অশরীরী স্বামী

অশরীরী স্বামী

আমি ছাত্রাবস্থায় যখন বিলেতে থাকতুম, তখন হ্যাম্পস্টে হিথে মিসেস পেখি বর্ডেনের বোর্ডিং-হাউসে থাকতুম। থেকেই দোতলা বাসে চেপে লন্ডনে আসতুম।

ওই বোর্ডিং হাউসে একজন অসাধারণ সুন্দরী যুবতী থাকত। যুবতীর সৌন্দর্য কোনো উত্তাপ ছিল না, একটা স্নিগ্ধতা ছিল তার রূপে। অসামান্য দেহসৌষ্ঠব আর একজোড়া হরিণ নয়ন তাকে অতুলনীয় রূপের অধিকারিণী করেছিল। যুবতী ছিল অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ। আমার দেরি না হয়ে গেলে বাসস্টপে তাকে দেখতুম এবং একই বাসে আমরা লন্ডনে যেতুম। কিন্তু ফেরার সময় দেখা হত না। রাত্রে দেখা হত ডাইনিং-রুমে। ঘড়ি ধরে একই সময়ে সে খেতে আসত। তাকে দেখবার জন্যে ও তার সান্নিধ্য লাভ করবার জন্যে আমিও ঘড়ি ধরে চলবার চেষ্টা করতুম।

যুবতীর মুখে লক্ষ্য করতুম একই সঙ্গে দৃঢ়তা গাম্ভীর্য ও আত্মসম্মান ; কিন্তু তার সেই একজোড়া হরিণ-চোখ বলে দিত, কোথাও তার একটা গোপন ব্যথা লুকিয়ে আছে। কি সে গোপন ব্যথা তার আমি জানি না, জানবার চেষ্টাও করিনি ; কারণ যুবতী কারও সঙ্গে কথা বলত না। রাত্রে ডাইনিং হলেও না। সে কথা বলত একমাত্র মিসেস বর্ডেনের সঙ্গে। আর কারও সঙ্গে নয়। কেউ কথা বললে উত্তর দিতে চাইত না। আশ্চর্য ও অদ্ভুত।

এমন যুবতীর সঙ্গে কথা বলবার চেষ্টা না করাই ভাল। শেষে কি অপমানিত হব। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করতুম যে খাওয়া শেষ হবার পর সে বেশ প্রসন্ন। রাত যত এগিয়ে আসে, তার প্রসন্নতা তত বাড়ে। সকালে যে বাসি ফুল, রাত্রে সে যেন তাজা ফুল। কে এই অসামান্যা যুবতী?

কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে একদিন মিসেস বর্ডেনকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললুম।

অ, তুমি তো নতুন এসেছ, তাই জিনের বিষয় কিছু জানো না। ওর বিষয় আমি যা শুনেছি, তা বিশ্বাস করি না। কিন্তু তোমরা হিন্দু, তোমরা হয়তো বিশ্বাস করবে – মিসেস বৰ্ডেন বললেন।

আমার কৌতুহল আরো বেড়ে গেল। বললুম, তোমরা ইংরেজ, তোমরা বিশ্বাস করবে না আর আমি হিন্দু বলেই বিশ্বাস করব, কি ব্যাপার?

হা, তোমরা হিন্দুরা পরলোক-টরলোক বিশ্বাস কর তো, তাই বলছিলুম আর কি, জিন

বরোজের সঙ্গে কি একটা ভৌতিক ব্যাপার জড়িয়ে আছে। তাহলে কি আপনি বলতে চান যে মিস জিন মানবী নয়। কিংবা কায়াহীনদের সঙ্গে তার কোন যোগাযোগ আছে ?

মিস নয়, সে মিসেস জিন বরোজ হ্যাঁ সে মানবী। তবে সোজা কথায় বলি সে

রোজ রাত্রে কোন ভূতের সঙ্গে কথা বলে এবং সে-ভূত রোজ রাত বারটায় আসে। এই চাপেলে যখন টং টং করে বারটা বাজে, তখনই সেই ভূত ওর ঘরে আসে। তবে বেশিক্ষণ থাকে না, বড় জোর পাচ মিনিট।

মিসেস বর্ডেন এবং বোর্ডিং হাউসের কেউ কেউ জিনের দরজায় কান পেতে শুনেছে, সে যেন কার সঙ্গে কথা বলছে। তার ঘরে কোনদিন কাউকে ঢুকতেও দেখা যায়নি, বেরোতেও দেখা যায়নি। তার ঘরে টেলিফোনও নেই। জিন যখন কথা বলে, তখন আর কারও কণ্ঠস্বর শোনা যায় না।

চ্যাপেলের ঘড়িতে ঢং ঢং করে আর জিনের কথা বলা আরম্ভ ঘড়ি ধরে দেখা গেছে যে বারটা বাজলে শুরু হয়। কথা শেষ হয় ঠিক পাচ মিনিট কিংবা ছ’ মিনিটের মধ্যে। আর জিনও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ে। তবে ব্যতিক্রমও আছে। এক একদিন রাত্রে শোনা যায় জিন মৃদু ও কোমল স্বরে গান গাইছে। জিন ভারি সুন্দর গান গাইতে পারে, কিন্তু হাজার অনুরোধেও সে প্রকাশ্যে কখনো গান গায় না।

জিনের রহস্যটা কি তাহলে? সেটা জানতেই হবে। সেদিন ছুটি ছিল। বোর্ডিং-হাউস খালি। আমি এবং মিসেস বর্ডেন ছাড়া কেউ আর নেই। বেশ শীত পড়েছে। চারদিকে ঘন কুয়াশা। দিনের বেলাতেই আলো জ্বলতে হয়েছে।

উকি মেরে দেখলুম, মিসেস বর্ডেন কোমর পর্যন্ত কম্বলে ঢেকে ইজিচেয়ারে বসে। একখানা নভেল পড়ছেন।

এই উপযুক্ত সুযোগ। একটু চাপাচাপি করতেই মিসেস বর্ভেন রাজী হলেন। আমরা দুজনেই গুছিয়ে বসলুম। মিসেস বর্ডেন বলতে আরম্ভ করলেন । জিন বিধবা। ওর ছ’ বছরের একটি ছেলে আছে, ডেভিড। তারই জন্যে জিন সরকারী দপ্তরে চাকরি করে।

জিনের সঙ্গে আমার অনেক দিনের আলাপ। আমরা একই স্কুলে পড়তুম। জিন ছিল

ফুলের সেরা সুন্দরী, ধনীর কন্যা : জুড়ি গাড়ি চেপে ফুলে আসত। বালিকা বয়স থেকেই ঘোড়ার সখ ছিল। যখন বাচ্চা তখন ওর বাবা ওকে পনি কিনে দিয়েছিলেন। বড় হয়ে জিন ঘোড়ায় চড়তে শিখেছিল খুব ভালভাবে। অনেক প্রতিযোগিতায় জিনকাপ মেডাল পেয়েছে।

জিনের স্বভাব একটু স্বতন্ত্র ছিল। ও মোটেই পুরু-ঘেষা ছিল না। দরকার না হলে পুরুষের সঙ্গে কথা বলত না এবং যেটুকু দরকার তার বেশি কখনো বলেনি।

কত ধনী ও রূপবান যুবক তার সঙ্গে প্রেমালাপ করবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। পুরুষ সম্বন্ধে সে উদাসীন। তবে কারো সঙ্গে সে কথনো অভদ্র আচরণ করেনি। আমরা ধরে নিয়েছিলুন জিন ‘ওল্ড মেড’ থেকে যাবে-বিয়ে করবে না। সে নিজেও তাই বলত। সে বলত, আমি কোনদিনই বিয়ে করব না। তারপর মুচকি হেসে বলত আমি আমার ঘোড়া নিয়ে বেশ আছি। ঘোড়া আমার সব কথা শোনে, এমন কি চাবুক মারলেও কিছু বলে না। কোন পুরুষ কি মুখে লাগাম লাগিয়ে আমার চিরবাধ্য হয়ে থাকবে। আমি ভাই বেশ আছি। কোন ঝামেলা নেই।

জিনের বয়স এখন বোধ হয় বত্রিশ। আমার চেয়ে ও দু’ বছরের ছোট। ওঁর বয়স যখন পচিশ, তখন স্কটল্যাণ্ডের এক প্রাচীন ও অভিজাত পরিবার থেকে ওর নেমন্তন্ন আসে।

ঘোড়ায় চেপে সঙ্গে কুকুর নিয়ে বনে-পাহাড়ে ছুটে শেয়াল শিকার স্কটল্যান্ডের একটি সুপরিচিত থেলা। এই পরিবারের কত্ৰী লণ্ডনের কাছে অশ্বারোহণ প্রতিযোগিতায় জিনকে দেখে মুগ্ধ হন।

তিনি বলেন, সামনেই ফক্স হান্টিং সিজন, জিন যদি এই সময়ে স্কটল্যাণ্ডে তাদের ক্যাসেলে আতিথ্য গ্রহণ করে, তাহলে তিনি প্রীত হবেন। জিন কখনো স্কটল্যাণ্ডে যায় নি, ফক্স হান্টিংয়েও যোগ দেয়নি। সে নেচে উঠল।

জিন নিজের ঘোড়া নিয়ে স্কটল্যাণ্ডে গেল। ক্যাসেলটি প্রাচীন ও ভারি সুন্দর। বিরাট কম্পাউণ্ড। চমৎকার বাগান, নানারকম ফুলের শোভা। জিন খুশিতে টলমল। শৃগাল শিকার যেদিন শেষ হল, সেই দিন রাত্রেই গৃহকত্রী ডিনার ও বল ড্যান্সের আয়োজন করলেন। পার্টিতে এসেছে অভিজাত পরিবারের নরনারী, সুবেশ সুষমামণ্ডিত। জাতীয় পোশাক পরিহিত কয়েকজন ধনী ও স্কচ যুবকও এসেছে। তারা তো জিনকে দেখে মুগ্ধ।

সকলের সঙ্গে জিন কথা বলল, নাচলও কারো কারো সঙ্গে । কিন্তু কাউকে ধরাছোয়া দিল না। স্কচ যুবকেরা বোধ হয় হতাশই হল। জিনকে ঈর্ষা করতে লাগল। সমবেত যুবতীরা ; কারণ পার্টিতে সেদিন কোন অবিবাহিত যুবক কোন অবিবাহিতা যুবতীর সঙ্গে আলাপ করেনি। তারা জিনকে ঘিরে ভিড় জমিয়েছিল।

রাত যখন প্রায় বারটা বাজে, সেই সময় কে একজন জিনকে বলল আজকের রাত্রি হল হ্যালোউইন। স্কটল্যাণ্ডে এই হ্যালোউইন নাইটে নাকি বহু বিষয়কর বা এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে যে বুদ্ধিতে তার ব্যাখ্যা যায় না। মৃত ব্যক্তি আছে। তারা অনেক

রাতে ফিরে আসে, ভবিষ্যৎ কোন ঘটনারও আভাস বা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এমন কি অবিবাহিতা কন্যা তার ভাবী স্বামীরও দৰ্শন পায়, কিন্তু সে জন্যে কিছু রীতিনীতি পালন করতে হয়।

তুমি তো বিয়ে করবে না বলেছ, তাহলে আমাদের স্বটল্যাণ্ডে এই প্রাচীন ক্যাসেল আজ ঠিক রাত্রি বারটায় হ্যালোউইন নাইটে একবার পরীক্ষা করেই দেখ না।

এক মাথা সোনালী চুল-ভর্তি মাথা দুলিয়ে জিন খুব উৎসাহ প্রকাশ করল। সে যেন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ একটা করল। ঈষৎ লাল হল তার গাল। সে বলল, ঠিক কি করতে হবে বল। ভয় করবে না তো?

কিসের ভয়। ঘোড়ায় চড়ে লাফিয়ে বেড়া ডিঙতে পারি, আর এই এত বড় বাড়িতে, এত লোক গমগম করছে, সেখানে আমি ভয়ে মরে যাবো? বেশ, তাহলে নিচে ডাইনিং হলে চল। হল অন্ধকার থাকবে। টেবিলের ওপর দুটো নিভন্ত মোমবাতি থাকবে। তুনি একটা চেয়ারে চুপ করে বসে থাকবে, আর বারটা ৰাজার

সঙ্গে সঙ্গে তোমার ভাবী স্বামী তোমার পাশে এসে বসবে। আমি রাজি আছি। আমাকে একটা মোমবাতি দাও, আর আমি আমার সঙ্গে ঘোড়ার একটা চাবুক নেব৷ যদি কেউ বদমাইসি করে, তাকে উচিত শিক্ষা দোব।

একহাতে স্ট্যান্ডসুদ্ধ মোমবাতি আর অপর হাতে একটা চাবুক নিয়ে কার্পেটে-মোড়া সিড়ি দিয়ে জিন একা নিচে অন্ধকার ডাইনিং হলে নেমে গোল। তখনও  বারোটা বাজতে মাত্র দু তিন মিনিট বাকি আছে।

ডাইনিং টেবিলের একপাশে বাতিদান নামিয়ে সে একটা কাজ করল। ব্যাপারটার মধ্যে
ডাইনীদের যদি কোন কারসাজি থাকে, সেটা অনুমান করে একটা ডিক্যান্টারে মদ ঢেলে
ডিক্যান্টারটা মেঝেতে আছড়ে ফেলে দিল। সশব্দে ডিক্যানটার ভেঙে গেল, কাচের টুকরো
ও মদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ডাইনীর সব তুকতাক ব্যর্থ হবে।

এইবার সে চাবুকটা বেশ করে ধরে চেয়ারে বল। চেয়ারে বসতে না বসতে ঘড়িতে ঢং ঢং করে বারটা বাজতে আরম্ভ করল। দশটা ঘন্টা যেই বাজল, অমনি ঘরে যেন একটা দমকা হাওয়া উঠল। পর্দাগুলো সব দুলতে লাগল। ওপরে কিন্তু তখনও উৎসব চলছে।

জিন চমকে উঠল। তাহলে সত্যিই কিছু ঘটতে চলেছে। চেয়ার ছেড়ে জিন উঠে পড়ল। কি ঘটে দেখবার জন্যে একটা স্ক্রিনের আড়ালে চলে গেল। তারপর সত্যই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল। ভারী জুতোর শব্দ, গটগট আওয়াজ হচ্ছে, কে যেন অন্ধকারে এগিয়ে আসছে। তারপর কে যেন একটা আলো জ্বললো – না, দেশলাই নয়, চকমকি টুকে সে মোমবাতি জ্বলল। মোমবাতির চঞ্চল শিখায় এইবার জিন দেখতে পেল সুদর্শন দীর্ঘাঙ্গ এক যুবককে।

মাথা ভর্তি বাদামি কোকড়ানো চুল। সরু গোঁফ, বাদামি দাড়ি-তবে বেশি বড় নয়। তার পরনে ক্ৰচ হাইল্যাণ্ডারদের মত কিন্ট ও ম্পোরান, লাল জমির ওপর ঘোর নীল চেক, মাথায় ঈগলের পালক গোজা কানাওয়ালা বড়ো ক্যাপ। রহস্যময় সেই আগম্ভক টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। মাথার টুপিটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। কাধে চামড়ার ট্রাপে বাঁধা যে তলোয়ারটি ঝুলছিল, সেটি মাথা গলিয়ে খুলে স্ট্যাপসমেতই টেবিলের ওপর আস্তে আস্তে নামিয়ে রাখল। এরকম তলোয়ার আজকাল কেউ ব্যবহার করে না, দু দিকেই বার, লম্বা হাতল, কারুকার্য খচিত। তারপর জিন যে চেয়ারটিতে বসেছিল, তার পাশের চেয়ারটাতে বসল। কি যেন বলছে। হ্যাঁ জিন শুনতে পাচ্ছে। সে প্রাচীন স্কচ ভাষায় বলছে  বিড়বিড় করে !

দুর্যোগপূর্ণ রাত্রি, এমন রাত্রে বাইরে কেউ বেরোয় না” তারপর সে দু হাত দিয়ে মাথা ধরল।

ওপরে তখন কেউ পিয়ানো বাজাচ্ছে। নিচে কিন্তু জিন সম্পূর্ণ একা। আর সেই রহস্যময় আগন্তুক। জিনের বুক ঢিপ ঢিপ করছে। আগম্ভক একবার ঘরের চারদিকে চেয়ে দেখল, যে স্ক্রিনের আড়ালে জিন দাঁড়িয়েছিল, সেদিকে তার দৃষ্টি কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে থেমে রইল। তারপর সে উঠে দাড়াল। টুপিটা মাথায় পরল।

‘জিন লক্ষ্য করল, তার গা দিয়ে জল ঝরছে। বাইরে কি বৃষ্টি পড়ছে হবে হয়তো। আগন্তুক একবার সেই তলোয়ার আর চামড়ার সাপের ওপর হাত বুলাল, তার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে একটি একটি করে পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘরের দরজা আপনা আপনি বন্ধ হয়ে গেল। জিন স্বপ্ন দেখছে না তো! বাইরে বৃষ্টি পড়ছে? সে জানতে পারেনি কেন। উত্তেজনা। তাই হবে বোধ হয়।

জিন ওপরে উঠে গিয়ে তার হসটেসকে ডেকে নিয়ে এল। তিনি এসে স বিস্ময়ে দেখলেন, তখনও চেয়ারের ওপর জল রয়েছে। টেবিলের ওপর রয়েছে সুপ্রাচীন সেই তরবারি, দীর্ঘদিন ব্যবহারে যার হাতল মসৃণ হয়েছে। তাহলে একজন এসেছিল। পরদিন তরবারিটি একজন অ্যান্টিকোয়ারিয়ানকে দেখানো হল। তিনি পরীক্ষা করে বললেন যে, এই ধরনের তরবারি যোড়শ শতকে ব্যবহৃত হত।

তরবারিটি ডাইনিং হলে ফায়ারপ্লেসের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হল। যদি কোন দিন লোকটি তরবারির জন্যে ফিরে আসে। কিন্তু তরবারি নিতে কেউ এল না।

এরপর প্রায় এক বছর কেটে গেছে। সেই স্কটিশ মহিলা জিনের কাছ থেকে একখানা চিঠি পেলেন। আনন্দ সংবাদ। জিন চিঠি লিখেছে, সে বিয়ে করতে যাচ্ছে। তার স্বামীর নাম ডেভিড, সর্বদা বই নিয়েই পড়ে থাকে। চাকরি একটা করে, কৃষি মন্ত্রকে সে একজন অর্থনীতিবিদ। ডেভিড এক প্রাচীন বংশের সন্তান। কয়েক শত বৎসর পুরনো নাকি তার বংশ।

মহিলা খুব খুশি হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ লিখলেন যে, বিয়ের পরই জিন আর ডেভিড তাদের হনিমুন কাটাতে যেন তার ক্যাসেলে আসে। তাদের কোন অসুবিধে হবে না। বিয়ের কিছুদিন পরে ডেভিডকে নিয়ে জিন স্কটল্যান্তে সেই ক্যাসেলে এল।  ঝড়বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেছে। ঘোড়ার গাড়িটি অতি কষ্টে চড়াই অতিক্রম করে ক্যাসেলে হাতায় ওদের পৌঁছে দিল।

হাসি মুখে মহিলা ওদের অভ্যর্থনা জানিয়ে জিনকে নিচু গলায় বললেন, জিন, তোমার কি মনে পড়ে, আজ কি রাত্রি। আজই সেই হ্যালিউইন নাইট।

ডেভিড তখন তার রেনকোট থেকে হাত দিয়ে বৃষ্টির জল ঝাড়ছিল। মহিলার কথা শুনতে পায়নি।

জিন বলল, ও কথা বলো না, ও কিছুই জানে না, ডেভিডকে আমি কিছুই বলিনি। ডেভিড চারদিক তখন চেয়ে দেখছে। এমন ভাবে চাইছে যে , বাড়িতে সে যেন আগেও এসেছিল, এ যেন তার চেনা বাড়ি।

জিন ডেভিডকে মহিলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। ডেভিডের সেদিকে মন নেই। সে তখন ঘরের ভেতর দেখছে। তারপর সে মন্ত্রমুখের মত বাড়ির ভেতর ঢুকল। হল পার হয়ে ঢুকল ডাইনিং হলে। কোন দিকে না চেয়ে ডেভিড ফায়ারপ্লেসের কাছে গিয়ে সেই প্রাচীন তরবারিটি স্ট্যাপসমেত নামিয়ে নিজের কাধ দিয়ে ঝুলিয়ে দিল। জিন আর সেই মহিলা অবাক বিস্ময়ে ডেভিডকে দেখছে। তাদের মুখ দিয়ে কথা সরছে না। তারা স্থানুবত দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পরছে, বাতাস উতলা।

তারপর ডেভিড একটি একটি করে পা ফেলে গেল ঘর থেকে বেরিয়ে গেল । স্পষ্ট শোনা গেল, যাবার সময় সে বিড়বিড় করে বলছে : দুর্যোগপূর্ণ রাত্রি, এমন রাত্রে বাইরে কেউ

বেরোয় না” ঠিক সেই কথাগুলি, যে কথাগুলি গত বছরে হ্যালোউইন নাইটে সেই অজানা ও রহস্যময় পুরুষ ওই চেয়ারটায় বসে বলেছিল।

ডেভিড যখন বাইরে বেরিয়ে গেল, তখন জিন ও সেই মহিলা তাদের সম্বিত ফিরে পেল। তারা লোকজন ডাকাডাকি করল।

ম্যাকিন্টশ গায়ে দিয়ে হাতে আলো নিয়ে লোকজন আতিপাতি করে খুজে বেড়াল, কিন্তু ডেভিডকে কোথাও খুজে পাওয়া গেল না। এমন কি ক্যাসেলের পাঁচিলের ওপারে নিচে যে ছোট নদী বয়ে গেছে, সেখানেও নয়, কোথাও নয়। ডেভিড যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে।

জিনের সন্তান হল। জিন তার নাম রাখল ডেভিড। কিন্তু ডেভিডের পিতা কি তাহলে সেই অশরীরী ব্যক্তি, যে এখনও প্রত্যহ চ্যাপেলে রাত্রি বারটার শেষ ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে জিনকে দেখা দেয়?

জিন তার কুমারী বেলার উপাধি ব্যবহার করে, জিন বরোজ। সে আর কোনদিন আর কোন পুরুষকে বিবাহ করেনি, করবেও না।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত