দ্য দা ভিঞ্চি কোড

দ্য দা ভিঞ্চি কোড

০১. রবার্ট ল্যাংডন ঘুম থেকে জেগে উঠলো

অধ্যায় ১

রবার্ট ল্যাংডন খুব ধীরে ধীরে ঘুম থেকে জেগে উঠলো।

অন্ধকারে ফোন বাজছে ছোট্ট একটা অপরিচিত রিংয়ের শব্দ, যেনো বহু দূর থেকে ভেসে আসছে। সে বিছানার পাশে রাখা ল্যাম্পটার সুইচ হারে জ্বালিয়ে দিয়ে আড়চোখে চারপাশটা দেখে নিলো। একটা রেনেসা শোবার ঘর, ঘোড়শ সুইয়ের আমলের আসবাবপত্রে সাজানো, হাতে নক্সা করা দেয়াল আর সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত মেহগনি কাঠের বিছানা।

আরে, কোথায় আমি?

বিছানার পাশেই একটা বাথরোবের মনোগ্রামে লেখা : হোটেল রিজ প্যারিস।

আস্তে আস্তে ধোয়াটে ভাবটা কাটতে শুরু করলে ল্যাংডন রিসিভারটা তুলে নিলো। হ্যালো?

মঁসিয়ে ল্যাংডন? একটা পুরুষ কণ্ঠ বললো, আশা করি আপনার ঘুম ভাঙিনি আমি?

বিরক্ত হয়ে ল্যাংডন বিছানার পাশে রাখা ঘড়িটার দিকে তাকালো। রাত ১২টা বেজে ৩২ মিনিট। মাত্র এক ঘণ্টা হলো সে ঘুমিয়েছে, কিন্তু তার মনে হলো অনেকক্ষণ ধরে মরে পড়েছিলো।

আমি হোটেলের দ্বাররক্ষী বলছি, মঁসিয়ে। আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাই, কিন্তু আপনার কাছে একজন অতিথি এসেছেন। তিনি চাপাচাপি করছেন, ব্যাপারটা নাকি খুব জরুরি।

ল্যাংডনের তখনও ঘুম ঘুম ভাবটা ছিলো। একজন অতিথি? বিছানার পাশে রাখা টেবিলের ওপরে অনেকগুলো কাগজ-পত্রের সাথে দোমড়ানো-মোচড়ানো একটা ফ্লাইয়ারের দিকে তার চোখ গেলো।

আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব প্যারিস

গর্বের সাথে উপস্থাপন করছে

রবার্ট ল্যাংডন-এর সাথে একটি সন্ধ্যা

প্রফেসর, ধর্মীয় প্রতীক বিদ্যা

হারভার্ড ইউনিভার্সিটি

ল্যাংডন একটা গভীর আর্তনাদ করলো। আজ রাতের বক্তৃতাটা–শাত্রের ক্যাথেড্রালে লুকানো পাথরের মধ্যে প্যাগান প্রতীকগুলোর ওপর একটা স্লাইড শো–বোধহয় কোন রক্ষণশীল শ্রোতাকে বিক্ষুব্ধ করেছে। তাদের মধ্যে কোন কোন ধর্মীয় পণ্ডিত তার পিছু পিছু বাড়ি পর্যন্ত এসে এ নিয়ে একচোট ঝগড়াও করে গেছে।

আমি দুঃখিত, ল্যাংডন বললো, আমি খুবই ক্লান্ত আর–

মেই, মঁসিয়ে, দ্বাররক্ষীটি একটু নিচু স্বরে খুব তাড়া দিয়ে বললো, তার কণ্ঠে জরুরি একটা ভাব আছে। আপনার অতিথি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

ল্যাংডনের খুব কমই সন্দেহ ছিলো। ধর্মীয় চিত্রকর্ম এবং কাল্ট প্রতীকের ওপর রচিত তার বইয়ের জন্য সে খুব অপ্রত্যাশিতভাবেই শিল্পজগতে একজন সেলিবৃটি হয়ে গেছে, আর গত বছরের ল্যাংডনের পরিচিতিটা শত সহস্রগুণ বেড়ে গেছে ভ্যাটিকানের সাথে বহুল আলোচিত একটি ঘটনায় জড়িয়ে পড়াতে। ব্যাপারটা মিডিয়াতে বেশ প্রচার পেয়েছিলো। তারপর থেকে, স্বঘোষিত ইতিহাসবিদ আর শিল্পবিশারদদের স্রোতধারা তার ঘরের দরজায় আছড়ে পড়তে শুরু করেছে বিরামহীনভাবে।

আপনি যদি একটু দয়া করেন, ল্যাংডন বললো, ভদ্র থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো সে, আপনি কি তার নাম আর ফোন নাম্বারটা নিয়ে রাখতে পারবেন, তাকে বলবেন, আমি বুধবার প্যারিস ছাড়ার আগেই ফোন করে তার সাথে যোগাযোগ করবো। ধন্যবাদ, আপনাকে। দ্বাররক্ষী কোন কিছু বলার আগেই সে ফোনটা রেখে দিলো।

এবার উঠে বসে ল্যাংডন তার পাশে রাখা গেস্ট রিলেশনস হ্যান্ড বুকএর দিকে ভূরু তুলে তাকালো, সেটার কভারে লেখা আছে : আলো ঝলমলে শহরে ঘুমান শিশুদের মতো। প্যারিস রিজ-এ ঘুমান। ঘরের এক পাশে রাখা প্রমাণ সাইজের আয়নার দিকে ক্লান্তভাবে সে তাকালো। যে লোকটা আয়না থেকে তার দিকে চেয়ে আছে তাকে তার অচেনা মনে হলো এলোমেলো আর পরিশ্রান্ত।

তোমার একটু ছুটির দরকার, রবার্ট।

বিগত দশ বছর তার ওপর দিয়ে বেশ খাটুনি গেছে। কিন্তু সে আয়নার অবয়বটাকে সাধুবাদ দিতে নারাজ। তার তীক্ষ্ণ নীল চোখ জোড়া আজ রাতে ঘোলাটে আর কুয়াশাচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। খোঁচা খোচা দাড়িতে শক্ত চোয়াল আর টোল পড়া গালটা ঢেকে গেছে। মাথার চুল ধূসর হয়ে যাচ্ছে, আর সেটা হালকা পাতলা কালো চুলকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। যদিও তার নারী সহকর্মীরা এটাকে তার পাণ্ডিত্যের প্রকাশভঙ্গী হিসেবেই চিহ্নিত করে থাকে, তবে ল্যাংডন ভালো করেই জানে সত্যিকারে কারণটি।

বোস্টন ম্যাগাজিন যদি এখন আমাকে দেখতে পেতো। গত মাসে, ল্যাংডন সবচাইতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলো যখন বোস্টন ম্যাগাজিন শহরের সবচাইতে কৌতূহলোদ্দীপক ব্যক্তি হিসেবে টপ টেনের তালিকায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলো— একটা সন্দেহজনক সম্মানের ফলে সে তার হারভার্ডের সহকর্মীদের কাছ থেকে সীমাহীন টিটকারি আর টিপ্পনির শিকার হয়েছিলো। আজ রাতে, তার নিজ দেশ থেকে

তিন হাজার মাইল দূরে এই ব্যাপারটা এখানে এসে পৌঁছেছে। তার বক্তৃতার অনুষ্ঠানেও সেটা উঠে এসেছে। এখানেও সে এটার শিকার হলো।

ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়গণ… উপস্থাপিকা প্যারিসের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাভিলিয়ন ডওফিন-এর হলভর্তি লোকজনের উপস্থিতিতে ঘোষণা দিলো, আজ রাতের আমাদের অতিথিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কোন দরকার নেই। তিনি অসংখ্য বইয়ের লেখক। দ্য সিম্বোলজি অব সিক্রেট সেক্ট, দ্য আর্ট অব দি ইলুমিনাতি, দ্য লস্ট ল্যাংগুয়েজ অব ইডিওগ্রামস, আর আমি যখন কথা বলছি তখন তিনি লিখছেন দ্য রিলিজিয়াস আইকোনোলজির ওপর একটি বই। আপনাদের অনেকেই তার লেখা পাঠ্য বই হিসেবে শ্রেণী কক্ষে পড়েছেন।

উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে ছাত্ররা সানন্দে মাথা নেড়ে সায় দিলো। আমার একটা পরিকল্পনা ছিলো, আজ রাতে তাকে তার অসাধারণ পেশাগত পরিচয়টা তুলে ধরে আপনাদের কাছে উপস্থাপন করবো, কিন্তু যেভাবেই হোক… মেয়েটা ল্যাংডনের দিকে সকৌতুক দৃষ্টিতে তাকালো। একজন শ্রোতা কিছুক্ষণ আগে আমার হাতে একটা জিনিস দিয়ে গেছে, বলা যায়… কৌতূহলোদ্দীপক একটি পরিচয়।

বোস্টন ম্যাগাজিনর একটা কপি তুলে ধরলো মেয়েটা।

ল্যাংডন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। এটা সে পেলো কোথেকে?

উপস্থাপিকা প্রবন্ধটির নির্বাচিত কিছু অংশ পড়ে শোনাতে লাগলো। ল্যাংডনের মনে হলো সে তার চেয়ারের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। ত্রিশ সেকেন্ড পরে, দর্শক-শ্রোতারা প্রবল করতালি দিতে শুরু করলো। মেয়েটার মধ্যে এই ব্যাপারটা শেষ করার কোন চিহ্নই দেখা গেলো না। আর গতবছর মি. ল্যাংডনের সাথে ভ্যাটিকানের ওরকম ভূমিকার ব্যাপারে জনসমক্ষে কোন কিছু বলতে অস্বীকার করার কারণেই আমাদের কৌতূহলোদ্দীক মিটারের পয়েন্টে তিনি জয়ী হয়েছেন। উপস্থাপিকা শ্রোতাদের কাছে জিজ্ঞেস করলো, আপনারা কি আরো কিছু শুনতে চান?

মেয়েটাকে কেউ থামাচ্ছে না কেন, সে আবার পড়তে শুরু করতেই ল্যাংডন আপন মনে বললো।

যদিও প্রফেসর ল্যাংডন এখানে পুরস্কারপ্রাপ্ত তরুণদের মতো কেতাদূরস্ত হ্যান্ডসাম নন, কিন্তু চল্লিশোর্ধ এই পণ্ডিত ব্যক্তির পাণ্ডিত্য নির্ঘাত আবেদন সৃষ্টি করে।

তার আকর্ষণীয় উপস্থিতি, নিচু স্বরের স্পষ্ট উচ্চারণের মাধুর্যময় কণ্ঠের কারণে আরো বাঙময় হয়ে ওঠে যা তার ছাত্রীরা বর্ণনা করে কানের চকোলেট হিসেবে। পুরো হলটা হাসিতে ফেটে পড়লো।

ল্যাংডন জোড় করে একটা কাষ্ঠ হাসি দিলো। সে জানতো এর পরে কী হবে হ্যারিস টুইড পরিহিত হ্যারিসন ফোর্ড জাতীয় কিছু হাস্যকর লাইন কারণ আজকের সন্ধ্যায় সে পরে আছে হ্যারিস টুইড আর বারবেরি টার্টেলনেক টাই। সে ঠিক করলো একটা কিছু করতেই হবে।

ধন্যবাদ তোমাকে, মনিকা, ল্যাংডন আগেভাগেই উঠে দাঁড়িয়ে পোডিয়ামে দাঁড়ানো মেয়েটার দিকে এগোতে এগোতে বললো, বোস্টন ম্যাগাজিন নিশ্চিত ভাবেই গল্প বানাবার রসদ পেয়ে গেলো। সে শ্রোতাদের দিকে ঘুরে বিব্রত হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আমি যদি খুঁজে পাই আপনাদের মধ্যে কে এই প্রবন্ধটি এখানে এনেছেন, তবে দূতাবাসে গিয়ে আমি তাকে তার দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবো।

শ্রোতারা সবাই হেসে উঠলো।

তো, শ্রোতারা, আপনারা সবাই জানেন, আজ এখানে এসেছি প্রতীক বা সিম্বলের ক্ষমতা কী, সেটা বলতে…

ল্যাংডনের হোটেলের ফোনটা নিরবতা ভেঙে আরেকবার বেজে উঠলো।

অবিশ্বাসে গোঙাতে গোঙাতে সে ফোনটা তুলে নিলো। হ্যাঁ? যা ভেবেছে তা-ই, আবারো সেই হোটেলের দ্বাররক্ষী।

মি. ল্যাংডন, আমি আবারো ক্ষমা চাচ্ছি। আমি আপনাকে ফোন করেছি এটা জানাতে যে, আপনার অতিথি আপনার কাছেই আসছে। আমার মনে হলো, এটা আপনাকে জানানো দরকার।

ল্যাংডন কথাটা শুনেই পুরোপুরি ঘুম ছেড়ে উঠে গেলো। আপনি আমার ঘরে একজন লোককে পাঠিয়ে দিয়েছেন?

আমি এজন্যে ক্ষমা চাইছি, মঁসিয়ে, কিন্তু এরকম একজন মানুষকে…থামানোর ক্ষমতা আমি রাখি না।

ঠিক করে বলুন তো, লোকটা আসলে কে?

কিন্তু ফোনের অপর প্রান্তে দ্বাররক্ষী ফোনটা ততক্ষণে রেখে দিয়েছে।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ল্যাংডনের দরজায় জোড়ে জোড়ে ধাক্কা দেবার শব্দ হলো।

কী করবে ঠিক ভেবে না পেয়ে ল্যাংডন বিছানা থেকে নেমে এলো, স্যালোয় কার্পেটে তার পা-দুটো ডুবে যাচ্ছে বলে মনে হলো। তড়িঘড়ি দরজার দিকে এগিয়ে গেলো সে। কে?

মি. ল্যাংডন? আপনার সাথে একটু কথা বলার দরকার। লোকটার ইংরেজি উচ্চারণ একটু অন্যরকম, খুব পরিষ্কার, কিন্তু কর্তত্বপূর্ণ। আমার নাম লেফটেনান্ট জেরোমে কোলেত। পুলিশ জুডিশিয়ারের ডিরেকশন সেন্ট্রেইল থেকে এসেছি।

ল্যাংডন একটু থেমে গেলো। জুডিশিয়াল পুলিশ? ডিসিপিজে হলো আমেরিকার এফবিআইর সমতুল্য।

সিকিউরিটি চেইনটা লাগিয়ে ল্যাংডন দরজাটা একটু ফাঁক করলো। যে চেহারাটা তার দিকে চেয়ে আছে সেটা হাল্কা-পাতলা এবং ভাবলেশহীন, লোকটা সাংঘাতিক রকমের মেহদীন, নীল রঙের অফিশিয়াল পোশাক পরে আছে।

ভেতরে আসতে পারি কি? লোকটা বললো।

ল্যাংডন একটু ইতস্তত করলো, আগন্তুক তাকে নিরীক্ষণ করতে থাকলে সে একটু দ্বিধাগ্রস্তও হলো। হয়েছে কি?

আমার ক্যাপ্টেনের একটু আপনার সাহায্যের দরকার, ব্যক্তিগত একটা ব্যাপারে।

এখন? ল্যাংডন স্বাভাবিক হলো। মধ্যরাত তো পেরিয়ে গেছে।

আজ রাতে লুভর মিউজিয়ামের কিউরেটরের সাথে আপনার সাক্ষাত করার কথা ছিলো, আমি কি ঠিক বলেছি?

হঠাৎ করেই ল্যাংডনের খুব অস্বস্তি হতে লাগলো। বক্তৃতার শেষে আজ রাতে তার সাথে কিউরেটর জ্যাক সনিয়ের একটা সাক্ষাতের কথা ছিলো, কিন্তু সনিয়ে আর সেই সাক্ষাতের জন্য আসেননি। হ্যাঁ, আপনি সেটা জানলেন কি করে?

আমরা আপনার নাম উনার দৈনিক পরিকল্পনার নোটবুকে পেয়েছি।

আমার বিশ্বাস, খারাপ কিছু ঘটেনি?

লোকটা একটা করুণ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দরজার ফাঁক দিয়ে পোলারয়েডে তোলা একটি ছবি তার দিকে বাড়িয়ে দিলো। ছবিটা দেখেই ল্যাংডনের পুরো শরীরটা কাটা দিয়ে উঠলো।

ছবিটা একঘণ্টা আগে ভোলা হয়েছে। লুভরের ভেতরেই।

অদ্ভুত এই ছবিটা দেখে ল্যাংডন আতৃকে উঠে রেগে গেলো। কে এরকম করলো!

আমরা আশা করছি এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আপনার সাহায্যের দরকার রয়েছে। বিশেষ করে প্রতীকবিদ্যার ওপরে আপনার জ্ঞান এবং উনার সাথে সাক্ষাতের পরিকল্পনার কথাটা যদি বিবেচনা করেন।

ল্যাংডন ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো, এবার তার বিস্ময় কমে গিয়ে ভীতিতে রূপান্তরিত হলো। ছবিটা খুবই অদ্ভুত আর জঘন্য। ছবিটাতে এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে যা তার কাছে একেবারেই অভাবনীয় বলে মনে হচ্ছে। এরকম দৃশ্য সে এর আগে একবারই দেখেছে, কিন্তু সেটা কাউকে বলে বোেঝাবার মতো নয়। একবছর আগে ল্যাংডন এ রকম একটি লাশের ছবি পেয়েছিলো আর তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য অনুরোধও করা হয়েছিলো। চব্বিশ ঘণ্টা পরে, সে ভ্যাটিকানের ভেতরে নিজের জীবনটা প্রায় খুইয়ে ফেলতে যাচ্ছিলো। এই ছবিটা একেবারেই অন্যরকম। তারপরেও দৃশ্যগত দিক থেকে কিছুটা মিলও রয়েছে বলে তার মনে হলো। লোকটা তার ঘড়িটা দেখে নিলো। আমার ক্যাপিতেন অপেক্ষা করছে, স্যার।

মনে হলো ল্যাংডন তার কথা শুনতেই পায়নি। তার চোখ ছবিটার দিকে, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে।

এখানের এই প্রতীকটা, তার শরীরটা যেরকম অদ্ভুতভাবে …

অবস্থানটা? লোকটা তাকে বললো।

ল্যাংডন মাথা নেড়ে সায় দিলো, লোকটার দিকে তাকাতেই তার কী রকম শীতল অনুভব হলো। আমি ভাবতেও পরছি না, কোন মানুষের সাথে কেউ এরকম করতে পারে।

লোকটা চোখ কুচকে বললো, আপনি বুঝতে পারছেন না, মি. ল্যাংডন। ছবিতে আপনি যা দেখছেন… সে একটু বিরতি দিলো। মঁসিয়ে সনিয়ে নিজেই এমনটি করেছেন।

০২.

এক মাইল দূরে, সাইলাস নামের প্রকাণ্ড শরীরের শ্বেতি লোকটা রুই লা ব্রুইয়ার বিলাসবহুল ব্রাউনস্টোনের অট্টালিকার সদর দরজা দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঢুকলো। কাঁটাযুক্ত সিলিস বেল্টটা সে তার ঊরুতে বেঁধে রেখেছে। সেটা তার ঊরুর মাংস কেঁটে ভেতরে ঢুকে গেছে, তারপরেও তার মন-প্রাণ ঈশ্বরের জন্য কাজ করতে পেরে সন্তুষ্ট হয়ে গান গাইছে।

কষ্ট ভালো।

তার লাল চোখ দুটো ঢোকার সময় বাড়ির লবির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একটু দেখে নিলো। কিছু নেই। নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো সে। তার সহযোগী কোন সদস্যকে ঘুম থেকে ওঠাতে চাচ্ছিলো না সাইলাস। তার শোবার ঘরের দরজাটা খোলাই রয়েছে। এখানে তালা লাগানো নিষিদ্ধ। ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো সে।

 

ঘরটা একেবারে সাদামাটা শক্ত কাঠের জমিন, পাইন কাঠের একটা টেবিল আর একটা ক্যানভাস ম্যাট ঘরের এক কোণে, এটা সে বিছানা হিসেবে ব্যবহার করে। এই সপ্তাহটা এখানে সে একজন মেহমান হিসেবে এসেছে। এ ধরনের পরিবেশে দীর্ঘদিন ধরেই সে অভ্যস্ত, সেটা অবশ্য নিউইয়র্কে।

 

ঈশ্বর আমাকে আশ্রয় দিয়েছে, আমার জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দিয়েছে।

 

আজ রাতে, শেষপর্যন্ত সাইলাসের মনে হলো, সে তার ঋণশোধ করতে শুরু করেছে। টেবিলের ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা সেল ফোনটা হাতে নিয়ে একটা ফোন করলো।

 

হ্যাঁ? একটা পুরুষ কণ্ঠ জবাব দিলো।

 

টিচার, আমি ফিরে এসেছি।

 

বলো, কণ্ঠটা আদেশ করলো, এই কণ্ঠটা শুনতে পেয়ে আনন্দিত হলো সাইলাস।

 

চার জনের সবাই শেষ। তিন জন সেনেক্য … আর গ্র্যান্ডমাস্টার।

 

একটু বিরতি নেমে এলো, যেনো প্রার্থনা করছেন। তাহলে আমি অনুমান করতে পারি তোমার কাছে তথ্যটা আছে?

 

চার জনের সবার কাছ থেকেই নিয়েছি। আলাদা আলাদাভাবে।

 

তুমি তাদের কথা বিশ্বাস করেছো?

 

তাদের সবার কথা এক হওয়াটা কাকতালীয় কোন ব্যাপার না। উত্তেজনাপূর্ণ একটা নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেলো ওপর পাশ থেকে। চমক্কার। আমার ভয় ছিলো ভ্রাতৃসংঘের গোপনীয়তা রক্ষার সুনামটি বোধ হয় এবারেও টিকে যাবে।

 

মৃত্যুর দৃশ্যটা ছিলো খুবই অনুপ্রেরণামূলক।

 

তো, আমার শিষ্য, সেই কথাটা বলো, যা শোনার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে আছি।

 

সাইলাস জানতে সে তার শিকারদের কাছ থেকে যে তথ্যটা পেয়েছে সেটা আশংকাজনক। টিচার, চার জনের সবাই ঐতিহাসিক কি-স্টোন ক্লেফ দ্য ভূত-এর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করেছে।

 

ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে নিঃশ্বাস নেবার যে শব্দটা শুনতে পেলো সেটা তার টিচারের উত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ। কি-স্টোন, ঠিক যেমনটি আমরা সন্দেহ করেছিলাম।

 

লোককাহিনী মতে, ভ্রাতৃসংঘ পাথরের চোঙার ভেতরে একটা মানচিত্র তৈরি করেছে—একটা ক্লেফ দ্য ভূত… আথবা কি-স্টোন—খোঁদাই করা একটা চাকতি যা ভ্রাতৃসংঘের সেই অসাধারণ গোপনীয়তাকে, চূড়ান্ত শায়িত স্থানকে উন্মোচিত করে…তথ্যটা এতো বেশি শক্তিশালী যে, এটা রক্ষা করার কারণেই সৃষ্টি করা হয়েছে। ভ্রাতৃসংঘ।

 

আমরা কখন কি-স্টোনটা হাতে পাবো, টিচার বললেন, আমরা আর মাত্র একধাপ দূরে আছি।

 

আপনার ধারণার চেয়েও আমরা কাছাকাছি এসে পড়েছি। কি-স্টোনটা এখানেই আছে, এই প্যারিসে।

 

প্যারিসে? অবিশ্বাস্য। তাহলে তো খুব বেশিই সহজ হয়ে গেলো।

 

সাইলাস আজকের রাতের সমস্ত ঘটনাই বর্ণনা করলো…কীভাবে চারজন হতভাগ্য ব্যক্তি তাদের ঈশ্বরবিহীন জীবনটাকে শেষ মুহূর্তে রক্ষা করার জন্য তার বিনিময়ে সেই গুপ্ত ব্যাপারটি তার কাছে বলে গেছে। প্রত্যেকেই সাইলাসের কাছে ঠিক একই বর্ণনা দিয়েছে কি-স্টোনটা প্যারিসেরই কোন প্রাচীন গীর্জায়, নির্দিষ্ট কোন স্থানে অত্যন্ত সঙ্গোপনে লুকিয়ে রাখা হয়েছে এগুলি দ্য সেন্ট সালপিচ গীর্জায়।

 

প্রভুর নিজের ঘরের ভেতরেই, টিচার বিস্ময়ে বললেন। তারা আমাদের সাথে কীভাবে ফাজলামি করেছে দ্যাখো।

 

যেমনটা তারা শতশত বছর ধরে করে আসছে।

 

টিচার একটু চুপ হয়ে গেলেন। যেনো এই মুহূর্তের বিজয়টাকে নিজের বিজয় হিসেবে পরিগণিত হবার সুযোগ করে দিচ্ছেন। শেষে তিনি বললেন, তুমি ঈশ্বরের জন্য একটি মহান কাজ করেছে। আমরা এজন্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অপেক্ষা করেছি। তুমি অবশ্যই আমার জন্য কি-স্টোনটা উদ্ধার করে দেবে। আজ রাতেই। বিপদটা সম্পকে তো তোমার সম্যক ধারণা আছেই।

 

সাইলাস জানতো বেশুমার বিপদ রয়েছে এতে, আর টিচার এখন যে আদেশ দিয়েছেন সেটা মনে হচ্ছে খুবই অসম্ভব একটি ব্যাপার। কিন্তু গীর্জাটা তো একটা দূর্গ। বিশেষ করে রাতের বেলায়। আমি কিভাবে ভেতরে ঢুকবো?

 

টিচার একজন অসামান্য প্রভাবশালী মানুষ, আত্মবিশ্বাসী কষ্ঠে তাকে সবিস্তারে বলে দিলো কি করতে হবে।

 

সাইলাস ফোনটা নামিয়ে রাখতেই উত্তেজনায় তার চামড়া টান টান হয়ে গেলো।

 

আর একঘন্টা। মনে মনে বললো। সে খুব কৃতজ্ঞ যে, টিচার ঈশ্বরের ঘরে ঢোকার আগে কী কী করতে হবে তার জন্য সময় দিয়েছেন। আজকের পাপের জন্য আমি অবশ্যই আমার আত্মাকে বিশুদ্ধ করে নেবো।

 

আজকে যে পাপ করা হয়েছে সেটার উদ্দেশ্য ছিলো খুবই পবিত্র। ঈশ্বরের শত্রুদের বিরুদ্ধে শতাব্দী ধরেই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ক্ষমা পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে।

 

তারপরও, সাইলাস জানতো, ধর্মের জন্য বলি দিতেই হয়।

 

কাপড়চোপড় খুলে ফেলে সাইলাস ঘরের মাঝখানে হাটু গেঁড়ে বসে পড়লো। তার ঊরুতে বাঁধা সিলিস বেল্টটার দিকে তাকালো। দ্য ওয়ের সত্যিকারের সব অনুসারীই এই জিনিসটা পরে থাকে একটা চামড়ার বেল্ট তাতে লোহার কাঁটা লাগানো থাকে যা মাংসপেশীকে কেঁটে ভেদ করে যিশুর যন্ত্রণাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

যদিও সাইলাস নিয়মানুযায়ী দুঘণ্টার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরেই আজ এটা পরে আছে, কারণ দিনটা কোন সাধারণ দিন নয়। বেল্টটা আরো আঁটোসাঁটো করে বেঁধে নিলো সে, যাতে মাংসপেশীতে সেটা আরো বেশি বেঁধে যায়। আস্তে আস্তে তার প্রার্থনা শুরু করলো সে। যন্ত্রণা ভালো। সাইলাস বিড়বিড় করে বললো। বারবার সব গুরু গুরু ফাদার হোসে মারিয়া এসক্রিভার পবিত্র মন্ত্রটা আওড়াতে লাগলো সে।

 

যদিও এসক্রিভা ১৯৭৫ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন, তার প্রজ্ঞা আজো বেঁচে আছে, তাঁর শব্দ আজো সারা পৃথিবীর হাজার হাজার বিশ্বাসীরা হাটু গেঁড়ে প্রার্থনা করার সময় ব্যবহার করে থাকে। এই প্রার্থনাটি সবার কাছে কোরপোরাল মর্টিফিকেশন বা শারীরিক শাস্তি হিসেবে পরিচিত।

 

সাইলাস এবার তার পাশে রাখা গিট পাকানো মোটা দড়িটার দিকে তাকালো। গিটগুলোতে ওকননা রক্ত লেগে আছে। নিজের যন্ত্রণাকে বিশুদ্ধ করার জন্য দ্রুত একটা প্রার্থনা সেরে নিলো। তারপর, দড়িটার এক মাথা মুঠোতে নিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘাড়ের উপর দিয়ে পিঠে আঘাত করতে শুরু করলো। সে টের পেলো গিটগুলো তার পিঠে লাগছে। সে বার বার এটা করতে লাগলো। মাংসগুলো ফালা ফালা করে ফেললো। বার বার।

 

কাঙিগো কোরপাস মেয়োম। অবশেষে, সে বুঝতে পারলো রক্ত ঝড়তে শুরু করেছে।

 

 

 

০৩.

 

সিতরোঁ গাড়িটা দক্ষিণ প্রান্তের অপেরা হাউস অতিক্রম করে প্লেস ভোদোয়ায় এসে পড়তেই এপ্রিলের নির্মল বাতাসের ঝাঁপটা জানালা দিয়ে ভেতরে এসে লাগলো। গাড়িতে বসা রবার্ট ল্যাংডনের মনে হলো তার চিন্তাভাবনাগুলো পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। তড়িঘড়ি করে গোসল ও শেভ করার জন্য তাকে দেখতে খুব স্বাভাবিক মনে হলেও এটা তার উদ্বেগটাকে একটুও কমাতে পারেনি। কিউরেটরের ভয়ংকর ছবিটা তার মনে আঁটকে আছে।

 

জ্যাক সনিয়ে মারা গেছেন।

 

কিউরেটরের মৃত্যু ল্যাংডনের কাছে একটা বিরাট ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই না। পর্দার অন্তরালে থাকা সত্ত্বেও সনিয়ে একজন শিল্পবোদ্ধা এবং শিল্পের জন্য তাঁর অবদানের যে সুনাম আছে, সেটার জন্য একজন বিখ্যাত ব্যক্তিই হয়ে উঠেছিলেন। পুশিয়ান এবং তেনিয়ারের শিল্পকর্মের মধ্যে যে লুক্কায়িত কোড বা সংকেত রয়েছে সেটার ওপর রচিত তার বই ল্যাংডনের খুবই প্রিয় এবং সে এগুলো শ্রেণীকক্ষে পাঠ্য হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। আজকের সাক্ষাতের জন্য ল্যাংডন অধীর আগ্রহে ছিলো, কিন্তু কিউরেটর যখন কথা মতো আসতে পারলেন না তখন সে যারপর নাই হতাশ হয়েছিলো।

 

আবার কিউরেটরের ছবিটা তার মনের পর্দায় ভেসে উঠলো। জ্যাক সনিয়ে নিজেই এরকম করেছেন? ছবিটা মন থেকে তাড়ানোর জন্য ল্যাংডন জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। বাইরে, শহরটা বাতাসের ঝাঁপটায় ফুরফুর করছে রাস্তার হকাররা তাদের টং গাড়িগুলো ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, ময়লা ফেলার লোকগুলো ময়লার ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছে ডাস্টবিনের দিকে, একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা এই মধ্যরাতেও ঠাণ্ডা বাতাসের বিরুদ্ধে জড়াজড়ি করে উষ্ণতা খুঁজছে, বাতাসে জেসমিন ফুলের গন্ধ। সিতরোটা বেশ কর্তপূর্ণভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে, এটার দুই টোনের সাইরেনের আওয়াজ রাস্তার যানবাহনগুলোকে ছুরির ফলার মতো কেটে কুটে গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

 

আজ রাতে আপনি প্যারিসে আছেন দেখে লো ক্যাপিতেইন খুব খুশি হবেন, পুলিশের লোকটা হোটেল ছাড়ার পর এই প্রথম কথা বললো। কাকতালীয়ভাবেই এটা সৌভাগ্যের।

 

ল্যাংডন সৌভাগ্য ছাড়া আর সবকিছুই ভাবছে। আর কাকতালীয় ব্যাপারটাকে সে পুরোপুরি বিশ্বাসও করতে পারে না, এরকম কোন ধারণায় সে বিশ্বাস করে না। যে কিনা সারা জীবন ব্যয় করেছে লুকানো প্রতীক, সংকেত আর বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস নিয়ে, সেই ল্যাংডন মনে করে পৃথিবীটা ইতিহাস আর ঘটনাসমূহের একটা জাল ছাড়া আর কিছুই না। সংযোগটা হতে পারে অদৃশ্য, সে প্রায়শই তার হারভার্ডের ক্লাসের ছাত্র ছাত্রিদের কাছে কথাটা বলে, কিন্তু সয়ময়ই সেগুলো থাকে মাটির নিচে।

 

আমার অনুমান, ল্যাংডন বললো, প্যারিসের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি আপনাদেরকে বলেছে আমি কোথায় আছি?

 

গাড়ির চালক মাথা নাড়লো। ইন্টারপোল।

 

ইন্টারপোল, ল্যাংডন ভাবলো। অবশ্যই। সে ভুলে গিয়েছিলো ইউরোপের সবগুলো হোটেলই তাদের অতিথির তালিকা ইন্টারপোলের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সরবরাহ করে থাকে—এটাই নিয়ম। একটা নির্দিষ্ট রাতে সমগ্র ইউরোপে, কে কোথায় ঘুমাচ্ছে, সে সম্পর্কে একেবারে নিখুঁত তথ্য ইন্টারপোলের কাছে থাকে। রিজ হোটেলে যে ল্যাংডন অবস্থান করছে, সেটা ইন্টারপোলের জানতে পাঁচ সেকেন্ড সময় লেগেছে।

 

সিতরোটা শহরের দক্ষিণ দিকে দ্রুতবেগে ছুটতেই আইফেল টাওয়ারটা দেখা গেলো। আকাশের দিকে তাক করে আছে, যেনো খোচা দিবে আকাশটাকে। এটা দেখেই ল্যাংডন ভাবলো ভিত্তোরিয়ার কথা, মনে পড়ে গেলো এক বছর আগে করা প্রতীজ্ঞাটা, ছমাস অন্তর অন্তর তারা দেখা করবে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন রোমান্টিক জায়গায়। ল্যাংডনের মনে হলো আইফেল টাওয়ারটা তাদের তালিকায় অবশ্যই থাকতো। দুঃখের কথা, সে ভিত্তোরিয়াকে বিদায়ী চুম্বন দিয়েছিলো একবছর আগে রোমের এক কোলাহলপূর্ণ বিমানবন্দরে।

 

আপনি কি তার ওপরে উঠেছেন? পুলিশের লোকটা জিজ্ঞেস করলে ল্যাংডন তার দিকে তাকালো, নিশ্চিতভাবে সে ভুল বুঝেছে।

 

কি বললেন, বুঝতে পারলাম না।

 

খুব সুন্দর, না? লোকটা আইফেল টাওয়ারের দিকে ঈশারা করে বললো। আপনি কখনও ওটার ওপরে উঠেছেন?

 

ল্যাংডন তার দিকে চেয়ে বললো, না, আমি টাওয়ারে কখনও উঠিনি।

 

এটা ফ্রান্সের প্রতীক। আমার মনে হয় সেটা ঠিকই আছে।

 

ল্যাংডন উদাসভাবে মাথা নেড়ে সায় দিলো। সিম্বোলজিস্টরা প্রায়শই ফ্রান্সকে উল্লেখ করে মাচিসমো, মেয়েলীপনা এবং খর্বাকৃতির রাষ্ট্রনায়ক নেপোলিয়ন আর বামন পেপিনদের দেশ হিসেবে তারা হাজার ফুট উঁচু জাতীয় প্রতীক ছাড়া অন্যকিছু বেছে নিতে পারেনি।

 

রুই দ্য রিভোলিতে এসে পড়তেই ট্রাফিক সিগনালের বাতিটা জ্বলে উঠলো, কিন্তু সিতরোটার গতি কমলো না। পুলিশের লোকটা গাড়িটা আরো জোড়ে চালিয়ে তুইলেরি

 

গার্ডেনের উত্তর দিকের প্রবেশ পথ দিয়ে রুই কাস্তিলিওর দিকে চলে গেলো। এটা প্যারিসের সেন্ট্রাল পার্কের নিজস্ব সংস্করণ। বেশির ভাগ পর্যটকই এটাকে ভুল করে জারদিন দে তুইলেরি বলে ডাকে। তাদের ধারণা এখানে হাজার হাজার টিউলিপ ফোটে বলে এরকম নাম। কিন্তু তুইলেরি নামটা সত্যিকারের যে জিনিস থেকে এসেছে, সেটা অনেক কম রোমান্টিক। এই পার্কটা আগে প্যারিসীয় ঠিকাদারদের একটা ইট বানাবার কারখানা ছিলো। খনি থেকে পিট আর মাটি দিয়ে এখানে এক ধরনের লাল টাইলস বানানো হোতো, যা বাড়ি ঘরের ছাদে ব্যাপকহারে ব্যবহারে করা হতো—সেই টাইলসকেই ফরাসিরা বলে তুইলে।

 

ফাঁকা পার্কটাতে ঢোকামাত্রই পুলিশের লোকটা সাইরেন বন্ধ করে দিলো। আচমকা নিরবতা নেমে আসাতে ল্যাংডন স্বস্তিবোধ করলো।

 

ল্যাংডন সবসময়ই তুইলেরিকে পবিত্রস্থান বলে বিবেচনা করে। এইসব বাগানে বসেই ক্লদ মনে ফর্ম এবং রঙ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন, আর এই জায়গাটিই ইপ্রেশনিস্ট আন্দোলনের জন্ম দিতে প্রেরণা দিয়েছে। আজ রাতে, এই জায়গাটিই অদ্ভুত এক অশরীরী অনূভূতির জন্ম দিচ্ছে।

 

সিতরোটা বাম দিকে মোড় নিয়ে পার্কের সেন্ট্রাল বুলেভার্ডের পশ্চিম দিকে চলে গেলো। একটা গোল পুকুর পাড় ঘুরে ড্রাইভার ফাঁকা এভিনুতে এসে পড়লো। ল্যাংডন দেখতে পেলো তুইলেরি গার্ডেনের শেষ প্রান্তটি, একটা বিশাল পাথরের পথ দিয়ে সেটা শেষ হয়েছে।

 

আর্ক দু কারুজেল।

 

যদিও আর্ক দু কারুজেলে হৈ চৈ পূর্ণ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে, তারপরও চিত্রমোদীরা এই স্থানটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কারণে উল্লেখ করে থাকে। তুইলেরির শেষপ্রান্তে অবস্থিত বিশাল চত্বরটির চারদিকে পৃথিবীর চারটি সেরা জাদুঘর দেখতে পাওয়া যাবে… কম্পাসের প্রতিটি দিকে একটি করে অবস্থিত।

 

ডানদিকের জানালা দিয়ে দক্ষিণ দিকে সিন নদী এবং কুয়ে ভলতেয়ার দেখা যায়। ল্যাংডন আড়ম্বরপূর্ণ আলোকজ্জল পুরাতন স্টেশনের চত্বরটি দেখতে পেলো—এটা এখন মিউজি দরসে। বাম দিকে তাকালে দেখা যাবে অত্যাধুনিক পশিদু সেন্টার, যা আধুনিক চিত্রকলার জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তার পেছনে, পশ্চিম দিকে, ল্যাংডন জানতো রামেসিসের প্রাচীন অবিলিস্কটা গাছপালার ওপর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই জায়গাটাতেই জো দ্য পমের জাদুঘর অবস্থিত।

 

কিন্তু ঠিক সোজা, সামনের পূর্ব দিকে, ল্যাংডন দেখতে পেলো কারুকার্যময় রেনেসা প্রাসাদটিকে যা এখন বিশ্বের সবচাইতে বিখ্যাত জাদুঘর হিসেবে পরিচিত।

 

মিউজি দু লুভর।

 

ল্যাংডনের চোখ যখন বিশাল চত্বরটি দেখলো তখন অতি পরিচিত বিস্ময়ের আভা তার সমস্ত অনুভূতিতে ছড়িয়ে পড়লো। একটা বাড়তি বিশাল খোলা চত্বর সামনে, লুভরের সুবিশাল দূর্গ সদৃশ্য এলাকাটি প্যারিসের সবচাইতে মনোরম দৃশ্য। এটার আকৃতি বিশাল একটি অশ্বক্ষুরের মতো, লুভর ইউরোপের সবচাইতে দীর্ঘ ভবন। দৈর্যের দিক থেকে পাশাপাশি তিনটি আইফেল টাওয়ারের সম্মিলিত দৈর্ঘের সমান। এমনকি খোলা চত্বরের কয়েক মিলিয়ন স্কয়ার ফিটের রাজকীয় জায়গাটিও তার চেয়ে বেশি বড় নয়। ল্যাংডন একবার লুভরের পুরো এলাকাটি হেটে খুবই অবাক হয়েছিলো, তিন মাইলের মতো ছিলো ভ্রমণটা।

 

এই দালানের ভেতরে রাখা ৬৫৩০০টি শিল্পকর্ম ভালো মতো দেখতে হলে পাঁচ সপ্তাহ লাগার কথা থাকলেও বেশিরভাগ পর্যটকই সংক্ষিপ্ত সফর বেছে নেয়, ল্যাংডন যাকে লুভর লাইট হিসেবে উল্লেখ করে তিনটি বিখ্যাত বস্তু দেখার মধ্য দিয়ে লুভর পরিক্রমা শেষ করা : মোনালিসা, ভেনাস দ্য মিলো, এবং উইংগ ভিক্টোরি। আর্ট বুচওয়াল্ড একবার বলেছিলেন যে, এই তিনটি মাস্টারপিস দেখতে তাঁর পাঁচ মিনিট পঞ্চান্ন সেকেন্ড লেগেছিলো।

 

ড্রাইভার একটা ওয়াকিটকি হাতে নিয়ে ক্রমাগতভাবে ফরাসিতে কথা বলে যেতে লাগলো। মঁসিয়ে ল্যাংডন এ এরাইভ। দু মিনিত্‌স।

 

ওয়াকি-টকিতে একটা নির্দেশ দেয়া হলো তাকে। যন্ত্রটা সরিয়ে রেখে পুলিশের লোকটা ল্যাংডনের দিকে ফিরলো। আপনি সদর দরজায় ক্যাপিতেনের সাথে দেখা করবেন।

 

প্লাজার ট্রাফিক সিগনালের নিষেধাজ্ঞা বাতিটা অগ্রাহ্য করে ড্রাইভার গাড়ির গতি আরো বাড়িয়ে সিতরোটাকে প্লাজার পাথরের চত্বরে তুলে নিলে লুভরের মূল প্রবেশ পথটি দৃষ্টিগোচর হলো। দূর থেকে সেটাকে খুব উদ্যতভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। একটা বিশালাকৃতির ত্রিভুজ। জ্বলজ্বল করছে সেটা।

 

লা পিরামিদ।

 

প্যারিসের লুভরের নতুন প্রবেশ পথ, জাদুঘরটির মতোই বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। বির্তকিত, অতি-আধুনিক কাঁচের পিরামিডটি চায়নিজ বংশোদ্ভূত আমেরিকান স্থপতি আই এম পেইর নক্সা করা, আজো সেটা ঐতিহ্যবাদীদের দ্বারা সমালোচিত হয়ে আসছে, যারা মনে করে এটা বেঁনেসা ভবনের প্রাঙ্গণটির মর্যাদা নষ্ট করে ফেলেছে। গ্যোতে স্থাপত্যকলাকে জমে যাওয়া সঙ্গীত হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আর পেইর সমালোচকরা এই পিরামিডকে ব্ল্যাকবোর্ডের ওপর ভাঙা নখ বলে উল্লেখ করে থাকে। প্রগতিশীল ভক্তরা অবশ্য পেইর একাত্তর ফুট উঁচু স্বচ্ছ এই পিরামিডকে প্রাচীন স্থাপনা এবং আধুনিক পদ্ধতির অসাধারণ সম্মিলন বলে মনে করে—পুরাতন এবং নতুনের মধ্যে একটা প্রতীকি যোগসূত্র লুভরকে নতুন সহস্রাব্দে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছে।

 

আপনি কি আমাদের পিরামিডটি পছন্দ করেন? পুলিশের লোকটি জিজ্ঞেস করলো।

 

ল্যাংডন ভূরু কুকালো। মনে হয়, ফরাসিরা আমেরিকানদের এই কথাটা জিজ্ঞেস করতে পছন্দ করে। এটা একটা উভয় সংকটের প্রশ্ন, অবশ্যই পিরামিডটাকে ভালো লাগছে বলে মেনে নিলে আপনাকে একজন রুচিহীন আমেরিকান হিসেবে দেখা হবে, আর অপছন্দের কথা প্রকাশ করলে সেটা ফরাসিদেরকে অপমান করা হবে।

 

মিতের একজন সাহসী মানুষ ছিলেন, ল্যাংডন জবাব দিলো, ভিন্ন পথে এগোলো সে। প্রয়াত ফরাসি প্রেসিডেন্ট যিনি পিরামিডটি স্থাপনে সম্মতি দিয়েছিলেন, বলা হয়ে থাকে তিনি ফেরাউনের জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। মিশরীয় অবিলিস্ক, চিত্র আর শিল্পকলায় প্যারিস ভরে ফেলার জন্য তাকে দায়ী করা হয়, সেই ফ্রাসোয়া মিতেরর মিশরীয় সংস্কৃতির ব্যাপারে দারুণ আগ্রহ এবং শ্রদ্ধা থাকার দরুণ তাঁকে এখনও স্ফিংস হিসেবে অভিহিত করা হয়।

 

ক্যাপ্টেনের নাম কি? ল্যাংডন জিজ্ঞেস করলো। আলোচনাটা বদলে ফেললো সে।

 

বেজু ফশে, পিরামিডের মূল প্রবেশ পথের দিকে এগোতে এগোতে ড্রাইভার বললো। আমরা তাকে বলি লো তাঊরু।

 

ল্যাংডন তার দিকে তাকালো, ভাবলো, সব ফরাসিরই কি একটা করে জম্ভ জানোয়ারের নামে ডাক নাম রয়েছে কিনা।

 

আপনারা আপনাদের ক্যাপ্টেনকে বৃষল, মানে ষাড় বলে ডাকেন?

 

লোকটা চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকালো। আপনার ফরাসি খুব ভালো, যতোটা আপনি স্বীকার করেন, তারচেয়েও বেশি ভালো, মঁসিয়ে ল্যাংডন।

 

আমার ফরাসি খুব ভালো নয়, ল্যাংডন ভাবলো, কিন্তু আমার রাশিফলের প্রতীক সংক্রান্ত জ্ঞান বেশ ভালোই বলা যায়। তাউরাস মানে বৃষ, অর্থাৎ ষাড়। জ্যোতিষ বিজ্ঞানের প্রতীকগুলো সারা পৃথিবীতে প্রায় একই রকম।

 

পুলিশের লোকটা গাড়িটাকে একটা জায়গায় থামিয়ে পিরামিডের পাশে একটা বড় দরজার দিকে ইঙ্গিত করলো।

 

এটা হলো প্রবেশ পথ। গুডলাক, মঁসিয়ে।

 

আপনারা আসছেন না?

 

আপনাকে এই পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার নির্দেশই ছিলো আমার কাছে। আমার অন্য খানে কাজ রয়েছে।

 

ল্যাংডন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো। এটা আপনার সার্কাস।

 

পুলিশের লোকটা গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে চলে গেলো।

 

গাড়িটা চলে যাওয়ার পর ল্যাংডের মনে হলো, ইচ্ছে করলে সে এখান থেকে খুব সহজেই উল্টো পথে চলে যেতে পারে। প্রাঙ্গন থেকে বেড় হয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে ঘুমাতে পারে। কিন্তু তার এও মনে হলো এই আইডিয়াটা সম্ভবত খুব বাজে একটা ব্যাপার হবে।

 

ভেতরে ঢুকেই ল্যাংডনের মনে হলো একটা কাল্পনিক জগতে ঢুকে পড়ছে সে, অস্বস্তিকর লাগছে তার। রাতের পরিবেশটা স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। বিশ মিনিট আগে সে হোটেলে ঘুমিয়ে ছিলো। এখন দাঁড়িয়ে আছে একটা স্বচ্ছ পিরামিডের সামনে যেটা তৈরি করেছে একজন স্ফিংস আর সে অপেক্ষা করছে এক পুলিশের জন্য, যাকে সবাই ডাকে ষাড় বলে।

 

আমি সালভাদোর দালির চিত্রকর্মের মধ্যে আঁটকা পড়ে গেছি। সে ভাবলো।

 

ল্যাংডন মূল প্রবেশ পথের দিকে এগোতে লাগলো—একটা বিশাল ঘূর্ণায়মান দরজা। ভেতরের ফয়ারটা পেরিয়ে গেলে দেখা গেলো জায়গাটা আঁধো আলো অন্ধকার আর একেবারেই ফাঁকা। আমি নক করবো?

 

ল্যাংডন অবাক হয়ে ভাবলো হারভার্ডের কোন ইজিপ্টোলজিস্ট কি কখনও কোন পিরামিডের দরজায় নক করে কোন জবাবের আশা করেছিলো কিনা। সে কাঁচের ওপর টোকা মারার জন্য হাত ওঠাতেই নিচের অন্ধকার থেকে একজন মানুষের অবয়ব আসতে দেখলো। লোকটা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসছে। দেখতে শক্তসামর্থ্য আর কালো, প্রায় নিয়ানডারথাল মানুষের মতো, পরে আছে কালো ডাবল ব্রেস্টের সুট যা তার চওড়া কাঁধটাকে ঢেকে রেখেছে। সে অগ্রসর হচ্ছে অভ্রান্ত কর্তৃত্বসহকারে, দৃঢ় পদক্ষেপে। লোকটা ফোনে কথা বলছে কিন্তু তার সামনে আসতেই ফোনটা ছেড়ে দিয়ে ল্যাংডনের দিকে তাকালো সে।

 

আমি বেজু ফশে, ল্যাংডন ঘূর্ণায়মান দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সে ঘোষণা দিলো। সেন্ট্রাল জুডিশিয়াল পুলিশের ক্যাপটেন। তার কণ্ঠ খুবই স্পষ্ট—গম গম করছে … যেনো আকাশে মেঘের গর্জন।

 

ল্যাংডন হাত মেলাবার জন্য নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলো। রবার্ট ল্যাংডন।

 

ফশের বড়সড় হাতের পাঞ্জাটি ল্যাংডনের হাতটি সজোড়ে ধরে প্রচণ্ড জোড়ে চাপ দিলো।

 

ছবিটা আমি দেখেছি। ল্যাংডন বললো, আপনার লোক আমাকে বলেছে জ্যাক সনিয়ে নিজেই এটি করেছেন–

 

মি. ল্যাংডন, ফশের কঠিন কালো চোখ তার ওপর আঁটকে আছে। আপনি ছবিতে যা দেখেছেন তা সনিয়ে যা করেছে তার গুরু মাত্র।

 

 

 

০৪.

 

ক্যাপ্টেন বেজু ফশে ক্রুব্ধ ষাড়ের মতো ফুঁসছে। তার চওড়া কাঁধটা একটু পেছনের দিকে হেলে থুতনিটা বুকের কাছে আঁটকে আছে। তেল দেবার জন্য কালো চুলগুলো চক্ করছে। কপালের সম্মুখভাগটি তীরের মতো উচিয়ে আছে, আর ভূরু দুটো যেনো সেটা বিভক্ত করে রেখেছে। কাছে আসতেই তার কালো চোখ দুটো আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো। জ্বল জ্বল করা চোখ দুটো তার সুনামকে আরো বেশি প্রকট করে তুলেছে।

 

কাঁচের পিরামিডের নিচ দিয়ে চলে যাওয়া বিখ্যাত মার্বেল সিঁড়ি দিয়ে আর্টিয়ামের ভেতরে ল্যাংডন ফশের পিছু পিছু চললো। তারা এগোতেই দুজন অস্ত্রধারী জুডিশিয়াল পুলিশের দেখা পেলো। তাদের হাতে রয়েছে মেশিনগান। ব্যাপারটা খুব পরিষ্কার : আজরাতে কেউ এখান থেকে ক্যাপ্টেন ফশের আশীর্বাদ ছাড়া ঢুকতে এবং বের হতে পারবে না।

 

গ্রাউন্ড লেবেলের নিচে যেতে যেতে ল্যাংডন ক্রমাগত একটা কাঁপুনি থেকে নিজেকে বাঁচাতে লড়াই করলো। ফশের উপস্থিতি সুখকর নয়, আর লুকেও এই সময়টাতে প্রায় জীবন্ত কবর দেয়ার ভূগর্ভস্থ কবরখানা বলেই মনে হচ্ছে। সিঁড়িটা অন্ধকার সিনেমা হলের মতো। ল্যাংডন তার নিজের পায়ের শব্দ শুনতে পেলো। শব্দটা উপরের কাছে প্রতিফলিত হচ্ছে। সেখানে তাকাতেই ল্যাংডন দেখলো স্বচ্ছ কাঁচের ছাদটা। বাইরের আলো সেখানে মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

 

আপনি কি এটা পছন্দ করেন? ফশে জিজ্ঞেস করলো, থুতনিটা একটু উপরের দিকে তুলে মাথা নাড়লো সে।

 

ল্যাংডন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো, সে এসব খেলার জন্য খুব বেশিই ক্লান্ত। হ্যাঁ, আপনাদের পিরামিডটা সত্যি বিস্ময়কর।

 

ফশে ঘোৎঘোৎ করে উঠলো। প্যারিসের চেহারায় এটা একটা কলঙ্কের দাগ।

 

লেগেছে। ল্যাংডন বুঝতে পারলো তার সামনের লোকটাকে খুশি করা মোটেই সহজ কাজ নয়। সে ভাবলো, ফশের কি কোন ধারণা আছে যে, এই পিরামিডটা যা প্রেসিডেন্ট মিতেরর প্রচণ্ড দাবি ছিলো, সেটা নির্মিত হয়েছে একেবারে কাটায় কাটায় ৬৬৬টা স্প্যান দিয়ে একটা অদ্ভুত অনুরোধ ছিলো সেটা, যা সব সময়ই সমালোচক ও নিন্দুকদের কাছে গরম আলোচনার বিষয় হয়ে আছে, যারা দাবি করে ৬৬৬টি হলো শয়তানের সংখ্যা। ত

 

ল্যাংডন সিদ্ধান্ত নিলো এই প্রসঙ্গটি তুলবে না।

 

তারা যখন আরো নিচে নামতে লাগলো তখন অন্ধকার ভেদ করে জায়গাটা দৃষ্টির গোচরে চলে এলো। মাটি থেকে সাতান্ন ফিট নিচে তৈরি করা লুভরের নতুন স্থাপনা ৭০০০০ বর্গফুটের লবিটাকে মনে হবে অন্তহীন এক গুহা। উপরে লুভরের জমিন যে রকম মধু-রঙের পাথর দিয়ে তৈরি তার সাথে মিল রেখেই এ জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে উষ্ণতা নিরোধক মার্বেল পাথর। নিচের এই জায়গাটি সাধারণত সূর্যের আলো এবং পর্যটকদের পদভারে কম্পিত হয়। আজরাতে, অবশ্য লবিটা অন্ধকার আর ফাঁকা মনে হচ্ছে। আর এতে করে পুরো জায়গাটিতে এক ধরনের হিমশীতল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

 

মিউজিয়ামের নিয়মিত নিরাপত্তারক্ষীরা কোথায়? ল্যাংডন জিজ্ঞেস করলো।

 

এঁ কোরাতোঁয়া, ফশে এমনভাবে জবাব দিলো যেনো ল্যাংডন ফশের দলটির কর্তব্যনিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নিশ্চিতভাবেই, আজরাতে এখানে কেউ প্রবেশ করেছিলো যার এভাবে প্রবেশ করাটা ঠিক হয়নি। রাতের বেলায় লুভরের দায়িত্বে থাকা সব ধরনের লোককেই এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আমার লোকজন আজ রাতের জন্য লুভরের নিরাপত্তার ভার নিয়ে নিয়েছে।

 

ল্যাংডন মাথা নেড়ে ফশের সাথে তাল মিলিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চললো।

 

জ্যাক সনিয়েকে আপনি কি রকম চেনেন? ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করলো।

 

সত্যি বলতে কী একদমই না। আমরা কখনও দেখা করিনি।

 

ফশেকে দেখে মনে হলো খুব অবাক হয়েছে। আপনাদের প্রথম সাক্ষাতটি সম্ভবত আজরাতে হবার কথা ছিলো?

 

হ্যাঁ। আমরা ঠিক করেছিলাম আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে আমার বক্তৃতা শেষ হবার পরপরই সেখানে মিলিত হবো। কিন্তু উনি আসেন নি।

 

ফশে একটা নোটবইয়ে কিছু টুকে নিলো। তারা এগোতেই ল্যাংডনের চোখ পড়লো লুভরের লেজার হিসেবে পরিচিত পিরামিডের দিকে—লা পিরামিদ ইনভার্সি—একটা বিশাল উল্টো পিরামিড আকৃতির স্কাইলাইট, যা সিলিং থেকে ঝুলে আছে। প্রবেশ পথের টানেল দিয়ে যাবার জন্য ফশে ল্যাংডনকে ছোট্ট একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে গেলো। সেই টানেলের প্রবেশ মুখের উপরে সাইনবোর্ডে লেখা আছে: ডেনন।

 

ডেনন উইং হলো লুভরের প্রধান তিনটি সেশনে মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত।

 

আজকের সাক্ষাতের জন্য কে অনুরোধ করেছিলো? ফশে আচমকা জিজ্ঞেস করলো। আপনি, নাকি উনি?

 

প্রশ্নটিকে একটু অদ্ভুত মনে হলো। মি. সনিয়ে, ল্যাংডন টানেলে ঢুকতে ঢুকতে কথাটা বললো। উনার সেক্রেটারি ই-মেইলের মাধ্যমে আমার সাথে কয়েক সপ্তাহ আগে যোগাযোগ করেছিলেন। সে-ই আমাকে বলেছিলো যে কিউরেটর জানতে পেরেছেন আমি এ মাসে প্যারিসে একটা বক্তৃতা দেবো আর তখন তিনি আমার সাথে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।

 

কিসের আলোচনা?

 

আমি জানি না। মনে হয় চিত্রকলা সম্পকে। আমাদের আগ্রহ একই ধরনের বিষয়ে।

 

ফশেকে দেখে মনে হলো সন্দেহপ্রবণ। সাক্ষাতের বিষয় সম্পর্কে আপনার কোন ধারণাই নেই?

 

ল্যাংডনের কোন ধারণাই ছিলো না। সেই সময়ে সে খুব বেশি কৌতূহলী ছিলো এবং নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে আলোচনা হবে সেটা জিজ্ঞেস করাটা তার কাছে সংগত মনে হয়নি। শ্রদ্ধেয় জ্যাক সনিয়ে নিজের একান্ত বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য সুপরিচিত ছিলেন এবং খুব কম সাক্ষাতই অনুমোদন করতেন তাই ল্যাংডন তার সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞই ছিলো।

 

মি. ল্যাংডন, আপনি কি অনুমান করতে পারেন, আমাদের খুন হওয়া ব্যক্তিটি আসলে কী বিষয় নিয়ে আপনার সাথে আজরাতে দেখা করতে চেয়েছিলেন? এটা জানা খুবই দরকারী।

 

প্রশ্নটির ইঙ্গিত ল্যাংডনকে অস্বস্তিতে ফেলে দিলো।

 

আমি আসলেই অনুমান করতে পারছি না। আমি জিজ্ঞেস করিনি। উনার সাথে যোগাযোগ হবে এই ভেবে আমি খুব সম্মানিত বোধ করেছিলাম। আমি মি. সনিয়ের কাজকে খুব শ্রদ্ধা করি। তার ভক্ত ছিলাম। উনার লিখিত বইপত্র প্রায়শই শ্রেণী কক্ষে ব্যবহার করতাম।

 

ফশে তার নোট বইয়ে এইসব টুকে নিলো।

 

দুজন লোক তখন ডেনন উইংসর প্রবেশ পথের টানেলের অর্ধেক পথে এসে পড়েছে। ল্যাংডন দেখতে পেলো পথের শেষ মাথায় এক জোড়া এসকেলেটর। দুটোই। থেমে আছে। ততা, আপনারা একই বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন? ফশে জিজ্ঞেস করলো।

 

হ্যাঁ। সত্যি বলতে কী, গতবছরের বেশিরভাগ সময়ই আমি এমন একটি বিষয়ে বই লিখতে ব্যস্ত ছিলাম যে বিষয়ে মি. সনিয়ের বেশ দক্ষতা ছিলো। আমি উনার মাথা থেকে আরো কিছু জিনিস নিতে চাচ্ছিলাম।

 

কথাটা বোধ হয় ফশে ঠিক বুঝতে পারলো না।

 

আমি উনার চিন্তাভাবনা সমূহ সম্পর্কে জানতে চাইছিলাম আর কী।

 

আচ্ছা। বিষয়টা কি ছিলো?

 

ল্যাংডন দ্বিধান্বিত হলো, কীভাবে বলবে ঠিক বুঝতে পারছিলো না। লেখার বিষয় বস্তু ছিলো দেবীদের আইকনোগ্রাফি সম্পর্কিত-পবিত্র নারী, পূজা এবং তার সাথে চিত্রকলা আর প্রতীকের সংযোগ।

 

ফশে তার চুলে আলতো করে আঙ্গুল চালালো। সনিয়ের এ ব্যাপারে খুব জানালোনা ছিলো?

 

তাঁর চেয়ে বেশি কেউ জানতো না।

 

বুঝেছি।

 

ল্যাংডন বুঝতে পারলো ফশে আসলে কিছুই বোঝেনি। জ্যাক সনিয়েকে দেবী আইকনোগ্রাফির ব্যাপারে এ বিশ্বে একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শুধুমাত্র পূরাকীর্তি সংক্রান্ত দেবী পূজা, স্ত্রী পূজা, উইকা এবং পবিত্র নারী সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণেই নয়, বরং লুভরে বিশ বছর ধরে কিউরেটর হিসেবে থাকাকালীন সময়ে সনিয়ে লুভরে সারা পৃথিবীর দেবীদের চিত্রকলার এক বিশাল সংগ্রহ তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন লাবরিজ এর কুড়াল থেকে প্রাচীন গৃকের ডেলফির মন্দিরের নারী যাজকদের চিত্রকলা, স্বর্ণ কাচি ওয়ান্ডস, শত শত ইয়েত আখ, প্রাচীন মিশরে শয়তানের ক্ষমতা রহিতকরণের জন্য ব্যবহার করা এক ধরনের গোখরা সাপ এবং আইসিস দেবীর সেবায় রত হোরাসের বিস্ময়কর ভাস্কর্য।

 

সম্ভবত জ্যাক সনিয়ে আপনার পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে জানতো?  ফশে বললো, তিনি আপনার বইয়ের জন্য তাঁর সাহায্যের ব্যাপরে সাক্ষাতের প্রস্তাব করেছিলেন।

 

ল্যাংডন মাথা নেড়ে সায় দিলো। আসলে, এখন পর্যন্ত আমার পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। সেটা এখনও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। আমি ওটা আমার সম্পাদক ছাড়া আর কাউকে দেখাইনি।

 

ফশে চুপ মেরে গেলো।

 

ল্যাংডন পাণ্ডুলিপিটা কেন অন্য কাউকে দেখায়নি সেটা অবশ্য বললো না। তিনশ পৃষ্ঠার খসড়া আকর্ষনীয় শিরোনাম সিম্বলস অব দি লস্ট স্যাকরেড ফেমিনিন–সমকালীন প্রতিষ্ঠিত ধর্মমতগুলোর আইকনোগ্রাফি সম্পর্কে কিছু নতুন ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে যা নিশ্চিত ভাবেই বির্তকিত হবে।

 

এখন, থেমে থাকা এসকেলেটরের কাছে এগোতেই ল্যাংডনের মনে হলো ফশে তার পাশে নেই। লাংডন ঘুরে দেখে ফশে একটা লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

 

আমরা লিফটে যাবো, লিফটের দরজাটা খুলতেই ফশে বললো। আমি নিশ্চিত, আপনি জানেন, গ্যালারিটি পায়ে হেটে যাওয়ার জন্য একটু বেশিই হয়ে যায়।

 

যদিও ল্যাংডন জানতো যে লিফটে মাত্র দুতলা গেলেই ডেনন উইংস। সে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো।

 

কিছু হয়েছে কি? ফশে দরজায় হাত দিয়ে অধৈর্যের সাথে বললো।

 

ল্যাংডন ক্লান্ত ভঙ্গীতে থেমে থাকা এসকেলেটরের দিকে তাকালো। কিছুই হয়নি, সে নিজের সাথে মিথ্যে বললো। লিফটের দিকে পেছন ফিরে রইলো সে। ছেলেবেলায় ল্যাংডন একটা পরিত্যাক্ত কুয়ায় পড়ে গিয়ে পানিতে ডুবে মরতে বসেছিলো—সেখানে একঘণ্টা আটকে ছিলো। তারপর মরে যাওয়ার আগেই তাকে উদ্ধার করা হয়েছিলো। এরপর থেকেই বদ্ধ কোন জায়গায় ঢুকলেই তার প্রচণ্ড ভয় করে—লিফট, ভূগর্ভস্থ পথ, স্কোয়াশ কোর্ট সসব জায়গায়। লিফট খুবই নিরাপদ একটা জায়গা, ল্যাংডন ক্রমাগত নিজেকে বলে চললো। অবশ্য এ কথা সে কখনও বিশ্বাস করে না। এটা একটা ছোট্ট লোহার বাক্স, বদ্ধ একটা জায়গায় ঝুলে আছে! বুকভরে নিঃশ্বাস নিয়ে সে লিফটের ভেতরে প্রবেশ করলো। অতি পরিচিত শিড়দাঁড়া বেয়ে শীতল একটা অনুভূতি টের পেলো সে।

 

দুই তলা। দশ সেকেন্ড মাত্র।

 

আপনি এবং মি. সনিয়ে, লিফটা চলতে শুরু করলে ফশে বলতে শুরু করলো, কখনও কথা বলেন নি? ই-মেইল আদান প্রদান করেননি?

 

আরেকটা অদ্ভুত প্রশ্ন। ল্যাংডন মাথা নাড়লো। না, কখনও না।

 

ফশে মাথাটা দোলাতে লাগলো যেনো এই কথাটা সে মনে মনে টুকে নিচ্ছে কিন্তু কিছুই বললো না, ঠিক সামনের ক্রোম দরজাটার দিকে চেয়ে রইলো। লিফটা চলতে শুরু করলে ল্যাংডন অন্য কিছুর দিকে না তাকিয়ে চার দেয়ালের দিকে মনোযোগ দেবার চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। লিফটের চঞ্চকে দরজার দিকে চেয়ে দেখলো সেখানে ক্যাপ্টেনের টাই বাঁধা দৃশ্যটা প্রতিফলিত হচ্ছে—একটা সিলভার ক্রুশ, সেই তেরোটি কালো অকীক মণির কারুকাজ খচিত। ল্যাংডনের কাছে এটা খুবই বিস্ময়কর বলে মনে হলো। সে অবাকই হলো বলা যায়। প্রতীকটি কুক্স জেমাতা হিসেবেই পরিচিত একটা ক্রুশ যাতে রয়েছে তেরোটি জেম বা পাথর বসানো—একটি বৃস্টিয় আদর্শ প্রতীক, যিশু এবং তার বারোজন শিষ্য। যাহোক, ল্যাংডন কোনভাবেই এটা আশা করেনি যে, ফরাসি পুলিশের কোন ক্যাপ্টেন তার ধর্মকে এরকম খোলাখুলিভাবে প্রচার করবে। তারপরও বলতে হয়, এটা ফ্রান্স; খৃস্টান ধর্ম এখানে জন্ম অধিকার হিসেবে খুব একটা স্বীকৃত নয়।

 

এটা ক্রুক্স জেমমাতা, ফশে আচমকা কথাটা বললো। ল্যাংডন চমকে চেয়ে দেখে ফশের চোখ তার উপর। লিফটা থেমে গেলে দরজাটা খুলে গেলো।

 

ল্যাংডন খুব দ্রুতই ভেতর থেকে বের হয়ে এলো, খোলামেলা বিশাল কোন স্থানের জন্য উদগ্রীব ছিলো সে। লুভরের বিখ্যাত গ্যালারির উঁচু সিলিংয়ের নিচে এসে হাফ ছেড়ে বাচলো। যে জায়গায় সে এসে পড়লো, সেটা আর যাই হোক তার কাছে প্রত্যাশিত ছিলো না।

 

বিস্মিত ল্যাংডন থেমে দাঁড়ালো।

 

ফশে তার দিকে তাকিয়ে বললো, মনে হয় মি. ল্যাংডন, আপনি কখনও বন্ধ হয়ে যাবার পর লুভর দেখেননি।

 

মনে হয় না দেখেছি? ল্যাংডন ভাবলো, অন্যমনস্কতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করলো।

 

যে লুভর সবসময় আলো ঝলমলে চোখ ধাঁধানো অবস্থায় থাকে সেই জায়গাটা আজরাতে কেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। উপর থেকে সাদা ফ্লাড লাইট জ্বলা সত্ত্বেও একটা ছোট লালবাতির আভাই বেশি চোখে পড়ছে—লাল আলোর ছটা টাইলসের ফ্লোরে পড়াতে জায়াগাটাকে রহস্যময় মনে হচ্ছে।

 

ল্যাংডন অন্ধকারাচ্ছন্ন করিডোরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো এই দৃশ্যটা প্রত্যাশা করাই উচিত ছিলো তার। বলতে গেলে প্রায় সব প্রধান প্রধান গ্যালারিতেই রাতের বেলায় লাল বাতি জ্বলিয়ে রাখা হয় বিশেষ বিশেষ জায়গায় এমন ভাবে এগুলো রাখা হয় যাতে এইসব নরম আর হালকা আলোতে কর্মচারীরা চলাফেরা করতে পারে। চিত্রকর্মগুলো তার চেয়েও বেশি অন্ধকারে রাখা হয়, কড়া আলোয় ছবিগুলোর ক্ষয় দ্রুত হয় সেজন্যে। আজরাতে মিউজিয়ামটি খুব বেশি অস্বস্তিকর বলে মনে হচ্ছে। সব জায়গায় দীর্ঘ ছায়া ছড়িয়ে আছে আর উঁচু উঁচু ছাদগুলো অন্ধকারে খুব বেশি নিচু লাগছে।

 

এদিক দিয়ে আসুন, ফাশ বললো, ডানদিকে ঘুরে একাধিক গ্যালারির সংযোগস্থলের দিকে ইঙ্গিত করলো সে। ল্যাংডন তাকে অনুসরণ করলো, অন্ধকারে আস্তে আস্তে তার চোখ মানিয়ে নিতে শুরু করেছে। তার মনে হলো চারদিকের তৈলচিত্রগুলে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, অনেকটা ছবি তৈরির ডার্ক রুমে যেভাবে ছবিগুলো আস্তে আস্তে ফুটে ওঠে…সে সব চিত্রকর্মগুলো যেনো তাদেরকে চেয়ে চেয়ে দেখছে। সে জাদুঘরের চিরচেনা বাতাসের গন্ধটা টের পেলো সে—একটা শুষ্ক, হাল্কা কার্বনের গন্ধ-শিল্প-কারখানার মতো কোলফিল্টারটা সারাদিনের আগত দর্শনার্থীদের ত্যাগ করা কার্বন-ডাই-ওক্সইডকে শুষে নিচ্ছে।

 

দেয়ালের খুব উঁচুতে, নিরাপত্তা ক্যামেরাগুলো দৃষ্টির গোচরে এলো। সেগুলো যেনো দর্শনার্থীদের কাছে একটা পরিষ্কার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে : আমরা তোমাদের দেখছি। কোন কিছু স্পর্শ কোরো না।

 

সবগুলোই কি আসল? ক্যামেরাগুলোর দিকে তাকিয়ে ল্যাংডন জিজ্ঞেস করলো।

 

ফশে মাথা নাড়লো। অবশ্যই না।

 

ল্যাংডন একটুও অবাক হলো না। এ রকম একটা বিশাল জাদুঘরে ভিডিও সার্ভিলেন্স করাটা অসম্ভব ব্যয়বহুল আর অকার্যকর। কয়েক একরের গ্যালারিতে নজর দারি করতে হলে শুধুমাত্র ক্যামেরার ছবি মনিটরিং করার জন্যই লুভরের দরকার হবে শত শত টেকনিশিয়ান। বড় বড় জাদুঘরগুলো বর্তমানে কনটেইনমেন্ট সিকিউরিটি ব্যবহার করে থাকে। চোরদেরকে বাইরে রাখার কথা ভুলে যাও। তাদেরকে ভেতরেই রাখো। অবরুদ্ধ করা, মানে কনটেইনমেন্ট সিস্টেমটা জাদুঘর বন্ধ হবার সাথে সাথেই চালু করা হয়। আর এখন যদি কোন অনুপ্রবেশকারী কোন একটা শিল্পকর্ম সরিয়ে ফেলে, তবে পুরো গ্যালারিটির বের হবার পথ সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে। চোর তখন পশিল আসার আগেই জেলখানার.গারদের ভেতরে নিজেকে আবিষ্কার করবে।

 

মার্বেল পাথরের করিডোর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বরের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে আসতে লাগলো। শব্দগুলো সম্ভবত ডানদিকের নিচতলার কোন প্রকোষ্ঠ থেকে আসছে। হলওয়ের ওপর উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে আছে।

 

এটা কিউরেটরের অফিস। ক্যাপ্টেন বললো।

 

বারান্দা দিয়ে যাবার সময় ল্যাংডন হলওয়ের নিচের দিকে একটু তাকিয়ে দেখলো, সনিয়ের অভিজাত পড়ার ঘরটা উষ্ণ কাঠের তৈরি, পুরনো তৈলচিত্র আর বড়সড় একটা পুরনো আমলের ডেস্ক, যার ওপর দুই ফুট লম্বা বর্ম পরিহিত একটা নাইটের মূর্তি রাখা। ঘরটার ভেতরে কয়েকজন পুলিশ অফিসার, ফোনে কথা বলছে, নোট নিচ্ছে। তাদের একজন সনিয়ের ডেস্কে বসে ল্যাপটপে টাইপ করছে। প্রকারন্তরে কিউরেটরের ব্যক্তিগত কক্ষটি ডিসিপিজের আজ রাতের কমান্ড-পোস্ট হয়ে উঠেছে।

 

মেঁসিয়ে, ফশে ডাক দিলে লোকটা তার দিকে ঘুরে তাকালো। নিনো দোরাঁগেজ পাস সু আঁক প্রিতেক্স। এঁতেদু?

 

অফিসের সবাই কথাটা বুঝতে পেরে মাথা নাড়লো।

 

ল্যাংডন নো পাস দোরাঁগেজ চিহ্নসম্বলিত কার্ড হোটেলের ঘরের বাইরে ঝুলিয়ে রাখে, সে ক্যাপ্টেনের কথার সারমর্মটা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারলো। ফশে আর ল্যাংডনকে কোন কারণে যেনো বিরক্ত করা না হয়।

 

পুলিশের দলটাকে পেছনে রেখে ফশে ল্যাংডনকে নিয়ে আরো বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন হলওয়ের দিকে এগিয়ে গেলো। লুভরের সবচাইতে জনপ্রিয় গ্যালারিটা আর মাত্র ত্রিশ ফুট দূরে–লা গ্রঁ গ্যালারি—প্রায় এক অন্তহীন দীর্ঘ করিডোর, যেখানে রয়েছে লুভরের সবচাইতে মূল্যবান ইতালিয় মাস্টারপিসগুলো। ল্যাংডন এতোক্ষণে বুঝে গিয়েছে, সনিয়ের মৃত দেহটা এখানেই পড়ে আছে; গ্র্যান্ড গ্যালারির বিখ্যাত কাঠের নক্সা করা জমিনটা পোলারয়েড ক্যামেরায় অভ্রান্তভাবেই ফুটে উঠেছিলো।

 

তারা এগোতেই ল্যাংডন দেখতে পেলো প্রবেশ পথটি বড় একটা লোহার গেট দিয়ে আঁটকানো আছে ; যেনো মধ্যযুগের রাজপ্রাসাদগুলো মারাউদিং সৈন্যদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য এসব ব্যবহার করছে।

 

কনটেইনমেন্ট সিকিউরিটি, গেটের সামনে পৌঁছাতেই ফশে বললো।

 

এমনকি অন্ধকারেও ঐ গেটটা দেখে মনে হলো সেটা একটা ট্যাংককেও আটকে দিতে পারবে। বাইরে থেকেই ল্যাংডন লোহার গৃলের ভেতর দিয়ে স্বল্প আলোর গ্র্যান্ড গ্যালারিটা দেখতে পেলো।

 

আপনার সামনেই, মি. ল্যাংডন, ফশে বললো।

 

ল্যাংডন ফিরে দেখলো। আমার সামনে, কোথায়?

 

ফশে স্থির হয়ে গৃলের নিচে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলো। ল্যাংডনও নিচে তাকালো। অন্ধকারে সে খেয়াল করেনি। গৃলটা দুফুটের মতো উপরে উঠানো। তাতে করে নিচে কি আছে সেটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

 

এই জায়গাটা এখনও লুভরের নিরাপত্তার বাইরে রয়েছে, ফশে বললো। আমার পুলিশ তেকনিক এ সাইস্তিফিক-এর দলটি একটু আগেই তাদের তদন্ত শেষ করেছে। সে গৃলের দিকে এগিয়ে গেলো। প্লিজ, নিচ দিয়ে আসুন।

 

ল্যাংডন সেই সরু জায়গাটার দিকে তাকিয়ে বিশাল লোহার গৃলটার উপরের দিকে তাকালো। ঠাট্টা করছে, তাই না? লোহার গৃলের ব্যারিকেডটা দেখে মনে হচ্ছে একটা গিলোটিন, অনুপ্রকেশকারীর গলা কাটার জন্য অপেক্ষা করছে।

 

ফশে ফরাসিতে বিড়বিড় করে কিছু বলে ঘড়ির দিকে তাকালো, তারপর হাটু গেঁড়ে গৃলের নিচ দিয়ে গড়িয়ে ভেতরে চলে গেলো। অন্যপ্রান্তে গিয়ে গৃলের ভেতর দিয়ে ল্যাংডনের দিকে তাকালো সে।

 

ল্যাংডন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। হাতের তালু পালিশ করা কাঠের জমিনে রেখে শুইয়ে পড়ে নিচ দিয়ে গড়িয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। নিচ দিয়ে যাবার সময় তাঁর হ্যারিস টুইড টাইটা আঁটকে গেলে ল্যাংডনের মাথাটা একটু পেছনের দিকে টান লাগলো। মাথাটা টুক করে লোহার গৃলের সাথে লাগলে ব্যথা পেলো সে।

 

খুবই ভালো, রবার্ট, সে ভাবলো। একটু হোচট খেয়ে শেষ পর্যন্ত উঠে দাঁড়ালো। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই ল্যাংডনের এই আশংকা হতে শুরু করলো যে, আজকের রাতটা খুব দীর্ঘ হবে।

 

 

 

০৫.

 

মুরে হিল–ওপাস দাইর নতুন বিশ্ব সদর দফতর এবং কনফারেন্স সেন্টার নিউইয়র্ক শহরের ২৪৩ লেক্সিংটন এভিনুতে অবস্থিত। ৪৭ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি টাকা ব্যয়ে নির্মিত, ১৩৩০০০ বর্গফুটের টাওয়ারটা লাল ইট আর ইন্ডিয়ানা লাইমস্টোন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। মে এন্ড পিংসার নক্সায় করা এই দালানটাতে রয়েছে একশরও বেশি শোবার ঘর, ছয়টা ডাইনিং-রুম, লাইব্রেরি, বৈঠকখানা, মিটিং-রুম এবং অফিস ঘর। তৃতীয় অষ্টম এবং ঘোড়শ তলাগুলো গীর্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেগুলো মিলওয়ার্ক এবং মার্বেল দিয়ে সাজানো। সতেরো তলাটি পুরোপুরি আবাসিক কাজে ব্যবহার করা হয়। পুরুষেরা এই ভবনে লেক্সিংটন এভিনুর দিকের প্রধান দরজাটা দিয়ে প্রবেশ করে আর মহিলারা প্রবেশ করে পাশের রাস্তা বরাবর একটা আলাদা দরজা দিয়ে। তাদেরকে এই ভবনে শাব্দিক এবং দৃশ্যগত। উভয় দিক থেকে সবসময়ই পৃথক করে রাখা হয়।

 

আজকের রাতের প্রথম দিকে, নিজের এপার্টমেন্টের পবিত্র আবহাওয়ার মধ্যে বিশপ ম্যানুয়েল আরিজারোসা ছোট্ট একটা ট্রাভেলব্যাগ গোছগাছ করে ঐতিহ্যবাহী কালো পোশাক পরে তৈরি হয়ে গেলেন। সাধারণত তিনি কোমরে বেগুনি রঙের একটা সিনচুয়ার জড়িয়ে নেন, কিন্তু আজ রাতে তিনি জনসাধারনের মধ্যে যাতায়াত করবেন। তাই ঠিক করলেন কারোর মনোযোগ যাতে আকর্ষিত না হয় যে, তিনি একজন বিশপ। শুধুমাত্র অভিজ্ঞ চোখই তার হাতের ১৪ ক্যারেটের সোনার আংটিটা দেখে তাঁকে চিনতে পারবে। যাতে রয়েছে পার্পল অ্যামেথিস্ট, বড় একটা হীরা এবং হ্যান্ডটুল মিরে ক্রোজিয়ের এপলিক পাথর। ট্রাভেল ব্যাগটা কাঁধে ফেলে তিনি নিরবে একটা প্রার্থনা। সেরে নিয়ে নিজের এপার্টমেন্ট ত্যাগ করলেন। লবিতে তার ড্রাইভার তাকে বিমান। বন্দরে নিয়ে যাবার জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে।

 

এখন, রোমের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়া একটা বাণিজ্যিক বিমানে বসে আরিঙ্গারোসা জানালা দিয়ে ঘন কালো আটলান্টিকের দিকে তাকালেন। সূর্য ইতিমধ্যে উদয় হয়েছে, কিন্তু অরিঙ্গাবোসা জানতেন তাঁর নিজের আকাশের তারা উঠে গেছে। আজ রাতে যুদ্ধ জয় হবে, ভাবলেন তিনি, বিস্ময়কর ব্যাপার যে, মাত্র এক মাস আগেও তার সাম্রাজ্য ধ্বংস হবার হুমকিটার বিরুদ্ধে তিনি খুব অসহায়বোধ করছিলেন।

 

ওপাস দাইর প্রেসিডেন্ট-জেনারেল হিসেবে বিশপ আরিঙ্গাবোসা বিগত দশ বছর ধরে নিজের জীবন ব্যয় করেছেন ওপাস দাইর মাধ্যমে ঈশ্বরের কর্মীর বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। সংস্থাটি ১৯২৮ সালে স্পেনিয় যাজক হোসে মারিয়া এসক্রিভা গঠন করেছিলেন। রক্ষণশীল ক্যাথলিক মূল্যবোধে ফিরে যাওয়া আর সেটার পৃষ্ঠাপোষকতা করা এবং এর সদস্যদেরকে ঈশ্বরের কর্ম সম্পাদন করার জন্য আত্মত্যাগে উৎসাহ দেবার জন্য কাজ করে সংগঠনটি।

 

ওপাস দাইর ঐতিহ্যবাহী দর্শনটি ফ্রাংকোর শাসনামলেরও আগে স্পেনে এর শিকড় প্রােথিত ছিলো। কিন্তু ১৯৩৪ সালে হোসে মারিয়া এসক্রিভার আধ্যাত্মিক বই দ্য ওয়ে প্রকাশ হবার পর থেকে এসক্রিভার বার্তা বিশ্বব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে দ্য ওয়ের চল্লিশ লক্ষেরও বেশি কপি বিয়াল্লিশটি ভাষায় অনূদিত আছে। ওপাস দাই বিশ্বব্যাপী একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর আবাসিক হল, শিক্ষাকেন্দ্র এবং এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ পৃথিবীর প্রায় সব বড় বড় শহরগুলোতেই পাওয়া যাবে। ওপাস দাই সারা বিশ্বের ক্যাথলিক সংস্থাসমূহের মধ্যে সবচাইতে দ্রুত বর্ধনশীল এবং আর্থিকভাবে সুসংহত সংগঠন। দূভার্গ্যবশত, আরিঙ্গাবোসা বুঝতে শিখেছিলেন যে, ধর্মীয় সিনিসিজমের এই যুগে, ওপাস দাইর ক্রমবর্ধমান সম্পদ এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি সম্পর্কে সন্দেহকে চুম্বকের মতোই টানবে।

 

অনেকেই ওপাস দাইকে মস্তিষ্ক ধোলাইয়ের কারখানা বলে থাকে, সাংবাদিকরা প্রায়শই এমন চ্যালেঞ্জ করে থাকে। অনেকেই আপনাদেরকে অতিরক্ষণশীল একটি বৃস্টিয় গুপ্ত সমাজ বলে অভিহিত করে থাকে। আপনারা আসলে কোনটা?

 

ওপাস দাই এসব কোনটাই না, বিশপ খুব ধৈর্যসহকারে জবাব দিতেন, এটি একটি ক্যাথলিক চার্চ। আমরা এমন একটি ক্যাথলিক সংগঠন যারা সত্যিকারের ক্যাথলিক বিশ্বাস নিজেদের দৈনন্দিন জীবনাচরণে পালন করা জন্য অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি।

 

ঈশ্বরের কর্ম করার জন্য কি কুমার থাকার বা কৌমার্য ব্রত পালন করার সত্যি কোন দরকার আছে, নিজের শরীরকে কষ্ট দেয়া এবং সিলিসের মাধ্যমে তীব্র যন্ত্রণা পাওয়ার কি সংগত কোন কারণ আছে?

 

আপনারা শুধুমাত্র ওপাস দাইর ক্ষুদ্র একটি অংশের বর্ণনা দিলেন, অরিঙ্গাবোসা বলেছিলেন। আমাদের এখানে অনেক ধরনের অংশগ্রহণ রয়েছে। হাজার হাজার ওপাস দাইর সদস্য বিবাহিত, তাদের পরিবার আছে এবং তারা নিজেদের সমাজে ঈশ্বরের কর্ম সম্পাদন করে থাকে। অন্যেরা আমাদের আবাসিক স্থানগুলোতে অধ্যাত্মবাদের জীবন বেছে নিয়েছে। এসব তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ। কিন্তু ওপাস দাইর সবাই একই উদ্দেশ্য পোষণ করে থাকে, ঈশ্বরের কর্মীর মাধ্যমে বিশ্বের আরো বেশি মঙ্গল সাধন করা। নিশ্চিতভাবেই এটি একটি প্রসংশনীয় প্রচেষ্টা।

 

প্রচার মাধ্যম সবসময়ই কেলেংকারীর উপরই বেশি গুরুত্ব দেয়। আর ওপাস দাইরও অন্যসব বৃহৎ সংগঠনের মতোই, নিজেদের ভেতরে কিছু বিপথগামী সদস্য রয়েছে যাদের জন্য সংগঠনের সব সদস্যই বদনামের ভাগীদার হয়।

 

দুমাস আগে, ওপাস দাইর মিডওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির একটি দল নতুন যোগ দেয়া সদস্যদেরকে দীক্ষিত করার জন্য এবং ধর্মীয় অনুভূতির আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভের আশায় মাদক সেবনরত অবস্থায় হাতেনাতে ধরা পড়ে যায়। আরেকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাঁটা তারের সিলিস বেল্টটা নিয়মানুযায়ী দিনে দুঘণ্টা ব্যবহার না করে বেশি সময় ব্যবহার করে মারাত্মক ইনফেকশনের শিকার হয়ে প্রায় মরতে বসেছিলো। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, বোস্টনের এক মোহগ্রস্ত তরুণ ব্যাংকার তার নিজের সমস্ত ধন-সম্পত্তি ওপাস দাইর নামে লিখে দিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলো।

 

বিপথগামী ভেড়া, আরিঙ্গাবোসা ভাবলেন, তাদের জন্য তাঁর হৃদয়ে কোন সহানুভূতি নেই।

 

সন্দেহাতীতভাবেই সবচাইতে বিব্রতকর ব্যাপার ছিলো বহুল আলোচিত এবং ব্যাপক প্রচারণা পাওয়া এফবিআইর গুপ্তচর রবার্ট হানসেনের মামলাটি। সে ছিলো ওপাস দাইর খুবই নাম করা একজন সদস্য। দেখা গেলো সে আসলে যৌনবিকৃত ব্যক্তি, যে নিজের শোবার ঘরে একটা ক্যামেরা লুকিয়ে রেখে দিতো যাতে তার বন্ধু বান্ধবরা তার বউয়ের সাথে যৌনকর্মের দৃশ্য দেখতে পারে। এজন আত্ম উৎসর্গীকৃত ক্যাথলিকের জন্য সময়টা সত্যিই কঠিন, বিচারক মামলা চলাকালীন সময়ে মন্তব্যটি করেছিলেন।

 

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এইসব ঘটনা নতুন একটি পর্যবেক্ষক দল, যাদের নাম দি ওপাস দাই এওয়্যারনেস নেটওয়ার্ক (ওডিএএন), গঠনে সাহায্য করলো। দলটির জনপ্রিয় ওয়েবসাইট www.odan.org-ওপাস দাইর সাবেক সদস্যদের কাহিনী সম্প্রচার করতে শুরু করে, যেনো কেউ এই বিপজ্জনক সংগঠনে যোগ না দেয়। প্রচার মাধ্যমগুলো এরপর থেকে ওপাস দাইকে ঈশ্বরের মাফিয়া এবং যিশুর পূজারী বলে অভিহিত করতে থাকে।

 

আমরা যা বুঝি না সেটাকে ভয় পাই, আরিঙ্গাবোসা ভাবলেন, তাঁর আক্ষেপ, এইসব সমালোচক যদি জানতো কতো লোককে ওপাস দাই নতুন জীবন দিয়েছে। দলটি ভ্যাটিকানের পুরোপুরি সমর্থন এবং আশীবাদপুষ্ট। ওপাস দাই স্বয়ং পোপেরই একটি মনোনীত সংস্থা।

 

সাম্প্রতিক কালে, ওপাস দাই প্রচারমাধ্যমের চেয়েও বেশি শক্তিশালী একটি শক্তির হুমকির সম্মুখীন হয়েছে …একটি আচমকা শত্রুতা যা আরিঙ্গাবোসা কোনভাবেই লুকাতে পারেন না। পাঁচমাস আগে, ক্ষমতার অকেন্দ্রটি ঝাঁকুনি খেয়েছিলো, আর আরিগারোসা এখনও সেই আঘাতটি সামলে উঠতে পারেননি।

 

তারা জানে না, তারা কোন্ যুদ্ধ শুরু করেছে, আরিজারোসা মনে মনে বললেন। বিমানের জানালা দিয়ে তিনি নিচের অন্ধকার সমুদ্রের দিকে তাকালেন। তখনই তাঁর চোব জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হওয়া নিজের মুখের দিকে আঁটকে গেলো কালচে এবং পরিশ্রান্ত, লম্বা বাঁকানো নাক আধিপত্য করছে সেখানে, তরুণ মিশনারি হিসেবে স্পেনে থাকার সময় নাকটা একটা ঘুষিতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছিলো। সেই চিহ্নটা এখনও রয়ে গেছে তাঁর শরীরে। আরিঙ্গাবোসা আত্মার বিশ্বের মানুষ, রক্তমাংসের নয়।

 

পর্তুগালের উপকূল দিয়ে জেট প্লেনটা অতিক্রম করতেই, পকেটে রাখা সেল ফোনটা কাঁপতে শুরু করলো। ফোনটার রিংটোন বন্ধ করে রাখা ছিলো। যদিও বিমান চলাকালীন সময়ে সেলফোন ব্যবহার করা নিষিদ্ধ, তারপরও আরিঙ্গাবোসা জানেন এই কলটা তিনি ছেড়ে দিতে পারেন না। এই ফোন নাম্বারটা শুধুমাত্র একজনের কাছেই আছে। সেই লোকই তাঁকে ফোন করেছে।

 

উত্তেজিত বিশপ খুব শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন। হ্যাঁ?

 

সাইলাস কি-স্টোনটার অবস্থান জানতে পেরেছে, লোকটা বললো। সেটা প্যারিসেই রয়েছে। সেন্ট সালপিচ চার্চের ভেতরে।

 

বিশপ আরিঙ্গারোসা মুচকি হাসলেন। তাহলে আমরা খুব কাছাকাছি এসে গেছি।

 

আমরা খুব দ্রুতই সেটা নিয়ে নিতে পারবো। কিন্তু আমাদের দরকার আপনার সাহায্যের।

 

অবশ্যই। বলুন আমাকে, কি করতে হবে?

 

আরিঙ্গাবোসা যখন ফোনটা বন্ধ করলেন তখন তার হৃদপিণ্ড লাফাচ্ছে। তিনি আবার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালেন। যা ঘটেছে তাতে তাঁর দারুণ এক সুখকর অনুভূতি হতে লাগলো।

 

* * *

 

পাঁচশো মাইল দূরে, সাইলাস নামের ধবল লোকটি একটা ছোট্ট পানির বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার পিঠের রক্ত পরিষ্কার করছে আর পানিতে লাল রক্তটা দেখতে কী রকম হয় সেটা পরখ করে দেখেছে। আমাকে শুদ্ধ করো, আমি শুদ্ধ হবো, সে বাইবেলের একটা প্রার্থনা সঙ্গীত আওড়ালো। আমাকে সাফ করো, আমি তুষারের চেয়েও বেশি সাদা হবো।

 

সাইলাসের এমন এক অনুভূতি হচ্ছে যা তার আগে কখনও হয়নি। এটা বিদ্যুতায়িত এবং বিস্ময়কর, দুটোই মনে হচ্ছে তার কাছে। বিগত দশ বছর ধরে, দ্য ওয়ে অনুসরণ করে আসছে। নিজেকে পাপ থেকে পরিষ্কৃত করা…নিজের জীবনকে পুণঃনির্মাণ করা…আর অতীতের সহিংসতা মুছে ফেলা। আজ রাতে এসব কিছু আবার ফিরে এসেছে তার মধ্যে। সে খুব অবাক হলো এই ভেবে যে, কতো দ্রুত তার অতীত আবার উঠে আসছে। সেটা কাজ করবার জন্য বেশ উপযোগীই হবে।

 

যিশুর বার্তা হলো শান্তির…অহিংসার…ভালবাসার। শুরুতে এইসব কথাই সাইলাস শিখেছিলো, সেসব কথা সে হৃদয়ে ধারণ করে আছে। আর এসবই যিশুর শত্রুরা ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছে। যারা ঈশ্বরকে শক্তির হুমকি দেয় তারা শক্তির মুখোমুখি হবে। অনড় এবং প্রচণ্ড দ্রুততার সাথে।

 

দুহাজার বছর ধরে, খৃস্টিয় সৈনিকরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে যারা তাদের বিশ্বাসকে ধ্বংস করতে চায়। আজরাতে, সাইলাস একটা যুদ্ধের ডাক দিয়েছে।

 

নিজের ক্ষত শুকিয়ে সে তার গোড়ালী সমান লম্বা আলখেল্লাটা পরে নিলো। সেটা এক রঙা উলের তৈরি, তার গায়ের এবং চুলের রঙের সাথে মিলিয়ে শাদা রঙের। কোমরে দড়িটা শক্ত করে বেঁধে নিয়ে সে তার মাথাটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলো। চাকাটা ঘুরছে।

 

 

 

০৬.

 

নিরাপত্তা দরজার নিচে চাপা খেয়ে ল্যাংডন এ্যান্ড গ্যালারির ভেতরে উঠে দাঁড়ালো। একটা গভীর গিরিখাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। গ্যালারির দুদিকের দেয়ালই ত্রিশ ফিট উচ্চতা সম্পন্ন, অন্ধকারের মধ্যেও সেটা বোঝা যায়। লাল আলোর সার্ভিস লাইটগুলো দেয়ালের ওপরের দিকে লাগানো, সেগুলোর অতিপ্রাকৃত আলোতে দা ভিঞ্চি, তিতিয়ান এবং কারাজ্জিওর দূর্লভ সংগ্রহগুলো উদ্ভাসিত হয়ে আছে। ছবিগুলো ছাদের সাথে তার লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। স্টিল লাইফ, ধর্মীয় দৃশ্য। এবং ল্যান্ডস্কেপের সাথে সঙ্গী হয়েছে খ্যাতনামা ব্যক্তি আর রাজনীতিবিদদের ছবি। যদিও গ্র্যান্ড গ্যালারি হলো লুভরের সবচাইতে বিখ্যাত ইতালিয় শিল্পকলার কক্ষ, তবে অনেক দর্শনার্থী মনে করে এখানকার সবচাইতে চিত্তাকর্ষক জিনিসটা হলো কাঠের নক্সা করা ফ্লোরটা। ওক গাছের বাকলের উপর অসাধারণ জ্যামিতিক নক্সার ফ্লোরটা এক ধরণের ক্ষণস্থায়ী দৃষ্টি বিভ্রম সৃষ্টি করে দর্শনার্থীদের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি করে। যাতে তাদের মনে হয় তারা গ্যালারির ওপরে ভাসছে আর প্রতিটি পদক্ষেপে দৃশ্যসমূহ বদলে যাচ্ছে।

 

জমিনের ওপর তাকাতেই ল্যাংডনের চোখ একটা অপ্রত্যাশিত জিনিসের দিকে আঁটকে গেলো। জিনিসটা কয়েক গজ দূরে মাটিতে পড়ে আছে, সেটার চারদিক পুলিশের ফিতা দিয়ে ঘেরাও করা। সে ফশের দিকে তাকালো। এটা কি… কারাজ্জিওর ছবি মাটিতে পড়ে আছে?

 

ফশে তার দিকে না তাকিয়েই মাথা নেড়ে সায় দিলো। চিত্রকর্মটি, ল্যাংডন অনুমান করলো, দুই মিলিয়ন ডলারেরও বেশি দামের, আর সেটা কিনা একটা দোমড়ানো মোচরানো পোস্টারের মতো মাটিতে পড়ে আছে। এটা এভাবে মাটির ওপর পড়ে আছে!

 

ফশে একটুও না নড়েচড়ে তার দিকে চোখ বড়বড় করে তাকালো। এটা অপরাধ সংঘঠিত স্থান, মি. ল্যাংডন। আমরা এখানকার কোন কিছুই স্পর্শ করিনি। ছবিটা কিউরেটর নিজেই দেয়াল থেকে টেনে ফেলেছেন। এভাবেই নিরাপত্তা। সিস্টেমটাকে সচল করেছেন তিনি।

 

ল্যাংডন গেটের দিকে তাকালো, কী ঘটেছিলো তার একটা ছবি মনে মনে আঁকার চেষ্টা করলো।

 

কিউরেটর তার অফিসেই আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। সেখান থেকে গ্র্যান্ড গ্যালারির দিকে দৌড়ে এসেছেন। আর সিকিউরিটি সিস্টেমটা সচল করেছেন দেয়াল থেকে এই ছবিটা টেনে ফেলে দিয়ে। সাথে সাথে লোহার গেটটা পড়ে সবগুলো প্রবেশ পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এই গ্যালারিতে ঢোকা এবং বের হবার জন্য এটাই একমাত্র প্রবেশ পথ।

 

ল্যাংডনকে খুব দ্বিধান্বিত দেখালো। তবে তো, কিউরেটর তাঁর আক্রমণকারীকে গ্র্যান্ড গ্যালারির ভেতরে আঁটকে ফেলতে পেরেছিলেন?

 

ফশে মাথা নাড়লো, সিকিউরিটি গেটটা সনিয়ে এবং তার আক্রমণকারীকে পৃথক করে রেখেছিলো। খুনি গেটের বাইরে থেকে গৃলের ভেতর দিয়ে গুলি করেছে। যে লোহার গেটের নিচ দিয়ে তারা এইমাত্র এখানে এসেছে ফশে তার একটি শিকে কমলা রঙের ট্যাগের দিকে নির্দেশ করলো। পিটিএস দলটি বন্দুকের গুলি লাগার জায়গাটি খুঁজে পেয়েছে। খুনি গলের ভেতর দিয়েই গুলি করেছে। জ্যাক সনিয়ে এখানে একা একাই মৃত্যু বরণ করেছেন।

 

ল্যাংডন সনিয়ের শরীরের ছবিটা কল্পনা করলো। তারা বলছে, তিনি নিজেই এরকম করেছেন। ল্যাংডন তাদের সামনের বিশাল করিডোরটার দিকে তাকালো। তো উনার মৃত দেহটা কোথায়?

 

ফশে তার টাইপিনটা একটু ঠিক করে নিয়ে হাটতে শুরু করলো। সম্ভবত আপনি জানেন, গ্র্যান্ড গ্যালারিটা অনেক দীর্ঘ।

 

ল্যাংডন খুব ভালো করেই এটার একদম সত্যিকারের দৈর্ঘের কথাটা মনে করতে পারলো, সেটা প্রায় পনেরো শ ফুট দীর্ঘ, তিন তিনটা ওয়াশিংটন মনুমেন্টের দৈর্যের সমান। করিডোরটির প্রশস্ততাও অবিশ্বাস্য রকমের, সেখানে খুব সহজেই পাশাপাশি দুটো প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলাচল করতে পারবে।

 

ফশে চুপ মেরে গেলো, হনহন করে করিডোরের বাম দিক দিয়ে ছুটে চললো। তার দৃষ্টি একেবারে সোজা সামনের দিকে। বিখ্যাত বিখ্যাত সব মাস্টার পিসগুলোর সামনে দিয়ে যাবার সময় কোন ধরনের বিরতি না দিয়ে, সেগুলোর দিকে না তাকিয়ে এভাবে হেটে যাওয়ায় ল্যাংডনের কাছে মনে হলো ছবিগুলোকে অসম্মান করা হচ্ছে।

 

এরকম আলোতে কিছুই দেখতে পারবো না, সে ভাবলো।

 

এরকম স্বল্প আলো দুভার্গ্যজনকভাবেই তাকে স্বল্প আলোর ভ্যাটিকানের গোপন আকাইভে ঘটনাটার কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। সেটা আজকের রাতের মতোই রোমে তার প্রায় মরতে বসার ঘটনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আবার ভিত্তোরিয়ার কথা মনের পর্দায় ভেসে এলো। গত এক মাস ধরে মেয়েটা তার স্বপ্নে অনুপস্থিত ছিলো। ল্যাংডন একদমই বিশ্বাস করতে পারছিলো না যে, রোমের ঘটনাটি এক বছর আগের ; তার মনে হচ্ছে কয়েক যুগ আগে সেটা ঘটেছে। অন্য আরেকটি জীবনে। ভিত্তোরিয়ার সাথে তার শেষ যোগাযোগ হয়েছিলো গত ডিসেম্বরে—একটা পোস্টকার্ডে এই কথা লেখা ছিলো যে, সে জাভা সাগরের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে তার এনটেঙ্গেলমেন্ট পদার্থ বিদ্যার গবেষণার জন্য…উপগ্রহ ব্যবহার করে মান্তা রশ্মির সন্ধান করার মতো একটা ব্যাপারে। ল্যাংডন কখনও এমন ভ্রান্ত মোহে আচ্ছন্ন ছিলো না যে, ভিত্তোরিয়ার মতো একজন মেয়ে তার সাথে কলেজ ক্যাম্পাসে থেকে সুখি হবে, কিন্তু রোমে তাদের মুখোমুখি দেখা হওয়াটা তার মনে এমনভাবে গেঁথে আছে যে, সে এমনটি কখনও কল্পনাও করতে পারেনি। তার চিরজীবন অবিবাহিত থাকার বাসনা আর সহজ সরল স্বাধীনতা যেভাবেই হোক প্রচণ্ড একটা ঝাকি খেয়েছিলো ….

 

একটা অপ্রত্যাশিত একাকীত্ব মনে হচ্ছে সেই জায়গাটা দখল করেছে আর বিগত একবছর ধরে সেটা ক্রমাগত বেড়েই চলছে।

 

তারা হনহন করে হাটতে লাগলো, এতোদূর এসেও ল্যাংডন কোন মৃতদেহ দেখতে পেলো না। জ্যাক সনিয়ে এতোদূর পর্যন্ত এসেছিলেন?

 

মি. সনিয়ে পেটে গুলি খেয়েছিলেন। তিনি খুব ধীরে ধীরে মৃত্যুবরণ করেছেন। সম্ভবত পনেরো কিংবা বিশ মিনিট পরে। নিশ্চিতভাবেই তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের মানুষ।

 

ল্যাংডন অবাক হয়ে তাকালো। নিরাপত্তারক্ষীদের এখানে আসতে পনেরো মিনিট লেগেছে?

 

অবশ্যই না। লুভরের নিরাপত্তা রক্ষীরা এলার্ম শুনেই সাথে সাথে এখানে চলে এসেছিলো, এসে দেখে গ্র্যান্ড গ্যালারির গেট বন্ধ। গৃলের ভেতর থেকে তারা করিডোরের শেষ প্রান্তের দিকে কারোর পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েছিলো, কিন্তু লোকটাকে দেখতে পায়নি। তারা চিৎকার করে ডেকেও কোন উত্তর পায়নি। ধারণা করেছিলো, সেটা অপরাধীই হবে। তাই তারা প্রটোকল অনুযায়ী জুডিশিয়াল পুলিশকে ঘটনাটা জানিয়ে দেয়। আমরা পনেরো মিনিটের মধ্যে এখানে এসে অবস্থান নিয়ে নেই। এখানে পৌঁছেই ব্যারিকেডটা একটু তুলে দিয়ে ভেতরে ডজনখানেক অস্ত্রধারী সৈনিক পাঠিয়ে দেই। তারা গ্যালারির ভেতরে অনুপ্রবেশকারীকে তন্নতন্ন করে খোঁজে।

 

তারপর?

 

ভেতরে কাউকেই পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র … হলের একটু দূরে ইঙ্গিত করলো সে। তাঁকে ছাড়া।

 

ল্যাংডন ফশের আঙ্গুলের দিকে তাকালো। প্রথমে সে ভেবেছিলো ফুশে হলওয়ের মাঝখানে রাখা বিশাল একটা পাথরের মূর্তির দিকে ইঙ্গিত করছে। আরেকটু সামনে যেতেই ল্যাংডন মূর্তিটা অতিক্রম করে দেখতে পেলো ত্রিশ গজ দূরে, একটা স্ট্যান্ডের উপর স্পট লাইটটা জ্বলছে, সেটার আলো অন্ধকার গ্যালারির জমিনে পড়ে একটা আলোর বৃত্ত তৈরি করেছে। আলোর বৃত্তের মাঝখানে, অনেকটা মাইক্রোস্কোপের নিচে থাকা পোকা-মাকড়ের মতো কিউরেটরের মৃতদেহটা কাঠের নক্সা করা জমিনের ওপর সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

 

আপনি ছবিটা দেখেছেন, ফশে বললো, তাহলে তো, খুব বেশি অবাক হবার কথা নয়।

 

মৃতদেহটার কাছে যেতেই ল্যাংডনের খুব হিমশীতল একটা অনুভূতি হলো। তার সামনে এমন অদ্ভুত ছবি ভাসছে, যা সে জীবনেও দেখেনি।

 

জ্যাক সনিয়ের বিবর্ণ মৃতদেহটা কাঠের জমিনে এমনভাবে পড়ে আছে ঠিক যেমনটি সে ছবিতে দেখেছে। ল্যাংডন তীব্র আলোর মধ্যে মৃতদেহটার সামনে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে ভাবতে লাগলো সনিয়ে তাঁর শেষ কয়েকটি মুহূর্ত নিজের শরীরটাকে কত অদ্ভুতভাবেই না সাজিয়েছেন।

 

সনিয়ে তাঁর বয়সের তুলনায় অসাধারণ সুস্থ আর সতেজ ছিলেন …তাঁর শরীরের পেশীগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তিনি তার ব্যবহার্য সব ধরনের পোশাকই খুলে সেগুলো সুন্দর করে পাশে রেখে দিয়েছেন। চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন করিডোরের মাঝখানের জমিনে। নিখুঁতভাবেই ঘরের অক্ষের সমান্তরালে দেহটা রেখেছেন। তার হাত-পা ঈগল পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে আছে, অনেকটা শিশুদের তৈরি বরফের পরীর মতো অথবা, খুব স্পষ্ট করে বললে, কোন অদৃশ্য শক্তি কর্তৃক একজন মানুষকে আঁকা হলে যেমনটি হয়, সেরকম।

 

সনিয়ের পাঁজরের হাড়ের নিচে একটা রক্তে আঁকা চিহ্ন, যেখানে বুলেটটা বিদ্ধ হয়েছিলো ঠিক সেখানেই। আঘাতটার ফলে খুবই ছোট্ট একটা ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, সেটা বিস্ময়করই বটে। শুধুমাত্র এক ফোঁটা কালচে রক্তের ছোট্ট একটা বৃত্ত।

 

সনিয়ের বাম হাতের তর্জনীটাও রক্তাক্ত। নিজের রক্তকে কলমের কালি হিসেবে ব্যবহার করে আর নিজের পেটকে ক্যানভাস বানিয়ে সনিয়ে ছোট্ট একটা প্রতীক এঁকেছেন—পাঁচটা সরল রেখা দিয়ে একটা পাঁচ কোনা তারা।

 

পেনটাকল।

 

সনিয়ের নাভির মাঝখানে রক্তাক্ত তারাটা মৃতদেহটাকে একধরনের ভৌতিক রূপ দিয়েছে। যে ছবিটা ল্যাংডন দেখেছিলো সেটাও যথেষ্ট ভীতিকর ছিলো, কিন্তু এখন,

 

স্বচক্ষে দৃশ্যটা দেখে ল্যাংডনের খুব গভীর অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি তৈরি হলো।

 

তিনি নিজেই এটা করেছেন।

 

মি. ল্যাংডন? ফশের গভীর কালো চোখ আবার তার ওপর স্থির হলো।

 

এটা একটা পেনটাকল, ল্যাংডন বললো, তার কথাটা বিশাল ফাঁকা জায়গায় প্রতিধ্বনিত হলো। পৃথিবীর সবচাইতে প্রাচীন একটা প্রতীক। যিশুর জন্মের চার হাজার বছর আগেও এটা ব্যবহার করা হোত।

 

এর মানে কি?

 

এ ধরনের প্রশ্ন করা হলে ল্যাংডন সবসময়ই দ্বিধাগ্রস্ত হয়। একটা প্রতীকের মানে কি, এটা বলা মানে, একটা সঙ্গীত কেমন অনুভবের সৃষ্টি করবে সেই কথা বলা—এটা একেকজনের কাছে একেক রকম। সাদা রঙের একটা কু ক্লাক্স ক্লান মুখোশের ছবি যুক্তরাষ্ট্রে ঘৃণা এবং বর্ণবাদের প্রতীক, আর সেই একই জিনিস স্পেনে ধর্মীয় বিশ্বাসের অর্থ বহন করে।

 

একেক জায়গায় প্রতীকের অর্থ একেক রকম হয়ে থাকে, ল্যাংডন বললো। সাধারণ অর্থে, পেনটাকল হলো একটি প্যাগান ধর্মীয় প্রতীক।

 

ফশে মাথা নাড়লো। শয়তানের পূজা।

 

না, ল্যাংডন শুধরিয়ে দিলো, পরক্ষণেই বুঝতে পারলো তার আরো পরিষ্কার করে বলা দরকার। তার শব্দ চয়ন আরো বেশি পরিষ্কার হওয়া উচিত।

 

আজকাল প্যাগান শব্দটি শয়তান পূজার সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে—একটা জনপ্রিয় ভুল ধারণা। শব্দটির মূল এসেছে ল্যাটিন শব্দ প্যাগানাস থেকে, যার অর্থ গ্রামীন অধিবাসী। আভিধানিক অর্থে প্যাগান মানে অশিক্ষিত গ্রাম্য লোকজন, যারা প্রাচীন গ্রামীন প্রকৃতি পূজার অনুসারী। আসলে, যারা ভিলেজ, মানে গ্রামে বাস করে তাদের সম্পর্কে চার্চের অনেক ভীতি ছিলো, সেই গ্রামবাসী তথা ভিলেজার শব্দটি থেকেই ভিলেইন অর্থাৎ খল-এই নেতিবাচক অর্থটি আরোপিত হয়েছে।

 

পেনটাকল, ল্যাংডন খুলে বললো, একটি প্রাক খৃস্টিয় প্রতীক যা প্রকৃতি পূজার সাথে সম্পর্কিত। প্রাচীন কালের মানুষেরা তাদের পৃথিবীকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেখতো-নারী আর পুরুষ। তাদের দেব-দেবীরা শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতো। ইন। এবং ইয়াং। যখন নারী এবং পুরুষ ভারসাম্যপূর্ণ থাকতো, পৃথিবীতে তখন সম্প্রীতি বিরাজ করতো। আর যখন তারা ভারসাম্যহীন থাকতো, তখন নৈরাজ্য নেমে আসতো। ল্যাংডন সনিয়ের পেটের দিকে ইঙ্গিত করলো।এই পেনটাকলটা নারীর প্রতিনিধিত্ব করে, যারা পৃথিবীর সব কিছুরই অর্ধেক—এটা ধর্মীয় ইতিহাসবিদদের ধারণা, পবিত্র নারী অথবা স্বর্গীয় দেবী বলে ডাকা হয়। সনিয়ে সেটা জানতেন।

 

সনিয়ে তার পেটে একটি দেবীর প্রতীক এঁকেছেন?

 

ল্যাংডনকে স্বীকার করতেই হলো, যদিও এটা খুব অদ্ভুত মনে হচ্ছে। একেবারে নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, পেনটাকল ভেনাসেরই প্রতীক-যৌনতা, ভালোবাসা আর সুন্দরের দেবী।

 

ফশে নগ্ন দেহটার দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করতে লাগলো।

 

প্রথম দিকে ধর্মগুলো ছিলো প্রকৃতির স্বর্গীয় শৃঙ্খলার উপর ভিত্তি করে। দেবী ভেনাস এবং ভেনাস গ্রহ একই জিনিস। রাতের আকাশে দেবীর একটা অবস্থান আছে আর এটা অনেক নামেই পরিচিত ভেনাস, পূর্ব-তারা, ইস্টার, আস্টার্তে সবগুলো শক্তিশালী নারীর প্রতিভূ যা মাতৃদেবী পৃথিবীর সাথে সম্পর্কিত।

 

ফশেকে আরো বেশি চিন্তিত মনে হলো এবার, যেনো সে প্রকৃতি পূজার ধারণাটিই বেশি পছন্দ করেছিলো।

 

ল্যাংডন সিদ্ধান্ত নিলো পেনটাকল সম্পর্কিত সবচাইতে বিস্ময়কর তথ্যটি সে জানাবে না—ভেনাসের চিত্রের সত্যিকারের ঘটনাটি। একজন তরুণ জ্যোর্তিবিদ্যার ছাত্র হিসেবে ল্যাংডন এই তথ্যটি জেনে অবাক হয়েছিলো যে, ভেনাস গ্রহ প্রতি আট বছরে আকাশে যে অবস্থান বদল করে সেটা একটা নিখুঁত পেনটাকলরই আকৃতিতে। এই ঘটনাটা প্রাচীন মানুষকেও এতোটা বিস্মিত করেছিলো যে, তারা ভেনাস এবং পেনটাকলকে সুন্দর, নিখুঁত এবং যৌনজ ভালবাসার প্রতীক হিসেবে পরিণত করে ফেললো। ভেনাসের এই যাদুময়তাকে সম্মান প্রদর্শন করার জন্যই গৃকরা প্রতি আট বছর পরপর অলিম্পিক খেলার প্রচলন করে। আজকাল খুব কম সংখ্যক লোকই বুঝতে পারবে যে, বর্তমানের চার বছর অন্তর অন্তর অলিম্পিকটি আসলে ভেনাসের পরিক্রমার অর্ধ চক্র। এমনকি খুব অল্পসংখক লোক জানে অলিম্পিকের অফিশিয়াল প্রতীক হয়ে ওঠা পাঁচটা বৃত্ত আসলে শেষ মুহুর্তে পাঁচটা তারাকে বদলেই করা হয়েছে-ভেনাসের পাঁচটা তারাকে বদলে পাঁচটা বৃত্ত দিয়ে আধুনিক অলিম্পিকের সত্যিকারের চেতনা ও সম্প্রীতির একটি প্রতীক তৈরি করা হয়েছে।

 

মি. ল্যাংডন, ফশে হরবর করে বললো। অবশ্যই পেনটাকল শয়তান সম্পর্কিত। আপনাদের আমেরিকান ভৌতিক চলচ্চিত্রগুলো এটা খুব স্পষ্ট করেই দেখায়।

 

ল্যাংডন ভুরু তুললো। ধন্যবাদ হলিউড, তোমাকে। পেনটাকল, মানে পাঁচ মুখের তারা বর্তমানে চলচ্চিত্রে শয়তান ও সিরিয়াল খুনির প্রতীক হয়ে উঠেছে। কোন শয়তান বা পিশাচের ঘরের দেয়ালে সাধারণত অন্যান্য পিশাচ প্রতীকের সাথে এটা আঁকা থাকে। ল্যাংডন এই প্রতীকটাকে এরকমভাবে ব্যবহার করতে দেখলে খুবই মর্মাহত হয়; পেনটাকলর সত্যিকারের উৎস কিন্তু পুরোপুরি দেবতা সম্পৰ্কীয়।

 

আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি, ল্যাংডন বললো, ছবিতে আপনি যা-ই দেখেছেন, পেনটাকলর এই রকম পিশাচ প্রতীকীকরণের ব্যাপারটা ঐতিহাসিকভাবেই ভুল। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে পেনটাকলর প্রতীকটি বিকৃত করে তুলে ধরা হচ্ছে। আর আজকের ঘটনায়, এটা একেবারে রক্তপাতের মধ্য দিয়ে করা হয়েছে।

 

আমি নিশ্চিত হতে পারছি না।

 

ল্যাংডন ফশের ক্রুশর দিকে তাকালো, মনস্থির করতে পারছিলো না কীভাবে পরের কথাটা বলবে। চার্চ করেছে, স্যার। সব প্রতীকই দ্ব্যর্থবোধক, কিন্তু পেনটাকল বৃস্টিয় যুগের সূচনাতেই রোমান ক্যাথলিক চার্চ কর্তৃক পরিবর্তিত হয়ে যায়। ভ্যাটিকানের প্যাগান ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচারণা এবং সেই ধর্মমত অনুসারীদেকে খৃস্ট ধর্মে দীক্ষা দেবার অংশ হিসেবে চার্চ প্যাগান দেব-দেবীদের বিরুদ্ধে একটি সর্বগ্রাসী অভিযান পরিচালনা করেছিলো। সেই সূত্রে তারা স্বর্গীয় প্রতীকগুলোকে শয়তানের চিহ্ন হিসেবে আখ্যায়িত করে।

 

বলে যান।

 

এরকম ঘটনা ঐ রকম অরাজক সময়ে খুবই সাধারণ একটি ব্যাপার, ল্যাংডন আবারো বলতে শুরু করলো। একটি উদীয়মান নতুন শক্তি বিদ্যমান প্রতীকগুলো আত্মসাৎ করে নেয়, সেগুলোকে হেয় প্রতিপন্ন করে যাতে ধীরে ধীরে সেসব জিনিসের সত্যিকারের অর্থ মুছে যায়, বিস্মৃত হয়ে যায়। প্যাগান প্রতীক এবং খৃস্টিয় প্রতীকের মধ্যে লড়াইয়ে প্যাগানরা হেরে যায় ; পসাইডন দেবতার ত্রিশূল হয়ে ওঠে শয়তানের লাঠি, জ্ঞানী ক্রোনের লম্বা টুপিটা ডাইনীর প্রতীকে আর ভেনাসের পেনটাকল হয়ে যায় শয়তানের চিহ্ন। ল্যাংডন একটু বিরতি দিলো। দূর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীও পেনটাকলকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে; এটা এখন আমাদের বেশির ভাগের কাছেই যুদ্ধের একটা প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আমরা এটাকে আমাদের সবগুলো যুদ্ধ বিমানে এঁকে রাখি আর সব জেনারেলের কাঁধে লাগিয়ে রেখেছি।

 

ভালোবাসা এবং সৌন্দর্যের দেবীদের জন্য একটু বেশিই হয়ে গেছে।

 

মজার তো। ফশে হাত পা ছড়ানো মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বললো, আর এই দেহটার এই রকম অবস্থানের কারণ? এটার ব্যাপারে কি বলবেন?

 

ল্যাংডন কাঁধ ঝাঁকালো। এই অবস্থাটা খুব সহজ করে বলতে গেলে পেনটাকল এবং পবিত্র নারীকেই ইঙ্গিত করছে।

 

ফশের মুখভঙ্গী ছায়ায় পেঁকে গেলো। ক্ষমা করবেন, বুঝতে পারছি না?

 

অনুকরণ। প্রতীকটা অনুকরণ করা হয়েছে যাতে দেখামাত্রই বোঝা যায়। জ্যাক সনিয়ে নিজেকে পেনটাকলর পাঁচটি মুখের আদলে নিজের শরীরটাকে সাজিয়েছেন। যদি একটা পেনটাকল ভালো হয়, তবে দুটো পেনটাকল অবশ্যই আরো ভালো।

 

ফশে সনিয়ের দেহের পাঁচটি অংশ, হাত-পা, মাথার দিকে ভালো করে লক্ষ্য করে আবার নিজের তৈলাক্ত চুলে আঙুল চালালো। মজার বিশ্লেষণ। সে একটু থামলো। আর নগ্নতা? সে শব্দটা উচ্চারণ করার সময় একটু বিড়বিড় করলো। একজন বয়স্ক মানুষের নগ্ন দেহের দিকে তাকিয়ে এ কথাটা একটু অশ্লীলই শোনালো। তিনি কেন নিজের সমস্ত জামা-কাপড় খুলে ফেললেন?

 

একেবারে মোক্ষম প্রশ্ন, ল্যাংডন ভাবলো। পোলারয়েড ক্যামেরার ছবিটা প্রথমবার দেখার পর থেকেই সে অবাক হয়ে এই কথাটি ভাবছিলো। তার সবচাইতে বেশি যে ব্যাখ্যাটি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে, সেটা হলো, নগ্ন মানুষের দেহ যৌনতার দেবী ভেনাসের প্রতিমূর্তিকেই ইঙ্গিত করে। যদিও আধুনিক কালে ভেনাসের স্ত্রী-পুরুষ মিলন সম্পর্কিত শাব্দিক অর্থটি মুছে ফেলা হয়েছে, তারপরও শব্দজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবে যে, ভেনাসের উৎপত্তি হয়েছে Venereal শব্দ থেকে, যার অর্থ যৌনসঙ্গম। ল্যাংডন ঠিক করলো এই প্রসঙ্গটি তুলবে না।

 

মি. ফশে, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারবো না, কেন মি. সনিয়ে এই প্রতীকটি এঁকেছেন অথবা এভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু আমি আপনাকে বলতে পারি সনিয়ের মতো একজন মানুষ পেনটাকল প্রতীকটিকে নারী দেবীর মূর্তি হিসেবেই বোঝাতে চেয়েছেন। এই প্রতীকটি এবং পবিত্র নারীর ধারণাটি শিল্পকলা বিষয়ক ইতিহাসবিদ এবং সিম্বোলজিস্টদের কাছে খুবই সুপরিচিত।

 

চমৎকার। আর নিজের রক্তকে কালি হিসেবে ব্যবহার করাটা?

 

অবশ্যই এ ছাড়া তাঁর কাছে লেখার জন্য অন্য কিছু ছিলো না।

 

ফশে কিছুক্ষণ চুপ রইলো। আসলে, আমি বিশ্বাস করি তিনি লেখার জন্য রক্তের ব্যবহার করেছেন ফরেনসিক প্রমাণের সুবিধার্থে।

 

বুঝলাম না?

 

তার বাম হাতের দিকে তাকিয়ে দেখুন।

 

ল্যাংডন কিউরেটরের অসাড় হাতটার আঙ্গুলের দিকে চাইলো, কিন্তু কিছুই দেখতে পেলো না। সে মৃতদেহটা চারপাশ দিয়ে ঘুরে দেখলো, নিচু হয়ে তাকালো, অবাক হবার মতো কোন কিছু দেখতে পেলো না। শুধু দেখতে পেলো কিউরেটরের দেহের নিচে একটা মার্কার কলম চাপা পড়ে আছে।

 

আমরা যখন এখানে আসি তখন সনিয়ে এটা হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছিলেন, ফশে বললো, একটু সরে গিয়ে কয়েক গজ দূরে রাখা একটা পোর্টেবল টেবিলের কাছে গিয়ে তদন্তকার্যে ব্যবহার্য কিছু যন্ত্রপাতি, তার এবং ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া করলো। আপনাকে তো আগেই বলেছি, সে বললো, আমরা কিছুই স্পর্শ করিনি। আপনি কি এ ধরনের কলমের সাথে পরিচিত?

 

ল্যাংডন হাটু গেঁড়ে বসে কলমটা আরো ভালো করে পরখ করে দেখলো।

 

স্টাইলো দ্য লুমিয়ে নোয়ে

 

সে অবাক হয়ে তাকালো।

 

ব্ল্যাক লাইট কলম অথবা ওয়াটার মার্ক স্টাইলাস এমন এক ধরনের বিশেষ কলম, পুলিশ এবং জাদুঘরের ক্ষতিগ্রস্ত ছবি ঠিক করে যারা, তারা এই কলম ব্যবহার করে থাকে জালিয়াতি ধরতে মালপত্রের গায়ে অদৃশ্য দাগ দেবার জন্য। স্টাইলাস কলমে কালি হিসেবে ব্যবহার করা হয় এলকোহল জাতীয় ফুরোসেন্ট কালি, যা কেবলমাত্র ব্ল্যাক লাইটের প্রভাবেই এর কালির দাগ দৃষ্টিগোচর হয়। আজকাল, জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কর্মচারীরা এটা ব্যবহার করে থাকে প্রতিদিনকার টহলের সময় মেরামত করার জন্য বিবেচিত হওয়া ছবিকে চিহ্নিত করার কাজে।

 

ল্যাংডন উঠে দাঁড়ালে, ফশে স্পটলাইটটার কাছে গিয়ে সেটা বন্ধ করে দিলে সাথে সাথে গ্যালারিটা আচমকা অন্ধকারে ডুবে গেলো।

 

সাময়িক অন্ধকার হয়ে গেলে ল্যাংডনের মনে হলো তার ভেতরে অনিশ্চয়তার উত্থান ঘটছে। ফশে একটা বহনযোগ্য লাইট নিয়ে এলো, যেটা থেকে বেগুনি আলো ঠিকরে বের হচ্ছে। আপনি হয়তো জানেন, ফশে বললো, তার চোখে বেগুনি আলোর ঝলকানি, পুলিশ অপরাধ সংগঠিত স্থানে ব্ল্যাক লাইট ব্যবহার করে রক্ত এবং অন্যান্য ফরেনসিক এভিডেন্স খুঁজে পেতে। সুতরাং আপনি আমাদের অবাক হবার ব্যাপারটা কল্পনা করতে পারেন… সাথে সাথেই সে লাইটটা মৃতদেহের উপর নিক্ষেপ করলো।

 

ল্যাংডন দৃশ্যটা দেখেই চমকে গেলো।

 

কাঠের ফ্লোরের ওপর এই আজব দৃশ্যটা দেখ তার হৃদপিণ্ড লাফাতে শুরু করলো। একটা হাতের লেখা জ্বলজ্বল করছে। কিউরেটরের শেষ কিছু কথা তাঁর মৃতদেহটার পাশেই লেখা আছে। সেই জ্বলজ্বল করতে থাকা লেখাটার দিকে তাকিয়ে ল্যাংডনের মনে হলো কুয়াশার যে চাদর সারাটা রাত জুড়ে ছিলো, সেটা ক্রমশ হালকা হয়ে উঠছে।

 

ল্যাংডন লেখাটি পড়ে ফশের দিকে তাকালো, এই লোকটা করেছে কী!

 

ফশের চোখ কেমন সাদা দেখাচ্ছে। মঁসিয়ে, এই কথার উত্তর দিতেই আপনাকে এখানে ডেকে আনা হয়েছে।

 

* * *

 

খুব বেশি দূরে নয়, সনিয়ের অফিসের অভ্যন্তরে, লেফটেনান্ট কোলেত লুভর থেকে ফিরে এসে একটা অডিও কনসোল নিয়ে সনিয়ের ডেস্কে বসে কাজ করছে একটা ভূতুরে পরিবেশে, যেখানে কিউরেটরের ডেস্কের উপর একটা নাইট-এর মূর্তি রাখা আছে আর সেটা যেনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপরও কোলেত খুব স্বাচ্ছন্দেই কাজ করে যাচ্ছে। সে তার একেজি হেডফোনটা ঠিক করে নিয়ে রেকর্ডিং সিস্টেমটা চেক্ করে দেখলো। সবকিছু ঠিক আছে। শব্দ শোনা যাচ্ছে খুবই পরিষ্কার।

 

লো মোমেস্ত দ্য ভারিত, সে বিড়বিড় করে বললো। মুচকি হেসে চোখ বন্ধ করে বাকি কথপোকথন শুনতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। এইসব কথাবার্তা গ্র্যান্ড গ্যালারি থেকে ধারণ করে রেকর্ড করা হচ্ছে।

 

 

 

০৭.

 

সেন্ট সালপিচ চার্চের ভেতরেই একটি ছিমছাম আবাস রয়েছে, সেটা চার্চের তিন তলায় কয়্যার বেলকনির বাম দিকে অবস্থিত। পাথরের ফ্লোর আর কম সাজসজ্জা সম্পন্ন দুই ঘরের এই সুটটা বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সিস্টার সানড়ন বাইলের আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাশের কনভেন্টটি তার আগের আবাস ছিলো। কেউ যদি তাঁকে প্রশ্ন করে তবে তিনি চার্চের ঘরটিই বেশি পছন্দ করেন বলে জানান। সেখানেই তিনি একটা বিছানা, টেলিফোন আর হট প্লেট নিয়ে বেশ নিরবে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করেন।

 

চার্চের কনজারভারিস ডি এফেয়ার্স হিসেবে সিস্টার সানড়নই চার্চের সবধরনের ধর্মীয় বহির্ভূত কার্যকলাপের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মচারী নিযুক্ত করা ও ভাড়া করার নির্দেশনা দেয়া, পুরো বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তা দেখাশোনা করা, বিশেষ করে চার্চ বন্ধ হবার পর, এবং কমিনিউন-এর জন্য প্রয়োজনীয় মদ ও পোশাক সরবরাহ করা তাঁর কাজের মধ্যে পড়ে।

 

আজরাতে তিনি নিজের ছোট্ট খাটে ঘুমিয়ে ছিলেন, জেগে উঠলেন টেলিফোনের ঝংকারে। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত সিস্টার ফোনটা তুলে নিলেন,সোয়ের সানড়ন। এগলিস সেন-সালপিচ।

 

হ্যালো সিস্টার, লোকটা ফাসিতে বললো।

 

সিস্টার সানড্রন উঠে বসলেন। ছয়টা বাজে? যদিও তিনি তাঁর বসের কণ্ঠটা ভালো করেই চেনেন, তবুও পনেরো বছরে কখনই তাঁর বস তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে ওঠাননি। আব্বে একজন ঘুম কাতুরে লোক, যিনি মাস্ এর পরপরই বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।

 

আমি যদি আপনাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে থাকি তার জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, সিস্টার, আব্বে বললেন, তাঁর কণ্ঠটা খুব কাটা কাটা শোনাচ্ছে। আপনাকে একটা কথা বলতে হচ্ছে। এই মাত্র আমি একজন প্রভাবশালী আমেরিকান বিশপের ফোন পেয়েছি। সম্ভবত আপনি তাকে চেনেন? ম্যানুয়েল আরিঙ্গাবোসা?

 

ওপাস দাইর প্রধান? অবশ্যই তাকে আমি চিনি। এই চার্চের কে না তাঁকে চেনে? আরিঙ্গারোসার রক্ষণশীল সংগঠনটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব দ্রুত বর্ধনশীল করে অঙ্গসংগঠন, আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন

 

হচ্ছে। সংগঠনটি হঠাৎ করেই শক্তিশালী ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যখন ১৯৮২ সালে পোপ জন পল দ্বিতীয় অপ্রত্যাশিতভাবে ঘোষণা দেন যে, তারা হলো পোপের ব্যক্তিগত অঙ্গসংগঠন, আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সবধরনের কার্য কলাপই অনুমোদন করে দেয়া হয়। সন্দেহজনকভাবে ঐ একই বছরে সম্পদশালী ধর্মীয় সংগঠনটি প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ভ্যাটিকানের ধর্মীয় ইনস্টিটিউটে হস্তান্তর করে যা সর্বসাধারণের কাছে ভ্যাটিকান ব্যাংক হিসেবে পরিচিত বিব্রতকর দেউলিয়ার হাত থেকে ব্যাংকটিকে এভাবে রক্ষা করা হয়। এর পরবর্তী পদক্ষেপটি অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দেখা দেয়, পোপ ওপাস দাইর প্রতিষ্ঠাতাকে সেন্ট হবার তালিকায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন বলে। প্রায়শই যেটা একশ বছরের দীর্ঘ একটি ব্যাপার, সেটা খুব দ্রুত কমিয়ে বিশ বছরের আনুষ্ঠানিকতায় টেনে আনা হয়েছিলো। সিস্টার সানন এটা না ভেবে পারলেন না যে, রোমে ওপাস দাইর এতো ভালো অবস্থানের ব্যাপারটি অবশ্যই সন্দেহজনক, তবে তাদের ধর্মীয় আনুগত্যের ব্যাপারে কোন তর্ক চলে না।

 

বিশপ আরিঙ্গাবোসা আমার কাছে একটা সাহায্য চেয়েছেন, আব্বে তাঁকে বললেন, তাঁর কণ্ঠটা খুবই নার্ভাস শোনা যাচ্ছে। উনার একজন শিষ্য আজ রাতে প্যারিসে আছেন …।

 

সিস্টার সানন একটা অদ্ভুত অনুরোধ শুনে দোটানায় পড়ে গেলেন। আমি দুঃখিত, আপনি বলছেন ওপাস দাইর এই সদস্যটি আগামীকাল সকালে আসতে পারবেন না?

 

হ্যাঁ, তা-ই। তার প্লেন খুব সকালেই ছাড়বে। তিনি সবসময়ই সেন্ট সালপিচ চার্চ দেখার স্বপ্ন দেখতেন।

 

কিন্তু দেখার জন্য চার্চটা তো দিনের বেলায়ই বেশি আকর্ষণীয়। ছাদের কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো, আলো-আঁধারির ছায়া, এগুলোই তো চার্চের অনন্য বৈশিষ্ট্য।

 

সিস্টার, আমি আপনার সাথে একমত, তারপরও আমি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করছি উনাকে আজ রাতে চার্চে প্রবেশ করার অনুমতি দিন। তিনি আপনার এখানে ঠিক…একটা বাজে? তার মানে বিশ মিনিটের মধ্যে।

 

সিস্টার সানভৃনের চোখ কপালে উঠলো। অবশ্যই। এটা আমার জন্য খুবই আনন্দের ব্যাপার।

 

আব্বে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোনটা রেখে দিলেন। হতভম্ব হয়ে সিস্টার সানভৃন নিজের উষ্ণ খাটে কিছুক্ষণ বসে থেকে ঘুম ঘুম ভাবটা কাটাবার চেষ্টা করলেন। তাঁর পয়ষট্টি বছরের শরীরটা খুব দ্রুত ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারে না। যদিও আজরাতের ফোনটা তাঁকে জেগে তুলেছে, তার সম্বিত ফিরেছিলো খুব দ্রুত। ওপাস দাই সব সময়ই তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। তাদের শরীরে কষ্ট দেয়ার অনুশীলটা বাদ দিলেও, নারীদের সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী খুবই আগ্রাসী। তিনি এটা জেনে খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন যে, ওখানকার মেয়ে সদস্যদেরকে জোর করে কোন রকম পারিশ্রমিক ছাড়াই পুরুষ সদস্যদের বাসস্থান পরিষ্কার করানো হয়। মেয়েরা শক্ত, খসখসে কাঠের পাটাতনে ঘুমায় আর পুরুষেরা ঘুমায় নরম ম্যাটে; মেয়েদেরকে শারিরীক কষ্টের অনুশীলনে একটু বাড়তি কিছু করানো হয় এবং সেটা করানো হয় জোর করে…এসবই করা হয় আদি পাপের শাস্তি ভোগের জন্য। মনে হয় ইভের আপেল খাওয়াটা নারী জাতির জন্য এক পারলৌকিক শাস্তি। দুঃখের বিষয় হলো, যেখানে বেশিরভাগ ক্যাথলিক চার্চ নারীদের বিষয়ে সঠিক পথে এগোচ্ছে, নারীদের অধিকারকে সম্মান করছে উত্তরোত্তর, সেখানে ওপাস দাই পুরো ব্যাপারটিকে উল্টো পথে চালানোর হুমকি দিচ্ছে। যাই হোক, সিস্টার সানড়ন একটা আদেশ পেয়েছেন।

 

আস্তে আস্তে তিনি নিজের বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর খালি পায়ে ঠাণ্ডা জমিনের শীতলতা লাগলো। ঠাণ্ডাটা সমস্ত শরীর জুড়ে বয়ে গেলে তার একটা অপ্রত্যাশিত অনুভূতির সৃষ্টি হলো।

 

নারীদের স্বজ্ঞা?

 

ঈশ্বরের একজন অনুসারী হিসেবে, সিস্টার সানড়ন শিখেছেন নিজের আত্মার শান্ত কণ্ঠের মধ্যেই শাস্তি নিহিত থাকে। আজরাতে, সেইসব কণ্ঠস্বর, তাকে ঘিরে থাকা নিরব, ফাঁকা চার্চের মতোই নিশ্চুপ।

 

 

 

০৮.

 

কাঠের ফ্লোরের জ্বলজ্বলে লেখাটির তীব্র আলোতে ল্যাংডনের চোখে পানি এসে গেলো। জ্যাক সনিয়ের শেষ বার্তাটি বিদায়ী বার্তা হিসেবে এতোটাই বেখাপ্পা যে, সে এটা কল্পনাও করতে পারেনি।

 

বার্তাটি হলো :

 

13-3-2-21-1-1-8-5

Oh, Draconian devil!

O’ Lame saint!

 

যদিও ল্যাংডনের একটুও ধারনা ছিলো না এটার মানে কী, তবুও ফশে কেন এমন ধারণা করলো যে, পেনটাকল হলো শয়তান পূজার সাথে সংশ্লিষ্ট, সেটা সে বুঝতে পারলো।

 

ও, ড্রাকোনিয়ান শয়তান।

 

সনিয়ে শয়তানের উল্লেখ করে একটা লিখিত বক্তব্য দিয়ে গেছেন। সংখ্যাগুলোও লেখার মতোই সমান কিম্ভুতকিমাকার, দেখে মনে হচ্ছে একটা সংকেতের অংশ।

 

হ্যাঁ, ফশে বললো। আমাদের ক্রিপটোগ্রাফাররা এ নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, কে তাঁকে খুন করেছে সেটা জানার জন্য এই সংখ্যাগুলোই মূল চাবিকাঠি হবে। হয়তো কোন ফোন নাম্বার, অথবা কোন সোশাল আইডি নাম্বার। এই সংখ্যাগুলো কি আপনার কাছে কোন প্রতীকি অর্থ বহন করে?

 

ল্যাংডন সংখ্যাগুলোর দিকে আবারো তাকালো, বুঝতে পারলো এগুলোর ঠিক মতো প্রতীকি অর্থ বের করতে হলে কম পক্ষে এক ঘণ্টা সময় লেগে যাবে। অবশ্য, এ দিয়ে সনিয়ে যদি কিছু বুঝিয়ে থাকেন তো। ল্যাংডনের কাছে সংখ্যাগুলো একেবারেই এলোমেলো লাগছে। সে প্রতীকি ক্রমের ব্যাপারে জ্ঞাত, যা দিয়ে কিছু বোঝা যায়, কিন্তু এখানকার সবটাইপেনটাকল, লেখাগুলো, সংখ্যাগুলো মনে হচ্ছে মূলগত দিক থেকে একটার সাথে আরেকটার কোন মিলই নেই।

 

আপনি শুরুতে বলেছিলেন, ফশে বললো, সনিয়ের এখানকার কাজকর্মগুলো এক ধরনের বার্তা দেয়ার চেষ্টা বলে মনে হচ্ছে…দেবী পূজা অথবা সেই রকম কিছু? এই বার্তাটি সেগুলোর সাথে কীভাবে খাপ খায়?

 

ল্যাংডন জানতো প্রশ্নটা শুধুই বাগাড়ম্বরপূর্ণ। এই অদ্ভুত সব জিনিস নিশ্চিতভাবেই ল্যাংডনের বলা দেবী পূজার সাথে মোটেও খাপ খায় না।

 

ওহ্, ড্রাকোনিয়ান শয়তান? ও ল্যাংড়া সেন্ট?

 

ফশে বললো, এইসব লেখা-ঝোকা দেখে মনে হচ্ছে এগুলো একধরনের অভিযোগ। আপনি কি একমত নন?

 

ল্যাংডন কল্পনা করতে চেষ্টা করলো গ্র্যান্ড গ্যালারির ভেতরে একা আঁটকে পড়া কিউরেটরের শেষ কয়েক মিনিটের সময়টার কথা, তিনি জানতেন মারা যাচ্ছেন। এটা যুক্তিপূর্ণই মনে হচ্ছে। নিজের খুনির বিরুদ্ধে অভিযোগ করাটা খুবই স্বাভাবিক, আমারও তাই মনে হয়।

 

আমার কাজ হলো, লোকটার নাম বের করা। আপনাকে একটি প্রশ্ন করি মি. ল্যাংডন। আপনার চোখে এই সংখ্যাগুলো বাদে, এই বার্তাটিতে সবচাইতে অদ্ভুত জিনিসটা কি?

 

সবচাইতে অদ্ভুত? একজন মরতে বসা লোক নিজেকে গ্যালারির অভ্যন্তরে আঁটকে রাখলেন, নিজে নিজে একটা পেনটাকল আঁকলেন এবং কাঠের ফ্লোরে একটি রহস্যময়, দূর্বোধ্য কিছু আঁকিবুকি করলেন। এসবের কোনটা অদ্ভুত নয়?

 

ড্রাকোনীয় শব্দটি? সে একটু ঝুঁকি নিলো। ল্যাংডন একদম নিশ্চিত ছিলো যে, সেটা ড্রাকোকেই নির্দেশ করে—খৃস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী নিষ্ঠুর এক রাজনীতিক। ড্রাকোনীয় শয়তান মনে হচ্ছে একটা অদ্ভুত শব্দের ব্যবহার।

 

ড্রাকোনীয়? ফশের কণ্ঠে একধরনের অধৈর্যের প্রকাশ দেখা গেলো। সনিয়ের শব্দ ব্যবহার করাটা এখানে তেমন বড় কোন বিষয় নয়।

 

ল্যাংডন নিশ্চিত ছিলো না, ফশের মনে ঠিক কোন্ বিষয়টা ঘুরপাক খাচ্ছে।

 

সনিয়ে একজন ফরাসি, ফশে উত্তাপহীন কণ্ঠে বললো। তিনি প্যারিসে থাকতেন। তারপরও তিনি এরকম একটি বার্তা বেছে নিলেন লেখার জন্য…

 

ইংরেজিতে, ল্যাংডন বললো, বুঝতে পারলো ক্যাপ্টেনের কথার অর্থটি। ফশে মাথা নাড়লো, যথাযর্থই। কোন ধারণা আছে, কেন?

 

ল্যাংডন জানতো সনিয়ে খুব নিখুঁত ইংরেজি বলতেন, তারপরও শেষ কথা হিসেবে লিখিত বার্তাটি লিখতে গিয়ে ইংরেজি ব্যবহার করাটা ল্যাংডন খেয়ালই করেনি। সে কাধ ঝাঁকালো।

 

ফশে সনিয়ের পেটে আঁকা পেনটাকলের দিকে ঘুরলো। শয়তানের পূজার সাথে কোন সম্পর্ক নেই? আপনি কি এখনও নিশ্চিত?

 

ল্যাংডন কোন কিছুর ব্যাপারেই নিশ্চিত নয়। প্রতীক বিদ্যা আর লিখিত কিছু মনে হচ্ছে কাকতালীয় নয়। আমি দুঃখিত, আমি এর চেয়ে বেশি সাহায্যে আসতে পারছি না।

 

সম্ভবত এটা আরো পরিষ্কার করে দেবে, ফশে মৃতদেহটা থেকে সরে এসে ব্ল্যাক-লাইটটা আবার তুলে ধরলো, আলোটা আরেকটু বাড়িয়ে নিয়ে নিক্ষেপ করলো। এখন?

 

ল্যাংডনের কাছে খুব বিস্ময়কর মনে হলো, কিউরেটরের শরীরের চারপাশে একটা বৃত্ত জ্বলজ্বল করছে। সনিয়ে আরো একটা চিহ্ন একেঁছেন। একটা বৃত্তের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করেছেন। এক ঝলকেই অর্থটা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

 

ভিটরুভিয়ান ম্যান, ল্যাংডন সখেদে বললো। সনিয়ে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত ছবির একটা প্রমাণ সাইজের অনুলিপি তৈরি করেছেন।

 

এটাকে সেই সময়ে এনাটমিক্যালি দিক থেকে সবচাইতে শুদ্ধ ছবি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ভিঞ্চির ভিটরুভিয়ান ম্যান আধুনিক কালের একটি সাংস্কৃতিক আইকন হয়ে উঠেছে। পোস্টার, কম্পিউটারের মাউস প্যাড, টি-শার্ট, ইত্যাদিতে এই ছবি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ছবিটাতে দেখা যাবে একটা নিখুঁত বৃত্তের মধ্যে একজন নগ্ন পুরুষ… ডানা ছড়ানো ঈগল পাখির মতো তার হাত পা ছড়ানো।

 

দা ভিঞ্চি। ল্যাংডনের ভেতরে একটা রোমাঞ্চ খেলে গেলো। সনিয়ের অভিপ্রায় খুবই স্পষ্ট, সেটা অস্বীকার করা যায় না। জীবনের শেষ মুহূর্তটায় কিউরেটর পরনের কাপড় চোপড় খুলে দা ভিঞ্চির ভিটরুবিয়ান ম্যানর অনুকরণে নিজেকে তুলে ধরেছেন।

 

বৃত্তটা একটি অব্যাখ্যাত উপাদান। নারীত্বের রক্ষার প্রতীক, নগ্ন লোকটাকে ঘিরে থাকা বৃত্তটা দা ভিঞ্চির একটি ইঙ্গিতের অভিপ্রায় নারী পুরুষের সম্প্রীতি। এখন প্রশ্ন হলো, সনিয়ে কেন এ রকম বিখ্যাত একটি ছবিকে অনুকরণ করলেন।

 

মি. ল্যাংডন, ফশে বললো, আপনার মতো একজন মানুষ নিশ্চিত করেই জানে যে, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ডার্ক-আর্টের ব্যাপারে এক ধরনের ঝোঁক ছিলো।

 

দা ভিঞ্চি সম্পর্কে ফশের জানাশোনা দেখে ল্যাংডন খুবই অবাক হলো। কিন্তু ক্যাপ্টেনকে এ ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা তেমন সুবিধার হবে না। তাকে বোঝানো যাবে না শয়তান পূজা সম্পর্কে তার সন্দেহের নিশ্চিত কোন ভিত্তি নেই। দা ভিঞ্চি সবসময়ই ইতিহাসবিদদের কাছে একটি জটিল চরিত্র। বিশেষ করে খৃস্টিয় ঐহিত্যে। এই দূরকল্পনাকারীর অসাধারণত্ব বাদ দিলেও তিনি ছিলেন একজন সমকামী এবং প্রকৃতির স্বর্গীয় শৃঙ্খলার পূজারী। এই দুইয়ের কারণেই তাকে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপাচারের দোষে অভিযুক্ত করা হয়। তাছাড়া শিল্পীর অন্যান্য কাজকর্ম তাকে শয়তান সংশ্লিষ্ট রহস্যময়তায় বিবেচনা করা হয় : দা ভিঞ্চি এনাটমি করার জন্য মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করতেন; তিনি কিছু রহস্যময় এবং উল্টো করে লেখা পাণ্ডুলিপি রেখে গেছেন; তিনি বিশ্বাস করতেন তাঁর আয়ত্তে রয়েছে সেই এলকেমি শক্তি যা দিয়ে সীসাকে সোনায় রূপান্তর করা যায়। এমনকি ঈশ্বরকে ফাঁকি দিয়ে মৃত্যুকেও থামিয়ে দেয়া যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন; তার এমন কিছু ভৌতিক আর কল্পিত চিত্র রয়েছে যা তখন ছিলো একেবারেই অকল্পনীয়, পরে অবশ্য সেগুলোর বেশিরভাগই বাস্তবায়িত হয়েছে।

 

ভুল বোঝাবুঝি অবিশ্বাসের জন্ম দেয়, ল্যাংডন ভাবলো। এমনকি দা ভিঞ্চির বিশাল খৃস্টিয় শিল্পকর্মের ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও সেটা তাঁর আধ্যাত্মিক ভণ্ডামি হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে। ভ্যাটিকান থেকে শত শত শিল্পকর্ম তৈরির জন্য লোনীয় সুযোগ পেলেও, দা ভিঞ্চি বৃস্টিয় ছবিগুলো নিজের বিশ্বাসের প্রকাশ হিসেবে না নিয়ে বরং সেগুলোকে বাণিজ্যিক ব্যাপার হিসেবেই নিয়েছিলেন–বিলাস বহুল জীবন যাপন করার তহবিল তৈরির উদ্দেশ্যে। দা ভিঞ্চি ছিলেন একজন খামখেয়ালি মানুষ। তিনি তার হাতে আঁকা অনেক খৃস্টিয় শিল্পকর্মে এমন কিছু সিম্বল বা প্রতীক লুকিয়ে রাখতেন যা আর যাইহোক খৃস্টিয় কিছু নয়। ল্যাংডন এ সম্পর্কে লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে একটি বক্তৃতাও দিয়েছিলো, যার শিরোনাম ছিলো : লিওনার্দোর গুপ্তজীবন্ত স্টিয় চিত্রকর্মে প্যাগান প্রতীক।

 

আমি আপনার ব্যাপারটা বুঝতে পারছি, ল্যাংডন বললো, কিন্তু দা ভিঞ্চি কখনোই ব্ল্যাক আর্ট চর্চা করেননি। তিনি ছিলেন খুবই আধ্যাত্মিক একজন মানুষ, যার সাথে চার্চের সব সময়ই দ্বন্দ্ব লেগে থাকতো। কথাটা বলার সময় ল্যাংডনের মনে একটা অদ্ভুত চিন্তা খেলে গেলো। সে ফ্লোরের লেখাটার দিকে আরেকবার তাকালো। ওহ্, ড্রাকোনীয় শয়তান! ও, ল্যাংড়া সেন্ট।

 

হ্যাঁ? ফশে বললো।

 

ল্যাংডন খুব সর্তকভাবে বলতে শুরু করলো। এইমাত্র আমি ভাবছিলাম যে, সনিয়ে দা ভিঞ্চির সাথে অনেক আধ্যাত্মিক দর্শনই শেয়ার করতেন, তাঁর মধ্যে, আধুনিক ধর্মমতগুলো থেকে চার্চের পবিত্র নারী নির্মূল করার ব্যাপারটাও রয়েছে। হয়তো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত ড্রইংটা অনুকরণ করে সনিয়ে, আধুনিক চার্চ কর্তৃক দেবীদেরকে ডাইনী বানাবার ব্যাপারে তাঁদের উভয়ের হতাশার কথাটাই বলতে চেয়েছেন।

 

ফশের চোখ দুটো শক্ত হয়ে উঠলো। আপনার ধারণা সনিয়ে চার্চকে ল্যাংড়া সেন্ট এবং ড্রাকোনীয় শয়তান বলে অভিহিত করছেন?

 

ল্যাংডনকে মানতেই হলো এটা অনেক বেশি দূরকল্পনা, তারপরও মনে হচ্ছে পেনটাকল এ ধরনের আইডিয়াকে কিছুটা হলেও অনুমোদন করে। আমি যা বলতে চাচ্ছি, সেটা হলো, মি. সনিয়ে তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেবীদের ইতিহাস গবেষণায়, আর ক্যাথলিক চার্চের চেয়ে অন্য আর কেউ এতো বেশি ইতিহাস মুছে ফেলেনি। এটা খুবই যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে যে, সনিয়ে হয়তো তার বিদায়ী সময়টাতে নিজের হতাশা আর অনুযোগের কথা বলাটাই বেছে নিয়েছিলেন।

 

হতাশা? ফলে জিজ্ঞেস করলো, তাকে এখন শত্রু বলে মনে হচ্ছে। এইসব লেখা হতাশার চেয়ে রাগ-গোস্বা বলেই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে, আপনি কি তাই বলবেন না?

 

ল্যাংডন তার ধৈর্যের শেষ সীমায় চলে এলো। ক্যাপ্টেন, আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন সনিয়ে কী বলতে চেয়েছেন সে সম্পর্কে আমার মতামতটা কি, আর আমি সেটাই আপনাকে বলছি।

 

এটা চার্চের বিরুদ্ধে বিষোদগার? ফশের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো, দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বললো সে। মি. ল্যাংডন, আমি আমার কর্মজীবনে অনেক হত্যা-খুন দেখেছি, আমার কথাটা শুনুন। যখন একজন লোক আরেকজন লোক কর্তৃক খুন হয়, আমি বিশ্বাস করি না, তখন সেই লোকটা তার চূড়ান্ত কথা হিসেবে প্রহেলিকাময় ও অস্পষ্ট আধ্যাত্মিক কিছু কথা লিখে যাবে যা কেউই বুঝতে পারবে না। আমি বিশ্বাস করি তিনি একুটাই চিন্তা করছিলেন। ফশের ফিস্ ফিস্ কথাবার্তা বাতাসে বিশ্লিষ্ট হয়ে গেলো।

 

লা ভেনজিনেস। আমার বিশ্বাস সনিয়ে এই লেখাটা লিখেছেন এটা বলার জন্য যে, কে তাকে খুন করেছে।

 

ল্যাংডন চেয়ে রইলো। কিন্তু এসব দেখে তো তেমন কিছু একদমই মনে হচ্ছে।

 

না?

 

না, ক্লান্ত এবং বিমর্ষ হয়ে সেও পাল্টা বললো। আপনি আমাকে বলেছেন, সনিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন তাঁর নিজের অফিসে, এমন একজন লোকের দ্বারা, যাঁকে তিনি নিজেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

 

হ্যাঁ।

 

তাহলে, স্পষ্টই মনে হচ্ছে, কিউরেটর তার আক্রমণকারীকে চিনতেন।

 

ফশে মাথা নাড়লো। বলে যান।

 

তো, সনিয়ে যদি জানতেন কে তাকে খুন করেছে, তাহলে এসবের মানে কি? সে ফ্লোরের দিকে ইঙ্গিত করলো। সংখ্যার কোড? ল্যাংড়া সেন্ট? ড্রাকোনীয় শয়তান? তার পেটে আঁকা পেনটাকলটা? এগুলোর সবটাই খুব বেশি রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে।

 

ফশে এমনভাবে ভুরু তুললো যেনো এ ধারণাটি তার কখনোই মনে আসেনি। আপনার কথায় যুক্তি আছে।

 

সবকিছু বিবেচনা করুন, ল্যাংডন বললো, আমার ধারণা, সনিয়ে যদি বলতে চাইতেন তাঁকে কে খুন করেছে, তবে তিনি কারোর নামই লিখতেন।

 

ল্যাংডন এই কথাটা বলতেই এই প্রথমবারের মতো ফশের ঠোঁটে একটা মুচকী হাসি দেখা দিলো। যথার্থই, ফশে বললো। যথার্থই।

 

 

 

আমি একজন ওস্তাদের কাজ প্রত্যক্ষ করছি, লেফটেনান্ট কোলেত কানে হেডফোন লাগিয়ে ফশের কথাবার্তা শুনতে শুনতে ভাবছিলো।

 

ফশে এমন কিছু করবে, যা কেউ করতে সাহসও করবে না।

 

কাজোলের সূক্ষ্ম শিল্পের দক্ষতা আধুনিক কালের আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এতে একজনকে প্রচণ্ড চাপের সময় অসাধারণ ভারসাম্য ধরে রাখতে হয়। খুব কম লোকেরই এই ধরনের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক শক্তি থাকে। কিন্তু মনে হচ্ছে, এর জন্যই ফশের জন্ম হয়েছে। তার ধৈর্য আর মানসিক শক্তি রোবটের সমপর্যায়ের।

 

আজ রাতে ফশের মূল আবেগটি মনে হচ্ছে, যেনো এই গ্রেফতারটি তার একান্তই ব্যক্তিগত একটি ব্যাপার। এক ঘণ্টা আগে ফশে তার এজেন্টকে যে বৃফিংটা দিয়েছে, তাতে মনে হয় সে একেবারেই নিশ্চিত, সাধারণত এমনটি কখনোই সে করে না। আমি জানি কে জ্যাক সনিয়েকে হত্যা করেছে, ফশে বলেছিলো। তুমি জানো কি করতে হবে। আজরাতে কোন ভুল করা যাবে না।

 

আর এখন পর্যন্ত, কোন ভুলই করা হয়নি। কোলেতের কাছে এখনও এমন কোন প্রমাণ কিংবা ইঙ্গিত যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে না, যাতে অপরাধীর ব্যাপারে ফশের নিশ্চিত জানাটাতে বিশ্বাস রাখা যায়। কিন্তু সে জানতো, খুবভালো করেই জানতো, এই বৃষলকে জিজ্ঞেস করার কোন দরকার নেই। ফশের অনুমান, অনেক সময়ই মনে হয় প্রায় আধ্যাত্মিক কিছু থেকে উৎসারিত হয়। ঈশ্বর তার কানে কথা বলে, একজন।

 

এজেন্ট তার ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতার প্রমাণ পাওয়ার পর একথাটা বলেছিলো। কোলেতও  সেটা মেনে নিয়েছিলো, যদি কোন ঈশ্বর থেকে থাকে, তবে বেজু ফশে সেই ঈশ্বরের তালিকায় প্রথম দিকেই থাকবে। ক্যাপ্টেন মাস্ এবং কনফেশনে নিয়মিতই উপস্থিত থাকে—অন্যসব অফিসাররা যেমনটি করে থাকে শুধুমাত্র ভালো গণসংযোগের আশায়, মোটেও তেমনভাবে নয়। কয়েক বছর আগে পোপ যখন প্যারিসে এসেছিলেন, ফশে তখন সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাঁর একজন শ্রোতার সম্মান অর্জন করতে পেরেছিলো। পোপের সাথে ফশের একটা ছবি বর্তমানে তার অফিসে টাঙানো আছে। পাপালের ষাড়, লোকজন আড়ালে আবডালে তাকে এ নামে ডাকে।

 

কিন্তু কোলেতের কাছে এটা খুবই পরিহাসপূর্ণ বলে মনে হলো, যখন সে দেখতে পেলো ফশে আজকাল ক্যাথলিক চার্চের শিশু-যৌন-নির্যাতন কেলেংকারী সম্পর্কে বেশ প্রকাশ্যেই সমালোচনা করা শুরু করেছে। এইসব পাদ্রীদেরকে একবার নয়, দুবার ফাঁসিতে ঝোলানো উচিত। ফশে বেশ জোড়েশোরেই কথাটা বলে থাকে। একবার বাচ্চাদের সাথে এই অপরাধ করার জন্য, এবং আরেকবার ক্যাথলিক চার্চের সুনামকে হেয় করবার জন্য। কোলেতের অদ্ভুত ধারণা তৈরি হয়েছিলো যে, দ্বিতীয় কারণটার জন্যই ফশে বেশি রেগে আছে।

 

তার ল্যাপটপ কম্পিউটারের দিকে ঘুরে কোলেত তার দ্বিতীয় কাজটি করতে লেগে গেলো জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম। কম্পিউটারে লুভরের পুরো এলাকাটির একটা স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ভেসে এলো। গ্যালারি এবং হলওয়ের দিকে তার চোখ কী যেনো খুঁজতে লাগলো। অবশেষে কোলেত সেটা পেয়ে গেলো।

 

গ্র্যান্ড গ্যালারির অভ্যন্তরে ছোট্ট একটা লাল বিন্দু জ্বলছে আর নিভছে।

 

লা মার্ক।

 

ফশে আজরাতে তার শিকারকে খুব শক্ত করেই ধরেছে। রবার্ট ল্যাংডন এ পর্যন্ত নিজেকে খুব ঠাণ্ডা মাথার মানুষ হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছে।

 

 

 

০৯.

 

মি. ল্যাংডনের সাথে কথাবার্তায় যেনো বিঘ্ন না ঘটে সেটা নিশ্চিত করতে বেজু ফশে নিজের সেল ফোনটা বন্ধ করে রেখেছিলো। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, সেটা ছিলো খুবই ব্যয়বহুল একটা যন্ত্র যেটার রয়েছে দ্বিমুখী রেডিও সুবিধা। তার নিষেধ সত্ত্বেও এখন যন্ত্রটা বেজে উঠছে, তার এক এজেন্টের করা কলে।

 

ক্যাপিতেইন? ফোনটা সশব্দ হয়ে উঠলো ওয়াকি-টকির মতো। ফশে দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো প্রচণ্ড রাগে। সে কোনমতেই ভাবতে পারছে না, কোলেতের সার্ভিলেন্স করার কাজের চেয়ে আর কোন জরুরি বিষয় আছে কিনা বিশেষ করে এরকম একটি জটিল মুহূর্তে।

 

সে ল্যাংডনের দিকে তাকিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিলো। ক্ষমা করবেন, এক মিনিট। বেল্ট থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে রেডিও ট্রান্সমিশনেরর সুইচটা চাপ দিলো।

 

উই?

 

ক্যাপিতেই, উঁ এজেন্ট দু দিপার্তমেস্ত দ্য ক্রিপ্টোগ্রাফি এস এরাইভ।

 

ফশের রাগটা কিছুক্ষণের জন্য কমে গেলো। কিটোগ্রাফার? এই অসময়ে ফোন করলেও, সম্ভবত খবরটা ভালো। ফশে সনিয়ের ক্রিপটিক অর্থাৎ রহস্যময় লেখাগুলো খুঁজে পাবার পর, সেগুলোর সব ছবিই তুলে ক্রিপ্টোলজি ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়ে দিয়েছিলো এই আশায় যে, কেউ হয়তো বলতে পারবে সনিয়ে আসলে কী বলতে চেয়েছেন। যদি এখন কোন কোড ব্রেকার এসে থাকে, তার মানে, কেউ না কেউ সনিয়ের লেখার পাঠোদ্ধার করতে পেরেছে।

 

এই মুহূর্তে আমি খুব ব্যস্ত আছি, ফশে ফোনে জবাব দিলো, ক্রিপ্টোগ্রাফারকে কমান্ড পোস্টে অপেক্ষা করতে বলো। আমার কাজ শেষ হলে লোকটার সাথে কথা বলবো।

 

মহিলা, স্যার, কণ্ঠটা শুধরিয়ে দিলো, এজেন্ট নেভু।

 

এই ফোনটা আসার পর থেকেই ফশের আশা একটু একটু করে দূরাশায় পরিণত হচ্ছে। সোফি নেভু ডিসিপিজের একটি মস্ত বড় ভুল। একজন প্যারিসবাসী তরুণী, যে ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে লেখাপড়া করেছে ইংল্যান্ডের রয়্যাল হলো ওয়েতে, দুই বছর আগে যখন নারীদেরকে পুলিশে আরো বেশি অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তার মন্ত্রণালয় সোফিকে নিয়োগ দেয় তখন থেকে মেয়েটা ফশের কাঁধে চেপে বসেছে। এ ব্যাপারে ফশে আপত্তি করেছিলো এই বলে যে, এতে ডিপার্টমেন্টটা দুর্বল হয়ে যাবে।  শুধুমাত্র শারীরিক সক্ষমতার অভাবের জন্যই নয়, নারীদের উপস্থিতি পুলিশের মাঠ পর্যায়ের পুরুষ সহকর্মীদের মনোযোগের বিচ্যুতি ঘটাবে। এটা হবে খুবই বিপজ্জনক। ফশে যতোটা আশংকা করেছিলো সোফি নেভু তার চেয়েও বেশি মনোযোগের বিচ্যুতি ঘটিয়েছে।

 

বত্রিশ বছর বয়সের মেয়েটার দৃঢ়তা তার একগুয়েমীপনাকে পরিমিত করে রেখেছে। তার বৃটেনের নতুন ক্রিপ্টোলজিক পদ্ধতির ব্যবহার ক্রমাগতভাবে প্রখ্যাত ফরাসি ক্রিপ্টোগ্রাফারদেরকে ক্ষুব্ধ করে যাচ্ছে। তারচেয়েও বড় কথা, ফশের জন্য সবচাইতে বড় সমস্যা হলো সেই চিরন্তন সত্য কথাটি যা থেকে সে নিজেও বাচতে পারেনি, সেটা হলো, একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ মানুষের অফিসে, সুন্দরী, আকর্ষণীয় কোন তরুণী চোখের সামনে থাকলে, চোখ সারাক্ষণ সেদিকেই ঘোরে, হাতের কাজের দিকে নয়।

 

ফোনে লোকটা বললো, এজেন্ট নেভু এই মুহূর্তেই আপনার সাথে কথা বলার জন্য চাপচাপি করছে, ক্যাপ্টেন। আমি তাকে থামাতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু সে গ্যালারির দিকে রওনা দিয়ে দিয়েছে।

 

ফশে অবিশ্বাসে চিৎকার করে উঠলো প্রায়। এটা কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি খুব ভালো করেই বলেছিলাম

 

কিছুক্ষণের জন্য ল্যাংডনের মনে হয়েছিলো বেজু ফশের স্ট্রোক করেছে বোধ হয়। কথার মাঝপথে ক্যাপ্টেনের চোয়াল শক্ত হয়ে চোখ দুটো ঠিকরে বের হয়ে যাচ্ছিলো। তার রক্তচক্ষু ল্যাংডনের কাঁধের পাশে কোথাও স্থির হয়ে গেলো। ল্যাংডন ঘুরে দেখার আগেই, শুনতে পেলো একটি নারী কণ্ঠ, তার পেছন থেকে রিনিঝিনি করে বলে উঠলো।

 

এক্সুইজেজ মোয়ে, মেঁসিয়ে।

 

ল্যাংডন ঘুরে দেখে একজন তরুণী এগিয়ে আসছে। করিডোর দিয়ে লম্বা-লম্বা পা ফেলে তাদের দিকেই আসছে সে…তার হাটার ধরণে নির্ঘাত শিকারের একটি ব্যাপার রয়েছে। হাটু পর্যন্ত ক্যাজুয়াল পোশাক পরিহিত, ঘিয়ে রঙের সোয়েটার, কালো রঙের পা-মোজা, দেখতে খুব আকর্ষণীয় আর বয়স ত্রিশের কোঠায় বলে মনে হচ্ছে। তার পাতলা এলোমেলো চুলগুলো কাঁধের উপর অবিন্যস্তভাবে পড়ে আছে। সেজন্যে মুখটার চারপাশ একটু ঢেকে গেছে। এই মেয়েটার রঙ-চঙহীন সৌন্দর্য আর অকৃত্রিমতা এক ধরনের দৃঢ় চরিত্রের দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

 

ল্যাংডনের কাছে খুব অবাক করার ব্যাপার হলো যে, মেয়েটা সরাসরি তার কাছে এসে বেশ ভাবেই হাতে বাড়িয়ে দিলো। মঁসিয়ে ল্যাংডন, আমি ডিসিপিজের ক্রিপ্টোগ্রাফার ডিপার্টমেন্টের এজেন্ট নেভু। তার উচ্চারণে এ্যাংলো-স্যাক্সন টান বেশ স্পষ্ট।

 

আপনার সাথে পরিচিত হওয়া খুব আনন্দের ব্যাপার। তার নরম হাত ধরে ক্ষণিকের জন্য ল্যাংডনের মনে হলো তার চোখ মেয়েটার ওপর স্থির হয়ে আছে। মেয়েটার চোখ জলপাই সবুজ—প্রখর এবং স্পষ্ট।

 

ফশের ভাবসাবে বিরক্তি ফুটে উঠলো।

 

ক্যাপ্টেন, মেয়েটা বললো, খুব দ্রুত তার দিকে ফিরে একটা আক্রমণাত্মক কথা বললো, এজন্যে আমাকে ক্ষমা করবেন, কিন্তু সে নেস্ত পাস লো মোমেন্ত! ফশে খুব কাটা কাটাভাবে বললো।

 

আমি আপনাকে ফোন করার চেষ্টা করেছিলাম, সোফি ইংরেজিতেই চালিয়ে গেলো ল্যাংডনের প্রতি সৌজন্যবশতায়। কিন্তু আপনার সেল ফোনটা বন্ধ।

 

ফোনটা একটা কারণে বন্ধ করে রেখেছিলাম, ফশে গজ গজ করতে করতে বললো। আমি মি. ল্যাংডনের সাথে কথা বলছিলাম।

 

আমি সংখ্যা-কোডটা উদঘাটন করতে পেরেছি, সে খুব সাদামাটাভাবেই কথাটা বললো।

 

ল্যাংডনের মধ্যে একধরনের স্নায়ুবিক উত্তেজনা দেখা দিলো। সে কোডটার মমোৰ্দ্ধার করতে পেরেছে?

 

ফশে কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে সে ব্যাপারে একটু দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে হলো।

 

এটা ব্যাখ্যা করার আগে, সোফি বললো, মি. ল্যাংডনের জন্য আমার কাছে একটা জরুরি মেসেজ আছে সেটা বলে নেই।

 

ফশে খুবই অবাক হলো বলে মনে হচ্ছে। মি. ল্যাংডনের জন্য?

 

মেয়েটা মাথা নেড়ে ল্যাংডনের দিকে ফিরলো, আপনার এখনই ইউএস এ্যামবাসিতে যোগাযোগ করা দরকার, মি. ল্যাংডন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আপনার জন্য আসা একটা মেসেজ তাদের কাছে রয়েছে।

 

ল্যাংডনও অবাক হলো, কোড-এর অর্থ জানার জন্য যে উত্তেজনাটা তার মধ্যে ছিলো, সেটা যেনো হঠাৎ করেই অন্য একটা বিস্ময়ে প্রতিস্থাপিত হলো। যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটা মেসেজ? সে অনুমান করতে চেষ্টা করলো, কে তাকে সেটা পাঠাতে পারে। তার সহকর্মীদের খুব কম সংখ্যকই জানে বর্তমানে সে প্যারিসে আছে।

 

খবরটা শুনে ফশের চওড়া চোয়ালটা খুব শক্ত হয়ে গেলো। ইউএস এ্যামবাসি? সে প্রশ্ন করলো, তার কথায় সন্দেহের আভাস। তারা কীভাবে জানতে পারলো মি. ল্যাংডন এখানে আছেন?

 

সোফি কাঁধ ঝাঁকালো। আসলে তারা মি. ল্যাংডনের হোটেলে ফোন করেছিলো, সেখান থেকে জানতে পেরেছে যে, মি. ল্যাংডনকে ডিসিপিজে তুলে নিয়ে গেছে।

 

ফশেকে দেখে মনে হলো সে বিপদে পড়েছে। আর এ্যামবাসি তারপর ডিসিপিজের ক্রিপ্টোগ্রাফিতে যোগযোগ করেছে?

 

না, স্যার, সোফি বললো, তার কণ্ঠ খুব দৃঢ়। আমি যখন ডিসিপিজের সুইচ বোর্ড থেকে আপনার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম তখন তারা আমায় বললো যে, মি. ল্যাংডনের কাছে একটা মেসেজ এসেছে, যদি আমি আপনাকে পেয়ে যাই তবে সেটা আমাকে পৌঁছে দিতে বললো তারা।

 

ফশেকে খুব চিন্তিত দেখালো। সে কিছু বলার আগেই সোফি ল্যাংডনের দিকে ঘুরলো।

 

মি. ল্যাংডন, সে তার পকেট থেকে একটা ছোট্ট কাগজ বের করে বললো, এটা আপনার এ্যামবাসির মেসেজ সার্ভিসের নাম্বার। তারা আপনাকে যতো দ্রুত সম্ভব ফোন করতে বলেছে। কাগজটা তার হাতে তুলে দেবার সময় সে চোখের একটু ইশারা করলো। আমি যখন মি. ফশেকে কোডের অর্থটা ব্যাখ্যা করতে থাকবো তখন আপনি ফোন করে নেবেন।

 

ল্যাংডন কাগজটা দেখলো। এটাতে প্যারিসের ফোন নাম্বার এবং একটা এক্সটেনশন নাম্বার দেয়া আছে। ধন্যবাদ আপনাকে, সে বললো, তার খুব উদ্বিগ্ন বোধ হচ্ছে এখন। একটা ফোন কোথায় পেতে পারি?।

 

সোফি তার সোয়টারের পকেট থেকে একটা ফোন বের করতে যেতেই ফশে তাকে ইশারা করে থামিয়ে দিলো। তাকে এখন মাউন্ট ভিসুভিয়াস মনে হচ্ছে, এক্ষুণি বোধ হয় অগ্নৎপাত হবে। সোফির দিক থেকে চোখ না সরিয়েই সে নিজের সেল ফোনটা বের করলো। এই লাইনটা ব্যবহার করাই বেশি নিরাপদ, মি. ল্যাংডন। আপনি এটা ব্যবহার করতে পারেন।

 

ফশে কেন এই মেয়েটার উপর এত ক্ষেপে আছে সেটা ল্যাংডনের কাছে খুবই রহস্যময় মনে হচ্ছে। খুব অস্বস্তি লাগলেও সে ক্যাপ্টেনের ফোনটা গ্রহণ করলো। ফশে ফোনটা দিয়েই একটু দূরে দাঁড়ানো সোফির কাছে চলে গিয়ে চাপা গলায় কী যেনো বলতে শুরু করলো। ল্যাংডন ক্যাপ্টেনকে অপছন্দ করতে শুরু করেছে, তাদের এই অদ্ভুত কথাবার্তা থেকে নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে সে ফোনটার সুইচ টিপলো। কাগজটা দেখে দেখে ল্যাংডন একটা নাম্বারে ফোন করলো।

 

রিং বাজতে শুরু করেছে। একবার… দুবার….তিনবার… শেষে কলটা লাইন পেলো।

 

ল্যাংডন এ্যামবাসির একজন অপারেটরকে আশা করেছিলো। কিন্তু তার পরিবর্তে সে একটা এন্সারিং মেশিনের আওয়াজ শুনতে পেলো। সবচাইতে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, টেপের কণ্ঠটা খুব পরিচিত। এটা সোফি নেভুরই।

 

বজুঁখ, ভু এতে বুশেজ সোফি নেভু, নারী কণ্ঠটা বললো, জো সুই এবসেনতে পোটর লো মোমেন্ত, সেই…..

 

কিছু বুঝে উঠতে না পেরে, ল্যাংডন সোফির দিকে তাকালো। আমি দুঃখিত, মিস্ নেভু? আমার মনে হয় আপনি আমাকে।

 

না, এটাই ঠিক নাম্বার, সোফি খুব দ্রুতই মাঝপথে বাধা দিয়ে বললো। এ্যামবাসির একটা স্বয়ংক্রিয় এন্সারিং মেশিন আছে। মেসেজটা পেতে হলে আপনাকে আরেকটা এক্সটেনশন নাম্বার ডায়াল করতে হবে।

 

ল্যাংডন চেয়ে রইলো। কিন্তু—

 

আমি আপনাকে তিন সংখ্যার একটা কোড দিয়েছি, কাগজে।

 

ল্যাংডন কিছু একটা বলতে যাবে, তখনই সোফি নিঃশব্দে চোখের ইশারা করলো। সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য। তার সবুজ চোখ দুটো স্পষ্টতই একটা বার্তা দিয়ে দিয়েছে।

 

কোন প্রশ্ন করবেন না। শুধু যা বলেছি তাই করুন। ল্যাংডন এক্সটেনশন নাম্বারটা চাপলো : ৪৫৪।

 

সোফির মেসেজটা সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে গেলো, আর তারপরই ল্যাংডন শুনতে পেলো একটা ইলেক্ট্রনিক কণ্ঠ, ফরাসিতে : আপনার জন্য একটা নতুন মেসেজ আছে। আসলে, ৪৫৪ নম্বরটি সোফিরই, সে যখন বাড়িতে না থাকে তখন তার মেসেজ পেতে এটি ব্যবহার করা হয়।

 

আমি এই মেয়েটারই মেসেজ নিতে যাচ্ছি।

 

ল্যাংডন এবার টেপটা শুনতে পেলো। আবারো, যে কণ্ঠটি কথা বলছে, সেটা সোফির নিজের।

 

মি. ল্যাংডন, মেসেজটা একটা ভীতিকর ফিসফিস্ কণ্ঠে বলতে শুরু করলো। এই মেসেজটা পড়ে কোন ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে শুনে যান। আপনি এখন খুব বিপদে আছেন। মনোযোগ দিয়ে আমার কথাগুলো শুনুন।

 

 

 

১০.

 

সাইলাস কালো অদি গাড়িটার পেছনের সিটে বসে আছে, টিচার তার জন্য এই গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন। সে বসে থেকে বাইরে বিখ্যাত চার্চ সেন্ট-সালপিচের দিকে তাকিয়ে আছে। নিচ থেকে ফ্লাড লাইটের আলোতে চার্চের দুটো টাওয়ারকে মনে হচ্ছে লম্বা দালানটার দুদিকে দুটো পাহাড়াদার।

 

শয়তানের দল তাদের কি-স্টোনটা লুকানোর জন্য ঈশ্বরের ঘরকে ব্যবহার করেছে। আবারো ভ্রাতৃসংঘ তাদের রহস্য-প্রহেলিকা আর শঠতার ঐতিহাসিক সুনামটি বজায় রাখতে পেরেছে। সাইলাস কি-স্টোনটা খুঁজে পেলেই সেটা তার টিচারকে দিয়ে দেবে, যাতে ভ্রাতৃসংঘ যে জিনিসটা বিশ্বাসীদের কাছ থেকে চুরি করেছিলো সেটা তাঁরা ফিরে পায়।

 

সেটা ওপাস দাইকে কত শক্তিশালীই না করবে।

 

সেন্ট সালপিচের এক ফাঁকা জায়গায় অদিটাকে পার্ক করে সাইলাস বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো, নিজেকে সুধালো এই মুহূর্তের কাজের জন্য মাথাটা পরিষ্কার রাখতে হবে। তার প্রশস্ত পিঠটা আজ সকালের কোরপোরাল মরটিফিকেশন নামক শারিরীক শাস্তির একটি অনুশীলনের জন্য এখনও ব্যাথা করছে। এই যন্ত্রণাটা তার আগেরকার জীবনের যন্ত্রণার সাথেই তুলনীয়, ওপাস দাই তাকে তখনও সেই জীবন থেকে তুলে আনেনি।

 

এখনও সেইসব স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

 

তোমার ঘৃণাকে ছেড়ে দাও, সাইলাস নিজেকে আদেশ করলো। তোমার বিরুদ্ধে যারা এসে যাবে, তাদেরকে মাফ করে দিও।

 

সেন্ট সালপিচের পাথরের টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে, সাইলাসের মনে পড়ে গেলো অতিপরিত একটা দৃশ্যের কথা … যে আচরণের কারণে অনেক অনেক আগে তাকে জেলখানায় বন্দী করা হয়েছিলো, সেটা ছিলো তার তরুণ বয়সে। আত্মশুদ্ধির স্মৃতিটা তার মনে একটা ঝড় বয়ে আসার মতো করে আসলো…পচা, সোঁদা-সোঁদা গন্ধ, মৃত্যুর বিভীষিকা, মানুষের প্রস্রাবের। হতাশার কান্না, আছুঁড়ে পড়তো পিরেনিজর বাতাসের ওপর।

 

এনদোরা, সে ভাবলো, অনুভব করলো তার পেশীগুলো আড়ষ্ট হয়ে আছে।

 

অবিশ্বাস্যভাবে, সেটা ছিলো স্পেন আর ফ্রান্সের মাঝখানে নিষিদ্ধ একটা এলাকাতে, পাথরের নির্জন সেলে বসে কান্নাকাটি করতে করতে মরে যেতে চাইতো শুধু, সেই সাইলাসকে রক্ষা করা হয়েছিলো।

 

সেই সময়ে সে এটা বুঝতে পারে নাই।

 

বজ্রপাতের পরপরই আলোটা এসেছিলো।

 

তখন তার নাম সাইলাস ছিলো না, যদিও সে তার বাবা-মার দেয়া নামেও নিজেকে পরিচয় দিতো না। সাত বছর বয়সে বাড়ি ছেড়েছিলো সে। তার মদ্যপ বাবা, জাহাজঘাটার একজন নগন্য শ্রমিক ছিল, ধবল একটি সন্তানকে দুনিয়ার আলো দেখানোর দায়ে তার মাকে প্রায় প্রতিদিনই রেগেমেগে নির্যাতন করতো। সন্তানের এরকম অবস্থার জন্য তাকে দায়ী করতো। যখন ছোট্ট সাইলাস মাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতো, তখন তাকেও বেদম মারা হতো। একরাতে, ভয়ংঙ্কর মারপিট হলো। মারের চোটে তার মা আর উঠে দাঁড়াতে পারলো না। ছোট্ট ছেলেটা নিথর-নিস্তব্ধ মার পাশে দাড়িয়ে মার এই অবস্থার জন্য নিজেকে দায়ী মনে করলো।

 

এটা আমারই দোষ

 

যেনো এক ধরণের অশুভ শক্তি তার শরীরটা নিয়ন্ত্রণ করছিলো। ছেলেটা রান্নাঘরে গিয়ে একটা কসাইর ছুরি হাতে তুলে নিলো। সম্মােহিতভাবে সোজা চলে গেলো। শোবার ঘরে, যেখানে তার বাবা মাতাল হয়ে পড়ে আছে। কোন কথা না বলেই, ছেলেটা বাবার পিঠে কোপ বসালো। তার বাবা চিৎকার দিয়ে গুটি গুটি মেরে গড়াগড়ি খেতে লাগলো, কিন্তু ছেলে আবারো কোপ মারলো। বারবার মারলো, যতোক্ষণ পর্যন্ত না ঘরটা নিথর-নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।

 

ছেলেটা বাড়ি ছাড়লো কিন্তু মার্সেইর পথঘাটকেও একই রকম শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে পেলো সে। রাস্তাঘাটের অন্যান্য ঘর পালানো ছেলের দল তার অদ্ভুত চেহারার জন্য তাকে একঘরে করে রাখতো। তখন বাধ্য হয়েই একটা ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার ভূগর্ভস্থ ঘরে আশ্রয় নিলো সে, জাহাজঘাটার ফেলে দেয়া ফলমূল আর কাঁচা মাছ খেতো। তার একমাত্র সঙ্গী ছিলো আবর্জনায় ফেলে দেয়া পরিত্যাক্ত ম্যাগাজিন। নিজে নিজেই সে ওগুলো পড়তে শিখেছিলো। পরে খুব শক্ত-সামর্থ্য এক মানুষে পরিণত হলো সে। যখন তার বয়স বারো তখন আরেকজন ঘরপালানো ভবঘুরে—তার দ্বিগুণ বয়সের একটা মেয়ে-পথে-ঘাটে তাকে পরিহাস করতো শুধু আর তার খাবার চুরি করার চেষ্টা করতো। একদিন মেয়েটা নিজেকে আবিষ্কার করলো। ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায়। কর্তৃপক্ষ যখন ছেলেটাকে মেয়েটার উপর থেকে টেনে তুললো, তখন তারা তাকে আলটিমেটাম দিয়ে দিলো–মার্সেই ছাড়ো নয়তো কিশোর জেলখানায় যেতে হবে।

 

ছেলেটা তুইলোর উপকূলের দিকে চলে গেলো। সময়ের পরিবর্তনে, যে ছেলেটা পথঘাটের করুণার পাত্র ছিলো, সে-ই হয়ে উঠলো ভীতিকর এক চরিত্রে। ছেলেটা প্রচণ্ড শক্তির এক যুবক হিসেবে বেড়ে উঠলো। যখন লোকজন তার পাশ দিয়ে যেতো, সে শুনতে পেতো, তারা একে অন্যকে ফিস্ ফিস্ করে বলছে, একটা ভূত, তার শাদা চামড়ার দিকে তাকিয়ে তাদের চোখ ভয়ে গোল গোল হয়ে যেতো। একটা ভূত, শয়তানের মতো চোখ!

 

আর সেও নিজেকে ভূত মনে করতে শুরু করলো…স্বচ্ছ…সমুদ্রতীর থেকে সমুদ্রতীরে ভেসে বেড়ানো।

 

মনে হতো মানুষজন তার শরীরের ভেতর দিয়ে সব কিছু দেখতে পেতো।

 

আঠারো বছর বয়সে, এক বন্দর শহরে, একটা কার্গো থেকে শূয়োরের মাংসের টিনের কৌটা চুরি করবার চেষ্টা করলে দুজন খালাসি তাকে ধরে ফেললো। যে দুজন খালাসি তাকে মারতে শুরু করলো তাদের মুখ থেকে সে বিয়ারের গন্ধ পেয়েছিলো, যেমনটা তার বাবার মুখ থেকে পেতো। ঘৃণা এবং ভয়ের স্মৃতি তার ভেতর থেকে এমনভাবে উঠে এলো যেমন করে সুপ্ত অবস্থায় থেকে কোন দানব জেগে ওঠে। সেই যুবকটা একজন খালাসির ঘাড় মটকে দিলো খালি হাতেই, আর একই পরিণতি থেকে অন্য খালাসিটাকে পুলিশ এসে বাঁচাতে পেরেছিলো কোনমতে।

 

দুমাস পরে, শেকল পড়া অবস্থায়, সে এনডোরার একটা বন্দীশালায় এসে পৌঁছালো।

 

তুমি ভূতের মতোই শাদা, প্রহরীরা যখন তাকে পাহাড়া দিতো তখন তার সঙ্গীরা ঠাট্টাচ্ছলে এ কথা বলতো। তাকে ন্যাংটো করে ঠাণ্ডা শীতে রাখা হতো। মিরা এন এসপেত্রো! সম্ভবত ভূতটা এই দেয়াল ভেদ করে যেতে পারবে।

 

বারো বছর বয়স থেকেই সে তার আত্মা এবং শরীরকে ভূতুরেই মনে করতে শুরু করেছিলো। ভাবতে শুরু করেছিলো সে স্বচ্ছ কাঁচে মতো হয়ে গেছে।

 

আমি ভূত।

 

আমি ওজনহীন।

 

ইয়ো সোয় এসপেকত্রো…পালিদো কোমো উন ফ্যানতাসমা…কামিনাদো এতে মুন্দো এ সালাম, এক রাতে ভূতটা তার সহ-বন্দীদের চিৎকারে ঘুম থেকে উঠে গেলো। সে জানতো না, সে যে ফ্লোরে ঘুমিয়ে আছে, সেটা কোন অদৃশ্য শক্তিতে থর থর করে কাঁপছে। কোন মহা শক্তিশালী হাত পাথরের সেলটাকে কাঁপাচ্ছে। কিন্তু লাফ। দিয়ে দাঁড়াতেই যে জায়গাটাতে সে ঘুমিয়ে ছিলো সেখানে একটা বিশাল শৈলখণ্ড এসে আছড়ে পড়লো। সে দেখতে পেলো দেয়ালটাতে একটা বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, আর সেই গর্ত দিয়ে সে দৃশ্যটা দেখতে পেলো, সেটা বিগত দশ বছর ধরে সে দেখেনি। একটা চাদ। মাটিটা যখন কাঁপছিলো, তখন ভূতটা একটা সরু টানেলের গিরিখাদে এসে পড়লো। জায়গাটা ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত। সারাটা রাত ধরে সে ছুটে চললো নিচের দিকে, প্রচণ্ড ক্ষুধার আর ক্লান্তিকর ছিলো ব্যাপারটা।

 

সম্বিত ফিরে পেতেই সে নিজেকে আবিষ্কার করলো বনের মধ্যে বুক চিড়ে চলে যাওয়া রেললাইনের পাশে। রেললাইন ধরে সে ছুটে চললো যেনো সে স্বপ্ন দেখছে। একটা খালি মালবাহি গাড়ি দেখতে পেলে হামগুড়ি দিয়ে সেটার কাছে গেলো, ওটার ভেতরে আশ্রয় নিলো একটু বিশ্রামের জন্য। জেগে উঠে দেখতে পেলো ট্রেনটা চলছে। কততক্ষণ? কতো দূরে? তীব্র যন্ত্রণা বোধ হলো তার। আমি মারা যাচ্ছি? সে আবারো। ঘুমিয়ে পড়লো। এবার তার ঘুম ভাঙলো অন্য কারোর ডাকাডাকিতে, চড় থাপড়ে, তাকে তুলে মালবাহি গাড়ি থেকে ফেলে দেয়া হলো। ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়, রক্তমাখা শরীরটা নিয়ে সে একটা ছোট্ট গ্রামের বাইরে খাবারের আশায় ঘুর ঘুর করতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত তার শরীরটা এভোটা দুর্বল হয়ে গেলো যে, আর এক পা-ও এগোতে পারলো না। পথের পাশে অচেতন হয়ে পড়ে গেলো সে।

 

আলোটা এসেছিলো ধীরে ধীরে। ভূতটা অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো কততক্ষণ ধরে সে মরে পড়ে আছে। একদিন? তিনদিন? তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। তার বিছানাটা এতো নরম ছিলো যেনো সেটা মেঘের মতো কিছু। তার চার পাশের বাতাসটা ছিলো খুবই মিষ্টি আর মোমবাতিতে ভরা ছিলো পুরো ঘরটা। যিশুও সেখানে ছিলেন, তাঁর দিকে তাকিয়ে। আমি এখানে আছি, যিশু বললেন। পাথর গড়িয়ে পড়ে তোমার নতুন এক জন্ম দিয়ে গেছে।

 

সে জেগে উঠে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। তার চিন্তাভাবনা ধোয়াচ্ছন্ন হয়ে রইলো। সে কখনও স্বর্গে বিশ্বাস করতো না, তারপরও যিশু তার দিকে চেয়ে আছে। তাকে দেখাশোনা করছে। তার বিছানার পাশে খাবার রাখা ছিলো। ভূত সেটা উদর পূর্তি করলো। তার মনে হলো খাবারগুলো তার শরীরে পুষ্ট হয়ে হাড়ে হাড়ে মাংস তৈরি করছে। সে বার বার ঘুমিয়ে পড়তো। যখন সে জেগে উঠলো, তখনও যিশুর মুখে হাসি লেগেই আছে। তিনি কথা বললেন। তুমি বেঁচে গেছে, বাছা। যে আমার পথ অনুসরণ করে সে-ই আশীর্বাদ পায়।

 

আবারো সে ঘুমিয়ে পড়লো।

 

একটা যন্ত্রণাকাতর চিৎকারে ভুতটা তার ঘর ছেড়ে বাইরে বেড়িয়ে এলো। চিৎকারটা যেখান থেকে এসেছিলো সেখানে ছুটে গেলো সে। একটা রান্নাঘরে ঢুকে দেখতে পেলো বিশাল দেহের এক লোক ছোটোখাটো একজনকে প্রহার করছে। কোন কিছু না জেনেই ভুতটা বিশালদেহী লোকটাকে জাপটে ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো। লোকটা তার হাত থেকে ছুটে পালালো। ভুতটা দাড়িয়ে রইলো পাদ্রীর দড়ি পড়া একজন যুবকের নিথর দেহের পাশে। পাদ্রীর নাকটা একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। ভূতটা তাকে তুলে নিয়ে একটা সোফায় শোয়ালো।

 

ধন্যবাদ তোমাকে, আমার বন্ধু, পাদ্রী ভাঙাভাঙা ফরাসিতে তাকে বললো। দানের টাকা-পয়সা চোর-বাটপারের কাছে বেশি লোভনীয়। তুমি ঘুমের মধ্যে ফরাসিতে কথা বলছিলে। তুমি কি স্পেনিশে কথা বলতে জাননা?

 

ভূতটা মাথা নাড়ালো।

 

তোমার নাম কি? ভাঙা ভাঙা ফরাসিতেই বললেন।

 

ভূতটা তার বাবা-মার দেয়া নামটা কোনভাবেই মনে করতে পারলো না। সে শুধু জেলের প্রহরীরা তাকে যে নামে ডাকতো তা-ই শুনেছে।

 

পাদ্রী মুচকি হাসলেন। নো হেই প্রবলেমা। আমার নাম ম্যানুয়েল আরিঙ্গাবোসা। আমি মাদ্রিদের একজন মিশনারি। আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছে ওরা দ্য ডিওর জন্য একটা গীর্জা বানাতে।

 

আমি কোথায় আছি? তার কণ্ঠটা ভীতিকর শোনালো।

 

অভিদোতে। স্পেনের উত্তরে।

 

এখানে আমি কিভাবে এলাম?

 

তোমাকে কেউ একজন আমার দরজার সামনে ফেলে রেখে গিয়েছিলো। তুমি খুব অসুস্থ ছিলে। আমি তোমাকে খাইয়েছি। তুমি এখানে অনেকদিন ধরেই আছে।

 

ভূতটা তার যুবক রক্ষাকর্তার দিকে তাকালো। অনেক বছর যাবত কেউ তার প্রতি এরকম দয়া দেখায়নি। ধন্যবাদ, ফাদার।

 

পাদ্রী তার রক্তাক্ত ঠোঁটটা স্পর্শ করলো। আমিই তোমাকে ধন্যবাদ দেই, বন্ধু আমার।

 

যখন ভূতটা সকালে ঘুম থেকে উঠলো, তখন তার দুনিয়াটা স্পষ্ট হয়ে গেলো। সে তার বিছানার উপর থাকা কুশটার দিকে তাকালো। যদিও এটা তার সাথে কোন কথাই বলেনি তবুও তার মনে হলো এটার উপস্থিতিতে তার এক ধরনের আরাম বোধ হচ্ছে। উঠে বসে দেখে তার বিছানার পাশে একটা দৈনিক সংবাদপত্র রাখা আছে, সে খুব। অবাক হলো। লেখাটা ফরাসিতে ছিলো, এক সপ্তাহের পুরনো। যখন সে গল্পটা পড়লো, শিউরে উঠলো। এতে বলা আছে, একটা প্রচণ্ড ভূমিকম্পে পাহাড়ের পাদদেশের বন্দীশালা ধবংস হয়ে গেছে আর অনেক বিপজ্জনক কয়েদী পালিয়েছে। তার বুক ধরফর করতে লাগলো।পাদ্রী জানে আমি কে? তার যে ধরনের আবেগের সৃষ্টি হলো, সেটা এর আগে আর হয়নি। লজ্জা। অপরাধবোধ। তার সাথে ধরা পড়ার ভয়। সে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠলো। কোথায় পালাবো আমি?

 

বুক অব এক্টস্, দরজার দিক থেকে কণ্ঠটা বললো। ভূতটা ঘুরে দেখে ভয় পেয়ে গেলো।

 

তরুণ পাদ্রীটি ঘরে ঢুকলো হাসতে হাসতে। তাঁর নাক খুব বাজেভাবে ব্যান্ডেজ করা। তাঁর হাতে একটা পুরনো বাইবেল। আমি ফরাসিতে একটা বাইবেল খুঁজে পেয়েছি, তোমার জন্য। অধ্যায়গুলোতে দাগ দেয়া আছে।

 

অনিশ্চয়তা বোধ থেকেই ভূতটা বাইবেল হাতে তুলে নিয়ে পাদ্রীর দাগ দেয়া অধ্যায়গুলোর দিকে তাকালো।

 

এক্টস ১৬।

 

পংক্তিটাতে বলা আছে সাইলাস নামের এক বন্দীর কথা যাকে নগ্ন করে সেলের ভেতরে ফেলে নির্যাতন করা হয়েছিলো। সে ঈশ্বরের স্তবক গাইছিলো। যখন ভূতটা ২৬ নাম্বার পংক্তিতে পৌঁছালো, সে আতকে উঠলো।

 

…আর হঠাৎ করেই, সেখানে একটা প্রবল ভূমিকম্প হলো, তাতে বন্দীশালার ভিতটা কেঁপে উঠলো আর ভেঙ্গে পড়লো সবগুলো দরজা।

 

তার চোখ পাদ্রীর দিকে নিক্ষিপ্ত হলো।

 

পাদ্রী একটা উষ্ণ হাসি দিলেন। এখন থেকে, বন্ধু, যদি তোমার অন্য কোন নাম থেকে থাকে, আমি তোমাকে সাইলাস নামেই ডাকবো।

 

ভূতটা মাথা নাড়লো। সাইলাস। তাকে রক্ত-মাংসের শরীর দেয়া হলো। আমার নাম সাইলাস।

 

নাস্তা খাবার সময় হয়ে গেছে, পাদ্রী বললেন, যদি তুমি আমাকে এই গীর্জাটা বানাতে সাহায্য করো তবে তোমার খুব শক্তির দরকার রয়েছে।

 

 

 

ভূমধ্য সাগর থেকে বিশ হাজার ফুট উঁচুতে, আলিতালিয়ার ১৬১৮ বিমানটা, শূন্যে একটু ঝাকি খেলে যাত্রীরা ঘাবড়ে গেলো। বিশপ আরিঙ্গাবোসা এগুলো লক্ষ্যই করলেন না। তার চিন্তাভাবনা ছিলো ওপাস দাইর ভবিষ্যত নিয়ে। তিনি জানতে উদগ্রীব ছিলেন প্যারিসের কাজটা কতোটুকু হলো, তার ইচ্ছে হলো সাইলাসকে একটা ফোন করতে। কিন্তু তিনি তা করলেন না। টিচার নিজে সেটা দেখছেন।

 

এটা তোমার নিজের নিরাপত্তার জন্য, টিচার ব্যাখ্যা করেছিলেন। ফরাসি টানে ইংরেজিতে বলেছিলেন, আমি বেশ ভালো করেই জানি কীভাবে ইলেক্ট্রনিক যোগাযোগের যন্ত্রগুলো ইন্টারসেপ্ট করা হয়। ফলাফলটা তোমার জন্য খুবই ধ্বংসাত্মক হতে পারে।

 

আরিঙ্গাবোসা জানতেন তিনি ঠিকই বলেছেন। টিচার হলেন খুবই সর্তক একজন মানুষ। তিনি আরিঙ্গারোসার কাছে নিজের পরিচয় দেননি, আর তিনি নিজেও প্রমাণ করেছেন যে, তিনি একজন বিশ্বস্ত লোক। হাজার হোক, তিনি খুবই গোপন একটা জিনিস জানেন। ভ্রাতৃ সংঘের শীর্ষ চার ব্যক্তির নাম! এজন্যেই বিশপের কাছে টিচারের এতো সমাদর।

 

বিশপ, টিচার তাঁকে বলেছিলেন, আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। আমার পরিকল্পনা সফল করার জন্য আপনি অবশ্যই সাইলাসকে কয়েক দিনের জন্য আমার সাথে যোগাযোগ করার অনুমতি দেবেন। সে যেনো আমার কাছেই জবাবদিহি করে। আপনারা দুজন সেই সময়টাতে কোন কথা বলবেন না। আমি তার সাথে খুবই নিরাপদ চ্যানেল ব্যবহার করে যোগাযোগ করবো।

 

আপনি তার সঙ্গে সম্মানের সাথে ব্যবহার করবেন?

 

একজন বিশ্বাসী মানুষ তো সর্বোচ্চ সম্মানই আশা করে।

 

চমৎকার। বুঝতে পেরেছি। এটা শেষ হওয়ার আগে সাইলাস এবং আমি কথা বলবো না।

 

এটা আমি করবো আপনার পরিচয়টা রক্ষা করার জন্য। সাইলাসের পরিচয় এবং আমার বিনিয়োগ রক্ষা করতেও এর প্রয়োজন রয়েছে।

 

আপনার বিনিয়োগ?

 

বিশপ, যদি আপনার অতিরিক্ত কৌতূহল আপনাকে জেলে ভরে ফেলে তবে তো, আপনি আর আমার পারিশ্রমিকটা দিতে পারবেন না।

 

বিশপ হাসলেন। চমৎকার যুক্তি। আমাদের দুজনের আকাঙ্খ একই, ঈশ্বরের জন্যই আমরা কাজ করি।

 

বিশ মিলিয়ন ইউরো, বিশপ ভাবলেন, প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। অঙ্কটা ইউএস ডলারের প্রায় সমপরিমাণ। খুব শক্তিশালী হবার জন্য যথার্থই বটে।

 

তাঁর মনে হলো সাইলাস এবং টিচার ব্যর্থ হবে না। টাকা এবং বিশ্বাস খুবই শক্তিশালী জিনিস।

 

 

 

 

 

০২. উঁয়ে প্লাঁসোইতোরি নিউমেরিক

উঁয়ে প্লাঁসোইতোরি নিউমেরিক? বিবর্ণ মুখে ফশে অবিশ্বাসে সোফির দিকে চেয়ে আছে। একটা ঠাট্টা? সনিয়ের কোডের ব্যাপারে আপনার পেশাগত মূল্যায়ন হলো, এটা একধরনের গাণিতিক ঠাট্টা?

 

ফশে এই মেয়েটার ধৃষ্টতায় বিস্মিত। তার অনুমতি ছাড়া সে এইমাত্র এখানে এসে যা করছে শুধু সেটাই নয়, বরং মেয়েটা এখন তাকে এই বলে বিশ্বাস করতে বলছে যে, সনিয়ে তার অন্তিম মুহূর্তে একটা গাণিতিক প্রহেলিকা রেখে গেছেন?

 

এই কোডটা, সোফি ফরাসিতে দ্রুত বলে গেলো, একেবারেই অর্থহীন একটা জিনিস। জ্যাক সনিয়ে অবশ্যই জেনে থাকবেন যে, আমরা খুব দ্রুতই এখানে এসে এটা এভাবেই দেখবো। সে সোয়েটারের পকেট থেকে একটা দোমড়ানো কাগজ বের করে ফশের হাতে তুলে দিলো। এখানেই এটার পাঠোদ্ধারের বিষয়টা আছে।

 

ফশে লেখাটার দিকে তাকালো।

 

১-১-২-৩-৫-৮-১৩-২১

 

এই? সে ফুঁসে উঠলো। আপনি কেবল সংখ্যাগুলো ছোট থেকে বড়তে সাজিয়েছেন।

 

সোফির নার্ভ খুব শক্ত, সে একটা সম্ভষ্ট হবার হাসি দিলো। একদম ঠিক। ফশে বিড়বিড় করে আপন মনে বকতে শুরু করলো।

 

এজেন্ট নেভু, আপনি এসব নিয়ে কতদূর যাবেন, সে ব্যাপারে আমার কোন ধারণাই নেই, তবে আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি, ওখানে খুব দ্রুত যান। সে ল্যাংডনের দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকালো। সে কানে ফোনটা চেপে অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে। ল্যাংডনের ফ্যাঁকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে, ফশে আঁচ করতে পারলো খবরটা খারাপই হবে।

 

ক্যাপ্টেইন, সোফি বললো, তার কণ্ঠ বিপজ্জনকভাবেই উদ্ধত। আপনার হাতে যে সংখ্যাগুলো আছে সেটা খুবই বিখ্যাত আর ঐতিহাসিক একটা সখ্যক্রম।

 

ফশে এ ব্যাপারে সচেতন ছিলো না যে, পৃথিবীতে কোন সংখ্যাক্রম বিখ্যাত হয়ে থাকতে পারে। সে সোফির কথাটা পাত্তাই দিলো না।

 

এটা ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রম, সোফি জানালো, ফশের হাতে ধরে থাকা কাগজটার দিকে মাথা নেড়ে ইঙ্গিত করলো সে। এটা এমন একটি সংখ্যাক্রম, যার পূর্বের দুটি সংখ্যার যোগ ফল হলো তৃতীয় সংখ্যাটির সমান।

 

ফশে সংখ্যাগুলো ভালো করে দেখে নিলো। কথাটা সত্যি। তারপরেও সে বুঝতে পারলো না, এর সাথে সনিয়ের মৃত্যুর সম্পর্ক কী।

 

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে গণিতশাস্ত্রবিদ লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি এই সংখ্যাক্রম তৈরি করেছিলেন। নিশ্চিতভাবে সনিয়ের লেখা সংখ্যাগুলোর সবটাই ফিবোনাচ্চি সংখ্যা হওয়টা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয়।

 

ফশে তরুণীর দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলো। চমক্কার, যদি এটা কাকতালীয় ব্যাপার না-ই হয়ে থাকে, তাহলে আপনি কি আমায় বলবেন, কেন জ্যাক সনিয়ে এটা বেছে নিলেন। তিনি কি বলতে চাচ্ছেন? এটার মানেই বা কি?

 

মেয়েটা কাঁধ ঝাঁকালো। একেবারে কিছুই না। এটাই হলো আসল কথা। এটা খুব সরল একটা ক্রিপটোগ্রাফিক জোক। অনেকটা বিখ্যাত কোন কবিতার কিছু শব্দ নিয়ে, সেগুলো এলোমেলো করে মিশিয়ে, কাউকে খুঁজে বের করতে বলা।

 

ফশে খুবই আক্রমনাত্মকভাবে কয়েক পা সামনে এগিয়ে গেলো। সোফির চেহারা থেকে তার মুখটা মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। আমি নিশ্চিত করেই আশা করি যে, এসবের চেয়ে আরো ভালো ব্যাখ্যা আপনি আমাকে দেবেন।

 

ক্যাপ্টেনের এভাবে সামনে ঝুকে আসাতে সোফির নরম চেহারাটা বিস্ময়ে হতবাক হলো। ক্যাপটেন, আজরাতের এখানকার যে বিপদ সেটা বিবেচনা করুন, আমার মনে হচ্ছে, আপনি এটা জেনে বিশ্বাস করবেন যে, জ্যাক সনিয়ে আপনার সাথে হয়তো খেলা খেলছেন। আসলে তা নয়। আমি ক্রিপটোগ্রাফির পরিচালককে জানিয়ে দেবো, আপনার আর আমাদেরকে প্রয়োজন নেই।

 

এটা বলেই সে যে পথ দিয়ে এসেছিলো সেদিকে ঘুরে চলে গেলো।

 

হতবাক হয়ে ফুশে চেয়ে চেয়ে দেখে মেয়েটা অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেলো। মেয়েটার কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো? সোফি নেভু এইমাত্র যা করলো তা আর কিছু না, স্রেফ লো সুইসাইড প্রফেশনাল।

 

ফশে ল্যাংডনের দিকে ঘুরে দেখলো সে এখনও ফোনে কথা শুনেই যাচ্ছে, আগের চেয়েও বেশি মনোযোগী আর চিন্তিত মনে হলো তাকে। খুব মনোযোগ দিয়েই সে ফোনের মেসেজটা শুনে যাচ্ছে। ইউ এস এ্যামবাসি। বেজু ফশে অনেক কিছুই ঘৃণা করে…কিন্তু ইউএস এ্যামবাসির ওপর তার যতোটা রাগ ততোটা খুব কম জিনিসের ওপরই।

 

ফশে এবং এ্যামবাসেডর নিয়মিতই একে অপরকে মোকাবেলা করে থাকে পররাষ্ট্রবিষয়ক কিছু বিষয় নিয়ে তাদের সবচাইতে সাধারণ যুদ্ধটা বাঁধে ফ্রান্সে আগত আমেরিকানদের সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচরণ নিয়ে। প্রায় প্রতিদিনই, ডিসিপিজে আমেরিকান ছাত্রদেরকে মাদকসহ গ্রেফতার করে থাকে। আমেরিকান ব্যবসায়ীরা অল্পবয়স্কা পতিতাসহ এবং আমেরিকান পর্যটকরা দোকান থেকে চুরির দায়ে অথবা ভাঙচুরের জন্য গ্রেফতার হয়ে থাকে। বৈধভাবেই ইউএস এ্যামবাসি অভিযুক্ত নাগরিকদেরকে নিজের দেশে বিচারের জন্য পাঠিয়ে দেয়, যেখানে তাদেরকে একটা থাপ্পর মারা ছাড়া আর কিছুই করা হয় না।

 

আর এই কাজটা এ্যামবাসি বিরামহীনভাবেই করে থাকে।

 

লো মাসকুলেশন দ্য লা পুলিশ জুডিশিয়ার, ফশে একে এভাবেই অভিহিত করে থাকে। প্যারিস ম্যাচ সম্প্রতি একটা কার্টুন ছেপেছে, যাতে ফশেকে পুলিশের কুত্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে, কুত্তাটা এক আমেরিকানকে কামড়াতে চেষ্টা করছে, কিন্তু তার শেকল ইউএস এ্যামবাসিতে বাধা, তাই সে কামড়াতে পারছে না।

 

আজ রাতে আর সেটা হচ্ছে না, ফশে মনে মনে বললো। অনেক বড় বিপদে পড়েছে আজকে।

 

রবার্ট ল্যাংডন ফোনটা রেখে দিলো। তাকে খুব অসুস্থ দেখাচ্ছে।

 

সবকিছু কি ঠিক আছে? ফলে জিজ্ঞেস করলো।

 

ক্লান্ত ভঙ্গীতে ল্যাংডন মাথা নাড়লো।

 

দেশ থেকে খারাপ খবর এসেছে, ফশে অনুমান করলো, খেয়াল করে দেখলো ল্যাংডন ঘামছে।

 

একটা দুর্ঘটনা, ল্যাংডন ফশের দিকে অদ্ভুত ভঙ্গীতে তাকিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বললো, এক বন্ধু… সে একটু ইতস্তত করলো। সকালের প্রথমই দিকেই আমাকে দেশের ফ্লাইটটা ধরতে হবে।

 

ল্যাংডনের চেহারায় যে অভিব্যক্তি দেখা যাচ্ছে সেটা যে সত্যি, সে ব্যাপারে ফশের কোন সন্দেহ ছিলো না। তার পরও, তার কাছে মনে হলো ল্যাংডনের মনে অন্য কিছুও আছে, যেনো একটা দূরবর্তী ভয় আমেরিকানটার চোখে মুখে জেঁকে বসেছে। খবরটা শুনে আমি দুঃখিত, ল্যাংডনকে খুব ভালো করে দেখে কশে বললো। আপনি কি একটু বসবেন? সে গ্যালারির একটা ভিউয়িং বেঞ্চের দিকে ইঙ্গিত করে বললো।

 

ল্যাংডন উদাসভাবে মাথা নেড়ে কয়েক ফিট দূরের একটা বেঞ্চের কাছে গিয়ে একটু থামলো। প্রতিটি মুহূর্তে তাকে আরো বেশি দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে। আসলে, আমার মনে হচ্ছে বিশ্রামঘরটা একটু ব্যবহার করি।

 

ফশে ভুরু তুললো একটু। বিশ্রাম ঘর। অবশ্যই। ঠিক আছে, কয়েক মিনিটের বিরতি নেয়া যাক তবে। সে বিশ্রাম ঘরটার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলো। বিশ্রাম ঘটা কিউরেটরের অফিসের ঠিক পেছন দিকেই।

 

ল্যাংডন একটু ইতস্তত করলো। অন্যদিকে ইঙ্গিত করে দেখালো, গ্যালারির করি ডোরের দিকে। আমার মনে হয় আরো কাছ একটা বিশ্রামঘর আছে, ওখানে।

 

ফশে বুঝতে পারলো ল্যাংডন ঠিকই বলছে। গ্র্যান্ড গ্যালারির শেষ মাথায় দুটো বিশ্রামঘর আছে। আমি কি আপনার সাথে আসবো?

 

ল্যাংডন মাথা নেড়ে সায় দিয়ে রওনা দিতে উদ্যত হলো। না, তার আর দরকার নেই। আমার মনে হয়, আমার কয়েক মিনিট একা থাকা দরকার।

 

ল্যাংডনের একা চলে যাওয়াতে ফশে তেমন চিন্তিত হলো না। কারণ, সে জানে ল্যাংডন এখান থেকে কোনভাবেই বের হতে পারবে না সবগুলো ফটকেই পাহাড়া বসানো আছে। এমনকি ফায়ার-স্কেপ সিঁড়িগুলোও নজরে রাখা আছে। ডিসিপিজের এজেন্টরা ভেতরে, বাইরে, চারদিকেই আছে। ল্যাংডন ফশেকে ফাঁকি দিয়ে কোথাও যেতে পারবে না। এটা একেবারেই অসম্ভব।

 

আমাকে মি. সনিয়ের অফিসে ফিরে যেতে হচ্ছে কিছুক্ষণের জন্য। ফশে বললো। দয়া করে সেখানেই সোজা চলে আসুন, মি. ল্যাংডন। আমাদের আরো অনেক ব্যাপারে কথা বলার দরকার রয়েছে।

 

ল্যাংডন নিরবে চলে গেলো অন্ধকারের মধ্যেই।

 

ল্যাংডন চলে যেতেই ফশে রেগে ফেটে পড়লো। গ্র্যান্ড গ্যালারির সনিয়ের অফিসটা এখন কমান্ডসেন্টার, সেখানে ধুম করে ঢুকে পড়লো সে।

 

সোফি নেভুকে এই বিল্ডিংয়ে ঢোকার অনুমতি কে দিয়েছে! ফশে দাঁতে দাঁত চেপে বললো।

 

কোলেই প্রথমে জবাব দিলো, সে বাইরের গার্ডদের বলেছিলো যে, সে কোডটার অর্থ বের করে ফেলেছে।

 

ফশে চারপাশটা এক ঝলক তাকিয়ে দেখলো। সে কি চলে গেছে?

 

সে আপনার সাথে নেই?

 

না, সে চলে গেছে। ফশে অন্ধকার হলওয়ের দিকে তাকালো। সোফির এমন কোন স্বভাব নেই যে, যাবার পথে অন্য অফিসারদের সাথে গল্পগুজব কবে, কথা বলবে। তার ইচ্ছে হচ্ছিলো নিচের গর্দভদের ওয়্যারলেস করে বলবে সোফিকে আটকাতে। কিন্তু এই চিন্তাটা বাদ দিলো ফশে। আজরাতে ইতিমধ্যেই সে অনেক উল্টাপাল্টা করে ফেলেছে।

 

এজেন্ট নেভুর সাথে পরে খেলা যাবে, মনে মনে বললো সে। মেয়েটাকে গুলি করতে ইচ্ছে হচ্ছিলো তার।

 

সোফিকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে, ফশে কয়েক মুহূর্ত সনিয়ের ডেস্কে রাখা নাইট মূর্তিটার দিকে তাকালো, তারপর কোলেতের দিকে ফিরলো। তাকে পেয়েছো?

 

কোলেত একটা ইতিবাচক ভঙ্গী করে ল্যাপটপ কম্পিউটারটা তার দিকে ঘুরিয়ে দিলো। লাল বিন্দুটা এই ভবনের মানচিত্রের একটা জায়গায় পরিষ্কার বিপ করছে। যে ঘরটাতে সেটা জ্বলছে সেটাতে পাবলিক টয়লেট লেখা।

 

বেশ, একটা সিগারেট ধরিয়ে ফশে বললো, আমাকে একটা ফোন করতে হবে। আর ল্যাংডন যেনো শুধুমাত্র বিশ্রাম ঘরেই যেতে পারে সেটা একদম নিশ্চিত করে রেখো। অন্য কোথাও যেনো সে না যেতে পারে।

 

 

 

১২.

 

গ্র্যান্ড গ্যালারির শেষ মাথায় পৌঁছে রবার্ট ল্যাংডনের মনে হলো তার মাথাটা, একেবারে হালকা হয়ে গেছে। সোফির ফোন মেসেজটা তার মাথায় বার বার বাজতে লাগলো। করিডোরের শেষ মাথায়, জ্বলজ্বলে একটা সাইনে বিশ্রামঘরের আন্তর্জাতিক একটা প্রতীক আঁকা আছে, সে একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেলো সেটার দিকে। বিশ্রামঘরটা ইতালিয়ান চিত্রের সারি সারি ক্যানভাসের এক ফাঁকে যেনো লুকিয়ে আছে।

 

পুরুষের চিহ্ন দেয়া দরজাটা খুঁজে ল্যাংডন ভেতরে প্রবেশ করেই বাতি জ্বালালো।

 

ঘরটা খালি।

 

সিঙ্কের কাছে গিয়ে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে সে মুখে ঝাঁপটা দিলো। ঘোরটা কাটাতে চেষ্টা করলো। কড়া ফুরোসেন্টের আলো চচ্চকে টাইলসে জ্বলজ্বল করছে। ঘরটাতে এমোনিয়ার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছতেই ঘরের দরজাটা খট করে খুলে গেলে খুব চমকে গেলো সে।

 

সোফি নেভু ঢুকলো। তার সবুজ চোখে ভয়ের আভা। ধন্যবাদ ঈশ্বরকে, আপনি এসেছেন। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই।

 

ল্যাংডন সিঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে ডিসিপিজের ক্রিপ্টোগ্রাফার সোফি নেভুর দিকে বিস্ময়ে চেয়ে আছে।

 

মাত্র মিনিটখানেক আগে ল্যাংডন ফোনে তার মেসেজাটা শুনেছে। ভাবছিলো এই ক্রিপ্টোগ্রাফার ভদ্রমহিলা নির্ঘাত পাগল। তারপর যতোই সোফি নেভুর কথা সে শুনছে, ততোই তার মনে হচ্ছে মেয়েটা সততার সাথেই কথা বলছে। এই মেসেজটা শুনে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। ঠাণ্ডা মাথায় গুধ গুনে যান। আপনি এখন বিপদে আছেন। আমার কথা মনোেযোগ দিয়ে শুনুন।

 

অনিশ্চয়তা বোধ করলেও, ল্যাংডন সিদ্ধান্ত নিলো সোফি যা বলবে ঠিক তা-ই করবে। সে ফশেকে বলেছে যে, ফোনের মেসেজটা তার নিজের দেশের একজন আহত বন্ধুর পাঠানো। তাকে দেশে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। তারপর সে বিশ্রামঘর ব্যবহার করার কথা বলেছে, যেটা গ্যালারির শেষ প্রান্তে অবস্থিত।

 

সোফি এখন তার সামনে দাড়িয়ে আছে, তার শ্বাস প্রশ্বাস এখনও দ্রুত চলছে। অনেকটা পথ ঘুরে এখানে আসতে হয়েছে তাকে। ফুরোসেন্ট লাইটে ল্যাংডন দেখলো সোফির মুখটা বেশ নরম। সে অবাকই হলো বলা যায়। শুধুমাত্র তার চোখটা তীক্ষ্ম। আর সেটা যেনো রেনোয়র একাধিক লেয়ারে আঁকা ঐন্দ্রজালিক একটা মুখচ্ছবি… আড়াল করা কিন্তু স্বতন্ত্র এক ধরনের ঢেকে থাকা রহস্য আর সাহসিকতাপূর্ণ।

 

আমি আপনাকে সাবধান করে দিতে চাই, মি. ল্যাংডন… সোফি বলতে শুরু করলো, এখনও তার নিঃশ্বাস দ্রুত পড়ছে, আপনি এখন সু সারভিলেন্স ক্যাচির অধীনে আছেন। কথাগুলো যখন বলছিলো তখন তার উচ্চারিত শব্দগুলো প্রতিধ্বনি হলো।

 

কিন্তু…কেন? ল্যাংডন জানতে চাইলো। সোফি ইতিমধ্যেই তাকে ফোনে একটা ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু কথাটা সে সোফির মুখ থেকেই শুনতে চায়।

 

কারণ, কয়েক পা সামনে এগিয়ে এসে সে বললো। এই হত্যাকাণ্ডে ফশের প্রাথমিক সন্দেহভাঁজন হলেন আপনি।

 

ল্যাংডন কথাটা শুনে অবিশ্বাসে তাকালো, তারপরও কথাটা তার কাছে খুব হাস্যকর শোনালো। সোফির মতে, ল্যাংডনকে আজ রাতে লুভরে ডেকে আনা হয়েছে একজন সিম্বোলজিস্ট হিসেবে নয়, বরং একজন সন্দেহভাঁজন হিসেবে। তাকে বর্তমানে ডিসিপিজের কাছে জনপ্রিয় পদ্ধতি সারভিলেন্স ক্যাচির আওতায় রাখা হয়েছে এক ধরনের ধোকাবাজি, পুলিশ এই পদ্ধতিটা ব্যবহার করে সন্দেহভাঁজনকে অপরাধ সংঘটিত স্থানে নিয়ে এসে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে, যাতে সন্দেহভাঁজন ব্যক্তি নার্ভাস হয়ে ভুলবশত কিছু করে ফেলে, আর জালে আঁটকা পড়ে যায়।

 

আপনার জ্যাকেটের বাম দিকের পকেটে দেখুন, সোফি বললো। আপনি প্রমাণ পাবেন, তারা আপনাকে নজরে রেখেছে।

 

ল্যাংডন বুঝতে পারলো তার উদ্বিগ্নতা বাড়ছে। আমার পকেটে দেখবো? শুনে মনে হচ্ছে এক ধরনের সত্তা যাদুর কৌশল।

 

একটু দেখুন।

 

অনিচ্ছা সত্ত্বেও, ল্যাংডন তার জ্যাকেটের পকেটে হাত দিলো—এই পকেটটা সে কখনই ব্যবহার করে না। ভেতরে কিছুই খুঁজে পেলো না। কি আর আশা করতে পারো তুমি? সে একটু ভাবলো, হয়তো সোফি পাগলই হয়ে গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই হাতে একটা কিছুর নাগাল পেলো, একেবারেই অপ্রত্যাশিত। জিনিসটা ছোট্ট আর শক্ত। তার আঙ্গুলে ওটার স্পর্শ লাগলো। ল্যাংডন সেটা বের করে এনে দেখলো, দারুণ বিস্মিত হলো সে। একটা ধাতব জিনিস। বোতামের মতো কিছু, অনেকটা হাতঘড়ির ব্যাটারির মতো দেখতে। আগে কখনও দেখেনি সে। এটা কি….?

 

জিপিএস ট্র্যাকিং ডট, সোফি বললো, বিরামহীনভাবেই এটা নিজের অবস্থান সম্পর্কে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য দিয়ে থাকে, আর ডিসিপিজে সেটা মনিটরিংও করতে পারে। আমরা এটা লোকজনের অবস্থান জানার কাজে ব্যবহার করে থাকি। এই পৃথিবীর যে কোন জায়গা, এমনকি দুই ফিটের মতো জায়গাও এটা চিহ্নিত করতে পারে। এ দিয়ে তারা আপনাকে নজরদাড়ি করছে। যে এজেন্ট লোকটা আপনাকে হোটেল থেকে তুলে এনেছে, সে-ই এই জিনিসটা আপনার পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

 

ল্যাংডন হোটেল ঘরের কথাটা স্মরণ করলো…তার দ্রুত গোসল করা, পোশাক পরা, ডিসিপিজের এজেন্ট ঘর থেকে বের হবার সময় তার টুইড জ্যাকেটটা হাতে নিয়ে ছিলো। বাইরে খুব ঠাণ্ডা, মি. ল্যাংডন, এজেন্ট লোকটা তাকে বলেছিলো। প্যারিসের বসন্ত শুধু গানেরই হয় না। ল্যাংডন তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে জ্যাকেটটা পরে নিয়েছিলো।

 

সোফির অলিভ রঙের চোখের চাহনীটা খুবই প্রখর। আমি আপনাকে এই জিনিসটার ব্যাপারে আগে সতর্ক করিনি, কারণ আমি চাইনি আপনি ফশের সামনেই আপনার পকেট হাতড়ে বেড়ান। আপনি যে এটা খুঁজে পেয়েছেন সেটা যেনো সে না জানে।

 

ল্যাংডন কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে সে সম্পর্কে কোন ধারণাই তার ছিলো না।

 

তারা আপনার সাথে জিপিএস লাগিয়ে দিয়েছে, কারণ তারা ভেবেছে, আপনি পালাতে পারেন। সোফি একটু থামলো। সত্যি বলতে কী, তারা আশা করছে আপনি পালাবেন ; এতে তাদের কেটা খুব শক্ত হবে।

 

আমি পালাবো কেন! ল্যাংডন জানতে চাইলো। আমি নির্দোষ!

 

ফশে কিন্তু অন্য কিছু মনে করছে।

 

রেগে মেগে ল্যাংডন ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ডটটা ফেলতে উদ্যত হলো।

 

না! সোফি তার হাতটা টেনে ধরে তাকে থামালো।

 

পকেটেই রাখুন। এটা ফেলে দিলে সিগনালটা থেমে যাবে, তখন তারা বুঝতে পারবে আপনি জিনিসটা খুঁজে পেয়েছেন। ফশে আপনাকে একা ছেড়েছে, তার কাণ সে আপনার অবস্থানটা মনিটরিং করতে পারছে। যদি সে জেনে যায় যে, আপনি এটা ধরে ফেলেছেন, তবে যা করবে… সোফি কথাটা শেষ করলো না। জিনিসটা তার পকেটেই আবার ঢুকিয়ে দিলো। এটা আপনার সাথেই থাকুক। অন্তত পক্ষে কিছুক্ষণের জন্য।

 

ল্যাংডন আশাহত হলো। ফশে কী করে বিশ্বাস করতে পারলো যে, আমি জ্যাক সনিয়েকে খুন করেছি!

 

আপনাকে সন্দেহ করার কিছু সঙ্গত কারণও রয়েছে, কিছু জোড়ালো প্রমাণ আছে তার কাছে। সোফির মুখে একটা চিন্তার ছাপ দেখা গেলো। এখানে একটা ছোটখাটো প্রমাণ রয়েছে যা আপনি দেখেননি। ফশে সেটা খুব যত্ন সহকারে আপনার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে।

 

ল্যাংডন শুধু চেয়ে রইলো।

 

আপনি কি সনিয়ের লেখা তিনটি লাইন মনে করতে পারবেন, ফ্লোরের লেখাটা?

 

ল্যাংডন মাথা নাড়লো। সংখ্যা আর লেখাটা তার মনে ছাপা হয়ে গেছে।

 

সোফির কণ্ঠটা নিচুতে নেমে ফিসফিসানিতে পরিণত হলো। দূভাগ্যজনক কথা হলো, আপনি মেসেজটার পুরোটা দেখেননি। সেখানে চতুর্থ একটা লাইন ছিলো যা আপনি আসার আগেই ফশে ছবি তুলে রেখে মুছে ফেলেছে।

 

যদিও ল্যাংডন জানতো যে ওয়াটার-মার্কের কালি খুব সহজেই মুছে ফেলা যায় তবুও সে কল্পনাও করতে পারলো না, ফশে কেন সেটা করতে যাবে।

 

মেসেজটার শেষ লাইন, সোফি বললো, এমন কিছু ছিলো যা সে চায়নি আপনি দেখে ফেলেন। সে একটু থামলো। অন্তত পক্ষে, আপনার সাথে একটা মীমাংসা করার আগে তো নয়ই।

 

সোফি তার পকেট থেকে একটা কম্পিউটার প্রিন্টের ছবি বের করে সেটার ভাঁজ খুললো। ফশে এটা ক্রিপ্টোলজি ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়েছিলো যাতে সনিয়ের মেসেজটার মর্মোদ্ধার করা যায়। এটা হলো মেসেজটার পূর্ণাঙ্গ ছবি। সে ছবিটা ল্যাংডনকে দিলো।

 

অবাক চোখে, ল্যাংডন ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। ফ্লোরের মেসেজটার একটা ক্লোজ-আপ ছবি। শেষ লাইনটা ল্যাংডনকে এমনভাবে আঘাত করলো যেনো তার মাথায় কেউ প্রচণ্ড জোরে লাথি মেরেছে।

 

১৩-৩-২-২১-১-১-৮-৫

 

ওহ্, ড্রাকোনীয় শয়তান!

 

ও, ল্যাংড়া সেন্ট!

পি,এস, রবার্ট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করো।

 

 

 

১৩.

 

কয়েক সেকেন্ড ধরে ল্যাংডন অবাক দৃষ্টিতে সনিয়ের লেখার ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। পি এস, রবার্ট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করো। তার মনে হলো তার পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠছে। সনিয়ে আমার নাম উল্লেখ করে একটা মেসেজ রেখে গেছেন? সে দুঃস্বপ্নেও এটা ভাবে নাই, এরকমটি কেন হলো সেটা বুঝে উঠতেও পারছে না।

 

এখন আপনি বুঝতে পারছেন, সোফি বললো, তার চোখে তাড়া, কেন ফলে আপনাকে এখানে এনেছে, আর কেনইবা আপনি তার প্রাথমিক সন্দেহে আছেন?

 

ল্যাংডন এবার বুঝতে পারলো, যখন সে বলেছিলো সনিয়ে তাঁর খুনির নাম রেখে যেতে পারেন তখন কেন ফশে ওরকম আচরণ করেছিলো তার সাথে।

 

রবার্ট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করো।

 

সনিয়ে কেন এটা লিখবেন? ল্যাংডন জানতে চাইলো, তার হতাশা এখন রাগে পরিণত হলো। আমি কেন সনিয়েকে খুন করতে যাবো?

 

ফশে এখনও মোটিভটা ধরতে পারেনি, কিন্তু সে আজরাতে আপনার সাথে তার সমস্ত কথাবার্তা রেকর্ড করে ফেলেছে এই আশায়, যাতে আপনি কিছু উন্মোচিত করে ফেলেন।

 

ল্যাংডনের মুখ হা হয়ে গেলো, কোন কথা বললো না।

 

সে ছোট্ট একটা মাইক্রোফোন ফিট করেছে, সোফি ব্যাখ্যা করলো, তার পকেটে থাকা একটা ট্রান্সমিটারের সাথে সেটা সংযুক্ত, সেখান থেকে সমস্ত কথাবার্তা কমান্ড পোস্টে ট্রান্সমিট হয়েছে।

 

এটা অসম্ভব, ল্যাংডন চিৎকার করে উঠলো। আমার একজন এলিবাই আছে। আমি বক্তৃতা শেষ করে সরাসরি আমার হোটেলে ফিরে এসেছিলাম। আপনি হোটেলের ডেস্কে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।

 

ফশে ইতিমধ্যেই সেটা করেছে। তার রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, আপনি হোটেলের চাবি নিয়েছেন দশটা ত্রিশে, দূর্ভাগ্যজনকভাবে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় এগারোটার দিকে। আপনি খুব সহজেই, কাউকে না জানিয়ে, সবার নজর এড়িয়ে, সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারতেন।

 

এটা পাগালামী! ফশের কাছে কোন প্রমাণ নেই!

 

সোফির চোখ দুটো বড়বড় হয়ে গেলো যেননা সে বলতে চাচ্ছে : কোনো প্রমাণ নেই? মি. ল্যাংডন, আপনার নাম ফ্লোরে লেখা ছিলো, মৃতদেহের পাশেই। আর সনিয়ের ডেটবুকে লেখা ছিলো আপনি তার সাথে দেখা করবেন, ঠিক যে সময়টাতে তিনি খুন হয়েছেন সে সময়। সে একটু থামলো। আপনাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ফশের কাছে খুব বেশিই প্রমাণ আছে।

 

ল্যাংডনের হঠাৎ করেই মনে হলো যে, তার একজন আইজীবির দরকার। আমি একাজ করিনি।

 

সোফি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো। এটা আমেরিকান টেলিভিশন নয়, মি. ল্যাংডন। ফ্রান্সের আইন পুলিশকে রক্ষা করে, অপরাধীকে নয়। দূভাগ্যজনক হলেও এটা সত্যি যে, এই কেসের ব্যাপারে মিডিয়াও বেশ আগ্রহী থাকবে। জ্যাক সনিয়ে প্যারিসে খুবই সম্মানিত এবং শ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তি। তার হত্যার খবরটি প্রতিটি মিডিয়ায় সকালেই চাউড় হয়ে যাবে। ফশের ওপর খুব জলদিই একটা বিবৃতি দেবার জন্য চাপ থাকবে। আর সেক্ষেত্রে, তিনি তো একজন সন্দেহভাঁজনকে গ্রেফতার করতেই বেশি পছন্দ করবেন। সেটাইতো তার জন্য সবচাইতে ভালো হবে। আপনি অপরাধী হন বা না হন, ডিসিপিজে আপনাকে তাদের হেফাজতে রাখতে চাইবে ততোক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না তারা জানতে পারবে সত্যি কী ঘটেছিলো।

 

ল্যাংডনের মনে হলো সে খাঁচায় বন্দী একটা পশু। আপনি আমায় কেন এসব বলছেন?

 

কারণ, মি. ল্যাংডন, আমি বিশ্বাস করি আপনি নির্দোষ। সোফি তার চোখটা একটু নামিয়ে আবারো তার দিকে তাকালো। আর, আরেকটি কারণ হলো, আপনার এই বিপদের জন্য অংশত আমিও দায়ি।

 

কি বললেন? আপনি দায়ী?

 

সনিয়ে আপনাকে জড়াতে চাননি, ফাঁসাতেও চাননি। এটা একটা ভুল হয়ে গেছে। ফ্লোরের মেসেজটা আসলে আমার উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে!

 

ল্যাংডন কথাটা বুঝতে বেশ কিছুক্ষণ সময় নিলো, আমায় মাফ করবেন, কি বললেন?

 

মেসেজটা পুলিশের জন্য ছিলো না। তিনি ওটা আমার জন্য লিখেছেন। আমার মনে হয় কোন এক কারণে তিনি পুরো কাজটা খুব দ্রুত করেছেন, আর সেজন্যেই পুলিশের কাছে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে সেটা হয়তো তিনি খেয়াল করেননি। সে একটু থামলো। সংখ্যার কোডটা একেবারেই অর্থহীন। সনিয়ে এটা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন যে, এই কেসটায় যেনো একজন ক্রিপ্টোগ্রাফারকে জড়ানো হয়, আর সেই সূত্রে যাতে আমি জানতে পারি তাঁর কী হয়েছিলো।

 

ল্যাংডনের মাথায় কিছুই ঢুকলো না। তবে এটা সে বুঝতে পারলো যে, সোফি কেন তাকে বাঁচাতে চেষ্টা করছে। পি এস, রবার্ট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করো। সোফি বুঝতে পারছে, কিউরেটর যে লেখাটা রেখে গেছেন সেটা বুঝতে হলে ল্যাংডনের সাহায্য নিতে হবে। কিন্তু আপনি এটা কেন ভাবলেন যে, মেসেজটা আপনার জন্যই লেখা হয়েছে?

 

ভিটরুভিয়ান ম্যান, সোফি নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললো। লিওনার্দোর এই স্কেচটা সবসময়ই আমার খুব প্রিয়। তিনি এটা করেছেন আমার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য।

 

রাখেন, রাখেন। আপনি বলছেন কিউরেটর সাহেব জানতেন আপনার প্রিয় ছবি কী?

 

সোফি মাথা নেড়ে সায় দিলো। আমি দুঃখিত। জ্যাক সনিয়ে এবং আমি …।

 

সোফির কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেলো। ল্যাংডন আঁচ করতে পারলো, সোফি এবং সনিয়ে একটা বিশেষ সম্পর্কে জড়িত। তার সামনে দাঁড়ানো যুবতীটাকে সে ভালো করে দেখলো। খুবই সুন্দরী, আর সে এ ব্যাপারে বেশ জ্ঞাত ছিলো যে, ফ্রান্সে বয়স্ক লোকেরা প্রায়শই অল্পবয়স্কা তরুণী রক্ষিতা হিসেবে রেখে থাকে। তারপরও, সোফি নেভুকে এজন রক্ষিতা হিসেবে একদমই মনে হচ্ছে না।

 

দশ বছর ধরে আমাদের মধ্যে কোন যোগাযোগ নেই, সোফি বললো। তার কণ্ঠ এখন বেশ নিচু হয়ে গেছে। তারপর থেকে আমাদের মধ্যে খুব কমই কথা হয়েছে। আজরাতে ক্রিপ্টোগ্রাফি ডিপার্টমেন্ট থেকে আমি তাঁর ছবিটা দেখে বুঝতে পেরেছি, আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা তিনি করেছিলেন। আমার কাছে একটা মেসেজ পাঠানোর চেষ্টাও করেছেন তিনি।

 

ভিটাভিয়ান ম্যানের কারণেই?

 

হ্যাঁ। আর পি, এস অক্ষর দুটো।

 

পোস্ট স্ক্রিপ্ট?

 

সে মাথা ঝাঁকালো। পিএস আমার নামের আদ্যাক্ষর।

 

কিন্তু আপনার নাম তো সোফি নেভু।

 

তিনি আমাকে ডাকতেন প্রিন্সেস সোফি বলে। তার চেহারাটায় লাল একটা আভা দেখা গেলো। পি এস মানে প্রিন্সেস সোফি।

 

ল্যাংডন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না।

 

খুব ছেলেমানুষী শোনাচ্ছে, আমি জানি, সে বললো, কিন্তু অনেক বছর আগের কথা সেটা। তখন আমি খুব ছোট ছিলাম।

 

আপনি তাকে চিনতেন যখন আপনি খুব ছোট ছিলেন?

 

একদম তাই সোফি বললো, তার চোখ ছল-ছল করে উঠলো আবেগে। জ্যাক সনিয়ে আমার দাদু হোন।

 

 

 

১৪.

 

ল্যাংডন কোথায়? কমান্ড-পোস্টের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে ফশে জিজ্ঞেস করলো।

 

এখনও পুরুষ টয়লেটে আছে, স্যার। লেফটেনান্ট কোলেত প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

 

ফশে বেশ বিরক্ত হলো, সময় নিচ্ছে সে, বুঝেছি।

 

কোলেতের ঘাড়ের উপর দিয়ে ফশে ল্যাপটপের পর্দায় ডটটার ছবি দেখলো। সে ল্যাংডনের ব্যাপারে খোঁজ নিতে ওখানে যাবার জন্য চাপাচাপি করতে চাইলো। এরকম কাজে কাউকে বুঝতে দেয়া চলে না যে, তাকে চোখে চোখে রাখা হচ্ছে। ল্যাংডন নিজের ইচেয়ই ফিরে আসবে। ইতিমধ্যে দশমিনিট পার হয়ে গেছে।

 

খুব বেশি সময় নিচ্ছে।

 

ল্যাংডনের কি আমাদের চালাকিটা ধরে ফেলার কোন সম্ভাবনা আছে? ফশে জিজ্ঞেস করলো।

 

কোলে মাথা ঝাঁকালো। এখনও পুরুষ টয়লেটের ভেতরে নড়াচড়া করার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। তার মানে জিপিএস ডটটা নিশ্চিতভাবেই তার সাথে আছে। হয়তো সে খুব অসুস্থবোধ করছে। যদি ডটটা সে খুঁজে পেতো, তবে সেটা ফেলে দিয়ে পালাতে চেষ্টা করতো।

 

ফশে তার হাতঘড়িটা দেখে নিলো। চমৎকার। এখনও তাকে দেখে অস্থির মনে হচ্ছে। সারাটা সন্ধ্যা, কোলেত আঁচ করতে পেরেছে, তার ক্যাপ্টেনের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত দুঃশ্চিন্তা। সচরাচর নির্লিপ্ত আর দারুণ চাপের মধ্যেও ঠাণ্ডা মাথার ফশেকে আজ রাতে দেখে মনে হচ্ছে আবেগ তাড়িত, যেনো এই ব্যাপারটা যে কোনভাবেই হোক, তার ব্যক্তিগত একটি ব্যাপার। অবাক করার কিছু নেই, কোলেত ভাবলো। ফশের এই গ্রেফতারটি খুবই দরকার, দারুণভাবেই দরকার। সামপ্রতিক সময়ে বোর্ড অব মিনিস্টার এবং মিডিয়া ফশের আগ্রাসী কৌশলের জন্য সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে। তার সাথে বেশ কিছু শক্তিশালী এ্যামবাসির দ্বন্দ্ব আর নিজের ডিপার্টমেন্টে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে বাজেটও খুব বাড়িয়ে ফেলেছে। আজ রাতে, একটি অতি উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করে, স্বনামধন্য একজন আমেরিকানকে গ্রেফতার করার মধ্য দিয়ে ফশে তার সমালোচকদেরকে কিছু দিনের জন্য মুখ বন্ধ করে রাখতে পারবে, যা তার চাকরিটাকে বাঁচিয়ে দেবে। আর মাত্র কয়েক বছর পরই সে অবসরে চলে যাবে, সেই সাথে পাবে অবসরের আকর্ষণীয় ভাতা। সবটাই সে এই কাজের মধ্য দিয়ে সুরক্ষা করতে পারবে। ঈশ্বর জানেন, তার পেনশনটার খুবই দরকার, কোলেত ভাবলো। প্রযুক্তির ব্যাপারে ফশের অতি আগ্রহ পেশাগত এবং ব্যক্তিগতভাবে তার মর্মপীড়ার কারণ হয়েছে। আজরাতে, এখনও বেশ সময় হাতে রয়েছে। সোফি নেভুর অদ্ভুতভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করাটা যদিও দুঃখজনক, তবে সেটা খুব সামান্য ব্যাপারই। সে এখন চলে গেছে। আর ফশের কাছে খেলার জন্য এখনও কার্ড রয়েছে। সে এখনও ল্যাংডনকে জানায়নি যে, ফ্লোরের লেখার মধ্যে ল্যাংডনের নামও ছিলো। ভিকটিম নিজে সেটা লিখে গেছেন। পি, এস, রবার্ট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করো।

 

ক্যাপ্টেন? ডিসিপিজের এক এজেন্ট অফিস থেকে কল করলো। আমার মনে হয়, এই ফোনটা আপনার নেয়া দরকার। সে একটা ফোন হাতে ধরে রেখেছে। তাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে।

 

কে করেছে? ফশে জিজ্ঞেস করলো।

 

এজেন্ট চোখ কপালে তুলে বললো, ক্রিপ্টোলজি ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর।

 

কি?

 

সোফির ব্যাপারে, স্যার। মনে হচ্ছে একটা কিছু হয়েছে।

 

 

 

১৫.

 

সময় হয়ে গেছে।

 

কালো অদি গাড়িটা থেকে নামতেই নিজেকে সাইলাসের খুব শক্তিশালী মনে হলো। রাতের বাতাসে তার কোমরে আলগা করে বাঁধা দড়িটা নড়ছে। পরিবর্তনের বাতাস বইছে। সে জানে, তার সামনে যে কাজটি আছে তার জন্যে শক্তির চেয়ে বেশি চাতুর্যের প্রয়োজন। তাই তার পিস্তলটা গাড়িতেই রেখে এসেছে। থার্টিন রাউন্ড হেলার এবং কচ ইউএসপি ৪০ পিস্তলটা টিচার তাকে দিয়েছে।

 

ঈশ্বরের ঘরে কোন মারণাস্ত্রের স্থান নেই। বিশাল গীর্জাটার সামনের পাজাটা এই সময়ে একেবারেই ফাঁকা, সেন্ট সালপিচের দূরে, দৃশ্যত যে প্রাণীর চিহ্ন দেখা যাচ্ছে, তা হলো একজোড়া অল্প বয়স্কা পতিতা। পথঘাটের পর্যটকদেরকে নিজেদের সম্পদ দেখাচ্ছে। তাদের প্রাপ্তবয়স্ক শরীরটা সাইলাসের কাছে অতি চেনা মনে হলো। তার নিজের পাছার কথা মনে পড়ে গেলো। তার ঊরুতে বাধা কাটা তারের সিলিস বেল্টটা মাংস কেটে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, আর তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে।

 

আচমকা তার শারীরিক কামনা উথিত হলো। দশ বছর ধরে সাইলাস সব ধরনের যৌনকর্ম থেকে নিজেকে বিশ্বস্ততার সাথেই বিরত রেখেছে। এমনকি স্বমেহনও করেনি। দ্য ওয়ের জন্য। সে জানতো ওপাস দাইকে অনুসরণ করতে হলে তাকে আরো বড় আত্মত্যাগ করতে হবে। বিনিময়ে সে পাবে তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। ব্যক্তিগত সমস্ত সম্পদ আর ভোগকে বাদ দেয়ার একটা প্রতীজ্ঞা করেছে সে, এটাই তো আত্মত্যাগ। যে দারিদ্র থেকে সে উঠে এসেছে, আর যে যৌনতার শিকার সে জেলখানার ভেতরে হয়েছে, সেটা থেকে মুক্তি পেয়েছে সে।

 

এবার, গ্রেফতার হয়ে ফ্রান্সের এনডোরায় বন্দী হবার পর, এই প্রথম সে ফ্রান্সে আসলো। সাইলাসের মনে হলো, তার স্বদেশ তাকে পরীক্ষা করছে। তার আত্মা অতীত হিংস্রতার স্মৃতিতে আচ্ছন্ন হলো। তুমি নতুন জন্ম লাভ করেছে, সে নিজেকে আবারো সুধালো। ঈশ্বরের জন্য আজকে তার যে কাজ, তার জন্য একটি হত্যার প্রয়োজন রয়েছে। এটাও আত্মত্যাগ, সাইলাস জানতো সেটা।

 

যন্ত্রণা সহ্য করার পরিমাণই হলো তোমার বিশ্বাসের গভীরতা, টিচার তাকে এই কথাটা বলেছিলেন। যন্ত্রণার ব্যাপারে সাইলাস কোন আনাড়ি লোক না, আর সে এটা টিচারের কাছে প্রমাণ করবার জন্য মুখিয়ে ছিলো।

 

হাগো লা ওরা দি দিয়োস, চার্চের মূল প্রবেশদ্বারের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সাইলাস ফিসফিস করে বললো।

 

বিশাল দরজাটার সামনে এসে সাইলাস খুব গভীর একটা নিঃশ্বাস নিলো।

 

কি-স্টোনটা। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাবে। সে তার ভূতুরে সাদা হাতটা দিয়ে দরজায় তিনটা আঘাত করলো।

 

কিছুক্ষণ পর, বিশাল দরজাটার বোল্ট খুলতে শুরু করলো।

 

 

 

১৬.

 

সোফি ভাবতে লাগলো, সে যে এখান থেকে চলে যায়নি, সেটা বুঝতে ফশের কতোক্ষণ লাগতে পারে। ল্যাংডনকে খুব বেশি মাত্রায় ঘাবড়ে যেতে দেখে সোফি নিজেকে প্রশ্ন করলো, সে ল্যাংডনকে এই পুরুষ টয়লেটে নিয়ে এসে ভুল করেছে কিনা।

 

এছাড়া আমি আর কী-বা করতে পারতাম।

 

সোফি তার দাদুর মৃতদেহটার দৃশ্য কল্পনা করলো, নগ্ন এবং ঈগল পাখির মতো হাত-পা ছড়ানো। একটা সময় ছিলো, যখন তার দাদাই তার কাছে এই দুনিয়া ছিলো। তারপরও, সোফি খুব অবাক হলো যে, এই লোকটার জন্য তার কোন দুঃখবোধ হচ্ছে। না। জ্যাক সনিয়ে এখন তার কাছে একজন আগন্তুক। তাদের সম্পর্কটা মার্চের একরাতে, একটি মাত্র ঘটনায় আচমকাই উবে গিয়েছিলো। তখন সোফির বয়স ছিলো মাত্র বাইশ। দশ বছর আগের কথা। ইংল্যান্ডের গ্র্যাজুয়েট ইউনির্ভাসিটি থেকে কয়েক দিন আগেই বাড়ি ফিরে সোফি তার দাদুকে এমন কিছুতে জড়িত অবস্থায় দেখতে পায় যা তার কখনও দেখার কথা ছিলো না।

 

হায়, আমি যদি নিজ চোখে সেটা না দেখতাম…

 

লজ্জায় ঘৃণায় বিস্মিত হয়ে সোফি তার দাদুকে ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলো। নিজের জমাকৃত টাকা পয়সা নিয়ে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট ঠিক করে একজন বান্ধবীর সাথে বসবাস করতে শুরু করে দিলো। সোফি প্রতীজ্ঞা করেছিলো, যে দৃশ্য সে দেখেছে, সে সম্পর্কে কাউকে কোনদিন কিছুই বলবে না। তার দাদু তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। চিঠিপত্র আর কার্ড পাঠিয়ে বার বার অনুরোধ করে বলেছিলেন, সোফি যেনো একবার দেখা করে, যাতে তার কাছে ব্যাপারটা খুলে বলা যায়। কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? একবারই কেবল সোফি জবাব দিয়েছিলো তার সাথে কখনও কোন জায়গাতে যেননা তিনি দেখা না করেন, ফোন না করেন। সোফি বেশ ভীত ছিলো যে, ঘটনাটার ব্যাখ্যা ঘটনাটার চেয়েও বেশি ভয়ংকর হবে।

 

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, সনিয়ে কখনও সোফির ব্যাপারে হাল ছেড়ে দেননি। সোফি একটা বন্ধ করা ড্রয়ার নিয়ে দশ বছর কাটিয়ে দিয়েছে। তার দাদু তার অনুরোধ ঠিকই রক্ষা করেছিলেন, তাকে কখনও ফোন করেননি কিংবা চিঠিও লেখেননি।

 

কেবল আজকের সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত।

 

সোফি? সোফির এনসারিং মেশিনে তাঁর কণ্ঠস্বরটি অনেক বেশি বয়স্ক বলে মনে হয়েছিলো। আমি তোমার কথামতো দীর্ঘদিন যোগাযোগ করিনি, মেনে চলেছি তোমার নিষেধ, কিন্তু আজ তোমার সাথে আমার কথা বলতেই হবে। একটা ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে।

 

তার প্যারিসের ফ্ল্যাটের রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সোফি এতোগুলো বছর পর তার কণ্ঠটা শুনে খুব শীতল অনুভব করলো। তার নম্র কণ্ঠস্বরটা শুনে সোফির ছেলেবেলাকার ভক্তির স্মৃতিটা ফিরে এলো।

 

সোফি, দয়া করে আমার কথা শোনো। তিনি সোফির সাথে ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। সে যখন ছোট ছিলো তখন ঠিক এভাবেই তিনি কথা বলতেন। স্কুলে ফরাসি চর্চা করবে। বাড়িতে ইংরেজি। তুমি চিরতরের জন্য পাগল হতে পারো না। তুমি কি সেইসব চিঠিগুলো পড়ে দ্যাখোনি, যা আমি বিগত বছরগুলো ধরে লিখেছি? তুমি কি এখনও বুঝতে পারোনি? তিনি একটু থামলেন। এক্ষুনি আমাদেরকে কথা বলতে হবে। দয়া করে এবারের মতো তোমার দাদুর কথাটি রাখো। এক্ষুণি লুভরে ফোন করো আমায়। এক্ষুণি। আমার মনে হচ্ছে, তুমি আর আমি ভীষণ বিপদে পড়ে গেছি।

 

সোফি এনসারিং মেশিনের দিকে তাকিয়ে ছিলো। বিপদ? তিনি এসব কি বলছেন?

 

প্রিন্সেস… তার দাদুর কণ্ঠটা আবেগমথিত ছিলো, সোফি আর অটল থাকতে পারেনি। আমি জানি, আমি তোমার কাছ থেকে কিছু লুকিয়ে রেখেছি আর সেজন্যে আমি তোমার ভালবাসা হারিয়েছি। কিন্তু সেটা তোমার নিরাপত্তার জন্যই। এখন তুমি অবশ্যই সত্যটা জানতে পারবে। আমি তোমার পরিবার সম্পর্কে সত্য কথাটা বলবো।

 

সোফি হঠাৎ করেই তার নিজের মনের কথাটা শুনতে পেলো। আমার পরিবার? সোফির যখন চার বছর বয়স তখন তার বাবা-মা মারা গিয়েছিলো। তাদের গাড়িটা একটা সেতুর রেলিং ভেঙে খরস্রোতা নদীতে পড়ে গিয়েছিলো। তার দাদী এবং ছোট, ভাইটিও গাড়িতে ছিলো, হঠাৎ করেই সোফির পুরো পরিবারটা বিলীন হয়ে গেলো। সংবাদ পত্রের কিছু ক্লিপিংস সে রেখে দিয়েছে নিশ্চিত হবার জন্য।

 

তাঁর কথাগুলো সোফির হাড়ে অপ্রত্যাশিতভাবে কাঁপুনি লাগিয়ে দিয়েছিলো। আমার পরিবার! সোফির মনে পড়ে গেলো, ছোটবেলায় সে স্বপ্নে অসংখ্যবার একটা জিনিস দেখে ঘুম থেকে জেগে উঠতো : আমার পরিবার জীবিত আছে। তারা বাড়িতে ফিরে আসছে। কিন্তু মুহূর্তেই এই ভাবনাটা উবে যেতো।

 

তোমার পরিবার মারা গেছে সোফি। তারা আর ফিরে আসবে না।

 

সোফি… এন্সারিং মেশিনে তার দাদুর কণ্ঠটা বলছিলো। অনেক বছর ধরে আমি এই কথাটা তোমাকে বলার জন্য অপেক্ষা করে আছি। ঠিক মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু এখন সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমাকে লুভরে ফোন করো। যত দ্রুত সম্ভব। আমি এখানে সারা রাত অপেক্ষা করবো। আমার আশংকা, আমরা দুজনেই চরম বিপদে রয়েছি। তোমার অনেক কিছুই জানার দরকার।

 

মেসেজটা এইখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো।

 

নিরবে, সোফি নিশ্চল কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলো। তার দাদুর মেসেজটার মর্মার্থ সে অনুমান করার চেষ্টা করলো। একটাই সম্ভাবনা আছে, তার মনে হচ্ছিলো, এটা একটা, টোপ।

 

অবশ্যই, তার দাদু তাকে দেখার জন্য ব্যকুল হয়ে আছেন। আর সেজন্য তিনি সবকিছুই করতে পারেন। লোকটার ব্যাপারে তার ঘৃণা খুবই গভীর। সোফি ভাবলো, হয়তো তিনি মারাত্মক কোন অসুখে পড়েছেন, একেবারেই অন্তিম অবস্থা, আর ঠিক করেছেন যেভাবেই হোক একটা বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি সোফিকে তার কাছে নিয়ে আসবেন, এক নজর দেখার জন্যে। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে তিনি বুদ্ধিমানের মতোই কাজ করেছেন।

 

আমার পরিবার।

 

এখন, লুভরের পুরুষ টয়লেটের আঘো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সোফি সন্ধ্যাবেলার মেসেজটার প্রতিধ্বনি যেনো শুনতে পেলো। সোফি, আমরা হয়তো দুজনেই খুব বিপদে আছি। আমাকে ফোন করো।

 

সোফি ফোন করেনি। এমনকি সেটা করার কোন পরিকল্পনাও করেনি। এখন, তার সন্দেহটা খুব বড়সড় একটা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তার দাদু নিজের জাদুঘরে পড়ে আছেন। ফ্লোরে তিনি একটা কোডও লিখে গেছেন।

 

তার জন্য একটা কোড। এ ব্যাপারে, সে একদমই নিশ্চিত। যদিও মেসেজটার অর্থ সে বুঝতে পারছে না, তবুও সে নিশ্চিত, কথাগুলো তার জন্যই। সোফির ক্রিপ্টোগ্রাফি সম্পর্কে ছোটবেলা থেকে যে আগ্রহ ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিলো সেটা কার্যত জ্যাক সনিয়ের জন্য—কোডের ব্যাপারে তাঁর নিজে মারাত্মক রকমের আসক্তি ছিলো। বিশেষ করে ওয়ার্ডস গেমস এবং পাজল। কত রোববার আমরা সংবাদ পত্রের ক্রিপ্টোগ্রামস্ আর ক্রসওয়ার্ডস নিয়ে পার করে দিয়েছি?

 

বারো বছর বয়সে সোফি লা মদে পত্রিকার ক্রসওয়ার্ডস কারো সাহায্য ছাড়াই মেলাতে পারতো। তবে দাদু তাকে ইংরেজিতে ক্রসওয়ার্ডস, গাণিতিক পাজল আর সাবস্টিটিউশন সিফারে দক্ষ করে তুলেছিলেন। সোফি সবগুলোই ভালো পারতো। প্রকারান্তরে সোফি তার নেশাটাকে পেশায় রূপান্তর করে নিলো পুলিশ জুডিশিয়ারে একজন কোডব্রেকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার মধ্য দিয়ে।

 

আজরাতে, সোফির ক্রিপ্টোগ্রাফার সত্ত্বা তাকে বাধ্য করছে তার দাদুর সহজ সরল কোডটা দুজন আগন্তুককে এক সঙ্গে জুড়ে দেবার জন্য সোফি নেভু এবং রবার্ট ল্যাংডন।

 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন?

 

দুঃখের কথা হলো, ল্যাংডনের হতবাক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে সোফির মনে হলো এই আমেরিকানটাও তার চেয়ে বেশি কিছু জানে না, কেন তার দাদু তাদের দুজনকে একসঙ্গে, এরকম একটি ঘটনায় নিক্ষেপ করেছেন।

 

সে আবার বলতে শুরু করলো। আপনার সাথে আমার দাদুর আজ রাতে দেখা করার কথা ছিলো। কিসের জন্য?

 

ল্যাংডনকে সত্যি খুব কিংকর্তব্যবিমূঢ় মনে হলো। তার ব্যক্তিগত সচিব সাক্ষাতের ব্যবস্থাটা করেছিলো, আর এ ব্যাপারে সে কোন কারণও বলেনি। আমিও জিজ্ঞেস করিনি। আমার ধারণা, তিনি হয়তো শুনেছেন যে, আমি ফরাসি ক্যাথেড্রালের প্যাগান আইকনোগ্রাফি নিয়ে বক্তৃতা দেবো, সে ব্যাপারে হয়তো উনার আগ্রহ রয়েছে। আমি মনে করলাম, বক্তৃতার পর তার সাথে গল্পগুজব আর একটু পানাহার করাটা খুবই আনন্দদায়ক হবে।

 

সোফি এ কথাটা একদমই মানতে পারলো না। সংযোগটা একেবারেই যুক্তিহীন বলে মনে হচ্ছে। তার দাদু প্যাগান আইকননাগ্রাফি সম্পর্কে এ পৃথিবীর যে কোন লোকের চেয়ে বেশিই জানতেন। তার চেয়েও বড় কথা, তিনি একজন অসম্ভব রকমের অন্তর্মুখী ব্যক্তি ছিলেন, কোন গুরুত্বপূর্ণ কারণ না থাকলে, একজন আমেরিকানকে ডেকে এনে আড্ডা জুড়ে দেবেন, সেটা একেবারেই অসম্ভব।

 

সোফি একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে আবারো জানতে চাইলো। আমার দাদু আজ বিকেলে ফোন করে আমাকে বলেছিলেন যে, আমরা দুজনেই খুব বড় রকমের একটা বিপদে আছি। এটা কি আপনার কাছে কোন অর্থ বহন করে?

 

ল্যাংডনের নীল চোখ দুটো চিন্তার মেঘে ঢেকে গেলো। না, কিন্তু যা ঘটেছে সেটা বিবেচনা করলে…

 

সোফি মাথা নেড়ে সায় দিলো। আজরাতে যা ঘটেছে সেটা বিবেচনায় না নিলে সে খুব বোকা হিসেবেই প্রতীয়মান হবে। অন্যমনস্কভাবে হেটে বাথরুমের ছোট্ট একটা কাঁচের জানালার কাছে গেলো। সেখান থেকে বাইরে তাকালো, দেখলো জানালার কাঁচে এলার্ম টেপ লাগানো আছে। তারা অনেক উপরে আছেচল্লিশ ফুট উপরে।

 

দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সে প্যারিসের চমৎকার নৈসর্গিক দৃশ্যের দিকে তাকালো। বাম দিকে, সাইন নদীর ওপারে, জ্বলজ্বল করছে আইফেল টাওয়ার। আর ঠিক সোজাসুজি তাকালে, আর্ক দ্য ট্রায়াম্ফ। ডান দিকে ঢালু আর সুউচ্চ মতোয়ামাত্রে, গর্বিত সা কোয়েরের এরাবেস্কডাম-এর পালিশ করা সাদা পাথর দ্যুতি ছড়াচ্ছে পবিত্র আলোর মতো। এখানে ডেনন উইং-এর পশ্চিম মাথাটার কাছে প্লেস দু কারুজেল। লুভরের বাইরের দেয়ালটা শুধুমাত্র সরু একটা ফুটপাত দিয়ে সেই জায়গা থেকে পৃথক করা হয়েছে। নিচে, যথারীতি রাত্রিকালীন ট্রাকের সারি অলসভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সিগনালের অপেক্ষায় আছে তারা। তাদের বাতিগুলো মনে হচ্ছে টিপটিপ করে সোফির দিকে ঠাট্টাচ্ছলে তাকাচ্ছে।

 

আমি জানি না কী বলবো, ল্যাংডন বললো। সোফির পাশে এসে দাঁড়ালো সে। আপনার দাদু নিশ্চিতভাবেই আমাদেরকে কিছু বলতে চেষ্টা করেছেন। আমি দুঃখিত, আমি খুব কম সাহায্যেই আসতে পারছি।

 

সোফি জানালা থেকে ঘুরে দাঁড়ালো। বুঝতে পারলো ল্যাংডনের কণ্ঠে গভীর অনুশোচনাটা একেবারেই নিখাদ। তাকে নিয়ে এতো সমস্যা হবার পরও সে নিশ্চিতভাবেই চায় তাকে সাহায্য করতে। ডিসিপিজের সন্দেহের তালিকায় নিজের নামটি দেখেও এই শিক্ষাবিদ ব্যাপারটা পরিষ্কার বুঝতে পারছে না।

 

আমাদের দুজনের অবস্থাই একরকম, সে ভাবলো।

 

একজন কোডব্রেকার হিসেবে সোফি তার জীবিকা অর্জন করে আপাত অর্থহীন তথ্যের অর্থ বের করে। আজরাতে রবার্ট ল্যাংডনকে নিয়ে তার সবচাইতে ভালো অনুমান হলো, লোকটা জানুক আর না-ই জানুক, সে এমন কিছু জানে, যা সোফির খুবই জানা দরকার। প্রিন্সেস সোফিয়া, রবার্ট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করো।

 

তার দাদুর মেসেজটা এর চেয়ে আর কতোটা পরিষ্কার হতে পারতো? ল্যাংডনের সাথে সোফির আরো বেশি সময় দরকার ভাবার জন্য। এক সাথে এই রহস্যের ভেদ করতে সময় লাগবে। কিন্তু দুঃখজনক, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

 

ল্যাংডনের দিকে তাকিয়ে সোফি একটা জিনিসের কথাই শুধু ভাবতে পারলো। বেজু ফশে আপনাকে যেকোন সময়ে তার কাস্টডিতে নিয়ে নেবে। আমি আপনাকে এই জাদুঘর থেকে বের করতে পারি। কিন্তু আমাদের এখন একটু অভিনয় করতে হবে।

 

ল্যাংডনের চোখ দুটো বড় হয়ে গেলো। আপনি চাচ্ছেন আমি পালাই?

 

এটাই হবে আপনার জন্য সবচাইতে স্মার্ট কাজ। আপনি যদি ফশের কাছে ধরা দেন, তবে সে এক্ষুণি আপনাকে তার কাস্টডিতে নিয়ে নেবে। আপনাকে তখন কয়েক সপ্তাহ ফ্রান্সের জেলে কাটাতে হবে আর সেই সময়টাতে ডিসিপিজে এবং ইউএস এ্যামবাসি আপনার মামলাটা কোন্ কোর্টে হবে, সেটা নিয়ে লড়াই শুরু করে দেবে। কিন্তু, আপনি যদি এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে আপনার এ্যামবাসিতে চলে যেতে পারেন, তবে আপনার সরকার আপনার অধিকার রক্ষা করতে পারবে। তখন আপনি আর আমি প্রমাণ করতে পারবো যে, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই।

 

ল্যাংডনকে দেখে মনে হলো না, সে পুরোপুরি একমত হতে পেরেছে। ভুলে যান এটা! সবগুলো বের হবার দরজায় ফুশে সশস্ত্র পাহাড়া বসিয়েছে। তারপরও যদি আমরা কোন গুলি না খেয়ে পালিয়ে যেতে পারি, তবে আমরা অপরাধী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবো। আপনি ফশেকে বলুন যে, ফ্লোরের লেখা মেসেজটা আপনার জন্যই লেখা হয়েছে। আমার নামটা অভিযুক্তকারীর নাম হিসেবে লেখা হয়নি।

 

আমি সেটা করবো, সোফি বললো, খুব দ্রুত কথা বলছে সে, তবে সেটা তখনই, যখন আপনি ইউএস এ্যামবাসির ভেতরে নিরাপদে থাকবেন। সেটা এখান থেকে মাত্র এক মাইল দূরে। জাদুঘরের বাইরে আমার গাড়িটা পার্ক করা আছে। এখানে ফশের সাথে দেনদরবার করাটা খুব বেশি জুয়া খেলা হয়ে যাবে। আপনি কি সেটা বুঝতে পারছেন না? ফশে আজরাতে তার মিশন ঠিক করে ফেলেছে, আপনাকে অপরাধী প্রমাণ করবেই সে। আপনি যদি কিছু করে বসেন তবে তার কেসটা আরো শক্তিশালী হবে, এই আশাই সে করছে।

 

একদম ঠিক। যেমন পালিয়ে যাওয়া!

 

সোফির সোয়েটারের পকেটে থাকা সেলফোনটা হঠাৎ করে বেজে উঠলো। সম্ভবত ফশে। সে পকেটে হাত দিয়ে ফোনটা বন্ধ করে দিলো।

 

মি. ল্যাংডন, সে খুব হরবর করে বললো, আপনাকে আমি একটা শেষ প্রশ্ন করতে চাই। আর আপনার পুরো ভবিষ্যতটাই তার উপর নির্ভর করছে। ফ্লোরের লেখাটা একদম নিশ্চিত করে আপনার অপরাধের প্রমাণ নয়, তারপরও ফলে আমাদের পুরো টিমকে বলেছে যে, সে নিশ্চিত, আপনিই হলেন আসামী। আপনি কি এ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারেন, যা আপনাকে তার কাছে অপরাধী করতে পারে?

 

ল্যাংডন কয়েক সেকেন্ড নিরব রইলো।তেমন কিছুই তো মনে হচ্ছে না।

 

সোফি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এর অর্থ, ফশে মিথ্যে বলছে। কেন, সোফি সেটা ভাবতে পারলো না। সত্য হলো এই, বেজু ফশে আজ রাতে রবার্ট ল্যাংডনকে চৌদ্দ শিকে ভরবেই, যে করেই হোক। সোফির নিজের জন্যেও ল্যাংডনকে প্রয়োজন। আর এ জন্যেই তার কাছে একমাত্র যে যৌক্তিক ব্যাপারটা মনে আসছে, সেটা আরো বেশি প্রহেলিকাময়। ল্যাংডনকে ইউএস এ্যামবাসিতে পৌঁছে দেয়ার দরকার।

 

জানালার দিকে ঘুরে, সোফি কাঁচে লাগানো এলার্ম টেপটার দিকে তাকালো। সেখান থেকে নিচে তাকালো, চল্লিশ ফুট উচ্চতা হবে। এখান থেকে লাফ দেয়ার অর্থ ল্যাংডনের পা কয়েকটা জায়গায় ভেঙে যাওয়া। যাইহোক, সোফি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। রবার্ট ল্যাংডন লুভর থেকে পালাবেই, সে চাক আর না চাক।

 

 

 

১৭.

 

কোন জবাব দিচ্ছে না মানে? ফশেকে খুব সন্দেহপ্রবণ দেখাচ্ছে। তুমি তার সেল ফোনে ফোন করেছে, ঠিক? আমি জানি ওটা তার সাথেই আছে।

 

কোলে কয়েক মিনিট ধরেই সোফির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছে। হয়তো তার ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে গেছে। অথবা রিংটোন বন্ধ করে রেখেছে।

 

ক্রিপ্টোলজির পরিচালকের সাথে ফোনে কথা বলার পর থেকেই ফলশকে খুব অস্থির দেখাচ্ছে। ফোনটা রেখেই সে কোলেতের কাছে এসে এজেন্ট নেভুকে ফোন করে তাকে দিতে বললো কিন্তু কোলেত লাইন দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফশেকে দেখে মনে হলো খাঁচায় বন্দী একটা সিংহ পায়চারী করছে।

 

ক্রিপ্টো থেকে কেন ফোন করা হয়েছিলো? কোলেত এবার জানতে চাইলো।

 

ফশে তার দিকে তাকালো। এটা বলতে যে, ড্রাকোনীয় শয়তান আর ল্যাংড়া সেন্ট-এর ব্যাপারে তারা কিছু খুঁজে পায়নি।

 

এই?

 

না, তারা আরো বলেছে, এইমাত্র সংখ্যাগুলোকে তারা ফিবোনাচ্চি সংখ্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে পেরেছে। কিন্তু তাদের সন্দেহ এটা একেবারেই অর্থহীন একটা জিনিস।

 

কোলেতকে দ্বিধাগ্রস্ত দেখালো। কিন্তু তারা তো ইতিমধ্যে এজেন্ট নেভুকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছে।

 

ফশে মাথা নাড়লো। তারা নেভুকে পাঠায়নি। কি?

 

ডিরেক্টরের মতে, আমার নির্দেশে তিনি তার পুরো দলটিকে আমার পাঠানো ছবিগুলো বিশ্লেষণে লাগিয়ে দেন। এজেন্ট নেভু ওখানে আসার পর সনিয়ের একটা ছবি আর কোডটা নিয়ে কোন কথা না বলেই অফিস থেকে বেড়িয়ে যায়। ডিরেক্টর বলেছেন, তিনি সোফিকে তার আচরণের ব্যাপারে কোন প্রশ্ন করেননি, কারণ ছবিগুলো দেখে সোফি সঙ্গত কারণেই ভেঙে পড়েছিলো।

 

ভেঙে পড়েছিলো? সে কি কখনও মৃতদেহের ছবি দেখেনি?

 

ফশে কিছুক্ষণ নিরব রইলো, এ ব্যাপারটা কেউই জানতো না, যতক্ষণ না সহকর্মীদের একজন ডিরেক্টরকে জানিয়েছিলো যে, আসলে জ্যাক সনিয়ে সোফি নেভুর দাদা হোন।

 

কোলেত বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো।

 

ডিরেক্টর বলেছেন, সোফি একবারও বলেনি যে জ্যাক সনিয়ে তার দাদা হোন, আর তাঁর মতে এটা এজন্যে যে, সোফি তার বিখ্যাত দাদার কথা বলে কোন ধরনের বাড়তি সুবিধা পেতে চায়নি।

 

ছবি দেখে ভেঙে পড়েছিলো তাতে অবাক হবার কিছু নেই। কোলেত কখনও কল্পনাও করতে পারেনি যে, কাউকে একদিন একটা কোডের মর্মোদ্ধার করতে বলা হবে তারই নিকট আত্মীয়ের হত্যাকাণ্ডের পর, ভিকটিমের নিজের লেখা সেই কোড। তারপরও সোফির আচরণ বেখাপ্পা মনে হচ্ছে। কিন্তু সে তো নিশ্চিতভাবেই সংখ্যাগুলো ফিবোনাচ্চি সংখ্যা হিসেবে চিহ্নিত করে আমাদের কাছে এসে বলে গেছে। আমি বুঝতে পারছি না, কেন সে অফিসের কাউকে সেই কথাটা না বলে অফিস থেকে বের হয়ে গেলো।

 

কোলেত এই রকম ঘটনার একটা ব্যাখ্যার কথাই ভাবতে পারছে আর তা হলো, সনিয়ে এই আশায় ফ্লোরে একটা সংখ্যাগত কোড লিখেছেন যাতে ফশে একজন ক্রিপ্টোগ্রাফারকে এই ঘটনায় যুক্ত করে, আর এভাবেই তার নিজের নাতনী জড়িত হয়ে যাবে। আর বাকী লেখাগুলো তার নাতনীর কাছে দেয়া এক ধরনের মেসেজ ছাড়া আর কী? কিন্তু এতে ল্যাংডনকে কিভাবে মেলানো যায়?

 

কোলেত এর চেয়ে বেশি ভাবোর আগেই, ফাঁকা জাদুঘরটা এলামের আওয়াজে কেঁপে উঠলো। মনে হলো এলার্মটা গ্র্যান্ড গ্যালারির ভেতর থেকে আসছে।

 

এলার্মে! একজন এজেন্ট চিৎকার করে বললো। তার চোখ ভরের সিকিউরিটি সেন্টারের দিকে। গ্যালারি তয়লেত, মেঁসিয়ে!

 

ফশে কোলেতের দিকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালো। ল্যাংডন কোথায়?

 

এখনও পুরুষ টয়লেটেই আছে! কোলেত ল্যাপটপের পর্দায় লাল বিন্দুটার অবস্থানে দিকে ইঙ্গিত করে বললো, সে জানালার কাঁচ ভেঙেছে, নিশ্চিত! কোলেত জানতো ল্যাংডন বেশি দূরে যেতে পারবে না। যদিও প্যারিসের ফায়ার কোড অনুযায়ী পনেরো মিটার উঁচুতে অবস্থিত জানালার কাঁচ আগুন লাগলে ভাঙা যেতে পারে, তবে লুভরের দোতলা থেকে মই অথবা হুক ছাড়া নামার অর্থ হলো নির্ঘাত আত্মহত্যা করা। আরেকটি ব্যাপার, ডেনন উইংয়ের পশ্চিম দিকে কোন গাছ-পালা নেই এমনকি মাটিতে কোন ঘাসও নেই যে, পড়ে গেলে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যাবে। বিশ্রাম ঘরের জানালার নিচে দুই লেইন বিশিষ্ট প্লেস দু কারুজেল অবস্থিত।

 

হায় ঈশ্বর, পর্দার দিকে তাকিয়ে কোলেত চিৎকার করে বললো। ল্যাংডন জানালা দিয়ে লাফ দিয়েছে!

 

কিন্তু ফশে ইতিমধ্যেই তার কাজ শুরু করে দিয়েছে। তার ম্যানুরিন এম আর-৯৩ রিভলবারটা হাতে নিয়ে অফিস থেকে বেড়িয়ে গেছে।

 

কোলেত পর্দার দিকে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে চেয়ে আছে, তার চোখে বিস্ময়। লাল বিন্দুটা এই ভবনের বাইরে চলে গেছে। হচ্ছেটা কি? সে অবাক হলো। ল্যাংডন কি জানালা দিয়ে, নাকি–

 

হায় যিশু। লাল বিন্দটা লাফিয়ে লাফিয়ে দেয়াল অতিক্রম করে ফেললে কোলেত উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গেলো। সিগনালটা একটু থামলো, তারপর বিন্দুটা ভবনের বাইরে, প্রায় দশ গজ দূরে চলে গেলো।

 

তড়িঘড়ি করে কোলেত প্যারিসের রাস্তা-ঘাটের মানচিত্রটার জন্য কম্পিউটারে সার্চ করে জিপিএস সিস্টেমটা ঠিক করে নিলো। দৃশ্যটা একটু বড় করে সে বিন্দুটার একেবারে নিখুঁত অবস্থান দেখতে পেলো।

 

এটা আর নড়ছে না।

 

এটা এখন প্লেস দু কারুজেল-এর মাঝখানে থেমে আছে। ল্যাংডন ঝাঁপ দিয়ে…

 

 

 

১৮.

 

ফশে ঊর্ধ্বশ্বাসে গ্র্যান্ড গ্যালারির দিকে ছুটে চললো, কোলেতের রেডিওটা ঘরঘর করছে, কিন্তু এলার্মের শব্দে সেটা শোনা যাচ্ছে না।

 

সে ঝাঁপ দিয়েছে! কোলেত চিৎকার করে বলছে। আমি সিগনালটাকে প্লেস দু কারুজেলে দেখতে পাচ্ছি। বাথরুমের জানালার বাইরে! এটা একদমই নড়ছে না! হায় যিশু, আমার মনে হচ্ছে ল্যাংডন আত্মহত্যা করেছে, আর কিছু না।

 

ফশে কথাটা শুনতে পেলো, কিন্তু তার কাছে এগুলো কোন অর্থই বহন করছে না। সে দৌড়াতেই লাগলো। হলওয়েটা মনে হচ্ছে কখনও শেষ হবে না। সনিয়ের মৃতদেহটা দৌড়ে অতিক্রম করার সময় সে ডেনন উইংয়ের পার্টিশনের দিকে তাকালো। এলার্মটা আরো জোরে শোনা যাচ্ছে।

 

দাঁড়ান! রেডিওতে কোলেতের কণ্ঠটা চিৎকার করে বললো, সে নড়ছে! হায় ঈশ্বর, সে বেঁচে আছে। ল্যাংডন পালাচ্ছে!

 

ফশে দৌড়াতেই লাগলো, প্রতিটি পদক্ষেপে হলওয়ের দৈর্ঘ্যটা কমিয়ে আনছে সে।

 

ল্যাংডন খুব দ্রুত দৌড়াচ্ছে। কোলেত রেডিওতে চিৎকার করেই যাচ্ছে। সে কারুজেল দিয়ে দৌড়াচ্ছে। দাঁড়ান… সে খুব জোরে দৌড় শুরু করেছে। সে তো দেখি প্রচণ্ড দ্রুত দৌড়াচ্ছে।

 

পার্টিশনের দিকে আসতেই ফশে দেখতে পেলো বিশ্রাম ঘরের দরজাটা, সে ওদিকেই দৌড়ে গেলো।

 

এলার্মের শব্দে ওয়াকি-টকির কথা আর শোনা গেলো না। সে কোনও গাড়িতে চড়ে থাকবে! আমার মনে হয় সে গাড়িতেই আছে! আমি বলতে পারছি না–

 

ফশে প্রবল বেগে পুরুষ টয়লেটের ভেতরে অস্ত্র হাতে ঢুকতেই কোলেতের কথাগুলো এলামের আওয়াজ গিলে ফেললো। পুরো ঘরটা ভালো করে দেখে নিলো সে। ঘরটা একেবারেই ফাঁকা। বাথরুমও খালি। ফশের চোখ ঘরের ভাঙাচোরা জানালাটার দিকে গেলো। সে দৌড়ে জানালার কাছে গিয়ে নিচের দিকে তাকালো। ল্যাংডনকে কোথাও দেখা গেলো না। ফলে কোনভাবেই ভাবতে পারলো না, এ রকম ঝুঁকি কেউ নিয়ে থাকবে। নিশ্চিতভাবেই, কেউ যদি এখান থেকে লাফ দেয়, তবে মারাত্মকভাবে আহত হবে।

 

এলার্মটা বন্ধ করে দেয়া হলে ওয়াকিটকিতে কোলেতের কণ্ঠটা আবারো শোনা গেলো।

 

…দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে … খুব দ্রুত … পন দু কারুজেল দিয়ে সিন নদীটা পার হচ্ছে!

 

ফশে তার বাম দিকে ঘুরলো। পন দু কারুজেলের রাস্তায় একমাত্র যে যানবাহনটা আছে, সেটা হলো বিশাল বড় একটা টুইনবেড ডেলিভারি ট্রাক, লুভর থেকে দক্ষিণ দিকে চলে যাচ্ছে সেটা। ট্রাকের পেছনের খোলা ডালাটা ত্রিপল দিয়ে ঢাকা, একটা বিশাল হ্যামোক আছে সেখানে। ফশে খুব দ্রুতই বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। এই ট্রাকটা কিছুক্ষণ আগে বিশ্রামঘরের নিচে ট্রাফিক সিগনালের জন্য থেমে ছিলো।

 

একটা উন্মাদগ্রস্ত ঝুঁকি, ফশে আপন মনে বললো। ল্যাংডনের কোনভাবেই জানতে পারা কথা নয়, ত্রিপলের নিচে কী আছে। ট্রাকটা যদি স্টিল বহন করে থাকে তবে কি হবে? অথবা সিমেন্ট? কিংবা ময়লা আবর্জনা? চল্লিশ ফুট উঁচু থেকে ঝাঁপ দেয়া? একেবারেই পাগলামী।

 

ডটটা ঘুরে যাচ্ছে! কোলেত জানালো, পন দে সেন-পেরেজর দিকে যাচ্ছে!

 

ঠিক তা-ই, ট্রাকটা বৃজ অতিক্রম করে ধীরে ধীরে পন দে সেন-পেরেজর দিকে যাচ্ছে। তাই হোক, ফশে ভাবলো। কোলেত ইতিমধ্যেই ওয়্যারলেসের মাধ্যমে কয়েকজন এজেন্টকে লুভর থেকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাদেরকে প্যাট্রল গাড়িতে করে রাস্তায় টহল দিতে বলে দিয়েছে সে। এরই মধ্যে ট্রাকটার অবস্থান পরিবর্তিত হলো, যেনো ব্যাপারটা অদ্ভুত একটি চোর-পুলিশ খেলা।

 

খেলা শেষ হয়ে গেছে, ফশে জানতো। তার লোকজন মিনিট খানেকের মধ্যেই ট্রাকটা আঁটকে ফেলতে পারবে। ল্যাংডন কোথাও যেতে পারবে না।

 

অস্ত্রটা জায়গামতো রেখে ফশে বিশ্রামঘর থেকে বের হয়ে কোলেতকে ওয়্যারলেস করলো। আমার গাড়িটা নিয়ে আসতে বলো। গ্রেফতারের সময়টাতে আমি ওখানে থাকতে চাই।

 

ফশে গ্র্যান্ড গ্যালারি থেকে বের হতে হতে ভাবছিলো, ল্যাংডন যদি এখান থেকে লাফ দেয়ার পরও বেঁচে থাকে, তবে সেটা অবাক হবার মতোই ব্যাপার হবে।

 

এটা অবশ্য কোন ব্যাপার না।

 

ল্যাংডন পালিয়েছে, অভিযুক্ত হয়ে।

 

***

 

বিশ্রাম-ঘর থেকে মাত্র পনেরো গজ দূরেই ল্যাংডন আর সোফি গ্র্যান্ড গ্যালারির ছায়া ঢাকা জায়গাটাতে দাঁড়িয়েছিলো। ফশে বাথরুম থেকে বের হবার সময় তারা নিজেদেরকে খুব কষ্ট করে দৃষ্টির আড়ালে রাখতে পেরেছিলো। তার হাতে অস্ত্র ছিলো। হুরমুর করে বাথরুমে ঢুকেছিলো সে। শেষ ষাট সেকেন্ড সময়টা ছিলো ঘোরের মতো।

 

ল্যাংডন পুরুষ টয়লেটের ভেতরে দাঁড়িয়ে বার বার পালাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিলো। যে অপরাধ সে করেনি, সেই অপরাধ থেকে কেন সে পালাবে। যখন সোফি জানালার এলার্মটা পরীক্ষা করে নিচের দিকে তাকালো, তার ভাবসাব দেখে মনে হলো উপর থেকে লাফ দেবার হিসাব কষছে সে।

 

ছোট্ট একটা নিশানার সাহায্যে এখান থেকে আপনি বের হয়ে যেতে পারেন, সে বলেছিলো।

 

নিশানা? অস্বস্তি নিয়ে বিশ্রাম ঘরের জানালার দিকে তাকিয়েছিলো সে।

 

রাস্তায়, একটা বিশাল আকারের আঠারো চাকার ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে।

 

ট্রাকটার ডালায় বিশাল একটা ত্রিপল দিয়ে মালপত্রগুলো ঢেকে রাখা হয়েছে। ল্যাংডন আশা করলো সোফিকে দেখে যা মনে হচ্ছে সে যেনো তা না ভাবে। সোফি, আমি কোনভাবেই লাফ দিচ্ছি না–

 

ট্র্যাকিং ডটটা বের করুন।

 

হতবুদ্ধিকর ল্যাংডন তার পকেট হাতরাতে লাগলো। হাতরাতে হাতরাতে পেয়ে গেলো ছোট্ট ধাতব জিনিসটা। সোফি সেটা হাতে নিয়ে সিংকে রেখে দিলো। একটা টয়লেট সাবান নিয়ে সেটার মধ্যে ধাতব বস্তুটি চেপে ধরে রাখলো যতোক্ষণ না সেটা দেবে গিয়ে আঁটকে না গেলো।

 

সাবানটা ল্যাংডনের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে সোফি একটা ময়লা ফেলার ভারি ড্রাম টেনে এনে জানালার কাছে নিয়ে এলো। ল্যাংডন কোন কিছু বলার আগেই সেই ড্রামটা দিয়ে জানালায় আঘাত করে জানালার কাঁচ ভেঙে ফেললো।

 

এলার্মটা মাথার উপর প্রচণ্ড শব্দে বাজতে শুরু করলো।

 

সাবানটা আমার হাতে দিন। সোফি চিৎকার করে বললো, এলার্মের আওয়াজে কিছু শোনা যাচ্ছিলো না।

 

ল্যাংডন সাবানটা তার হাতে তুলে দিলো।

 

সাবানটা হাতে নিয়ে, সোফি ভাঙা জানালা দিয়ে নিচে দাড়িয়ে থাকা আঠারো চাকার গাড়িটার দিকে তাকালো। টার্গেটটা খুব বেশি বড় আকাড়ের আর সেটা বিল্ডিংটা থেকে দশ ফুটেরও কম দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাফিক বাতিটা পরিবর্তন হবার আগেই, সোফি গভীর একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সাবানটা ছুঁড়ে মারলো।

 

সাবানটা ট্রাকের উপর গিয়ে পড়ে সেটা ত্রিপলের মধ্যে আঁটকে রইলো। আর ট্রাফিক সিগনালের বাতিটা সবুজ রঙে আসতেই ট্রাকটা সাঁই করে চলে গেলো।

 

কগ্রাচুলেশনস্, দরজার দিকে তাকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে সোফি বললো। আপনি লুভর থেকে পালিয়ে গেলেন আর কী।

 

পুরুষ টয়লেট থেকে বের হয়েই তারা অন্ধকারে সরে পড়লো। ফশে খুব দ্রুতই এসে পড়েছিলো। এবার ফায়ার এলার্মটা বন্ধ হতেই ল্যাংডন শুনতে পেলো ডিসিপিজের সাইরেন লুভর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। পুলিশের হিজরত হচ্ছে। ফশেও খুব দ্রুতই গ্র্যান্ড গ্যালারি থেকে বের হয়ে গেলে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেলো।

 

গ্র্যান্ড গ্যালারির পেছনে, আনুমানিক পঞ্চাশ মিটার দূরে, একটা জরুরি সিঁড়ি আছে, সোফি বললো।

 

এখন প্রহরীরা এই এলাকা ছেড়ে চলে গেলেই আমরা এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারবো।

 

ল্যাংডন ঠিক করলো আজ রাতে আর কিছু বলবে না। সোফি নেভুকে এখন তার চেয়েও অনেক বেশি বুদ্ধিমান বলেই মনে হচ্ছে।

 

 

 

১৯.

 

সেন্ট-সালপিচ গীর্জা, বলা হয়ে থাকে প্যারিসের অন্য যেকোন দালানের চেয়ে এর ইতিহাস একটু ভিন্ন ধরনের। মিশরীয় দেবী আইসিসের একটা ভগ্নপ্রায় মন্দিরের উপর এটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। গীর্জাটাতে একটা স্থাপত্যিক পদচিহ্ন আছে যেটা নটরডেমের পদচিহ্নের সাথে একেবারে মিলে যায়। এই গীর্জাটাতেই মারকুইস দ্য সাদ এবং বোদলেয়ারের ব্যাপটিজম অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, সেই সাথে ভিক্টর হুগোর বিয়েটাও। গীর্জা সংলগ্ন সেমিনার কক্ষটি অপ্রচলিত ইতিহাসের জ্বলন্ত সাক্ষী, এক সময় গুপ্ত সভা কক্ষটি অসংখ্য গুপ্ত সংঘের আখড়া ছিলো।

 

আজরাতে সেন্ট-সালপিচ গীর্জাটা কবরের মতোই নিরব-নিথর। সাইলাস আঁচ করতে পারলো সিস্টার সানড়ন তাকে ভেতরে নিয়ে যাবার সময় একটু অস্বস্তিতে ভুগছিলেন। এতে অবশ্য সে খুব একটা অবাক হয়নি। তার উপস্থিতিতে লোকজন যে অস্বস্তিবোধ করে থাকে, সাইলাস তাতে অভ্যস্ত ছিলো।

 

আপনি একজন আমেরিকান, সিস্টার বললেন।

 

জন্মসূত্রে ফরাসি, সাইলাস জবাব দিলো। স্পেনেও আমি ছিলাম, আর এখন যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করছি।

 

সিস্টার সানন মাথা নেড়ে সায় দিলেন। তিনি ছোটোখাটো একজন মহিলা, শান্ত শিষ্ট চোখের অধিকারিনী। আপনি কখনও সেন্ট-সালপিচ দেখেননি?

 

আমি বুঝতে পারছি, এটা না দেখাটা এক ধরনের পাপই।

 

দিনের বেলায় এটা আরো বেশি সুন্দর দেখায়।

 

এ ব্যাপারে আমিও নিশ্চিত। তাসত্ত্বেও, আজরাতে আমাকে এখানে আসার সুযোগ করে দেয়ার জন্য আপনার কাছে খুবই কৃতজ্ঞ।

 

আব্বে এজন্য আমাকে অনুরোধ করেছিলেন। আপনার তো দেখছি অনেক ক্ষমতাবান বন্ধ রয়েছে।

 

আপনার কোন ধারণাই নেই, সাইলাস ভাবলো।

 

সিস্টার সানভৃনের পেছনে পেছনে ভেতরে যাওয়ার সময় সাইলাস গীর্জার ভেতরটা দেখে অবাক হলো। রঙ-বেরঙের ফ্রেসকো, ছাদের নক্সা এবং উষ্ণ কাঠের জন্য সেন্ট-সালপিচ গীর্জাটাকে নটরডেমের মতো মনে হয় না। নিরব-নিথর আর ভেতরের পরিবেশ শীতল, অনেকটা স্পেনের ক্যাথেড্রালের মতো। সাজসজ্জার কমতির কারণে ভেতরটা আরো বেশি অভিজাত বলে মনে হয়। ছাদের দিকে তাকাতেই তার মনে হলো, সে কোন উল্টো করে রাখা বিশাল জাহাজের নিচে দাঁড়িয়ে আছে।

 

খাপ খেয়ে যাওয়া দৃশ্য, সে ভাবলো। ভ্রাতৃসংঘের জাহাজটা চিরতরের জন্যই উল্টে যাবে। কাজে নেমে যাবার জন্য উদগ্রীব সাইলাস সিস্টার সানভৃনকে অনুরোধ করলো যাতে তাকে একটু একা থাকতে দেয়া হয়। তিনি খুবই ছোটোখাটো আকৃতির একজন মহিলা, যাকে সাইলাস খুব সহজেই কাবু করতে পারবে, কিন্তু সে প্রতীজ্ঞা করেছে, একেবারে প্রয়োজন না হলে শক্তি প্রয়োগ করবে না। তিনি একজন নারী, আর ভ্রাতৃসংঘের লোকেরা তাঁর চার্চকে নিজেদের কি-স্টোনটা লুকানোর কাজে ব্যবহার করার জন্য তো তাকে দায়ী করা যায় না। অন্যের পাপের জন্য তাকে শাস্তি দেয়াটা ঠিক হবে না।

 

আমি খুবই বিব্রতবোধ করছি, সিস্টার। আমার জন্য আপনাকে ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে।

 

না, তা নয়। আপনি প্যারিসে খুব অল্প সময়ের জন্য আছেন। সেন্ট-সালপিচ না দেখাটা ঠিক হবে না। আপনি কি চার্চের স্থাপত্য দিক নাকি ঐতিহাসিক দিকের প্রতি বেশি আগ্রহী?

 

আসলে, সিস্টার, আমার আগ্রহটা আধ্যাত্মিক ব্যাপারেই।

 

সিস্টার একটা প্রশান্তির হাসি হাসলেন। তাহলে তো কোন কথাই নেই। আমি ভাবছিলাম, আপনি কোথা থেকে আপনার পরিদর্শনটা শুরু করবেন।

 

সাইলাস বুঝতে পারলো তার চোখ বেদীর দিকে। পরিদর্শনের কোন প্রয়োজন নেই। আপনার দয়া সিস্টার। আমি নিজেই ঘুরে ঘুরে দেখতে পারবো।

 

আমার কোন সমস্যা হবে না। তিনি বললেন। হাজার হোক আমিতো জেগেই গেছি।

 

সাইলাস হাটা থামিয়ে দিলো। তারা বেদী থেকে মাত্র পনেরো গজ দূরে এসে পড়েছে। সে তার বিশাল দেহটা ছোটোখাটো মহিলার দিকে ঘুরালো। মহিলার চোখের দিকে তাকিয়ে তার পিছু হটার কারণটা বুঝতে পারলো। তার লাল চোখের দিকে সিস্টার তাকিয়ে ছিলো। যদি আপনার কাছে এটা খুব বেশি অভদ্র মনে না হয় সিস্টার, আমি ঈশ্বরের ঘরে শুধুমাত্র এমনিতে ঘোরাঘুরি করার ব্যাপারে অভ্যস্ত নই। প্রার্থনা করার আগে আমি একা একা জায়গাটা ঘুরে দেখলে আপনি কি কিছু মনে করবেন?

 

সিস্টার সানড়ন একটু দ্বিধাগ্রস্ত হলেন। ওহ্, অবশ্যই। আমি চার্চের বেলকনিতে আপনার জন্য অপেক্ষা করবো।

 

সাইলাস আলতো করে তার ভারি হাতটা সিস্টারের কাঁধে রেখে তার দিকে তাকালো। সিস্টার, আপনাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে আমি বেশ অপরাধ বোধ করছি।

 

আর আপনাকে জেগে থাকতে বলাটা খুব বেশি হয়ে যাবে। দয়া করে আপনি আপনার বিছানায় ফিরে যান। আমি আপনার চার্চে একা একা ভালোই থাকবো, তারপর একাই চলে যেতে পারবো।

 

সিস্টার খুব অস্বস্তি বোধ করলেন। আপনি কি নিশ্চিত, এখানে আপনার একা একা খারাপ লাগবে না?

 

মোটেই না। একা একা প্রার্থনা করাই সবচেয়ে বেশি আনন্দের।

 

আপনার যেমন ইচ্ছে।

 

সাইলাস তার হাতটা সিস্টারের কাঁধ থেকে সরিয়ে নিলো। ভালো ঘুম হোক, সিস্টার। ঈশ্বরের শান্তি আপনার সাথেই থাকুক।

 

আপনার সাথেও। সিস্টার সানড়ন সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। বেড়িয়ে যাবার সময় দয়া করে দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে যাবেন।

 

ঠিক আছে। সাইলাস দেখলো তিনি চলে যাচ্ছেন। পুরোপুরি অপসৃত হবার পর সে ঘুরে হাটু গেঁড়ে বসে পড়লো, সিলিস বেল্টটার চাপ অনুভব করলো।

 

হে ঈশ্বর, আজ যে কাজটি আমি করবো, সেটা তোমাকে নিবেদন করছি।

 

কয়্যার বেলকনির ছায়া ঢাকা অংশ থেকে সিস্টার বেদীর সামনে হাটু গেঁড়ে বসা যাজকের দিকে আড়াল থেকে তাকালেন। তার মনে আচমকা একটা ভয় চেপে বসাতে ভাবতে শুরু করলেন, এই রহস্যময় অতিথি হতে পারে শত্রুপক্ষের কেউ, তারা তাকে আগেই এ ব্যাপারে সর্তক করে দিয়েছিলো। আজ রাতে হয়তো সে রকমই কিছু হবে, আর এজন্য সে অনেক বছর ধরে আদেশ বহন করে চলছে। সিস্টার ঠিক করলেন, তিনি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবেন লোকটার প্রতিটি চলাফেরা।

 

 

 

২০.

 

ছায়া ঢাকা জায়গা থেকে বের হয়ে ল্যাংডন আর সোফি চুপিসারে ফাঁকা গ্র্যান্ড গ্যালারির করিডোরে এসে উপস্থিত হলো। তারা জরুরি বহিগমনের সিঁড়িটার দিকে এগিয়ে গেলো।

 

চলতে চলতে ল্যাংডনের মনে হলো সে অন্ধকারের মধ্যে জিগশ পাজল মেলাবার চেষ্টা করছে। এই রহস্যের নতুন মাত্রাটা হলো খুবই সমস্যা সংকুল আর কঠিন একটি অবস্থা।

 

জুডিশিয়াল পুলিশের ক্যাপ্টেন আমাকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।

 

আপনি কি মনে করেন, সে ফিসফিস করে বললো, ফশে নিজেই মেসেজটা ফ্লোরে লিখেছে?

 

সোফি এমন কি তার দিকে ঘুরেও তাকালো না। অসম্ভব।

 

ল্যাংডন অবশ্য খুব নিশ্চিত ছিলো না। সে আমাকে অপরাধী বানাতে সচেষ্ট বলে আমার মনে হচ্ছে। হয়তো সে ভেবেছে, ফ্লোরে আমার নাম লিখে দিলে তার মামলায় সাহায্য হবে?

 

ফিবোনাচ্চি সংখ্যক্রমটা? পি,এস? দা ভিঞ্চি আর দেবীদের সবগুলো প্রতীকের ব্যাপারটা? এটা আমার দাদুই করেছেন।

 

ল্যাংডন জানে সোফি ঠিকই বলছে। প্রতীকগুলোর সবই নিখুঁতভাবে জালের বুননের মতো—পেনটাকল, ভিটরুবিয়ান ম্যান, দা ভিঞ্চি, দেবী, এমন কি ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রমটা। এক সেট সঙ্গতিপূর্ণ প্রতীকসমূহ, আইকনোগ্রাফাররা এটাকে এ নামেই ডাকবে। সবগুলোই একটার সাথে আরেকটা সংযুক্ত।

 

আজ বিকেলে তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন, সোফি যোগ করলো। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, আমাকে তার কিছু বলার আছে। আমি নিশ্চিত ভরে রেখে যাওয়া মেসেজটার মধ্য দিয়ে তিনি আমাকে কিছু বলতে চেয়েছেন, কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা, এমন কিছু যা তিনি ভেবেছেন যে, আপনি সেটা আমাকে বুঝতে সাহায্য করতে পারবেন।

 

ল্যাংডনের চোখ ছানাবড়া হলো। Oh, Draconian devil! ০, laine saint! ও, ড্রাকোনীয় শয়তান! ওহ, ল্যাংড়া সেন্ট! তার ইচ্ছে করলো মেসেজটা আবার উচ্চারণ করবে, সোফি এবং তার নিজের জন্য। ব্যাপারটা সেই প্রথম থেকে, যখন ল্যাংডন ক্রিপটিক শব্দগুলো দেখেছিলো, শুধুই খারাপের দিকেই যাচ্ছে। বাথরুমের জানালা দিয়ে ভূয়া লাফ দেয়াতে ল্যাংডনের জনপ্রিয়তায় কোন সাহায্যে আসবে না। সে সন্দেহ করলো, ফরাসি পুলিশের ক্যাপ্টেন পিছু নিয়ে সাবানের বারটা খুঁজে পেয়ে একটা কৌতুককর দৃশ্যই দেখবে।

 

দরজাটা খুব বেশি দূরে নয়, সোফি বললো।

 

আপনি কি মনে করেন, আপনার দাদুর মেসেজটাতে যে সংখ্যাগুলো আছে সেগুলো দিয়ে বাকি লাইনগুলো বোেঝার কোন সম্ভাবনা আছে? ল্যাংডন একবার বাকোনিয়ান ম্যানুস্ক্রিপ্টের ওপর কাজ করেছিলো, যেখানে শিলালিপিতে সাংকেতিক লিপি দেয়া ছিলো, যাতে করে নির্দিষ্ট একটা কোডের মাধ্যমে সংকেত উদ্ধার করা যায়।

 

সারা রাত ধরে আমি সংখ্যাগুলো নিয়ে ভেবেছি। কিছুই পাইনি। গাণিতিক দিক থেকে এগুলো খুব এলোমেলোভাবে বিস্তৃত হয়ে আছে। একটা ক্রিপ্টোগ্রাফীয় প্রহেলিকা।

 

তারপরও সেগুলোর সবটাই ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রম। এটাতো কাকতালীয় হতে পারে না।

 

তা না। ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রম ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে আমার দাদু আমার দৃষ্টি আকর্ষণই করতে চেয়েছেন যেমন, মেসেজটা তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন, অথবা আমার প্রিয় চিত্রকর্মের অনুকরণে নিজেকে মেলে ধরেছেন। কিংবা নিজের শরীরে পেনটাকল আঁকা। সবটাই, আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য।

 

পেনটাকল কি আপনার কাছে কোন অর্থবহন করে?

 

হ্যাঁ। আমি সেটা আপনাকে বলার সুযোগ পাইনি, আমার দাদু এবং আমার মধ্যে পেনটাকল একটা বিশেষ প্রতীক ছিলো সেই ছোট বেলা থেকেই। আমরা আনন্দ পাওয়ার জন্য টারোট কার্ড খেলতাম। আর আমার ইন্ডিকেটর কার্ডটা সবসময়ই হতো পেনটাকল।

 

ল্যাংডন শীতল অনুভব করলো। তারা টারোট খেলতো? মধ্যযুগের ইতালিয় কার্ড খেলাটাতে ঐতিহ্যবাহী প্রতীকের এতো বেশি প্রাচুর্য ছিলো যে, ল্যাংডন তার নতুন লেখাটার একটা পুরো অধ্যায়ই টারোট-এর নামে উৎসর্গ করেছে। বাইশ কার্ডের এই খেলাটায় মহিলা পোপ, তারকা ইত্যাদি নামও রয়েছে। উৎসের দিক থেকে, টারোট এমন একটি আদর্শিক অর্থ বহন করে যা চার্চ কর্তৃক নিষিদ্ধ। বর্তমানে, টারোটর রহস্যময় গুণাবলীর জন্য এই বিদ্যাটা আধুনিক জ্যোতিষীদের কাছে চলে গেছে।

 

টারোটর ইঙ্গিতপূর্ণ পবিত্র নারীর পোশাকটা হলো পেনটাকল, ল্যাংডন ভাবলো। বুঝতে পারলো, সনিয়ে যদি তার নাতনীর সাথে আনন্দঘন সময় কাটানোর জন্য। খেলাটা খেলে থাকে, তবে পেনটাকল জোক হিসেবে যথার্থই ছিলো।

 

তারা জরুরি সিঁড়ির কাছে এসে পড়লে সোফি খুব সাবধানে দরজাটা খুললো। কোন এলার্ম বাজলো না। শুধুমাত্র বাইরের দরজার সাথে একটা তার সংযুক্ত আছে। সোফি ল্যাংডনকে সরু সিঁড়িটা দিয়ে নিচে নামার জন্য পথ দেখিয়ে আগে আগে নামতে শুরু করলো। কিছু দূর নামার পর গতি একটু বাড়িয়ে দিলো।

 

আপনার দাদু, দ্রুত তার পেছনে নামতে নামতে ল্যাংডন বললো, কখন আপনাকে পেনটাকলের ব্যাপারে বলেছিলেন, তিনি কি কোন দেবীপূজা অথবা ক্যাথলিক চার্চের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন কিছুর উল্লেখ করেছিলেন?

 

সোফি মাথা ঝাঁকালো। আমি আসলে এটার গাণিতিক ব্যাপারটার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী ছিলাম—স্বর্গীয় অনুপাতের ব্যাপার অর্থাৎ PHI, ফিবোনাচ্চি সংখ্যক্রম, এরকম কিছু জিনিস।

 

ল্যাংডন খুব অবাক হলো। আপনার দাদু আপনাকে PHI সংখ্যা সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন?

 

অবশ্যই। স্বর্গীয় অনুপাত। তার চেহারায় লাজুক একটা ভাব দেখা গেলো। সত্যি বলতে কী, তিনি ঠাট্টা করে বলতেন আমি হলাম অর্ধেক স্বর্গীয়…বুঝতেই পারছেন, আমার নামের অক্ষরগুলোর কারণে।

 

ল্যাংডন কথাটা একটু সময় নিয়ে ভেবে আপন মনে বলে উঠলো। S – O – PHI -e

 

অন্যমনস্কভাবে ল্যাংডন PHI নিয়ে ভাবতে লাগলো। সে বুঝতে পারলো সনিয়ের কু-গুলো প্রথম দিকে সে যতোটা আন্দাজ করতে পেরেছিলো তার চেয়েও বেশি সুসংহত।

 

দা ভিঞ্চি… ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রম … পেনটাকল।

 

অবিশ্বাস্যভাবে এইসবগুলো জিনিস একটা ধারণার সাথেই সংযুক্ত, সেটা হলো চিত্র কলার ইতিহাস, যা ল্যাংডন প্রায়শই তার শ্রেণী কক্ষে টপিক হিসেবে বলে থাকে।

 

PHI

 

ল্যাংডন আচমকাই অনুভব করলো সে হারভার্ডে ফিরে গেছে, দাঁড়িয়ে আছে তার চিত্রকলায় সিম্বোলিজম ক্লাসের সামনে। তার প্রিয় সংখ্যাটা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছে।

 

১.৬১৮

 

ল্যাংডন তার উদগ্রীব হয়ে চেয়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রিদের সমুদ্রের দিকে ফিরলো। কে আমায় বলতে পারবে এই সংখ্যাগুলো কি?

 

পেছনে বসা এক লম্বা পায়ের গণিতের মেজর, হাত তুললো। এটা PHI-র সংখ্যা। সে এটা উচ্চার করলো ফি বলে।

 

চমৎকার বলেছেন, স্টেটনার, ল্যাংডন বললো। সবাই পরিচিত হোন PHI-র সাথে।

 

PI-এর সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না, স্টেট্রার আরো বললো, দাঁত বের করে হাসতে লাগলো সে। আমরা গণিতবিদরা যেরকমটি বলতে পছন্দ করি : PHIর একটা H আসলে PI-এর চেয়ে অনেক বেশি ঠাণ্ডা!

 

ল্যাংডন উচ্চস্বরে হাসলো, কিন্তু অন্য কেউ এই ঠাট্টাটা বুঝতে পারলো বলে মনে হলো না।

 

এই PHI সংখ্যাটা, ল্যাংডন বলতে শুরু করলো, এক দশমিক ছয়-এক-আট, শিল্পকলায় এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কে আমাকে বলতে পারে, কেন?

 

স্টেটনার নিজেকে আবারো প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করলো। কারণ, এটা খুবই সুন্দর?

 

সবাই হেসে উঠলো।

 

আসলে, ল্যাংডন বললো, স্টেট্রার আবারো ঠিক বলেছে। PHI-কে সাধারণত এই মহাবিশ্বের সবচাইতে সুন্দর সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

হাসিটা থেমে গেলে স্টেটনারের মুখে তৃপ্তির একটা হাসি দেখা গেলো।

 

ল্যাংডন তার স্লাইড প্রজেক্টরটাতে ফিল্ম ভরতে ভরতে ব্যাখ্যা করলো যে, PHI সংখ্যাটি ফিবোনাচ্চি সংখ্যক্রম থেকেই উদ্ভূত হয়েছে—সংখ্যাক্রমটি শুধুমাত্র এজন্যে বিখ্যাত নয় যে, প্রথম দুটি সংখ্যার যোগফল পরবর্তী সংখ্যার সমান, বরং সন্নিহিত সংখ্যার ভাগফলে বিস্ময়কর সংখ্যা ১.৬১৮ রয়েছে–অর্থাৎ PHI.

 

PHI-এর রহস্যময় গাণিতিক উৎপত্তিটা ছাড়াও, ল্যাংডন ব্যাখ্যা করলো যে, PHI এর সত্যিকারের হতবুদ্ধিকর জিনিসটা হলো প্রকৃতির গঠনের ক্ষেত্রে তার মৌলিকতু। গাছপালা, জীবজম্বু এবং এমনকি মানুষের ক্ষেত্রেও, সবকিছুতেই মাত্রাগত দিক থেকে একেবারে ঠিক ঠিকই PHI-এর সাথে ১-এর সমানুপাতে আছে।

 

PHI প্রকৃতির সর্বত্রই রয়েছে, ল্যাংডন বললো, বাতিটা নিভিয়ে দিলো সে, যা : পরিষ্কারভাবেই কাকতালীয় ব্যাপারটাকে অতিক্রম করে, আর তাই প্রাচীন কালের মানুষেরা PHI সংখ্যাটিকে মনে করতো বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা এটা আগে থেকেই ঠিক করে দিয়েছেন। প্রাচীন কালের বিজ্ঞানীরা এক দশমিক-ছয়-এক-আটকে স্বর্গীয় অনুপাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলো।

 

দাঁড়ান, সামনের সারিতে বসা এক তরুণী বললো, আমি বায়োলজির ছাত্রী, আমিতো কখনও প্রকৃতিতে এই স্বর্গীয় অনুপাতটা দেখিনি।

 

দেখেননি? ল্যাংডন দাঁত বের করে হাসলো। কখনও কি মৌচাকের পুরুষ এবং স্ত্রী মৌমাছির সম্পর্কটা খতিয়ে দেখেছেন?

 

অবশ্যই। স্ত্রী মৌমাছি সবসময়ই পুরুষ মৌমাছির তুলানায় সংখ্যায় বেশি থাকে।

 

একদম ঠিক। আর আপনি কি এটা জানেন, যদি পুরুষ মৌমাছির সংখ্যা দিয়ে স্ত্রী মৌমাছির সংখ্যাকে ভাগ করা হয় তবে সবসময়ই একই সংখ্যা পাওয়া যাবে?,

 

আপনি জানেন?

 

আজ্ঞে। PHI।

 

মেয়েটা খেদোক্তি করলো। একদমই না!

 

একদমই! ল্যাংডন পাল্টা বললো, হাসতে হাসতে প্রজেক্টরে একটা ছবি প্রক্ষেপন করলো। চিনতে পেরেছেন এটা?

 

এটা একটা সামুদ্রিক শামুক, এক বায়ো মেজর বললো। একটা শামুকের মাথার ভেতরের অংশ যা গ্যাস পাম্প করে ভেতরে নিয়ে যায় ভেসে থাকার জন্য।

 

ঠিক বলেছেন। আপনি কি আন্দাজ করতে পারেন প্রতিটা স্পাইরালের ডায়ামিটার পরেরটার সাথে কি সুনপাতে রয়েছে?

 

মেয়েটা অনিশ্চিত ভঙ্গীতে শামুকের স্পাইরালের দিকে তাকালো।

 

ল্যাংডন মাথা নাড়লো। PHI। স্বর্গীয় অনুপাত। এক দশমিক ছয়-আট-এক। মেয়েটাকে বিস্মিত হতে দেখা গেলো।

 

ল্যাংডন পরবর্তী স্নাইডটাতে গেলোসূর্যমুখী ফুলের বীজের মাথার একটা বিশাল ছবি। সূর্যমুখী ফুলের বীজ বিপরীত চক্রাকারে বেড়ে ওঠে। আপনারা কি অনুমান করতে পারেন, প্রতিটি ক্রোকারের ব্যস পরেরটার সাথে কত অনুপাতে আছে?

 

PHI? সবাই বললো।

 

বিঙ্গো। ল্যাংডন স্লাইডগুলো নিয়ে আবার ব্যস্ত হয়ে গেলো—পদ্ম ফুল, গাছপালার পাতার বিন্যাস, পোকা-মাকড়ের বিভাঁজন সবগুলো বিস্ময়করভাবেই স্বর্গীয় অনুপাত মেনে চলেছে।

 

দারুণ! কেউ একজন চিৎকার করে বললো।

 

হ্যাঁ, আরেকজন বললো, কিন্তু এর সাথে চিত্রকলার সম্পর্ক কি?

 

আ-হা! ল্যাংডন বললো। আপনি জিজ্ঞেস করাতে খুশি হয়েছি। সে আরেকটা স্লাইড চড়ালো–বিবর্ণ হলুদ রঙের পার্চমেন্ট কাগজে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ভিরুভিয়ান ম্যান–প্রতিভাবান রোমান স্থপতি মার্কাস ভিরুভিয়ানের নামানুসারে করা হয়েছিলো, যিনি স্বর্গীয় অনুপাতকে তাঁর লেখায় প্রশংসা করে বলেছিলেন দ্য আর্কিটেকচুরা।

 

মানুষের শরীরের স্বর্গীয় গঠনের ব্যাপারটা দা ভিঞ্চির চেয়ে বেশি কেউ বুঝতে। আসলে দা ভিঞ্চি শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করে মানুষের শরীরে হাড়ের গঠনের যথার্থ অনুপাতটি মেপে ছিলেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি দেখিয়েছিলেন যে, মানুষের শরীর গঠনে সবময়ই PHI-র হিসাবে থাকে।

 

শ্রেণীকক্ষের সবাই সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকালো।

 

আমাকে বিশ্বাস করছেন না? ল্যাংডন চ্যালেঞ্জ করলো। এরপর গোসল করার সময় একটা মাপজোখ করার ফিতা নিয়ে যাবেন।

 

কথাটা শুনে কয়েকজন ফুটবল খেলোয়াড় নাক সিঁটকালো।

 

ল্যাংডন বললো, আপনাদের সবাই। ছেলে এবং মেয়ে। চেষ্টা করে দেখবেন এটা। আপনাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত মেপে দেখবেন। তারপর মাটি থেকে আপনাদের নাভি পর্যন্ত যে মাপ হয় তা দিয়ে সেটাকে ভাগ করে দেখবেন। কোন্ সংখ্যাটা আপনারা পাবেন, জানেন?

 

PHI নয়! একজন সৈনিক অবিশ্বাসে কথাটা বললো।

 

হ্যাঁ, PHI, ল্যাংডন জবাব দিলো, এক-দশমিক-ছয়-এক-আট। আরেকটা উদাহরণ চান? আপনাদের কাঁধ থেকে হাতের আঙুল পর্যন্ত মাপ নিন, আর সেটাকে আপনাদের বাহু থেকে আঙুল পর্যন্ত যে মাপ হয়, সেটা দিয়ে ভাগ করুন। আবারো PHI। আরেকটা চান? পা থেকে হিপর মাপকে পা থেকে হাটু দিয়ে ভাগ করুন। আবারো PHI। আঙুলের গিট, পায়ের পাতা। মেরুদণ্ডের বিভাঁজন। PHI, PHI, PHI। বন্ধুরা, আপনারা প্রত্যেকেই স্বর্গীয় অনুপাতের কল্যাণে হাটছেন।

 

এমনকি অন্ধকারেও ল্যাংডন দেখতে পারলো তারা সবাই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আছে। সে ভেতরে ভেতরে অতিপরিচিত একটা আবেগ অনুভব করলো। এজন্যেই সে শিক্ষাদান করে থাকে। বন্ধুরা, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এই পৃথিবীর বিশৃঙ্খল সবকিছুই আসলে সুপ্ত একটা শৃঙ্খলায় চলছে। যখন প্রাচীনকালের মানুষেরা প্রথম PHI আবিষ্কার করলো, তখন তারা নিশ্চিত হয়েছিলো যে, তারা ঈশ্বরের বিশ্ব নির্মানের একটা হিসাবের সন্ধান পেয়েছে। আর এজন্যেই তারা প্রকৃতি পূজা করে থাকে। যে কেউই ব্যাপারটা বুঝতে পারবে, কেন। প্রকৃতিতে ঈশ্বরের হাতের প্রমাণ রয়েছে, এমনকি আজকের দিনেও প্যাগানদের অস্তিত্ব রয়েছে। আমাদের অনেকেই, আজও প্যাগানদের মতো প্রকৃতি উৎসব করে থাকি। আর তারা এটা জানেও না। মে-ডে হলো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, বসন্ত উৎসব উদযাপন…পৃথিবী তার উর্বরা শক্তি ফিরে পায়। স্বর্গীয় অনুপাতের মধ্যে যে রহস্যময় জাদুশক্তি আছে, সেটা মানব সভ্যতার শুরুর দিকেই লিখিত হয়েছিলো। মানুষ প্রকৃতির নিয়মের দ্বারা শাসিত, আর যেহেতু শিল্পকলা হলো ঈশ্বরের হাতকে অনুকরণ করার একটা প্রচেষ্টা, সেজন্যে আপনারা এই সেমিস্টারে শিল্পকলায় স্বর্গীয় অনুপাতের ছড়াছড়ি দেখতে পাবেন।

 

পরবর্তী আধঘণ্টা ধরে ল্যাংডন স্লাইডশোর মাধ্যমে একের পর এক মাইকেল এঞ্জেলো, আলব্রেখট দ্রার, দা ভিঞ্চি এবং অন্য অনেকের চিত্রকর্ম দেখালেন। প্রতিটাতেই শিল্পী ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের কম্পােজিশনে স্বর্গীয় অনুপাত ব্যবহার করেছেন। ল্যাংডন গৃক পার্থিনোন, মিশরের পিরামিড, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত জাতিসংঘের ভবনের স্থাপত্যে PHI-এর বিষয়টি উন্মোচিত করলো। PHI মোজার্টের সোনাটার গঠনেও আছে, বিঠোফেনের পঞ্চম সিম্ফোনি এবং বার্তোক, ডেবুসি আর শুবার্টের কর্মেও সেটা বিদ্যমান। ল্যাংডন তাদেরকে বললো, PHI সংখ্যাটি, এমনকি স্ট্রাডিভ্যারিয়াসও ব্যবহার করেছেন তার বেহালার হোল-এর সঠিক অবস্থানের জন্য।

 

অবশেষে, ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে গিয়ে ল্যাংডন বললো, আমরা আবার প্রতীকেই ফিরে আসবো। সে পাঁচটি বিন্দুর সাহায্যে একটা তারা আঁকলো। এই প্রতীকটা সবচাইতে শক্তিশালী একটা ইমেজ যা আপনারা এই টার্মে দেখতে পারবেন। সাধারণত এটাকে বলা হয় পেনটাগ্রাম অথবা পেনটাকল, যেমনটি প্রাচীন কালের মানুষেরা বলতো—এই প্রতীকটা বিভিন্ন সংস্কৃতিতে স্বর্গীয় আর জাদুকরী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেউ কি বলতে পারবে, কেন?

 

স্টেটনার, গণিতের মেজ, আবারো হাত তুললো। কারণ, আপনি যদি পেনটাগ্রাম আঁকেন তবে আপনা আপনিই সেটা স্বর্গীয় অনুপাতে বিভাজিত হয়ে যাবে।

 

ল্যাংডন ছেলেটাকে মাথা নেড়ে সাধুবাদ জানালো। চমৎকার। হ্যাঁ, পেনটাকলর রেখার বিভিন্ন অংশের সবগুলোর অনুপাতই PHIর সমান। এজন্যেই, এই প্রতীকটা স্বর্গীয় অনুপাতের একটি অনিবার্য প্রকাশ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। এই কারণেই পাঁচ বিন্দুর এই তারকাটা সবসময়ই দেবী এবং পবিত্র নারীর সাথে সংশ্লিষ্ট সৌন্দর্য আর নিখুতের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

শ্রেনী কক্ষের মেয়েরা ভুরু কুঁচকালো।

 

একটা কথা। আজকে আমরা শুধু দা ভিঞ্চিকে স্পর্শ করেছি। কিন্তু আমরা এই সেমিস্টারে তার আরো অনেক কিছুই দেখতে পাবো। লিওনার্দো প্রাচীন দেবীদের প্রতি খুবই নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, এর যথেষ্ট প্রমাণও আছে। আগামীকাল, আমি আপনাদেরকে তার দ্য লাস্ট সাপার ফ্রেসকোটি দেখাবো, এতে পবিত্র নারীর একটি বিস্ময়কর প্রমাণ রয়েছে, যা আপনারা কখনও দেখেননি।

 

আপনি ঠাট্টা করছেন, তাই না? কেউ একজন বললো।

 

আমরা তো জানতাম দ্য লাস্ট সাপার যিশু খৃস্টের উপর!

 

ল্যাংডন মুচুকি হাসলো। আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না, প্রতীকগুলো কীভাবে বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে আছে।

 

 

 

আসুন, নিচু স্বরে সোফি বললো। কি হয়েছে আপনার? আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। জলদি করুন!

 

ল্যাংডন চোখ তুলে তাকালো, দূরের চিন্তাভাবনা থেকে ফিরে আসলো। বুঝতে পারলে তারা সিঁড়ির শেষ মাথায় এসে পড়েছে। একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলো সে।

 

O, Draconian devil! Oh, lame saint!

 

সোফি তার পেছনে থাকা ল্যাংডনের দিকে ঘুরে তাকালো।

 

এটা এতোটা সহজ-সরল হতে পারে না, ল্যাংডন ভাবলো।

 

কিন্তু সে জানে, অবশ্যই এটা।

 

লুভরের এই গহ্বরের ভেতরে … PHI এবং দা ভিঞ্চি তার মনে ঘুরপাক খেতে লাগলো। রবার্ট ল্যাংডন আচমকা, অপ্রত্যাশিতভাবে সনিয়ের কোডটার মর্মোদ্ধার করে ফেললো।

 

O, Draconian devil! সে বললো, Oh, lame saint! এটাতো খুব সহজ সরল ধরনের একটা কোড!

 

সোফি থেমে তার দিকে দ্বিধাগ্রস্তভাবে তাকালো। এটা একটা কোড? সে সারারাত ধরে শব্দগুলো নিয়ে ভেবেছে কিন্তু কিছুই খুঁজে পায়নি, বিশেষ করে সহজ সরল ধরনের কোড।

 

আপনি নিজেই এটা বলেছিলেন। ল্যাংডনের কণ্ঠে আবার উত্তেজনা ফিরে এলো। ফিবোনাচ্চি সংখ্যাগুলো শুধুমাত্র যথার্থ নিয়মে থাকলেই কোন অর্থ বহন করে। তা না হলে ওগুলো গাণিতিক প্রহেলিকা ছাড়া আর কিছুই না।

 

সে কী বলছে সে সম্পর্কে সোফির কোন ধারণাই ছিলো না। ফিবোনাচ্চি সংখ্যা? সে এ ব্যাপারে খুব নিশ্চিত যে, এটা শুধুমাত্র ক্রিপ্টোগ্রাফি ডিপার্টমেন্টকে জড়িত করার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। ওগুলোর আরেকটা উদ্দেশ্যও আছে? সে তার হাতটা পকেটে ঢুকিয়ে প্রিন্ট-আউটটা বের করলো, তার দাদুর মেসেজটা আবার খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলো।

 

13-3-2-21-1-1-8-5

 

O, Draconian devil!

Oh, lame saint!

 

সংখ্যাগুলোর ব্যাপারটা কি?

 

এলোমেলোভাবে ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রমটা আসলে একটা ক্লু, প্রিন্ট-আউটটা হাতে নিয়ে ল্যাংডন বললো। সংখ্যাগুলো আসলে বাকি মেসেজগুলোর মর্মোদ্ধার করার একটা ইঙ্গিত। তিনি সংখ্যামটা এলোমেলোভাবে লিখেছেন আমাদেরকে এটা বলার জন্য যে, একই কাণ্ড করা হয়েছে লিখিত মেসেজেটাতেও। O, Draconian devil? oh, lame saint? এই লাইনগুলোর কোন অর্থ নেই। এগুলো এলোমেলোভাবে লেখা অক্ষর ছাড়া আর কিছুই না।

 

আপনার মতে এই মেসেজটা…উনে এনাগ্রাম?  সে তার দিকে চেয়ে রইলো। অনেকটা সংবাদপত্র থেকে শব্দের দঙ্গল বানানো?

 

ল্যাংডন সোফির চেহারায় সন্দেহ দেখতে পেলো, সঙ্গত কারণেই বুঝতে পারলো সেটা। খুব কম লোকই এনাগ্রাম জিনিসটা বুঝতে পারে। কোন শব্দ বা বাক্যাংশের বর্ণগুলো দিয়ে স্থান পরিবর্তনের সাহায্যে ভিন্ন-ভিন্ন শব্দ বা বাক্য তৈরি করাকে এনাগ্রাম বলে।

 

কাবালার রহস্যময় শিক্ষা খুব বেশি রকমেরই এনাগ্রাম ভিত্তিক—এতে হিব্রু অক্ষরগুলো নতুন ভাবে সাজিয়ে নতুন অর্থ বের করে আনা হয়। রেনেসাঁর সময়কার ফরাসি রাজারা এনাগ্রামের ব্যাপারে এতোটাই মুগ্ধ ছিলো যে, তারা বিশ্বাস করতো এতে জাদুকরী শক্তি আছে। তারা রাজকীয় এনাগ্রাম বিশারদ পর্যন্ত নিয়োগ দিয়েছিলো যাতে করে গুরুত্বপূর্ণ দলিল-দস্তাবেজ বিশ্লেষণে সাহায্য করা যায়। রোমানরা সত্যিকার অর্থে এনাগ্রাম বিদ্যাকে আক্বস ম্যাগনা অর্থাৎ মহান চিত্র বলে অভিহিত করেছিলো।

 

ল্যাংডন সোফির দিকে তাকালো, তার চোখে চোখ স্থির করলো। আপনার দাদুর অর্থটা আমাদের সামনেই রয়েছে, আর তিনি আমাদের কাছে এটা দেখানোর জন্য যথেষ্ট কু-ই রেখে গেছেন।

 

আর কোন কথা না বলেই ল্যাংডন তার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা কলম বের করে প্রতিটা লাইনের অক্ষরগুলো নতুন করে সাজালো।

 

0, Draconian devil!

Oh, lame saint!

 

এর একটি নিখুঁত এনাগ্রাম হলো …

 

Leonardo Da vinci!

The Mona Lisa!

 

 

 

 

 

০৩. মোনালিসা

২১.

 

মোনালিসা।

 

হঠাৎ করেই সোফি বের হওয়ার সিঁড়িটার সামনে থম্‌কে দাঁড়ালো, ভুলে গেলো লুভর থেকে চলে যাবার কথাটা। তার এজন্যে দুঃখ হতে লাগলো যে, এনাগ্রামটার মর্মোদ্ধার সে নিজে করতে পারেনি। সোফির দক্ষতা জটিল জটিল সব ক্রিপ্টো বিশ্লেষণের উপর, তাই তার চোখ সহজ সরল শব্দের খেলাটা এড়িয়ে গেছে। তারপরও তার মনে হলো, তার উচিত ছিলো এটা বের করার। হাজার হলেও, তার কাছে এনাগ্রাম কোন অপরিচিত কিছু ছিলো না, বিশেষ করে ইংরেজিতে।

 

যখন সে খুব ছোট ছিলো, তার দাদু প্রায়ই তার ইংরেজি বানানের দক্ষতা পরীক্ষা করার জন্য এই এনাগ্রাম খেলাটা ব্যবহার করতেন। একবার তিনি ইংরেজি শব্দ Planets লিখে এর অক্ষরগুলো দিয়ে সোফিকে বিরানব্বইটি অন্য ইংরেজি শব্দ লিখতে বললেন। এই অক্ষরগুলো দিয়ে আসলেই, বিস্ময়করভাবে এতোগুলো শব্দ লেখা যায়। সোফি তিন দিন ব্যয় করে, ডিকশনারি ঘেঁটে সবগুলো শব্দ বের করতে পেরেছিলো।

 

আমি কল্পনাও করতে পারছি না, লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে ল্যাংডন বললো, কীভাবে আপনার দাদু মারা যাবার আগে মিনিটখানেকের ভেতরে এরকম একটি এনাগ্রাম তৈরি করতে পারলেন!

 

সোফি ব্যাখাটা জানতো, আর এটা বুঝতে পেরে তার খুব খারাপ লাগলো। আমার এটা দেখা উচিত ছিলো! সে তার দাদুর কথা স্মরণ করলো—একজন শব্দ খেলার আসক্ত ব্যক্তি এবং শিল্পকলাপ্রিয় মানুষ তরুণ বয়সে বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম দিয়ে এনাগ্রাম তৈরি করে খুব আনন্দ পেতেন। সত্যি বলতে কী, একবার তাঁর তৈরী একটা এনাগ্রাম তাঁকে বেশ সমস্যায় ফেলে দিয়েছিলো, তখন সোফি একটা বাচ্চা মেয়ে। আমেরিকান এক আর্ট ম্যাগাজিনের সাথে সাক্ষাতের সময়, সনিয়ে আধুনিক কিউবিজম আন্দোলনের প্রতি তার অপছন্দের কথা প্রকাশ করেছিলেন পিকাসোর মাস্টারপিস les Demoiselles d ‘Avignor-কে Vile meaningless doodles-এর যথার্থ  এনাগ্রাম হিসেবে বর্ণনা করে। পিকাসোর ভক্তরা এতে খুশি হতে পারেনি।

 

আমার দাদু এই Monalisa এনাগ্রামটি সম্ভবত অনেক আগেই তৈরি করেছিলেন, ল্যাংডনের দিকে চেয়ে সোফি বললো। আর আজরাতে তিনি এটা বাধ্য হয়েই একটা কোড হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সে তার দাদুর শীতল কণ্ঠটা শুনতে পেলো।

 

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি!

 

মোনালিসা!

 

কেন তিনি তাঁর চুড়ান্ত মুহূর্তের কথায় এই বিখ্যাত চিত্রকর্মটির উল্লেখ করে গেছেন, সে ব্যাপারে সোফির কোন ধারণাই ছিলো না। কিন্তু একটা সম্ভাবনার কথাই কেবল ভাবতে পারলো সে। বিব্রতকর একটা কিছু।

 

এগুলো তাঁর অন্তিম কথা নয় …

 

সে কি মোনালিসা দেখতে যাবে? তাঁর দাদু কি সেখানে কোন মেসেজ রেখে গেছেন? আইডিয়াটা মনে হচ্ছে যথার্থই ন্যায়সঙ্গত। হাজার হোক, বিখ্যাত চিত্রকর্মটি ঝুলে আছে সল দে এতা-এ-একটা আলাদা কক্ষে, কেবলমাত্র গ্র্যান্ড গ্যালারির ভেতর দিয়েই সেখানে প্রবেশ করা যায়। সোফি টের পেলো, যে ঘরটির দরজা খোলা রয়েছে সেটা থেকে কেবল বিশ মিটার দূরে তার দাদুর মৃতদেহটা পড়ে আছে।

 

তিনি মারা যাবার আগে খুব সহজেই মোনালিসাকে দেখে যেতে পারতেন।

 

সোফি ইমার্জেন্সি সিঁড়িটার দিকে ফিরে তাকালো, সিদ্ধান্তহীনভাবে। সে জানে তার উচিত ল্যাংডনকে এক্ষুণি জাদুঘর থেকে বের করে নেয়া। তারপরও তার মনে হতে লাগলো বিপরীত কিছু করার। সোফি তার শৈশবে দাদুর সাথে লুভরের ডেনন উইংয়ে বেড়াতে আসার কথাটি মনে করতেই বুঝতে পারলো, তার দাদু যদি তার কাছে গোপন কিছু বলার থেকেই থাকে, তবে সেটা দা ভিঞ্চির মোনালিসার চেয়ে খুব কম জায়গাই রয়েছে এই পৃথিবতে।

 

সে এখান থেকে অল্প দূরেই আছে, তার দাদু সোফির নরম হাতটা ধরে ফিস ফিস্ করে কথাটা বলেছিলো। তখন জাদুঘরটা সবার জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো,

 

ফাঁকা জাদুঘরটা তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন তিনি।

 

সোফির বয়স তখন মাত্র ছয়। বিশাল বড় ছাদ আর চমঙ্কার ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছিলো, সে খুব ছোট আর নগন্য। ফাঁকা জাদুঘরটা তাকে ভীত করে তুলেছিলো। যদিও সেটা দাদুকে বুঝতে দেয়নি সে।

 

সামনেই সল দে এতা, লুভরের সবচাইতে বিখ্যাত ঘটাতে প্রবেশ করতেই তার দাদু তাকে বলেছিলেন। দাদুর দারুণ উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও সোফি চাইছিলো বাড়ি ফিরে যেতে। সে বইতে মোনালিসার ছবি দেখেছিলো, তার একদম পছন্দ হয়নি। সে বুঝতেই পারতো না, কেন সবাই তাকে নিয়ে এতো মাতামাতি করে।

 

সেস্ত, এনুয়ে, সোফি গজ গজ করে ফরাসিতে বলেছিলো।

 

বোরিং, দাদু ইংরেজি শব্দটা বলে শুধরিয়ে দিয়েছিলেন, স্কুলে ফরাসি, বাড়িতে ইংরেজি।

 

লো লুভর, সেস্তু পা শেজ মেয়ে! সে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলো।

 

তিনি ক্লান্ত একটা হাসি দিয়েছিলেন। ঠিক বলেছো তুমি। তাহলে মজা করার জন্য ইংরেজি বলা হোক।

 

সোফি ঠোঁট উল্টিয়ে হাটতে শুরু করেছিলো। সল দে এতা-এ ঢোকা মাত্রই তার চোখ সংকীর্ণ একটা ঘর নিরীক্ষণ করে খুঁজে পেলো সেই সম্মানজনক স্থানটি ডান দিকের দেয়ালের ঠিক মাঝখানটা। সেখানে বুলেটপ্রুফ গ্লাসের পেছনে একটা ছবি টাঙানো ছিলো। তার দাদু দরজার দিকে এসেই একটু থেমে গিয়ে ছবিটার দিকে ঘুরে বলেছিলেন, যাও, সোফি। খুব বেশি মানুষ তাকে একা দেখার এই দূর্লভ সুযোগটা পায় না।

 

সোফি আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়েছিলো। মোনালিসা সম্পর্কে এতো কিছু শোনার পর, তার মনে হচ্ছিলো, সে যেনো রাজকীয় কোনো কিছুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বুলেট প্রুফ গ্লাসটার সামনে এসে দাঁড়াতেই সোফি নিঃশ্বাস নিয়ে সোজা ছবিটার দিকে তাকিয়েছিলো।

 

সোফি নিশ্চিত ছিলো না, তার কী রকম অনুভূতি হবে, কিন্তু তার তেমন কিছুই হয়নি। কোন বিস্ময় না। তৎক্ষণাৎ কোন উত্তেজনাও বোধ করেনি। বিখ্যাত চেহারাটা, বইতে যেমন দেখেছে, তেমনি দেখাচ্ছিলো সেটা। নিরবে দাঁড়িয়ে ছিলো সে যা তার কাছে অনন্ত কালের অপেক্ষা করার মতো মনে হয়েছিলো। সে কিছু একটা ঘটার প্রতীক্ষা করছিলো।

 

তো, তোমার কি মনে হচ্ছে? তার দাদু তার পেছনে এসে ফিসফিস্ করে বলেছিলেন। সুন্দর, চোখটা?

 

সে তো দেখি খুবই ছোট।

 

সনিয়ে হেসে ছিলেন। তুমিও তো ছোট, কিন্তু সুন্দর।

 

আমি সুন্দর নই, সে মনে মনে ভেবে ছিলো। সোফি তার লাল চুল আর চেহারায় ছিট-ছিট দাগগুলো ঘৃণা করতো। তার ক্লাসের সব ছেলেদের চেয়েও সে বড়সড় ছিলো। সে মোনালিসার দিকে আবার ফিরে তাকিয়ে মাথা নেড়ে ছিলো। বইতে তাকে যেমন দেখায়, দেখতে তার চেয়েও বেশি খারাপ। তার চেহারাটা …ব্রুমোয়া।

 

কুয়াশাচ্ছন্ন, তার দাদু বলেছিলেন।

 

কুয়াশাচ্ছন্ন, সোফিও কথাটা আবার বলে ছিলো।

 

এটাকে বলে পেইন্টিংয়ের ফুমেতো স্টাইল। তিনি সোফিকে বলেছিলেন। আর এভাবে আঁকা খুবই কঠিন কাজ। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি অন্য যে কারোর চেয়ে এক্ষেত্রে সেরা ছিলেন।

 

তারপরও সোফি ছবিটা পছন্দ করেনি। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে কিছু একটা জানে… যেমন স্কুলের বাচ্চারা গোপন কিছু জানে, সেরকম।

 

তার দাদু জোরে জোরে হেসে ছিলেন, অনেকটা, এজন্যেই সে এতো বিখ্যাত। লোকজন অনুমান করতে পছন্দ করে, কেন সে হাসছে।

 

তুমি কি জানো, কেন সে হাসছে?

 

হয়তো। তার দাদু মিটিমিটি হেসে বলেছিলেন। একদিন আমি এসবের সবটাই তোমাকে বলবো।

 

সোফি তার পাটা মাটিতে সজোরে আঘাত করেছিলো। আমি তো তোমাকে বলেছিই, রহস্য আমার ভালো লাগে না!

 

প্রিন্সেস, তিনি হেসে বলেছিলেন। এ জীবন রহস্যে পরিপূর্ণ। তুমি একবারে এগুলোর সবটা জানতে পারবে না। আমি উপরে ফিরে যাচ্ছি, সোফি ল্যাংডনকে বললো, তার কণ্ঠটা সিঁড়ি ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো।

 

মোনালিসার কাছে? ল্যাংডন ভুরু কুচকে বললো। এখনই?

 

সোফি ঝুঁকিটা বিবেচনা করলো। আমি সন্দেহভাঁজন খুনি নই। আমি আমার সুযোগটা নেবোই। আমার দাদু আমাকে কী বলতে চাচ্ছেন, সেটা আমার জানা দরকার।

 

এ্যামবাসির ব্যাপারটা কি হবে?

 

ল্যাংডনকে একজন ফেরারি বানিয়ে এখন আবার তাকে পরিত্যাগ করার কথাটা ভেবে সোফির খুব অপরাধবোধ হতে লাগলো, কিন্তু তার অন্য কোন উপায়ও ছিলো না। সে নিচের সিঁড়ির কাছে একটা লোহার দরজার দিকে ইঙ্গিত করলো।

 

এই দরজাটা দিয়ে বেড়িয়ে যান, আর জ্বলজ্বলে বহির্গমনের সাইনগুলো অনুসরণ করুন। আমার দাদু আমাকে এখানে নিয়ে আসতেন। আমি এ জায়গাটা চিনি। বাইরে বের হবার জন্য এই একটাই পথ আছে। সোফি তার গাড়ির চাবিটা ল্যাংডনের কাছে হাতে দিয়ে দিলো। আমারটা লাল রঙের, কর্মচারীদের লটে পার্ক করা আছে। আপনি কি জানেন এ্যামবাসিতে কীভাবে যাওয়া যায়?

 

হাতের চাবিটার দিকে তাকিয়ে ল্যাংডন মাথা নাড়লো।

 

শুনুন, সোফি বললো, তার কণ্ঠটা খুব নরম শোনাচ্ছে। আমার মনে হয়, আমার দাদু মোনালিসাতে আমার জন্য একটা মেসেজ রেখে গেছেন—তাঁকে কে খুন করেছে, হয়তো সেই ব্যাপারে কোন কু আছে। অথবা, কেন আমি বিপদে আছি সেটা বলা আছে। অথবা আমার পরিবারের কী হয়েছিলো। আমাকে সেটা দেখতেই হবে।

 

কিন্তু তিনি যদি আপনার বিপদের কথাটা বলতেই চাইতেন, তবে তিনি মারা যাবার আগে সেটা ফ্লোরে লিখে গেলেন না কেন? কেন এই জটিল শব্দ-শব্দ খেলা?

 

আমার দাদু আমাকে যা-ই বলতে চাইছেন, আমার মনে হয় না, তিনি চান সেটা অন্য কেউ জানুক। এমন কি পুলিশও না। স্পষ্টতই, তার দাদু নিজের সমস্ত শক্তি দিয়েই তার কাছে একটা মেসেজ পৌঁছাতে চাইছিলেন। তিনি সেটা কোডের আকাড়ে লিখে গেছেন। সোফির গোপন আদ্যক্ষরও সংযুক্ত করে দিয়েছেন। আর শেষে তাকে বলে গেছেন রবার্ট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করতে একটি প্রজ্ঞাময় আদেশ। আমেরিকান সিম্বোলজিস্ট এই কোডটার মর্মোদ্ধার করতে পারবে এই ধারণায়। খুবই অদ্ভুত শোনাচ্ছে, সোফি বললো, আমার মনে হয়, তিনি চেয়েছেন অন্য কেউ পৌঁছানোর আগেই আমি মোনালিসার কাছে যাই।

 

আমিও আসছি আপনার সাথে।

 

না! আমরা জানি না গ্র্যান্ড গ্যালারি কততক্ষণ খালি থাকবে। আপনাকে যেতেই হবে।

 

ল্যাংডনকে মনে হলো দ্বিধাগ্রস্ত, যেনো তার একাডেমিক কৌতূহলটা এখন হুমকির সম্মুখীন।

 

এক্ষুণি যান। সোফি তার দিকে চেয়ে একটা বিদায়ী হাসি দিলো। আমি এ্যামবাসিতে গিয়ে আপনার সাথে দেখা করবো, মি. ল্যাংডন।

 

ল্যাংডনকে দেখে মনে হলো খুশি হয়নি। আমি আপনার সাথে সেখানে দেখা করতে পারি একটা শর্তে, সে জবাব দিলো, তার কণ্ঠ কাঁপছে।

 

সোফি একটু থেমে চোখ তুলে তাকালো। সেটা কি?

 

আপনি আমাকে ল্যাংডন বলা বন্ধ করবেন।

 

সোফি মিষ্টি হেসে ল্যাংডনের দিকে তাকিয়ে বললো, গুড লাক, রবার্ট।

 

 

 

ল্যাংডন সিঁড়ির একেবারে শেষ ধাপে নেমে আসলো। সেখানে তেল আর পাস্টারের ঝাঝালো গন্ধটা তার নাকে এসে লাগলো। সামনে এগোতেই চোখ পড়লো SORTIE/ EXIT লেখা একটা সাইন। সেটা সঙ্কীর্ণ একটা করিডোরের দিকে ইঙ্গিত করছে। ল্যাংডন সেদিকেই পা বাড়ালো।

 

হলওয়ে দিয়ে যেতে যেতে ল্যাংডন ভাবতে লাগলো, যদি এই মুহূর্তে ক্যামবৃজের বিছানা থেকে জেগে উঠতো সে আর আজকের পুরো ঘটনাটাই হতো অদ্ভুত একটা স্বপ্ন! আমি লুভর থেকে চুপিসারে বেড়িয়ে যাচ্ছি… একজন ফেরারী হয়ে।

 

সনিয়ের চাতুর্যপূর্ণ এনাগ্রামটি এখনও তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ল্যাংডন অবাক হয়ে ভাবলো, সোফি মোনালিসাতে কী এমন খুঁজে পাবে…অবশ্য যদি কিছু পায়। সে একদম নিশ্চিত যে, তার দাদু তাকে বিখ্যাত চিত্রকর্মটি আরেকবার পরিদর্শন করার জন্য ইঙ্গিত করে গেছেন। কিন্তু ল্যাংডনের কাছে এটা হেঁয়ালী বলেই মনে হলো।

 

পি,এস, রর্বাট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করো।

 

সনিয়ে ল্যাংডনের নাম ফ্লোরে লিখে সোফিকে আদেশ করে গেছেন তাকে খুঁজে বের করতে। কিন্তু কেন? এজন্যে কি, যাতে ল্যাংডন এনাগ্রামটার মর্মোদ্ধার করতে তাকে সাহায্য করতে পারে?

 

এটা একেবারেই মনে হচ্ছে না।

 

হাজার হোক, সনিয়ের এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে, ল্যাংডন একজন দক্ষ এনাগ্রাম বিশেষজ্ঞ। আমরা এমনকি কখনও দেখাও করিনি। তাছাড়া, সোফি ইতিমধ্যেই ফিবোনাচ্চি সংখ্যামটা বের করতে পেরেছে, আরেকটু সময় পেলে বাকী মেসেজটার মর্মোদ্ধারও সে করতে পারবে। এগুলোর জন্য তো তার ল্যাংডনের কোন সাহায্যের দরকার নেই।

 

সোফি এনাগ্রামটা নিজে নিজেই বের করতে পারতো। হঠাৎ করেই ল্যাংডন এ ব্যাপারে একদম নিশ্চিত হয়ে গেলো। সে বুঝতে পারলো, সনিয়ের এরকম করার কারণটা কী।

 

আমি কেন? ল্যাংডন অবাক হয়ে হলের দিকে এগোলো। কেন সনিয়ের মৃত্যুকালীন ইচ্ছা হলো তাঁর বিচ্ছিন্ন হওয়া নাতনী আমাকে খুঁজে বের করুক?

 

হঠাৎ অন্য একটা ভাবনা খেলে গেলো ল্যাংডনের মনে। সে একটু থেমে পকেট হাতড়ে কম্পিউটার প্রিন্ট-আউটটা বের করলো। সনিয়ের মেসেজটার শেষ লাইনটার দিকে তাকালো সে।

 

পি,এস, রবার্ট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করো।

 

দুটো অক্ষরের দিকে সে চোখ স্থির করলো।

 

পি, এস।

 

হুট করেই ল্যাংডনের মনে হলো, সে সনিয়ের উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারছে। অনেকটা বজ্রপাতের মতো সিমোলজি আর ইতিহাস তার উপর পতিত হলো। আজ রাতে সনিয়ে যা যা করেছেন, তার সবটাই এখন স্পষ্ট বলেই তার কাছে মনে হচ্ছে। ল্যাংডনের চিন্তাভাবনাগুলো খুব দ্রুত সবকিছু মিলিয়ে একটা অর্থ দাঁড় করাতে শুরু করলো। ঘুরে, যেখান থেকে সে এসেছিলো, সেখানে আবার তাকালো।

 

সময় আছে কি?

 

সে জানতো, এতে অবশ্য কিছু যায় আসে না।

 

কোন রকম ইতস্তত না করেই, ল্যাংডন সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত উপরে উঠতে শুরু করলো।

 

 

 

২২.

 

বেদীর দিকটা ভালো করে দেখে নিয়ে সাইলাস হাটু গেঁড়ে প্রার্থনা করার ভান করলো। সেন্ট-সালপিচ, বেশির ভাগ চার্চের মতোই বিশালাকার রোমান ক্রসের আকাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এটার লম্বা কেন্দ্রীয় অংশটি মূল অংশ সরাসরি বেদীর দিকে চলে গেছে। সেখান থেকে ট্রানসেপ্ট নামের আরেকটা ছোট অংশ আড়া আড়ি চলে গেছে। মূল অংশটি এবং এর সাথে আড়াআড়ি ছোট অংশটাকে চার্চের প্রাণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় …সবচাইতে পবিত্র এবং আধ্যাত্মিক স্থান।

 

আজ রাতে নয়, সাইলাস ভাবলো। সেন্ট সালপিচ তার সিক্রেটটা অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখেছে।

 

ডান দিকে চেয়ে সে দক্ষিণ দিকের ক্রুশাকৃতির অংশটার দিকে তাকালো। তার শিকাররা যে বস্তুটার কথা তাকে বলেছিলো, পদ্রীর আসনের ওপাশে খোলা জায়গাটার দিকে সেটা দেখতে পেলো সাইলাস।

 

এইতো এটা।

 

ধূসর গ্রানাইট ফ্লোরের পাথরের মধ্যে শক্ত করে লাগিয়ে রাখা পালিশ করা পিতলের একটা ডোরা কাটা দাগ চক্ করছে…সোনালী রেখাটা চার্চের ফ্লোরটাকে আড়াআড়িভাবে বিরক্ত করে আছে। দাগটার মধ্যে কিছু চিহ্ন দেয়া আছে, অনেকটা রুলার-স্কেলের মতো। এটা সূর্য ঘড়ির কাঁটা। সাইলাসকে বলা হয়েছিলো যে, এটা একটা প্যাগান জ্যোর্তিবিদ্যার যন্ত্র, অনেকটা সূর্যঘড়ির মতো দেখতে। পর্যটক, বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ এবং প্যাগানরা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে সেন্ট সালপিচের এই বিখ্যাত রেখাটি দেখতে আসতো।

 

রোজ লাইন।

 

আস্তে আস্তে সাইলাস দাগটা লক্ষ্য করে ঘরের ডান থেকে বাম দিকে তাকালো। তার সামনে বেঢপ আকৃতির একটা কোণ, চার্চের সাথে একেবারেই অসামঞ্জস্যভাবে স্থাপিত। মূল বেদীটা এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত দাগ কাটা, যেনো সুন্দর কোন চেহারায় কাটা দাগের মতো। দাগটা চার্চের প্রস্তুটাকে এপাশ-ওপাশ ভাগ করে ফেলেছে। অবশেষে, উত্তর দিকের কোণায় পাদ্রীর আসনের কাছে গিয়ে থেমেছে। সেখানে এটা সবচাইতে অপ্রত্যাশিত একটা স্থাপত্যের গোড়ায় গিয়ে মিলেছে।

 

একটা বিশাল মিশরীয় অবিলিস্ক।

 

এখান থেকে, চকে রোজ লাইনটা নব্বই ডিগ্রি বাঁক নিয়ে সোজা অবিলিস্কের দিকে চলে গেছে। তেত্রিশ ফুট দূরে গিয়ে অবশেষে থেমেছে।

 

রোজ লাইন, সাইলাস ভাবলো। ভ্রাতৃসংঘ কি-স্টোনটা রোজ লাইনে লুকিয়ে রেখেছে।

 

আজ রাতে প্রথম দিকে সাইলাস যখন তার টিচারকে বলেছিলো যে, প্রায়োরি কি স্টোনটা সেন্ট সালচিপের অভ্যন্তরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, টিচার তখন সন্দেহ করেছিলেন। কিন্তু সাইলাস যখন খুলে বললো যে, ভ্রাতৃসংঘের সবাই তাকে ঠিক একই কথা বলেছে, ঠিক একই জায়গার বর্ণনা দিয়েছে, টিচারের কণ্ঠে তখন আতিশয্যের বহিপ্রকাশ পাওয়া গিয়েছিলো। তুমি রোজ লাইনর কথা বলছো!

 

টিচার সাথে সাথেই সাইলাসকে সেন্ট সালপিচের অদ্ভুত স্থাপত্যের খ্যাতি সম্পর্কে বলেছিলেন—একটা পিতলের ডোরা কাটা দাগ চার্চের ভেতরের জায়গাটাকে নিখুঁতভাবে উত্তর-দক্ষিণ অক্ষে বিভক্ত করেছে। এটা এক ধরনের প্রাচীন সূর্য ঘড়ি, যা প্যাগান মন্দিরের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট, আর ঠিক এই জায়গাটাতেই এক সময় একটা প্যাগান মন্দির অবস্থিত ছিলো। সূর্যের রশ্মি, দক্ষিণ দিকের চচকে দেয়াল থেকে প্রতিদিন একটু একটু করে দাগ ধরে এগিয়ে যায়, যা সময়ের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

 

উত্তর-দক্ষিণ ডোরা কাটা দাগটাই রোজ লাইন নামে পরিচিত। শত শত বছর ধরে রোজ বা গোলাপের প্রতীকটা মানচিত্রের দিক নির্দেশনার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলো। কম্পাস রোজপ্রায় সব মানচিত্রেই আঁকা থাকে যা উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিমকে নির্দেশ করে। আগে এটা উইন্ড-রোজ হিসেবে পরিচিত ছিলো। এটা বত্রিশটা বায়ু প্রবাহের দিক নির্দেশ করতে যা আটটা অর্ধেক বায়ু প্রবাহ আর ষোলোটা এক চতুর্থাংশ বায়ু প্রবাহ থেকে উদ্ভুত। যখন বৃত্তের মধ্যে এটা আঁকা থাকে তখন কম্পাসের এই বত্রিশটা বিন্দু ঐতিহ্যবাহী বত্রিশটা গোলাপের পাপড়ির সাথে মিলে যায়। আজকের দিনেও নেভিগেশনের মূল যন্ত্রপাতিকে বলা হয় কম্পাস রোজ। এটার দক্ষিণ দিকের নির্দেশনাটা এখনও একটা তীরের মাথা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়…খুব সাধারণভাবে সেটা ফ্লার-দ্য-লিস প্রতীক হিসেবেই পরিচিত।

 

একটি ভূ-গোলকে রোজ লাইনকে মধ্য রেখা অথবা দ্রাঘিমাংশ হিসেবেও ডাকা হয়দক্ষিণ-মেরু থেকে উত্তর-মেরু পর্যন্ত যে কোন কাল্পনিক রেখাকেই দ্রাঘিমাংশ বলা হয়। অবশ্য, ভূ-গোলকে সীমাহীন সংখ্যক দ্রাঘিমা রেখা রয়েছে, কারণ ভূ-গোলকের উত্তর দক্ষিণ দিকে কল্পনা করা যে কোন বিন্দু থেকেই দ্রাঘিমা রেখা টানা যায়। প্রাচীন। কালে এই রেখাগুলোকেই রোজলাইন হিসেবে ডাকা হতো শূন্য দ্রাঘিমা রেখা—যে রেখা থেকে অন্য দ্রাঘিমা রেখাগুলো মাপা হয়।

 

আজকের দিনে এই লাইনটাই হলো ইংল্যান্ডের গৃনিচ।

 

কিন্তু সবসময় এটা এখানে ছিলো না।

 

প্রধান মধ্যরেখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার অনেক আগে শূন্য দ্রাঘিমা রেখাটি প্যারিসে অবস্থিত ছিলো, আর সেটা ছিলো সেন্ট সালপিচেই। সেন্ট সালপিচের পিতলের ডোরা কাটা দাগটাই পৃথিবীর প্রথম প্রাইম মেরিডিয়ান বা প্রধান মধ্যরেখার স্মৃতি বহন করে আছে। আর যদিও গৃনিচ ১৮৮৮ সালে প্যারিস থেকে এই সম্মানটা ছিনিয়ে নেয়, তারপরও, আসল রোজ লাইন এখনও এখানে দেখা যায়।

 

আর এজন্যেই বিংবদন্তীটা সত্যি, টিচার সাইলাসকে বলেছিলেন। বলা হয়ে থাকে প্রায়োরি কি-স্টোনটা রোজ লাইন চিহ্নের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

 

সাইলাস, হাটু গেঁড়েই চার্চের চারপাশটা একটু দেখে নিলো, নিশ্চিত হলো, কেউ নেই। পরক্ষণেই, তার মনে হলো, কয়্যার বেলকনি থেকে নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে। সে ওদিকটায় কয়েক মুহূর্ত ভালো করে লক্ষ্য করলো কিন্তু কিছুই দেখতে পেলো না।

 

আমি একা।

 

এবার সে বেদীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ক্রুশ এঁকে বাম দিকে ঘুরে পিতলের ভোরা কাটা দাগটা অনুসরণ করে অবিলিস্কের উত্তর দিকে চলে গেলো।

 

 

 

ঠিক এই সময়ে রোমের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের রানওয়েতে টায়ারের ঘর্ষণ হলে বিশপ আরিঙ্গারোসার অন্যমনস্কভাবটা কেটে গেলো।

 

আমি এসে গেছি, তিনি ভাবলেন, যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দে আছেন ভেবে খুশি হলেন।

 

বেনভেনুতে এ রোমা, ইন্টারকমে ঘোষণাটা এলো। নড়েচড়ে বসে আরিঙ্গাবোসা তার কালো আলখেল্লাটা একটু শক্ত করে বেঁধে নিয়ে বিরল একটা হাসি হাসলেন। এই সফরটা করতে পেরে তিনি খুব সুখী অনুভব করছেন।

 

আমি অনেকদিন ধরেই রক্ষণাত্মক ছিলাম। আজ রাতে, এই নিয়মটা বদলে গেছে। মাত্র পাঁচ মাস আগে, আরিঙ্গারোসা তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের ভবিষ্যতটা নিয়ে বেশ ভীত ছিলেন। এখন, যেনো অনেকটা ঈশ্বরের ইচ্ছায়, সমাধানটা নিজেই উপস্থিত হয়েছে।

 

স্বর্গীয় হস্তক্ষেপ।

 

যদি প্যারিসের সব কিছুই পরিকল্পনা মাফিক এগোয়, আরিঙ্গাবোসা খুব জলদিই এমন কিছুর অধিকারী হয়ে উঠবেন, যা তাঁকে খৃস্টান বিশ্বে সবচাইতে শক্তিশালী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

 

 

 

২৩.

 

সোফি সলদে এতা-এর বিশাল কাঠের দরজার বাইরে এক দমে এসে পড়লো—এই ঘরেই মোনালিসা থাকে। ভেতরে ঢোকার আগে, হলের দিকে সে আনমনে তাকালো। বিশ গজ অথবা এরকমই হবে, যেখানে তার দাদুর মৃতদেহটা এখনও স্পট-লাইটের নিচে পড়ে রয়েছে। যে সুতীব্র অনুশোচনা তাকে আঁকড়ে ধরেছে, সেটা খুবই শক্তিশালী আর হঠাৎ করেই এসেছে। গভীর দুঃখবোধের সাথে সাথে তার অপরাধবোধও হলো। লোকটা এই দশ বছরে তার কাছে অসংখ্যবার আসতে চেয়েছে। তারপরও সোফি ছিলো অনড়—তাঁর দেয়া চিঠি-পত্র আর প্যাকেটগুলো না খুলেই ড্রয়ারে রেখে দিতো। সাক্ষাৎ করার ব্যাপারে একদমই রাজি হতো না। তিনি আমার সাথে মিথ্যে বলেছেন। ক্রমাগতভাবে গোপন করে গেছেন। আমার কীইবা করার ছিলো? তাই সোফি তাঁর কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতো।

 

আজ তার দাদু মৃত। এখন সোফির সাথে তিনি কবর থেকে কথা বলছেন।

 

মোনালিসা।

 

সে বিশাল কাঠের দরজাটার কাছে পৌঁছে সেটা ধাক্কা দিলে খুলে গেলো। সোফি একটু থমকে দাঁড়ালো। বিশাল আয়তক্ষেত্র কক্ষটি তাকিয়ে দেখলো, এটাও নরম লাল আলোতে স্নাত হয়ে আছে। সল-দে এতা হলো জাদুঘরের অন্যতম বিরল কস-দ্য সেক্—একেবারে শেষ মাথায় আর গ্র্যান্ড গ্যালারির মাঝামাঝিতে অবস্থিত। এই দরজাটাই এখানে ঢোকার একমাত্র প্রবেশ পথ। এটার মুখোমুখি, দূরের দেয়ালটাতে, বত্তিচেল্লির পনেরো ফুটের একটি চিত্রকর্ম আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। এটার নিচে, কাঠের ফ্লোরটার মাঝখানে, একটা বিশাল আটকোনা পালঙ্ক সদৃশ্য বেঞ্চিটা দর্শকদের বিশ্রামের আকাঙ্খ মিটিয়ে থাকে, তাদের ক্লান্ত পা দুটোকে বিশ্রাম দেয়, সেই সাথে লুভরের মূল্যবান সম্পদসমূহ অবলোকন করার সুযোগও তৈরি করে।

 

ভেতরে ঢোকার আগেই সোফি জানতো, কিছু একটা ফেলে এসেছে। ব্ল্যাক লাইটটা। সে হলের দিকে তাকালো, সেখানে তার দাদু স্পট-লাইটের নিচে পড়ে আছেন, চারিদিকে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি ভরা। যদি সেখানে তিনি কিছু লিখে থাকেন, তবে সেটা নিশ্চিতভাবেই ওয়াটারমার্ক স্টাইলাস দিয়ে লিখেছেন তিনি।

 

একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে সোফি দ্রুত সেই জায়গাটাতে চলে গেলো। তার দাদুর দিকে না তাকিয়েই সে পিটিএস যন্ত্রপাতিগুলোর দিকে নজর দিলো। একটা ছোট আলট্রাভায়োলেট পেন-লাইট খুঁজে পেলো সে। পেন-লাইটটা সোয়েটারের পকেটে ভরে সল দে এতা-এর খোলা দরজার দিকে চলে গেলো।

 

সোফি ঢুকতেই অপ্রত্যাশিত একটা শব্দ শুনতে পেলো, কারোর পায়ের আওয়াজ। সেটা তার দিকেই আসছে। এখানে অন্য কেউ আছে! লাল আলো থেকে আচমকাই একটা ভূতুরে অবয়ব আবির্ভূত হলো। সোফি লাফিয়ে পেছনে সরে গেলো।

 

এইতো তুমি! ল্যাংডন সোফির কাছে এসে চাপা কণ্ঠে বললো।

 

সোফির স্বস্তিটা ছিলো ক্ষণস্থায়ী। রবার্ট, আমি তোমাকে এখান থেকে বের হয়ে যেতে বলেছিলাম! ফশে যদি—

 

তুমি কোথায় ছিলে?

 

আমি ব্ল্যাক লাইট আনতে গিয়েছিলাম, নিচু স্বরে বললো। জিনিসটা পকেট থেকে বের করে আনলো সে। যদি আমার দাদু আমার জন্যে কোন মেসেজ রেখে যান-–

 

সোফি, শোনো। ল্যাংডন নিঃশ্বাস নিতে নিতে সোফির নীল চোখের দিকে চোখ স্থির করে বললো, পি,এস অক্ষর দুটো…তোমার কাছে কি অন্য কোন অর্থ বহন করে? অন্য কোন মানে আর কি?।

 

তাদের কথাবার্তা প্রতিধ্বনিত হয়ে নিচের হলে চলে যেতে পারে এই ভয়ে সোফি তাকে টেনে সল দে তা-এর ভেতরে নিয়ে এসে বিশাল দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ করে দিলো। আমি তোমাকে বলেছি তো, আদ্যক্ষরটির অর্থ প্রিন্সেস সোফি।

 

আমি জানি, কিন্তু তুমি কি এই অক্ষরগুলো অন্য কিছুতে দেখেছো? তোমার দাদু কি পি,এস অক্ষর দুটো অন্য কিছুতে ব্যবহার করেছিলেন, অন্য কোনভাবে? মনোগ্রাম হিসেবে, অথবা ব্যক্তিগত কোন জিনিসে?

 

প্রশ্নটা তাকে ভাবিয়ে তুললো। রবার্ট কিভাবে এটা জানতে পারলোর সোফি পিএস অক্ষর দুটো অবশ্যই আরো একবার দেখেছিলো। এক ধরনের মনোগ্রাম হিসেবে। সেটা ছিলো তার নবম জন্ম দিনের ঠিক আগে। সে গোপনে তার পুরো ঘরটা তল্লাসী চালিয়েছিলো জন্ম দিনের লুকানো উপহারের খোঁজে। এরপর থেকে, সোফি তার কাছ থেকে কোনো কিছু লুকিয়ে রাখাটা সহ্য করতে পারতো না। এই বছর আমার দাদ আমার জন্যে কি উপহার এনেছেন? সে কাপবোর্ড ও ড্রয়ার খুঁজে দেখে ছিলো। আমি যা চাচ্ছি সেই পুতুলটা কি তিনি এনেছেন? কোথায় সেটা রেখেছেন?

 

সারা বাড়িতে কিছু না পেয়ে সোফি তার দাদুর শোবার ঘরে তল্লাশী চালাবার সাহসও অর্জন করেছিলো। ঘরটা তার খুব কাছেই ছিলো, কিন্তু দাদু নিচের ঘরের সোফায় শুয়ে ছিলেন।

 

আমি খুব দ্রুতই কাজটা করে নেবো!

 

পায়ের পাতা উঁচু করে কাঠের ফ্লোরটা পেরিয়ে চুপি চুপি দাদুর ক্লোসেটের কাপড় সরিয়ে দেখেছিলো সে। কিছুই ছিলো না। তারপর, বিছানার নিচে দেখে ছিলো। তাঁর দাদুর ব্যুরোর দিকে এগিয়ে একের পর এক ড্রয়ার খুলে সেগুলো তন্নতন্ন করে দেখে ছিলো। আমার জন্যে কিছু একটা আছেই! নিচের ড্রয়ারটাতেও সে কোন পুতুলের চিহ্ন খুঁজে পায়নি। রেগেমেগে শেষ ড্রয়ারটা খুলে সে দেখতে পেয়ে ছিলো কতগুলো কালো রঙের পোশাক, যা কখনও তার দাদুকে পরতে দেখেনি। ড্রয়ারটা বন্ধ করার সময় ড্রয়ারের পেছনে একটা কিছু চমকাতে দেখে ছিলো সে। দেখতে ছিলো পকেট ঘড়ির চেইনের মতো। কিন্তু সে জানতো তিনি ওসব পরেন না। জিনিসটা কি সেটা বুঝতে পেরে তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়ে ছিলো।

 

একটা নেকলেস!

 

সোফি খুব সযত্নে চেইনটা ড্রয়ার থেকে বের করে এনে ছিলো। তার বিস্ময় বেড়ে গেলো যখন সে দেখতে পেলো চেইনটার শেষ মাথায় একটা সোনার চাবি। ভারি এবং চৰ্চকে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সে ওটা হাতে তুলে নিলো। সে জীবনে কখনও এরকম চাবি দেখেনি। বেশির ভাগ চাবিই সমতল, উঁচু-নিচু দাঁত বিশিষ্ট। কি এটার কলামটা ত্রিভূজাকৃতির আর সেটার উপর অনেকগুলো ছোট-ছোট দাগ। এটার বড় সড় সোনার মাথাটি ক্রুশ আকৃতির। কিন্তু সেগুলো সাধারণ ক্রুশের মতো নয়। সবগুলো বাহুই সমান, অনেকটা যোগ চিহ্নের মতো। ক্রুশটার মাঝখানে একটা অদ্ভুত প্রতীকদুটো অক্ষর এমনভাবে একটার সাথে আরেকটা লেগে আছে যেনো কোনো ফুলের ছবি।

 

পি এস, সোফি ফিসৃফিস্ করে বলেছিলো। এটা কি হতে পারে?

 

সোফি? তার দাদু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন। চমকে গিয়ে চাবিটা হাত থেকে ফেলে দিয়েছিলো সে। সোফি চাবিটার দিকেই চেয়ে ছিলো, তার দাদুর দিকে তাকাতে ভয় পাচ্ছিলো। আমি…আমার জন্মদিনের উপহার খুঁজছিলাম, সে বলেছিলো। সে জানতো, তাঁর বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেলেছে সে।

 

তার দাদুর নিরবে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটা তার কাছে অনন্ত কালের মতো মনে হচ্ছিলো। শেষে তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ছিলেন। চাবিটা তুলে নাও, সোফি।

 

সোফি চাবিটা তুলে নিয়ে ছিলো।

 

তার দাদু সামনে এগিয়ে এসে বলেছিলেন, সোফি, অন্য লোকদের একান্ত নিজস্ব ব্যাপার-স্যাপারগুলো তোমার সম্মান করার দরকার রয়েছে। খুব ধীরে তিনি হাট গেঁড়ে মাটি থেকে চাবিটা তুলে নিয়ে ছিলেন। এই চাবিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি তুমি এটা হারিয়ে ফেলো … তার দাদুর শান্ত কণ্ঠটা সোফিকে আরো বেশি ঘাবড়ে দিয়ে ছিলো।

 

আমি দুঃখিত গ্র্যঁ-পেয়া। সত্যি আমি দুঃখিত। সে একটু থেমে বলে ছিলো, আমি ভেবেছিলাম এটা আমার জন্মদিনের একটা নেকলেস।

 

তিনি তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে ছিলেন। আমি এটা আবারো বলছি, সোফি, কারণ এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্য লোকের ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলোকে তোমার সম্মান করা শিখতে হবে।

 

হ্যাঁ, গ্র্যঁ পেয়া।

 

এ ব্যাপারে আমরা পরে কথা বলবো। এখন, বাগানে আগাছা সাফ করতে হবে।

 

সোফি দ্রুত ঘর থেকে বাইরে বেড়িয়ে গিয়েছিলো গৃহস্থালীর কাজ করার জন্যে।

 

পরের দিন সকালে, সোফি তার দাদুর কাছ থেকে জন্ম দিনের কোন উপহার পায়নি। যা সে করেছে, তারপর সে এমন কিছু প্রত্যাশাও করেনি। কিন্তু তিনি সারাটা দিন তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছাও জানাননি। রাতে, দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে সোফি শুতে গিয়ে ছিলো। বিছানার বালিশের নিচে একটা কার্ড খুঁজে পেয়ে ছিলো সে। কার্ডে একটা সহজ সরল ধাঁধা ছিলো। ধাঁধাটা সমাধান করার আগেই সে মুচকি হেসে ছিলো। এটা কি, আমি তা জানি! তার দাদু গত ক্রিসমাসের সকালেও এটা করেছিলেন। গুপ্তধন খোজা!

 

সোৎসাহে সে ধাঁধাটা সমাধান করার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েলো। সমাধানটা তাকে বাড়ির আরেকটা জায়গার ইঙ্গিত দিলো, সেখানে সে অন্য আরেকটা ধাঁধার কার্ড খুঁজে পেলোলা। এটাও সোফি সমাধান করে ফেলে আরেকটা কার্ডের পেছনে ছুটলো। এভাবে। সে ঘরের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলো। একটা ক্লু থেকে আরেকটা কুতে। সোফি সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নিজের ঘরে এসে থমকে দাঁড়ালো। ঘরের মাঝখানে একটা লাল রঙের বাইসাইকেল রাখা। সাইকেলটার হাতলে একটা ফিতে বাধা। সোফি আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলো।

 

আমি জানি তুমি পুতুল চেয়েছিলে, তার দাদু বলে ছিলেন। এক কোণে দাঁড়িয়ে হাসছিলেন তিনি। আমার মনে হলো, এটা তার চেয়েও ভালো কিছু হবে।

 

পরের দিন, তাঁর দাদু তাকে সাইকেল চালানো শিখালেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাহায্য করলেন। যখন লনে সাইকেল চালাতে গিয়ে সোফি ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে দাদুসহ ঘাসের উপর চিৎপটাং হয়ে পড়ে গিয়েছিলো তখন তারা দুজনেই খুব হেসেছিলো।

 

গ্র্যঁ পেয়া, সোফি এই বলে তার দাদুকে জড়িয়ে ধরেছিলো। ঐ ঘটনার জন্য আমি সত্যি দুঃখিত।

 

আমি জানি, সুইটি। তোমাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। তোমার ওপর আমি বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারি না। দাদু আর নাতনী সব সময়ই একে অন্যকে মাফ করে দেয়।

 

সোফি জানতো তার জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে না, কিন্তু জিজ্ঞেস না করে থাকতেই পারলো না সে। এটা দিয়ে কি ভোলা হয়? এরকম চাবি আমি কখন দেখিনি। ওটা দেখতে খুব সুন্দর ছিলো।

 

তার দাদু কিছুক্ষণ নিরব ছিলেন; আর সোফি ভেবে পাচ্ছিলো না তিনি কী বলবেন। দাদু কখনও মিথ্যা বলেন না।

 

এটা দিয়ে একটা বাক্স খোলা হয়, অবশেষে তিনি বলে ছিলেন। সেখানে আমি অনেক গোপন কিছু লুকিয়ে রেখেছি।

 

সোফি কপট অভিমানের সুরে বলে ছিলো, আমি গোপনীয়তাকে ঘৃণা করি!

 

সেটা আমি জানি, কিন্তু এসব গোপনীয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একদিন তুমি আমার মতোই এটা সংরক্ষণ করবে।

 

আমি চাবির ওপরের অক্ষরগুলো দেখেছি, একটা ফুলও।

 

হ্যাঁ, আমার প্রিয় ফুল। এটাকে ফ্লার-দ্য-লিস বলা হয়। আমাদের বাগানে এগুলো আছে। সাদা রঙেরগুলো। ইংরেজিতে এ ধরনের ফুলকে আমরা বলি লিলি।

 

এগুলো আমি চিনি। এগুলো আমার প্রিয় ফুল!

 

তাহলে আমি তোমার সাথে একটা চুক্তি করি। তার দাদুর চোখ দুটো কপালে উঠে গিয়ে ছিলো, যেমনটি তিনি করে থাকেন তাকে একটা চ্যালেঞ্জ দেয়ার সময়। তুমি যদি আমার চাবিটার কথা গোপন রাখো, এবং এ ব্যাপারে কারো সাথে, এমনকি আমার সাথেও আর কখনও আলোচনা না করো, তবে একদিন তোমাকে আমি এটা দিয়ে দেবো।

 

সোফি তার নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলো না।

 

সত্যি?

 

আমি প্রতীজ্ঞা করছি। সময় এলে, চাবিটা তোমার হয়ে যাবে। এটাতে তোমার নাম লেখা আছে।

 

সোফি অবিশ্বাসে তাকালো। না, তাতে নেই। এটাতে পি এস লেখা আছে। আমার নাম তো পি এস নয়!

 

তার দাদু কণ্ঠটা নিচে নামিয়ে নিয়ে ছিলেন, যেনো অন্য কেউ কথাটা শুনতে না পায়। ঠিক আছে, সোফি, যদি তুমি জানতেই চাও তো শোনো, পিএস হলো একটা কোড। এটা তোমার গোপন নামেরই আদ্যক্ষর।

 

তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গিয়ে ছিলো। আমার গোপন নাম আছে?

 

অবশ্যই। নাতনীদের সবসময়ই একটা গোপন নাম থাকে, যা তাদের দাদুরাই কেবল জানে।

 

পি এস?

 

তিনি সোফিকে আলতো করে টোকা দিলেন। প্রিন্সেস সোফি।

 

সে মাথা দোলালো। আমি তো প্রিন্সেস নই!

 

তিনি আশ্বস্ত করে বলেছিলেন। আমার কাছে তুমি তা-ই।

 

সেদিন থেকে তারা আর চাবিটা নিয়ে কোন কথা বলেনি। আর সেও হয়ে উঠলো প্রিন্সেস সোফি।

 

 

 

সলদে এতাত্-এর ভেতরে সোফি নিরবে দাঁড়িয়ে হারানোর সুতীব্র বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো।

 

আদ্যক্ষরটা, তার চোখের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে ল্যাংডন ফিসফিস্ করে বললো। তুমি কি ওগুলো দেখেছো?

 

সোফির মনে হলো, তার দাদুর কণ্ঠস্বরটা জাদুঘরের করিডোর থেকে ভেসে আসছে। এই চাবিটা সম্পর্কে কখনও কিছু বলবে না, সোফি। আমার সাথে কিংবা অন্য কারোর সাথে। তার মনে পড়ে গেলো, পিএস, রবার্ট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করো। তার দাদু ল্যাংডনের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। সোফি মাথা নাড়লো। তা, আমি পিএস অক্ষরটা একবার দেখেছি। তখন আমি খুব ছোট ছিলাম।

 

কোথায়?

 

সোফি দ্বিধাগ্রস্ত হলো। তাঁর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এমন কোন কিছুতে।

 

ল্যাংডন তার চোখে চোখ রাখলো।

 

সোফি, এটা খুবই জরুরি। তুমি কি আমাকে বলতে পারো, আদ্যক্ষরটা একটা প্রতীকে ছিলো কিনা? একটা ফ্লার-দ্য লিস-এ?

 

সোফি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। কিন্তু…তুমি সেটা কীভাবে জানতে পারলে।

 

ল্যাংডন নিঃশ্বাস ছেড়ে নিচু কণ্ঠে বললো, আমি খুবই নিশ্চিত যে, তোমার দাদু একটি গোপন সংগঠনের সদস্য ছিলেন। খুবই পুরাতন, একটা গোপন ভ্রাতৃসংঘ।

 

সোফির মনে হলো তার পেটের ভেতরে কোন কিছু গিট দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। সেও এ ব্যাপারে খুব নিশ্চিত ছিলো। বিগত দশ বছর ধরে সে ঐ দুঃসহ ঘটনাটা ভুলতে চেষ্টা করেছে। সে অচিন্তনীয় কিছু একটা দেখে ফেলেছিলো। ক্ষমার অযোগ্য।

 

ফ্লার-দ্য-লিস, ল্যাংডন বললো, পি এস অক্ষর সংবলিত, এটা ভ্রাতৃসংঘের নিজস্ব প্রতীক। তাদের লোগো।

 

তুমি এটা কীভাবে জানো? সোফি মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলো যেনো ল্যাংডন আবার না বলে বসে যে, সে নিজেও ঐ সংগঠনের সদস্য।

 

আমি এই দলটির সম্পর্কে লিখেছি, সে বললো, তার কণ্ঠ উত্তেজনায় কাঁপছে। গোপন সংগঠনের প্রতীক নিয়ে গবেষণা করাই আমার বিশেষত্ব। তারা নিজেদেরকে ডাকে প্রায়োরি দ্য সাইওন বলে অর্থাৎ প্রায়োরি অব সাইওন। তারা ফ্রান্স ভিত্তিক হলেও, সারা ইউরোপ থেকে শক্তিশালী সদস্য আকর্ষিত করে থাকে। সত্যি বলতে কী, তারা এই পৃথিবীর সবচাইতে প্রাচীন গোপন সংগঠন।

 

সোফি তাদের ব্যাপারে কখনও কিছু শোনেনি।

 

ল্যাংডন এবার ক্রমাগতভাবে এ ব্যাপারে বলতে শুরু করলো।

 

প্রায়োরি অব সাইন ইতিহাসের অনেক বিখ্যাত সংস্কৃত ব্যক্তিত্বকে অর্ন্তভূক্ত করেছিলো : বত্তিচেল্লি, স্যার আইজাক নিউটন, ভিক্টর হুগোর মতো মানুষদেরকে। সে একটু থামলো। তার কণ্ঠটা এখন শিক্ষকের মতো শোনাচ্ছে। এবং লিওনার্দো দা ভিঞ্চি।

 

সোফি তার দিকে চেয়ে রইলো। দা ভিঞ্চি গোপন সংগঠনে ছিলেন?

 

দা ভিঞ্চি প্রায়োরিতে ১৫১০ থেকে ১৫১৯ সাল পর্যন্ত গ্র্যান্ড মাস্টার হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এতে তোমার দাদুর লিওনার্দো প্রীতি সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে। দুজনেই ঐতিহাসিক একটা দলিলে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। আর এটা তাদের দুজনেরই দেবীদের আইকননালজি, প্যাগান মতবাদ, নারীত্ব এবং চার্চবিরোধী কৌতূহলের সাথে খাপ খেয়ে যায়। পবিত্র নারী সম্পর্কে প্রায়োরিদের কাছে যথেষ্ট দলিল-দস্তাবেজ রয়েছে।

 

তুমি বলছো এই দলটি প্যাগান দেবীদের পূজক?

 

প্যাগান দেবীদের পূজকের চেয়েও বেশি কিছু। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তারা একটি প্রাচীন সিক্রেট অর্থাৎ গুপ্ত ব্যাপারের অভিবাবক হিসেবেই বেশি পরিচিত। এটা এমন একটা জিনিস, যা তাদেরকে সীমাহীন শক্তিশালী করে তুলেছিলো।

 

ল্যাংডনের কথাবার্তা সোফির কাছে অবিশ্বাস্য শোনালো। গোপন প্যাগান পূজক। এক সময় লিওনার্দো দা ভিঞ্চি তার প্রধান ছিলেন? এস কথা শুনতে একদম অর্থহীন বলে মনে হচ্ছে। তারপরও, এসব বাতিল করে দিলেও, তার মন ফিরে গেলো দশ বছর আগে রাতে, সে ভুলক্রমে তার দাদুকে দেখে যারপরনাই অবাক হয়েছিলো। এমন কিছু দেখে ফেলেছিলো সে যা কখনও মেনে নিতে পারেনি। এটাকে কি ব্যাখ্যা করা যায়–?

 

প্রায়োরিদের জীবন্ত সদস্যদের পরিচিতি খুবই গোপনীয় একটি ব্যাপার, ল্যাংডন বললো, কিন্তু তুমি ছোটবেলায় যে পিএস এবং ফ্লার-দ্য-লিস দেখেছিলে, সেটাই প্রমাণ করে, এটা কেবল প্রায়োরিদের সাথেই সংশ্লিষ্ট।

 

সোফি এখন বুঝতে পারলো যে, ল্যাংডন তার দাদু সম্পর্কে তার চেয়েও অনেক বেশি জানে। এই আমেরিকানটার অবশ্যই অনেক কিছু আছে যা তার সাথে ভাগ করা উচিত। কিন্তু এটা সেই জায়গা নয়। আমি তোমাকে তাদের হাতে ধরা পড়তে দিতে পারি না। রবাট, আমাদের অনেক কিছু নিয়েই কথা বলতে হবে। তোমাকে যেতে হবে!

 

ল্যাংডন কেবলমাত্র সোফির বিড়বিড় করাটাই শুনতে পেলো। সে কোথাও যাচ্ছে। অন্য আরেকটা জায়গায় সে হারিয়ে গেছে এখন। এমন এক জায়গায় যেখানে প্রাচীন গুপ্ত গোলাপটি উদয় হয়েছে। এমন এক জায়গায়, যেখানে বিস্মৃত ইতিহাস অন্ধকার থেকে বেড়িয়ে আসছে, ধীরে ধীরে।

 

ধীরে, যেনো পানির নিচে নড়ছে; ল্যাংডন তার মাথাটা ঘুরিয়ে লাল আলোর ঘোলাটে পরিবেশে থাকা মোনালিসার দিকে তাকালো।

 

ফ্লার-দ্য-লিস…দ্য ফ্লাওয়ার অব লিসা…মোনালিসা।

 

একটা আরেকটার সাথে সংশ্লিষ্ট। একটা নিঃশব্দ সিম্ফোনি প্রায়োরি অব সাইন আর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির গহীন গোপনীয়তাকে প্রতিধ্বনিত করতে লাগলো।

 

 

 

কয়েক মাইল দূরে, লে ইনভ্যালিদ পেরিয়ে, একটা নদীর তীরে, হতভম্ব এক ট্রাক ড্রাইভার অস্ত্রমুখে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ জুডিশিয়ারের ক্যাপ্টেন ট্রাকের পেছন থেকে একটা সাবানের টুকরো পেয়ে রাগে ফুঁসে ওঠে সিন নদীতে সাবানটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো।

 

 

 

২৪.

 

সাইলাস সেন্ট-সালপিচের অবিলিস্কটার দিকে তাকালো, বিশাল আর দীর্ঘ মার্বেলের গাঁথুনীটা দেখে হতাশ হলো। তার মাংসপেশী উত্তেজনায় আড়ষ্ট হয়ে আছে। সে চার্চের চারপাশটা আবার তাকিয়ে দেখলো নিশ্চিত হবার জন্য যে, সে একাই আছে এখানে। তারপর হাঁটু গেঁড়ে ওটার নিচে বসে পড়লো, শ্রদ্ধা বোধ থেকে নয়, প্রয়োজনে।

 

কি-স্টোনটা রোজ লাইনর নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সালপিচের অবিলিস্কটার গাঁথুনীর নিচে।

 

ভ্রাতৃসংঘের সবাই একই কথা বলেছিলো।

 

হাটু গেঁড়েই সাইলাস পাথরের জমিনে হাত দিয়ে খুঁজে ফিরলো আগা টাইলসের কোন ফাঁটল অথবা দাগ আছে কি না, যাতে সে বুঝতে পারে কোন টাইলসটা সরানো যাবে। মুষ্টিবদ্ধ হাতটা আলতো করে জমিনে আঘাত করতে লাগলো। সবগুলো টাইলসই পরীক্ষা করে দেখতে লাগলো সে। শেষ পর্যন্ত, একটা টাইলস থেকে অদ্ভুত প্রতিধ্বনি শোনা গেলো।

 

সাইলাসের ঠোঁটে হাসি দেখা গেলো, আর সেই সাথে বেলকনি থেকে সিস্টার সানভৃনের দীর্ঘ নিঃশ্বাসটাও বাতাসে ভেসে এলো। তাঁর গভীর অন্ধকার ভীতিটা এইমাত্র নিশ্চিত হলো। এই অতিথি সেরকম কেউ নয়, যে রকমটা তিনি মনে করেছিলেন। ওপাস দাইর রহস্যময় সন্ন্যাসীটা সেন্ট সালপিচে অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে।

 

একটা গোপন উদ্দেশ্য।

 

গোপনীয় কিছুর তুমিই একমাত্র ব্যক্তি নও, তিনি ভাবলেন। সিস্টার সানড়ন এই চার্চের একজন তত্ত্বাবধায়কের চেয়েও বেশি কিছু। তিনি একজন প্রহরীও বটে। আর আজ রাতে, সেই পুরনো চাকাটা আবার ঘুরতে শুরু করেছে। এই আগষুকের অবিলিস্কের গাঁথুনীর নিচে এসে কিছু খোঁজাটা ভ্রাতৃসংঘের একটা সংকেত।

 

এটা একটা নিরব যন্ত্রণার ডাক।

 

 

 

২৫.

 

প্যারিসের ইউএস এ্যামবাসি শাম্প এলিসির দক্ষিণের গ্যাবৃয়েল এভিনুর একটা ছোটখাটো কমপ্লেক্সে অবস্থিত। এই তিন একরের জায়গাটিকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার অর্থ, যে এখানে এসে পড়বে, সে-ই যুক্তরাষ্ট্রের আইন আর আশ্রয়ের অনুরূপ, একই রকম অধিকার ভোগ করবে।

 

এ্যামবাসির রাত্রিকালীন অপারেটর টাইম ম্যাগাজিনের আন্তর্জাতিক সংস্করণটা হাতে নিয়ে পড়ছিলো। ফোনটা বেজে ওঠায় সে বিরক্ত হলো।

 

ইউএস এ্যামবাসি, মেয়েটা বললো।

 

শুভ সন্ধ্যা। ফোনের অপর পাশ থেকে ফরাসি টানে ইংরেজিতে বললো। আমার একটু সাহায্যের দরকার। লোকটার কথাবার্তায় ভদ্রতা আর মার্জিতভাব থাকা সত্ত্বেও, তার কণ্ঠটা কট্রটে আর খুব বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ শশানাচ্ছিলো। আমাকে বলা হয়েছিলো যে, আপনাদের কাছে আমার একটা মেসেজ রয়েছে, অটোমেটেড সিস্টেমে। নাম ল্যাংডন। দুঃখের বিষয়, আমি আমার তিন ডিজিটের কোডটা ভুলে গেছি। আপনি যদি সাহায্য করতে পারেন, তবে আমি খুবই কৃতজ্ঞ থাকবো।

 

অপারেটর একটু চুপ মেরে গেলো, দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলো। আমি দুঃখিত স্যার, আপনার মেসেজটা অনেক দিন আগের হয়ে থাকবে। এই সিস্টেমটা দুবছর আগে নিরাপত্তাজনিত কারণে বদলে ফেলা হয়েছে। এখন সবগুলো একসেস কোড হলো পাঁচ ডিজিটের। আপনাকে কে বলেছে, আমাদের কাছে আপনার মেসেজ রয়েছে?

 

আপনাদের কাছে কোন অটোমেটেড ফোন সিস্টেম নেই?

 

না, স্যার। আপনার কোন মেসেজ আমাদের সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে থাকলে সেটা হাতে লেখায় হতে হবে। আপনার নামটা যেনো কী বললেন?

 

ইতিমধ্যেই ওপাশের লোকটা ফোন রেখে দিলো।

 

সিন নদীর তীরে পায়চারি করতে থাকা বেজু ফশের মনে হলো, সে বধির হয়ে গেছে। সে একেবারেই নিশ্চিত, ল্যাংডনকে সে লোকাল নাম্বারে ডায়াল করতে দেখেছে তিন সংখ্যার কোডটা দিয়ে। তারপর রেকর্ডিং করা মেসেজও সে শুনেছে। কিন্তু ল্যাংডন যদি এ্যামবাসিতেই ফোন না করে থাকে, তবে সে করলো কার কাছে? সাথে সাথেই তার চোখ গেলো সেলুলার ফোনের দিকে। ফশে বুঝতে পারলো উত্তরটা তার হাতের মুঠোয়ই আছে। ফোনটা করার জন্য ল্যাংডন আমার ফোনই ব্যবহার করেছিলো।

 

ফোনের মেনু বাটনটা চেপে সাম্প্রতিক করা ফোন কলের নাম্বারগুলো চেক্ করে ল্যাংডনের করা নাম্বারটা খুঁজে পেলো সে।

 

প্যারিসের একটা নাম্বার, তারপর সেটা তিন সংখ্যার কোড নাম্বার ৪৫৪-তে ডায়াল করা।

 

সেই নাম্বারটা পুণরায় ডায়াল করে ফশে লাইনটা পাবার জন্যে অপেক্ষা করলো।

 

অবশেষে, একটা নারী কন্ঠের জবাব এলো। বজুঁখ, ভু ইতে ব্যুঁ শেজ সোফি নেভু, রেকর্ড করা কণ্ঠটা বললো। জো সুই এবসেস্তে পুর লো মেমোয়া, মেই…

 

৪…৫…৪, সংখ্যাটা ডায়াল করার সময় ফশের রক্ত বলক দিয়ে উঠলো।

 

 

 

২৬.

 

সুবিশাল খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও, মোনালিসা মাত্র একত্রিশ ইঞ্চি লম্বা আর একুশ ইঞ্চি চওড়া—এমনকি লুভরের গিফট শপে বিক্রি হওয়া পোস্টারের চেয়েও এটা আকারে ছোট। সল দে এতা-এর উত্তর-পশ্চিম দেয়ালে, দুই ইঞ্চি পুরু বুলেট প্রুফ গ্লাসের পেছনে এটা টাঙানো রয়েছে। এটা আঁকা হয়েছে পপুলার কাঠের ওপর। তার ধোঁয়াটে, কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশটা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ফুমাতো স্টাইলের অনন্য সাধারণ কীর্তির স্বাক্ষর বহন করছে। এই স্টাইলে ফর্মগুলো একটার উপর আরেকটা ঘোয়াটে হয়ে আর্বিভূত হয়। লুভরে স্থান পাওয়ার পর থেকে মোনালিসা অথবা লা জকোন্দো, যেমনটি তাকে ফ্রান্সে ডাকা হয় দু দুবার চুরি হয়েছিলো। সাম্প্রতিক কালেরটা হয়েছিলো ১৯১১ সালে, যখন সে লুভরের সল ইমপেনেট্রেবল থেকে উধাও হয়েছিলো। প্যারিসবাসী রাস্তা-ঘাটে কান্নাকাটি করে, সংবাদপত্রে কলাম লিখে, চোরের কাছে ছবিটা ফিরে পাবার আবেদন জানিয়েছিলো। দুবছর বাদে, মোনালিসা ফ্লোরেলের একটা হোটেল কক্ষের ট্রাঙ্কের গোপন কুঠুরি থেকে উদ্ঘাটিত হয়েছিলো।

 

ল্যাংডন, এখন সোফিকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলো যে, তার চলে যাবার কোন ইচ্ছেই নেই। সোফির সাথেই সে সল দে এতা-এ ঢুকলো। সোফি ব্ল্যাক লাইটটা যখন জ্বালালো তখনও মোনালিসা বিশ গজ দূরে। হালকা নীল ক্রিসেন্ট আলোটা ফ্লোরের উপর গিয়ে পড়লো। সোফি আলোটা ফ্লোরে এমনভাবে নিক্ষেপ করলো যেনো ফ্লোরটা ঝাড়া মোছা করছে। লুমিনিসেন্ট কালি আছে কি না খুঁজে দেখলো সে।

 

তার পাশে হাটতে হাটতে ল্যাংডনের মনে হলো, বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলো মুখোমুখি দেখার সুযোগটা আবারো আসলো। তার বাম দিকে, ঘরের মাঝখানে কাঠের ফ্লোরে রাখা আটকোনা বেঞ্চিটাকে অন্ধকারে মনে হচ্ছিলো একটা ফাঁকা কাঠের সমুদ্রে ভেসে থাকা দ্বীপ।

 

ল্যাংডন এবার দেয়ালের কালো গ্লাসের প্যানেলটা দেখতে পেলো। সে জানতো, এটার পেছনেই, নিজের ঘরে বন্দী হয়ে আছে বিশ্বের সবচাইতে খ্যাতিমান চিত্রকর্মটি।

 

ল্যাংডন জানে, বিশ্বের সবচাইতে বিখ্যাত চিত্রকর্ম হিসেবে মোনালিসার যে অবস্থান তার সাথে রহস্যময় হাসির কোন সম্পর্ক নেই। অনেক চিত্রসমালোচক আর ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়ানো ভক্তের রহস্যময় ব্যাখ্যার জন্যেও নয়। খুব সহজেই বলা যায়, মোনালিসা বিখ্যাত, কারণ লিওনার্দো দা ভিঞ্চি দাবি করেছিলেন যে, এটা তার সবচাইতে সেরা কাজ। তিনি যেখানেই যেতেন, ছবিটা সঙ্গে নিয়ে নিতেন। যদি জিজ্ঞেস করা হয় কেন, জবাবটা হলো, তিনি এতে তার নারী সৌন্দর্যের সূক্ষ্মপ্রকাশ ঘটাতে পেরেছিলেন।

 

তারপরও, চিত্রকলার ইতিহাসবিদদের অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, দা ভিঞ্চি মোনালিসাকে শ্রদ্ধা করেছেন তার শৈল্পিক রহস্যের জন্য নয়। সত্যি বলতে কী, ছবিটা বিস্ময়করভাবেই ফুমাতে পোট্রেটের একটি সাধারণ কাজ। এই কাজের জন্য দা। ভিঞ্চির প্রশংসা, অনেকেই দাবি করে, এর অন্তর্নিহিত কিছুর জন্যেই : ছবিটার পরতে পরতে লুকায়িত কোন মেসেজের জন্য। মোনালিসা, সত্যি বলতে কী, পৃথিবীর সবচাইতে নথিবদ্ধ বিখ্যাত অর্ন্তনিহিত একটি জোক। সাম্প্রতিক সময়ে এই ছবিটির দ্ব্যর্থবোধকতা আর ঐন্দ্রজালিক ব্যাপারটি উন্মোচিত হলেও, অবিশ্বাস্যভাবেই, এটা এখনও তার হাসির জন্যেই বিশাল রহস্য হয়ে আছে।

 

কোন রহস্যই নেই, ল্যাংডন ভাবলো। সে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো সোফির পাশাপাশি। কোন রহস্যই নেই।

 

অতিসম্প্রতি, ল্যাংডন মোনালিসার রহস্যময়তা আর গুপ্তব্যাপারটি নিয়ে একদল অদ্ভুত লোকের চিন্তাভাবনার সাথে পরিচিত হয়েছিলো—এসেক্সের কাউন্টি জেলের একদল কয়েদী। ল্যাংডনের এই জেল সেমিনারটা ছিলো হারভার্ডের জেলখানায় শিক্ষা দীক্ষার প্রকল্পের একটি অংশ বিশেষ অপরাধীদের জন্য সংস্কৃতি, ল্যাংডনের সহকর্মীরা এটাকে এই নামেই উল্লেখ করেছিলো।

 

জেলখানার লাইব্রেরির অন্ধকার একটি কক্ষে, মাথার ওপর একটা প্রজেক্টর নিয়ে ল্যাংডন কয়েদীদের সাথে মোনালিসার রহস্য আর গুপ্ত ব্যাপারটা আলোচনা করেছিলো। ওখানে সে দেখতে পেয়েছিলো, লোকগুলো বিস্ময়করভাবেই খুব। মনোযোগী রাফ এন্ড টাফ, কিন্তু প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। আপনারা হয়তো খেয়াল করে থাকবেন, প্রজেক্টর থেকে মোনালিসার ছবিটা লাইব্রেরির দেয়ালে প্রক্ষেপন করে সেখানে হেটে গিয়ে ল্যাংডন তাদের বলেছিলো, তার পেছনের দৃশ্যপটটা অসমান। ল্যাংডন তাদের দিকে ঘুরে বললো, দা ভিঞ্চি বাম দিকের আনুভূমিক রেখাটা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই ডান দিকের চেয়ে একটু নিচু করে এঁকেছেন।

 

দা ভিঞ্চি এটাকে টাল করে ফেলেছেন? কেউ একজন বলেছিলো।

 

ল্যাংডন কথাটাতে খুব মজা পেয়ে ছিলো। না, দা ভিঞ্চি এরকমটা হরহামেশা করতেন না। আসলে এটা দা ভিঞ্চির একটা ছোটখাটো চালাকি। বাম দিকের নৈসর্গিক দৃশ্যটা একটু নিচু করে দেয়ায়, মোনালিসাকে ডান দিকের তুলনায়, বাম দিক থেকে একটু বড় দেখা যায়। এটা দা ভিঞ্চির একটা ছোট্ট অর্ন্তনিহিত জোক। ঐতিহাসিকভাবে নারী আর পুরুষের অবস্থানগত হিসাবটা হলো বাম দিক নারীর। ডান দিক পুরুষের। যেহেতু দা ভিঞ্চি নারীবাদের একজন বড় ভক্ত ছিলেন, তাই তিনি মোনালিসাকে এমনভাবে একেছেন যেনো, ডান দিকের তুলনায় বাম দিক থেকে তাকে বেশি অভিজাত আর বড় দেখায়।

 

আমি শুনেছি, তিনি একজন সমকামী ছিলেন, ছোটখাটো ছাগলা দাড়িওয়ালা এক লোক বললো।

 

ল্যাংডন চোখ কুচকে বললো, ঐতিহাসিকরা সাধারণত ব্যাপারটাকে এভাবে দেখেন না, কিন্তু এটা সত্যি, দা ভিঞ্চি একজন সমকামী ছিলেন।

 

একজন্যেই কি তিনি এইসব নারী সংক্রান্ত বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন?

 

আসলে, দা ভিঞ্চি ছিলেন নারী এবং পুরুষের মধ্যেকার ভারসাম্যপূর্ণ একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মধ্যে যততক্ষণ না, নারীপুরুষ উভয়ের উপাদান থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার আত্মা আলোকিত হবে না।

 

তার মানে, বলতে চাচ্ছেন, পুরুষের মধ্যে মেয়েলীপনা থাকতে হবে? কেউ একজন বললো।

 

কথাটা শুনে ঘরের মধ্যে একটা হাসির রোল পড়ে গেলো। ল্যাংডন ভাবলো Hermaphrodite শব্দটির শাব্দিক ব্যাখ্যাটা আলোচন করবে, যা Hermes আর Aphrodite শব্দের সম্মিলনে তৈরি হয়েছে। কিন্তু তার কাছে মনে হলো, এটা হয়তো এই হৈহল্লার মধ্যে হারিয়েই যাবে।

 

এই, মি. ল্যাংফোর্ড, শক্তপেশীর এক লোক বললো, এটা কি সত্য যে, মমানালিসা দা ভিঞ্চির নিজের ছবিরই অনুকরণ? আমি শুনেছি, এটা সত্যি।

 

এটা খুবই সম্ভব, ল্যাংডন বললো, দা ভিঞ্চি একজ খেয়ালি মানুষ ছিলেন। কম্পিউটারের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোনালিসা এবং দা ভিঞ্চির আত্ম-প্রতিকৃতির সাথে অদ্ভুত রকমের সাদৃশ্য রয়েছে। দা ভিঞ্চি যা-ই করে থাকুক, ল্যাংডন বললো, তার মোনালিসা না পুরুষ, না নারী। এটা আসলে দুটোরই মিলিত রূপ।

 

আপনি নিশ্চিত, এটা হরাভার্ডের সেই হাজামজা জিনিস না, যারা বলে, এটা হলো এক কুৎসিত ছুক্‌রি।

 

ল্যাংডন হেসে ফেললো। আপনি হয়তো ঠিক বলেছেন। কিন্তু দা ভিঞ্চি আসলে যথেষ্ট কু রেখে গেছেন যে, ছবিটা উভয়লিঙ্গের। এখানে কেউ কি মিশরীয় দেবী আমন এর নাম শুনেছেন?

 

হ্যাঁ-হ্যাঁ। বিশালাকৃতির লোকটা বললো। পুরুষ উর্বরতার দেবতা!

 

ল্যাংডন দারুণ অবাক হলো।

 

এটা আমন কনডমের প্রতিটি প্যাকেটেই বলা আছে। পেশীবহুল লোকটা চওড়া একটা হাসি দিলো। এটাতে একটা ভেড়া-মাথার পুরুষ রয়েছে আর বলা হয়েছে, সে হলো মিশরীয় উর্বরতার দেবতা।

 

ল্যাংডন অবশ্য এই কনডম কোম্পানির নামটার সাথে পরিচিত ছিলো না। তার পরও সে খুব খুশি হলো যে, প্রস্তুতকারকরা তাদের সঠিক হায়ারোগ্লিফস ঠিকই ধরতে পেরেছে। খুব ভালো। আমন সত্যি ভেড়া মাথাওয়ালা পুরুষকেই প্রতিনিধিত্ব করে আর তার বাঁকানো শিং দুটো আমাদের আধুনিক যৌন স্ল্যাং Hornyর সাথে সংশ্লিষ্ট।

 

কী!

 

কী, ল্যাংডনও পাল্টা বললো। আপনারা কি জানেন, আমনের সঙ্গী কে ছিলো? মিশরীয় উর্বরতার দেবী? প্রশ্নটা কয়েক মুহূর্তের নিরবতার আবহ তৈরি করলো।

 

আইসিস, ল্যাংডন তাদের বললো। একটা কলম হাতে তুলে নিলো সে। তো, আমরা পুরুষ দেবতা আমনকে পেলাম। সে নামটা লিখে ফেললো। আর নারী দেবী আইসিস, যার প্রাচীন প্রতীকটাকে ডাকা হতো LISA বলে। ল্যাংডন লেখা শেষ করে প্রজেক্টরের সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো।

 

AMONLISA

 

কিছু বোঝা যাচ্ছে? সে জিজ্ঞেস করলো।

 

Mona Lisa … পবিত্র জঞ্জাল, কেউ একজন ফোঁস করে উঠলো।

 

ল্যাংডন মাথা নেড়ে সায় দিলো। ন্দ্রমহোদয়গণ, মোনালিসার চেহারাটা শুধুমাত্র উভলিঙ্গেরই নয়, তার নামটাও নারী-পুরুষের স্বর্গীয় ঐক্যের একটি এনাগ্রাম। আর এটাই, আমার বন্ধুগণ, দা ভিঞ্চির ছোটখাটো রহস্য আর মোনালিসা যে হাসছে তার কারণ।

 

 

 

আমার দাদু এখানেই ছিলেন, সোফি বললো, হঠাৎ করেই মোনালিসা থেকে মাত্র দশ ফিট দূরে হাটু গেঁড়ে বসে পড়লো। সে ব্ল্যাক লাইটের আলোটা কাঠের ফ্লোরে ফেলে খুঁজতে লাগলো কিছু।

 

প্রথমে ল্যাংডন কিছুই দেখতে পেলো না। তারপর, সেও হাটু গেঁড়ে তার পাশে বসে পড়তেই, দেখতে পেলো ছোট্ট এক ফোটা শুকিয়ে যাওয়া তরল, যা আসলে লুমিনেসিং। কালি? হুট করেই সে বুঝে গেলো ব্ল্যাক লাইটটা যার জন্যে আসলে ব্যবহার করা হয়। রক্ত। তার চিন্তা ভাবনা একটু ধাক্কা খেলো। সোফি ঠিকই বলেছে। জ্যাক সনিয়ে মারা যাবার আগে মোনালিসা দেখতে এসেছিলেন।

 

তিনি এখানে কোন কারণ ছাড়া আসেননি, সোফি উঠে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বললো। আমি জানি, তিনি এখানে আমার জন্যে একটা মেসেজ রেখে গেছেন। সে সোজা চলে এলো মোনালিসার ঠিক সামনে। ছবিটার সামনের ফ্লোরে ব্ল্যাক লাইটটা দিয়ে কিছু খুঁজে চললো সে।

 

এখানে কিছু নেই!

 

ঠিক সেই মুহূর্তেই, ল্যাংডন মোনালিসার বুলেটপ্রুফ কাঁচের ওপর হালকা বেগুনী রঙের কিছু একটা দেখতে পেলো। সামনে এসে সে সোফির হাতটা ধরে ধীরে ধীরে ব্ল্যাক লাইটটা ছবিটার দিকে নিক্ষেপ করলো।

 

দুজনেই বরফের মতো জমে গেলো।

 

কাঁচের ওপর, বেগুনী রঙের ছয়টা শব্দ জ্বল জ্বল করছে। সরাসরি মোনালিসার চেহারা বরাবর।

 

 

 

২৭.

 

সনিয়ের ডেস্কে বসে, লেফটেনান্ট কোলেত অবিশ্বাসে তার কানে ফোনটা ধরলো। আমি ফশের কথা ঠিক ঠিক শুনতে পারছি? একটা সাবানের টুকরো? কিন্তু ল্যাংডন কীভাবে জিপিএস ডটটার কথা জানতে পারলো?

 

সোফি নেভু, ফশে জবাব দিলো। সে-ই ওকে বলেছে।

 

কী! কেন?

 

খুব ভালো প্রশ্ন করেছে, আমি এইমাত্র একটা রেকর্ড করা মেসেজ শুনে বুঝতে পেরেছি সোফিই ওকে সর্তক করে দিয়েছে।

 

কোলেত বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লো। নেভু কি ভাবছে? ফশের কাছে প্রমাণ রয়েছে, সোফি নেভু ডিসিপিজের অপারেশনে নাক গলিয়েছে? সোফি নেভূকে শুধু বরখাস্তই করা হবে না, জেলেও যেতে হবে। কিন্তু, ক্যাপ্টেন…তাহলে ল্যাংডন এখন কোথায় আছে?

 

এখানকার কোন ফায়ার এলার্ম কি বেজেছে?

 

না, স্যার।

 

আর গ্র্যান্ড গ্যালারির সদর দরজা দিয়ে কেউ কি বের হয়েছে?

 

না। সদর দরজায় আমাদের নিরাপত্তা অফিসাররা রয়েছে। আপনার অনুরোধেই তাদের রাখা হয়েছে।

 

ঠিক আছে, ল্যাংডন অবশ্যই গ্র্যান্ড গ্যালারির ভেতরে আছে।

 

ভেতরে? কিন্তু, সে করছেটা কি?

 

লুভরের নিরাপত্তা প্রহরী কি সশস্ত্র অবস্থায় রয়েছে?

 

হ্যাঁ, স্যার। সে একজন সিনিয়র ওয়ার্ডেন।

 

তাকে ভেতরে পাঠাও, ফশে আদেশ করলো।আমি আমার লোকদেরকে কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে ফিরে আনতে পারবো না, আর আমি চাই না ল্যাংডন ওখান থেকে বের হয়ে যাক। ফশে একটু থামলো। তুমি প্রহরীকে বলে দাও, এজেন্ট সোফি নেভুও তার সাথেই আছে।

 

আমার মনে হয়,এজেন্ট নেভু চলে গেছে।

 

তুমি কি তাকে চলে যেতে দেখেছো?

 

না, স্যার কিন্তু–

 

ওখানকার কেউই তাকে চলে যেতে দেখেনি। তারা শুধু তাকে ঢুকতে দেখেছে।

 

কোলেত সোফি নেভুর সাহসিকতায় দারুণ অবাক হলো। সে এখনও ভেতরেই আছে?

 

এদিকটা একটু সামলাও, ফশে নির্দেশ দিলো। আমি চাই, ফিরে এসেই যেনো দেখি ল্যাংডন আর সোফি অস্ত্রের মুখে বন্দী হয়ে আছে।

 

ট্রাকটা চলে যেতেই ক্যাপ্টেন ফশে তার লোকদের জড়ো করলো। রবার্ট ল্যাংডন আজ রাতে একটা লুকোচুরি খেলা শুরু করেছে। আর এখন এজেন্ট নেভু তাকে সাহায্য করছে। ধারণার চেয়েও তাকে বেশি কঠিন বলে মনে হচ্ছে।

 

ফশে ঠিক করলো, সে কোন সুযোগই দেবে না ওদের। তার লোকদের অর্ধেককে লুভরে ফিরে যেতে বললো সে। বাকি অর্ধেক লোককে প্যারিসের একমাত্র যে স্থানে ল্যাংডন নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারে, সেখানে গিয়ে পাহাড়া দিতে বললো।

 

 

 

২৮.

 

সল দে এতাত-এর ভেতরে ল্যাংডন বুলেট প্রুফ কাঁচের ওপর লেখা ছয়টা শব্দের দিকে বিস্ময়ে চেয়ে রইলো। লেখাগুলো দেখে মনে হচ্ছে বাতাসে ভাসছে। সেগুলোর ছায়া মোনালিসার রহস্যময় হাসির উপরে গিয়ে পড়েছে।

 

তোমার দাদু, ল্যাংডন নিচু স্বরে বললো।  প্রায়োরিদের একজন সদস্য ছিলেন, এটা তারই প্রমাণ!

 

সোফি তার দিকে দ্বিধাগ্রস্তভারে তাকালো। তুমি এটা বুঝতে পেরেছো?

 

এটা খুবই নিখুঁত, ল্যাংডন মাথা নেড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বললো। এটা প্রায়োরিদের একটি মূল দর্শনকেই ব্যক্ত করছে! মোনালিসার চেহারায় ভেসে থাকা মেসেজটার দিকে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো সে।

 

SO DARK THE CON OF MAN

 

সোফি, ল্যাংডন বললো। দেবী পূজার ব্যাপারে প্রায়োরিদের বিশ্বাসের মূলে যে প্রেক্ষাপট রয়েছে সেটা তোমাকে জানতে হবে। খৃস্টিয় চার্চের শুরুর দিকে, ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে পৃথিবীকে নারীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলো, যাতে করে পুরো ব্যাপারটা পুরুষতন্ত্রের পক্ষে যায়।

 

লেখাগুলোর দিকে চেয়ে সোফি নিচুপ রইলো।

 

প্ৰায়োরিরা বিশ্বাস করে, কনস্টানটিন এবং তার পুরুষ-বংশধরেরা সাফল্যজনকভাবেই মাতৃতান্ত্রিক প্যাগান সমাজকে পিতৃতান্ত্রিক খৃস্টিয় সমাজে রূপান্তরিত করেছিলেন পবিত্র নারীকে ডাইনীকরণের মধ্য দিয়ে, আধুনিক ধর্ম থেকে তাদেরকে চিরতরের জন্য নির্বাসিত করে।

 

সোফি নির্বাক হয়ে রইলো। আমার দাদু আমাকে এসব জিনিস খুঁজে বের করার জন্য এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি অবশ্যই এর চেয়ে বেশি কিছু বলার চেষ্টা করেছেন।

 

ল্যাংডন বুঝতে পারলো সে কি বোঝাতে চাইছে। সে মনে করছে এটা একটা কোড! এখানে কোন লুকানো অর্থ আছে কী না সেটা ল্যাংডন তৎক্ষণিকভাবে বলতে পারলো না। তার মন সনিয়ের লেখা মেসেজটার কথা ভেবে ভেতরে ভেতরে দারুণ উত্তেজিত বোধ করছিলো।

 

So dark The con of man অর্থাৎ অন্ধকার মানুষের বিরুদ্ধে, সে ভাবলো। খুবই অন্ধকার। আজকের সমস্যা সংকুল বিশ্বে আধুনিক চার্চ যে, বিশাল জনকল্যাণ মূলক কাজ করেছে সে ব্যাপারটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না, তারপরও বলতে হয়, চার্চের রয়েছে খুবই জঘন্য আর হিংসাত্মক এক ইতিহাস। তাদের বর্বর ক্রুসেড তিন শতাব্দী ধরে প্যাগান আর নারী পূজারীদের পুণঃদীক্ষা করেছে। আর এসব করতে গিয়ে তারা এমন সব পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলো, যা এতোটাই বিভীষিকাময় ছিলো যে তারা আরো বেশি উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন।

 

ক্যাথলিক ইনকুইজিশন একটা বই প্রকাশ করেছে যাকে মানব ইতিহাসের সবচাইতে রক্তাক্ত-ঘামের প্রকাশনা হিসেবে বলা যেতেই পারে। মালিয়াস মেল ফিকারাম অথবা ডাইনী শায়েস্তাকরণ—এমন একটি মতবাদ, যাতে বলা হয়েছে মুক্তচিন্তার নারীরা বিপজ্জনক। আর পুরোহিতদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কীভাবে তাদেরকে খুঁজে বের করে অত্যাচার করে ধ্বংস করা যেতে পারে। চার্চ যাদেরকে ডাইনী বলে মনে করেছিলো তাদের মধ্যে জ্ঞানী, নারী যাজক, জিপসি, আধ্যাত্মিক নারী ব্যক্তিত্ব, প্রকৃতি প্রেমী, লতাপাতা সংগ্রহকারী এবং প্রাকৃতিক বিশ্বের সাথে মিলে যায় এমন যে কোন নারী। ধাত্রীদেরকেও হত্যা করা হয়েছিলো তাদের উত্তরাধিকারী সূত্রে পাওয়া বাচ্চা প্রসবের সময় প্রসূতির বেদনা লাঘবের কৌশলের জন্য প্রসব বেদনাটা, চার্চের দাবি অনুসারে, হাওয়া স্বর্গ থেকে জ্ঞানের গন্ধম ফল খাওয়ার জন্য ঈশ্বর প্রদত্ত একটি ন্যায়সঙ্গত শাস্তি। এভাবেই তারা প্রসব বেদনার মধ্য দিয়ে আদি পাপের শাস্তি বহন করে। তিন শত বছর ধরে ডাইনী শিকারের সময়ে চার্চ অবিশ্বাস্য সংখ্যক পঞ্চাশ লক্ষ নারীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিলো।

 

প্রচারণা আর রক্তপাত বেশ ভালোই কাজে লেগেছিলো। সফল হয়েছিলো তারা। আজকের এই পৃথিবীই তার সব চেয়ে বড় প্রমাণ।

 

এক সময় আধ্যাত্মিক উজ্জীবনের অর্ধেক হিসেবে যে নারী গণ্য হতো, তারা এই পৃথিবীর ধর্মশালা থেকে একেবারেই উৎখাত হয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্বে কোন নারী অর্থোডক্স রাব্বি নেই, কোন নারী ক্যাথলিক যাজক নেই, এমন কি ইসলামী দুনিয়ায় কোন নারী ধর্মীয় নেতাও নেই। এক সময় যে হায়ারোস গামোস অর্থাৎ নারী পুরুষের স্বাভাবিক সঙ্গমের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার পূর্ণতায় পৌঁছানো কাজটাকে ভক্তি করা হতো, সেটাই হয়ে উঠলো লজ্জাজনক একটি কাজ। সাধুপুরুষরা এক সময় ঈশ্বরের সাথে মিলিত হবার জন্যে তাদের নারী সঙ্গীদের সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হতেন। সেই তাঁরাই তাঁদের স্বাভাবিক যৌন তাড়নাকে শয়তানের কাজ বলে মনে করতে শুরু করলেন। নারীদের সাথে মিলিত হওয়াটা শয়তানি কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হলো।

 

নারীদের সাথে সংশ্লিষ্ট, বাম দিকটাও চার্চের হাত থেকে রেহাই পায়নি। ফ্রান্স এবং ইতালিতে, বাম শব্দটার অর্থ গশে এবং সিনিস্ত্রা—এটা এসেছে খুবই নেতিবাচক অর্থ থেকে। যেখানে ডান দিকের সঙ্গী হলো সততা নিরপেক্ষতা আর বিশুদ্ধতার প্রতীক, সেখানে আজকের দিনেও, উগ্রবাদী চিন্তাসমূহকে বলা হয় বামপন্থী, অযৌক্তিক চিন্তাকে বলা হয় বাম মস্তিস্ক, আর শয়তানী ব্যাপারকে বলা হয় সিনিস্তার।

 

দেবীদের দিন শেষ হয়ে গেছে। পেন্ডুলামটা ঝুলছে। ধরিত্রী জননী হয়ে উঠেছে পুরুষের বিশ্ব। আর তাই ধ্বংসের দেবতা এবং যুদ্ধ ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাচ্ছে এই বিশ্বে। পুরুষ অহংবোধটা তাদের নারী সঙ্গীদের অলক্ষ্যে দুই হাজার বছর কাটিয়ে দিয়েছে। প্রায়োরি অব সাইওন বিশ্বাস করে, পবিত্র নারীকে এভাবে দমন করার জন্য আমাদের আধুনিক জীবন হয়ে গেছে আমেরিকান আদিবাসিরা যাকে বলে কয়ানিস কোয়াসি অর্থাৎ ভারসাম্যহীন জীবন—একটা অস্থিতিশীল অবস্থা, যা নারী বিদ্বেষী সমাজের আধিক্য আর পুরুষতান্ত্রিকতার যুদ্ধংদেহীভাবকেই চিহ্নিত করে আর সেই সাথে ধরিত্রী মাতাকে ক্রমবর্ধমানভাবে অসম্মান করা হয়।

 

রবার্ট! সোফি বললো, তার কণ্ঠ অস্ফুট। কেউ আসছে!

 

সে হলওয়ে থেকে একটা পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলো।

 

এখানে! সোফি তার ব্ল্যাক লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে ল্যাংডনের সামনে থেকে যেনো উধাও হয়ে গেলো।

 

মূহূর্তের জন্য ল্যাংডনের মনে হলো, সে একদম অন্ধ হয়ে গেছে। এখানে! তার দৃষ্টিটা পরিষ্কার হতেই সে দেখতে পেলো সোফির অবয়বটা ঘরের মাঝখানে আটকোনা বেঞ্চিটার আড়ালে চলে যাচ্ছে। যখন একটা কণ্ঠ তাকে থামতে বললো, সেও সোফিকে অনুসরণ করতে লাগলো।

 

আরেতেজ! দরজা থেকে একটা কণ্ঠ বললো। লুভরের নিরাপত্তারক্ষী সল দে এতার ভেতরে প্রবেশ করে তার পিস্তলটা ল্যাংডনের বুকের কাছে তা করলো।

 

ন্যাংডন তার দুহাত উপরে তুলে ধরলো।

 

কুশেজ—ভূ! রক্ষীটা আদেশ করলো। শুয়ে পড়ো!

 

ল্যাংডন মুহূর্তেই ফ্লোরের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়লে রক্ষীটা দ্রুত কাছে এসে তার পায়ে লাথি মারলো।

 

মভোয়া আইদি, মঁসিয়ে ল্যাংডন, সে ল্যাংডনের পিঠে অস্ত্রটা ঠেকিয়ে বললো,মভোয়া আইদি।

 

কাঠের ফ্লোরে হাত-পা ছড়িয়ে এভাবে শুয়ে থাকাটা ল্যাংডনের কাছে নিয়তির নির্মম পরিহাস বলে মনে হলো। উপুড় হয়ে থাকা ভিটাভিয়ান ম্যান, সে ভাবলো।

 

 

 

২৯.

 

সেন্ট-সালপিচের অভ্যন্তরে, সাইলাস বেদীর পাশে রাখা ভারি লোহার মোমবাতির স্ট্যান্ডটা নিয়ে অবিলিস্কের কাছে ফিরে আসলো। এটা দিয়ে অনায়াসেই হাতুড়ির কাজ করা যাবে। ধূসর মার্বেল প্যানেল, যেটার নিচটা ফাঁপা, সেটার দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারলো, কোন ধরনের শব্দ ছাড়া এটা ভাঙতে পারবে না।

 

মার্বেলের উপর লোহার আঘাতের শব্দটা ঘরের ছাদে প্রতিধ্বনিত হবে।

 

এটা কি নান শুনতে পারবে? এই সময়ের মধ্যে উনি নিশ্চিত ঘুমিয়ে যাবেন। তারপরও, সাইলাস কোন ঝুঁকি নিতে চাইলো না। লোহার স্ট্যান্ডটার মাথা একটা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে নেবার দরকার, কিন্তু সে বেদীর লিনেন কাপড় ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলো না। ওটাকে অসম্মান করতে চাইলো না সাইলাস। আমার আলখেল্লাটা, সে ভাবলো। সে জানে, বিশাল এই চার্চে সে একাই আছে। সাইলাস শরীর থেকে আলখেল্লাটা খুলে ফেললো।

 

ওটা খুলতে গিয়ে কাপড়ের আঁশ সাইলাসের পিঠের ক্ষতে লেগে যাওয়াতে একটু ব্যথা করলো।

 

নিমাঙ্গের অর্ন্তবাসটা ছাড়া সে এখন নগ্নই বলা চলে। সাইলাস তার আলখেল্লাটা লোহার স্ট্যান্ডের মাথায় পেঁচিয়ে নিলো, তারপর ফ্লোরের টাইলসের মাঝ বরাবর নিশানা করে সজোড়ে আঘাত করলো। একটা ভেঁতা শব্দ হলো। কিন্তু পাথরটা ভাঙলো না। আবারো আঘাত করলে একটা ভোতা আওয়াজটা হলো, কিন্তু সেই সাথে ভেঙে যাবার শব্দও শোনা গেলো। তৃতীয় আঘাতে টাইলসটা পুরোপুরি ভেঙে গেলে ফ্লোরের নিচে গহ্বরটা দেখা গেলো।

 

একটা কক্ষ।

 

খুব দ্রুত আরো কিছু টাইলস্ খুলে সাইলাস ফোকরটা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখলো। হাটু গেঁড়ে বসার সময় তার রক্ত টগবগ করছিলো। বিবর্ণ ফ্যাঁকাশে হাত দুটোয় ভর করে সে ভেতরে ঢুকে পড়লো।

 

প্রথমে তার কিছুই মনে হলো না। ভেতরের কক্ষটার জমিন মসৃন পাথরের আর সেটা একেবারেই খালি। তারপর রোজলাইন রেখাটা ধরে কয়েক হাত এগোতেই, একটা কিছুর স্পর্শ পেলো। পাতলা একটা পাথরের তক্তা। সেটার কোণা দুটো হাত দিয়ে ধরে তুলে ফেললো। সাইলাস দেখতে পেলো একটা অমসৃণ পাথরের ফলক, তাতে কিছু লেখা খোঁদাই করা আছে। কিছুক্ষণের জন্য তার নিজেকে মনে হলো আধুনিক কালের মুসা পয়গম্বর বলে।

 

ফলকটার লেখাগুলো পড়ে সাইলাস দারুণ অবাক হলো। সে আশা করেছিলো কিস্টোন একটা মানচিত্র হবে, অথবা একটা জটিল নির্দেশনা, কিংবা হয়তো কোন কোড। কি-স্টোনটা, দেখা যাচ্ছে, আসলে সহজ সরল একটা প্রস্তর ফলক।

 

জব ৩৮:১১

 

বাইবেলর একটা পংক্তি? সাইলাস এমন সহজ সরল জিনিস দেখে হতবাক হয়ে গেলো। তারা যে গোপন জায়গাটা খুঁজে ফিরছে, সেটা বাইবেলের একটা পংক্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে? ভ্রাতৃসংঘ কি শেষ পর্যন্ত ঠাট্টা করলো!

 

জব। অধ্যায় আটত্রিশ। পংক্তি এগারো।

 

যদিও সাইলাসের এগারো নাম্বার পংক্তিটা হুবহু মুখস্ত নেই, তারপরও, সে জানতো, জব পুস্তকে এমন একজন লোকের গল্প বলা হয়েছে, যার ঈশ্বরের বিশ্বাসটা পরীক্ষা করবার পরেও টিকে ছিলো। যথার্থই, সে ভাবলো, তার উত্তেজনার সাথে মিলে যাচ্ছে।

 

মাথার ওপর তাকিয়ে সাইলাস না হেসে পারলো না। প্রধান বেদীর উপরে রাখা বই রাখার বড় একটা স্ট্যান্ড, তার উপড়ে চামড়ায় মোড়ানো বিশাল একটা বাইবেল রাখা।

 

বেলকনির ওপরে দাঁড়িয়ে সিস্টার সানডৃন কাঁপছিলেন। লোকটা যখন তার আলখেল্লাটা আচমকা খুলে ফেললো, তখন চলে যেতে উদ্যত হয়েছিলেন তিনি। তার প্রতি যে নির্দেশ ছিলো, সেটা পালন করতে চাইছিলেন। লোকটার ফ্যাঁকাশে সাদা চামড়া দেখে তিনি ভয় পেলেন। তার চওড়া বিবর্ণ পিঠটা রক্তে ভিজে আছে। এমন কি এখান থেকে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন টাকা ক্ষত চিহ্নগুলো।

 

লোকটাকে নির্দয়ভাবে চাবুক মারা হয়েছে।

 

তিনি তার ঊরুতে রক্তাক্ত সিলিস্ বেল্টটাও দেখতে পেলেন। সেখান থেকে রক্ত ঝড়ছে। কোন ধরনের ঈশ্বর এ রকম শারিরীক শান্তি কামনা করে? ওপাস দাইর নিয়ম-নিষ্ঠা সিস্টার সানড্রন কখনও বুঝতে পারেননি। তবে এই ব্যাপারটা তার কাছে এখন আর তেমন বিবেচ্য বিষয় নয়। ওপাস দাই কি-স্টোনটার খোঁজ করছে। তারা এ সম্পর্কে কীভাবে জানতে পারলো, সিস্টার সানন সেটা কোনোভাবেই ভেবে পেলো না। অবশ্য, তিনি জানতেন, ভাবার মতো সময় তাঁর এখন নেই।

 

রক্তাক্ত সন্ন্যাসিটি এবার নিরবে তার আলখেল্লাটা পরে নিলো। এরপর, সে বেদীতে রাখা বাইবেলের দিকে গেলো।

 

শ্বাসরুদ্ধকর নিরবতায় সিস্টার সানন বেলকনি ছেড়ে দ্রুত নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। হাটু গেঁড়ে বসে তার কাঠের খাটটার নিচ থেকে সিলগালা করা একটা খাম বের করলেন। তিন বছর আগে এটা তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন।

 

খামটা ছিঁড়ে, খুলে দেখতে পেলেন, প্যারিসের চারটা ফোন নাম্বার।

 

কাঁপতে কাঁপতে তিনি ডায়াল করলেন।

 

নিচে, পাথরের ফলকটি সাইলাস তুলে নিয়ে আসলো বেদীর সামনে। অন্য হাতে চামড়ার বাইবেলটা তুলে নিলো সে। তার লম্বা-লম্বা সাদা আঙ্গুল দিয়ে পাতা ওল্টাতে শুরু করলো। ওল্ড টেস্টামেন্টটা ঘেঁটে-ঘেঁটে বুক অব জব খুঁজে পেলো সে। আটত্রিশতম অধ্যায়টা বের করলো। যে শব্দগুলো সে খুঁজছে, সেই শব্দগুলো পেয়ে গেলো এখানে।

 

তারাই পথ দেখাবে।

 

এগারো নাম্বার পংক্তিটা খুঁজে পেয়ে সাইলাস সেটা পড়ে দেখলো। এতে মাত্র সাতটা শব্দ রয়েছে। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে, সে ওটা আবার পড়তে লাগলো। তার মনে হচ্ছিলো, বিশাল একটা ভুল হয়ে গেছে। পংক্তিটা একেবারেই সহজ সরল।

 

এ পর্যন্তই তোর আসা উচিত, এর চেয়ে বেশি না।

 

 

 

৩০.

 

সিকিউরিটি ওয়ার্ডেন ক্লদ গ্রুয়াদ মোনালিসার সামনে অবনত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, তার বন্দীর সামনে অস্ত্র তাক করে রেখে দারুণ উত্তেজনা অনুভব করলো। এই বানচোতটা জ্যাক সনিয়েকে হত্যা করেছে। সনিয়ে ছিলেন গ্রুয়ার্দ এবং তার টিমের কাছে একজন স্নেহপরায়ণ পিতার মতোন।

 

গ্রুয়ার্দ টৃগারটা টিপে রবার্ট ল্যাংডনের পিঠে একটা বুলেট ঢুকিয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছিলো না। একজন সিনিয়র ওয়ার্ডেন হিসেবে গ্রুয়ার্দ হলো সেই সব স্বল্প সংখ্যক লোকদের একজন, যে সঙ্গে করে অস্ত্র বহন করে। সে নিজেকে প্রবোধ। দিলো যে, ল্যাংডনকে খুন করা মানে, ফরাসি জেলখানায় যাওয়া আর বেজু ফশের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া।

 

গ্রুয়ার্দ তার কোমরের বেল্ট থেকে ওয়াকি-টকিটা নিয়ে ব্যাক-আপের জন্য সাহায্য চাইলো। কিন্তু সে কেবল ঘঘ শব্দই শুনতে পেলো। এই কক্ষের বাড়তি ইলেক্ট্রনিক সিকিউরিটির জন্য সবসময়ই রক্ষীদের যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়ে থাকে। আমাকে দরজার কাছে যেতে হবে। ল্যাংডনের দিকে অস্ত্রটা তা করে রেখেই গ্রুয়ার্স আস্তে আস্তে পিছু হটে দরজার বাইরে দিকে যেতে লাগলো। তার তৃতীয় পদক্ষেপেই, সে কিছু একটা বুঝতে পেরে একটু থামলো।

 

এটা আবার কি?

 

ঘরটার মাঝখানে কিছু একটা নড়ে-চড়ে উঠছে। একটা ছায়ার অবয়ব। এই ঘরে তাহলে আরেক জন আছে? দূরের অন্ধকারে একটা মেয়েকে নড়তে দেখা যাচ্ছে। তার সামনে একটা বেগুনী আলোর রেখা ফ্লোরের এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। যেনো রঙ্গীন ফ্লাশ লাইটটা দিয়ে কেউ কিছু খুঁজছে।

 

কুয়ে এস্ত লা? গ্রুয়ার্দ গর্জন করে বললো, শেষ ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে দ্বিতীয় বারের মতো শিড়দাঁড়া দিয়ে শীতল অনুভূতিটা অনুভব করলো। আচমকাই সে খেই হারিয়ে ফেললো। অস্ত্রের নিশানাটা কোথায় তা করবে আর কোন দিকেই বা সে যাবে।

 

পিটিএস, মেয়েটা শীতল কণ্ঠে জবাব দিলো, এখনও লাইটটা দিয়ে সে খোঁজাখুঁজি করে যাচ্ছে।

 

পুলিশ তেকনিক এ সাইন্তিফিক। গ্রুয়ার্দ এবার ঘামে ভিজতে শুরু করলো। আমি ভেবেছিলাম সব এজেন্টই এখান থেকে চলে গেছে। সে বেগুনী আলোটা চিনতে পারলো, আন্ট্রাভায়োলেট রশ্মি। পিটিএস দলের কাছে এগুলো থাকে। তারপরও সে বুঝতে পারলো না, কেন ডিসিপিজে এখানে প্রমাণ বা আলামতের জন্য খোঁজাখুঁজি করছে।

 

ভোতার নম! গ্রুয়ার্দ চিৎকার করে বললো। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বললো কিছু একটা অসঙ্গতি রয়েছে। রিপোদে!

 

সে সোয়ে, কণ্ঠটা খুব শান্ত, ফরাসিতে বললো। সোফি নেভু।

 

গ্রুয়ার্দের মনের কোণে কোথাও এই নামটা আছে, সোফি নেভু? এই নামটাতো সনিয়ের নাতনীর নাম, তাই না? ছোটবেলায় সে এখানে আসতো, কিন্তু সেটাতো অনেক বছর আগের কথা। এই মেয়েটা সম্ভবত সে নয়। আর যদি সে সোফি নেভূই হয়ে থাকে তারপরও তাকে বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই, গ্রুয়ার্দ সনিয়ে এবং তার নাতনীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদের গুজবটা শুনেছিলো।

 

আপনি আমাকে চেনেন, মেয়েটা বললো। রবার্ট ল্যাংডন আমার দাদুকে খুন করেনি। বিশ্বাস করুন।

 

ওয়ার্ডেন গ্রুয়ার্দ এই কথাটা আমলেই নিলো না। আমার দরকার ব্যাক-আপের। তার ওয়াকি-টকিতে আবারো চেষ্টা করলো, সাড়াশব্দ কিছুই পেলো না। প্রবেশ দ্বারটা এখান থেকে আরো বিশ গজ পেছনে। গ্রুয়াদ আস্তে আস্তে পিছু হটতে লাগলো। সে ঠিক করলো, ফ্লোরে শুয়ে থাকা লোকটার দিকেই অস্ত্রটা তাক করে রাখবে। পিছু হটতেই গ্রুয়ার্দ দেখতে পেলো মেয়েটা ঘরের অন্য পাশ থেকে তার ইউভি লাইটটা দিয়ে সল দে এতাত এর দেয়ালে মোনালিসার ঠিক বিপরীতে টাঙানো বিশাল একটা

 

ছবির দিকে আলো ফেলে কি যেনো খুঁজছে।

 

গ্রুয়ার্দ ভাবলো, বুঝতে চেষ্টা করলো, কোন্ পেইন্টিং সেটা।

 

ঈশ্বরের দোহাই, মেয়েটা করছে কি?

 

সোফি নেভুর মনে হলো, তার কপালটা ঠাণ্ডা ঘামে ভিজে গেছে। ল্যাংডন মাটিতে ডানা ছড়ানো ঈগলের মতোই পড়ে আছে। একটু, রবার্ট, এইতো। জানতো তাদের প্রহরী কাউকেই গুলি করবে না। সোফি তার নিজের কাজেই মনোেযোগ দেবার মনস্থির করলো। একটা মাস্টার পিসের পুরোটাই খুঁজে দেখলো, বিশেষ করে আরেকটা দা ভিঞ্চি। কিন্তু ইউভি লাইটে কিছুই ধরা পড়লো না। ফ্লোরেও না, দেয়ালেও না, এমনকি ক্যানভাসেও না।

 

এখানে কিছু একটাতো আছেই।

 

সোফির মনে হলো সে তার দাদুর সংকেতের পুরোটাই ঠিক ঠিকভাবে মর্মোদ্ধার করতে পেরেছে।

 

এ ছাড়া আর কীইবা তিনি বোঝাতে চাইবেন?

 

যে মাস্টার পিসটা সে পরীক্ষা করলো, সেটা পাঁচ ফুট লম্বা একটা ক্যানভাস। দা ভিঞ্চি একটা অদ্ভুত দৃশ্য এঁকেছিলেন, যাতে জবুথুবুভাবে কুমারী মেরি শিশু যিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছেন, পাশে জন দ্য ব্যাপটিস্ট এবং ইউরিয়েল এনজেল একটা পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সোফি যখন ছোট ছিলো তখন তার দাদু এই ছবিটার কাছে তাকে জোর করে ধরে না নিয়ে এসে মোনালিসা দর্শন শেষ করতেন না।

 

গ্র্যঁ-পেয়া, আমি এখানে! কিন্তু সেটা দেখতে পাচ্ছি না! তার পেছনে, সে শুনতে পেলো, রক্ষীটা আবার সাহায্যের জন্য রেডিওতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

 

ভাবো!

 

সে মোনালিসার বুলেট প্রুফ কাঁচের ওপরে লেখা মেসেজটা আবার দেখলো। So dark the con of man। তার সামনের পেইটিংটার কোনো কাঁচ নেই, যাতে কোন মেসেজ লেখা থাকতে পারে। সোফি জানে, তার দাদু বিখ্যাত কোনো মাস্টার পিসের উপরে কিছু লিখে সেটা নষ্ট করবেন না। সে একটু থামলো। সামনে তো কোনোভাবেই নয়। তার চোখ ওপরের দিকে গেলো। ক্যানভাসটা সিলিংয়ের থেকে যে তারটা দিয়ে ঝোলানো রয়েছে, সেটা লাফিয়ে ধরলো। এটাই কি তবে সেই জিনিস? ক্যানভাসটার বাম দিকটা ধরে তার কাছে টেনে আনলো সেটা। ছবিটা বেশ বড়, তাই দুলতে লাগলো। সোফি কোনোমতে তার মাথাটা ক্যানভাসের পেছনে ঢুকিয়ে উঁকি মারলো। ব্ল্যাক লাইটটা দিয়ে পেছনে খুঁজে দেখতে চেষ্টা করলো।

 

মাত্র কয়েক সেকেন্ড লাগলো বুঝতে যে, তার ধারণাটা ভুল। ছবিটার পেছন দিক কালো আর বিবর্ণ, সেখানে কোন বর্ণালি রঙের লেখা নেই, শুধুমাত্র পুরনো ক্যানভাসের পেছনকার কালো ধূসর চিটচিটে রঙ আর–

 

আরে।

 

সোফির চোখ কাঠের ফ্রেমের নিচের দিকের খাজের মধ্যে একটা ধাতব, চঞ্চকে বস্তুর দিকে আঁটকে গেলো। জিনিসটা ছোট, সেটাতে আঁটকে আছে জ্বলজ্বলে একটা সোনার চেইন।

 

সোফি যারপরনাই বিস্মিত হলো। চেইনটার সাথে লাগনো আছে অতিপরিচিত সোনার চাবিটা। চাবিটার চওড়া মাথাটা ক্ৰশ আকৃতির, আর তাতে আছে একটা খোঁদাই করা সিল, যা সে নয় বছর বয়সের পর আর কখনও দেখেনি। একটা ফ্লার-দ্য লিস তার সাথে আছে পিএস অক্ষরটা। সোফির মনে হলো, তার দাদুর অশরীরি কণ্ঠস্বরটা তার কানে ফিস্ ফিস করে বলছে। যখন সময় আসবে, চাবিটা তোমার হবে। তার দাদু মারা গেলেও নিজের প্রতিশ্রুতি ঠিকই রক্ষা করেছেন, এটা বুঝতে পেরে তার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। এই চাবিটা দিয়ে একটা বাক্স খোলা যায়, তাঁর কণ্ঠটা বলছে, সেখানে আমি অনেক গোপনীয় জিনিস রাখি।

 

সোফি এবার বুঝতে পারলো, আজকের রাতের পুরো শব্দখেলার সত্যিকারের উদ্দেশ্য ছিলো এই চাবিটা। তার দাদু যখন মারা যাচ্ছিলেন, তখন চাবিটা তার কাছেই ছিলো। তিনি চাননি এটা পুলিশের হাতে গিয়ে পড়ক। তাই ছবিটার পেছনে সেটা রেখে দিয়েছিলেন। তারপর একটা অতিপরিচিত গুপ্তধন খোজা খেলাটা খেলালেন, যাতে কেবলমাত্র সোফিই এটা খুঁজে পায়।

 

অ্যা সিকোর! রক্ষীটা জোরে বলে উঠলো। সোফি চাবিটা ফ্রেমের পেছন থেকে এক ঝটকায় নিয়ে ইউডি লাইটটা সহ তার পকেটে ঢুকিয়ে ফেললো। ক্যানভাসের পেছনে থেকেই সে উঁকি মেরে দেখলো রক্ষীটা তখনও ওয়াকি-টকিতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সে পিছু হঁটে-হঁটে প্রবেশ দ্বারের দিকে যাচ্ছে, আর হাতে ধরা অস্ত্রটা ল্যাংডনের দিকেই তাক্ করে রাখা।

 

অ্যা সিকোর! সে আবারো রেডিওতে চিৎকার করে বললো।

 

কোন সাড়া শব্দ নেই।

 

লোকটা যোগাযোগ করতে পারছে না, সোফি বুঝতে পারলো। তার মনে পড়ে গেলো, প্রায়শই দশনার্থী পর্যটকরা মোনালিসা দেখে অভিভূত হয়ে তাদের সেল ফোনে কথা বলতে গিয়ে দেখে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। এখানের দেয়ালে এক্সট্রা সার্ভিলেন্স যন্ত্রের জন্য কোন ধরনের বেতার যোগাযোগ একরকম অসম্ভবই হয়েই পড়ে, যদি না দরজার বাইরে না গিয়ে সেটা করা হয়। রক্ষীটাও এখন খুব দ্রুত দরজা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। সোফি জানে, তাকে এক্ষুণি কিছু একটা করতে হবে। বড় ছবিটার পেছন থেকে সোফি তাকিয়ে দেখছিলো আর ভাবছিলো যে, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আজ রাতে দ্বিতীয় বারের মতো সাহায্যে আসতে পারে কিনা।

 

আর মাত্র কয়েক মিটার দূরেই, গ্রুয়ার্দ মনে মনে বললো, অস্ত্রটা তা করেই রাখলো।

 

আরেতেজ! ওউ জো লা দেই। মেয়েটা ঘরের একপাশ থেকে বলে উঠলো। গ্রুয়ার্দ তাকিয়ে দেখেই পিছু হটা থামিয়ে দিলো। মদিউ, নো!

 

ঘোলাটে লাল আলোর মধ্য দিয়ে সে দেখতে পেলো, মেয়েটা ঝুলে থাকা তারটা ছিঁড়ে ফেলে একটা বিশাল চিত্রকর্ম তার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। পাঁচ ফুট লম্বা ছবিটা মেয়েটাকে প্রায় ঢেকেই ফেলেছে। গ্রুয়ার্দ প্রথমে অবাক হয়ে ভাবলো, ছবিটা তার থেকে ছিঁড়ে ফেলার সময় এলার্ম কেন বাজলো না, অবশ্য, পরক্ষণেই, সে বুঝতে পারলো তারগুলোর সাথে এলার্মের সেন্সরটা এখনও নতুন করে সেট করা হয়নি। মেয়েটা করছে কি?

 

দৃশ্যটা দেখে তার রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেলো।

 

ক্যানভাসটার মাঝখান ফুলে উঠেছে। কুমারি ম্যারি, শিশু যিশু, জন ব্যাপটিস্ট এর নাজুক জায়গাটা ছিঁড়ে যাবার উপক্রম হলো।

 

নোঁ! গ্রুয়ার্দ চিৎকার করে বললো। দা ভিঞ্চির অমূল্য চিত্রকর্মটির এ অবস্থা দেখে সে ভয়ে জমে গেলো। মেয়েটা ক্যানভাসের পেছন থেকে হাটু দিয়ে ছবিটার মাঝখানে চাপ দিচ্ছে!

 

নোঁ।

 

গ্রুয়ার্দ তার পিস্তলটা ল্যাংডনের থেকে সরিয়ে মেয়েটার দিকে তাক্ করেই বুঝলো এটা একটা অসাড় হুমকি। ক্যানভাসটা কাপড়ের হলেও, সেটা একেবারেই অভেদ্য–ছয় মিলিয়ন ডলার দামের একটা বর্ম।

 

আমি দা ভিঞ্চিকে গুলি করতে পারি না!

 

আপনার ওয়াকি-টকি আর অস্ত্রটা নামিয়ে রাখুন, মেয়েটা ফরাসিতে শীতল কণ্ঠে বললো, তা-না হলে, আমি এই ছবিটা ছিঁড়ে ফেলবো। আমার মনে হয় আপনি জানেন, আমার দাদু এতে কী রকম কষ্ট পেতো।

 

গ্রুয়ার্দ একটা হতবুদ্ধিকর অবস্থায় পড়ে গেলো। দয়া করে…না। এটা ম্যাড়োনা অব দি রস! সে তার ওয়াকি-টকি আর অস্ত্রটা ফেলে দিয়ে মাথার উপর দু হাত তুলে ধরলো।

 

ধন্যবাদ আপনাকে, মেয়েটা বললো। এখন, আমি যা বলি তা-ই করুন, তাহলে সবকিছুই ঠিকঠাক হয়ে যাবে।

 

কিছুক্ষণ বাদে, ল্যাংডন যখন সোফির পাশাপাশি জরুরি বর্হিগমনের সিঁড়িটা দিয়ে বের হতে লাগলো, তখন তার নাড়িস্পন্দনটা লাফাচ্ছিলো। লুভরের সল দে এতা-এ রক্ষীটাকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে, ওখান থেকে বের হবার সময় থেকে তারা একটা কথাও বলেনি। রক্ষীর পিস্তলটা এখন ল্যাংডনের হাতে। আর এই জিনিসটা পরিত্যাগ করার জন্য একটুও অপেক্ষা করতে চাইলো না। অস্ত্রটা তার কাছে খুবই ভারি আর অচেনা মনে হচ্ছিলো। একসাথে দুটো করে সিঁড়ি ভেঙে নামতে নামতে ল্যাংডন অবাক হয়ে ভাবছিলো, সোফি কি জানে, যে ছবিটা সে প্রায় নষ্ট করে ফেলতে যাচ্ছিলো, সেটা কত দামী। আজ রাতে, এই এ্যাডভেঞ্চারের জন্য মেয়েটা ভালো একটা ছবিই বেছে নিয়েছিলো। দা ভিঞ্চির যে ছবিটা সে নিয়েছিলো, সেটা অনেকটা মোনালিসার মতোই, শিল্প ইতিহাসবেত্তাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে প্যাগান প্রতীক লুকিয়ে থাকার জন্য সমালোচিত ও আলোচিত।

 

তুমি খুব দামি জিম্মি বেছে নিয়েছিলে, দৌড়াতে দৌড়াতে ল্যাংডন তাকে বললো।

 

ম্যাড়োনা অব দি রস, সে জবাব দিলো। কিন্তু আমি এটা বেছে নেইনি, আমার দাদুই বেছে নিয়েছেন। তিনি ওটার পেছনে আমার জন্যে ছোট্ট একটা জিনিস রেখে গিয়েছেন।

 

ল্যাংডন মেয়েটার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। কী! কিন্তু তুমি কি করে জানলে কোন্ ছবিটাতে সেটা আছে? ম্যাডোনা অব দি রক্স কেন?

 

So dark the con of man। সে একটা বিজয়ীর হাসি হাসলো। আমি প্রথম দুটো এনাগ্রাম ধরতে পারিনি, রবার্ট। তৃতীয়টা ঠিকই ধরতে পেরেছি।

 

 

 

 

 

 

 

০৪. সিস্টার সানডন

৩১.

 

তাঁরা মরে গেছে।

 

সিস্টার সানডন সেন্ট সালপিচ-এর নিজের ঘরে বসে ফোনটা হাতে নিয়ে ভয়ে কাঠ হয়ে আছেন। তিনি এনসারিং মেশিনে একটা মেসেজ রেখে দিয়েছেন। দয়া করে ফোনটা তুলুন! তাঁরা সবাই মরে গেছে।

 

প্রথম তিনটি টেলিফোন নাম্বারে ফোন করে ভয়াবহ ফল পাওয়া গেলো—একজন হিস্টিরিয়াগ্রস্ত বিধবা, এক গোয়েন্দা হত্যা হবার পর ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছেছেন আর একজন বিষণ্ণ পাদ্রী শোক-সন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। তিনটা নাম্বারের সবগুলোই অকেজো। আর এখন, তিনি শেষ, অর্থাৎ চতুর্থ নাম্বারটা ফোন করতেই বাকি তিনটা নাম্বার ফোন করে না পেলেই কেবল এই নাম্বারটা তিনি করতে পারবেন—একটা এনসারিং মেশিনের কণ্ঠ শুনতে পেলেন। রেকর্ড করা কণ্ঠটা নিজের কোন নাম বা পরিচয় না দিয়ে সোজা বলে দিলো মেসেজটা ছেড়ে যেতে।

 

ফ্লোরের প্যানেলটা ভেঙে ফেলা হয়েছে! মেসেজটাতে বললেন। বাকি তিনজন মারা গেছেন!

 

সিস্টার সানডুন যে চারজনকে রক্ষা করছেন তাদের পরিচয় তিনি জানতেন না। কিন্তু তার বিছানার নিচে সযত্নে রাখা চারটা ব্যক্তিগত ফোন নাম্বার কেবল একটা ক্ষেত্রেই ব্যবহার করার কথা।

 

যদি কখনও ফ্লোর প্যানেলটা ভাঙা হয়, অদেখা মেসেন্জার তাকে বলেছিলেন, তার মানে, আমাদের মধ্যে কেউ, জীবননাশের হুমকির মুখে একটা মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছেন। নাম্বারগুলোতে ফোন করুন। বাকিদের সর্তক করে দিন। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হবেন না।

 

সেটা ছিলো একটা নিঃশব্দ এলার্ম। এটার সহজ সরলতা বোকাও বুঝতে পারবে। এই পরিকল্পনাটার কথা যখন তিনি প্রথম শুনেছিলেন, অবাকই হয়েছিলেন। যদি একজন ভাইয়ের পরিচয় উন্মোচিত হয়ে যায়, তবে একটা মিথ্যা বলবেন তিনি, যা ঘুরেফিরে বাকিদের কাছে পৌঁছে যাবে সতর্ক হবার জন্য। আজ রাতে, মনে হচ্ছে, কমপক্ষে একজন তো ধরা পড়ে গেছেই।

 

দয়া করে উত্তর দিন, তিনি ভয়ে ফিসফিস করে বললেন। কোথায় আপনি?

 

ফোনটা রাখুন, দরজা থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠ বললো। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সিস্টার তাকিয়ে দেখতে পেলেন বিশাল সন্ন্যাসীটাকে। তার হাতে ভারি মোমবাতি স্ট্যান্ডটা ধরা।

 

কাঁপতে কাঁপতে তিনি ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।

 

তারা সবাই মারা গেছে, সন্ন্যাসীটা বললো। চার জনের সবাই। আর তারা আমার সাথে চালাকি করেছে। এবার আপনি বলুন, কি-স্টোনটা কোথায় আছে।

 

আমি জানি না! সিস্টার সানভৃন সত্যি করেই বললেন। এই গুপ্ত ব্যাপারটা অন্যেরা জানে। অন্যরা, যারা মারা গেছেন।

 

লোকটা সামনের দিকে এগিয়ে আসলো, তার সাদা হাতে লোহার স্ট্যান্ডটা শক্ত করে ধরা। আপনি এই চার্চের একজন সিস্টার। তারপরও আপনি তাদের হয়ে কাজ করেন?

 

যিত্র একটা সত্য-বাণী আছে, সিস্টার সানড়ন দৃঢ়ভাবে বললেন। আমি ওপাস দাইর মধ্যে সেটা দেখতে পাইনি।

 

লোকটার চোখে আচমকা একটা ক্রোধের ছায়া দেখা গেলো। সে শক্ত হাতে স্ট্যান্ডটা তুলে ধরলো। সিস্টার সানড়ন পড়ে যাবার সময় শেষ যে জিনিসটা তাঁর মনে হচ্ছিলো, সেটা হলো এক ধরনের স্বতস্ফুর্ত পূর্বাভাস।

 

চার জনের সবাই মারা গেছেন।

 

দূর্লভ সত্যটা চিরতরের জন্যই হারিয়ে গেলো।

 

 

 

৩২.

 

ল্যাংডন আর সোফি প্যারিসের গভীর রাতে প্রবেশ করতেই ডেনন উইং-এর পশ্চিম প্রান্তের সিকিউরিটি এলার্মটা সশব্দে বেজে ওঠে আশপাশের তুইলেরি গার্ডেনের কবুতরগুলোকে এদিক ওদিক ছড়িয়ে দিলো। প্লাজায় রাখা সোফির গাড়ির কাছে যেতেই ল্যাংডন দূর থেকে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনতে পেলো।

 

।এইতো, এটা এখানে, সোফি বললো, প্রাজায় রাখা নাক বোচা দুই সিটের লাল গাড়িটার দিকে ইঙ্গিত করলো সে।

 

সে ঠাট্টা করছে, তাই না? গাড়িটা ল্যাংডনের দেখা সবচাইতে ছোটখাটো একটা গাড়ি।

 

স্মার্ট গাড়ি, সোফি বললো, লিটারে একশো মাইল চলে।

 

সোফি গাড়িটার ইজিন চালু করতেই ল্যাংডন কোনমতে ওটার ভেতরে গিয়ে বসে পড়লো। গাড়িটা ঝাকি খেয়ে ফুটপাতের ওপরে উঠে যেতেই ল্যাংডন দুহাতে গাড়ির ড্যাশ বোর্ডটা ধরে রাখলো। লাফাতে লাফাতে সেটা কারুজেল দু লুভরের ছোট্ট একটা গলি দিয়ে ছুটতে লাগলো।

 

সঙ্গে সঙ্গেই, সোফির মনে পড়ে গেলো শর্টকাট পথটার কথা। গলিটা দিয়ে সোজা চলে গেলেই হবে। মেরিডিয়ান চতুরটার ভেতর দিয়ে তারা গোল ঘাসের চত্বরটা সোজা মাড়িয়ে গেলো।

 

না! ল্যাংডন চিৎকার করে বললো, সে জানতো কারুজেল দু লুভর-এর একেবারে মাঝখানে একটা গহ্বর আছেলা পিরামিদ ইনভার্সি উল্টো পিরামিড স্কাই-লাইটটা সে জাদুঘরের ভেতরে আগেই দেখেছিলো। ওটা তাদের ছোট্ট স্মার্ট গাড়িটাকে খুব সহজেই গিলে ফেলতে পারার মতোই বিশাল। সৌভাগ্যক্রমে, সোফি সচরাচর রাস্তাটি ব্যবহার করারই সিদ্ধান্ত নিলো। ডান দিকে এক ঝট্কায় বাঁক নিয়ে একটা গোল চক্কর দিয়ে, বাম দিকে মোড় নিয়ে, উত্তর দিকের রুই দ্য রিভোলির পথে এগোলো।

 

দুই টোনের পুলিশের সাইরেনটা তাদের পেছনে চিৎকার করতে করতে তাড়া করে আসছে। ল্যাংডন দরজার পাশের আয়না দিয়ে গাড়ির লাইটটা দেখতে পারলো। সোফি লুভর থেকে বের হয়ে যাবার জন্য গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলে স্মার্ট গাড়িটার ইনজিন একটা আর্তচিৎকার দিয়ে উঠলো। পঞ্চাশ গজ সামনে, রিভোলির ট্রাফিক লাইটটার লালবাতি জ্বলে উঠলো। সোফি দম নিয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়েই যাচ্ছে। ল্যাংডন অনুভব করলো তার পেশীগুলো আড়ষ্ট হয়ে গেছে।

 

সোফি?

 

চৌরাস্তার মোড়ের কাছে এসে একটু ধীর গতি করলো সোফি। গাড়ির হেডলাইটটা জ্বালিয়ে, চোরা চোখে দুপাশটা দেখে নিয়ে, গাড়িটা আবার দ্রুত গতিতে বাম দিকে মোড় নিয়ে সোজা চলে গেলো রিভোলির ফাঁকা রাস্তায়। এরপর তারা শাম্প এলিসির প্রশস্ত এভিনুতে চলে এলো।

 

গাড়িটা সোজা চলতেই ল্যাংডন নিজের আসন থেকে ঘুরে, ঘাড় বেঁকিয়ে রিয়ার উইন্ডো দিয়ে লুভরের দিকে তাকালো। সে দেখতে পেলো পুলিশ আর তাদেরকে তাড়া করছে না। নীল আলোর সমুদ্রে জাদুঘরটা আলোকিত হয়ে আছে।

 

তার হৃদস্পন্দন অবশেষে ধীর-স্থির হলো। ল্যাংডন সোফির দিকে তাকিয়ে বললো, খুব মজার ব্যাপার ছিলো এটা।

 

মনে হলো না কথাটা সোফি শুনতে পেয়েছে। তার চোখ সামনের সুদীর্ঘ শাম্প এলিসির দিকে স্থির হয়ে আছে। দুই মাইল দীর্ঘ অভিজাত প্রান্তরটাকে প্রায়শই প্যারিসের পঞ্চম এভিনু হিসেবে ডাকা হয়। এ্যামবাসিটা এখান থেকে মাত্র এক মাইল দূরে অবস্থিত। ল্যাংডন তার সিটে ঠিক করে বসে পড়লো।

 

So dark the con of man.

 

সোফির চটজলদি চিন্তাটা ছিলো খুব ইমপ্রেসিভ।

 

Modonna of the Rocks.

 

সোফি বলেছে, তার দাদু ছবিটার পেছনে তার জন্যে কিছু একটা রেখে গেছেন। একটা চুড়ান্ত মেসেজ? সনিয়ের অসাধারণ লুকানোর জায়গাটার কথা না ভেবে ল্যাংডন পারলো না; Madonna of the Rocks আজ রাতে ব্যবহৃত প্রতীকগুলোর সাথে একেবারেই সংগতিপূর্ণ আর সামঞ্জস্যপূর্ণ। মনে হচ্ছে, সনিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অজানা কালো-অধ্যায় সম্পর্কে বেশ ভক্তির স্বাক্ষর রেখে গেছেন। দা ভিঞ্চির ম্যাডোনা অব দি রকস্ ছবিটা আসলে ইমাকুলেট কনসেপশন নামে পরিচিত একটা ধর্মীয় দলের কাছ থেকে ফরমায়েশ পেয়ে আঁকা হয়েছিলো, যাদের দরকার ছিলো মিলানে অবস্থিত সেন্ট ফ্রান্সেকোর চার্চের বেদীর ঠিক মাঝ বরাবর জায়গায় একটা চিত্রকর্মের। নান লিওনার্দোকে নির্দিষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন কোন থিমের ওপর ছবিটা হবে কুমারি মেরি, শিশু জন দ্য ব্যাপটিস্ট, ইউরিয়েল এবং শিশু যিশুখৃস্ট একটা গুহায় আশ্রয় নিয়েছেন। যদিও দা ভিঞ্চি অনুরোধক্রমেই ছবিটা এঁকেছিলেন, তারপরও ছবিটা সমাপ্ত করে তাদের কাছে হস্তান্তর করার সময় ঐ দলটি ভয়ে আঁতকে উঠেছিলো কেনো ছবিটাতে তিনি বিস্ফোরণােন্মুখ আর বিব্রতকর জিনিসে ভরে রেখেছিলেন।

 

ছবিটাতে দেখানো হয়েছে, কুমারি মেরি নীল রঙের একটা গাউন পরে কোলে একটা শিশু নিয়ে বসে আছেন, শিশুটা হলো নবজাতক যিশু। মেরির বিপরীতে ইউরিয়েল, সেও আরেকটা নবজাতক নিয়ে বসে আছে, সেই শিশুটা হলো জন দ্য ব্যাপটিস্ট। বিষদৃশ্য ব্যাপারটা হলো, যিশু আর্শীবাদ করছেন জনকে, প্রচলিত এই দৃশ্যটা না রেখে বরং শিশু জনই যিশুকে আর্শীবাদ করছে এমন দৃশ্য দেখানো হয়েছে …আর যিশু সেই ব্যাপারটা অনুমোদন করছেন! আরো সমস্যা আছে, মেরির এক হাত শিশু জনের মাথার ওপর, আর সেটা খুবই ভয় দেখানো ইঙ্গিত করছে তার আঙ্গুলগুলো অনেকটা ঈগল পাখির বাঁকা নখের মতো, একটা অদৃশ্য মাথা ধরে আছে যেনো। চূড়ান্ত যে ভীতিকর জিনিস ছবিটাতে রয়েছে : মেরির কোঁকড়ানো আঙ্গুলগুলোর নিচে ইউরিয়েল হাত দিয়ে একটা আঘাত করার ভঙ্গী করছে—যেনো মেরির থাবা সদৃশ্য হাতে ধরা অদৃশ্য ঘাড়টাকে কেঁটে ফেলবে।

 

ল্যাংডনের ছাত্ররা সব সময়ই এটা জানতে পেরে বিস্মিত হয় যে, দা ভিঞ্চি ধর্মীয় দলটাকে দ্বিতীয় আরেকটা ছবি একে দিয়ে তাদের ক্ষোভ প্রশমিত করেছিলেন। ওয়াটার ডাউন সংস্করণে মাড়োনা অব দি রকস-এ সবাইকে অনেক বেশি প্রচলিত ভঙ্গীতে দেখানো হয়েছিলো। দ্বিতীয় সংস্করণটা এখন লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে ভার্জিন অব দি রক নামে টাঙানো রয়েছে। অবশ্য ল্যাংডন এখনও লুভরে রাখা প্রথম ছবিটাই পছন্দ করে থাকে।

 

শাম্প এলিসির দিকে যেতেই, সোফি গাড়িটার গতি আরো বাড়িয়ে দিলে ল্যাংডন বললো, চিত্রকর্মটার পেছনে, কি ছিলো?

 

সোফির চোখ ছিলো রাস্তার দিকে। জিনিসটা আমি আপনাকে এ্যামবাসির ভেতরে, নিরাপদে পৌঁছাবার পরেই দেখাবো।

 

তুমি ওটা আমাকে দেখাবে? ল্যাংডন খুব অবাক হয়ে বললো, তিনি তোমার কাছে একটা জিনিস রেখে গেছেন?

 

সোফি হ্যাঁ-সূচক ইঙ্গিত করলো। ফ্লার-দ্য-লিস খোঁদাই করা, সেই সাথে পি,এস অক্ষর সংবলিত।

 

ল্যাংডন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না।

 

 

 

আমরা প্রায় এসে গেছি, স্মার্ট গাড়িটা ডান দিকে মোড় ঘোরাতেই সোফি ভাবলো। বিলাসবহুল হোটেল দ্য সলোয় অতিক্রম করে সারি সারি বৃক্ষের কূটনৈতিক এলাকাটাতে প্রবেশ করলো। এ্যামবাসিটার দূরত্ব এখান থেকে একমাইলেরও কম। সোফির শেষ পর্যন্ত মনে হলো, সে এখন স্বাভাবিক নিঃশ্বাস নিতে পারছে আবার।

 

গাড়ি চালানোর সময়ও সোফির চিন্তা-ভাবনা আঁটকে ছিলো পকেটে রাখা চাবিটার মধ্যে। অনেক দিন আগের দেখা সেই সোনার চাবিটা, পিএস অক্ষর দুটো আর ফ্লার-দ্য-লিস, সবগুলোই তার মনে পড়ে গেলো।

 

যদিও এতোগুলো বছর ধরে চাবিটা সম্পর্কে সোফি খুব কমই ভেবেছে, তারপরও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ কর্ম করতে করতে সোফি নিরাপত্তাসম্পর্কিত অনেক কিছুই শিখেছিলো। তাই এই অদ্ভুত চাবিটা তার কাছে আর কোন রহস্যময় জিনিস বলে মনে হলো না। একটা লেজার মেট্রিক্স যন্ত্রপাতির মতো। এটা নকল করা অসম্ভব। অন্য চাবির মতো এর কোন দাত নেই, আর প্রচলিত চাবির মধ্যেও এটা কাজ করে না। একটা ইলেকট্রক চক্ষু দ্বারা এটা পরীক্ষিত হলেই কেবল চাবিটা কাজ করবে, অত্যাধুনিক কোন তালা খুলতে। একেবারেই সূক্ষ্ম একটা পদ্ধতি, একটু এদিক ওদিক হলেই কাজ করবে না। তাই এটা নকল করা একেবারেই অসম্ভব।

 

সোফি ভাবতেই পারলো না, এরকম একটা চাবি দিয়ে কোন্ ধরনের জিনিস খোলা যায়। তবে তার মনে হলো রবার্ট এ ব্যাপারে সাহায্য তাকে করতে পারবে। হাজার হোক, জিনিসটা না দেখেই সে এটার খোঁদাই করা প্রতীকটার কথা বলতে পেরেছে। চাবিটার মাথায় আঁকা ক্রশের চিত্রটা কোন বৃস্টিয় সংগঠনের বলে মনে হলেও, সোফি জানতো, কোন চার্চই লেজার চাবি ব্যবহার করে না।

 

তাছাড়া, আমার দাদু খৃস্টান ছিলেন না…

 

এর প্রমাণটা সোফি দশ বছর আগেই প্রত্যক্ষ করেছে। পরিহাসের ব্যাপার হলো, সেটা ছিলো আরেকটা চাবি–অনেক বেশি স্বাভাবিক চাবি যা সোফির কাছে তার সত্যিকারের স্বভাবটা উন্মোচিত করেছিলো।

 

সেই বিকেলটা ছিলো খুবই গরম যখন সোফি শার্ল দ্য গল বিমান বন্দরে নেমেই একটা ট্যাক্সি ধরেছিলো বাড়ি যাওয়ার জন্য। গ্র্যঁ পেয়া আমাকে দেখে খুবই অবাক হবেন। সে ভেবেছিলো। বৃটেনের গ্রাজুয়েট স্কুল থেকে বসন্তের ছুটি কাটাতে একটু আগেই দেশে ফিরেছিলো সে। এনক্রিপশন পদ্ধতি সম্পর্কিত শিক্ষাটা গ্রহণ করে সোফি তার দাদুকে সে সম্পর্কে বলার জন্য আর অপেক্ষা করতে চাইছিলো না।

 

যখন প্যারিসের নিজ বাড়িতে এসে পৌঁছালো, দেখলো তার দাদু বাসায় নেই। হতাশ হলেও সে বুঝতে পারলো, তিনি তো আর জানতেন না সোফি আসবে। অবশ্যই তিনি ভরেই কাজ করছেন। কিন্তু আজতো শনিবার, সে বুঝতে পারলো। তিনি সপ্তাহান্তে কাজ কর্ম থেকে বিরত থাকেন। সপ্তাহান্তে, তিনি সাধারণত হেসে, সোফি গ্যারাজের দিকে ছুটলো। নিশ্চিত ছিলো দাদুর গাড়িটা থাকবে না। সপ্তাহান্তে জ্যাক সনিয়ে একটা গাড়ি নিয়ে একটি জায়গাতেই চলে যান নরম্যান্ডিতে তার অবকাশ যাপনের জন্য তৈরি করা শ্যাতুতে। সেটা প্যারিসের উত্তরে অবস্থিত। লন্ডনে কয়েক মাস কাটিয়ে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটি কাটাবার জন্য উদগ্রীব ছিলো সোফি। সময়টা তখন ছিলো মাত্র সন্ধ্যা, তাই সে ঠিক করলো, সেখানে গিয়ে দাদুকে চম্‌কে দিবে। এক বন্ধুর কাছ থেকে একটা গাড়ি ধার করে নিয়ে সোফি রওনা দিলো। ঠিক দশটায় পৌঁছালো সেখানে। তাঁর দাদুর শ্যাতুর এলাকায় প্রবেশের পথটা একমাইলেরও বেশি, আর অর্ধেক রাস্তায় আসতেই সে গাছ-পালার ফাঁক দিয়ে বাড়িটা দেখতে পেলো—একটা বিশালাকৃতির পাথরের তৈরি শ্যাতু, পাহাড়ের পাশেই।

 

সোফি আশা করেছিলো এসময়টাতে তার দাদু ঘুমিয়ে থাকবে, কিন্তু বাড়িটাতে বাতি জ্বলতে দেখে সে একটু উত্তেজিত বোধ করলো। তার আনন্দ বিস্ময়ে রূপান্তরিত হলো, যখন সে দেখতে পেলো বাড়ির প্রাঙ্গণটাতে অনেকগুলো গাড়ি পার্ক করা মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, অদি আর রোলস-রয়েস। সোফি কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হাসিতে ফেঁটে পড়লো। আমার দাদু, প্রখ্যাত সন্নাসী, জ্যাক সনিয়ে, দেখে মনে হচ্ছে, তিনি নিজেকে যতোটা সন্নাসী হিসেবে দাবি করেন, আসলে তিনি ততোটা নন। সোফির অনুপস্থিতিতে তিনি একটা পার্টির আয়োজন করেছেন বলেই মনে হচ্ছে। আর পার্ক করা গাড়িগুলো দেখে বোঝাই যাচ্ছে প্যারিসের প্রভাবশালী লোকেরা এখানে উপস্থিত আছেন।

 

তাঁকে চমকে দেবার আশায়, সোফি সামনের দরজার দিকে দ্রুত ছুটে গেলো। কিন্তু দেখতে পেলো দরজাটা বন্ধ। কড়া নেড়ে কোন সাড়া-শব্দ পেলো না। হতভম্ব হয়ে সে পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলো। সেটাও বন্ধ। কোন সাড়া-শব্দ নেই। হতাশ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সে কিছু একটা শুনতে পেলো। নরম্যান্ডির উপকূল থেকে ভেসে আসা ঠাণ্ডা বাতাসের ঝিঝির শব্দই কেবল শুনতে পেলো।

 

না কোন সংগীত।

 

না কোন কণ্ঠ।

 

কিছুই না।

 

বনের নির্জনতায়, সোফি দ্রুত বাড়িটার পাশে স্তুপ করা কাঠের উপর উঠে বসার ঘরের জানালা দিয়ে ভেতরে তাকালো। সে যা দেখতে পেলো, তাতে আরো বেশি হতভম্ব হয়ে গেলো।

 

এখানেও কেউ নেই!

 

পুরো ঘরটাতে কেউ নেই, একেবারে ফাঁকা।

 

লোকজন সব কোথায় গেলো?

 

তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো, ছুটে গেলো একটা বক্সের কাছে, যেখানে তার দাদু বাড়তি একটা চাবি লুকিয়ে রাখতেন। সে দৌড়ে সামনের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। অভ্যর্থনা কক্ষে ঢোকামাত্রই সিকিউরিটি সিস্টেমটার লাল বাতি জ্বলতে শুরু করলো—একটা সতর্কতা, প্রবেশকারী দশ সেকেন্ডের মধ্যে সঠিক কোডটা টাইপ না করতে পারলে নিরাপত্তা এলার্মটা বাজতে শুরু করবে।

 

পার্টির সময়টাতে তিনি এলার্ম দিয়ে রাখেন?

 

সোফি দ্রুত কোডটা টাইপ করে এলার্মটা থামালো।

 

ভেতরে ঢুকে সোফি পুরো ঘরটাকে জন-মানবশূন্য দেখতে পেলো। উপরের তলায়ও এরকমই। সে আবারো ফাঁকা অভ্যর্থনা কক্ষে এসে ভাবতে লাগলো, সম্ভাব্য কী ঘটতে পারে।

 

এরপরই সোফি সেটা শুনতে পেয়েছিলো।

 

চাপা একটা কণ্ঠস্বর। আর সেগুলো মনে হচ্ছে নিচ থেকে ভেসে আসছে। সোফি কল্পনাও করতে পারলো না। হামাগুড়ি দিয়ে সে মাটিতে কান পাতলো। হ্যাঁ, শব্দটা নিশ্চিত নিচ থেকেই আসছে। কণ্ঠগুলো মনে হচ্ছে গান করছে, অথবা…ফিসফাস্ করছে? সোফি ভয় পেয়ে গেলো। এই বাড়িতে যে একটা বেসমেন্ট রয়েছে সেটা সোফি জানতো না।

 

এবার অভ্যর্থনা কক্ষের চারপাশটা ভালো করে তাকিয়ে দেখলো সোফি। পুরো ঘরটাতে সে শুধু একটা জিনিসই খুঁজে পেলো, যা একটু সরে ছিলো তার দাদুর প্রিয় এন্টিক। একটা চওড়া টেপেস্ট, যেটা পূর্ব দিকের দেয়ালে, ফায়ার প্লেসের পাশে সাধারণত টাঙানো থাকে। কিন্তু সেদিন সেটা একটু দূরে সরে ছিলো। যেনো জিনিসটা কেউ ইচ্ছে করেই সরিয়ে রেখেছে। এতে করে ওটার পেছনের দেয়ালটা দেখা যাচ্ছে।

 

কাঠের দেয়ালটার কাছে যেতেই, সোফি শুনতে পেলো আওয়াজটা বেড়ে যাচ্ছে। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে সে কাঠের উপর কান চেপে শুনতে চাইলো। আওয়াজটা এবার খুব পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। লোকগুলো নিশ্চিত সুর করে গাইছে…গানের কথাগুলো সোফি ধরতে পারলো না।

 

এই দেয়ালটার পেছনে ফাঁকা জায়গা আছে!

 

প্যানেলের কোনায়, সোফি টের পেলো একটা ছিদ্র আছে।একটা স্লাইডিং দরজা। তার হৃদস্পন্দন আবারো বেড়ে গেলো। ছিদ্রটার মধ্যে আঙ্গুল ঢুকিয়ে টান দিলো সে। কোন রকম শব্দ ছাড়াই ভারি দরজাটা সরতে লাগলো। ভেতরের অন্ধকার থেকে কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

 

দরজাটা দিয়ে সোফি ভেতরে ঢুকেই দেখতে পেলো খড়খড়ে পাথরের তৈরি একটা সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে। সে ছোট বেলা থেকেই এবাড়িতে নিয়মিত আসততা, তারপরও এ ধরনের সিঁড়ির অস্তিত্ব সম্পর্কে তার কোন ধারণাই ছিলো না।

 

ভেতরে ঢুকতেই বাতাসটা ঠাণ্ডা অনুভূত হলো। কণ্ঠস্বরগুলো আরো পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। এখন সে নারী-পুরুষের কণ্ঠ শুনতে পেলো। সিঁড়ির একেবারে নিচের ধাপে নেমে সে দেখতে পেলো, একটা ছোট বেসমেন্ট ফ্লোর-পাথরের, ফায়ার লাইটের কমলা রঙের আলোতে জায়গাটা আলোকিত হয়ে আছে।

 

দম নিয়ে, সোফি ভালো করে তাকিয়ে দেখলো। কী হচ্ছে, সেটা দেখতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো তার। ঘরটা একটা গুহা—পাহাড়ের গ্রানাইটে তৈরি গহ্বরটা। দেয়ালের একটা মশালই ঘরটার একমাত্র বাতি। বাতির আলোতে, ত্রিশ জন বা সেই সংখ্যক লোক ঘরটাতে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

 

আমি স্বপ্ন দেখছি, সোফি নিজেকে বলেছিলো। একটা স্বপ্ন ছাড়া আর কী?

 

ঘরের সবাই মুখোশ পরে আছে। মহিলারা পরেছে সাদা গাউন আর সোনালি জুতা। তাদের মুখোশগুলো সাদা, হাতে সোনালি রঙের গোলক ধরা। পুরুষেরা কালো আলখেল্লা পরা, তাদের মুখোশও কালো। তাদেরকে দেখে বিশাল দাবার কোর্ট বলে মনে হচ্ছে। বৃত্তের সবাই সামনে এবং পেছনে দুলছে আর সুর করে গাইছে। তাদের সামনে কোন কিছু রাখা আছে, সেটাকে তারা এভাবে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে…কিছু একটা যা সোফি দেখতে পাচ্ছিলো না।

 

সুরধ্বনিটা আরো স্পষ্ট শোনা যেতে লাগলো। সেটা ক্রমশ বেড়ে বজ্রপাতের মতো প্রবল হলো এবার। অংশগ্রহণকারীরা এক কদম এগিয়ে গিয়ে হাটু গেঁড়ে বসে পড়লো। ঠিক সেই মুহূর্তেই, সোফি মাঝখানে কী হচ্ছে সেটা দেখতে পেলো। দৃশ্যটা দেখে ভয়ে পিছু হটে গেলেও, এই দৃশ্যটাই তার মনে চিরকালের জন্য গেঁথে গিয়েছিলো। তার বমি বমি ভাব হলে সে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে লাগলো। পাথরের দেয়ালটা কোনভাবে হাতরাতে হাতরাতে সে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে চেষ্টা করলো। দরজাটা টেনে বন্ধ করে ঐ বাড়িটা ছেড়ে চলে গেলো সে। কাঁদতে কাঁদতে গাড়ি চালিয়ে সেই রাতে প্যারিসে ফিরে এসেছিলো সোফি।

 

ঐ রাতে সোফি ভগ্নহৃদয় নিয়ে সবকিছু গোছগাছ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। ডাইনিং রুমের টেবিলের ওপর একটা চিরকুট রেখে গিয়েছিলো সে।

 

আমি সব দেখে ফেলেছি। আমাকে খোঁজার চেষ্টা করবে না।

 

চিরকুটটার পাশেই শ্যাতুর বাড়িটার পুরনো একটা চাবি রেখে দিয়েছিলো।

 

সোফি! ল্যাংডন তাড়া দিয়ে বললো, থামাও! থামাও।

 

স্মৃতি থেকে ফিরে এসে সোফি জোরে ব্রেক কষলো। কি? কি হয়েছে?

 

ল্যাংডন সামনের রাস্তার দিকে ইঙ্গিত করলো।

 

দৃশ্যটা দেখে সোফির রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। একশো গজ সামনে, রাস্তার মোড়টায় ডিসিপিজের কয়েকটা গাড়ি পথ আঁটকে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার। তারা গ্যারিয়েল এভিটা সিল করে দিয়েছে!

 

ল্যাংডন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এ্যামবাসিতে যাওয়াটা আজ রাতে কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

 

রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ডিসিপিজের দুজন অফিসার তাদের দিকে তাকালো।

 

ঠিক আছে, সোফি, খুব ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে ফেলে।

 

সোফি স্মার্ট গাড়িটা একটু পেছনে নিয়ে বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে ফেললো। গাড়িটা ছুটতেই সে শুনতে পেলো কতগুলো চাকার খ্যা খ্যাচ্‌ শব্দ আর সাইরেনের আওয়াজ। সোফি সঙ্গে সঙ্গে এক্সেলেটরে চাপ দিলো

 

 

 

৩৩.

 

সোফির স্মার্ট গাড়িটা কূটনৈতিক এলাকা ছেড়ে এগিয়ে গেলো। অ্যামবাসি আর কনসুলেটগুলো অতিক্রম করে অবশেষে একটা রাস্তায় এসে পড়লো তারা, সেখান থেকে ডান দিকে মোড় নিয়ে আবার শাম্প-এলিসির বিশাল চত্বরটাতে ফিরে গলো।

 

ল্যাংডন সিটে বসে পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখলো কোন পুলিশের গাড়ি দেখা যায় কি না। হঠাৎ করে তার মনে হলো সে আর পালাবে না। তুমি এরকম কোরো না, নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিলো। বাথরুমের জানালা দিয়ে জিপিএস ডটটা যখন সোফি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো তখন তার হয়ে সোফিই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলো। এখন অ্যামবাসি থেকে চলে যাবার সময়, শাম্প-এলিসির পথ দিয়ে ছুটতে ছুটতে ল্যাংডনের মনে হলো তার সুযোগগুলো কমতে শুরু করেছে। যদিও মনে হচ্ছে সোফি পুলিশকে ক্ষণিকের জন্য ফাঁকি দিতে পেরেছে কিন্তু ল্যাংডনের সন্দেহ খুব বেশিক্ষণ তারা এভাবে নিজেদের সৌভাগ্য ধরে রাখতে পারবে না।

 

এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে থাকা অবস্থায় অন্য হাত দিয়ে সোফি তার সোয়েটারের পকেট থেকে ধাতব একটা বস্তু বের করে আনলো। জিনিসটা ল্যাংডনের দিকে এগিয়ে ধরলো সে। রবার্ট, জিনিসটা একটু দেখো। এটাই আমার দাদু ম্যাডোনা অব দি রকস্-এর পেছনে রেখে গিয়েছেন।

 

ভেতরে ভেতরে প্রবল উত্তেজনা বোধ করে ল্যাংডন জিনিসটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখলো। খুব ভারি আর ক্রুশ আকৃতির একটা জিনিস। তার প্রথমে মনে হলো, সে ধরে রেখেছে একটা শেষকৃত্যের পাইকবরের পাশে, মাটিতে পোতা ফলকের ছোটখাটো একটা সংস্করণ। কিন্তু ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখলো জিনিসটা আসলে এক ধরনের উন্নত মানের সূক্ষ্ম-যন্ত্রবিশেষ।

 

এটা একটা লেজার-কাট চাবি, সোফি তাকে বললো। শুধুমাত্র ইলেক্ট্রক-আই দিয়েই এটা রিড করা যায়।

 

একটা চাবি? ল্যাংডন কখনও এরকম কিছু দেখেনি।

 

অন্য দিকটা দেখো, সোফি বললো। রাস্তা বদলে একটা মোড়ের কাছে এসে পড়লো তারা।

 

ল্যাংডন যখন চাবিটা ঘুরিয়ে দেখলো তার মুখ হা হয়ে গেলো। কুশটার মাঝখানে খোঁদাই করা ফ্লার-দ্য-লিস এবং পিএস অক্ষর দুটো রয়েছে! সোফি, সে বললো, এই সিলটার কথাই তোমাকে আমি বলেছিলাম। প্রায়োরি অব সাইনর অফিশিয়াল প্রতীক।

 

সে মাথা নেড়ে সায় দিলো। তোমাকে যেমনটা বলেছিলাম, আমি চাবিটা অনেক আগে একবার দেখেছিলাম। তিনি আমাকে এ ব্যাপারে কখনও কোন কিছু বলতে বারণ করে দিয়েছিলেন।

 

ল্যাংডনের চোখ তখনও চাবিটার দিকেই নিবদ্ধ। এর অতি উন্নত প্রাযুক্তিক কৌশল আর বহু প্রাচীন প্রতীকের সহাবস্থান আধুনিকতা আর প্রাচীনের সংমিশ্রন বলে মনে হলো তার কাছে।

 

তিনি আমাকে বলেছিলেন চাবিটা দিয়ে একটা বাক্স খোলা যায়, যেখানে তিনি অনেক গোপনীয় কিছু রাখেন।

 

ল্যাংডন এটা ভেবে খুব শীতল অনুভব করলো যে, জ্যাক সনিয়ের মতো একজন মানুষ কী ধরনের সিক্রেট রাখতে পারেন। একজন প্রাচীন ভ্রাতৃসংঘের মানুষ এরকম একটা চাবি দিয়ে কী করতেন। ল্যাংডনের সে সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই। প্রায়োরিরা একটা সিক্রেটকেই রক্ষা করার উদ্দেশ্যে সংগঠনটির পত্তন করেছিলেন। অবিশ্বাস্য ক্ষমতার একটা সিক্রেট। এই চাবিটা কি সে সবের সাথে সংশ্লিষ্ট? ভাবনাটা তাকে রোমাঞ্চিত করলো।

 

তুমি কি জাননা এটা দিয়ে কী খোলা যায়?

 

সোফিকে দেখে খুব হতাশ মনে হলো। আমি আশা করেছিলাম তুমিই সেটা জানো।

 

ল্যাংডন নিরবে চাবিটার ক্রশ পরীক্ষা করতে লাগলো। এটা দেখতে খৃস্টিয় বলে মনে হচ্ছে, সোফি জানালো।

 

ল্যাংডন অবশ্য এ ব্যাপারে অতোটা নিশ্চিত ছিলো না। চাবির মাথায় যে কুশটা আঁকা আছে সেটা প্রচলিত খৃস্টিয় ক্রশের মতো একটা বাহু লম্বা নয়, বরং এটার চারটা বাহুই সমান-চারটা বাহু দৈর্যে একেবারে একই রকম-যা খৃস্টাব্দের পনেরোশ বছর আগেকার সময়কেই নির্দেশ করছে। এই ধরনের ক্রশ কোন খৃস্টিয় ধর্ম সম্পর্কিত নয়, যা ক্রুশবিদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট। রোমানরা যেটা শাস্তি দেয়ার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতো। ল্যাংডন সব সময়ই অবাক হয়ে ভেবেছে, কতজন খৃস্টান এটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে, তাদের প্রতীকের রক্তাক্ত ইতিহাসটা এর নামকে সঠিকভাবেই প্রতিধ্বনিত করছে : ক্রশ এবং ক্রুশিফিক্স বা ক্রুশবিদ্ধ শব্দটা এসেছে লাতিন ক্রিয়াপদ Cruiare থেকে-মানে, নির্যাতন করা।

 

সোফি, সে বললো, আমি যেটা তোমাকে বলতে পারি সেটা হলো, এরকম সমান বাহুর ক্রশকে শান্তিপূর্ণ ক্রশ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। তাদের চারকোনা আকৃতিটা ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য অনুপোযোগী হয়ে যায়, তাদের উলম্ব আর আনুভূমিক ভারসাম্য নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সম্মিলনকে ইঙ্গিত করে। এটা প্রায়োরিদের দর্শনের একটি প্রতীকি উপস্থাপন।

 

সোফি একটা হতাশাপূর্ণ ভঙ্গী করলো। তোমার কোন ধারণা নেই, তাই না?

 

ল্যাংডন ভুরু তুলে বললো, একটা ক্লুও পাচ্ছি না।

 

ঠিক আছে, আমাদেরকে রাস্তাটা ছাড়তে হবে। সোফি তার বিয়ার-ভিউটা দেখে নিলো। আমাদেরকে নিরাপদ একটা জায়গায় গিয়ে খুঁজে বের করতে হবে চাবিটা দিয়ে কী খোলা যায়।

 

ল্যাংডন তার হোটেল রিজ-এর আরামদায়ক ঘরটির কথাই প্রথমে ভাবলো। নিশ্চিতভাবেই এটা কোন জায়গা হতে পারে না। প্যারিসে আমার আমেরিকান ইউনিভার্সিটির নিমন্ত্রণকতার জায়গাটা কেমন হয়?

 

এটা একদম নিশ্চিত, ফশে তাদের ওখানে সবার আগে খোঁজ নেবে।

 

তুমি এখানে থাকো, অনেককেই নিশ্চয় চেননা।

 

ফশে আমার ফোন, ই-মেইল রেকর্ড ঘেঁটে দেখবে, আমার সহকর্মীদের সাথে কথা বলবে। আমার পরিচিতজনদের কোন জায়গা নিরাপদ হবে না, আর কোন হোটেলে যাওয়াটাও ঠিক হবে না, সব জায়গায়ই আইডি কার্ড চাইবে।

 

ল্যাংডন আবার ভাবতে লাগলো, যদি সে লুভরেই ফশের হাতে গ্রেফতার হোতো তবেই বেশি ভালো হতো। আসো, অ্যামবাসিতে ফোন করি। আমি তাদের সমস্ত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে পারবো আর অ্যামবাসির কাউকে আমাদের সাথে অন্য কোথাও দেখা করার জন্য লোক পাঠাতে বলবো।

 

আমাদের সাথে দেখা করা? সোফি তার দিকে ঘুরে এমনভাবে তাকালো যেনো ল্যাংডন একজন পাগল। রবার্ট, তুমি স্বপ্ন দেখছো। তোমার অ্যামবাসি নিজের কম্পাউন্ডের বাইরে এরকম কোন আইনগত ক্ষমতা রাখে না। আমাদেরকে নেয়ার জন্য লোক পাঠানোর অর্থ হলো ফরাসি সরকারের একজন ফেরারী আসামীকে সাহায্য করা। এটা হবে না। তুমি যদি তোমার অ্যামবাসিতে গিয়ে সাময়িক আশ্রয় চাওয়ার অনুরোধ করো সেটা একটা কথা, কিন্তু তাদের কাছে ফরাসি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু চাওয়াটা? সোফি মাথা ঝাঁকালো। তোমার অ্যামবাসিকে এক্ষুণি ফোন করে, তারা তোমাকে বলবে আর বেশি ক্ষতি না করে ফশের কাছে ধরা দিতে। তারপর তারা প্রতীজ্ঞা করবে কূটনৈতিকভাবে ব্যাপারটা মীমাংসা করার, যাতে তুমি ন্যায় বিচার পাও। সোফি শাম্প-এলিসির অভিজাত এলাকার দিকে তাকালো। তোমার কাছে কি পরিমাণ টাকা আছে?

 

ল্যাংডন মানি ব্যাগটা দেখে নিলো। একশো ডলার, আর কিছু ইউরো। কেন?

 

ক্রেডিট কার্ড?

 

অবশ্যই।

 

সোফি গাড়িটার গতি বাড়াতেই ল্যাংডন অনুমান করতে পারলো সে একটা পরিকল্পনা আঁটছে। একেবারে সামনে শাম্প-এলিসির শেষ মাথায় আর্ক দ্য ট্রায়াঙ্গ অবস্থিত-নেপোলিয়নের ১৬৪ ফুট উচ্চতার স্মৃতিস্তম্ভ যা তার সেনাবাহিনীর শক্তিকে প্রকাশ করছে-সেটার চারপাশ ঘিরে রয়েছে ফ্রান্সের সবচাইতে বড় একটা চত্বর।

 

সেখানে পৌঁছাতেই সোফি আবারো বিয়ার-ভিউ আয়না দিয়ে তাকালো। কিছুক্ষণের জন্য হলেও তাদেরকে আমরা ফাঁকি দিতে পেরেছি, সোফি বললো, কিন্তু এই গাড়িতে যদি আমরা থাকি তবে পাঁচ মিনিটও আর টিকতে পারবো না।

 

তো, অন্য আরেকটা গাড়ি চুরি করতে হবে, ল্যাংডন মনে মনে বললো, আমরা এখন সত্যিকারের অপরাধী। তুমি কি করতে চাও?

 

সোফি গাড়িটা দ্রুত গতিতে চত্বরটার সামনে নিয়ে গেলো। আমার উপর আস্থা রাখো।

 

ল্যাংডন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। আজ রাতে আস্থা তাকে খুব বেশি দূর অবধি নিয়ে যেতে পারেনি। শার্টের হাতা গুটিয়ে হাত ঘড়িটা দেখলো-একটা পুরনো, সংগ্রহশালার সংস্করণের মিকি মাউস হাত-ঘড়ি, যা তার বাবা-মা তার দশম জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলো। যদিও এটা দেখতে অল্পবয়সীদের মতো লাগে তবুও ল্যাংডন কখনও এটা বাদে অন্য কোন ঘড়ি পরেনি; আকার এবং রঙের জাদুর সাথে তার প্রথম পরিচয় ডিজনির কার্টুনের মধ্য দিয়ে। আর মিকি, ল্যাংডনকে প্রতিদিনের সময়ের কথা স্মরণ করার মধ্যে দিয়ে তাকে মনের দিক থেকে তরুণ করে রেখেছে। এখন মিকির হাত দুটো অত ভীতে আছে, ইঙ্গিত করছে সেরকমই অত সময়টাকে।

 

২টা ৫১ মিনিট।

 

মজার ঘড়িতো, গাড়িটা একটানে ঘোরাতে ঘোরাতে তার হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সোফি বললো।

 

এটার লম্বা একটা গল্প আছে, হাতটা নামিয়ে সে বললো।

 

আমারও সে রকমই ধারণা। তার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটা হাসি দিলো সে। গাড়িটা ঘুরিয়ে উত্তর দিকে গেলো। রাস্তাটা শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে চলে গেছে। মোড়টা ছাড়িয়ে যেতেই তারা গাড়ির গতি বাড়িয়ে বুলেভার্ড মলেশাব-এর দিকে ছুটলো। সারি সারি গাছপালা সমৃদ্ধ কূটনৈতিক এলাকা ছেড়ে ঘন আঁধারে ঢাকা শিল্পাঞ্চলের ভেতরে ঢুকে পড়লো তারা। সোফি বাম দিকে মোড় নিতেই ল্যাংডন বুঝতে পারলো তারা এখন কোথায় আছে।

 

গার সেন্ট-লাজারে।

 

তাদের সামনে কাঁচের ছাদের ট্রেন টার্মিনালটা দেখতে অনেকটা এয়ারপ্লেন হ্যাঙ্গার অথবা গৃন-হাউজের মতোই লাগছে। ইউরোপের ট্রেন স্টেশনগুলো কখনও ঘুমায় না। এমন কি এই সময়ে প্রবেশ দ্বারের সামনে আধ ডজন ট্যাক্সি অলসভাবে দাড়িয়ে আছে। গাড়িতে করে স্যান্ডউইচ আর মিনারেল ওয়াটার বিক্রি করছে ফেরীওয়ালারা, মুটে-মজুররা মাল-পত্র ওঠানো নামানোর জন্য অপেক্ষা করছে। রাস্তার ওপরে দাঁড়ানো কয়েকজন পুলিশ পর্যটকদেরকে রাস্তা-ঘাট চেনার কাজে সহায়তা দিচ্ছে।

 

যদিও পার্কিং এলাকাতে পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে তারপরও সোফি তার গাড়িটা ট্যাক্সি পার্ক করা জায়গার ঠিক পেছনে রেঙ-জোন এলাকায় থামালো। ল্যাংডন তাকে কী হচ্ছে বা কী করবে জিজ্ঞেস করার আগেই সোফি গাড়ি থেকে নেমে সামনের ট্যাক্সিটার জানালা দিয়ে ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে শুরু করে দিলো।

 

ল্যাংডন গাড়ি থেকে নামতেই দেখতে পেলো সোফি ড্রাইভারকে এক বান্ডিল টাকা দিচ্ছে। ট্যাক্সি ড্রাইভার মাথা নেড়ে ল্যাংডনকে বিস্মিত করে তাদের ছেড়ে চলে গেলো।

 

কি হয়েছে? ট্যাক্সিটা চলে যেতে দেখে ল্যাংডন জানতে চাইলো।

 

সোফি ইতিমধ্যেই ট্রেন স্টেশনের প্রবেশদ্বারের দিকে এগিয়ে গেছে। আসো। আমরা পরের ট্রেনেই প্যারিস ছেড়ে যাবার জন্য দুটো টিকেট কিনবো।

 

ল্যাংডন তার পিছু পিছু দ্রুত ছুটতে লাগলো। ইউএস অ্যামবাসি থেকে এক মাইল দূরে এসে এখন যা শুরু হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে একেবারে প্যারিসই ছাড়তে হবে। ল্যাংডন এই আইডিয়াটাকে একদমই পছন্দ করতে পারছিলো না।

 

 

 

৩৪.

 

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বিমান বন্দর থেকে যে ড্রাইভার বিশপ আরিঙ্গারোসাকে তুলে নিলো সে একটা ছোট্ট সাদা-মাটা কালো ফিয়াট সিডান গাড়ি নিয়ে এসেছে। আরিজারোসার মনে পড়ে গেলো সেইসব দিনগুলোর কথা যখন ভ্যাটিকানের পরিবহন শাখায় ছিলো ব্যয়বহুল আর অভিজাত সব গাড়ি, যাতে মেডেল আর হলি সির সিলযুক্ত পতাকা উড়তো। সেইসব দিন আর নেই। ভ্যাটিকানের গাড়িগুলো জৌলুস হারিয়েছে, এখন আর সেগুলোর সবগুলোতে কোন কিছু দিয়ে চিহ্নিত করা থাকে না। ভ্যাটিকানের দাবি, এতে করে খরচ কমিয়ে বিশপদের এলাকায় আরো বেশি সেবামূলক কাজ করা যাবে। তবে আরিঙ্গারোসার সন্দেহ এটা আসলে নিরাপত্তার জন্যই করা হয়েছে। পৃথিবীটা উন্মাদ হয়ে গেছে, আর ইউরোপের অনেক অংশেই তোমার যিশুর জন্য ভালবাসার বিজ্ঞাপনটা করা হয়ে থাকে অনেকটা তোমার গাড়ির ছাদে ষাড়ের চোখ আঁকার মতো করে।

 

কালো আলখেল্লাটা বেঁধে নিয়ে আরিজারোসা গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসলেন কাস্তেল গাডোলফোর উদ্দেশ্যে লম্বা একটা ভ্রমণের জন্য। এটা হবে ঠিক পাঁচ মাস আগের ভ্রমণের মতোই।

 

গত বছরের রোমের ভ্রমণ, তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। আমার জীবনের দীর্ঘতম একটি রাত।

 

পাঁচ মাস আগে ভ্যাটিকান তাকে ফোন করে বলেছিলো সঙ্গে সঙ্গে যেনো রোমে উপস্থিত হয়। তারা কোন ব্যাখ্যা দেয়নি। আপনার টিকিট এয়ারপোর্টেই আছে। হলি সি একটা ঢেকে থাকা রহস্য পুণরুদ্ধারের জন্য প্রবলভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন, এমনকি এর উচ্চতম যাজকও। এই রহস্যময় ডেকে আনাটা, আরিঙ্গাবোসা ভেবেছিলেন, সম্ভবত ওপাস দাইর সাম্প্রতিক সফলতার জন্য পোপ এবং ভ্যাটিকানের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে ছবি তোলার একটা সুযোগ-নিউইয়র্কে তাদের বিশ্ব-সদর দফতরের কাজ সমাপ্ত হয়েছিলো। আর্কিটেকচারাল ডাইজেস্ট ওপাস দাইর ভবনটাকে আধুনিক স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে ক্যাথলিকদের জৌলুসের উজ্জ্বল আলো, হিসেবে বর্ণনা করেছিলো। শেষ পর্যন্ত মনে হলো ভ্যাটিকান আধুনিক শব্দটার সাথে কোন না কোনভাবে জড়িয়ে গেছে।

 

দাওয়াতটা কবুল করা ছাড়া আরিজারোসার কোন উপায় ছিলো না। তারপরও তিনি অনিশ্চয়তা নিয়েই সেটা মেনে নিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ের পাপাল প্রশাসনের কোন ভক্ত হিসেবে নয়, আরিজারোসা অন্যসব রক্ষণশীল যাজকদের মতোই, নতুন পোপের প্রথম বছরটা প্রচণ্ড উদ্বিগ্নতার সাথে লক্ষ্য করে যাচ্ছিলেন, কীভাবে তিনি তার অফিস চালান সেটা দেখতে। একটা নজিরবিহীন উদারতায় হিজ হলিনেস ভ্যাটিকানের ইতিহাসের সবচাইতে বির্তকিত কনক্লেইভ-এর মধ্য দিয়ে পাপাসিটাকে সুরক্ষিত করেছিলেন। পোপ এখন ঘোষণা দিয়েছেন, তার পাপাল মিশনটা হবে ভ্যাটিকানের মতবাদকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করা এবং ক্যাথলিকবাদকে তৃতীয় সহস্রাব্দের উপযোগী করে গড়ে তোলা। এই কাজটাকে অন্যেরা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে বলে আরিজারোসার আশংকা হয়েছিল। যারা মনে করে আধুনিককালে ক্যাথলিকবাদ অকেজো, তাদের মন জয় করার জন্য লোকটা কি ঈশ্বরের আইনকে নতুন করে লেখার মতো দুঃসাহস দেখাবে?

 

আরিঙ্গাবোসা ওপাস দাই আর তাদের ব্যাংকের মাধ্যমে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে পোপ এবং তার উপদেষ্টাদেরকে চাপ দিলেন। বোঝালেন, চার্চের নিয়ম কানুন শিথিল করার মাধ্যমে শুধুমাত্র বিশ্বাসহীনতাই তৈরি হবে না বরং রাজনৈতিকভাবেও আত্মহত্যা করা হবে।

 

তিনি অতীতে চার্চের নিয়ম-কানুন পরিবর্তন করার ভ্যাটিকানের দ্বিতীয় ফিয়াকোটার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন, যে ঘটনাটি মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়েছিলো : চার্চের বর্তমান সময়ে উপস্থিতির হার যে কোন সময়ের তুলনায় কম, আর্থিক সাহায্যও কমে আসছে, এমনকি ক্যাথলিক চার্চে সভাপতিত্ব করার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক পাদ্রীরও সংকট চলছে এখন।

 

চার্চ থেকে লোকজন গঠনমূলক এবং কিছু দিকনির্দেশনাও প্রত্যাশা করে, আরিঙ্গাবোসা চাপাচাপি করেছিলেন, আসকারা দেয়া কিংবা প্রশ্রয় দেয়াটা তারা আশা করে না।

 

কয়েক মাস আগের সেই রাতে, ফিয়াটটা এয়ারপোর্ট থেকে ভ্যাটিকানের দিকে না গিয়ে পূর্বদিকের একটা আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ দিয়ে চলে গিয়েছিলো। আরিঙ্গাবোসা খুবই অবাক হয়েছিলেন। আমরা কোথায় যাচ্ছি? ড্রাইভারের কাছে তিনি জানতে চেয়েছিলেন।

 

আলবান হিল-এ, লোকটা জবাব দিয়েছিলো। আপনার সাক্ষাক্টা হবে কাস্তেল গাভোলফোতে।

 

পোপের গ্রীষ্মকালীন আবাস? আরিঙ্গাবোসা কখনও সেখানে যায়নি, যাওয়ার ইচ্ছেও হয়নি কখনও। পোপের এই বাড়তি আবাসটা, ষষ্ঠ শতাব্দীর স্পেকুলা ভ্যাটিকানা, সিটাডেল হাউজ ছিলো-ভ্যাটিকানের অবজারভেটরি-ইউরোপের সবচাইতে অগ্রসর অবজারভেটরির মধ্যে এটা অন্যতম। আরিঙ্গাবোসা ভ্যাটিকানের বিজ্ঞান নিয়ে ছেলেমানুষী করার ইতিহাসটায় খুবই ব্ৰিত বোধ করেন। বিজ্ঞান এবং বিশ্বাসের সংমিশ্রনের যৌক্তিকতা কি? যে ব্যক্তি ঈশ্বরে বিশ্বাস ধারণ করে তার দ্বারা নিরপেক্ষ বিজ্ঞান ভাবনা সম্ভব নয়। যেমনটা সম্ভব নয় বিশ্বাসী কারোর পক্ষে তার বিশ্বাসের স্বপক্ষে বস্তুগত কোন প্রমাণের।

 

যাহোক, এইতো এটা, কাস্তেল গান্ডোলফোটা দৃষ্টিগোচর হলে তিনি মনে মনে বলেছিলেন। নভেম্বরের তারা ভরা আকাশে বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা। দূর থেকে প্রাসাদটাকে দেখা যায় ইতালিয় সভ্যতার পাদপীঠে-যে উপত্যকায় কুরিয়াজি এবং ওরাজি ক্লান লড়াই করেছিলো রোম পত্তন হবার অনেক আগে।

 

প্রাসাদটার ছায়া দেখেও মনে হবে একটা আত্মরক্ষামূলক স্থাপত্যের চমৎকার অবয়ব। দুঃখজনক হলো, আরিঙ্গাবোসা দেখতে পান ভ্যাটিকান প্রাসাদটাকে এর ছাদের উপর বিশাল বড় দুটো অ্যালুমুনিয়ামের টেলিস্কোপ বসানোর মধ্য দিয়ে নষ্ট করে ফেলেছে। যেনো এককালের গর্বিত কোন যোদ্ধার মাথায় পার্টি টুপি পরিয়ে দেয়া হয়েছে।

 

আরিঙ্গাবোসা গাড়ি থেকে নামতেই একজন তরুণ যাজক খুব দ্রুত ছুটে এসে তাঁকে অভিবাদন জানিয়েছিলো। বিশপ, আপনাকে স্বাগতম। আমি ফাদার মাঙ্গাননা। এখানকার একজন জ্যোর্তিবিদ।

 

আপনার জন্য উপযুক্ত জায়গা। আরিঙ্গাবোসা শুভেচ্ছা বিনিময় করে ফাদারের পিছু পিছু প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করেন। অভ্যর্থনা কক্ষটি বেশ খোলামেলা জায়গা, সেখানকার সাজসজ্জা বেঁনেসা চিত্রকলা এবং জ্যোর্তিবিদ্যার চিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। এতে করে জৌলুসহীন হয়ে পড়েছে ভেতরের পরিবেশ। বিশাল এবং প্রশস্ত মার্বেলের সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার সময় আরিঙ্গাবোসা লক্ষ্য করেন কনফারেন্স রুম, সায়েন্স লেকচার হল আর পর্যটন তথ্য সার্ভিস ইত্যাদি সাইনগুলো। এটা তাকে বিস্মিত করলো। তিনি ভাবেন, ভ্যাটিকান প্রতিটি ক্ষেত্রেই আধ্যাত্মিকতার সমৃদ্ধি না ঘটিয়ে বরং পর্যটকদের কাছে ভৌত জ্যোর্তিবিদ্যার বক্তৃতা দিয়ে থাকে।

 

আমাকে বলুন, আরিজারো তরুণ যাজককে বলেন, কখন থেকে লেজে কুকুর নাড়াতে শুরু করেছে?

 

তরুণ যাজক তার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকায়। স্যার?

 

আরিঙ্গাবোসা ইশারা করে ব্যাপারটা ক্ষান্ত দেন। তিনি ঠিক করেন আজকের সন্ধ্যায় আর এইসব ব্যাপার নিয়ে আক্রমণাত্মক কোন কিছু বলবেন না। ভ্যাটিকান উন্মাদ হয়ে গেছে।

 

ওপরের তলার করিডোরটা খুবই প্রশস্ত, একদিকেই চলে গেছে সেটা-একটা বিশাল ও কাঠের দরজার দিকে, যেটাতে পিতলের একটা সাইন লাগানো :

 

BIBLIOTECA ASTRONOMICA

 

আরিঙ্গাবোসা এই জায়গাটা সম্পর্কে শুনেছিলেন-ভ্যাটিকানের জ্যোর্তিবিদ্যার লাইব্রেরি-গুজব আছে, এখানে পঁচিশ হাজার ভলিউম সংরক্ষণ করা আছে, যার মধ্যে কোপার্নিকাসের বিরল কাজগুলোও রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে গ্যালিলিও, কেপলার, নিউটন আর সেচ্চির। আরো অভিযোগ আছে, এখানেই পোপের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গোপন মিটিং করে থাকে…এসব মিটিং তারা ভ্যাটিকানের চার দেয়ালের মধ্যে করাটা পছন্দ করেন না।

 

দরজার দিকে এগোতে থাকা বিশপ আরিঙ্গাবোসা কখনও কল্পনাও করতে পারেননি ভেতরে ঢুকে তিনি কী রকম দুঃখজনক একটি সংবাদ শুনবেন। এই ঘটনাই তাকে একটা মিশনে নামতে প্রবৃত্ত করেছিলো। এখন থেকে ছয় মাস পরে। মনে মনে ভাবলেন তিনি। ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন।

 

 

 

এখন ফিয়াটে বসে বিশপ আরিঙ্গাবোসা বুঝতে পারলেন, প্রথম মিটিংটার কথা ভেবে তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেছে। তিনি তার মুঠোটা খুলে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিয়ে তার পেশীগুলো নিস্তেজ করলেন।

 

সবকিছু ঠিকঠাক মতো হবে, ফিয়াটটা পাহাড়ী পথে উঠতেই তিনি নিজেকে বললেন। তিনি এখনও আশা করছেন তাঁর সেলফোনটা বাজুক। টিচার কেন ফোন করছে না আমাকে? সাইলাস হয়তো এরইমধ্যে কি-স্টোনটা পেয়ে থাকবে।

 

নিজের নাভটা স্থিত করার জন্য বিশপ তার হাতের আঙটির বর্ণালি এমেথিস্টটার দিকে তাকিয়ে ধ্যান করার চেষ্টা করলেন। তার এও মনে হলো, হাতের পাথরটার যে ক্ষমতা আছে তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষমতা তিনি খুব শীঘ্রই অর্জন করতে যাচ্ছেন।

 

 

 

৩৫.

 

গার সেন্ট লাজারের ভেতরটা দেখতে ইউরোপের অন্যান্য ট্রেন স্টেশনের মতোই, ছোট-ঘোট গমন-নির্গমনের দরজা, অনেকটা গুহার মতো-গৃহহীন লোকেরা হাতে সাইনবোর্ড ধরে আছে, কতোগুলো স্কুল কলেজের ছাত্র পিঠে ঝোলা নিয়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমাচ্ছে, কেউবা এমপি খৃ কানে লাগিয়ে গান শুনছে, নীল রঙের ব্যাগেজ নিয়ে সিগারেট ফুকছে একদল মুটে।

 

সোফি উপরে ঝোলানো বিশাল ডিপার্চার বোর্ডটার দিকে তাকালো। কালো আর সাদা ট্যাবগুলো বদলে যাচ্ছে, ভেসে উঠছে নতুন তথ্য। আপডেটগুলো শেষ হলে ল্যাংডন সেটা দেখলো। তালিকার সবার উপরের লেখাটা পড়লো সে :

 

লিলে-রেপাইড-৩:০৬

 

মনে হচ্ছে এটা খুব শীঘ্রই ছাড়বে, সোফি বললো।

 

শীঘই। ল্যাংডন তার ঘড়ির দিকে তাকালো : ২:৫৯। ট্রেনটা সাত মিনিটের মধ্যেই ছেড়ে যাবে আর এখন পর্যন্ত তারা টিকেট হাতে পায়নি।

 

সোফি ল্যাংডনকে কাউন্টারের দিকে নিয়ে গিয়ে বললো, তোমার ক্রেডিট কার্ডটা দিয়ে দুটো টিকেট কেনো।

 

আমার মনে হয় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে ওরা ট্রে করে ফেলবে–

 

একেবারেই ঠিক।

 

ল্যাংডন এগিয়ে গিয়ে ভিসাকার্ডটা দিয়ে লিলের দুটো টিকেট কিনে সোফির হাতে তুলে দিলো।

 

তাকে নিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেলো সোফি। একটা পরিচিত কণ্ঠ মাথার উপর বেজে চলছে। পিএ ঘোষক লিলের বোর্ডিংয়ের জন্য চুড়ান্ত আহ্বান জানাচ্ছে। তাদের সামনে যোলোটা রেললাইন চলে গেছে। দূরের ডান দিকে, তিন নম্বর লাইনটাতে লিলের ট্রেনটা ছাড়ার জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু সোফি ল্যাংডনের কোমর এক হাতে জড়িয়ে ধরে তাকে ঠিক বিপরীত দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। তারা লবিটা এবং সারারাত খোলা থাকে এমন একটা কফিশপ পেরিয়ে অবশেষে স্টেশনের পশ্চিম দিকের দরজা দিয়ে বের হয়ে বাইরে ফাঁকা রাস্তায় এসে পড়লো।

 

দরজাটার সামনেই খালি একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। সোফিকে দেখেই হেডলাইট জ্বালালো ড্রাইভার।

 

সোফি গাড়িটার পেছনের সিটে গিয়ে বসে পড়লে ল্যাংডনও তাকে অনুসরণ করে পেছনে গিয়ে বসলো।

 

ট্যাক্সিটা স্টেশন থেকে ছেড়ে যেতেই সোফি এইমাত্র কেনা টিকেট দুটো বের করে ছিঁড়ে ফেললো।

 

ল্যাংডন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সতেরো ডলার কতো ভালোভাবেই না খরচ করা হলো।

 

তাদের ট্যাক্সিটা উত্তর দিকের রুই দ্য ক্লিচিতে না আসা পর্যন্ত ল্যাংডনের মনে হলো না তারা পালাতে পেরেছে। ডান দিকের জানালা দিয়ে সে দেখতে পেলো চমৎকার সুন্দর মস্তমাত্রে আর মনোরম স্যাকর-কোয়ে। বিপরীত দিক থেকে পুলিশের গাড়ির হেডলাইটের আলোতে দৃশ্যগুলো দেখতে বাঁধা পেলো।

 

সাইরেনের আওয়াজটা পেতেই ল্যাংডন আর সোফি নিচু হয়ে শুয়ে পড়লো।

 

সোফি ড্রাইভারকে আগেই বলে দিয়েছিলো সোজা শহরের বাইরে বেড়িয়ে যেতে, আর ল্যাংডন সোফির শক্ত চোয়ালটা দেখে অনুমান করতে পারলো পরবর্তী পরিকল্পনাটাও মনে মনে এঁটে নিচ্ছে মেয়েটা।

 

ল্যাংডন ক্রুশাকৃতির চাবিটা আবার পরীক্ষা করতে লাগলো। জানালার সামনে তুলে ধরলো সেটা, খুব কাছে নিয়ে দেখতে চেষ্টা করলো ওটাতে কোন মার্ক দেয়া আছে কি না, যাতে বোঝা যায় চাবিটা কোথায় বানানো হয়েছে। কিন্তু এই স্বল্প আলোতে সে কেবল প্রায়োরি সিলটা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলো না।

 

কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, বললো সে।

 

কোনটা?

 

তোমার দাদু এতো কষ্ট করে তোমার কাছে এমন একটা চাবি দিয়ে গেলেন যা দিয়ে কী করতে হবে সেটা তুমি জানো না।

 

ঠিক বলেছো।

 

তুমি কি নিশ্চিত তিনি ছবিটার পেছনে অন্য কিছু লেখেননি?

 

আমি পুরো জায়গাটা খুঁজেছি। এটাই শুধু ছিলো। এই চাবিটা ছবিটার পেছনে ছিলো। আমি প্রায়োরি সিলটা দেখেই চাবিটা পকেটে ভরে চলে এসেছি।

 

ল্যাংডন কপাল কুচকে চাবির ত্রিভূজাকৃতির দণ্ডটার দিকে তাকালো। কিছুই নেই। এবার চাবিটার মাথা ভালো করে দেখলো। সেখানেও কিছু নেই। আমার মনে হচ্ছে চাবিটা সম্প্রতি পরিষ্কার করা হয়েছে।

 

কেন?

 

এটা থেকে এলকোহলের গন্ধ পাচ্ছি।

 

সোফি ঘুরে তাকালো। বুঝলাম না?

 

এটা থেকে গন্ধ পাচ্ছি, তাতে মনে হচ্ছে কেউ এটা ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করেছে। ল্যাংডন চাবিটা নাকের কাছে ধরে গন্ধ শুকলো। এদিকটাতে আরো বেশি গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সে জিনিসটা উল্টে দেখলো। হ্যাঁ, এলকোহলই। মনে হচ্ছে। ক্লিনার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অথবা– ল্যাংডন থামলো।

 

কি?

 

সে চাবিটা আলোর কাছে কোনাকুনি করে ধরে এটার মসৃন পৃষ্ঠটার দিকে তাকালো। ভেজা-ভেজা মনে হচ্ছে, তাই চকচক করছে। চাবিটা পকেটে ঢোকানোর আগে তুমি এটার পেছনে কি ভালো করে দেখেছো?

 

কি? না, ভালো করে দেখিনি। আমার খুব তাড়া ছিলো।

 

ল্যাংডন সোফির দিকে ঘুরলো। তোমার কাছে কি ব্ল্যাক লাইটটা আছে?

 

সোফি তার পকেট থেকে ইউভি পেনটা বের করে দিলে ল্যাংডন সেটা হাতে নিয়ে জ্বালিয়ে চাবিটার পেছন দিকে আলোর লম্মি ফেললো।

 

পেছনটা সাথে সাথে জ্বলজ্বল করে উঠলো। কিছু একটা লেখা আছে।

 

তো, ল্যাংডন হেসে বললো। আমার মনে হয় এলকোহলের গন্ধের কারণ কি সেটা আমি জানি।

 

সোফি বিস্ময়ে চাবিটার পেছনে বর্ণালি লেখাটার দিকে তাকিয়ে আছে।

 

২৪ রুই হ্যাক্সে

 

একটা ঠিকানা। আমার দাদু একটা ঠিকানা লিখে গেছেন।

 

সেটা কোথায়? ল্যাংডন জিজ্ঞেস করলো।

 

এ ব্যাপারে সোফির কোন ধারণাই ছিলো না। সামনের দিকে ঝুঁকে গাড়ির ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলো সে, কনোসেজ-তু লা রুই হস্লো?

 

ড্রাইভার একটু ভেবে মাথা নেড়ে সায় দিলো। সে জানালো জায়গাটা প্যারিসের বাইরে, পশ্চিম দিকে অবস্থিত টেনিসকোটের কাছেই। সোফি তাকে তক্ষুণিই সেই জায়গায় যেতে বললো।

 

দ্রুত যাওয়ার রাস্তাটা হলো বোয়ে দ্য বুলোয়াঁ দিয়ে, ড্রাইভার ফরাসিতে সোফিকে জানালো। ওদিক দিয়ে যাবো?

 

সোফি একটু চিন্তা করলো। সে চাইছে যতো কম সমস্যা হয় তেমন একটা পথ ধরে যেতে কিন্তু আজ রাতে হয়তো সেটা সম্ভব হচ্ছে না। উই। আমরা এই বেড়াতে আসা আমেরিকানটাকে একটু ঘাবড়ে দিতে পারবো।

 

সে চাবিটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো, এটা দিয়ে ২৪ রুই দ্য হ্যাক্সোতে গিয়ে কী খুঁজে পাবে। একটা চার্চ? প্রায়োরিদের হেড কোয়ার্টার জাতীয় কিছু?

 

তার আবারো মনে পড়ে গেলো, দশ বছর আগে বেসমেন্টে দেখা সেই গোপন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানটার কথা, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। রবার্ট, তোমাকে আমার অনেক কথা বলার আছে। সোফি একটু থেমে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। ট্যাক্সিটা পশ্চিম দিকে ছুটছে এখন। কিন্তু প্রথমে আমি চাই তুমি আমাকে প্রায়োরি অব সাইওন সম্পর্কে সব কিছু খুলে বলো।

 

 

 

৩৬.

 

সল দে এতাত-এর বাইরে, বেজু ফশে লুভরের ওয়ার্ডেনের কাছে সোফি আর ল্যাংডন কিভাবে তাকে নিরস্ত্র করে পালিয়ে গেছে সেটা শুনে ফুসতে লাগলো। আপনি কেন ছবিটাতে গুলি করলেন না।

 

ক্যাপ্টেন? লেফটেনান্ট কোলেত কমান্ড-পোস্ট থেকে এসে বললো। ক্যাপ্টেন, এইমাত্র আমি শুনলাম, তারা এজেন্ট সোফির গাড়িটার অবস্থান জানতে পেরেছে।

 

সে কি অ্যামবাসির দিকে যাচ্ছে?

 

না। ট্রেন স্টেশনে। দুটো টিকেট কিনেছে। ট্রেনটা এইমাত্র ছেড়েছে।

 

ফশে ওয়ার্ডেন গ্রুয়ার্দকে হাত নেড়ে চলে যেতে বলেই কোলেতকে নিয়ে একটু আড়ালে গেলো। নিচু স্বরে বললো, গন্তব্যটা কোথায়?

 

লিলে।

 

সম্ভবত একটা ফাদ। ফশে খুব আগ্রহ নিয়ে একটা পরিকল্পনা আঁটলো। ঠিক আছে, পরের স্টেশনকে সতর্ক করে দাও। দরকার হলে ট্রেনটা থামিয়ে তল্লাশী করতে বলো। সোফির গাড়িটা বাদ দিয়ে, ওখানে সাদা পোশাকের কিছু লোককে নজরদারিতে রাখো, যদি তারা ফিরে আসে সেক্ষেত্রে তাদেরকে পাকড়াও করা যাবে। স্টেশন এলাকার আশেপাশে কিছু লোক পাঠিয়ে দিও, তারা যদি পায়ে হেঁটে পালাতে চায় তো ধরা যাবে। স্টেশন থেকে কি বাস ছাড়ে?

 

এই সময়টাতে, স্যার। শুধু ট্যাক্সি ছাড়ে। ভালো।

 

ড্রাইভারদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ কোরো। দেখো, তারা তাদের দেখেছে কী। তারপর ট্যাক্সি কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করবে। আমি ইন্টারপোলে ফোন করছি।

 

কোলেতকে খুব অবাক হতে দেখা গেলো। আপনি এই ব্যাপারটা ওখানে জানাবেন?

 

ফশে সম্ভাব্য ব্ৰিত হওয়ায় অনুশোচিত হলো কিন্তু এছাড়া তার কিছু করারও নেই।

 

জালটা খুব দ্রুত গুটিয়ে ফেলল, খুব শক্ত করে করো।

 

প্রথম ঘন্টাটি হলো খুব জটিল। পালানোর পর ফেরারীরা প্রথম ঘণ্টায় খুব বেশি অনুমেয় থাকে। তাদের সবসময়ই দরকার হয় একই জিনিস। ভ্রমণ। আশ্রয়। টাকা। পবিত্র-জয়ী। ইন্টারপোল এই তিনটি উধাও হওয়া জিনিস চোখের পলকে খুঁজে বের করতে পারে। ল্যাংডন আর সোফির ছবি প্যারিসের ট্রালে অধিকর্তা, হোটেল আর ব্যাংকে প্রচার করার মধ্য দিয়ে ইন্টারপোল কোন অপশনই বাদ রাখবে না-শহর ছেড়ে যাবার কোন পথই আর থাকবে না। কোথাও পালানো যাবে না, আর কোথাও থেকে নিজের পরিচয় লুকিয়ে টাকাও তোলা যাবে না। সাধারণত ফেরারীরা রাস্তাঘাটে ভয়ে থাকে, বোকার মতো কাজ করে বসে। হয়তো একটা গাড়ি চুরি করে। কোন দোকানে ডাকাতি করে। মরিয়া হয়ে ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে। যে ভুলই তারা করুক না কেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের অবস্থান খুব দ্রুতই জানাজানি হয়ে যায়।

 

শুধু ল্যাংডন, ঠিক আছে? কোলেত জানতে চাইলো। আপনি সোফি নেভুকে নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। সে তো আমাদেরই এজেন্ট।

 

অবশ্যই। আমি তাকে নিয়ে ব্যস্ত হবো ফশে জোর দিয়ে বললো। সে যদি ল্যাংডনের সব নোংরা কাজগুলো করে ফেলে তো ল্যাংডনকে নিয়ে টানাটানি করাতে আর লাভ কী? আমি নেভু ফাইলটা দেখার কথা ভাবছিবন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, ব্যক্তিগত যোগাযোগ-এমন কেউ, যার কাছে সোফি সাহায্যের জন্য যেতে পারে। আমি জানি না সে কী করছে কিন্তু এটা শুধু তার চাকরিই খাবে না তারচেয়েও বেশি কিছু হবে!

 

আপনি কি আমাকে ফোনে রাখতে চান, না ফিল্ডে?

 

ফিল্ডে। ট্রেন স্টেশনে গিয়ে পুরো দলটার সমন্বয় করো। তুমিই সবকিছু করবে, তবে আমার সাথে কথা না বলে কোন পদক্ষেপ নেবে না।

 

জি, স্যার। কোলেত দ্রুত চলে গেলো।

 

ফশের মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। বাইরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে সে কাঁচের পিরামিডটা দেখতে পেলো। জ্বলজ্বল করছে সেটা। জানালায়ও সেই আলোর ছটা এসে পড়েছে। তারা আমার হাত ফসকে বেড়িয়ে গেছে, মনে মনে বললো সে।

 

এমনকি একজন প্রশিক্ষিত এজেন্টও ইন্টারপোলের চাপ সহ্য করতে পারবে না, সেটা পারলে সেই এজেন্টটার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপারই হবে।

 

একজন মহিলা ক্রিপ্টোলজিস্ট আর একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

 

ভোর পর্যন্তও তারা টিকতে পারবে না।

 

 

 

৩৭.

 

গভীর বনে আচ্ছাদিত উদ্যান যা বোয়ে দ্য বুলোয়াঁ হিসেবে পরিচিত। একে অনেক নামে ডাকা হলেও প্যারিসবাসি এটাকে জানে জাগতিক আনন্দের উদ্যান হিসেবেই। প্রশংসাসূচক কথাটা খুব বেশি বাড়াবাড়ি মনে হলেও সেটা একেবারেই স্ববিরোধী। একই নামে লুরিড ব-এর চিত্রকর্মটা কেউ দেখলেই বুঝতে পারবে। ছবিটা বনের মতোই খুব কালো আর দোমড়ানো-মোচরানো, বিপথগামী আর জড়বস্তুর পূজা করে যারা তাদের জন্য প্রায়শ্চিত্তমূলক। রাতের বেলায় বনের মধ্যে রাস্তাগুলোতে শতশত চক্চকে শরীর দাঁড়িয়ে থাকে ভাড়া খাটার জন্য, জাগতিক ফুর্তিকে সন্তুষ্ট করার জন্য, কারোর গহীনের অকথিত কামনা নিবৃত্তির জন্য-নারী, পুরুষ, আর এদের মাঝামাঝি যারা আছে, সবাই।

 

ল্যাংডন সোফিকে প্রায়োরি অব সাইওন সম্পর্কে বলার জন্য মনস্থির করতেই পার্কের কাঠের তৈরি প্রবেশদ্বারটা পেরিয়ে পশ্চিম দিকের নুড়ি পাথরের ক্রশফেয়ারের দিকে এগিয়ে গেলো তাদের গাড়িটা। পার্কের নিশাচর অধিবাসীরা গাড়ির হেডলাইটের আলোতে আরো বেশি করে ল্যাংডনের চোখের সামনে উদ্ভাসিত হতে লাগলো, এতে তার মনোেযোগর বিঘ্ন ঘটলো। সামনে দুজন নগ্নবক্ষের অল্পবয়স্কা মেয়ে ট্যাক্সিটার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের পাশেই এক কৃষ্ণাঙ্গ শরীরে তেল মেখে নিজের পশ্চাদদেশ প্রদর্শন করছে। তার সাথে এক অসাধারণ সোনালি চুলের মেয়ে নিজের মিনিস্কাটটা তুলে ধরে বোঝাতে চাইছে, আসলে সে মেয়ে নয়।

 

ঈশ্বর আমাকে সাহায্য করো! ল্যাংডন তার চোখটা সরিয়ে নিয়ে গাড়ির ভেতরে তাকিয়ে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিলো।

 

আমাকে প্রায়োরি অব সাইওন সম্পর্কে বলো, সোফি বললো।

 

ল্যাংডন মাথা নাড়লো, কোথেকে শুরু করবে ভেবে পেলো না। ভ্রাতৃসংঘের ইতিহাসটা হাজার বছরের…একটা বিস্ময়কর সিক্রেট, ব্ল্যাকমেইল, বিশ্বাসঘাতকতা, এমনকি একজন রাগী পোপের হাতে বর্বর নির্যাতনের ইতিহাস এটি।

 

প্রায়োরি অব সাইওন? সে বলতে শুরু করলো, ফরাসি সম্রাট গড়ফই দ্য বুইলো ১০৯৯ সালে জেরুজালেম দখল করে নেবার পর পরই জেরুজালেমে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

 

সোফি মাথা নাড়লো, তার চোখ ল্যাংডনের দিকে স্থির হয়ে আছে।

 

সম্রাট গড়ফই একটা শক্তিশালী সিক্রেটের অধিকারী ছিলেন বলে গুজব ছিলো খৃস্টের সময় থেকেই সিক্রেটটা তার পরিবারের কাছে ছিলো। তিনি মারা গেলে সিক্রেটটা চিরতরে হারিয়ে যাবে বলে তার আশংকা ছিলো, তাই তিনি একটা ভ্রাতৃসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন-প্রায়োরি অব সাইন-তিনি তাদেরকে সিক্রেটটা রক্ষা করার জন্যে বংশ পরম্পরায় এটা ধারণ করতে প্ররোচিত করেছিলেন। জেরুজালেমে সেই সময়ে প্রায়োরি অব সাইন জানতে পারলো, একগাদা দলিল-দস্তাবেজ ভগ্ন প্রায় হেরোডর মন্দিরের নিচে লুকিয়ে রাখা আছে। এই মন্দিরটা সলোমনের মন্দিরের ভগ্নাবশেষের ওপরেই নির্মাণ করা হয়েছিলো। তারা বিশ্বাস করতো এইসব দলিল গড়ইর শক্তিশালী সিক্রেটটার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং সেগুলো এতোটাই উত্তেজনা সৃষ্টিকারী যে, চার্চ যেভাবেই হোক তাদেরকে নিবৃত্ত করে ওগুলো আয়ত্তে নিতে চাইবে।

 

সোফিকে দেখে মনে হলো সে বুঝতে পারছে না।

 

প্রায়োরিরা প্রতীজ্ঞা করলো, যতো সময়ই লাগুক না কেন এইসব দলিল মন্দিরের নিচ থেকে উদ্ধার করে চিরতরের জন্য সংরক্ষণ করা হবে, যাতে সত্যটা কখনই হারিয়ে না যায়। দলিলগুলো ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করার জন্যে প্রায়োরিরা একটি সামরিক বাহিনী সৃষ্টি করলো-নয়জন নাইটের একটি দল, যাদেরকে ডাকা হতো অর্ডার অব দি পুওর নাইটস্ অব ক্রাইস্ট অ্যান্ড দ্য টেম্পল অব সলোমন নামে। ল্যাংডন একটু থামলো। সাধারণভাবে যারা পরিচিত ছিলো নাইট টেম্পলার হিসেবেই।

 

সোফি বিস্ময়ে তার দিকে তাকালো, তার চাহনিতে আছে স্বীকৃতি।

 

ল্যাংডন নাইট টেম্পলারদের সম্পর্কে প্রায়ই বক্তৃতা দিয়ে থাকে। সে এও জানে, পৃথিবীর প্রায় সবাই এদের সম্পর্কে জানে। নিদেনপক্ষে, অর্থহীনভাবে হলেও। একাডেমিকদের জন্য টেম্পলারের ইতিহাস একটা আজব জগৎ, যেখানে সত্য-মিথ্যা, নানান মতবাদ, ভুল তথ্য, এমনভাবে একটার সাথে আরেকটা মিলে আছে যে, তা থেকে খাটি সত্যটা বের করে আনা প্রায় অসম্ভব। আজকাল ল্যাংডন নাইট টেম্পলারদের ব্যাপারে বক্তৃতা দিতেও বেশ দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, কারণ সেটা নিশ্চিতভাবেই কতিপয় ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্বের বাধার সম্মুখীন হয়।

 

সোফিকে খুব হতভম্ব দেখালো। তুমি বলছো নাইট টেম্পলাররা প্রায়োরি অব সাইন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো একটা গোপন দলিল-দস্তাবেজ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে? আমি জানি টেম্পলারদের জন্ম হয়েছিলো পবিত্রভূমি সুরক্ষার জন্য।

 

একটা সার্বজনীন ভুল ধারণা। তীর্থযাত্রী দলের সুরক্ষার ধারণাটি আসলে একটা ভান, যার আড়ালে টেম্পলাররা তাদের মিশন পরিচালনা করতো। পবিত্র ভূমির জন্য তাদের সত্যিকারের লক্ষ্যটা হলো, ভগ্নপ্রায় মন্দিরের নিচ থেকে দলিল-দস্তাবেজগুলো দখলে নেওয়া।

 

তাঁরা কি সেটা খুঁজে পেয়েছিলো?

 

ল্যাংডন ভুরু তুললো। কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না কিন্তু একটা ব্যাপারে সব একাডেমিকরাই একমত, তা হলো : নাইটরা ভগ্নস্তুপের নিচ থেকে কিছু একটা খুঁজে পেয়েছিলো…যাতে তারা ধারণাতীতভাবেই সম্পদশালী এবং ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে।

 

ল্যাংডন খুব দ্রুত সোফিকে নাইট টেম্পলারদের সম্পর্কে স্ট্যান্ডার্ড একাডেমিক রূপরেখাটি ব্যাখ্যা করলো। পবিত্র ভূমির নাইটরা দ্বিতীয় ক্রুসেডের সময় কীভাবে ছিলো। তারা সম্রাট দ্বিতীয় বন্ডউইনকে বলেছিলো, খৃস্টান তীর্থযাত্রী দলগুলোকে যাত্রা পথে রক্ষা করবে তারা। যদিও বেতনহীন আর আর্থিকভাবে দরিদ্র ছিলো তারপরও নাইটরা ম্রাটকে বলেছিলো, তাদের একটা আশ্রয়ের দরকার, অনুরোধ করেছিলো ভগ্নপ্রায় মন্দিরের মধ্যেই যেনো তাদের আবাসন দেয়া হয়। স্রাট বন্ডউইন তাদের অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন, আর তখনই নাইটরা সেই জরাজীর্ণ মন্দিরে নিজেদের আস্তানা গেঁড়ে বসেছিলো।

 

আস্তানা গাঁড়ার এমন পছন্দের ব্যাপারটা ল্যাংডন ব্যাখ্যা করলো, আর যাই হোক কাকতালীয় ব্যাপার ছিলো না। নাইটরা বিশ্বাস করতে প্রায়োরিরা যেসব দলিল খুঁজছে সেগুলো ধ্বংসাবশেষের নিচে রয়েছে-হলি অব হলিস্-এর নিচে একটা পবিত্র কক্ষ, যেখানে স্বয়ং ঈশ্বর থাকেন বলে তারা বিশ্বাস করতো। আক্ষরিক অর্থে ইহুদীদের বিশ্বাসের মূলের মতোই। প্রায় একদশক ধরে নয়জন নাইট সেই ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বাস করেছিলো আর শক্ত পাথর খুঁড়ে বের করে এনেছিলো সিক্রেটটা।

 

সোফি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো। তুমি বলছে তারা কিছু একটা উদঘাটন করেছিলো?

 

অবশ্যই তারা পেয়েছিলো, ল্যাংডন বললো, ব্যাখ্যা করলো কীভাবে এই কাজটা করতে নয় বছর লেগেছিলো। অবশেষে নাইটরা যা খুঁজছিলো সেটা পেয়ে যায়। মন্দির থেকে সম্পদটা নিয়ে ইউরোপ ভ্রমণে বের হয়েছিলো তাঁরা। সেখানে তাঁদের প্রভাব রাতারাতি সুদৃঢ় হয়েছিলো।

 

নিশ্চিত করে কেউ জানে না, নাইটরা কি ভ্যাটিকানকে রাকমেইল করেছিলো নাকি চার্চ তাঁদের নিরবতা কিনে নিয়েছিলো। কিন্তু পোপ দ্বিতীয় ইনোসেন্ট খুব দ্রুতই একটা নজিরবিহীন পাপাল বুল ইসু জারি করেছিলেন, যাতে নাইট টেম্পলারদেকে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়ে তাদেরকে তারা নিজেরাই স্বয়ং আইন-একটা স্বায়ত্তশাসিত সেনাবাহিনীর মর্যাদা দিয়েছিলেন। তারা সম্রাট এবং রাজ্যের কোনো কর্তৃপক্ষেরই অধীনে নয়, সবকিছু থেকেই তারা স্বাধীন, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় দুই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও।

 

ভ্যাটিকানের কাছ থেকে নতুন এই ক্ষমতার স্বীকৃতি পাবার পর নাইট টেম্পলাররা দ্রুত রাজনৈতিক শক্তি এবং সংখ্যায় বাড়তে লাগলো। এক ডজনেরও বেশি দেশে বিশাল রাজ্য জমিয়ে ফেললো তারা। দেউলিয়া লোকদেরকে ঋণ দিয়ে বিনিময়ে সুদ চালু করলো। এভাবেই আধুনিক ব্যাংকের পত্তন করে এবং নিজেদের সম্পদ ক্রমাগতভাবে বাড়াতে থাকে তাঁরা।

 

১৩০০ সালের মধ্যে, ভ্যাটিকানের প্রদত্ত ক্ষমতার বলে, নাইটদের ক্ষমতা এতো বেড়ে গেলো যে, পোপ পঞ্চম ক্লেমেন্ত ঠিক করলেন, কিছু একটা করতেই হবে। ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ ফিলিপের সাথে যৌথভাবে মিলে পোপ একটা সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনা আঁটলেন। টেম্পলারদের সম্পদটা জব্দ করে ভ্যাটিকান যাতে সিক্রেটটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। একটা সামরিক কৌশলের মাধ্যমে, অনেকটা সিআইএর সঙ্গেই সেটা তুলনীয়, পোপ ক্লেমেন্ত একটা সিলংকিত গোপন নির্দেশ পাঠালেন, যা সমগ্র ইউরোপের সৈনিকরা একই সাথে খুলেছিলো, শুক্রবার, অক্টোবর ১৩, ১৩০৭ সালে।

 

তেরো তারিখের ভোর বেলায়, সিলংকিত নির্দেশটা ভোলা হলে বিষয় বস্তুগুলো প্রকাশিত হলো। ক্লেমেন্তের চিঠিতে দাবি করা হলো যে, ঈশ্বর তাঁকে দেখা দিয়ে বলেছেন, নাইট টেম্পলাররা জঘন্য রকমের শয়তানের পূজা অর্চনা করছে, সমকামীতা আর কুশকে অপব্যাখ্যা সহ অন্যান্য ঈশ্বর নিন্দার কাজ করছে। পোপ ক্লেমেন্তকে ঈশ্বর নির্দেশ দিয়েছেন, সব নাইটদের ধরে এনে নির্যাতন করে তাদেরকে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অপরাধের স্বীকারোক্তি আদায় করে সব কিছু শুদ্ধ করতে হবে। ক্লেমেন্তের ম্যাকিয়াভেলীয় অপারেশনটা ঠিক ঘড়ির কাটা ধরে করা হয়েছিলো। সেদিনটাতে, অগুণতি নাইটকে ধরা হয়েছিলো। প্রচণ্ড নির্যাতনের পর ধর্মবিরোধীতা করার দণ্ডে দণ্ডিত করে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো। ট্র্যাজেডিটার প্রতিধ্বনি এখনও আধুনিক সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয়ে আসছে; আজকের দিনের তেরো তারিখের শুক্রবারকে দূর্গ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

 

সোফিকে খুব হতবিহবল দেখালো। নাইট টেম্পলারদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছে? আমি ভাবতাম টেম্পলারদের ভ্রাতৃসংঘের অস্তিত্ব আজও টিকে আছে।

 

তা আছে, বিভিন্ন নামে। ক্লেমেন্তের মিথ্যা অভিযোগ এবং তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করার সর্বাত্মক চেষ্টার পরও, নাইটদের ছিলো শক্তিশালী মিত্র। তাদের অনেকেই ভ্যাটিকানের রোষাণল থেকে পালিয়ে যেতে পেরেছিলো। টেম্পলারদের মূল্যবান সম্পদটা, যা তাদের ক্ষমতার উৎসও বটে, সেটাই ছিলো ক্লেমেন্তের আসল লক্ষ্য, কিন্তু সেটা তার হাত ফসূকে বের হয়ে গিয়েছিলো। দলিল-দস্তাবেজগুলো দীর্ঘদিন ধরে টেম্পলারদের কাছে নিরাপদে ছিলো, পরে তাদেরই ছায়া দল, প্রায়োরি অব সাইন, সিক্রেটটা ভ্যাটিকানের রুদ্ররোষ থেকে বাঁচিয়ে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। প্রায়োরিরা তাদের দলিলটা প্যারিস থেকে রাতের অন্ধকারে লা রশেলের টেম্পলারদের জাহাজে করে পাচার করেছিলো।

 

দলিল-দস্তাবেজগুলো গেলো কোথায়?

 

ল্যাংডন কাঁধ ঝাঁকালো। এই রহস্যময় উত্তরটা কেবলমাত্র জানে প্রায়োরি অব সাইওন। কারণ দলিলগুলো এখনও, এমনকি আজকের দিনেও, বিরামহীন তদন্ত আর তল্লাশীর শিকার।

 

বার কয়েকই এগুলো ধরা পড়ে যাচ্ছিলো প্রায়। সাম্প্রতিককালে, অনুমান করা হয়, দলিলগুলো যুক্তরাজ্যের কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

 

সোফি একটু অস্বস্তি বোধ করলো।

 

হাজার বছর ধরে, ল্যাংডন বলে চললো, সিক্রেটটার কিংবদন্তী হস্তান্তর হয়ে আসছে। পুরো দলিলটা, এটার ক্ষমতা এবং সিক্রেটটা একটি নামেই পরিচিত স্যাংগৃল। এর ওপরে শত শত বই লেখা হয়েছে। স্যাংগৃলের মতো আর কোন রহস্যই ইতিহাসবিদদের এতো বেশি কৌতূহলী করেনি।

 

স্যাংগৃল? শব্দটা কি ফরাসি শব্দ স্যাং অথবা স্পেনিশ স্যাংগার-এর সাথে সম্পর্কিত–যার অর্থ রক্ত?

 

ল্যাংডন মাথা নেড়ে সায় দিলো। রক্ত হলো স্যাংগুলের মেরুদণ্ড, তারপরও সেটা সোফি যেমনটি কল্পনা করছে সেরকম কিছু নয়। কিংবদন্তীটা খুব জটিল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটা স্মরণে রাখা দরকার, তা হলো, সত্যটা প্রকাশ করার জন্য প্রায়োরিরা ইতিহাসের সঠিক সময়টার জন্য অপেক্ষা করছে।

 

সত্যটা কি? কী এমন সিক্রেট, যা খুবই শক্তিশালী হতে পারে?

 

ল্যাংডন খুব বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বাইরের দিকে তাকালো। সোফি, sangreal একটা প্রাচীন শব্দ। এটা সময়ে আরেকটা শব্দে রূপান্তরিত হয়ে গেছে… একটা আধুনিক নামে। সে একটু থামলো। যখন আমি তোমাকে এর আধুনিক নামটা বলবো, তখন তুমি বুঝতে পারবে, এ সম্পর্কে তুমি অনেক কিছুই জানো। সত্যি বলতে কী, পৃথিবীর প্রায় সবাই sangreal এর গল্পটা শুনেছে।

 

সোফি সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। আমি এ সম্পর্কে কখনও কিছু শুনিনি।

 

অবশ্যই শুনেছো। ল্যাংডন হাসলো। তুমি এটা হলি গ্রেইল নামে চেনো।

 

 

 

৩৮.

 

সোফি গভীর সতর্কতার সাথে ট্যাক্সির পেছনে বসা ল্যাংডনের দিকে তাকালো। সে ঠাট্টা করছে। হলি গ্রেইল?

 

ল্যাংডন মাথা নেড়ে সায় দিলো, তার ভাবভঙ্গী খুবই গুরুগম্ভীর। স্যাংগৃলের আক্ষরিক অর্থ হলো হলি গ্রেইল। শব্দটা এসেছে ফরাসি Sangraal থেকে, যা Sangreal-এ রূপান্তরিত হয়েছে, আর সেটাই প্রকারন্তরে দুটি শব্দ San Greal-এ বিভক্ত হয়ে গেছে।

 

হলি গ্রেইল। সোফি ভাষাগত সংযোগটা তৎক্ষণাৎ ধরতে না পারাতে অবাক হলো। তারপরও, ল্যাংডনের দাবি টা তার কাছে বোধগম্য বলে মনে হচ্ছে না। আমি জানতাম হলি গ্রেইল হলো একটা পেয়ালা।…আর তুমি বলছো স্যাংগৃল হলো কতোগুলো দলিল-দস্তাবেজ, যা খুব গভীর কোন সিক্রেটকে উন্মাচিত করে।

 

হ্যাঁ, স্যাংগৃল দলিল-দস্তাবেজগুলো হলি গ্রেইলের অর্ধেক গুপ্তধন। সেগুলো গ্রেইলের সাথেই সমাধিস্থ হয়ে আছে…আর এর সত্যিকারের অর্থটা প্রকাশ করে। দলিল-দস্তাবেজগুলো নাইট টেম্পলারদেরকে খুবই শক্তিশালী করে তুলেছিলো, কারণ এসব পৃষ্ঠায় গ্রেইলের সত্যিকারের ধারণাটা উন্মোচিত হয়েছে।

 

গ্রেইলের সত্যিকারের ধারণা? সোফির এখন নিজেকে আরো বেশি হতবিহ্বল মনে হলো। সোফি জানতো হলি গ্রেইল হলো একটা পেয়ালা, যা যি লাস্ট সাপারে পান করেছিলেন। যাতে পরবর্তীতে, আরিমাথিয়ার জোসেফ ক্রুশবিদ্ধের রক্ত পেয়েছিলেন। হলি গ্রেইল হলো যিশুর পেয়ালা, সে বললো, এর চেয়ে সহজ আর কী হতে পারে?

 

সোফি, ল্যাংডন নিচুস্বরে বললো, এখন তার দিকে ঝুঁকে আছে সে। প্রায়োরি অব সাইন-এর মতে, হলি গ্রেইল মোটেও কোন পেয়ালা নয়। তারা দাবি করে গ্রেইলের পেয়ালার কিংবদন্তীট আসলে একটা রূপক ধারণ করে আছে। খুব দক্ষতার সাথেই সেটা করা হয়েছে। তার মানে, গ্রেইলের কাহিনীটাতে পেয়ালার ব্যবহারটা একটা রূপক, যার অর্থ এমন, যা খুবই শক্তিশালী কিছুর চেয়েও বেশি। সে একটু থামলো। এমন কিছু, যার সাথে তোমার দাদু আজ যা বলতে চেষ্টা করেছেন, তার সবকিছুর সাথেই একেবারেই খাপ খেয়ে যায়। তাঁর সব প্রতীকধর্মী উল্লেখই পবিত্র নারীকে নির্দেশ করে।

 

তবুও অনিশ্চিত, সোফি আঁচ করতে পারলো, ল্যাংডনের ধৈর্যের হাসিটাতে তার দ্বিধাটা ধরা পড়েছে। তারপরও তার চোখে আন্তরিকতা। কিন্তু, হলি গ্রেইল যদি একটা পেয়ালা না হয়ে থাকে, সোফি জিজ্ঞেস করলো, তাহলে সেটা কি?

 

ল্যাংডন জানতো এই প্রশ্নটা করা হবে, তারপরও কীভাবে তাকে কথাটা বলবে বুঝতে পারছিলো না। সে যদি উত্তরটা এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সহকারে না উপস্থাপন করে, তবে সোফির আবারো বিস্ময় হওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না ঠিক এরকম অবাক হবার ভঙ্গী ল্যাংডন কয়েক মাস আগে তার লেখা নতুন পাণ্ডুলিপিটা হস্ত ত্তির করার সময় তার সম্পাদকের চেহারায় দেখতে পেয়েছিলো।

 

এই লেখাটায় কি দাবি করা হয়েছে? তার সম্পাদক মদের গ্লাসটা হাতে নিয়ে বিস্ময়ে বলেছিলেন। তাঁর সামনে পড়ে ছিলো আধা খাওয়া লাঞ্চ। তুমি সত্যি বলছো নাকি।

 

একদম সত্যি, একবছর ধরে গবেষণা করার মতোই সিরিয়াস।

 

নিউইয়র্কের বিখ্যাত সম্পাদক জোনাস ফকম্যান তার থুতনীর দাঁড়িটা চুলকাতে চুলকাতে বলেছিলেন। ফম্যানের কোন সন্দেহই ছিলো না যে, তার বর্নাঢ্য পেশাগত জীবনে এমন অদ্ভুত বইয়ের কথা কখনই শশানেনি। কিন্তু, এই বইটার কথা শুনে লোকটা হতভম্ব হয়ে গেলো।

 

রবার্ট, ফকম্যান অবশেষে বলেছিলেন, আমাকে উল্টাপাল্টা কিছু বোলো না। আমি তোমার কাজ পছন্দ করি, আর আমরা দুজন একসঙ্গে খুব অসাধারণ কাজ করেছি। কিন্তু আমি যদি এই ধরনের বই প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিই, তবে লোকজন আমাকে আমার অফিসের সামনেই একমাস ধরে পেটাতে থাকবে। তাছাড়া, এতে তোমার সুনামকেও একেবারে শেষ করে দেবে। তুমি হারভার্ডের একজন ইতিহাসবিদ। ঈশ্বরের দোহাই, তুমি কোন পপকমিস্টার নও যে, দ্রুত টাকা কামানোর ধান্দা করছে। এই রকম একটা তত্ত্বকে প্রমাণ করার জন্য তুমি পর্যাপ্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য আলামত কোথেকে পাবে?

 

নিরব হাসি দিয়ে ল্যাংডন তার পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে ফকম্যানকে দিয়েছিলো। কাগজটাতে পঞ্চাশেরও বেশি শিরোনামের তালিকা ছিলো খুবই সুপরিচিত ইতিহাসবিদদের বইয়ের তালিকা। কিছু সাম্প্রতিক কালের, কিছু শত বছরেরও পুরনো অনেকগুলোই একাডেমিক বেস্টসেলার। সবগুলো বইয়েরই শিরোনাম, ল্যাংডন এইমাত্র যা বলেছে, সেই বিষয়টারই ইঙ্গিত করছে। ফকম্যান তালিকাটা পড়ার পর তাকে দেখে মনে হলো, এইমাত্র তিনি আবিষ্কার করেছেন যে, পৃথিবীটা আসলে সমতল। আমি এখানে কিছু কিছু লেখকদের চিনি। তারা… সত্যিকারের ইতিহাসবিদ!

 

ল্যাংডন হাসলো। আপনি দেখতেই পাচ্ছেন, জোনাস, এটা শুধু আমার নিজের মতবাদ নয়। অনেকদিন আগে থেকেই এটা হয়ে আসছে। আমি কেবলমাত্র এটার ওপর কিছু একটা নির্মাণ করতে চাচ্ছি। এখন পর্যন্ত কোন বই-ই হলি গ্রেইলের ঐতিহাসিক কিংবদন্তীটাকে সিমোলজিমের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেনি। তত্ত্বটার পক্ষে, প্রমাণের জন্য আমি যেসব আইকনোগ্রাফিক প্রমাণ-পত্র খুঁজে বের করেছি, সেগুলো খুবই গ্রহণযোগ্য।

 

ফকম্যান তালিকাটার দিকেই তাকিয়ে রইলো। হায় ঈশ্বর, এইসব বইয়ের একটা লেখক তো দেখি স্যার লেই টিবিং—একজন বৃটিশ রয়্যাল ইতিহাসবিদ।

 

টিবিং তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময়ই ব্যয় করেছেন হলি গ্রেইল নিয়ে পড়াশোনা করে। তিনি আসলে, আমার অনুপ্রেরণার একটা বিশাল অংশ। তালিকার অন্য সবার মতোই, তিনি একজন বিশ্বাসী, জোনাস।

 

তুমি আমাকে বলছো, এইসব ইতিহাসবিদরা আসলে বিশ্বাস করেন… ফকম্যান একটা ঢোক গিললেন, প্রকারন্তরে তিনি শব্দটা বলতেই পারলেন না।

 

ল্যাংডন আবারো দাঁত বের করে হাসলো। হলি গ্রেইলটা তর্কাতীতভাবেই মানবেতিহাসের সবচাইতে বেশি গুপ্তধন সন্ধানের প্রচেষ্টা। গ্রেইলটা কিংবদন্তী ছড়িয়েছে, যুদ্ধ বাঁধিয়েছে, আর আজীবন এটা অন্বেষণ করা হয়েছে। এতে করে কী মনে হয়, এটা একটা নিছকই পেয়ালা? যদি তাই হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই অন্য পুরানিদর্শনগুলো একই রকম কিংবা আরো বেশি কৌতূহলের জন্ম দিতে রাজ মুকুট, সত্যিকারের ক্রুশবিদ্ধের কুশটা, টিটালাসটা—তারপরও সেগুলো নয়। ইতিহাস জুড়েই হলি গ্রেইল বিশেষ কিছু একটা হিসেবে ছিলো। ল্যাংডন হাসলো। এখন আপনি বুঝতে পারছেন কেন।

 

ফকম্যান বার বার মাথা ঝাঁকাতে লাগলেন। কিন্তু এই ব্যাপারটা নিয়ে এইসব বই লেখা হলেও, কেন এই মতবাদটা এতো বেশি সুপরিচিত নয়?

 

এইসব বই শত শত বছরের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের সাথে টক্কর দিতে পারেনি। বিশেষ করে এমন ইতিহাসের সাথে, যা সর্বকালের সেরা বিক্রি হওয়া বইতে রয়েছে।

 

ফকম্যানের চোখ দুটো বড় হয়ে গেলো। আমাকে বোলো না যে, হ্যারি পটার আসলে হলি গ্রেইল সম্পর্কিত।

 

আমি বাইবেলের কথা বলছিলাম।

 

ফকম্যান জিভ কাঁটলো। আমি জানতাম সেটা।

 

 

 

লেইসেজ-লো! সোফির চিৎকারটা ট্যাক্সির ভেতরের বাতাস কাঁপিয়ে দিলো। নামিয়ে রাখো!।

 

সোফি ঝুঁকে ড্রাইভারের আসনের দিকে এসে চিৎকার দিতেই ল্যাংডন চম্‌কে গেলো। সে দেখতে পারছিলো ড্রাইভার হাতে রেডিও মাউথপিসটা ধরে কথা বলছে।

 

সোফি এবার ঘুরে ল্যাংডনের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিলো। কি হচ্ছে সেটা বোঝার আগেই সে পিস্তলটা বের করে আনলো। সেটা পেছন থেকে ড্রাইভারের মাথা বরাবর তা করলো। সাথে সাথেই ড্রাইভার হাত থেকে রেডিওটা ফেলে দিয়ে অন্য হাতটা মাথার ওপর তুলে ধরলো।

 

সোফি! ল্যাংডন আর্তস্বরে বললো। কি হচ্ছে এসব–

 

আরেতেজ! সোফি ড্রাইভারকে আদেশ করলো। কাঁপতে কাঁপতে ড্রাইভার তার কথা মেনে গাড়িটা একটা জায়গায় নিয়ে থামালো।

 

তখনই ল্যাংডন রেডিও থেকে একটা কণ্ঠ শুনতে পেলো। ট্যাক্সি কোম্পানি থেকে ঘোষণা দিচ্ছে, …কুইসাপেলে এজেন্ট সোফি নেভু… রেডিওটা খট খট করে উঠলো। এত্ উঁ আমেরিকেই, রবার্ট ল্যাংডন…

 

ল্যাংডনের পেশীগুলো শক্ত হয়ে গেলো। তারা এরই মধ্যে আমাদেরকে খুঁজে বের করে ফেলেছে?

 

দিসেনদেজ, সোফি আদেশ করলো।

 

কাঁপতে থাকা ড্রাইভার দুহাত মাথার ওপর তুলে গাড়ি থেকে বের হয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো।

 

সোফি জানালার কাঁচটা নামিয়ে অস্ত্রধরা হাতটা বের করে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ড্রাইভারের দিকে তাক করলো। রবার্ট, সে খুব শান্তভাবে বললো, স্টিয়ারিংয়ে গিয়ে বসো। তুমি গাড়ি চালাবে।

 

অস্ত্রহাতে ধরা কোন মেয়ের সাথে ল্যাংডন তর্ক করার সাহস করলো না। সে গাড়ি থেকে নেমে সামনে গিয়ে বসলো। ড্রাইভার লোকটা আকুতি মিনতি করতে লাগলো, তার হাত দুটো মাথার ওপরেই তোলা।

 

রবার্ট, পেছনের সিট থেকে সোফি বললো, আমার বিশ্বাস তুমি আমাদের জাদুর বনটা যথেষ্ট দেখেছো?

 

সে মাথা নেড়ে সায় দিলো। যথেষ্টই।

 

ভালো। এখান থেকে বের হও আগে।

 

ল্যাংডন গাড়িটার সামনের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করলো। ধ্যাৎ। সে স্টিয়ারিংটা ধরলো। সোফি? যদি তুমি–

 

চালাও! সোফি চিৎকার করে বললো।

 

বাইরে, কিছু সংখ্যক পতিতা কী হচ্ছে সেটা দেখার জন্য উঁকি মারলো। একটা মেয়ে তার সেলফোনে ফোন করতে লাগলো। ল্যাংডন গিয়ারের স্টিকটা ধরেই প্রথমে তার যা মনে হলো, সেটা হলো ফার্স্ট গিয়ার।

 

ল্যাংডন ক্লাচটা চেপে ধরলো। ট্যাক্সিটা সামনে এগোতেই চাকার খ্যাচ্‌ খ্যাচ্‌ শব্দ শোনা গেলো। সামনে জড়ো হওয়া মানুষজন আত্মরক্ষার্থে এদিক-ওদিক ছুটতে লাগলে ফোন হাতে ধরা মেয়েটা লাফিয়ে বনের ভেতরে চলে গেলো, অল্পের জন্য সে গাড়ি চাপার হাত থেকে বেঁচে গেছে।

 

দুসমেঁ! গাড়িটা রাস্তায় আসতেই সোফি বললো, তুমি করছোটা কি?

 

আমি তোমাকে সতর্ক করার চেষ্টা করছি, গিয়ারের শব্দকে ছাপিয়ে সে চিৎকার করে বললো। আমি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালাচ্ছি।

 

 

 

৩৯.

 

যদিও রুই লা ব্রুয়েরের, ধূসর পাথরের অনাড়ম্বরপূর্ণ ঘরটা অনেক যন্ত্রণার সাক্ষী, কিন্তু সাইলাসের সন্দেহ, এখন তার শরীরে যে শারীরিক যন্ত্রণাটা আঁকড়ে ধরেছে সেটার সাথে আর কোন কিছুরই তুলনা হয় না। আমি প্রতারিত হয়েছি। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।

 

সাইলাসের সাথে চালাকি করা হয়েছে। ভায়েরা তাকে মিথ্যে বলেছে। তাঁরা সত্যিকারের সিক্রেটটা প্রকাশ করার বদলে মৃত্যুকেই বেছে নিয়েছে। টিচারকে ফোন করার মতো শক্তি সাইলাসের ছিলো না। সে শুধুমাত্র চারজন লোককেই খুন করেনি, যারা জানতো কি-স্টোনটা কোথায় লুকিয়ে রাখা আছে, উপরন্তু, সেন্ট-সালপিচের অভ্যন্তরে একজন নানাকেও খুন করেছে। নানটা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে কাজ করতো! সে ওপাস দাইর কাজ-কর্মগুলোও নিন্দা করতে!

 

হঠাৎ করেই একটা অপরাধবোধ, মহিলার মৃত্যু ব্যাপারটাকে খুব বেশি জটিল করে ফেলেছে। বিশপ আরিঙ্গারোসার ফোন কলটার জন্যই সাইলাস সেন্ট-সালপিচের ভেতরে ঢুকতে পেরেছিলো; তিনি যখন আবিস্কার করবেন, নান মারা গেছে, তখন কি ভাববেন? যদিও সাইলাস মৃতদেহটা তার বিছানায় রেখে এসেছে, কিন্তু নানের আঘাতটা সহজেই চোখে পড়ে যাবে। সাইলাস জমিনের ভাঙা টাইল্সগুলো ঠিক করে রেখে দেবার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু ওগুলো এতো বেশি ভেঙে গিয়েছে যে, সবাই জেনে যাবে, এখানে কেউ এসেছিলো।

 

সাইলাস পরিকল্পনা করেছিলো এখানকার কাজটা শেষ করে ওপাস দাইর ভেতরে লুকিয়ে পড়বে। বিশপ আরিঙ্গাবোসা আমাকে রক্ষা করবেন। সাইলাস কল্পনা করলো, ওপাস দাইর হেড কোয়াটারের অভ্যন্তরে প্রার্থনা করা আর ধ্যান করার চেয়ে বড় কোন আশীবাদের অস্তিত্ব এ জীবনে নেই। সে আর কখনই বাইরে পা রাখবে না। তার সব প্রয়োজনই ঐ উপাসনালয়ের ভেতরেই মেটাবে। কেউ আমার অভাবও অনুভব করবে না। দূভার্গ্যজনকভাবে, সাইলাস জানতো, বিশপ আরিঙ্গারোসার মতো খ্যাতিমান ব্যক্তি খুব সহজে উধাও হতে পারবে না।

 

আমি বিশপকে বিপদে ফেলে দিয়েছি। সাইলাস জমিনের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজের কথা ভাবলো। হাজারহোক, আরিঙ্গারোসাই তাকে নতুন জীবন দান করেছিলেন…স্পেনের সেই ছোট্ট মঠে, তাকে শিক্ষাদীক্ষা দিয়েছেন, তার জীবনের উদ্দেশ্য ঠিক করে দিয়েছেন।

 

আমার বন্ধু, আরিঙ্গাবোসা তাকে বলেছিলেন, তুমি ধবল হয়ে জন্মেছে। এজন্যে অন্যের কাছে তুমি লজ্জিত হয়ো না। তুমি কি বুঝতে পারছে না, এজন্যে তুমি কতোটা আলাদা হয়ে উঠেছো? তুমি কি জানো না, নুহ নিজেও একজন ধ্বল ছিলেন?

 

নৌকার নূহ? সাইলাস একথাটা কখনও শোনেনি।

 

আরিঙ্গারোসা হেসেছিলেন। অবশ্যই, নৌকার নৃহ। তিনি একজন ধবল ছিলেন। তোমারই মতো। তার ছিলো ফেরেস্তাদের মতো সাদা চামড়া। এটা মনে রেখো। নূহু এই পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকূলকে রক্ষা করেছিলেন। তোমারও জন্ম হয়েছে মহৎ কিছু করার জন্য, সাইলাস। ঈশ্বর তোমাকে একটা কারণেই মুক্ত করেছেন। তোমার ডাক তুমি পেয়েছে। ঈশ্বর তোমার সাহায্য চাইছে তার কাজের জন্য।

 

সময়ে, সাইলাস নিজেকে নতুন আলোয় চিনতে শিখলো। আমি বিশুদ্ধ। সাদা। সুন্দর। ফেরেস্তাদের মতোন।

 

ঠিক এই সময়েই, যদিও সে তার নিজের ঘরে, তার বাবার হতাশ কণ্ঠস্বরটা শুনতে পেলো। অতীত থেকে তার কাছে ফিসফিস করে বলছে।

 

তু ইস্ উঁ দেসাস্ত্রে। উঁ স্পেকত্রে।

 

কাঠের ফ্লোরে হাটু গেঁড়ে বসে সাইলাস ক্ষমা প্রার্থনা করলো। তারপর, দড়িটা খুলে ফেলে আবার তার প্রায়শ্চিত্তে ফিরে গেলো।

 

 

 

৪০.

 

গিয়ারের শিফটটা নিয়ে বেসামাল ল্যাংডন খুব কষ্টে হাইজ্যাক করা গাড়িটা কোনমতে বোয়ে দ্য বুলোঁয়া থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারলো। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, এই ঘটনার কৌতুককর দিকটা, রেডিওতে ট্যাক্সি কোম্পানির বার বার ঘোষণার মধ্যে হারিয়ে গেলো।

 

ভয়তুর সিঙ্গ-সিক্স-ত্রয়। ওউ ইতে-ভু? রিপোনদেজ!

 

ল্যাংডন যখন পার্ক থেকে বের হবার পথটার কাছে এসে পৌঁছালো, তখন সে সজোড়ে ব্রেক কষলো। তুমিই চালাও।

 

সোফি স্টিয়ারিংয়ে গিয়ে বসতেই ল্যাংডন হাপ ছেড়ে বাঁচলো বলে মনে হলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই, সোফি গাড়িটাকে খুব সুন্দর করে চালিয়ে নিয়ে জাগতিক আনন্দের উদ্যানটা পেছনে ফেলে, পশ্চিম দিকের আলি দ্য লং শাম্প-এর দিকে নিয়ে গেলো।

 

রুই হাক্সোটা কোন্ দিকে? ল্যাংডন জিজ্ঞেস করলো। স্পিড মিটারের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো ঘন্টায় একশো কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়িটা চলছে।

 

সোফির চোখ রাস্তার দিকেই নিবিষ্ট। ড্রাইভার বলেছিলো জায়গাটা রোল্যা গারো টেনিস স্টেডিয়ামের কাছেই। আমি সেই জায়গাটা চিনি।

 

ল্যাংডন আবারো তার পকেট থেকে ভারি চাবিটা বের করে হাতের তালুতে রেখে সেটার ওজন অনুভব করলো। তার মনে হলো, এটা একটা বিশাল পরিণতির জিনিস। তার নিজের স্বাধীনতার চাবির মতোই অনেকটা।

 

একটু আগে, যখন সোফিকে নাইট টেম্পলারদের ব্যাপারে বলছিলো, তখন ল্যাংডন বুঝতে পারছিলো যে, এই চাবিটা, প্রায়োরিদের সিলংকিত। প্রায়োরি অব সাইওনের সাথে খুব সূক্ষ্ম একটা সংযোগ ধারণ করে আছে। সমবাহুর ক্রুশ ভারসাম্য আর সম্প্রীতির প্রতীক, কিন্তু সেটা নাইট টেম্পলারদেকেও বোঝায়। সবাই নাইট টেম্পলারদের চিত্রকর্মগুলো দেখেছে, সাদা পোশাক পরা আর তার মাঝে লাল রঙের সমবাহুর ক্রুশ আঁকা। তবে এটা ঠিক, টেম্পলারদের ক্রশের বাহুর শেষ মাথাগুলো কিছুটা চওড়া, কিন্তু সেগুলোও সমান দৈর্ঘের।

 

একটা সুষম বাহুর ক্রশ। ঠিক এই চাবিটাতে যেমন আছে।

 

এটা দিয়ে তারা কী খুঁজে পাবে ভাবতেই, ল্যাংডনের কল্পনা পাগলাঘোড়ার মতো ছুটতে লাগলো। হলি গ্রেইল। কথাটার অর্থহীনতা ভেবে সে প্রায় জোরে হেসে উঠতে যাচ্ছিলো। বিশ্বাস করা হয়, গ্রেইলটা ইংল্যান্ডের কোথাও আছে, কোন এক টেম্পলার চার্চের ভূগর্ভস্থ গোপন কক্ষে সেটা লুকিয়ে রাখা হয়েছে, কমপক্ষে ১৫০০ সাল থেকে।

 

গ্র্যান্ডমাস্টার দা ভিঞ্চির সময়কাল থেকে।

 

প্রায়োরিরা, তাদের শক্তিশালী দলিল-দস্তাবেজগুলো নিরাপদে রাখার জন্যে শত শত বছর ধরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরাতে বাধ্য হয়েছিলো। ঐতিহাসিকরা এখন আশংকা করছে, গ্রেইলটা জেরুজালেম থেকে ইউরোপে নিয়ে আসার পর থেকে কম করে হলেও, ছয় জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। গ্রেইলটা শেষবার দেখা গিয়েছিলো ১৪৪৭ সালে, যখন অসংখ্য চাক্ষুষ স্বাক্ষীদাতা বর্ণনা করেছে, দলিল দস্তাবেজগুলো আগুনে প্রায় পুড়ে যাবার আগেই, সেগুলো নিরাপদে চারটা সিন্দুকে করে সরিয়ে নেবার জন্য ছয় জন লোক লেগেছিলো। এরপর থেকে, কেউই আর গ্রেইলটা কখনও দেখেনি। যা কিছু শোনা গেছে, তাহলো, মাঝে মাধ্যে একটা ফিস্ ফাস্। গ্রেইলটা নাকি লুকিয়ে রাখা আছে গ্রেট বৃটেনে, নাইট আর্থার আর রাউন্ড টেবিলের নাইটদের দেশে।

 

যেখানেই থাকুক না, দুটো গুরুত্বপূর্ণ সত্য রয়ে গেছে :

 

লিওনার্দো তাঁর জীবনকালে জানতেন গ্রেইলটা কোথায় রাখা আছে।

 

লুকিয়ে রাখার জায়গাটা বোধহয় আজকের দিন পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়নি।

 

এই কারণেই, গ্রেইল নিয়ে উৎসাহটা এখনও দা ভিঞ্চির ছবিতে আর ডায়রিতে গ্রেইলের বর্তমান অবস্থানটার সম্পর্কে কোন কু লুকিয়ে আছে বলে আশা করা হয়। কেউ কেউ দাবি করে থাকে, ম্যাড়োনা অব দি রকস-এর পেছনের পর্বতের দৃশ্যটা স্কটল্যান্ডের সারি সারি গুহা-পর্বতের সাথে একেবারে মিলে যায়। অন্যেরা দাবি করে, দ্য লাস্ট সাপার-এর শিষ্যদের সন্দেহজনক অবস্থানটা আসলে এক ধরনের কোড। এখনও অনেকে দাবি করে যে, মোনালিসার এক্সরেতে এটা উন্মোচিত হয়েছে যে, তাকে আসলে আইসিস এর ল্যাপিস লাজুইলি পরা অবস্থায় আঁকা হয়েছিলোদা ভিঞ্চি পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এটার ওপরে আরো নিখুঁতভাবে কিছু আঁকার। ল্যাংডন কখনও এমন কোন প্রমাণ দেখেনি, বা কল্পনা করতে পারেনি, হলি গ্রেইলকে উন্মোচিত করে। তারপরও গ্রেইল সম্পর্কিত খবরাখবর ইন্টারনেটের বুলেটিন আর চ্যাট রুমে আলোচিত হয়। সবাই চক্রান্ত–ষড়যন্ত্র পছন্দ করে।

 

আর চক্রান্তগুলো এখনও হচ্ছে। খুবই সাম্প্রতিককালে, পৃথিবী কাঁপানো একটা আবিস্কার হয়েছে যে, দা ভিঞ্চির বিখ্যাত এডোরেশন অব দি মাজাইর পরতে পরতে একটা সিক্রেট লুকিয়ে রাখা আছে। ইতালিয় চিত্রকলা ডায়াগনোস্টিশিয়ান মরিজিও সেরাসিনি সত্যটা উন্মোচন করেছেন, যা নিউইয়র্ক টাইম ম্যাগাজিন খুবই গুরুত্বের সাথে লিওনার্দোর ছদ্মবেশ শিরোনামে ছেপেছে।

 

সেরাসিনি কোন সন্দেহের উদ্রেক না করেই উদঘাটন করেছেন যে, এডোরেশন এর ধূসর সবুজ স্কেচটার নিচের ড্রইংটা নিশ্চিতভাবেই দা ভিঞ্চির কাজ, কিন্তু উপরের মূল ছবিটা নয়। সত্য হলো, কোন অজানা শিল্পী দা ভিঞ্চির মৃত্যুর অনেক বছর পর, কয়েকবারই এর ওপর পেইন্ট করেছে। আরো বেশি ভয়ংকর ব্যাপার হলো, উপরে আঁকা ছবিটার নিচে যা আছে, সেটা ইনফারেন্স রিফ্লেক্টোগ্রাফি ছবি আর এক্স-রে বলছে, দৃবৃত্ত শিল্পী দা ভিঞ্চির স্কেচটার বিকৃত সাধন করেছে…যাতে দা ভিঞ্চির আসল উদ্দেশ্যটা উল্টিয়ে দেয়া হয়েছে। নিচের ড্রইংটার সত্যিকারের স্বরূপটা এখন পর্যন্ত জনসাধারনের কাছে প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি ফ্লোরেন্সের উফিজি গ্যালারির বিব্রত কর্মকর্তারা সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা রাস্তার অপরপাশে একটা ওয়্যারহাউসে স্থানান্তর করে ফেলে। গ্যালারির যে জায়গাটাতে এক সময় এডোরেশন-টা ঝোলানো ছিলো, সেখানে দর্শনার্থীরা গিয়ে একটা বিভ্রান্তিকর এবং ক্ষমাপ্রার্থনাসূচক কার্ড দেখতে পাবে এখন।

 

এই শিল্পকর্মটি মেরামতের জন্য

ডায়াগনোস্টিক টেস্ট-এর কাজ চলছে।

 

আধুনিক গ্রেইল অম্বেষণকারীদের উদ্ভট আন্ডারওয়ার্ল্ডে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বিশাল একটি উন্মাদনা হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছেন। তাঁর শিল্পকর্ম একটা সিক্রেট-এর কথা বলছে যেনো, তার পরও, সেটা একেবারে লুকায়িত আছে। সম্ভবত ছবিটার নিচের পরতে, হয়তোবা সাদামাটা দর্শনের মধ্যে কোন গুপ্তলিখনের ভেতরে, অথবা একেবারেই কোথাও না। হতে পারে দা ভিঞ্চির হতবুদ্ধিকর কু-গুলো কিছুই না, কেবলই অসাড় প্রতীজ্ঞা, যার পেছনে রয়েছে অতি আগ্রহীদেরকে বিভ্রান্ত করা, তাঁর মোনালিসার বোকার মতো ভান করা হাসির মতোই।

 

এটা কি সম্ভব, পেছনে বসে থাকা ল্যাংডনের দিকে ফিরে সোফি জিজ্ঞেস করলো, তুমি যে চাবিটা ধরে রেখেছে, সেটা দিয়ে হলি গ্রেইলের লুকিয়ে রাখা জায়গাটা খোলা যাবে?

 

ল্যাংডনের হাসি পেলো। আমি আসলেই ভাবতে পারছি না। তাছাড়া, গ্রেইলটা যুক্তরাজ্যের কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়, ফ্রান্সে নয়। সে তাকে ইতিহাসটা দ্রুত বলে দিলো।

 

কিন্তু, গ্রেইলটা-ই মনে হচ্ছে, একমাত্র যৌক্তিক উপসংহার, সে জোর দিয়ে বললো। আমাদের কাছে একটা অসম্ভব নিরাপদ চাবি আছে, প্রায়োরি অব সাইন এর সিলংকিত, আর সেটা দিয়েছেন প্রায়োরিদেরই একজন সদস্য—একটা ভ্রাতৃসংঘ, যা একটু আগে তুমি আমাকে বলেছো, হলি গ্রেইলের অভিভাবক।

 

ল্যাংডন জানতো, সোফির কথায় যুক্তি আছে, তারপরও সেটাকে মনে প্রাণে সে মেনে নিতে পারছে না। গুজব আছে যে, প্রায়োরিরা প্রতীজ্ঞা করেছিলো, একদিন গ্রেইলটাকে ফ্রান্সে ফিরিয়ে আনবে এবং অন্তিম শয়নে রাখবে, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই কোন ঐতিহাসিক প্রমাণাদি নেই, যাতে মনে হতে পারে এটা বাস্তবিকই ঘটেছে। তারপরও, যদি প্রায়োরিরা গ্রেইলটা ফ্রান্সে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়ে থাকে, ২৪, রুই হাক্সো, টেনিস স্টেডিয়ামের নিকটের জায়গাটা কোনমতেই চুড়ান্ত অন্তিম শয়ানের স্থান বলে মনে হয় না। সোফি, আমি এই চাবিটার সাথে গ্রেইলের কোন সম্পর্কই দেখতে পাচ্ছি না।

 

কারণ গ্রেইলটা ইংল্যান্ডে থাকার কথা?

 

শুধু তাই নয়। হলি গ্রেইলের অবস্থানটা ইতিহাসের সব চাইতে সিক্রেট একটি ব্যাপার। প্রায়োরির সদস্যরা কয়েক দশক অপেক্ষা করে নিজেদেরকে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে প্রতিপন্ন করে থাকে। তারপর, তারা জানতে পারে গ্রেইলটা কোথায় আছে। সিক্রেটটা খুবই জটিল একটি জ্ঞান। আর যদিও প্রায়োরিদের ভাইয়েরা সংখ্যায় অনেক বেশি, তারপরও, একই সময়ে, কেবলমাত্র চার জন সদস্য জানে গ্রেইলটা কোথায় লুকিয়ে রাখা আছে—এ্যান্ড মাস্টার আর তাঁর তিন জন সেনেক্য। তোমার দাদুর বেলায় এরকম চারজনের একজন হওয়াটা, সম্ভবত খুবই ক্ষীণ।

 

আমার দাদু তাদেরই একজন, সোফি ভাবলো। এক্সলেটরটা চাপ দিলো। তার স্মৃতিতে একটা ছবি আছে যা খুব নিশ্চিত করেই বলে দেয়, তার দাদুর অবস্থান ছিলো নিঃসন্দেহে ভ্রাতৃসংঘের ভেতরেই।

 

আর তোমার দাদু যদি সে রকম কিছু হয়েও থাকেন, তবে কখনও ভ্রাতৃসংঘের বাইরের কারো কাছে সেটা প্রকাশ করার কথা নয়। তিনি তোমাকে তাদের একেবারে ভেতরের সার্কেলে নিয়ে আসবেন, সেটা বিশ্বাসযোগ্যও নয়।

 

আমি ইতিমধ্যেই সেখানে ঢুকে গিয়েছিলাম, সোফি ভাবলো। বেসমেন্টের আচার অনুষ্ঠানটার ছবি ভেসে উঠলো তার মনের পর্দায়। সে ভাবলো, এই মুহূর্তে ল্যাংডনের কাছে নরম্যান্ডির শ্যাতুতে দেখা সেই রাতের ঘটনাটার কথা বলবে কি না। এখন থেকে দশ বছর আগে, কাউকে কথাটা বলতে তার ভীষণ লজ্জা করতো। কথাটা মনে করলেই সে দারুণভাবে লজ্জিত আর ব্রিত হতো। দূরে কোথাও সাইরেন বাজছে, তার মনে হলো, তার ভেতরে হালকা একটা অবসাদ এসে ভর করেছে।

 

এইতো! ল্যাংডন বললো, সামনের বিশাল বোলা গারো টেনিস স্টেডিয়ামটা দেখে সে দারুণ উত্তেজনা অনুভব করলো।

 

সোফি স্টেডিয়ামটার দিকে এগোলো। একটু যেতেই তারা রুই হাক্সোর মোড়টা খুঁজে পেলো। জায়গাটা খুব বেশি শিল্পাঞ্চলের মতো মনে হলো। সারি সারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

 

আমাদের দরকার চব্বিশ নাম্বার, ল্যাংডন আপন মনে বললো, বুঝতে পারলো, সে গোপন একটা চার্চের চূড়া দেখার আশা করছে। হাস্যকর হয়ো না। এই রকম জায়গায় একটা বিস্মৃত টেম্পলার চার্চ?

 

এইতো সেটা, সোফি বিস্ময়ে চিক্কার করে উঠলো। আঙুল দিয়ে দেখালো জায়গাটা।

 

ল্যাংডনের চোখ সামনের স্থাপত্যটার দিকে গেলো। এটা আবার কি?

 

ভবনটা খুব আধুনিক। চারকোনা একটা ভবন, তাতে একটা বিশাল সমানবাহুর ক্রশ উপরের দিকে অংকিত। ক্ৰশটার নিচে লেখা :

 

জুরিখের ডিপোজিটরি ব্যাংক

 

ল্যাংডন ভাবলো তার টেম্পলার চার্চের প্রত্যাশার কথাটা সোফিকে বলবে না। ল্যাংডন প্রায় ভুলেই গেলো যে, এই শান্তিপূর্ণ, সমবাহুর ক্রশটা নিরপেক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ড তাদের ফ্ল্যাগে স্থান করে নিয়েছে। নিদেনপক্ষে, রহস্যটার একটা সমাধান তো হলো।

 

সোফি আর ল্যাংডন সুইস ব্যাংকের একটা ডিপপাজিট বক্সের চাবি হাতে ধরে রেখেছে।

 

 

 

 

 

 

০৫. কাস্তেল গাভোলফোর

৪১.

 

কাস্তেল গাভোলফোর বাইরে, বিশপ আরিঙ্গাবোসা তাঁর ফিয়াট গাড়িটা থেকে নামতেই, একটা পাহাড়ি বাতাসের ঝাঁপটা চুড়া থেকে নেমে এসে তাঁর শরীরে শীতল পরশ বুলিয়ে দিলো। এই আলখেল্লাটার চেয়েও বেশি কিছু আমার পরে আসা উচিত ছিলো, তিনি ভাবলেন। ঠাণ্ডা বাতাসটার সাথে লড়াই করতে হলো তাকে। আজ রাতে তার যা দরকার সেটা হলো, হয় তাকে দুর্বল, নয়তো ভীতিকর হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে।

 

প্রাসাদটা অন্ধকারে ডুবে আছে, ওপরের তলার একটা জানালা দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে, অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে সেটা। লাইব্রেরি, আরিঙ্গারোসা মনে মনে বললেন। তারা জেগে জেগে অপেক্ষা করছে। মাথাটা উঁচু করে আশেপাশে খুব ভালো মতো না তাকিয়ে তিন সোজা এগিয়ে গেলেন।

 

তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা যাজককে দেখে তাঁর ঘুমঘুম মনে হলো। পাঁচ মাস আগেও এই একই যাজক তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলো। অবশ্য আজকে তাকে দেখে একটু কম অতিথিপরায়ন বলেই মনে হচ্ছে। আমরা আপনার জন্য খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম, বিশপ, নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে যাজক বললো, তার চেহারায় উদ্বিগ্নতার চেয়েও বেশি বিরক্তি মনে হলো।

 

ক্ষমা করবেন আমাকে। আজকাল বিমানগুলো খুবই অবিশ্বস্ত হয়ে গেছে।

 

যাজক লোকটা বিড়বিড় করে কী যেনো বললো, বোঝা গেলো না, তারপর বললো, তারা উপরের তলায় আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি আপনাকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি।

 

লাইব্রেরিটা বিশাল একটা চৌকোনা ঘর। ছাদ থেকে জমিন পর্যন্ত কালো কাঠে তৈরি। চারদিকে লম্বা লম্বা বুক-সেলফে মোটা-মোটা বইয়ে পূর্ণ। জমিনটা এম্বার মার্বেলের, খুব সহজেই মনে করিয়ে দেয়, ভবনটা এক সময় প্রাসাদ ছিলো।

 

স্বাগতম, বিশপ, ঘরের একপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ বললো।

 

আরিঙ্গাবোসা দেখার চেষ্টা করলেন কে কথাটা বলছে। কিন্তু ঘরের ভেতরের আলোটা হাস্যকর রকমেরই স্বল্পতার প্রথম আগমনের সময় থেকেও বেশি স্বল্প। তখন সবকিছুই জ্বলজ্বল করছিলো। রাতটা পুরোদস্তর জেগে উঠেছে। আজ রাতে, সেই সব লোকগুলো অন্ধকারে বসে আছে, যেনো তারা কী করতে যাচ্ছে তার জন্যে খুব লজ্জিত।

 

আরিঙ্গাবোসা খুব ধীরে ধীরে প্রবেশ করলেন। তিনি কেবল ঘরের ভেতরে, একটু দূরে, টেবিলে বসে থাকা মানুষগুলোর ছায়া দেখতে পেলেন। মাঝখানে বসে থাকা অবয়বটা দেখে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি চিনতে পারলেন অবিস্ সেক্রেটারিয়েট ভ্যাটিকানা, ভ্যাটিকান সিটির অভ্যন্তরে সমস্ত আইনী ব্যাপারগুলো দেখেন তিনি। উচ্চ পদস্থ একজন ইতালিয় কার্ডিনাল।

 

আরিগারোসা তাদের সামনে এগিয়ে গিয়ে বললেন, এই দেরির জন্য আন্তরিক ক্ষমা নেবেন। আমরা ভিন্ন টাইম-জোনে ছিলাম। আপনি খুব ক্লান্ত হয়ে থাকবেন।

 

মোটেই না, সেক্রেটারি বললেন, তার হাত দুটো বিশাল বপুর ওপরে ভাঁজ করে রাখা। আপনি এতোদূর আসাতে, আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা কি আপনাকে এক কাপ কফি দিতে বলবো, ক্লান্তি দূর করার জন্য?

 

আমার মনে হয়, আমাদের ভনিতা করা ঠিক হবে না যে, এটা একটা সোশ্যাল ভিজিট। আমাকে আরেকটা প্লেন ধরতে হবে। আমরা কি কাজের কথা শুরু করতে পারি?

 

অবশ্যই, সেক্রেটারি বললেন। আমাদের ধারণার চেয়েও দ্রুত আপনি সাড়া দিয়েছেন।

 

তাই?

 

আপনার হাতে এক মাস সময় ছিলো।

 

আপনারা আপনাদের ব্যাপারটা আমাকে পাঁচমাস আগে জানিয়েছিলেন, আরিগারোসা বললেন। আমি অপেক্ষা করবো কেন?

 

তাতো ঠিকই। আমরা আপনার আনুগত্যে খুব খুশি।

 

আরিঙ্গারোসার চোখ লম্বা টেবিলটার উপরে রাখা কালো বৃফকেসটার দিকে গেলো। এটার জন্যেই কি আমাকে অনুরোধ করা হয়েছে?

 

এটার জন্যেই। সেক্রেটারির কণ্ঠে অস্বস্তিকর একটা ভাব দেখা গেলো। অবশ্য, আমি স্বীকার করছি, অনুরোধটা নিয়েই আমাদের চিন্তা হচ্ছিলো। এটা মনে হয়েছিলো …

 

বিপজ্জনক, অন্য একজন কার্ডিনাল কথাটা শেষ করলেন।

 

আপনি কি নিশ্চিত, আমরা এটা আপনার কাছে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে অন্য কোথাও পাঠাতে পারবো না? অংকটা কিন্তু অনেক বড়।

 

মুক্তি অনেক ব্যয়বহুল। আমি আমার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত নই। ঈশ্বর আমার সঙ্গে আছেন।

 

মানুষগুলোকে একটু সন্দেহগ্রস্ত দেখালো।

 

তহবিলটা কি আমার অনুরোধের মতোই ঠিক আছে!

 

সেক্রেটারি সায় দিলেন। বিশাল অংকের বন্ড, ভ্যাটিকান ব্যাংক থেকে তোলা। পৃথিবীর যেকোন জায়গাই এটা টাকার মতোই ব্যবহার করা যাবে।

 

আরিঙ্গারোসা টেবিলটার শেষ মাথায় হেটে গিয়ে বৃফকেসটা খুললেন। ভেতরে দুটো বান্ডিলের বন্ড, প্রতিটাতে ভ্যাটিকানের সিলাঙ্কিত আর লেখা আছে PORTATORE

 

সেক্রেটারিকে খুব উদ্বিগ্ন দেখালো। আমাকে বলতেই হচ্ছে বিশপ, আমাদের সবাই খুব কম আশংকা করতাম, যদি এই তহবিলটা নগদে হোততা।

 

সেই পরিমাণ টাকা আমি বহন করতে পারতাম না, আরিঙ্গারোসা ভাবলেন, বৃফকেসটা বন্ধ করে রাখলেন। বন্ডগুলো নগদ টাকার মতোই ব্যবহার করা যায়। আপনি নিজেই বলেছেন সেই কথা।

 

কার্ডিনালরা একটা অস্বস্তির দৃষ্টি বিনিময় করলেন, শেষে একজন বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু এই বন্ডগুলো ভ্যাটিকান ব্যাংক খুব সহজেই ট্রে করতে পারবে।

 

আরিজারোসা মনে মনে হাসলেন। ঠিক এই কারণেই টিচার আরিঙ্গারোসাকে টাকাগুলো ভ্যাটিকান ব্যাংকের বন্ডের মাধ্যমে নিতে বলেছিলেন। এটা একটা ইনসুরেন্সের মতো কাজ করবে। আমরা সবাই এই ব্যাপারে এক সঙ্গে আছি। এটাতো খুবই বৈধ একটি হস্তান্তর, আরিঙ্গাবোসা আত্মপক্ষ সমর্থন করলেন। ওপাস দাই হলো ভ্যাটিকান সিটিরই নিজস্ব অঙ্গসংগঠন, আর পোপের কাছে এটা ঠিকই মনে হবে, টাকাটা যেভাবেই থাকুক না কেন। এখানে তো কোন আইন ভঙ্গ করা হচ্ছে না।

 

সত্য, তারপরেও… সেক্রেটারি একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন, তাতে চেয়ারটা থেকে মটমট করে একটা আওয়াজ হলো। আপনি এই তহবিলটা দিয়ে কী করবেন সে সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানা নেই। আর যদি এটা কোনভাবে অবৈধ কিছু …

 

আপনারা আমাকে কী জিজ্ঞেস করছেন সেটা বিবেচনা করুন, আরিঙ্গাবোসা পাল্টা জবাব দিলেন, এই টাকা দিয়ে আমি কি করবো, সেটা আপনাদের ব্যাপার নয়।

 

লম্বা একটা নিরবতা নেমে এলো।

 

তাঁরা জানে আমি সঠিক, আরিঙ্গাবোসা ভাবলেন। এখন আমি মনে করতে পারি, আপনারা সই করে দেবেন?

 

তারা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে কাগজটা তার দিকে ঠেলে দিলো যেনো তারা চাইছে আরিজারোসা এখান থেকে দ্রুত চলে যাক।

 

আরিঙ্গারোসা তাঁর সামনে রাখা কাগজটার দিকে তাকালো। এটাতে পাপাল-এর সিল মারা আছে। আপনারা আমার কাছে যে কপিটা পাঠিয়েছেন, এটার সাথে তার মিল আছে?

 

পুরোপুরি।

 

দলিলটা সই করার সময় সে কতো কম আবেগতাড়িত হলো সেটা ভেবে আরিঙ্গাবোসা খুবই অবাক হলেন। উপস্থিত তিন জন, মনে হলো একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

 

ধন্যবাদ, বিশপ, আপনাকে, সেক্রেটারি বললেন। চার্চের জন্য আপনার কাজের কথাটা কখনই বিস্মৃত হবে না।

 

আরিজারোসা বৃফকেসটা তুলে নিতেই এর ওজনের মধ্যে কর্তৃত্ব আর প্রতীজ্ঞা অনুভব করলেন। চার জন লোক একে অন্যের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেনো আরো কিছু বলার আছে তাদের, কিন্তু দৃশ্যত তারা কিছুই বললেন না। আরিঙ্গাবোসা ঘুরে দরজার দিকে চললেন।

 

বিশপ? আরিঙ্গারোসা দরজার কাছে যেতেই কার্ডিনালদের একজন ডাক দিলেন।

 

আরিঙ্গাব্রোসা থেমে, ঘুরে দাঁড়ালেন। হ্যাঁ?

 

এখান থেকে আপনি কোথায় যাবেন?

 

আরিঙ্গাবোসা আঁচ করতে পারলেন, প্রশ্নটা যতটা না ভৌগলিক তারচেয়েও বেশি আধ্যাত্মিক। তারপরও, এই সময়ে তাঁর নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা করার কোন ইচ্ছে হলো না। প্যারিস, কথাটা বলেই দরজা দিয়ে বেড়িয়ে গেলেন তিনি।

 

 

 

৪২.

 

ডিপোজিটরি ব্যাংক অব জুরিখ চব্বিশ ঘন্টার সার্ভিস দিয়ে থাকে। এই গেন্ডশ্রাংক ব্যাংক সুইসব্যাংকের ঐতিহ্য অনুসারে পুরোপুরি আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর। জুরিখ, কুয়ালালামপুর, নিউইয়ক এবং প্যারিসে তাদের অফিস রয়েছে। সাম্প্রতিককালে তারা তাদের সার্ভিসকে শতভাগ কম্পিউটারাইজ করেছে। বর্তমানে সবধরণের কাজই কোড দিয়ে করা হয় আর একাউন্ট নাম্বারগুলোর অদৃশ্য ডিজিটাইজ ব্যাক-আপ থাকে।

 

এই ব্যাংকের প্রধান কাজটা করা হয়ে থাকে বহু পুরনো আর সরল একটা পদ্ধতিতে বড়সড় একটা লেজার—তাতে তথ্য গোপন রাখা হয়, আর সেটা নিরাপদ ডিপোজিট বক্স সার্ভিস হিসেবে পরিচিত। গ্রাহক নিজেদের স্টক সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে চিত্রকর্ম পর্যন্ত ডিপোজিট রাখতে পারে এখানে। অতি উচ্চ-প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে এই ব্যাংকে। গ্রাহক যখন খুশি, ইচ্ছে করলেই সঙ্গোপনে এবং পূর্ণ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ডিপোজিটে রাখা জিনিসটা নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নিতে পারে।

 

ব্যাংকের কাছাকাছি একটা জায়গায় সোফি গাড়িটা থামালো। ল্যাংডন ভবনটার পুরোদস্তুর স্থাপত্যশৈলীর দিকে তাকিয়ে আর্চ করলো ডিপোজিটরি ব্যাংক অব জুরিখের হাস্যরসের ব্যাপারে সম্যক ধারণাই আছে। ভবনটা জানালাবিহীন চৌকোনা, পুরোপুরি স্টিল দিয়ে তৈরি করা। এর গাথুনীটা বড়-বড় লোহার ইটে তৈরি। মাটি থেকে ভবনটার ভিত পনেরো ফুট উঁচুতে। নিয়ন আলো আর সম-বাহুর ঐশ ভবনটার বাইরের দিকে জ্বল জ্বল করছে।

 

ব্যাংকিং খাতে সুইজারল্যান্ডের গোপনীয়তার সুনামটিই হলো সেই দেশের সবচাইতে লাভজনক রপ্তানি পণ্য। শিল্প সমাজের কাছ থেকে এই ধরনের সুবিধার ব্যাপারে বিরোধীতার সম্মুখীন হয়ে আসছে ভারা কারণ, তারা শিল্পকর্মের চোরদের চুরি করা জিনিস লুকিয়ে রাখার জন্য একেবারে নিরাপদ জায়গা দিয়ে থাকে। চোরেরা কয়েক বছর পরে, যখন চুরির ঘটনাটা বিস্মৃত হয়ে আসে, তখন সেগুলো তুলে নিয়ে থাকে, কারণ আইনগতভাবেই ডিপোজিটগুলো যে কোন ধরনের পুলিশী তল্লাশী থেকে মুক্ত, আর একাউন্টগুলো নামের উপরে না হয়ে সংখ্যার মাধ্যমে হয়ে থাকে। চোরেরা এটা জেনে স্বস্তিতে থাকে যে, তাদের চুরি করা মালামালগুলো নিরাপদে আছে এবং সেগুলো কোনভাবেই খোঁজ করা যাবে না।

 

সোফি ব্যাংকের দরজার সামনেই গাড়িটা থামালো। ল্যাংডনের মনে হলো তাদের উপরে একটা ভিত্তিও ক্যামেরা নজরদারি করছে, এই ক্যামেরাটা লুভরের মতো নয়, একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য।

 

সোফি গাড়ির কাঁচটা নামিয়ে ঠিক পাশেই রাখা ইলেকট্রনিক মঞ্চে রাখা এলসিডি মনিটরের দিকে তাকালো। সেখানে সাতটা ভাষায় দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। সবার উপরে ইংরেজি।

 

INSERT KEY

 

সোফি পকেট থেকে গোল্ড লেজার চাবিটা বের করে মঞ্চটার ঠিক নিচের ত্রিভূজাকৃতির একটা ছিদ্রটাতে ঢুকালো।

 

আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, এটা কাজ করবে, ল্যাংডন বললো।

 

চাবিটা পুরোপুরি ঢোকাবার পরই সোফির মনে হলো, এটা ঘোরাবার দরকার নেই। সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা খুলে গেলো। সোফি গাড়িটা চালিয়ে সামনের দ্বিতীয় দরজাটার দিকে এগোলো, তার পেছনের দরজাটা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গিয়ে তাদেরকে ভেড়া-বন্দী করে ফেললো।

 

ল্যাংডন এই বন্দী অবস্থাটা অপছন্দ করলো না। আশা করা যাক, দ্বিতীয় দরজাটাও খুলবে।

 

দ্বিতীয় দরজাটাও আগের মতো করেই খুলতে হলো।

 

INSERT KEY

 

চাবিটা ঢোকানো মাত্রই দরজাটা খুলে গেলো। কিছুক্ষণ পরেই তারা ভকটার পেটের ভেতরে ঢুকে পড়লো। গাড়ি রাখার জায়গাটা ছোট আর সংকীর্ণ। এক ডজন গাড়ি রাখার মতো আয়তন জায়াগাটার। অন্যপ্রান্তে, ল্যাংডন ভবনটার মূল প্রবেশ দ্বারের দিকে তাকালো। সিমেন্টের ফ্লোরটাতে একটা লম্বা লাল গালিচা বিছানো। দর্শনার্থীদেরকে স্বাগতম জাগানোর জন্য সেখানে রয়েছে একটা বিশাল দরজা, তার কাছে মনে হলো পুরোপুরি লোহার তৈরি বলে।

 

স্বাগতম এবং দূরে থাকুন, ল্যাংডন ভাবলো।

 

প্রবেশদ্বারের সামনে একটা পার্কিং লটের কাছে সোফি গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে গিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলো। তুমি অস্ত্রটা গাড়িতেই রেখে দাও।

 

আনন্দের সাথেই, ল্যাংডন মনে মনে বলে পিস্তলটা সিটের নিচে রেখে দিলো।

 

সোফি আর ল্যাংডন গাড়ি থেকে নেমে লাল গালিচাটা ধরে এগোলো। দরজাটার কোন হাত নেই। কিন্তু ঠিক তার পাশেই, দেয়ালে আরেকটা ত্রিভূজাকৃতির ছিদ্র দেখা গেলো। এখানে অবশ্য কোন নির্দেশনা নেই।

 

ধীরে শেখে যারা তাদের কাছ থেকে দূরে থাকো, ল্যাংডন বললো।

 

সোফি হাসলো, তাকে নার্ভাস দেখাচ্ছে। এইতো। সে ছিদ্রটার ভেতরে চাবি ঢুকালে সাথে সাথে দরজাটা খুলে গেলো। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে সোফি আর ল্যাংডন ভেতরে প্রবেশ করতেই দরজাটা ভোতা একটা শব্দে বন্ধ হয়ে গেলো।

 

ডিপোজিটরি ব্যাংকের ফয়ারটা যে রকমভাবে সাজানো হয়েছে, সে রকমটি ল্যাংডন কখনও দেখেনি। যেখানে বেশিরভাগ ব্যাংক পালিশ করা মার্বেল বা গ্রানাইট দিয়ে সাজায়, সেখানে এই জায়গাটার সারা দেয়াল জুড়ে লোহা আর নাট-বল্ট দিয়ে সাজানো।

 

তাদের ডেকোরেটর কে? ল্যাংডন অবাক হয়ে ভাবলো। স্টিলের গলি?

 

সোফিও একইরকম ভয়ে লবিটার দিকে তাকালো। চারদিকেই ধূসর লোহা জমিন, দেয়াল, কাউন্টার, দরজা, এমনকি লবির চেয়ারগুলোও লোহার তৈরি। তাসত্ত্বেও, ব্যাপারটা দেখতে খুবই আকর্ষণীয় আর চমক্কার। মেসেজটা খুব পরিষ্কার : তুমি একটা ভন্টের ভেতরে হাটছে।

 

তারা ঢুকতেই কাউন্টারে বসা এক বিশাল দেহের লোক তাদের দিকে তাকালো। সে ছোট্ট একটা টেলিভিশন বন্ধ করে তাদের দিকে প্রশান্তির একটা হাসি দিলো। বিশাল মাংসপেশী এবং শক্ত বাহু থাকা সত্ত্বেও, তার কণ্ঠে এবং আচারে মার্জিত সুইস বেলহপ-এর পরিচয় পাওয়া গেলো।

 

বঁজুখ, সে বললো, আপনাদেরকে আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি?

 

দুভাষায় অভিন্দন জানানোটা এই ইউরোপিয়ান অভ্যর্থনাকারীর নতুন একটা চাল।

 

সোফি জবাবে কিছুই বললো না। সোজা সোনার চাবিটা লোকটার সামনের কাউন্টারের উপর রেখে দিলো।

 

লোকটা সেটার দিকে তাকিয়েই সোজা উঠে দাঁড়ালো। অবশ্যই। আপনার লিফটটা ঘরের শেষ মাথায়। আমি জানিয়ে দিচ্ছি, আপনারা আসছেন।

 

সোফি মাথা নেড়ে চাবিটা তুলে নিলো।কোন্ তলায়?

 

লোকটা তার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকালো। আপনার চাবিটা-ই তো নির্দেশ করছে কোন তলা।

 

সোফি হেসে বললো, আহ্, তাইতো।

 

 

 

গার্ড দুই আগন্তুককে লিফটের কাছে যেতে দেখলো। তারা চাবি ঢুকিয়ে লিফটের ভেতরে চলে গেলো। দরজাটা বন্ধ হতেই ফোনটা তুলে নিলো লোকটা। কাউকে তাদের আসার কথা জানানোর জন্য বললো না; এর কোন দরকারও নেই। বাইরের প্রবেশদ্বারে কোন গ্রাহক চাবি ঢোকানোর সাথে সাথেই পুরো ভল্টটাই সতর্ক হয়ে যায়।

 

গার্ড আসলে ব্যাংকের রাত্রিকালীন ম্যানেজারকে ডাকতে ফোন করছে।

 

ফোনের রিং হতেই গার্ড টেলিভিশনটা ছেড়ে দিয়ে সেটা দেখতে লাগলো। যে খবরটা সে দেখছিলো সেটা এইমাত্র শেষ হলো। এতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। সে ইতিমধ্যেই এই দুজনের ছবি টেলিভিশনে দেখে ফেলেছে।

 

ম্যানেজার জবাব দিলো, উই?

 

এখানে একটা ঘটনা ঘটেছে।

 

কি হয়েছে? ম্যানেজার জানতে চাইলো।

 

ফরাসি পুলিশ দুজন ফেরারিকে খুঁজছে। আজ রাতে।

 

তো?

 

তাদের দুজন এখন আমাদের ব্যাংকের ভেতরে ঢুকেছে।

 

ম্যানেজার শান্ত কণ্ঠেই বললো, ঠিক আছে। আমি মঁসিয়ে ভার্নেটের সাথে যোগাযোগ করছি।

 

গার্ড ফোনটা নামিয়ে রেখে আরেকটা ফোন করলো। এটা করা হলো ইন্টারপোলে।

 

 

 

ল্যাংডন খুব অবাক হলো, কারণ তার মনে হলো, লিফটটা উপরের দিকে না উঠে বরং নিচের দিকে নামছে। লিফটের দরজাটা খোলর আগে সে বুঝতেই পারলো না ডিপোজিটরি ব্যাংক অব জুরিখের নিচের কত তলায় গেলো। সে অবশ্য পরোয়া করলো না। লিফট থেকে বের হতে পেরেই সে দারুণ খুশি। ইতিমধ্যেই একজন অভ্যর্থনাকারী মিষ্টি হেসে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা বয়সে প্রবীন আর বেশ হাসিখুশি। সে পরে আছে পরিষ্কার ফ্লানেল সুট, যা এই জায়গার সাথে একদম বেমানান–আধুনিক উচ্চপ্রযুক্তির জগতে একজন পুরনো দিনের ব্যাংকার।

 

বঁজুখ, লোকটা বললো। গুড ইভিনিং। আপনারা কি দয়া করে আমাকে অনুসরণ করবেন, সিল ভু প্লেই? কোন জবাবের অপেক্ষা না করেই, সে ঘুরে একটা সংকীর্ণ করিডোর দিয়ে যেতে লাগলো।

 

ল্যাংডন সোফির পেছন পেছন কয়েকটা করিডোর পার হলো। তারা কয়েকটা মেইন ফ্রেম কম্পিউটার ভর্তি ঘরও পার হলো। ওগুলোর বাতি জ্বলছিলো, নিভছিলো।

 

ভয়সি, লোকটা বললো, একটা লোহার দরজার সামনে এসে সেটা খুলে দিলো তাদের জন্য। এইতো এখানে।

 

ল্যাংডন আর সোফি আরেকটা জগতে প্রবেশ করলো। তাদের সামনে ছোট্ট ঘরটা দেখতে চমৎকার কোন হোটেলের বিলাসবহুল বসার ঘরের মতো। সেখানে লোহা আর নাট-বল্ট তিরোহিত হয়েছে। সেই জায়গাটা দখল করেছে প্রাচ্যদেশীয় কার্পেট, ওক কাঠের ফার্নিচার, আর কুশন সংবলিত চেয়ার। ঘরের মাঝখানে রাখা চওড়া ডেস্কটার উপরে, দুটো ক্রিস্টালের গ্লাস, তার পাশে খোলা পেরিয়ারের বোতল, সেটার বুদবুদ এখনও উঠছে। তার পাশেই রয়েছে একটা কফি পট।

 

লোকটা একটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি দিলো। আমার মনে হচ্ছে, আপনারা আমাদের এখানে এই প্রথম এসেছেন?

 

সোফি একটু ইতস্তত করে মাথা নেড়ে সায় দিলো।

 

বুঝেছি। প্রায়শই, চাবিগুলো উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়ে থাকে। আর আমাদের এখানে প্রথম যারা আসে, তারা সাধারণত এখানকার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে না। সে টেবিলে রাখা পানীয়ের দিকে ইশারা করলো। এই ঘরটা আপনাদের, যতোক্ষণ ইচ্ছে আপনারা এটা ব্যবহার করবেন।

 

আপনি বলছেন, চাবিগুলো প্রায়শই উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়ে থাকে? সোফি জিজ্ঞেস করলো।

 

একদম ঠিক। আপনার চাবিটা অনেকটা সুইস ব্যাংক একাউন্টের মতোই, যা প্রায়শই, পরবর্তী বংশধরদের কাছে উইল করে দেয়া হয়। আমাদের গোল্ড একাউন্টের সর্বনিম্ন লিজ নেয়ার সময়কাল হলো পঞ্চাশ বছর। অগ্রিম পরিশোধ করা হয়। তো, সে জন্যেই, আমরা অনেক পরিবারের বদল হতে দেখি।

 

ল্যাংডন তার দিকে তাকালো। আপনি বলছেন পঞ্চাশ বছর?

 

সর্বনিম্ন, লোকটা জবাব দিলো। অবশ্য, আপনি এর চেয়ে বেশি সময়ের জন্যও লিজ নিতে পারেন। আর যদি সময় না বাড়িয়ে পঞ্চাশ বছর অতিক্রম হবার পরও একাউন্টটা সচল না করা হয়, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই, সেফ ডিপোজিট বাক্সটা ধ্বংস করে ফেলা হয়। আমি কি আপনাদের বাক্সটা খোলার কাজ শুরু করবো?

 

সোফি মাথা নেড়ে সায় দিলো। প্লিজ।

 

লোকটা একটা বিলাসবহুল কামড়ার দিকে হাত দিয়ে ইশারা করে দেখালো। এটা আপনাদের ব্যক্তিগত ভিউয়িংরুম। আমি এই ঘর থেকে চলে যাবার পর, আপনারা যতোক্ষণ দরকার ততোক্ষণ থেকে, নিজেদের সেফ-ডিপোজিট বাক্সের জিনিসগুলো দেখতে পারেন, নিতে পারেন। সে হেটে ঘরটার একদিকের দেয়ালের কাছে গিয়ে বললো, আপনার চাবিটা এখানে ঢুকাবেন… লোকটা একটা ইলেক্ট্রনিক পোডিয়ামের দিকে ইঙ্গিত করলো। পোডিয়ামটার অতিপরিচিত ত্রিভূজকৃতির একটা ছিদ্র ছিলো। কম্পিউটার আপনার চাবিটা নিশ্চিত করলে, আপনি আপনার একাউন্ট নাম্বারটা ইনসার্ট করবেন, তারপরেই আপনার সেফ-ডিপোজিটরি বাক্সটা ভল্টের নিচে আপনা আপনিই এসে যাবে। বাক্সটার কাজ শেষ করার পর, একই প্রক্রিয়ায় আপনি সেটা আবার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখতে পারবেন। চাবিটা আবার ঢোকাতে হবে কিন্তু। সব কিছুই স্বরংক্রিয় ব্যবস্থায় হবে, তাই প্রাইভেসির গ্যারান্টি রয়েছে। এমন কি ব্যাংকের কর্মচারীদের কাছেও কিছুই জানা সম্ভব নয়। আপনাদের যদি কিছুর দরকার হয়, তাহলে শুধু টেবিলের মাঝখানের বোতামটা টিপলেই হবে।

 

সোফি কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাবে, তখনই ফোনটা বেজে উঠলো। লোকটা খুব বিব্রত আর হতভম্ব হলো। ক্ষমা করবেন, আমাকে, প্লিজ। সে ফোনটার কাছে গেলো, সেটা টেবিলে রাখা কফি পটটার পাশেই ছিলো।

 

উই? সে জবাব দিলো। ফোনের অপর পাশ থেকে কথা শুনে তার ভুরু কপালে উঠলো। উই…উই…দার্কোদ। সে ফোনটা রেখে দিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তির একটা হাসি দিলো। আমি দুঃখিত, আমাকে একটু যেতে হবে। আপনারা নিজের ঘর মনে করবেন। সে খুব দ্রুত দরজার দিকে চলে গেলো।

 

একটু শুনুন, সোফি লোকটাকে ডাকলো। যাবার আগে কি একটা বিষয় পরিষ্কার করে যাবেন? আপনি বলেছেন, আমাদেরকে একটা একাউন্ট নাম্বার ঢোকাতে হবে?

 

লোকটা দরজার সামনে গিয়ে থামলো। তার মুখটা ফ্যাঁকাশে দেখালো। তাতো অবশ্যই। সুইস ব্যাংকের একাউন্টের মতো, আমাদের সেফ ডিপোজিটরি বক্সের একাউন্টেরও একটা নাম্বার থাকে, কোন নাম নয়। আপনার কাছে একটা চাবি এবং পারসোনাল নাম্বার আছে, যা শুধু আপনিই জানেন। চাবিটা হলো আইডিন্টিফিকেশনের কেবলমাত্র অর্ধেকটা। আপনার একাউন্ট নাম্বারটা হলো বাকি অর্ধেক। তা-না হলে আপনি আপনার চাবিটা হারিয়ে ফেললে, যে কেউ সেটা ব্যবহার করতে পারবে।

 

সোফি ইতস্তত করে বললো, কিন্তু, আমার উইলদাতা যদি আমাকে কোন একাউন্ট নাম্বার না দিয়ে থাকেন তো?

 

লোকটার হৃদস্পন্দন লাফাতে লাগলো। তাহলে নিশ্চিতভাবেই এখানে এসে আপনার কোন কাজ হবে না! সে তাদের দিকে তাকিয়ে একটা শান্ত হাসি দিলো। আমি কাউকে ডেকে দিচ্ছি, আপনাদেরকে সাহায্য করার জন্য। সে খুব দ্রুতই এসে যাবে।

 

চলে গিয়ে ব্যাংকার লোকটা দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বাইরে থেকে চাবি মেরে দিলো। তাদেরকে ভেতরে আঁটকে ফেলা হলো।

 

 

 

শহরের উপকণ্ঠে, কোলেত গার দু নর্দ ট্রেন টামিনালে দাঁড়িয়ে আছে। তার ফোনটা বেজে উঠলো।

 

ফশের ফোন। ইন্টারপোল একটা জিনিস খুঁজে পেয়েছে। ল্যাংডন আর সোফি এইমাত্র প্যারিসের ডিপোজিটরি ব্যাংক অব জুরিখের একটা শাখায় গেছে। আমি চাই, তুমি তোমার লোকজন নিয়ে সেখানে এক্ষুণি চলে যাও।

 

এজেন্ট নেভু আর রবার্ট ল্যাংডনের কাছে সনিয়ে কী বলতে চেষ্টা করেছেন, সে ব্যাপারে কি কিছু জিজ্ঞেস করবো?

 

ফশের কণ্ঠটা শীতল হয়ে গেলো। তুমি যদি তাদেরকে গ্রেফতার করতে পারো লেফটেনান্ট কোলেত, তখন আমি নিজেই সেটা তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে পারবো।

 

কোলেত ইঙ্গিতটা ধরতে পারলো। চব্বিশ রুই হাক্সো। এক্ষুণি যাচ্ছি ক্যাপ্টেন। সে ফোনটা কেটে দিয়ে তার লোকদের কাছে ওয়্যারলেস করলো।

 

 

 

৪৩.

 

আদ্রেঁ ভার্নেট–জুরিখের ডিপোজিটরি ব্যাংকের প্যারিস শাখার প্রেসিডেন্ট ব্যাংকের ওপরেই বিরাট একটা ফ্ল্যাটে থাকেন তিনি। তাঁর এই চমক্কার থাকার জায়গা সত্ত্বেও তিনি স্বপ্ন দেখেন লিলের সেন্ট লুইর নদীর তীরের একটা এপার্টমেন্টের মালিক হতে, যেখানে তিনি তার কাঁধ সোজা করে সত্যিকারের মর্যাদা নিয়ে থাকবেন, এখানকার মতো নোংরা ধনীদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করার মতো কিছু থাকবে না সেখানে।

 

আমি যখন অবসরে যাবো, ভার্নেট নিজেকে বললেন, আমার ঘরটা বোর্দ মদ দিয়ে ভরে রাখবো, আর সারা দিন কাটাবো পুরনো ফার্নিচার এবং লাতিন কোয়ার্টার থেকে সংগ্রহ করা বই।

 

আজ রাতে, ভার্নেট, এইতো, মাত্র সাড়ে ছয় মিনিট আগে জেগেছেন। তারপরও, যখন ব্যাংকের আন্ডারগ্রাউন্ড করিডোর দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছেন তখন তাকে দেখলে মনে হবে তাঁর ব্যক্তিগত দর্জি এবং হেয়ার ড্রেসার তাকে ঘষা-মাজা করে চকে করে তুলেছে। নিখুঁতভাবেই সিল্কের সুট পরেছেন ভার্নেট, মুখে মাউথন্দ্রে করেছেন। হাটতে হাটতে টাইটা বেঁধে নিলেন ঠিক মতো। আন্তর্জাতিক কোন গ্রাহক, ভিন্ন কোন টাইম জোন থেকে ব্যাংকে এসে পৌঁছালে তাঁকে এভাবে উঠতেই হয়, এটা কোন অদ্ভুত ব্যাপার নয় তার কাছে। ভার্নেট মাসাই যোদ্ধাদের আদলে ঘুম দিয়ে থাকেন—এই আফ্রিকান উপজাতি, গভীর ঘুম থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জেগে ওঠে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে পারার ক্ষমতা রাখে।

 

যুদ্ধ প্রস্তুত, ভার্নেট ভাবলেন। আশংকা করলেন আজ রাতের ঘটনাটা খুব অভাবনীয় কিছু হবে। গোল্ড কি গ্রাহকের আগমন সবসময়ই বাড়তি মনোযোগ দাবি করে। কিন্তু একজন গোল্ড কির গ্রাহক যে কি-না জুডিশিয়াল পুলিশ কর্তৃক ফেরারি, সেটা নিঃসন্দেহে নাজুক একটা ব্যাপার। গ্রাহকদের গোপনীয়তার ব্যাপারটা নিয়ে ব্যাংকের সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকদের যথেষ্ট লড়াই হয়েছে। তারা কোন প্রমাণ ছাড়াই কিছু গ্রাহককে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো।

 

পাঁচ মিনিট, ভার্নেট নিজেকে বললেন। পুলিশ আসার আগেই এই লোকগুলো ব্যাংক থেকে বের হয়ে যাওয়া দরকার।

 

যদি খুব দ্রুত পৌঁছানো যায়, এই অনাহুত বিপদটা পাশ কাটানো যেতে পারে। ভার্নেট পুলিশকে বলতে পারবে, ফেরারিরা তাঁর ব্যাংকে এসেছিলো ঠিকই, কিন্তু তারা যেহেতু গ্রাহক নয়, আর তাদের কোন একাউন্টও নেই তাই তারা চলে গেছে। তিনি মনে মনে চাইছিলেন বোকা দারোয়ানটা যেনো ইন্টারপোলে ফোন না করে বসে। ১৫ ইউরো প্রতি ঘণ্টার দারোয়ানের কাছ থেকে বিচক্ষণতার প্রত্যাশা করা ঠিক নয়।

 

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, তিনি একটা লম্বা দম নিয়ে নিজের মাংসপেশীগুলোকে শিথিল করে নিলেন। তারপর, একটা কপট হাসি জোর করে মুখে এঁটে দিলেন। দরজাটা লাগিয়ে ঘরের ভেতরে গরম বাতাসের মতো ঢুকে পড়লেন।

 

গুড ইভিনিং, তিনি বললেন, তার চোখ ক্লায়েন্টদের খুঁজলো। আমি আজেঁ ভার্নেট। আমি কীভাবে আপনাদের সা শব্দটার বাকি অংশ তঁার এডামস এ্যাপেলের কোথাও আঁটকে গেলো। তাঁর সামনের মেয়েটা এতোটাই অপ্রত্যাশিত যে, ভার্নেট সেটা কল্পনাই করতে পারছিলেন না।

 

 

 

আমি দুঃখিত, আমরা কি একে অন্যেকে চিনি? সোফি জিজ্ঞেস করলো। সে ব্যাংকারকে চিনতে না পারলেও, কয়েক মুহুর্তের জন্য তার মুখটা দেখে মনে হলো, তিনি যেনো ভূত দেখছেন।

 

না… ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তোতলাতে শুরু করলেন। আমার…বিশ্বাস। আমাদের সার্ভিসটা বেনামে হয়। তিনি দম নিয়ে একটা হাসি দেবার চেষ্টা করলেন। আমার সহকারী আমাকে বলেছে, আপনাদের কাছে একটা গোল্ড কি আছে, কিন্তু কোন একাউন্ট নাম্বার নেই? আমি কি জিজ্ঞেস করতে পারি, চাবিটা কোথেকে পেয়েছেন?

 

আমার দাদু আমাকে এটা দিয়েছেন, লোকটাকে একটু ভালো করে দেখে সোফি জবাব দিলো। তার অস্বস্তিটা এখন আরো বেশি ইঙ্গিতবহ মনে হচ্ছে।

 

সত্যি? আপনার দাদ আপনাকে চাবিটা দিলেও একাউন্ট নাম্বার দিতে পারেন নি?

 

আমার মনে হয়, তিনি সময় পাননি, সোফি বললো। তিনি আজ রাতে খুন হয়েছেন।

 

তার কথায় লোকটা একটু পিছিয়ে গেলো। জ্যাক সনিয়ে মারা গেছেন? তিনি জানতে চাইলেন, তার চোখ জুড়ে আতংক। কিন্তু … কিভাবে?

 

এবার সোফি দারুণ অবাক হলো, ঘটনার আকস্মিকতায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। আপনি আমার দাদুকে চিনতেন?

 

ব্যাংকার আদ্রেঁ ভার্নের্টকেও একইরকম বাকরুদ্ধ হতে দেখা গেলো, টেবিলের কোনা ধরে একটু হেলে পড়লেন তিনি। জ্যাক এবং আমি খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম। কখন ঘটনাটা ঘটলো?

 

আজ রাতের শুরুতে। লুভরের ভেতরেই।

 

ভার্নেট একটা চামড়ার চেয়ারে বসে পড়লেন। আপনাদের দুজনকে আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। তিনি ল্যাংডন আর সোফির দিকে তাকালেন। আপনাদের কেউ কি তার মৃত্যুর সাথে কোনভাবে জড়িত?

 

না! সোফি জোড় দিয়ে বললো। একেবারেই নয়। ভার্নেটের চেহারাটায় একটা তিক্তভাব দেখা গেলো, তিনি একটু থেমে ভাবতে লাগলেন। ইন্টারপোল আপনাদের ছবি সম্প্রচার করছে। এজন্যেই আমি আপনাদেরকে চিনতে পেরেছিলাম, আপনারা হত্যার খুনের আসামী।

 

সোফি আৎকে উঠলো। ফশে ইতিমধ্যে ইন্টারপোলে সম্প্রচার করে ফেলেছে? এতে মনে হলো, সোফির ধারণার চেয়েও ক্যাপ্টেন অনেক বেশি করিকর্মা। সে খুব দ্রুত ল্যাংডনের পরিচয়টা দিয়ে দিলো আর লুভরের ভেতরে কী ঘটেছে সেটাও জানালো।

 

ভার্নেট খুব বিস্মিত হলো। আপনার দাদু মারা যাবার সময় আপনার জন্য একটা মেসেজ লিখে বলে গেছেন যে, মি. ল্যাংডনকে খোঁজ করুন?

 

হ্যাঁ। আর এই চাবিটা। সোফি সোনার চাবিটা প্রায়োরির সিলটার দিক মুখ করে ভার্নেটের সামনে কফি টেবিলের ওপরে রাখলো।

 

ভার্নেট চাবিটার দিকে তাকালেন, কিন্তু সেটা ধরলেন না। শুধু চাবিটাই আপনাকে দিয়েছে? আর কিছু না? কোন কাগজের টুকরো?

 

সোফি জানতো, সে লুভরে খুব তাড়াহুড়ো করেছিলো। কিন্তু সে একেবারে নিশ্চিত, মাড়োনা অব দি রকসর পেছনে অন্য কিছু ছিলো না। না, শুধু চাবিটা।

 

ভার্নেট একটা হতাশাজনক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, প্রতিটা চাবির সাথেই দশ সংখ্যার একটা একাউন্ট নাম্বারও থাকে। সেই নাম্বারটাই হলো। পাসওয়ার্ড। নাম্বারটা ছাড়া চাবিটা একেবারেই মূল্যহীন।

 

দশ সংখ্যার নাম্বার। সোফি মনে মনে ক্রিপ্টোগ্রাফিক কোডটার হিসাব-নিকাশ করতে শুরু করলো। দশ বিলিয়ন সম্ভাব্য সংখ্যা হবে। সে যদি ডিসিপিজের সবচাইতে শক্তিশালী প্যারালাল কম্পিউটার ব্যবহার করে তবে কোডটা ভাঙতে তার কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। অবশ্যই মঁসিয়ে, সব কিছু বিবেচনা করে আপনি আমাদেরকে সাহায্য করতে পারেন।

 

আমি দুঃখিত। সত্যি বলতে কী, আমি কোন সাহায্যই করতে পারবো না। গ্রাহকরা তাদের একাউন্ট নাম্বারগুলো একটা নিরাপদ টার্মিনালের মাধ্যমে পেয়ে থাকে। তার মানে, একাউন্ট নাম্বারটা কেবল গ্রাহক এবং কম্পিউটারই জানতে পারে। এইভাবে আমরা আমাদের সুরক্ষা দিয়ে থাকি। আর এটা আমাদের কর্মচারীদেরকেও নিরাপত্তা দিয়ে থাকে।

 

সোফি বুঝতে পারলো। কনভিনিয়েন্স স্টেটনারও একই জিনিস করে থাকে। কর্মচারীদের কাছে চাবি থাকে না। এই ব্যাংক নিশ্চিতভাবেই চায় না এমন ঝুঁকি নিতে, যাতে করে কেউ একটা চাবি চুরি করে ব্যাংকের কোন কর্মচারীকে জিম্মি করে একাউন্ট নাম্বারটা নিয়ে নিতে পারে।

 

সোফি ল্যাংডনের পাশে বসে পড়লো। চাবির দিকে তাকিয়ে তারপর ভানেক্টের দিকে তাকালো। আমার দাদু ব্যাংকে কী রেখেছেন, সে সম্পর্কে কি আপনার কোন ধারণা আছে?

 

একেবারেই না। এটাই গেন্ডশ্রাংক ব্যাংকের সংজ্ঞা।

 

মঁসিয়ে ভার্নেট, সে আরেকটু চাপাচাপি করলো। আজ রাতে আমাদের হাতে খুব অল্পই সময় আছে। আমি সরাসরিই বলছি। সে সোনার চাবিটা হাতে নিয়ে প্রায়োরি সিলটা তাঁকে দেখালো। এই চাবির প্রতীকটা কি আপনার কাছে কোন অর্থ বহন করে?

 

ভার্নেট ফ্লার-দ্য-লিস সিলটার দিকে তাকিয়ে কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। না, কিন্তু আমাদের অনেক গ্রাহকই নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লোগো কিংবা আদ্যক্ষর অংকিত করে থাকে।

 

সোফি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো, তখনও তাঁকে সতর্কভাবে দেখে যাচ্ছিলো। এই সিলটা একটা গুপ্তসংগঠন, প্রায়োরি অব সাইন-এর প্রতীক।

 

ভার্নেট আবারো কোন প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। আমি এসবের কিছুই জানি না। আপনার দাদু আমার একজন বন্ধু ছিলেন। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাজের কথা বলতাম। লোকটা তার টাই ঠিক করে নিলেন, এখন খুব নার্ভাস দেখাচ্ছে তাঁকে।

 

সিয়ে ভার্নেট, সোফি জোর দিয়ে বললো, তার কণ্ঠ খুবই দৃঢ়। আমার দাদু আজ রাতে আমাকে ফোন করে বলেছিলেন যে, তিনি এবং আমি মারাত্মক বিপদে আছি। তিনি বলেছেন, তার নাকি আমাকে কিছু একটা দেয়ার আছে। তিনি আমাকে আপনার ব্যাংকের এই চাবিটা দিয়েছেন। এখন তিনি মারা গেছেন। আপনি আমাদেরকে কিছু বললে, সেটা আমাদের খুব সাহায্যে আসবে।

 

ভার্নেট ঘামে ভিজে গেলেন। আমাদেরকে এই ভবন থেকে বের হয়ে যেতে হবে। আমার ভয় হচ্ছে পুলিশ খুব শীঘ্রই এখানে এসে পৌঁছাবে। আমার দারোয়ান ইন্টারপোলকে ফোন করে দিয়েছে।

 

সোফি একটু ভয় পেয়ে গেলো। সে শেষবারের মতো একটা চেষ্টা করে দেখলো। আমার দাদু বলেছিলেন যে, তিনি আমার পরিবার সম্পর্কে একটা সত্য কথা বলতে চান। এটা কি আপনার কাছে কোন অর্থ বহন করে?

 

মাদামোয়াজেল, আপনার পরিবার একটা গাড়ি দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলো, তখন আপনি খুবই ছোট ছিলেন। আমি দুঃখিত। আমি জানি আপনার দাদু আপনাকে খুব ভালোবাসতেন। সে আমাকে অনেকবারই বলেছে, আপনার সাথে তার সম্পর্কচ্ছেদের জন্য কী কষ্টটাই না সে পেয়েছে।

 

সোফি কী বলবে ভেবে পেলো না।

 

ল্যাংডনই জিজ্ঞেস করলো, এই একাউন্টে যা রাখা হয়েছে, তার সাথে কি স্যাংগৃলের কোন সম্পর্ক রয়েছে?

 

ভার্নেট আজব ভঙ্গীতে তার দিকে তাকালো। এটা আবার কি, এ সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই নেই। ঠিক এই সময়েই ভার্নেটের সেল ফোনটা বেজে উঠলে বেল্ট থেকে ওটা খুলে নিলেন। উই? তিনি কয়েক মুহূর্ত শুনলেন। তাঁর চেহারায় বিস্ময় আর দুশ্চিন্তার ছাপ দেখা গেলো। লা পুলিশ? সি র‍্যাপিদেমো? তিনি দ্রুত ফরাসিতে কিছু নির্দেশ দিয়ে দিলেন, আর বললেন কয়েক মিনিটের মধ্যে সে নিজেই। লবিতে আসছে।

 

ফোনটা রেখেই তিনি সোফির দিকে ঘুরলেন। পুলিশ খুব দ্রুতই ছুটে এসেছে দেখছি। আমরা কথা বলতে বলতেই তারা এসে পড়বে। শুনুন, ভার্নেট বললেন, জ্যাক আমার বন্ধু ছিলেন, আর আমার ব্যাংক চায় না এটা জানা-জানি হোক। তাই দুটো কারণে, আমি আমার এখানে কোন ধরণের গ্রেফতার হওয়াটা চাইছি না। আমাকে একটু সময় দিন, দেখি আপনাদেরকে এখান থেকে সবার অলক্ষ্যে বের করে দিতে পারি কিনা। এটা ছাড়া আমি আর কোনভাবে জড়িত হতে চাই না। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে চলে গেলেন। এখানেই থাকুন। আমি ব্যবস্থা করে ফিরে আসছি।

 

কিন্তু সেফ-ডিপোজিট বাক্সটা, সোফি জানালো। আমরা তো শুধু শুধু চলে যেতে পারি না।

 

এ ব্যাপারে আমি কিছু করতে পারবো না। ভার্নেট বললেন, দ্রুত দরজার দিকে এগোলেন। আমি দুঃখিত।

 

সোফি তার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো, ভাবলো, হয়তো একাউন্ট নাম্বারটা বছরে পর বছর ধরে তার দাদুর পাঠানো অসংখ্য চিঠির ভীড়ে চাপা পড়ে আছে, যা সে কখনই খুলে দেখেনি।

 

ল্যাংডন আচম্‌কা উঠে দাঁড়ালো। সোফি আঁচ করতে পারলো অপ্রত্যাশিত কিছু একটা তার চোখে, আশাব্যঞ্জক কিছু।

 

রবার্ট তুমি হাসছো।

 

তোমার দাদু একজন জিনিয়াস।

 

কি বললে?

 

দশ সংখ্যা?

 

সোফি কিছুই বুঝতে পারলো না। সে কি বলছে।

 

একাউন্ট নাম্বারটা, সে বললো, তার চেহারার একটা বুদ্ধিদীপ্তি ঝলক দেখা যাচ্ছে। আমি নিশ্চিত, তিনি ওটা আমাদের কাছেই রেখে গেছেন।

 

কোথায়?

 

ল্যাংডন তার পকেট থেকে কম্পিউটার প্রিন্ট-আউটটা বের করে কফি টেবিলের ওপর রাখলো। সোফি প্রথম লাইনটা পড়েই বুঝতে পারলো ল্যাংডন ঠিকই বলছে।

 

13-3-2-21-1-1-8-5

 

O, Draconian devil!

Oh, I ame saint!

P.S.Find Robert Langdon

 

 

 

৪৪.

 

দশটি সংখ্যা, সোফি বললো, প্রিন্ট-আউটটা দেখে তার ক্রিপ্টোলজিক জ্ঞানে টনক নড়লো।

 

১৩-৩-২-২১-১-১-৮-৫

 

দাদু তাঁর একাউন্ট নাম্বারটা লুভরের ফ্লোরে লিখে গেছেন!

 

সোফি যখন প্রথম এলোমেলো ফিবোনাচ্চি সংখ্যামটা কাঠের ফ্লোরে দেখেছিলো, তার নিশ্চিত ধারণা ছিলো, এটার মূল উদ্দেশ্য, ডিসিপিজের একজন ক্রিপ্টোগ্রাফার জড়িত করানো, যাতে সোফি এই ঘটনায় জড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে, সে বুঝেছিলো, সংখ্যাগুলোর বাকি লাইনগুলোর মর্মোদ্ধার করার একটা কু-ও বটে—এলোমেলো একটা সংখ্যাক্রম…একটা সংখ্যার এনাগ্রাম। এখন, পুরোপুরি বিস্মিত হয়ে, সে দেখছে, সংখ্যাগুলোর গুরুত্ব আসলে অনেক বেশি। সেগুলো তার দাদুর রহস্যময় সেফ ডিপোজিট বক্স খোলার চাবিকাঠি। তিনি ছিলেন একজন দ্ব্যর্থবোধক বিষয়ের ওস্তাদ, ল্যাংডনের দিকে ফিরে সোফি বললো। একাধিক অর্থ আছে এমন কোনকিছুকে তিনি খুবই পছন্দ করতেন। কোডের ভেতরে কোড।

 

ল্যাংডন ইতিমধ্যে ইলেক্ট্রনিক পোডিয়ামের দিকে এগিয়ে গেলে সোফি কম্পিউটার প্রিন্ট-আউটটা হাতে নিয়ে তাকে অনুসরণ করলো।

 

এটিএম ব্যাংকের মতোই পোডিয়ামটার একটা কি-প্যাড রয়েছে। পর্দায় ব্যাংকের অফিশিয়াল লোগে আর একটা ক্রুশ ভেসে এলো। কি-প্যাডটার পাশেই একটা ত্রিভূজাকৃতির ছিদ্র আছে। সোফি আর দেরি না করে সেই ছিদ্রের ভেতরে তার চাবিটা ঢুকিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে পর্দাটা বদলে গেলো।

 

একাউন্ট নাম্বার :

 

কারসরটা চম্‌কাতে লাগলো। অপেক্ষা করছে।

 

দশ সংখ্যা। সোফি কাগজটা থেকে সংখ্যাগুলো পড়লো আর ল্যাংডন সেগুলো টাইপ করে নিলো।

 

একাউন্ট নাম্বার :

১৩-৩-২-২-১-১-৮-৫

 

শেষ সংখ্যাটা লেখা হওয়ার সাথে সাথে পর্দাটা আবার বদলে গেলো। কয়েকটা ভাষায় একটা বার্তা ভেসে এলো, সবার ওপরে ইংরেজি।

 

সাবধান :

Enter বাটনে চাপ দেবার আগে দয়া করে

আপনি আপনার একাউন্ট নাম্বারটা ঠিক আছে কিনা

সেটা চেক করে দেখুন।

আপনার নিরাপত্তার জন্যই, যদি কম্পিউটার

আপনার একাউন্ট নাম্বার চিনতে না পারে,

তবে এই সিস্টেমটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে।

 

ফঙ্কশন তারমিনার, চিন্তিত হয়ে সোফি বললো। মনে হচ্ছে একবারই চেষ্টা করা যাবে। স্টান্ডার্ড এটিএম মেশিন ব্যবহারকারীদেরকে তিন বার পিন নাম্বার টাইপ করার সুযোগ দিয়ে থাকে। এটা অবশ্য সেরকম সাধারণ কোন ক্যাশ মেশিন নয়।

 

সংখ্যাগুলো মনে হচ্ছে ঠিকই আছে, ল্যাংডন নিশ্চিত করে বললো। কাগজের লেখার সাথে টাইপ করা লেখাটা মিলিয়ে দেখলো। Enter বোতামটার দিকে এগোলো। দিলাম চেপে।

 

সোফি তার তর্জনীটা কি প্যাডের কাছাকাছি এনেও দ্বিধান্বিত হলো। তার মনে অদ্ভুত এক ভাবনা খেলে গেলো।

 

দাও, ল্যাংডন বললো। ভার্নেট খুব জলদিই ফিরে আসবে।

 

না। সে তার হাতটা সরিয়ে নিলো। এটা সঠিক একাউন্ট নাম্বার না।

 

অবশ্যই এটা! দশ সংখ্যার। তাহলে অন্য কোনটা?

 

এটা খুব বেশি এলোমেলো।

 

খুব বেশি এলোমেলো? ল্যাংডন খুব বেশি দ্বিমত পোষণ করতে পারলো না।

 

প্রতিটি ব্যাংকই তার কাস্টমারদেরকে পিন নাম্বার হিসেবে এলোমেলো সংখ্যা বেছে নেবার জন্য উপদেশ দিয়ে থাকে, যাতে অন্য কেউ সেটা অনুমান করতে না পারে। নিশ্চিতভাবেই, এখানেও গ্রাহকদেরকে এলোমেলো সংখ্যাই বেছে নিতে বলা হয়।

 

সোফি যা টাইপ করেছিলো, তার সবটাই মুছে ফেললো। সে ল্যাংডনের দিকে তাকালো। তার তাকানোর মধ্যে আত্মবিশ্বাসী একটা ভাব ছিলো। এই সংখ্যাগুলো ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রম অনুযায়ী সাজানো হলেই মনে হয় নাম্বারটা সঠিক হবে।

 

ল্যাংডন বুঝতে পারলো, তার কথায় যুক্তি আছে। প্রথম দিকে সোফি এই একাউন্ট নাম্বারটা চিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রম অনুযায়ীই সাজিয়েছিলো। এটা করা এমন কি আর অদ্ভুত ব্যাপার?

 

সোফি আবারো কি-প্যাডে হাত রাখলো। এবার ভিন্ন একটা নাম্বার টাইপ করলো, স্মৃতি থেকেই। আরেকটা কথা, আমার দাদুর প্রতীক এবং কোডের প্রতি দুর্বলতার জন্য মনে হয়, তিনি এমন সংখ্যাক্রমই বেছে নেবেন, যা খুব সহজেই মনে রাখতে পারেন। সে টাইপ করে এন্টার কি-তে চাপ দিয়ে একটা নরম হাসি দিলো। এমন কিছু, যা দেখতে এলোমেলো মনে হলেও, আসলে তা নয়।

 

ল্যাংডন পর্দার দিকে তাকালো।

 

একাউন্ট নাম্বার :

১১২৫৮১৩২১

 

কয়েক মুহূর্ত ভেবে ল্যাংডন বুঝতে পারলো সোফি ঠিকই করছে।

 

ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রম।

 

১-১-২-৩-৫-৮-১৩-২১

 

যখন ফিবোনাচ্চি সংখ্যাগুলো দশটি সংখ্যায় আলাদা আলাদা করে মিলিয়ে ফেলা হয়, তখন সেটা দৃশ্যত চেনাই যায় না। সহজেই স্মরণ করা যায়, তারপরও মনে হয়, এলোমেলো। দশসংখ্যার একটা অসাধারণ কোড, যা কখনও সনিয়ে ভুলতেন না।

 

সোফি এন্টার কি-তে চাপ দিয়ে দিলো।

 

কিছুই হলো না।

 

এমন কিছু হলো না, যাতে তারা কিছু বুঝতে পারে।

 

 

 

ঠিক সেই সময়েই, তাদের নিচে, ব্যাংকের ভূ-গর্ভস্থ ভল্টে, একটা রোবটিক হাত জীবন্ত হয়ে উঠলো। হাতটা নির্দিষ্ট জিনিস খুঁজছে। সিমেন্টের ফ্লোরের নিচে, শত শত পরিচিতিমূলক প্লাস্টিকের বাক্স সারি করে সাজানো আছে…অনেকটা ছোট ছোট কফিন যেনো মাটির নিচে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

 

রোবোটিক হাতটা সঠিক বাক্সটা খুঁজে পেয়ে, বাক্সের গায়ে লেখা কোডটা সেই হাতের সাথে লাগোয়া একটা ইলেক্টক চোখ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখলো, নাম্বারটা ঠিক আছে কি না। তারপর কম্পিউটারের নির্দেশে হাতটা একটা বাক্সকে ধরে উপরের দিকে সোজা তুলতে শুরু করলো।

 

ধীরে ধীরে মাটি থেকে বাক্সটা উপরে উঠে আসতে লাগলো…

 

উপরের তলায় সোফি আর ল্যাংডন কনভেয়ার বেল্টটা নড়তে দেখে হাপ ছেড়ে বাঁচলো। বেল্টটার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মনে হলো, অনেক পথ ভ্রমণ করে অবশেষে যে লাগেজের জন্য তারা অপেক্ষা করছে, সেই রহস্যময় লাগেজটাতে কী আছে, সেটা তারা জানে না। কনভেয়ার বেল্টটার স্লাইডিং ডোরটা খুলে যেতেই, একটা প্লাস্টিকের বাক্স আর্বিভূত হলো। সেটা বেল্টের নিচ থেকে উঠে এসেছে। বাক্সটা কালো। খুব ভারি প্লাস্টিকে মোড়ানো, আর সেটা সোফি যে রকম বাক্সের কথা ভেবেছিলো, সেই রকমই। তাতে কোন ছিদ্র নেই।

 

বক্সটা সরাসরি তাদের সামনে এসে থামলো।

 

ল্যাংডন আর সোফি রহস্যময় কন্টেইনারের দিকে তাকিয়ে, সেখানেই নিরবে দাঁড়িয়ে রইলো।

 

এই ব্যাংকের সবকিছুর মতোই বাক্সটাও লোহার কয়ড়া বিশিষ্ট। এর উপরে একটা বারকোড-এর স্টিকার লাগানো আছে। সেটার একটা হাতলও রয়েছে। সোফি ভাবলো, এটা দেখতে অনেকটা বিশাল যন্ত্রপাতি রাখার বাক্সের মতো।

 

কোন সময় নষ্ট না করেই সোফি কয়ড়াটা খুলে ফেললো। তারপর, ল্যাংডনের দিকে তাকালো সে। দুজন এক সাথে ভারি ঢাকনাটা খুলে ফেললো।

 

বাক্সটার ভেতরে তাকালো তারা।

 

প্রথমে সোফি ভেবেছিলো, বাক্সটা খালি। তারপরই সে কিছু একটা দেখতে পেলো। বাক্সটার ঠিক মাঝখানে, একটা জিনিস রাখা আছে।

 

পালিশ করা একটা কাঠের বাক্স, জুতার বাক্সের আকারের। তাতে নক্সা করা রয়েছে। কাঠটা খুবই সুন্দর গভীর বেগুনী রঙের, দানাদার যুক্ত। রোজউড। সোফি বুঝতে পারলো। তার দাদুর প্রিয় জিনিস। ঢাকনাটাতে খুবই সুন্দর করে একটা গোলাপ আঁকা। তারা একে অন্যের দিকে হতভম্ব হয়ে তাকালো। সোফি ঝুঁকে বাক্সটা তুলে নিলো।

 

হায় ঈশ্বর, অনেক ভারি!

 

সে ওটা তুলে পাশের টেবিলটার উপর রাখলো। ল্যাংডন তার পাশে এসে দাঁড়ালো, তাদের দুজনেই সোফির দাদার সেই সেই ছোট্ট জিনিসটার দিকে তাকিয়ে রইলো। এটা ওদের দখলে নেবার জন্যই দাদু তাকে মেসেজ দিয়েছিলেন।

 

ল্যাংডন ঢাকনাটার দিকে বিস্ময়ে চেয়ে রইলো। বিশেষ করে নক্সাটার দিকে পঁচটা পাপড়ির গোলাপ। সে এ ধরনের গোলাপ অনেকবার দেখেছে। পাঁচ পাপড়ির গোলাপ হলো, সে ফিসফিস করে সোফিকে বললো, প্রায়োরিদের হলি গ্রেইলের প্রতীক।

 

সোফি তার দিকে ঘুরে তাকালো। ল্যাংডন বুঝতে পারলো সে কী ভাবছে। সেও একই রকম কথা ভাবছিলো। এই বাক্সটার ডাইমেনশন, এটার ওজন, এবং প্রায়োরিদের হলি গ্রেইল-এর প্রতীক, সবটাই একটি জিনিসকেই বোধগম্য করে তুলে। এই কাঠের বাক্সটার ভেতরে যিশুখৃস্টের পেয়ালা আছে। ল্যাংডন আবারো নিজেকে সুধালো, এটা অসম্ভব।

 

আকারটা যথার্থই, সোফি ফিস্ ফিস্ করে বললো, একটা পেয়ালাকে…ধারণ করার জন্য।

 

এটা পেয়ালা হতেই পারে না।

 

সোফি বাক্সটা খুলে ফেললো। ওটা খুলতেই অপ্রত্যাশিতভাবে, অদ্ভুত গরুগরু শব্দ বের হতে লাগলো। ল্যাংডন সঙ্গে সঙ্গে ভাবলো, এর ভেতরে তরল পদার্থ আছে?

 

সোফিকেও খুব বিভ্রান্ত দেখালো। তুমি কি শুনতে পেয়েছো…?

 

ল্যাংডন মাথা নাড়লো। তরল।

 

একটু সামনে এগিয়ে, সোফি ঢাকনাটা পুরোপুরি খুলে ফেললো। ভেতরের জিনিসটা এমন কিছু, যা ল্যাংডন চিন্তাও করতে পারেনি। একটা জিনিস তারা দুজনে খুব দ্রুতই বুঝতে পারলো যে, নিশ্চিতভাবেই এটা যিশু খৃস্টের পেয়ালা নয়।

 

 

 

৪৫.

 

পুলিশ রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়েছে, ওয়েন্টিং রুমের দিকে যেতে যেতে আদ্রেঁ ভার্নেট বললেন। আপনাদেরকে বের করে দেয়াটা খুব কঠিন কাজ হবে। দরজাটা বন্ধ করতেই ভার্নেট দেখতে পেলেন বিশাল পাস্টিকের বাক্সটা কনভেয়ার বেল্টের উপরে রাখা। হায় ঈশ্বর! তারা সনিয়ের একাউন্টটা খুলে ফেলেছে?

 

সোফি আর ল্যাংডন টেবিলের কাছেই ছিলো, তাদের হাতে ধরা ছিলো একটা কাঠের বাক্স, দেখতে অনেকটা গহনার বাক্সের মতোই। সোফি সাথে সাথেই ঢাকনাটা বন্ধ করে দিয়ে তার দিকে তাকালো। শেষ পর্যন্ত আমরা একাউন্ট নাম্বারটা পেয়েছি, সে বললো।

 

ভার্নেট বাকরুদ্ধ। এখন তো সবকিছুই বদলে গেলো। তিনি সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে বাক্সটার দিকে তাকালেন, চেষ্টা করলেন পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেবেন সেটা বের করতে। তাদেরকে আমার ব্যাংক থেকে বের করতেই হবে! কিন্তু পুলিশ রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়াতে এখন একটি মাত্র পথই খোলা আছে। মাদামোয়াজেল নে আমি যদি আপনাদেরকে ব্যাংক থেকে নিরাপদে বের করে দিতে পারি, তাহলে আপনারা কি এই জিনিসটা নিজেদের সাথেই নেবেন নাকি ব্যাংকের ভল্টে রেখে যাবেন?

 

সোফি ল্যাংডনের দিকে চেয়ে তারপর ভার্নেটের দিকে তাকালো। আমাদের এটা সঙ্গে নিতে হবে।

 

ভার্নেট মাথা নেড়ে সায় দিলেন। খুব ভালো। তাহলে, জিনিসটা যাইহোক, আমি আপনাদেরকে বলবো, এটা আপনার জ্যাকেটে মুড়িয়ে নিন, হলওয়ে দিয়ে যাবার সময় আমি চাইবো কেউ যাতে এটা দেখে না।

 

ল্যাংডন সেটা জ্যাকেটের তলায় নিতেই ভার্নেট তড়িঘড়ি করে কনভেয়ার বেল্টের দিকে গেলো। খালি বাক্সটা বন্ধ করে কি-প্যাডে কী যেনো টাইপ করলো। কনভেয়ার বেল্টটা আবার নড়তে শুরু করলো, নিজের জায়গায় চলে গেলো পাস্টিকের বাক্সটা। পোডিয়াম থেকে সোনার চাবিটা খুলে সোফির হাতে দিয়ে দিলেন তিনি।

 

এই দিকে প্লিজ। তাড়াতাড়ি।

 

তারা এগোতেই টের পেলো নিচে পুলিশ এসে জড়ো হয়েছে। পুলিশের গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখা যাচ্ছে। ভার্নেট চিন্তিত হয়ে পড়লেন। সম্ভবত, তারা পুরো ভবনটা ঘিরে ফেলেছে। আমি কি সত্যি এটা খুলে ফেলবো? ভার্নেট এখন ঘামছেন।

 

ভার্নেট ব্যাংকের ছোট্ট একটা পরিবহন ট্রাকের দিকে এগোলেন। ট্রান্সপোর্ট সুর হলো জুরিখের ডিপোজিটরি ব্যাংকের আরো একটি সার্ভিস। কার্গোটাতে উঠে পড়ন, পেছনের বিশাল স্টিলের দরজাটা খুলে দিয়ে বললেন, আমি আসছি।

 

সোফি আর ল্যাংডন কার্গোর ভেতরে উঠতেই, ভার্নেট ড্রাইভারের অফিসের দিকে চলে গেলেন। ভেতরে ঢুকেই তিনি চাবিটা নিয়ে ড্রাইভারের একটা পোশাক আর টুপি নিয়ে নিলেন। ড্রাইভারের পোশাকটা পরার পর তার কোট, টাই সব ঢাকা পড়ে গেলো। তিনি একটা শোল্ডার হোলস্টারও পরে নিলেন, জামাটার ভেতরে। বের হবার সময় ড্রাইভারের একটা পিস্তল সাথে করে নিয়ে নিলেন। সেটা হোলস্টারের ভরে পোশাকটার বোম লাগিয়ে নিলেন। গাড়িটার কাছে ফিরে এসেই ভার্নেট টুপিটা আরো নামিয়ে দিলেন। সোফি আর ল্যাংডনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তারা কার্গোর ভেতরে রাখা স্টিলের বাক্সের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।

 

আপনারা কি এটা চান, ডানেট বলেই ভেতরে ঢুকে একটা সুইচ টিপলেন, আর সাথে সাথে ভেতরে একটা বা জ্বলে গেলো। আপনারা বসে পড়ন। গেট দিয়ে বের হবার সময় কোন শব্দ করবেন না।

 

সোফি আর ল্যাংডন লোহার ফ্লোরে বসে পড়লো। ল্যাংডন তার জ্যাকেটের ভেতর থেকে বাক্সটা বের করে কোলের ওপর রাখলো। বিশাল দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলো। ভার্নেট তাদেরকে ভেতরে তালা মেরে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে গাড়ির ইঞ্জিনটা চালু করে দিলেন।

 

ট্রাকটা পার্কিং লাইন থেকে বের হয়ে বাইরের দিকে এগোতেই ভার্নেট ঘেমে উঠলেন। তার এইমাত্র পরা টুপিটার নিচেও ঘাম জমে গেছে। তিনি দেখতে পেলেন বাইরে তাঁর ধারণার চেয়েও বেশি পুলিশের গাড়ি পার্কিং লট থেকে বের হতেই দরজাটা আপনা আপনিই খুলে গেলো। ভার্নেট গেট থেকে বের হয়ে একটু থামলেন, পেছনের দরজাটা বন্ধ হবার জন্য অপেক্ষা করলেন। তারপর, তার সামনের গেটটাও খুলে গেলে গাড়িটা নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে গেলেন।

 

ভার্নেট গাড়িটা নিয়ে সামনের দিকে এগোলেন।

 

রাস্তার ব্যারিকেডের সামনে থাকা একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে তার গাড়িটা হাত দিয়ে থামাতে নির্দেশ দিলো। সামনে চারটা প্যাট্রল গাড়ি ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছে।

 

ভার্নেট গাড়িটা থামালেন। ড্রাইভারের টুপিটা টেনে আরেকটু নিচে নামিয়ে নিলেন। দরজাটা খুলে পুলিশের দিকে তাকালেন। লোকটার চেহারা অনমনীয় আর পাণ্ডুর।

 

কুয়েস্ত সি কুই সে পাস? ভার্নেট জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর কণ্ঠ খুব রুক্ষ্ম।

 

জো সুই জোরো কোলেত, লোকটা বললো। লেফতেনান্ত পুলিশ জুডিশিয়ার। সে কার্গোর দরজার দিকে এগোলো, কুয়েস্ত-সি কুইল আ লো দেদান?

 

আমি কী করে জানবো, ভার্নেট কর্কশ ফরাসিতে জবাব দিলেন। আমি কেবলমাত্র একজন ড্রাইভার।

 

কোলেতকে দেখে মনে হলো জবাবটা শুনে সে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। আমরা দুজন অপরাধীকে খুঁজছি।

 

ভার্নেট হাসলেন। তাহলেতো আপনি সঠিক জায়গায়ই এসেছেন। আমি যেসব লোকের টাকা বহন করি, সেই সব বানচোতদের অনেকেই অপরাধী।

 

লোকটা রবার্ট ল্যাংডনের একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি বের করে দেখালো। আজ রাতে এই লোকটা কি আপনাদের ব্যাংকে এসেছিলো?

 

ভার্নেট কাঁধ ঝাঁকালো। আমি হলাম আদার ব্যাপারি, জাহাজের খবর রাখি না। তারা আমাকে গ্রাহকদের কাছে ঘেষতে দেয় না। আপনি ভেতরে যান, ফ্রন্ট ডেস্কে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন।

 

আপনার ব্যাংক ভেতরে ঢোকার আগে আমাদের কাছে সার্চ-ওয়ারেন্ট দাবি করছে।

 

ভার্নেট মুখে একটা তিক্তভাব আনলেন। প্রশাসকরা। আমাকে বলে লাভ নেই।

 

আপনার ট্রাকের দরজাটা খুলুন, প্লিজ। কোলেত কার্গোর দরজার দিকে ইঙ্গিত করলো।

 

ভার্নেট কোলেতের দিকে তাকিয়ে জোর করে একটা বিশ্রী হাসি হাসলেন। দরজা খুলবো? আপনার ধারণা, আমার কাছে চাবি আছে? আপনার কি মনে হয়, তারা আমাদেরকে বিশ্বাস করে? আপনি আমার বেতনের খাতাটা দেখতে পারেন।

 

কোলেতের মাথাটা একদিকে হেলে গেলো, সন্দেহের চিহ্ন এটা। আপনি বলছেন আপনার নিজের ট্রাকের চাবি আপনার কাছে নেই?

 

ভার্নেট মাথা ঝাঁকালেন। এইসব গাড়ির দরজা লোডিং-ডকের ড্রাইভার কর্তৃক সিল মারা হয়। তারপর, অন্য কেউ চাবিটা নিয়ে যায় গন্তব্যে। গ্রাহকের কাছে চাবিটা পৌঁছানোর পর, তারা আমাদেরকে ফোন করে জানালে, আমরা গাড়িটা চালিয়ে ওখানে নিয়ে যাই। তার এক সেকেন্ড আগেও না। আমি কী বহন করছি সে সম্পর্কে কখনই কিছু জানতে পারি না।

 

এই ট্রাকটা কথন বন্ধ করা হয়েছে?

 

এক ঘণ্টা আগেতো হবেই। আমি যাচ্ছি সেন্ট থুরিয়ালে। চাবিটা ইতিমধ্যেই ওখানে পৌঁছে গেছে।

 

এজেন্ট লোকটা কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না, তার চোখ ভার্নেকে খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখছে, তাঁর ভাবনা-চিন্তা ধরার চেষ্টা করছে।

 

কপাল বেয়ে ঘামের ফোটা ভার্নেটের নাক দিয়ে পড়তে যাচ্ছিলো। যদি কিছু মনে না করেন? হাতে কাপড় দিয়ে নাকের ঘাম মুছে তিনি বললেন, পুলিশের ব্যারিকেডের দিকে ইঙ্গিত করলেন। আমি খুবই টাইট শিডিউলে আছি।

 

আপনাদের সব ড্রাইভারই কি রোলেক্স ঘড়ি ব্যবহার করে থাকে? এজেন্ট জিজ্ঞেস করলো, ভার্নেটের হাতের দিকে ইঙ্গিত করলো সে।

 

ভার্নেট তার হাতের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন তাঁর অত্যন্ত মূল্যবান ঘড়িটা, জ্যাকেটের হাতা থেকে বের হয়ে গেছে। মার্দে। এই শালার জিনিসটা? সেন্ট জার্মেইন দে প্রেস-এর এক তাইওয়ানি ভ্রাম্যমান বিক্রেতাদের কাছ থেকে বিশ ইউরো দিয়ে কিনেছিলাম। আমি এটা আপনার কাছে চল্লিশ ইউরোতে বেঁচতে পারি।

 

এজেন্ট একটু থেমে, শেষে সরে দাঁড়ালো। ধন্যবাদ, লাগবে না। আপনার ভ্রমণ নিরাপদ হোক।

 

ট্রাকটা রাস্তায় নেমে পঞ্চাশ মিটার পর্যন্ত যাওয়ার আগে ভার্নেট নিঃশ্বাস নিতে পারছিলেন না। এখন তার আরেকটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাঁর কার্গো। কোথায় আমি তাদেরকে নিয়ে যাবো?

 

 

 

৪৬.

 

সাইলাস তার ঘরে ক্যানভাস ম্যাটের ওপরে উপুড় হয়ে শুয়ে পিঠের ক্ষতটা বাতাসে শুকাতে দিলো। আজ রাতের দ্বিতীয় দফা আচারের ফলে তার শরীর আড়ষ্ট আর দুর্বল হয়ে গেছে। তারপরেও সে সিলিস বেল্টটা খোলেনি। টের পেলো, তার ঊরু চুইয়ে রক্ত ঝড়ছে। তারপরেও সেটা বলে ফেলার কোন কারণ দেখতে পেলো না।

 

আমি চার্চকে ব্যর্থ করে দিয়েছি। তার চেয়েও বেশি খারাপ ব্যাপার হলো, আমি বিশপকে ব্যর্থ করে দিয়েছি।

 

আজ রাতটা হতে পারতো বিশপ আরিঙ্গারোসার মোক্ষ লাভের রাত। পাঁচ মাস আগে, বিশপ আরিঙ্গাবোসা ভ্যাটিকানের অবজারভেটরি থেকে ফিরে এসেছিলেন, সেখানে তিনি এমন কিছু জেনে এসেছিলেন, যা তাঁকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছিলো। কয়েক সপ্তাহ ধরে বিষণ্ণ থেকে আরিঙ্গাবোসা খবরটা সাইলাসকে বলেছিলেন।

 

কিন্তু এটা অসম্ভব। সাইলাস চিৎকার করে বলেছিলো। আমি এটা মেনে নিতে পারছি না!

 

এটা সত্যি, আরিঙ্গাবোসা বলেছিলেন। অচিন্তনীয়, কিন্তু সত্য। মাত্র ছয় মাসে।

 

বিশপের কথাটা সাইলাসকে আতংকিত করে ফেলেছিলো। তিনি পরিত্রাণের জন্য প্রার্থনা করলেন, এমনকি সেইসব ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনেও ঈশ্বর এবং দ্য ওয়ের প্রতি তাঁর আস্থা একটুও টলতে পারেনি। মাত্র একমাস পরেই, অলৌকিকভাবেই, মেঘগুলো কাটতে শুরু করে আলোর সম্ভাবনা উঁকি মারলো।

 

স্বর্গীয় হস্তক্ষেপ, আরিজারোসা এটাকে এ নামেই ডাকলেন।

 

মনে হলো এই প্রথম, বিশপ খুব আশাবাদী হলেন। সাইলাস, তিনি নিচু স্বরে বললেন, ঈশ্বর দ্য ওয়েকে রক্ষা করার জন্য আমাদের উপর একটা সুযোগ বর্ষণ করেছে। অন্যান্য যুদ্ধের মতোই, আমাদের যুদ্ধেও আত্মত্যাগের দরকার রয়েছে। তুমি কি ঈশ্বরের সৈনিক হবে?

 

সাইলাস, যে লোকটা তাকে নতুন জীবন দিয়েছে, সেই বিশপের সামনে হাটু গেঁড়ে বসে পড়েছিলো। সে বলেছিলো, আমি ঈশ্বরের একটি মেষ শাবক। আপনার হৃদয় যা বলে, তা দিয়ে আমাকে চড়িয়ে বেড়ান।

 

যখন আরিঙ্গারোসা তাঁর সামনে যে সুযোগটা উপস্থিত হয়েছে, সেটা খুলে বললেন, সাইলাসের স্থির বিশ্বাস জন্মালো, এটা ঈশ্বরের নিজ হাতেরই কাজ। অলৌকিক ভাগ্য! আরিঙ্গাবোসা সাইলাসকে সেই লোকের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন, যে এই পরিকল্পনাটার প্রস্তাব করেছে লোকটা নিজেকে একজন টিচার হিসেবে পরিচয় দিলো। যদিও টিচার আর সাইলাস কখনও মুখখামুখি হয়নি। সব সময়ই তারা ফোনে কথা বলতো। সাইলাস টিচারের প্রগাঢ় ধর্ম বিশ্বাস এবং ক্ষমতার উপর আস্থাশীল হলো। মনে হলো, টিচার এমন একজন ব্যক্তি যিনি, সব জানেন, সবখানেই তার চোখ আর কান পাতা আছে। কীভাবে টিচার তথ্য যোগাড় করেন, সে সম্পর্কে সাইলাস কিছুই জানতো না। আরিঙ্গারোসা টিচারের উপর প্রচণ্ড আস্থাশীল ছিলেন এবং সাইলাসকে বলেছিলেন, তাঁর মতোই আস্থাশীল হতে। টিচার তোমাকে যা আদেশ করেন তা-ই কোরো। বিশপ সাইলাসকে বলেছিলেন, এতে করেই আমরা জয়ী হবো।

 

বিজয়ী! সাইলাস এখন খালি ফ্লোরটার দিকে চেয়ে আতংকিত হলো যে, জয় বোধহব সূদুরপরাহত। টিচারের সাথে চালাকি করা হয়েছে। কি-স্টোন একটা কানা গলি। আর ছল-চাতুরীর ফলে তাদের সব আশা উবে গেছে।

 

সাইলাস বিশপকে ফোন করতে চাইছিলো তাকে সর্তক করার জন্য, কিন্তু টিচার আজ রাতে সব রকম যোগাযোগের লাইনই গুটিয়ে ফেলেছেন। আমাদের নিরাপত্তার জন্যই।

 

শেষে সাইলাস হামাগুড়ি দিয়ে দড়িটা খুঁজে পেলো। সেটা মাটিতেই পড়েছিলো। সে তার পকেট থেকে সেল ফোনটা বের করে আনলো। লজ্জায় মাথা নত করে সে ডায়াল করলো।

 

টিচার, সে ফিস ফিস করে বললো, সব শেষ হয়ে গেছে। সাইলাস তাঁকে সত্য-সত্যই বললো, কীভাবে সে প্রতারণার শিকার হয়েছে।

 

তুমি তোমার বিশ্বাস খুব দ্রুতই হারাচ্ছো, টিচার জবাব দিলেন। আমি এইমাত্র সংবাদটা পেয়েছি। খুবই অপ্রত্যাশিত এবং ভালো। সিক্রেটটা এখনও বেঁচে আছে। জ্যাক সনিয়ে মারা যাবার আগে সেটা হস্তান্তর করে গেছেন। আমি তোমাকে শীঘ্রই ফোন করবো। আজ রাতে, আমাদের কাজটা এখনও সমাপ্ত হয়নি।

 

 

 

৪৭.

 

মৃদু আলোর বদ্ধ কার্গোর ভেতরটা যেনো অনেকটা ভ্রাম্যমান জেলখানা। ল্যাংডনের অতি পরিচিত আবদ্ধ জায়গার অস্বস্তিটা ভর করলো এখানে। ভার্নেট বলেছিলেন, তিনি আমাদেরকে শহরের বাইরে নিরাপদ কোথাও নিয়ে যাবেন। কোথায়? কতো দূরে?

 

হাটু মুড়ে লোহার ফ্লোরে বসে থাকার দরুণ, ল্যাংডনের পা দুটো আড়ষ্ট হয়ে গেলো। সে একটু নড়ে চড়ে বসলো, টের পেলো তার শীরের নিমাংশ থেকে রক্ত ঝড়ছে। দুহাতে, এখনও সে ব্যাংক থেকে তুলে নেয়া অদ্ভুত গুপ্তধনটা ধরে রেখেছে।

 

আমার মনে হচ্ছে, আমরা এখন হাইওয়েতে আছি, সোফি নিচু স্বরে বললো।

 

ল্যাংডনেরও তা-ই মনে হচ্ছিলো। ট্রাকটা যখন ব্যাংকের সামনে একটু থেমেছিলো, সেই মুহূর্তটা ছিলো স্নায়ু বিধ্বংসী। তারপর থেকে সেটা ছুটছে তো ছুটছেই। মিনিট দুয়েক পরপর, হয় ডানে কিংবা বায়ে মোড় নিচ্ছে। আর এখন মনে হচ্ছে, সবোর্ড গতিতে আছে। তাদের নিচে বুলেটপ্রুফ টায়ারটা শশা শো করছে। তার হাতে ধরা রোজউড বক্সটার দিকে সব মনোযোগ তাদের। ল্যাংডন জিনিসটা ফ্লোরে নামিয়ে রাখতেই সোফি তার পাশে এসে বসলো। ল্যাংডনের হঠাৎ করেই মনে হলো, তারা দুজন বাচ্চা ছেলে-মেয়ে, ক্রিসমাসের উপহার ভোলার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করছে।

 

রোজউড বাক্সটার গায়ের রঙের সাথে বৈচিত্র রেখে খোঁদাই করা গোলাপটা ছাই রঙের, যা মৃদু আলোতেও দেখা যাচ্ছে। গোলাপ। সমগ্র সেনাবাহিনী আর ধর্মমতগুলো এই প্রতীকটার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যেমনটি হয়েছে গুপ্ত সোসাইটির ক্ষেত্রে। দ্য রোসিশিয়ান্স। দ্য নাইটস্ অব দি রোজি ক্রুশ।

 

থামলে কেন, সোফি বললো। খোলো।

 

ল্যাংডন গভীর একটা নিঃশ্বাস নিয়ে নিলো। ঢাকনাটার ওপর হাত রেখে আরেকবার চোরা চোখে সে কাঠের নক্সা করা কাজটার দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর সেটা খুলে ফেলে ভেতরের জিনিসটা উন্মোচিত করলো।

 

এটার ভেতরে কী আছে, এই নিয়ে ল্যাংডন একাধিক ফ্যান্টাসিতে আক্রান্ত হয়েছিলো। কিন্তু পরিষ্কারভাবেই তার সবগুলো ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। ভেতরে সিল্ক কাপড়ে পেঁচানো একটা কিছু আছে, যা সে কল্পনাও করেনি।

 

সাদা পালিশ করা মার্বেলের কারুকাজ খচিত। পাথরের চোঙা জাতীয় একটা জিনিস। এর ব্যস হবে, আনুমানিক একটা টেনিস বলের সমান। একাধিক অংশ জোড়া লাগানো একটা চোঙা, অভিন্ন পাথরে তৈরি নয় সেটা। চোঙাটা অনেকগুলো অংশ জোড়া লাগিয়ে বানানো হয়েছে। পাঁচটা পুরু মার্বেলের চাকতি, একটার সাথে আরেকটা লাগিয়ে নেয়া হয়েছে। অনেকটা একাধিক চাকা বিশিষ্ট একটা কেলিডোস্কোপের মতো। চোঙাটার দুমাথাই ক্যাপ দিয়ে আঁটকানো, সেগুলোও মার্বেলের, তাই ভেতরটা দেখা একেবারেই অসম্ভব। ভেতরে তরল জাতীয় কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে। তাই ল্যাংডন বুঝতে পারলো, ভেতরটা ফাঁপা।

 

এই রহস্যময় আকৃতির চোঙাটার গায়ে খোঁদাই করা একটা নক্সার দিকে ল্যাংডনের মনোেযোগ আকর্ষিত হলো। পাঁচটা চাকতির প্রতিটাই খুব যত্ম করে বিভিন্ন অক্ষরের সারি খোঁদাই করা আছে ইংরেজির পুরো বর্ণমালা। চোঙার অক্ষরগুলো ল্যাংডনের ছেলেবেলার একটা খেলনার কথা মনে করিয়ে দিলো।

 

অদ্ভুত, তাই না? সোফি নিচু স্বরে বললো।

 

ল্যাংডন তার দিকে তাকালো। আমি জানি না, এটা কি জিনিস?

 

সোফির চোখে একটা দ্যুতি দেখা গেলো। আমার দাদু এ ধরনের কারুকাজ করতেন, এটা তার শখ ছিলো। এগুলো লিওনার্দো দা ভিঞ্চির উদ্ভাবন।

 

এই স্বল্প আলোতেও সোফি ল্যাংডনের অবাক হওয়াটা দেখতে পেলো।

 

দা ভিঞ্চি? সে বিড়বিড় করে বললো। জিনিসটার দিকে আবারো তাকালো।

 

হ্যাঁ। এটাকে ক্রিপটেক্স বলে। আমার দাদুর মতে, এটার নক্সাটা দা ভিঞ্চির গোপন ডায়রি থেকে নেয়া হয়েছে।

 

এটা কিসের জন্য?

 

আজকের রাতের ঘটনাগুলো বিবেচনা করলে, সোফি জানতো, উত্তরটা খুবই মজার হবে। এটা একটা ভল্ট, সে বললো। গোপন তথ্য রাখার।

 

ল্যাংডনের চোখ দুটো বড় হয়ে গেলো।

 

সোফি ব্যাখ্যা করে বোঝালো যে, দা ভিঞ্চির মডেলগুলো তৈরি করাটা তার দাদুর প্রিয় একটা শখ ছিলো। তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান কর্মকার, যিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঠ আর লোহা-লক্কর নিয়ে সময় কাটাতেন। জ্যাক সনিয়ে দক্ষ কর্মকারদেরকে অনুকরণ করতেনফাবার্জ, এসোর্টেড ক্লোইজোন আর্টিজানদের। কিন্তু খুব বেশি অনুকরণ করতেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চিকে। এমন কি দা ভিঞ্চির জার্নালাগুলোতে এক ঝলক দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেও, এটা প্রতীয়মান হবে যে, কেন একজন জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে তিনি বিখ্যাত ছিলেন, যেমনটা তিনি ছিলেন তাঁর অসাধারণত্বের জন্যও। দা ভিঞ্চি শত শত নক্সা এঁকে ছিলেন এমনসব জিনিসের, যা তিনি কখনওই নির্মাণ করেননি। জ্যাক সনিয়ের সময় কাটানোর মধ্যে অন্যতম ছিলো দা ভিঞ্চির কুয়াশাচ্ছন্ন মস্তিকের স্রোতধারাকে জীবন দেয়া সময় খণ্ডিত করা, পানির পাম্প, ক্রিপটেক্স, এমনকি মধ্য যুগের ফরাসি নাইটদের নিখুঁত মডেল, যা এখন তার অফিসের ডেস্কে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। এটা দা ভিঞ্চি ১৪৯৫ সালে নক্সা করেছিলেন, যে সময়টাতে তিনি এনাটমির উপরে কাজগুলো করছিলেন। রোবোট নাইটের ভেতরকার কলকজাগুলো ছিলো নিখুঁত জয়েন্ট। সেটা বসতে আর হাত-পা নাড়তে পারে, সেই সাথে নড়নচড়ন সক্ষম কাধের সাহায্যে মাথাও ঘোরাতে পারে। চোয়ালও ভোলা যায় একদম নিখুঁতভাবে। সোফি সবসময় বিশ্বাস করতো, এই বর্ম-পরিহিত নাইটটা তার দাদুর তৈরি সবচাইতে সুন্দর জিনিস…সেটা অবশ্য রোজউড বাক্সের ক্রিপ্টেক্সটা দেখার আগে।

 

তিনি আমাকে এরকম একটা জিনিস তৈরি করে দিয়েছিলেন, যখন আমি ছোট ছিলাম,  সোফি বললো। তবে এরকম নক্সওয়ালা আর বড় কখনও দেখিনি।

ল্যাংডনের চোখটা বক্সটা থেকে একটুও সরছে না। আমি ক্রিপ্টেক্স সম্পর্কে কখনও কিছু শুনিনি।

 

সোফি অবাক হলো না। লিওনার্দোর বেশিরভাগ অ-নির্মীয়মান উদ্ভাবনগুলো কখনই স্টাডি করা হয়নি, অথবা ওগুলোর নামও দেয়া হয়নি। ক্রিপেক্স শব্দটা খুব সম্ভবত, তার দাদুরই দেয়া। তথ্য সুরক্ষার জন্য ক্রিপ্টোলজি আর কোডেক্স শব্দ দুটোর সম্মিলন বলা যায়।

 

দা ভিঞ্চি ক্রিপ্টোলজির একজন অগ্রদূত ছিলেন, সোফি সেটা জানতো, যদিও এ ব্যাপারে তাকে খুব কমই কৃতিত্ব দেয়া হয়। সোফির বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্ট্রাক্টর যখন তথ্য নিরাপত্তার জন্য কম্পিউটার এনক্রিপশন পদ্ধতি উপস্থাপন করেছিলেন, তখন আধুনিক ক্রিপ্টোলজিস্ট, যেমন জিমার ম্যান এবং স্নেইয়ারদেরকে প্রশংসা করেছিলেন কিন্তু এটা উল্লেখ করেননি যে, লিওনার্দোই শত শত বছর আগে, সংকেতিক বার্তার মর্মোদ্ধারের প্রথম পাবলিক কির নিয়ম উদ্ভাবন করেছিলেন। সোফির দাদুই সেই লোক যে তাকে এসব বলেছিলেন।

 

তাদের ট্রাকটি হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যেতেই সোফি ল্যাংডনকে ব্যাখ্যা করলো, দা ভিঞ্চির ক্রিপ্টেক্স-ই বহুদূরে বার্তা পাঠানোর নিরাপত্তা বিষয়ক জটিলতার সমাধান দিয়েছিলো। টেলিফোন অথবা ই-মেইলবিহীন যুগে, কেউ যদি নিজের বার্তাটি সম্পূর্ণ গোপনে এবং নিরাপদে পাঠাতে চাইতো, তখন সেটা কোন কিছুর উপর লেখা ছাড়া গত্যন্তর ছিলো না। তারপর, একজন বিশ্বস্ত বার্তাবাহকের উপরই তাকে নির্ভর করতে হতো। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, যদি বার্তাবাহক আঁচ করতে পারতো যে, বার্তার মধ্যে কোন মূল্যবান তথ্য আছে, তখন সে উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সেটা চড়া মূল্যে বিক্রি করে লাভবান হতে পারতো।

 

ইতিহাসের অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি তথ্য-সুরক্ষার নিমিত্তে ক্রিপ্টোলজিক উদ্ভাবন করেছিলেন : জুলিয়াস সিজার এক ধরনের কোড-লেখনীর প্রচলন করেছিলেন, যা সিজার বক্স নামে ডাকা হোততা; স্কটল্যান্ডের রাণী ম্যারি এক ধরনের বিকল্প সংকেত তৈরি করে কারাগার থেকে গুপ্তসংগঠনে সেটা প্রেরণ করেছিলেন; আর প্রতিভাবান আরবীয় বিজ্ঞানী আবু ইউসুফ ইসমাইল আল কিন্দি তার গোপনীয়তা রক্ষা করেছিলেন এক ধরনের ভিন্নধর্মী বর্ণের সাহায্যে সংকেত তৈরির মাধ্যমে।

 

দা ভিঞ্চি, প্রকারন্তরে, যান্ত্রিক উপায়ে বার্তার সুরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেটা হলো ক্রিপ্টেক্স। একটা বহনযোগ্য আধার, যা অক্ষর, মানচিত্র, ডায়াগ্রাম, এবং যা কিছুই হোক না, সেগুলোর সুরক্ষা করে। একবার ক্রিপ্টেক্স-এর ভেতরে কোন তথ্য ঢুকিয়ে সিল করে দিলে, শুধুমাত্র যথার্থ পাসওয়ার্ড জানা লোকের পক্ষেই তা বের করে আনা সম্ভব ছিলো।

 

আমাদের একটা পাসওয়াডের দরকার, অক্ষর সংবলিত ডায়ালের দিকে ইঙ্গিত করে সোফি বললো। একটা ক্রিপ্টেক্স কাজ করে অনেকটা বাইসাইকেল কম্বিনেশন লকের মতো। তুমি যদি ডায়ালগুলো ঠিক মতো অবস্থানে আনতে পারো, তবে তালাটা খুলে যাবে। ক্রিপ্টেক্সটার পাঁচটা ডায়াল আছে। ঠিক মতো মেলাতে পারলেই পুরো চোঙাটা খুলে যাবে।

 

আর ভেতরে?

 

চোঙাটা খুলে গেলে, তুমি একটা ফাঁপা কম্পার্টমেন্ট পাবে, যাতে একটা কাগজ মোড়ানো থাকবে, সেটাতেই তথ্যগুলো লেখা থাকে।

 

ল্যাংডনকে দেখে মনে হলো সন্দেহগ্রস্ত। তুমি বলছিলে তোমার দাদু এসব বানিয়েছেন, যখন তুমি ছোট ছিলে?।

 

হ্যাঁ, ছোট আকাড়ের একটা। আমার জন্ম দিনে তিনি আমাকে একটা ত্রিপ্টেক্স আর একটা ধাঁধা দিতেন। ধাঁধার উত্তরটাই ছিলো ক্রিপ্টেক্সের পাসওয়ার্ড। আর সেটা করতে পারলে আমি ক্রিপ্টেক্সটা খুলে এর ভেতরে একটা কার্ড পেতাম।

 

একটা কার্ডের জন্য খুব বেশি খাটুনি হয়ে গেলো না।

 

না, কার্ডে আরো একটা ধাঁধা অথবা কু থাকতো। আমার দাদু সারা বাড়িতে গুপ্তধন রেখে দিতেন। ধাঁধা আর কুর মধ্য দিয়ে আমি আমার সত্যিকারের উপহারটা খুঁজে পেতাম। বলা চলে, পরীক্ষা আর প্রতিযোগীতার ভেতর দিয়ে আমি উপহারগুলো পেতাম। আর পরীক্ষাগুলো মোটেও সহজ ছিলো না।

 

ল্যাংডন বস্তুটার দিকে আবারো তাকালো। তাকে এখনও সন্দেহগ্রস্তই মনে হলো। কিন্তু এটা ভেঙে ফেলে কি সম্ভব নয়? অথবা গুড়িয়ে দিয়ে? ধাতুটা মনে হচ্ছে নাজুক, আর মার্বেল হলো নরম পাথর।

 

সোফি হাসলো। যেহেতু, দা ভিঞ্চি ছিলেন খুবই স্মার্ট, তাই তিনি এটা এমনভাবে তৈরি করেছেন, যাতে ভেঙে ফেললে ভেতরের তথ্যটা ধ্বংস হয়ে যায়। দ্যাখ্যো। সোফি বাক্সটা থেকে চোঙাটা বের করে আনলো। এটার ভেতরে কিছু লিখে ভরতে হলে, প্রথমে সেটা প্যাপিরাসেই লিখতে হবে।

 

ভেড়ার চামড়ায় নয়?

 

সোফি মাথা ঝাঁকালো। প্যাপিরাস। আমি জানি ভেড়ার চামড়া বেশি দিন টেকে আর সে সময়ে ওগুলো খুব সহজলভ্যও ছিলো, কিন্তু এটা প্যাপিরাসেই হতে হবে। পাতলা হলেই ভালো।

 

ঠিক আছে।

 

ক্রিপ্টেক্সের ভেতরে প্যাপিরাসটা ঢোকাবার আগে সেটা রোল করে একটা কাঁচের টিউবের ভেতরে ঢোকানো হয়। সে ক্রিপ্টেক্সটা ঝাকিয়ে এর ভেতরের তরল পদার্থটির শব্দ শোনালো। এর ভেতরে তরল পদার্থ আছে।

 

জিনিসটা কি?

 

সোফি হাসলো। ভিনেগার।

 

ল্যাংডন কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করার পর মাথা নেড়ে সায় দিলো। অসাধারণ।

 

ভিনেগার আর প্যাপিরাস, সোফি ভাবলো। কেউ যদি জোর করে ক্রিপ্টেক্সটা খুলতে যায়, কাঁচের টিউবটা তবে ভেঙে যাবে, আর ভিনেগার সঙ্গে সঙ্গেই প্যাপিরাসকে ভিজিয়ে দেবে। সুতরাং গোপন বার্তাটা কেউ পড়তে চাইলে, সেটা একটা অর্থহীন মণ্ড ছাড়া আর কিছুই পাবে না।

 

দেখতেই পাচ্ছো, সোফি তাকে বললো, এটার মুখটা ঠিকভাবে খুলতে চাইলে পাঁচ অক্ষরবিশিষ্ট একটা পাসওয়ার্ডের দরকার। আর পাঁচটা ডায়ালের প্রতিটাতে রয়েছে ছাব্বিশটি অক্ষর। সে খুব দ্রুত হিসাব করে নিলো। আনুমানিক বারো মিলিয়ন সম্ভাবনা।

 

যদি তাই হয়, ল্যাংডন বললো, দেখে মনে হলো তার মাথার ভেতরে বারো মিলিয়ন প্রশ্ন খেলে যাচ্ছে। তবে তোমার কি মনে হয়, এটার ভেতরে কি তথ্য থাকতে পারে?

 

সে যা-ই হোক, আমার দাদু নিশ্চিতভাবেই চাইছিলেন সেটা গোপন রাখতে। সে একটু থামলো। ঢাকনাটা বন্ধ করে সেটার উপরে পাঁচ পাপড়ি বিশিষ্ট গোলাপটার দিকে তাকালো। কিছু একটা তাকে খুঁচিয়ে যাচ্ছিলো। তুমি কি বলেছিলে যে, গোলাপ হলো গ্রেইলের প্রতীক?

 

একদম ঠিক। প্রায়োরিদের কাছে গোলাপ আর গ্রেইল একই জিনিস।

 

সোফি তার ভুরু কপালে তুললো। এটা খুব অদ্ভুত, কারণ আমার দাদু সবসময় আমাকে বলতেন যে, গোলাপ মানে গোপনীয়তা। তিনি বাড়িতে থাকার সময় যখন ভেতরে কারো সাথে খুব গোপনীয় কোন ফোন করতেন, এবং চাইতেন না আমি তাকে বিরক্ত করি, তখন তার অফিস ঘরের দরজায় একটা গোলাপের প্রতীক ঝুলিয়ে রাখতেন। তিনি আমাকেও এরকমটি করতে উৎসাহ দিতেন। সুইটি, তার দাদু তাকে বলতেন, আমরা একে অন্যের দরজায় তালা না মেরে বরং গোলাপ প্রতীকটা ঝুলিয়ে রাখতে পারিলা ফ্লার দে সিক্রেট যখন আমাদের গোপনীয়তার দরকার হবে। এভাবে আমরা একে অন্যেকে সম্মান এবং বিশ্বাস করতে শিখতে পারবো। গোলাপ ঝুলানোটা প্রাচীন রোমের একটা রীতি।

 

সাব রোসা, ল্যাংডন বললো। রোমানরা কোন সভায় গোলাপ ঝুলিয়ে রাখলে সবাই বুঝতে সভাটা খুব গোপনীয়। উপস্থিত সবাই বুঝতো যে, গোলাপের অধীনে যা বলা হবে সাব রোসার নিচে তা গোপন রাখতে হবে।

 

ল্যাংডন খুব দ্রুত ব্যাখ্যা করে বললো, প্রায়োরিরা গ্রেইলের প্রতীক হিসেবে গোলাপকে কেবল গোপনীয়তার জন্যই বেছে নেয়নি। রোসা রুগোসা হলো গোলাপের সবচাইতে প্রাচীন একটা প্রজাতি, যার পাঁচটি পাপড়ি পঞ্চভূজের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ঠিক গাইডিং-স্টার ভেনাসের মতো। এজন্যেই, গোলাপ নারীত্বের প্রতিমূর্তি হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। তাছাড়াও, সত্যিকারের দিক নির্দেশনার ধারণার সাথেও গোলাপের সংযোগ রয়েছে। কম্পাস-রোজ ভ্রমণকারীদের পথ দেখানোর কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ঠিক যেমনটি মানচিত্রে দ্রাঘিমাংশের কাজ রোজ লাইন করে থাকে। এই কারণেই, গোলাপকে গ্রেইলের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন দিক থেকেই বিবেচনা করা হয়—গোপনীয়তা, নারীত্ব, আর দিক-নির্দেশনা নারী পেয়ালা এবং গাইডিং-স্টার যা গোপন-সত্যের দিকে নিয়ে যায়।

 

ল্যাংডন তার ব্যাখ্যা শেষ করতেই, আচমকা তার অভিব্যক্তিটা শক্ত হয়ে গেলো।

 

রবার্ট? তুমি কি ঠিক আছে?

 

তার চোখ রোজউড বক্সের উপর স্থির। সাব…রোসা, সে বিড়বিড় করে বললো, একটা ভীতিকর অভিব্যক্তি তার চেহারায় ছড়িয়ে পড়লো। এটা হতে পারে না।

 

কি?

 

ল্যাংডন ধীরে ধীরে তার চোখ তুলে তাকালো। গোলাপের প্রতীকটার নিচে, সে বিড়বিড় করে বললো। এই ক্রিপ্টেক্সটা…আমার মনে হয়, এটা কি, তা আমি জানি।

 

 

 

৪৮.

 

ল্যাংডন সবেমাত্র নিজের ধারণাটায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, তার পরও, বিবেচনা করছে কে তাদেরকে এই চোঙাটা দিয়েছে, কীভাবে সেটা তাদেরকে দিয়েছে। এখন বাক্সটার ওপরে আঁকা গোলাপটা দেখে ল্যাংডন একটা উপসংহারেই পৌঁছাতে পারলো।

 

আমি প্রায়োরি কি-স্টোন ধরে রেখেছি।

 

কিংবদন্তীটা খুবই যথার্থ।

 

কি-স্টোন হলো এক ধরনের কোডবদ্ধ পাথর যা গোলাপ প্রতীকের নিচে রাখা আছে!

 

রবার্ট? সোফি তাকে দেখছিলো। কি হচ্ছে বলোতো?

 

ল্যাংডন তার ভাবনাগুলো সমন্বিত করার জন্য কিছু সময় নিলো। তোমার দাদু কি কখনও তোমাকে লা ক্লেফ দ্য ভূত সম্পর্কে কিছু বলেছিলো?

 

সিন্দুক, মানে ভল্টের চাবি? সোফি অনুবাদ করে নিলো।

 

না, এটাতো হলো আক্ষরিক অনুবাদ। ক্লেফ দ্য ভুত হলো একটা সাধারণ স্থাপত্য বিষয়ক পদবাচ্য। ভুত মানে ব্যাংকের ভল্ট নয়। এটার অর্থ হলো খিলানযুক্ত পথের ভেতরে একটা ভল্ট, যেমন গম্বুজওয়ালা ছাদ।

 

কিন্তু গম্বুজওয়ালা ছাদের তো চাবি থাকে না।

 

সত্যি বলতে কী, থাকে। প্রতিটি পাথরে তৈরি গম্বুজওয়ালা ছাদেরই একটা কেন্দ্র থাকে, যাকে বলে কীলকাকর পাথর, একেবারে উপরে থাকে সেটা, বাকি টুকরোগুলোকে এক সঙ্গে সংযুক্ত করে সমস্ত ভরটা বহন করে থাকে। এই পাথরটাকেই স্থাপত্যকলায় বলা হয় খিলানের চাবি বা ভল্ট-কি। ইংরেজিতে এই জিনিসটাকেই আমরা কি-স্টোন বলি। ল্যাংডন সোফির চোখের দিকে তাকালো কথাটার কোন স্বীকৃতি তাতে ঝলক দিচ্ছে কিনা সেটা দেখার জন্য।

 

সোফি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ক্রিপ্টেক্সের দিকে তাকালো। কিন্তু এটা মোটেও কোন কি স্টোন নয়।

 

ল্যাংডন জানে না কোথেকে শুরু করবে। ভবন নির্মাণের ব্যাপারে কি-স্টোন হলো একটি ম্যাসনারি কৌশল, আর এটা ম্যাসোনিক ভ্রাতৃসংঘের প্রথমদিকে সবচাইতে গুপ্তবিদ্যা হিসেবে বজায় ছিলো। রয়্যাল আর্চ ডিগ্রি। স্থাপত্য। কি-স্টোন। সবগুলোই একটার সাথে আরেকটা সংযুক্ত। কি-স্টোন দিয়ে গম্বুজ বানানোর গুপ্তবিদ্যাটা ম্যাসন ভায়েদেরকে যথেষ্ট পরিমাণে সম্পদশালী কারিগর বানিয়েছিলো, আর তারাও এটাকে গোপন রেখেছিলো দীর্ঘদিন। তারপরও, রোজউড বক্সের কি-স্টোনটা আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি জিনিস। প্রায়োরি কি-স্টোনটা—তারা এখন যেটা ধরে রেখেছে সেরকম যদি কিছু থেকে থাকে ল্যাংডন যেমনটা কল্পনা করেছিলো, মোটেও সে রকম কিছু নয়।

 

প্রায়োরি কি-স্টোনটা আমার জানা কি-স্টোনের মতো কিছু নয়, ল্যাংডন স্বীকার করলো। হলি গ্রেইল সম্পর্কিত আমার আগ্রহ, সাধারণত প্রতীকি, তো সেটা আসলে কীভাবে খুঁজে পাওয়া যায় সেটা আমার কাছে একেবারেই গুরুত্বহীন একটি বিষয়।

 

সোফির ভুরু দুটো কপালে উঠলো। হলি গ্রেইল-এর খোঁজ?

 

ল্যাংডন একটা অস্বস্তি নিয়ে মাথা ঝাঁকালো। পরের কথাগুলো সাবধানে বললো। সোফি, প্রায়োরিদের মতে, কি-স্টোন হলো একটা কোডবদ্ধ মানচিত্র…হলি গ্রেইল এর লুকিয়ে রাখা জায়গাটার মানচিত্র।

 

সোফির মুখ ফ্যাঁকাশে হয়ে গেলো। আর তুমি মনে করছে, এটা সেই জিনিস?

 

ল্যাংডন বুঝতে পারলো না কী বলবে। তার কাছেও কথাটা অবিশ্বাস্য শোনালো। তারপরও, সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, কি-স্টোনই হলো একমাত্র যৌক্তিক সমাপ্তি। একটা খোঁদাই করা শিলালিপি, গোলাপ প্রতীকের নিচে লুকিয়ে রাখা আছে।

 

ক্রিপ্টেক্সটার নক্সা করেছেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চিপ্রায়োরি অব সাইন-এর সাবেক গ্র্যান্ড মাস্টার—এই জিনিসটা দেখে মনে হচ্ছে, এটা অবশ্যই প্রায়োরিদের একটা কি-স্টোন। একজন সাবেক এ্যান্ড মাস্টারের নীল-নক্সা…আরেকজন গ্র্যান্ড মাস্টার কর্তৃক বাস্তবায়িত করা হয়েছে শত বছর বাদে, এটা এতোটাই নিশ্চিত যে, বাতিল করা যায় না।

 

বিগত দশক ধরে ঐতিহাসিকগণ ফ্রান্সের চার্চগুলোতে কি-স্টোনটা খুঁজে চলছেন। গ্রেইল অম্বেষণকারীরা, প্রায়োরিদের দ্ব্যর্থবোধক সাংকেতিক বার্তার সাথে পরিচিত ছিলো, তারা লা ক্লেফ দ্য ভূতকে আক্ষরিক অর্থেই কি-স্টোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে—একটা স্থাপত্য—খোঁদাই করা একটা পাথর, খিলানযুক্ত কোন চার্চের গোপন কক্ষের ভেতরে রাখা আছে। গোলাপ প্রতীকের নিচে। স্থাপত্য জগতে গোলাপের কোন কমতি নেই। গোলাপ জানালা বা রোজ উইন্ডোজ। রোসেট রিলিফ। এবং অবশ্যই, সিনকোয়ে ফয়েল দিয়ে পূর্ণ-পাঁচ পাপড়ির মনোরম গোলাপ প্রায়শই চার্চের ছাদে পাওয়া যায়, ঠিক কি-স্টেনের উপরে। লুকানো জায়গাটা নারকীয়ভাবে খুবই সহজ সরল। হলি গ্রেইলের মানচিত্রটা কোন বিস্মৃত চার্চের সাথে সম্পর্কিত, চার্চের যাতায়াতকারীরা না বুঝেই হেটে চলে সেটার উপর দিয়ে।

 

এই ক্রিপ্টেক্সটা কি-স্টোন হতে পারে না, সোফি দ্বিমত পোষণ করলো। এটা খুব বেশি পুরনো নয়। আমি নিশ্চিত, এটা আমার দাদু তৈরি করেছেন। এটা কোন প্রাচীন গ্রেইল কিংবদন্তীর অংশ হতে পারে না।

 

আসলে, ল্যাংডন জবাব দিলো, সে অনুভব করলো তার ভেতরে একটা উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, বিশ্বাস করা হয়, কি-স্টোনটা কয়েক দশক আগে প্রায়োরিরা তৈরি করেছে।

 

সোফির চোখে অবিশ্বাসের ছটা। কিন্তু এই ক্রিপ্টেক্সটা যদি হলি গ্রেইলের লুকানো জায়গাটার খোঁজ দিয়ে থাকে, তবে, সেটা আমার দাদু আমাকে কেন দেবেন? এটা কীভাবে খুলতে হবে, সে সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই নেই, কিংবা, এটা দিয়ে আমি করবোটা কী। এমনকি আমি জানিও না, হলি গ্রেইল আসলে কী?

 

ল্যাংডন বুঝতে পারলো, সোফি ঠিকই বলছে, যদিও সে এখনও তার কাছে হলি গ্রেইলের সত্যিকারের বৈশিষ্টটা কী সেটা ব্যাখ্যা করেনি। সেই গল্পটা আপাতত তোলা থাক। এই মুহূর্তে তারা কি-স্টোনটা নিয়েই ব্যস্ত।

 

যদি এটা সেই জিনিসই হয়ে থাকে…

 

তাদের নিচে বুলেট প্রুফ চাকাটার গর্জনকে ছাপিয়ে, ল্যাংডন খুব দ্রুত সোফিকে তার জানামতে কি-স্টোনটা কী, সেটা ব্যাখ্যা করতে শুরু করলো। শত শত বছর ধরে, প্রায়োরিদের সবচাইতে বড় সিক্রেটটা হলো—-হলি গ্রেইলের অবস্থান সেটা কখনও লেখা হয়নি। নিরাপত্তার খাতিরেই, সেটা মৌখিকভাবে প্রত্যেক সেন্যের কাছে একটা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে হস্তান্তরিত হয়ে আসছে। তবে যেভাবেই হোক, বিগত শতাব্দীর কোন এক সময়, একটা গুঞ্জন শোনা গিয়েছিলো যে, প্রায়োরিরা তাদের নীতি বদলিয়েছে। সম্ভবত, সেটা এ জন্যে যে, নতুন ইলেক্ট্রনিক সক্ষমতার যুগ সমাগত হয়েছে। কিন্তু প্রায়োরিরা গ্রুতে প্রতীজ্ঞা করেছিলো তারা কখনও গোপন পবিত্র স্থানটি সম্পর্কে মুখ খুলবে না।

 

তাহলে, সিক্রেটটা তারা কীভাবে হস্তান্তর করতো? সোফি জিজ্ঞেস করলো।

 

এখানেই কি-স্টোনের কথাটা এসে যায়, ল্যাংডন ব্যাখ্যা করলো। যখন শীর্ষ চার জন ব্যক্তির একজন মৃত্যু বরণ করে থাকেন, তখন নিচের সারি থেকে একজনকে সেনেক্য হিসেবে অধিষ্ঠিত করার জন্য বেছে নেয়া হয়। নতুন সেনেককে হলি গ্রেইলের গোপন স্থানটি না জানিয়ে, বরং তাকে একটা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করার সুযোগ দেয়া হয়।

 

এ কথা শুনে সোফি একটু দ্বিধাগ্রস্ত হলো। হঠাৎ করেই ল্যাংডনের মনে পড়ে গেলো, সোফির দাদু কীভাবে তার সাথে গুপ্তধন-খোজা খেলাটা খেলতেন প্রিউভু দ্য মেরিট মানে মেধা যাচাই। মানতেই হয়, কি-স্টোনটাও সেইরকমই একটি ধারণা। তারপরও, এরকম পরীক্ষা গোপন সংগঠনের মধ্যে খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। ম্যাসনরা এক্ষেত্রে বেশ সুপরিচিত ছিলো, যেখানে, সদস্যরা উচ্চপদ অর্জন করে থাকতেন বিভিন্নরকম আনুষ্ঠানিকতা আর মেধার পরীক্ষা দেবার মধ্য দিয়ে, যাতে করে তারা গোপন রাখার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। বহুবছর ধরে সেটা করা হয়ে থাকতো। কাজটা ক্রমাগতভাবেই কঠিন হতে থাকতো।

 

তো, কি-স্টোনটা হলো প্রিভিউ দ্য মেরিট, সোফি বললো। যদি একজন উদীয়মান প্রায়োরি সেনেক্য এটা খুলতে পারেন, তবে তিনি এর তথ্যটার মালিক বনে যান।

 

ল্যাংডন মাথা নেড়ে সায় দিলো। আমি ভুলে গিয়েছিলাম, তুমি এ ধরনের জিনিসের সাথে পরিচিত।

 

শুধুমাত্র আমার দাদুর সাথেই নয়। ক্রিপ্টোলজিতে এটাকে বলা হয় আত্মস্বীকৃত ভাষা। এর মানে, তুমি যদি এটা পড়তে পারো, তবে তুমি জানতে পারবে ওতে কী বলা হয়েছে।

 

ল্যাংডন একটু ইতস্তত করলে। সোফি, তুমি বুঝতে পারছো, যদি এটা সত্যিই একটা কি-স্টোন হয়ে থাকে, তবে ধরে নিতে হবে, তোমার দাদু প্রায়োরিদের ভেতরে খুবই শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন। তাঁকে হতে হবে শীর্ষ চার জন সদস্যের একজন।

 

সোফি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তিনি সিক্রেট সোসাইটিতে খুবই শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন। এ ব্যাপারে আমি একদম নিশ্চিত। আমি অনুমাণ করতে পারি, সেটা প্রায়োরিই ছিলো।

 

ল্যাংডন অবাক হয়ে বললো, তুমি জানতে, তিনি সিক্রেট সোসাইটিতে ছিলেন?

 

দশ বছর আগে আমি এমন কিছু দেখেছিলাম, যা আমার দেখার কথা ছিলো না। তখন থেকে আমরা আর কথা-বার্তা বলিনি। সে একটু থামলো। আমার দাদু দলটির শীর্ষ পর্যায়েরই শুধু ছিলেন না…আমার বিশ্বাস, তিনি ছিলেন একেবারে উচ্চপদের একজন সদস্য।

 

এইমাত্র সে যা বললো, ল্যাংডন তা বিশ্বাস করতে পারলো না। গ্র্যান্ড মাস্টার? কিন্তু…এটা তোমার জানা কথা নয়!

 

আমি এ ব্যাপারে কিছু বলবো না। সোফি অন্য দিকে তাকিয়ে রইলো, তার অভিব্যক্তি যতোটা দৃঢ়, ততোটাই যন্ত্রণাকাতর।

 

ল্যাংডন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বসে রইলো। জ্যাক সনিয়ে গ্র্যান্ড মাস্টার? যদিও শুনতে খুব অদ্ভুত মনে হচ্ছে, তার পরও, এটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, ল্যাংডনের মনে হলো, তাহলে ব্যাপারটা খুব ভালোই হয়। একেবারে বাপে-ধাপে মিলে যায়। হাজার হোক, আগের গ্র্যান্ডমাস্টাররাও ছিলেন বিখ্যাত সব ব্যক্তি আর শৈল্পিক-সত্ত্বার অধিকারী। এর সত্যতা কয়েক বছর আগে, প্যারিসের বিবলিওথেক ন্যাশনাল তাদের লো ভোসিয়ার সিক্রেট নামে পরিচিত কাগজে খবরটা ফাস করেছিলো।

 

প্রায়োরি ঐতিহাসিক এবং গ্রেইল অন্বেষণকারীদের সবাই ডোসিয়ারটা পড়েছে। নাম্বার 4,lm249 এর ক্যাটালগটা, ডোসিয়ার সিক্রেট নামে পরিচিত, অনেক বিশেষজ্ঞ কর্তৃকই সেটা বিশ্বাসযোগ্য বলে স্বীকৃত হয়েছে। ঐতিহাসিকরা এটা দীর্ঘ দিন ধরেই খুঁজছিলেন।

 

প্রায়োরি গ্র্যান্ড মাস্টারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, বত্তিচেল্লি, স্যার আইজ্যাক নিউটন, ভিক্টর হুগো এবং সাম্প্রতিক কালে, জ্য কতো, প্যারিসের বিখ্যাত শিল্পী ও কবি।

 

তবে জ্যাক সনিয়ে নয় কেন?

 

ল্যাংডন বুঝতে পারলো, আজ রাতে সনিয়ের সাথে তার সাক্ষাৎক্টা না হওয়াতে কী অপরিমেয় ক্ষতিই না হয়ে গেছে। প্রায়োরিদের গ্র্যান্ড মাস্টার আমার সাথে দেখা করার জন্য একটা বৈঠকের ব্যবস্থা করেছিলেন? শিল্পসংক্রান্ত নিছক গল্পগুজব করার জন্য? আচমকাই তার মনে হচ্ছে, তা নয়। হাজার হোক, যদি ল্যাংডনের মন যা বলছে, তা সত্য হয়ে থাকে, তবে প্রায়োরি অব সাইওনের গ্র্যান্ড মাস্টার ভ্রাতৃসংঘের ধারাবাহিকতায় কি-স্টোনটা তার নাতনীর কাছে হস্তান্তর করে গেছেন এবং বার বার। তাকে রবার্ট ল্যাংডনকে খুঁজে বের করার জন্য তাগাদা দিয়েছেন।

 

অসম্ভব!

 

তারপরও ল্যাংডনের কাছে ব্যাপারটা খাপ খাচ্ছে না। সনিয়ে কেন এমন আচরণ করলেন। তিনি যদি মারা যাওয়ার আশংকাই করে থাকেন, তবে তো আরো তিন জন সেনেক্য ছিলেন, যারা প্রায়োরিদের সিক্রেটটা রক্ষা করতে পারেন। তবে কেন সনিয়ে তার নাতনীর কাছে কি-স্টোনটা দেবার জন্য এতো ঝুঁকি নিতে গেলেন, যখন দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা মোটেও ভালো ছিলো না? আর কেনইবা, ল্যাংডনকে জড়ানো হলো… একেবারেই অপরিচিত একজন?

 

এই পাজলের একটা অংশ এখনও পাওয়া যাচ্ছে না, ল্যাংডন ভাবলো। উত্তরটার জন্য অবশ্যই অপেক্ষা করতে হবে। গাড়ির ইনজিনের ধীর গতির শব্দ তাদের দুজনকে তাকাতে বাধ্য করলো। টায়ারে খ্যাচ খ্যাচ করে একটা শব্দ হলো। সে কেন গাড়ি থামালো? ল্যাংডন অবাক হয়ে ভাবলো, ভার্নেট তাদেরকে বলেছিলেন তাদেরকে শহরের বেশ বাইরে, নিরাপদে নিয়ে যাবেন। সোফি ল্যাংডনের দিকে অস্বস্তিতে তাকালো। দ্রুত ক্রিপ্টেক্সটার বাক্স বন্ধ করে ল্যাংডন সেটা তার জ্যাকেটের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেললো।

 

দরজাটা খুলে গেলে ল্যাংডন অবাক হয়ে দেখলো, গাড়িটা রাস্তা থেকে অনেক দূরে, একটা বনের মধ্যে থেমেছে। ভার্নেটের চোখে অদ্ভুত চাহনি। তার হাতে একটা পিস্তল।

 

এজন্যে আমি দুঃখিত, তিনি বললেন। এছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিলো না।

 

 

 

৪৯.

 

আদ্রেঁ ভার্নেটকে পিস্তল হাতে খুবই অদ্ভুত দেখাচ্ছে। কিন্তু তাঁর চোখের দৃঢ়তা দেখে ল্যাংডন আঁচ করতে পারলো, তার সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করাটা হবে বোকামী।

 

আমি বলতে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমাকে জোর করতেই হবে, অস্ত্রটা তাদের দুজনের দিকে তাক করে নিয়ে ভার্নেট বললেন, বাক্সটা নিচে নামিয়ে রাখুন।

 

সোফি বাক্সটা তার বুকে চেপে ধরলো। আপনি বলেছিলেন, আপনি এবং আমার দাদু বন্ধু ছিলেন।

 

আপনার দাদুর সম্পদ রক্ষা করা আমার কর্তব্য, ভার্নেট জবাব দিলেন। আর আমি ঠিক, সেই কাজটাই করছি। এখন বাক্সটা নিচে নামিয়ে রাখুন।

 

আমার দাদু এটা আমাকে দিতে চেয়েছেন! সোফি জানালো।

 

নামিয়ে রাখুন বলছি, ভার্নেট তার অস্ত্রটা উঁচিয়ে ধরে বললেন।

 

সোফি বাক্সটা তার পায়ের কাছে নামিয়ে রাখলো।

 

মি. ল্যাংডন, ভার্নেট বললেন, আপনি বাক্সটা আমার কাছে নিয়ে আসুন। আর সর্তক থাকবেন, আমি আপনাকে বলছি এজন্যে যে, আপনাকে গুলি করতে আমি একটুও দ্বিধা করবো না।

 

ল্যাংডন ব্যাংকারের দিকে অবিশ্বাস ভরে তাকালো। আপনি কেন এসব করছেন?

 

আপনি কি ভাবছেন? ভার্নেট চট করে জবাব দিলেন, তাঁর ইংরেজি উচ্চারণটা এখন একটু বদলে গেলো। আমার গ্রাহকের সম্পত্তি রক্ষা করতে।

 

আমরাই এখন আপনার গ্রাহক, সোফি বললো।

 

অদ্ভুত একটা ভাবনায় ভার্নেটের মুখটা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। মাদামোয়াজেল নেভু, আমি জানি না, আপনি কীভাবে এই চাবিটা আর একাউন্ট নাম্বারটা আজ রাতে পেয়েছেন। তবে নিশ্চিতভাবেই মনে হচ্ছে, উল্টা-পাল্টা কিছু হয়েছে। আমি যদি জানতাম, আপনাদের অপরাধটা কী, তবে আমি কখনও আপনাদেরকে ব্যাংক থেকে বের করতে সাহায্য করতাম না।

 

আমি আপনাকে বলেছি, সোফি বললো, আমার দাদুর মৃত্যুর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।

 

ভার্নেট ল্যাংডনের দিকে তাকালেন, তারপরও রেডিওতে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে যে, আপনি কেবল জ্যাক সনিয়েকেই খুন করেননি, বরং বাকি তিন জনকেও হত্যা করেছেন?

 

কী! ল্যাংডন বজ্রাহত হলো। আরো তিনটা খুন হয়েছে? সে নিজে যে প্রধান সন্দেহভাঁজন তার থেকেও এইমাত্র বলা সংখ্যাটা তাকে বেশি ভাবিত করলো। মনে হচ্ছে এটা কাকতালীয় নয়। তিন জন সেনেক্য? ল্যাংডনের চোখ নিচে রাখা রোজউড বক্সের দিকে চলে গেলো। সেনেক্যরা যদি মারা গিয়ে থাকেন, তো, সনিয়ের কাছে অন্যকোন পথ খোলা ছিলো না। তাকে কি-স্টোনটা অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করতেই হোতো।

 

আমি আপনাকে পুলিশের হাতে তুলে দেবার পরই তারা এটা খুঁজে দেখতে পারবে, ভার্নেট বললেন। আমি আমার ব্যাংককে ইতিমধ্যেই খুব বেশি জড়িয়ে ফেলেছি।

 

সোফি ভার্নেটের দিকে তাকালো, আপনার নিশ্চয় আমাদেরকে তুলে দেবার কোন অভিপ্রায় নেই। তাহলে তো আপনি আমাদেরকে ব্যাংকেই নিয়ে যেতেন। অথচ তার বদলে আপনি আমাদেরকে এখানে নিয়ে এসে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করেছেন?

 

আপনার দাদু আমাকে ভাড়া করেছিলেন একটা কারণেই, তঁার জিনিসটা নিরাপদে আর গোপনে রাখার জন্যে। এই বাক্সের ভেতরে যা-ই থাকুক না কেন, আমি চাই না তা পুলিশের জব্দ তালিকায় ঠাই পাক। মি. ল্যাংডন, বাক্সটা আমার কাছে নিয়ে আসুন।

 

সফি মাথা ঝাঁকালো। না, তুমি তা করবে না।

 

একটা গুলির আওয়াজ শোনা গেলো, বুলেটটা তাদের পাশেই ভ্যানটার গায়ে গিয়ে বিধলে গুলির আঘাতে গাড়িটা একটু কেঁপে উঠলো।

 

উফ! ল্যাংডন বরফের মতো জমে গেলো।

 

ভার্নেট এখন আরো বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বললেন। মি. ল্যাংডন, বক্সটা তুলে নিন।

 

ল্যাংডন বক্সটা তুলে নিলো।

 

এখন, এটা আমার কাছে নিয়ে আসুন। ভার্নেট এবার অস্ত্রটা সোজা তার দিকেই তাক্‌ করলো। রিয়ার বাম্পারের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর অস্ত্রটা এখন

 

কার্গোর দরজার হাতলটার কাছাকাছি।

 

বাক্স হাতে ল্যাংডন খোলা দরজাটার হাতলের দিকে এগিয়ে এলো।

 

আমাকে কিছু একটা করতেই হবে! ল্যাংডন ভাবলো। আমি প্রায়োরিদের কি স্টোনটা তুলে দিচ্ছি! ভার্নেটের অস্ত্রটা তুলে ধরা থাকলেও, সেটা ল্যাংডনের হাটু বরাবর হবে। সজোড়ে জায়গা মতো একটা লাথি, সম্ভবত? দুঃখের বিষয় হলো, ল্যাংডন কাছে পৌঁছতেই, ভার্নেটও যেনো বিপদটা আঁচ করতে পারলেন। তিনি কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে ছয় ফুট দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন। ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

 

ভার্নেট আদেশ করলেন, দরজার পাশেই বাক্সটা রাখুন।

 

আর কোন উপায় না দেখে, ল্যাংডন হাটু গেঁড়ে বসে পড়ে বাক্সটা কার্গোর হোন্ডের নিচে নামিয়ে রাখলো, ঠিক খোলা দরজাটার সামনে।

 

এখন দাঁড়িয়ে পড়ুন।

 

ল্যাংডন উঠতে শুরু করে থেমে গেলো, ট্রাকের দরজার নিচের দিকে যে ছিটকিরিটা আছে সেটা সবার অগোচরে নামিয়ে দিলো।

 

উঠে দাঁড়ান, বাক্সটা থেকে সরে যান এবার।

 

ল্যাংডন একটু থামলো, তারপর উঠে দাঁড়ালো।

 

পেছন দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে থাকুন।

 

ল্যাংডন তা-ই করলো।

 

 

 

নিজের হৃদস্পন্দনটা টের পেলেন ভার্নেট। ডান হাতে পিস্তলটা ধরে, বাম হাত দিয়ে বাক্সটা তুলে নিলেন। বুঝতে পারলেন, বাক্সটা খুবই ভারি। দুহাতে ধরতে হবে। তার জিম্মিদের দিকে ফিরে দেখে ঝুঁকিটা হিসাব করলেন। তারা দুজনেই পনেরো ফুট দূরে, কার্গোর হোন্ডের কাছে, তার দিকে মুখ ফেরানো। ভার্নেট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। খুব দ্রুতই, তিনি অস্ত্রটা বাম্পারের ওপর রেখে, দুহাতে বাক্সটা তুলে নিয়ে এসে কাগোর কাছে মাটিতে রেখে দিলেন। তারপর, সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রটা হাতে তুলে নিলেন আবার। তার বন্দীরা একটুও নড়লো না।

 

একদম ঠিক আছে। এবার দরজাটা লাগাতে হবে। বাক্সটা মাটিতে রেখেই তিনি লোহার দরজাটা বন্ধ করতে লাগলেন। কিন্তু দরজাটা ঠিক মতো লাগলো না। হলোটা কী? ভার্নেট আবারো দরজাটা টান দিলেন। কিন্তু বোল্টগুলো লাগলো না। দরজাটা পুরোপুরি লাগছে না। একটু ভয় পেয়ে গেলেন। আবারো, সজোড়ে লাগানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু হলো না। কিছু একটায় আঁটকে গেছে! ভার্নেট দরজাটা ফাঁক করে ভেতরে উঁকি মেরে দেখলেন। কিন্তু এবার, দরজাটা বাইরের দিক থেকে খুলে, ভার্নেটের মুখ সজোড়ে আঘাত হানলে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তাঁর নাকটা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হতে লাগলো। অস্ত্রটা তার কাছ থেকে ছিটকে পড়ে গেছে। ভার্নেটের নাক দিয়ে গরম রক্ত ঝড়তে লাগলো।

 

রবার্ট ল্যাংডন সজোড়ে ঘুষি চালিয়েছে। ভার্নেট চেষ্টা করেও উঠতে পারলেন না, কারণ চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না। তাঁর দৃষ্টি ফাঁকা হয়ে গেছে, তাই আবারো মাটিতে পড়ে গেলেন। সোফি নেভু চিৎকার করতে লাগলো। কিছুক্ষণ বাদে, ভার্নেট শুনতে পেলেন, ট্রাকের চাকার খ্যা খ্যাচ্‌ শব্দ। গাড়িটা ঘুরতে গিয়ে সামনের একটা গাছের সাথে ধাক্কা খেলো। গাড়িটার সামনের বাম্পার খুলে একটু ঝুলে গেলেও সেটা চলতে শুরু করলো। গাড়িটা রাস্তায় পৌঁছতেই, দূর থেকে সেটার বাতি দেখা গেলো।

 

ভার্নেট মাটির দিকে তাকালেন, যেখানে গাড়িটা থামানো ছিলো। অল্প-স্বল্প চাঁদের আলোতেও তিনি দেখতে পেলেন, সেখানে কিছুই নেই, কাঠের বাক্সটাও।

 

 

 

৫০.

 

ফিয়া সিডান গাড়িটা কাস্তেল গান্ডোলফো ছেড়ে এলবান পাহাড়ের সাপের মতো এঁকে-বেঁকে যাওয়া পথ দিয়ে নিচের উপত্যকায় নেমে গেলো। পেছনের সিটে বসে বিশপ আরিজারোসা হাসছিলেন। তাঁর কোলের ওপর রাখা বৃফকেসটার ভেতরে বন্ডগুলোর ওজন অনুভব করছিলেন। অবাক হয়ে ভাবছিলেন টিচারের কাছে এটা হস্তান্তর করার জন্য কতো সময় লাগতে পারে।

 

বিশ মিলিয়ন ইউরো।

 

এই অংকের বিনিময়ে আরিঙ্গাবোসা যে ক্ষমতা অর্জন করবেন, সেটা এর চেয়েও বেশি মূল্যবান। আরিঙ্গাবোসা আবারো অবাক হয়ে ভাবলেন, টিচার কেন এখনও তার সাথে যোগাযোগ করছেন না। নিজের আলখেল্লাটার পকেট থেকে সেল ফোনটা বের করে দেখলেন নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল।

 

সেল সার্ভিস এই উঁচু জায়গায় বাঁধা পায়, রিয়ার আয়না দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে ড্রাইভার বললো। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমরা পাহাড় থেকে নেমে যাবো, তখন নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে।

 

ধন্যবাদ, তোমাকে। আরিঙ্গারোসা হঠাৎ করে একটু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। পাহাড়ের উপরে কোন নেটওয়ার্ক নেই? হয়তো টিচার তার সাথে এতোক্ষণ ধরে যোগাযোগ করার জন্য চেষ্টা করে গেছেন। হয়তো মারাত্মক কিছু একটা ঘটে গেছে।

 

সঙ্গে সঙ্গে, আরিঙ্গারোসা ফোনের ভয়ে