সেই রাতে

সেই রাতে

আমি, সুজিত, বিমল, সমীর, মানস – আমরা পাঁচ বন্ধু আমাদের অন্যতম বন্ধু ধীমানের আমন্ত্রণে তার গ্রামের বাড়ি নয়নসুখে গিয়েছিলাম তার বিয়ের বৌভাত উপলক্ষে। সেই স্কুলজীবন থেকেই আমাদের ছ’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব। স্কুলে একসঙ্গে পড়তাম। কলেজ জীবনও একই সঙ্গে কাটিয়েছি। তারপর আজ বছর তিন-চার গাঁটছড়ার গিট খুলেছে। মানে যে যার কর্মক্ষেত্রে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছি।

ধীমানদের প্রচুর জমি-জিরেত। বি এ পাশ করার পর সে অন্য কোনো কাজে না গিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষ করে। সে বিশেষ অনুরোধ করে আমাদের পাঁচ বন্ধুকে লিখেছে একে অজ-পাড়াগা, তার উপর তোদের এই বন্ধু আক্ষরিক অর্থেই যাকে বলে চাষা। এতে যদি তোদের মানের হানি না হয় তবে অবশ্য আসিস ।

একে শ্রাবণ মাস। ভরা বর্ষা। তায় হচ্ছে পাড়াগা। যাবার ইচ্ছে ছিল না। শুধু ধীমানের ঐ খোচাটুকুর জন্যই হয়তো যাব মনস্থ করলাম। আমাদের দলের মধ্যে ধীমানেরই প্রথম বিয়ে হচ্ছে।

সমীর বলল—বৌভাত সেরে সেদিনই কিন্তু আমাদের ফিরতে হবে। আমার মোটেই ছুটি নেই। অফিসে গোলমাল চলছে। অতি কষ্টে একদিনের ছুটি আদায় করেছি। মানস বলল—আমারও সেদিনই ফিরতে হবে ভাই। জরুরি কাজ রয়েছে। এদিকে আমি, বিমল আর সুজিত একসঙ্গে দক্ষিণ ভারত ঘুরতে যাব ঠিক করেছি। একমাস আগেই টিকিট কাটা রিজার্ভেশন সব হয়ে গেছে। ধীমানের বৌভাত বুধবার। আর আমাদের রওয়ানা হতে হবে শুক্রবার। সন্ধের দিকে ট্রেন। কাজেই বৌভাত সেরে সেদিনই রাতের ট্রেনে কলকাতায় ফিরে আসার ব্যাপারে সবাই একমত।

বৌভাতের দিন ভোরের ট্রেনে রওয়ানা হয়ে গেলাম। স্টেশন থেকে তিনটা রিকশা নিয়ে চললাম পাঁচজনে। মিনিট পনেরো চলার পর রিকশা দাড়িয়ে পড়ল। রিকশাওয়ালা বলল -রিকশা আর যাবে না বাবু। যাবার পথ নেই।

আমরা নেমে পড়লাম। জিজ্ঞাসা করলাম—এখান থেকে নয়নসুখ কত পথ হে? তা বাবু আধমাইলটাক হবে। এই আলপথ ধরে ধরে চলে যান। পৌছে যাবেন। দু’দিকে ধানক্ষেত। মাঝে সরু আলপথ। পাশাপাশি দুজনের চলার উপায় নেই। আমরা লাইন করে হাঁটছিলাম। পথের দু’পাশে কোথাও কোথাও খানা-ডোবাও রয়েছে। হাঁটছি তো হাটছিই। বিমল বলল—ধীমানটার বাড়ি কোন ধেদ্দেড়ে গোবিন্দপুরে রে ভাই! ওঃ, কি রাস্তা দেখেছিস।

সুজিত বলল-মোটেই আধমাইল রাস্তা নয়। মাইলখানেক হবে মনে হচ্ছে।

যাক, শেষ পর্যন্ত অনেকটা পথ ঠেঙিয়ে আমরা ধীমানদের বাড়িতে উঠলাম। আমাদের দেখে ধীমান খুশিতে কলরব করে উঠল—আরে আয় আয়। তোরা সবাই এসেছিস দেখছি। আমি তো ভাবতেই পারিনি সবাই আসবি। ওঃ, আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে: ধীমান যে কিভাবে আমাদের আপ্যায়ন করবে যেন ভেবে পাচ্ছে না। এই চা এল পরক্ষণেইবাটিভরা এত এত সর শুদ্ধ দুধ নিয়ে আসছে। চুমুক দিয়ে দেখি ক্ষীরের গন্ধ। ঘরের গরুর দুধ।

দুপুরে পাতে যা এক একখানা মাছভাজা ফেলল, ওজন হবে আড়াইশো গ্রাম করে। সব পুকুরের মাছ। সদ্য জল থেকে তোলা। টাটকা। খেতে যে কি চমৎকার স্বাদ!

সময়টা শ্রাবণ মাস। বিকেল চারটে নাগাদ আকাশ কালো করে মেঘ জমল। তারপর সে কি তোড়ে বৃষ্টি! সেইসঙ্গে জোর হাওয়া, ঝড়ো হাওয়া। সুজিত বলল—কি দারুণ দুর্যোগ করল রে, ফিরব কি করে!

ধীমান বলল—ধ্যাৎ, আজকে যাবি কি, আজ থাক। যাবার কথা কাল ভেবে দেখা যাবে।

আমরা রাজি হলাম না। রাত এগারটায় লাষ্ট ট্রেন। বৌভাতের খাওয়া সেরে ধীমান এবং তারমা-বাবা-ভাই-বোনেদের অনেক অনুরোধ উপেক্ষা করে রাত ন’টায় বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধের পর থেকে বৃষ্টিটাও ধরেছিল।

আবার সেই আলের পথ দিয়ে চলছি। এবারের যাত্রা আরও কঠিন। তখন ছিল দিনের আলো। পথ শুকনো। এখন ফুটফুটে অন্ধকার। বৃষ্টি হয়ে যাবার দরুন পথ পিছল। কাদায় পা বসে যায়। বাড়ি থেকে আসার সময় একটা টর্চও আনা হয়নি। পাড়াগাঁয়ে আসছি সেটা খেয়াল করা হয়নি। খানিকটা রাস্তা যেতেই আবার নামল প্রচণ্ড বৃষ্টি। সেইসঙ্গে ঝাড়ো হাওয়া। একেবারে সোনায় সোহাগা আর কি!

হঠাৎ যেন একটা চিৎকার শুনতে পেলাম। আমি ছিলাম সবার আগে। বললাম—কে চিৎকার করে উঠল মনে হচ্ছে।
পেছন থেকে ওরা বলল—কই না তো। আমরা তো কিছু শুনিনি। আর শোনা যাবে কি! বৃষ্টি আর হাওয়ার যা শব্দ!

যাবার পথে স্টেশন থেকে রিকশা পাওয়া যায়। ফেরার পথে রিকশাও পাওয়া যায় না। তার মানে পুরো রাস্তাটাই হেঁটে যেতে হবে। বড় রাস্তায় পড়ে দেখি ঝড়-বৃষ্টিতে ইলেকট্রিকের তার ছিড়ে গেছে। তাই গোটা এলাকা অন্ধকার। অন্ধকারেও এবার আমাদের খেয়াল হল—দলে আমরা চারজন অছি। আর একজন কই ?

কারও মুখ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। জিজ্ঞাসা করতেই একে একে সাড়া দিল সুজিত বিমল, সমীর। মানস? মানস কোথায়? মানস সবার পেছনে আসছিল। সে কি খুব বেশি পিছিয়ে পড়েছে? হঠাৎ আমাদের সামনের দিকে অনেকটা তফাৎ থেকে মানসের সাড়া পাওয়া গেল-—এই, আমি আগে আছি। তোরা আয়।

তাজ্জব ব্যাপার! আলের সরু পথে একজনকে পাশ কাটিয়ে তো আর একজনের এগিয়ে যাবার জো নেই। মানস সবার পেছন থেকে সবার আগে গেল কি করে! যাক-–আবার হাঁটতে লাগলাম, মানস আগে। আমরা পেছনে। এই দুর্যোগে পেছল পথে পা টিপে টিপে হাঁটতে গিয়ে আমাদের পাকা দু’ঘণ্টা সময় লেগে গেল স্টেশনে পৌছতে। স্টেশনে পৌছে দেখি গাড়ি ছাড়তে আর এক মিনিট বাকি। দৌড়ে গিয়ে একটা কামরায় উঠে পড়লাম। যাবার পথেই ফিরতি টিকিট কেটে রেখেছিলাম। ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি দুলে উঠল।

আবার দেখলাম আমরা চারজন। মানস ওঠেনি। আরে, মানস তো ওঠেনি। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে যে। দরজা খুলে গলা বাড়িয়ে দেখি ট্রেনের দিকে ছুটে আসছে মানস। হাত নেড়ে চেচিয়ে বলল– ভাবিসনে আমি পাশেই উঠছি ও লাফিয়ে অন্য কামরায় উঠল দেখতে পেলাম।

বিমল বলল—মানসটা কি উল্টোপাল্টা কাণ্ড শুরু করেছে দ্যাখ”। এই দেখি সবার পেছনে, আবার
দেখি সবার আগে। আমাদের আগে হেটে এল-আমরা উঠে পড়লাম আর ও উঠতে পারল না।
আমি বললাম— উঠেছে। অন্য কামরায়। রাতের ট্রেন। ভিড় নেই। বেশ ফাকা ফাকা। বৃষ্টিতে একেবারে ভিজে গিয়েছিলাম। কিটব্যাগ

থেকে তোয়ালে বের করে গা-মাথা মুছে ভেজা জামাকাপড় পালটে আয়েশ করে বসলাম। সেই ভোরবেলা থেকে ধকল যাচ্ছে। তার উপর এতটা পথ হাঁটার পরিশ্রম। গাড়ির দুলুনিতে ঢুলতে ঢুলতে ঘুমোতে ঘুমোতে ভোররাতে হাওড়া পৌছে গেলাম। মানসের সঙ্গে আর যোগাযোগ হল না।

সমীর বলল—মানসটা এমন ইয়ার্কি শুরু করল কেন রে! ওর কি হয়েছে বল তো!

আমরা যে যার বাড়ি ফিরলাম।

শুক্রবার সকালেই সেই মর্মান্তিক খবরটা জানতে পেরেছিলাম। ধীমানদের বাড়ি থেকে স্টেশনে আসার পথের পাশে একটা ডোবার মধ্যে মানসের মৃতদেহ দেখতে পাওয়া গেছে পরদিন সকালবেলা। মুখে মুখে খবরটা ছড়িয়ে পড়ায় ধীমানরাও কৌতুহলী হয়ে দেখতে এসেছিল। ওরাই মৃতদেহ সনাক্ত করে। ওখানকার পুলিশ কলকাতার পুলিশকে খবর জানায়। কলকাতা পুলিশ মানসদের বাড়িতে খবর দিয়ে গেছে। ঝড়বৃষ্টির মধ্যেও আমি তাহলে চিৎকারটা ঠিকই শুনেছিলাম। পা হড়কে ডোবায় পড়ে যাবার সময় মানসই চিৎকার করে উঠেছিল। মানস সাঁতার জানতো না তাই ডুবে মরল। সে আমাদের থেকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়েছিল এবং সে সময়ে প্রচণ্ড দুৰ্যোগ চলছিল বলে এত বড় ঘটনাটা ঘটে গেল অথচ আমরা টেরও পেলাম না।

কিন্তু আমি কি দেখলাম! আমি একা নই। আমরা সবাই দেখলাম। চোখের ভুল কি সবার একসঙ্গে হয় ?

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত