ড্রাগন লুডো

ড্রাগন লুডো

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বনবাংলাের সামনে লনটায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল তিন বন্ধু। রনি, পিকলু আর জোজো। চৌকিদার কাছেই থাকে, এইমাত্র বাড়ি গেল সে, ফিরবে কাল সকালে, বাংলাের এই চত্বরটায় তারা তিনজন ছাড়া এখন আর কেউ নেই। সাতকোশিয়ার এই জঙ্গলে পৌছতে তিন বন্ধুকে ঘাম ঝরাতে হয়েছে বিস্তর। সেই কাল রাত্তিরে হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে সকালে কটক, একপেট সিঙাড়া-জিলিপি সাঁটিয়ে বাসে চেপে চার ঘণ্টা পর আঙ্গল। ছােট্ট জমজমাট শহরটায় একে-ওকে-তাকে জিগ্যেস করে খুঁজে বের করতে হল বনদপ্তরের অফিস। সরকারি কাগজপত্র নিয়ে মধ্যাহ্নভােজন সেরে ফের বাস। অবশেষে ওড়িশার এই জঙ্গলটায় তিন মূর্তি যখন এসে নামল, সূর্য ডুবে গিয়েছে, সন্ধে প্রায় হয়-হয়।

তবে হ্যা, পরিশ্রম সার্থক। জায়গাটায় এসে প্রাণ জুড়িয়ে গিয়েছে। তিন দিক জঙ্গল দিয়ে ঘেরা বনবাংলােটি পাহাড়ের একদম প্রান্তে। অনেক নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মহানদী। আধাে অন্ধকারে নদী তেমন দেখা গেল না বটে, তবে তার কলকল ধ্বনি অতি স্পষ্ট। এমন চমৎকার নিসর্গ ভালাে না লেগে পারে?

অভ্যর্থনাও এখানে মন্দ হয়নি। থাকার ঘরটি বেশ পছন্দসই। আছে চার-চারখানা সিঙ্গল খাট, আলমারি, আয়না, চেয়ার, একটা বড়সড় টেবিল। লাগােয়া বাথরুমও আছে। আর দেখভাল করার চৌকিদারটি তাে ম্যাজিক জানে। ঘরে ঢুকে স্নান সেরে তরতাজা হতে-না-হতেই সে একথালা পেঁয়াজি আর আলুর চপ নিয়ে হাজির। রাতেও দারুণ মুরগি
বানিয়েছিল। কষা কষা, ঝাল-ঝাল। ঠিক যেমনটা রনি-পিকলু-জোজো পছন্দ করে। লােভে পড়ে আট-দশটা করে রুটি খেয়ে ফেলেছে এক-একজন, পেট এখন একেবারে আইঢাই। সেই হাঁসফাঁস ভাব কাটাতেই চলছে এখন পদচারণা। উত্তেজনাতেও ফুটছে তিনজন।

সবে হায়ার সেকেন্ডারি দিয়ে জীবনে এই প্রথম শুধু বন্ধুরা মিলে বেড়ানাের ছাড়পত্র পেয়েছে, তাদের খুশি যেন আর ধরছে না। তার উপর এমন এক রােমাঞ্চকর পরিবেশ। চারদিকে ছমছম করছে অন্ধকার, লাখ-লাখ ঝিঝিপোকার ডাক, অসংখ্য জোনাকি জ্বলছে- নিভছে, বৈশাখের বাতাস শিরশির শব্দ তুলছে জঙ্গলে। গাঢ় নীল আকাশে ঝকঝকে তারার মেলা। এমনটি তিনমূর্তি আগে কখনও দেখেইনি।

পিকলু তাে আনন্দে গান গেয়ে উঠল। রনিও গলা মিলিয়েছে। জোজো কোখেকে একটা শুকনাে ডাল কুড়িয়ে নিয়েছিল, সেটাকে ঘােরাচ্ছে তলােয়ারের ভঙ্গিতে। হঠাৎ বলে উঠল,—অ্যাই, এখন একটা অভিযান চালাবি?

গান থেমেছে। পিকলু জিজ্ঞেস করল,—কোথায় ?

—জঙ্গলে। চল, টর্চ নিয়ে একটা পাক খেয়ে আসি।

—এই রাতদুপুরে? হেঁটে-হেঁটে? মাথা খারাপ? রনি চোখ ঘোরাল,—শুনলি না চৌকিদার কী বলে গেল। হাতি, বুনাে শুয়োের, ভাল্লুক, কোনও কিছুর কমতি নেই এই সাতকোশিয়ায়। বাঘও নাকি আছে দু-চার পিস।

—সে হােয়াট ? চোখে আলাে ফেললে জন্তু জানােয়ার কাছে ঘেঁষে না, আমি জানি।

—তাের বই পড়া জ্ঞান বন্ধ রাখা পিকলু ফোড়ন কাটল,ভুলে যাস না অন্ধকারে সাপখােপও বেরােয়।

—হ্যা, এটা একটা যুক্তি বটে। টর্চ মেরে সাপকে বাগে আনা যাবে না। জোজো মাথা নেড়ে বলল, ‘তা হলে নদীর পারে নামি চল। পাথর বেয়ে-বেয়ে। অসম্ভব। অন্ধকারে পা পিছলে হাড়গােড় ভাঙি আর কী! পিকলু অন্য প্রস্তাব দিল,তার চেয়ে বরং রুমে গিয়ে তাস খেলি ব্রো। দেখি কে আগে গাধার ডাক ডাকে।

কথাটা রনি-জোজোরও মনে ধরেছে। কিন্তু ঘরে এসে কপালে হাত। যাঃ, তাসের প্যাকেট আনাই হয়নি।

রনি বেজার মুখে বলল,—তা হলে আর কী, আড়াই হােক। আমি তােদের একটু জব্বর ভূতের গল্প শােনাতে পারি।

জোজো তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,— ধুর, ভূতে আমার ইন্টারেস্ট নেই। আমি ভূত বিশ্বাসই করি না।

–সে তাে আমরাও করি না। তা বলে গল্প শুনতে দোষ কী? চারদিক শুনশান ঘরে হ্যারিকেন জ্বলছে, ভূত কিন্তু এখন জমবে ভালাে। অবাস্তব গল্প শুনবই না। তার চেয়ে শুয়ে পড়া ঢের ভালো। কাল তা হলে কাকভােরে উঠে বেরােতে পারব।

অগত্যা বিছানায় লম্বা হওয়ার তোেড়জোড়। পিলু আর জোজো মশারি টাঙাচ্ছিল হঠাৎই রনি চেঁচিয়ে উঠল,—এই দ্যাখ, এখানে কী রয়েছে।

অবাক হওয়ার মতােই জিনিস বটে। টেবিলের ড্রয়ারে বড়সড় সাইজের একখান লুডাের বাের্ড! খুঁটি ছক্কাও মজুত সঙ্গে।

ব্যস, আর তিন মূর্তিকে পায় কে! ধসে পড়ল লুডাে নিয়ে। বাের্ডটা একটু অদ্ভুত শুধু সাপলুডােই আছে। উঁহু, ঠিক সাপও নয়, সাপগুলাের মুখ অনেকটা যেন ড্রাগনের মতাে। লেজের কাছটাও কাটা কাটা। মইয়ের বদলে ছােট-বড় গাছ। ছবিগুলাে আঁকা হয়েছে ভারি নিপুণ হাতে। কেমন জ্যান্ত-জ্যান্ত দেখায়!

চালু হয়ে গিয়েছে খেলা। টপাটপ ছক্কা গড়াচ্ছে বাের্ডে। টুপটাপ এগােচ্ছে খুঁটি। গাছের ঘরে দান পড়তে সই উপরে উঠে গেল, ড্রাগনের মুখে পড়ে সৎ নেমে এল লেজে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দারুণ জমে গেল খেলা। বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে বাের্ডে উপর প্রায় ঝুঁকে পড়েছে তিন মূর্তি।

তখনই শুরু হল ঘটনাটা!

হঠাৎই একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল। কাছেই। আওয়াজটা এত জোর, মনে হল, যেন ঘরেই ঢুকে পড়েছে পাখিটা। মুহূর্তের জন্য চমকেছিল তিন খেলুড়ে, পরক্ষণে ফের মন দিয়েছে খুঁটিতে। পিলু বাের্ডে ছক্কা গুড়িয়ে দিয়ে বলল,”পাঁচ পড়েছে। এবার আমি বড় গাছ বেয়ে উঠে যাব।

জোজো খপ করে ছাটা তুলে ভারে নিয়েছে কলকেতে। ভুরু কুঁচকে বলল, –কোথায় পাঁচ! তাের তাে তিন পড়েছিল।

রনিও সঙ্গে-সঙ্গে সায় দিয়েছে,–হা, হা ! আমিও স্পষ্ট তিন দেখেছি। পিকলু অবাক মুখে বলল,-যাহ বাবা, আমি কি মিথ্যে বলছি?

–সে তুই-ই জানিস।

–তুই পড়েছিস ড্রাগনের মুখে যা, একদম নীচে চলে যা।

অগত্যা পিকলুকে মেনে নিতেই হয়। তিনজনের দুজন যখন বলছে, সে নিজেই নিশ্চয়ই ভুল দেখেছে। ড্রাগনের লেজে নেমে এল পিকলুর নীল ঘুটি।

এবার জোজোর দান। কলকে নেড়ে ফেলেছে ছক্কা! উল্লসিত স্বরে বলল,আমার পড়েছে চার। গাছে চড়ব। আমি! সােজা তিরানব্বইতে পৌছে যাব।

ছক্কাটা কলকেতে ভরে রনি বলল,তুইও পিকলুর মতাে গুল মারছিস? পড়ল দুই, আর বলছিস চার?

পিকলু ঠোট বেঁকিয়ে বলল,—কেন চালাকি করছিস জোজো? দেখাই তো গেল দুই পড়েছে!

—এটা কিন্তু দুই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বলছিস। জোজো তেতে গেল,আমি ভুল দেখতেই পারি না।

–বললেই হল? তুই তাে ইচ্ছে করে ভুল দেখছিস।

—চালাকি ছাড়াে চাদু। সুড়সুড় করে ড্রাগনের মুখে যাও।

জোজো নেমে এল বটে, তবে গজগজ করছে,—এটা কিন্তু অন্যায় হল, এটা কিন্তু অন্যায় হল…

হ্যা-হ্যা হেসে রনি কলকে নাড়ল জোরে-জোরে। ছক্কা চেলে বলল,—হুররে, পুট পড়েছে। এবার আমি সাঁইসাঁই উপরে উঠব।

পিকলু ছক্কাটা পুরে নিল কলকেয়। বাঁকা সুরে বলল, তুইও জোজোর লাইন ধরলি ? পড়ল তিন, আর বলছি এক?

জোজো আঙুল নেড়ে বলল,—নাে চালাকি রনি। তিনকে তুই এক বানিয়ে দিলি ?

রনি দপ করে জ্বলে উঠল,—চালাকি তাে তােরা করছিস! নিজেদের চালাকি ধরা পড়ে গিয়েছে তো, তাই এখন আমাকে ফাঁসানাের চেষ্টা!

পিকলু গরগর করে উঠল,—একদম বাজে কবি না। প্ল্যান করে তােরা আমাকে হারাতে চাইছিস।

শাটআপ। জোজো হুঙ্কার দিয়ে উঠল,—মাের্টেই আমাকে জড়াবি না। তােরাই প্ল্যান করে আমাকে ডাউন দিচ্ছিস।

—অ্যাঅ্যাই, চুরি করে আবার তেজ দ্যাখাে ! হাজার বার বলব, তুই, রনি দুজনেই চালাকি করছিস।

—চোপ, চোপ। তুই একটা চাতুরির মন্ত্রী, আর জোজো শয়তানির রাজা!

—মুখ সামলে, রনি। আমি কিন্তু তাের দাঁত ভেঙে দেব।

—আমার হাত নেই? আমি চালাতে জানি না?

—ভেবেছিস কী, আঁ? দুটোকেই এমন মারব না।

ব্যস, বেধে গেল ধুন্ধুমার। যে যাকে পারছে হাত চালাচ্ছে। রনির পাঞ্চ খেয়ে ঘরের কোনে ছিটকে পড়ল পিকলু। কোনওক্রমে উঠে যাঁড়ের মতাে তেড়ে গিয়ে জোজোর পেটে লেন্ট হুক মারল একখানা। জোজোর আপার কাটে রনি বিছানায় চিৎপাত। চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে তুলল পিকলু। রনি এলােপাথাড়ি ঘুসি ছুড়ছে অবিরাম। জোজো একখানা রামগাঁট্টা মারল পিকলুর চাদিতে। সঙ্গে সঙ্গে রনিকে ছেড়ে জোজোর উপর ঝাপিয়ে পড়েছে পিকলু। বক্সিংয়ের পর এবার মল্লযুদ্ধ। কে যে কখন কাকে ধরাশায়ী করছে, বােঝে কার সাধ্যি।

হঠাই আবার সেই রাতচরা পাখির ডাক। আওয়াজটা এবার আরও আজব, যেন খ্যাকখ্যাক হাসছে। থেমেও গেল ঝুপ করে। ওমনি চরাচর পলকে নিঝুম। কী কাণ্ড, দক্ষযজ্ঞও স্তব্ধ সহসা। তিন যুযুধান নিচুপ কয়েক পল।

খানিক পরে,

রনি মিনমিন করে উঠেছে,—এই, আমরা মিছিমিছি মারামারি করছিলাম কেন রে?

পিকলু কাতর গলায় বলল,-আমি জীবনে কোনও দিন কারওর সঙ্গে ঝগড়া করিনি আজ আমিই কিনা তােদের গায়ে হাত তুললাম।

জোজোর স্বরও করুণ,ছি ছি, খুব খারাপ কাজ হল। শেষে কিনা সামান্য লুডাে খেলা নিয়ে মারপিট!

অনুতপ্ত তিন বন্ধু বসল যে যার খাটে। আপােেশ চলছে কৃতকর্মের জন্য। পিকলু বলল,হঠাৎ আমাদের মাথা খারাপ হয়ে গেল কেন বল তাে?

জোজো বলল,—এই ড্রাগনমার্কা বাের্ডটাই যত নষ্টের মূল।

রনিও একমত,—নিশ্চই ওই বোর্ডটার কোনও অশুভ শক্তি আছে। ছক্কা আর খুঁটিগুলােরও।

–যা বলেছিস। কিছু একটা গড়বড় আছেই। নইলে আমরা তিনজনই ভুলভাল দেখা শুরু করলাম কেন?

-ওটাকে ছিড়ে টুকরাে-টুকরাে করে ফেলা যায় না?

-খুব যায়।

ভাবামাত্র কাজ। জোজো গিয়ে হেঁচকা টানে দু-টুকরাে করেছে বাের্ড। রনি আর পিকলুও ছিড়ছে মহােৎসাহে। ঘুটি গুলােকেও মটমট করে ভাঙল, প্লাস্টিকের কলকেটা পিষল পায়ে! ছক্কার ফুটকিগুলাে নখ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মুছে দিল। তারপর সব শুদ্ধ জানলার বাইরে ছুড়ে দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল তিন সঙ্গী।

বিছানায় পড়তে না পড়তেই ঘুম। পরদিন সকালে যখন নিদ্রা থেকে উঠল, শরীর- মন ঝরঝরে, তাজা। এমনকী গা-হাত-পায়েও এতটুকু ব্যথা নেই। দাঁত মেজে তিন মূর্তি বেরিয়েছে ঘর থেকে। দিনের আলােয় বাংলাের লন থেকে নদী দেখে তারা তাে মুগ্ধ। বেশ চওড়া নদী, স্রোতও আছে, জলটাও ভারি টলটলে। নদীর ওপারেও পাহাড়, জঙ্গল। দুই সবুজ পাহাড়ের মধ্যিখান দিয়ে বয়ে চলা মহানদীতে নৌকোও চলছে দিব্যি। খানিক গিয়ে বাঁক নিয়েছে নদী, ওপারের পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে।

তিন বন্ধু বেশ কিছুক্ষণ তারিয়ে তারিয়ে উপভােগ করল দৃশ্যটা। চৌকিদার এসে গিয়েছে বহুক্ষণ, জলখাবারের আলুপরােটা রেডি, গপাগপ খেয়েই ছুটেছে পাশের কুমিরপ্রকল্প দর্শনে। নানান সাইজের মেছােকুমির আছে খাঁচায়। এদের নাম যে ঘড়িয়াল, তাও জানা হয়ে গেল। পিকলু ক্যামেরা এনেছে, ঘুচলাে-মুখ ঘড়িয়ালদের ফোটো তুলল
পটাপট। তারপর মহানদীতে হুটোপুটি করে স্নান । বাংলােয় ফিরে চৌকিদারের রাধা সুস্বাদু ডিমের ঝােল, ভাত খেয়ে আবার হইহই করে ঘুরতে বেরােনাে। এবার অরণ্যে।

হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা ভিতরে চলে গিয়েছিল তিনজনে। যত এগোয়, ততই যেন টানে জঙ্গল। দু-ধারে শাল, সেগুন, শিমুল, মহুয়া, জারুল, আরও কত নাম না জানা গাছের ভিড়। অচেনা এক বুনাে গন্ধে ম ম করছে বাতাস। পাতা ঝরছে টুপটাপ। মাঝে- মাঝে পিকপিক ডেকে উঠছে পাখি। বাকি সময়টা বন অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ। কোথাও
চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লেই গায়ে যেন কাটা দেয়। মনে হয়, জঙ্গলের প্রাণীরা যেন তাদের আড়াল আবডাল থেকে দেখছে।

জীবজন্তুর দেখা অবশ্য মিলল না বিশেষ ওয়াচ টাওয়ারে উঠে দুটো চারটে হরিণ দেখেই ফিরতে হল। যাকগে যাক, বাঘ-ভাল্লুক নয় নাই দেখা হল, জঙ্গল ভ্রমণের শিহরণই বা মন্দ কী!

সন্ধেবেলা বাংলােয় ফিরে শুরু হয়েছে আড্ডা। সারা দিনের স্মৃতি রােমন্থন। ডিজিট্যাল ক্যামেরায় তােলা ফোটোগুলাে দেখাচ্ছিল পিকলু, পুটুস-পুটুস মন্তব্য করছিল। রনি আর জোজো। রাত নটা নাগাদ চৌকিদার খেতে ডাক। আহারপর্ব শেষ হওয়ার পরে কালকের মতােই চলে গেল চৌকিদার।

আবার বাংলােয় শুধু তারা তিনজন। রনি, পিকলু, জোজো। আর আছে ছমছমে । অন্ধকার। ঝিঝিপােকার ডাক। লক্ষ-লক্ষ জোনাকি। নদীর কুলকুল শব্দ। এবং বিদ্যুৎহীন। ঘরে হারিকেনের টিমটিমে আলাে।

খানিকক্ষণ বাংলাের লনে ফুরফুরে হাওয়া খেয়ে ঘরে এসেছে তিন বন্ধু। ঢুকেই  জোজো বলল, কাল সকালেই তাে ফেরা। আজ এখন কী করা যায়?

রনি বলল,—সেই ভূতের গল্পটা বলি? দারুণ ইন্টারেস্টিং। আমার কাকা যখন অসমে ছিলেন..

কথার মাঝখানেই হঠাৎ টেবিলের সামনে থেকে চেঁচিয়ে উঠল পিকলু,—অ্যাই রনি, অ্যাই জোজো, এদিকে আয়।

দৌড়ে গেল দুজনে। পিকলু টেবিলের ড্রয়ারটা খুলেছিল, ভিতরে চোখ পড়তেই কেঁপে উঠল রনি, জোজো।

কালকের সেই লুডাের বাের্ডটা ছিড়ে কুটিকুটি করে ফেলে দেওয়ার পরেও আবার সেটা বিরাজ করছে স্বস্থানে। ঘুটি, কলকে, ছক্কা সমেত।

জোজো অস্ফুটে বলল,-এটা কী করে সম্ভব?

পিকলু কাপা কাপা গলায় বলল, –আমিও তাে তাই ভাবছি।

রনি বলল,—‘স না ওটাকে, ধরিস না।

তবু কী যেন ঘটে গেল। সম্মােহিতের মতাে বাের্ডটা হাতে তুলে নিয়েছে জোজো।

ফিসফিস করে বলল, চল না, খেলি।

পিকলু বিড়বিড় করে বলল,-খেললে হয়।

রনির ঠোঁট নড়ল,—খেল তবে। শুরু কর।

ড্রাগন-লুড়ােয় ফের মেতেছে তিন বন্ধু। তাদের ছায়া পড়েছে দেওয়ালে। ছায়াগুলাে তিরতির কাপছে। ঠিক তখনই রাতচরা পাখিটা আবার ডেকে উঠল বিশ্রীভাবে।

ঘরের ছবিটা যেন বদলে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে। ক্রমশ চড়ছে গলা। চোখ লাল হচ্ছে তিন বন্ধুর। হুংকার আর তর্জন গর্জনে কেঁপে উঠছে বনবাংলাে। উন্মত্তের মতো শুরু হয়ে গেল মারপিট ।

হুবহু কালকের মতাে।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত