তৃপ্তি আমার

তৃপ্তি আমার

বলাকার আনন্দে লাফানোর ভঙ্গিমাটা প্রায় নাচের মতো হয়ে গিয়েছিল আর কি! ছোট দেওরের ছেলে জন্টি – জ্যেঠিমাকে অমন লাফাতে দেখে অবাক বিস্ময়ে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। বলাকা তড়িঘড়ি রান্না ঘর থেকে কেটে পরে, পা চালিয়ে দোতালায় নিজের শোবার ঘরে চলে গেলেন। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে দ্রুত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে…!
উফ্! কি আনন্দ ,কি আনন্দ! এইবার সত্যি সত্যি প্রায় ‘রাশিয়ান -ব্যালেই’ যেন নেচে ফেললেন বলাকা।
অবশেষে…!

গড়পড়তা বাঙ্গালী মেয়েদের মতোই তেইশ বছর বয়সে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর পরই গড়িয়ার ভট্টাচার্য বাড়িতে সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছিল বলাকার। স্বামী তপন রেলে চাকরি করেন, বয়সে বলাকার থেকে প্রায় বছর দশেকের বড়। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, আর দুই দেওর। মোটামুটি ছিমছাম পরিবার। প্রথাগত সুন্দরী বলতে যা বোঝায় তা কোনোওদিনই নন বলাকা – উচ্চতা মেরেকেটে পাঁচ ফুট, মুখশ্রী ও সাধারণ । কিন্তু ফিগারটা ছিল ঈর্ষণীয় । সব মিলিয়ে ভারী ভালো দেখাত বলাকাকে। কলেজে পড়ার সময় ছেলেরা বেশ পছন্দই করতো,প্রচুর প্রেম পত্র -টত্র ও পাওয়ার অভ্যেস ছিল, বিয়ে বাড়ি-টাড়িতে গেলেও বেশ মনোযোগ পেতেন বলাকা। ছেলে মেয়ে, মাসি- পিসি -কাকি নির্বিশেষে বলতেন -‘ বলাকার ফিগারটা এত সুন্দর ছিপছিপে যে, যে কোনোও পোষাক বা রঙেই ওকে ভারী মানায়! ‘
প্রশংসা ভরা স্তুতি- বাক্যগুলো খুব উপভোগ করতেন বলাকা নিজে!

এরকমই কোনো এক বিয়েবাড়িতে বলাকার স্বামী তপনের বাবা -মা বলাকাকে দেখে পছন্দ করেন। তপনের সরকারী চাকরি, নিজস্ব পৈতৃক বাড়ি, পালটি ঘর দেখে – বলাকার বাবা মা ও রাজী হয়ে যান। আজ থেকে প্রায় আঠাশ বছর আগে এভাবেই বলাকার বিয়েটা হয়ে যায়।

একান্নবর্তী পরিবারে বড় বউ হয়ে সমস্ত দায়- দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে পাকা গিন্নি পদে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যান বলাকা।

-‘ ঘোর -সংসারী’, ‘ ‘রন্ধন পটিয়সী,’ ‘ গৃহকর্মে- নিপুণা’ এইসব মনোরঞ্জক বিশেষণে ভূষিতা হয়ে বেশ আনন্দেই ছিলেন এতগুলো বছর বলাকা!

কিন্তু বছরদুয়েক আগে মামাতো ননদের মেয়ের বিয়েতে গিয়ে বাধল গোল!
চাকরী সূত্রে বলাকার দুই ছেলেই কলকাতার বাইরে থাকে। বলাকার হাতে এখন বেশ অখণ্ড অবসর। সংসারের সব রকম দায়িত্ব পালন করেও- টিভি দেখে ,গল্পের বই পড়ে দিব্যি দিন কেটে যাচ্ছে , যায়।

বিয়ে- বাড়ির দিনও মেজ দেওরের মেয়ে রিমলি আর ছোট দেওরের ছেলে জন্টিকে বলাকার জিম্মায় রেখে ওদের মায়েরা বিউটি পার্লার থেকে গিয়ে বেশ গুছিয়ে সেজে এসেছিল। তারপর বাড়ির সবাই মিলে বিয়ে বাড়িতে যাওয়া হয়েছিল।

আজকালকার ট্রেন্ড অনুযায়ী – কনে বউকে নিয়ে সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে গেছিল। বলাকা পার্লারে যদিও যাননি, কিন্তু নিজের মতো করে বেশ ভালোই সাজ গোজ করেছিলেন। কনের পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলার সময় হঠাৎ ই বলাকার কানে আসে কনে অর্থাৎ মামাতো ননদের মেয়ে তুয়ার বান্ধবীদের মন্তব্য!

-” দেখ দেখ, ওই মুটকি ভদ্রমহিলা কি প্রচন্ড সেজেছেন! কি ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে রে ওনাকে।”
-” উনিও আবার সেলফি তুলছেন? একে তো কি ভয়ঙ্কর মোটা। তায় মাথার সামনেটায় চুল নেই, তার মধ্যে আবার সবুজ- লাল কম্বিনেশনের জমকালো কাঞ্জিভরম সিল্ক পরেছেন। ইস! ওনার বাড়িতে কি আয়নাও নেই? নিজের ফিগারটা যে এত বিচ্ছিরি -সেটা উনি বোঝেন না? ”
-” আজকাল প্রত্যেকেই কত ফিগার সচেতন। অথচ এনাকে দেখো! ”

বান্ধবীদের মন্তব্যগুলো বিয়ের কনে তুয়ার কানেও গেছিল! স্বভাবতই মেয়েটি খুব লজ্জা পেয়ে যায়, ওর বলাকা মামীর কাছে ক্ষমাও চায় বন্ধুদের অসভ্যতার জন্য।

কিন্তু, বলাকার পৃথিবীটা যেন একদম ভেঙ্গেচুরে চুরমার হয়ে যায়!
সত্যিই তো! একটু একটু করে কবে যে এমন বিচ্ছিরি ফিগারটা হয়ে গিয়েছে বলাকার – সেটা খেয়ালই করেননি কখনো উনি নিজে! বাড়ির কেউ – মানে স্বামী তপন , দুই ছেলেরা বা অন্য কেউই তো কখনো কিছু বলেননি ! তার মানে কবে থেকে যেন এই একটু একটু করে ফুলে-ফেঁপে ওঠা সাংঘাতিক মোটা চেহারাটাই বলাকার ‘নিজস্ব- ট্রেডমার্ক ‘ হয়ে গেছে !

ইস! নিজের চেহারা যে এতটা বিসদৃশ হয়ে গিয়েছে , সেটা বলাকা নিজে কখনো বুঝতেই পারেননি? সংসার- সংসার করে এতটাই মাতোয়ারা থেকেছেন চিরকাল যে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গেও তো তেমন আর যোগাযোগ নেই। ফেসবুক -হোয়াটসঅ্যাপে সামান্য যোগাযোগ আছে বটে – কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনো গেট টুগেদারে যেতে বা আড্ডা মারতে কোনোও শপিং মলে জড়ো হতে কখনো ইচ্ছে হয় নি। হয়তো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে – সমবয়স্কদের দেখে নিজেকে পাল্টানোর একটা ইচ্ছে কোথাও হতো মনের মধ্যে! অবশ্য তাও বা বলেন কি করে বলাকা! বলাকার যে মামাতো ননদের মেয়ের বিয়েতে আজ এসেছেন তিনি – সেই ভদ্রমহিলার চেহারাও তো এখনো কত সুন্দর আছে! এগুলো কি কোনদিনও চোখে পড়লো না বলাকার এই এতগুলো বছর ধরে…!

সংসারে নিজের জায়গাটা সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়ে, দুই ছেলেকে কর্ম- যোগ্য করে ফেলতে পেরে এতটাই আত্মতৃপ্তিতে সন্তুষ্ট থেকেছেন মনে প্রাণে যে নিজের চেহারাটা যে কবে এমন ভীষণ -দর্শন হয়ে গেছে তা খেয়ালই করতে পারেননি!

বিয়ে বাড়ি থেকে বাড়ি ফিরে এসে সেদিন খুব কেঁদেছিলেন বলাকা। বাড়ির লোকেরা প্রথমে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন – তার পরেও বলাকার কান্না এবং ক্ষোভ কোনোওটাই কমছে না দেখে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে যে যার নিজের ঘরে চলে গেছিলেন। স্বামী তপনও প্রথম টা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, আর তারপরে হাবে-ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে – জীবনে তেমন কোনোও সমস্যা নেই বলেই হঠাৎ করে একটা কোথাকার কারা কি মন্তব্য করল সেই ব্যাপারটাকে এত গুরুত্ব দিয়ে, নিজের সমস্যাহীন জীবনে সমস্যা তৈরি করে শুধু শুধু কান্নাকাটি করছে বলাকা! এই ব্যাপারটা বলাকার দুঃখ বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়!

সেদিন রাত্রে দু চোখের পাতা এক করতে পারেননি বলাকা। গোটা রাতটা নির্ঘুম কাটিয়ে যেন মুখোমুখি হয়েছিলেন জীবনের এক অত্যন্ত কঠিন, কঠোর ,চূড়ান্ত সত্যের!

সেদিন বলাকা বুঝতে পেরেছিলেন – ভট্টাচার্য্য পরিবারের বড় বউ হয়ে, সংসারের ঘূর্ণাবর্তে নিজেকে এতটাই জড়িয়ে তিনি ফেলেছেন যে – তার নিজের অস্তিত্ব বলে তার নিজের কাছেই আর কিছুই অবশিষ্ট নেই! তাই তিনি যখন মন খারাপের কথাটা বাড়ির সকলকে বলতে গেলেন – তখন ব্যাপারটা তাদের কাছে খুব অস্বস্তিকর হলো। কারণ , ‘এ সংসারটার ভালো-মন্দ দেখা ছাড়া আর অন্য কোনোও দিকে মন দেবার প্রয়োজন বলাকার নেই!’ এটাই যেন ধ্রুব সত্যি বলে মানেন বলাকার বাড়ির লোকজন।

পরের দিন ভোর থেকে তাই নিজের কাছে নিজেই কঠিন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন বলাকা। ঠিক করলেন এবার থেকে নিজেকে সময় তো দেবেনই, সাথে সাথে পরিবারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব গুলো একটু একটু করে অন্যদের বুঝিয়ে দেবেন। আর…!

দু’বছর একটা দীর্ঘ সময়। দু’বছর ধরে দাঁতে দাঁত চেপে আজকের দিনটার অপেক্ষা করে গেছেন বলাকা। প্রথম প্রথম অজস্র টীকাটিপ্পনী সহ্য করতে হয়েছে তাকে। বলাকা এতটুকুও দমে যাননি। পাখির চোখের দিকে তাকিয়ে অর্জুন যেমন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে তীর ছুঁড়ে ছিল – বলাকার নিজেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও ছিল তেমনই অব্যর্থ!

আগে বলাকার ভোরবেলা শুরু হতো – পরিবারের সকলের জন্য বেড- টি বানানোর কাজ দিয়ে।আচমকা বাড়িতে তিনি ঘোষণা করলেন – আগামীকাল থেকে মর্নিং -ওয়াকে যাবেন। দুধ চিনি দিয়ে চা ও আর খাবেন না। অতএব বেড

-টি তার পক্ষে আর বানানো সম্ভব নয়। কারণ মর্নিং- ওয়াক সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে যথেষ্ট বেলা হয়ে যাবে।
প্রথম প্রথম মিনিট দশেক হাঁটলেই কি অসম্ভব পা ব্যথা যে করত বলাকার – তা আর বলার নয়। কিন্তু নিজেকে নিজে প্রতিজ্ঞা করেছেন – দাঁতে দাঁত চেপে চোখের জল সামলিয়ে হাঁটতে শুরু করতেন। ঘড়ি ধরে প্রত্যেকদিন হাঁটবার সময়টা একটু একটু করে বাড়াতে লাগলেন। ‘রামকৃষ্ণ পার্ক ‘এর কাছাকাছি বড় মাঠটাতে প্রচুর মহিলা পুরুষ বসে বসে প্রাণায়ম করেন। বলাকা তাদের দলে যোগ দিলেন। প্রথম প্রথম কিছুই পারতেননা। কিন্তু উপস্থিত মানুষজন খুব সাহস যোগাতেন। বলতেন -” হাল ছাড়বেন না। করতে করতেই হবে। ”

বলাকা হাল ছাড়েননি। ধীরে ধীরে বেড়েছে দম, মনে এসেছে সাহস আর আত্মপ্রত্যয়। এক ভদ্রমহিলা পেশায় ডায়েটেসিয়ান। উনি স্বতপ্রণোদিত ভাবেই উৎসাহী মানুষদের ডায়েট চার্ট টা ঠিক করে দিতেন। বলাকার নতুন খাদ্যাভ্যাসের তালিকাও উনি ঠিক করে দিলেন। সেই নিয়ে বাড়িতে ধুন্ধুমার। বলাকা নাছোড়! সকলের টিফিন, দুপুরের খাবার ,রাতের খাবার আগের মতনই রেঁধে বেড়ে দিয়ে- বলাকা নিজেরটা অন্যরকমভাবে করে নিতে থাকলেন। ভাত খাওয়ার পরিমাণ দিলেন কমিয়ে, ফ্যাট জাতীয় জিনিস বহুলাংশে পরিত্যাগ। ভাজাভুজি, মিষ্টি, জাঙ্ক ফুড – স্বেচ্ছায় বন্ধ করে দিয়ে ফল-মূলে মনোনিবেশ করলেন বলাকা।

যৌথ পরিবারে নেমন্তন্ন লেগেই থাকে। বলাকা যেতেন প্রত্যেকটি জায়গাতেই – আগের মতই। কিন্তু কোথাও খেতেন না কিছুই। এই নিয়ে কত যে শ্লেষাত্মক কথাবার্তা শুনে হেনস্থা হতে হয়েছে বলাকাকে! অনেকে তো এমনও বলেছেন – যে বলাকা না খেয়ে- ইচ্ছাকৃত অপমান করছেন গৃহকর্তাদের। বলাকা স্মিত হাসি হেসেছেন। এতকিছু করেও কিন্তু ওজন কমার তেমন কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিলোই না। পুজোর ছুটিতে বাড়িতে এসে – বলাকার দুই ছেলেও বলাকাকে বলল -“ওজন একবার বেড়ে গেলে সেটা কমানোটা অসম্ভব ব্যাপার! ”

বলাকা আবার শোবার ঘরে গিয়ে লুকিয়ে চোখের জল ফেলেছিলেন সেদিন। খুব কষ্ট হয়েছিল! মনে হয়েছিল ছেলেগুলো তো অন্তত নিজের মাকে এতটা নিরুৎসাহিত নাই করতে পারত!
কিন্তু বলাকা দমে যাননি। মর্নিং ওয়াকের বন্ধু -বান্ধবীদের বলা কথাগুলো কানে ভাসছিল!

-” হাল ছেড়ো না বন্ধু। ”
বিয়ের আগে খুব যত্ন নিয়ে ঘরোয়া সামগ্রী দিয়ে রূপচর্চা করতেন বলাকা আর পাঁচটা সাধারণ মেয়েদের মতই। বিয়ের পর এই ব্যাপারগুলো আস্তে আস্তে কেমন যেন অন্যান্য নানাবিধ কাজ কর্মের চক্করে পড়ে খসে পরেছিল জীবন থেকে। এমনকি বাড়িতে বলাকার দুই জা নিয়মিত পার্লারে গিয়ে নিজেদের ঘষামাজা করতে অভ্যস্ত। বলাকার যে কখনো কেন সে ব্যাপারটাও মনে আসেনি! কখনো যে কেন নিজেকে একটু চর্চিত করতে ইচ্ছে হয় নি!

ইউটিউব খুলে বিভিন্ন সাইটে গিয়ে ভিডিও দেখে দেখে – ঘরোয়া সামগ্রী দিয়েই সেই মেয়েবেলার মত রূপচর্চা আবার শুরু করলেন বলাকা। নিজেকে বোঝালেন – একদিনে যেমন চেহারা খারাপ হয়নি, তেমন একদিনে সুন্দরীও হওয়া যাবে না। অতএব অভ্যেসটা নিয়মিত রাখতেই হবে। নিয়মিত বেসন ,টক দই ,টমেটো, শসা, বাড়িতে লাগানো অ্যালোভেরা গাছের পাতার নির্যাস – এইসব দিয়েই দিব্যি নিজের মতো করে জমিয়ে রূপচর্চা চালাতে লাগলেন বলাকা।

সংসারের এতদিনকার অভ্যস্ত ,নিয়মিত সমস্ত কাজকর্ম করেও যে নিজের জন্য এতটা সময় বের করা যায় – খবরের কাগজে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে বারবার পড়া -‘ টাইম ম্যানেজমেন্ট’ শব্দটা যে কিভাবে নিজের জীবনেও সুন্দরভাবে প্রয়োগ করা যায় – এ সব কিছুই হয়তো অজানা থেকেই যেত বলাকার যদি না নিজেকে মেজে ঘষে, ঘাম ঝরিয়ে আদ্যোপান্ত পরিবর্তন করবার চ্যালেঞ্জটা না নিতেন!

বলাকার মামাতো ননদের মেয়ে তুয়ার বিয়েতে গিয়ে , আজ থেকে ঠিক দু বছর আগে বলাকার জীবনের মোড়টাই যেন ঘুরে গেছিল! কত তুচ্ছ তাচ্ছিল্য, অপমানজনক কথা বার্তা, মন খারাপ করিয়ে দেওয়া আচরণ, মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য নিজের আপনজনেদের তৈরি করা নানা রকম অদ্ভুত ধরনের ষড়যন্ত্র (বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বাজার থেকে ছোট মাছ না এনে তৈলাক্ত বড় মাছ আনা, চিকেনের পরিবর্তে ফি সপ্তাহে মাটনের বন্দোবস্ত করানো, যখন-তখন পিৎজা, পেস্ট্রি অথবা বার্গার নিয়ে এসে বলাকাকে সাধাসাধি করা খাবার জন্য… আরো আরো নানা ধরনের ষড়যন্ত্র। )

সত্যি সত্যিই বাড়ির গৃহিণী স্থানীয় মহিলা যখন নিজের অতিরিক্ত ওজন কমানোর জন্য বদ্ধপরিকর হন – তখন বলাকার মত এমন ‘মর্মান্তিক’ অভিজ্ঞতা কম বেশী প্রত্যেকেরই থাকে বোধহয়!

অবশেষে আজ এলো সেই বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণ! অনেক প্রতীক্ষার পরে, দীর্ঘ দু’বছরের কঠোর তপস্যায় পরে আজ এলো সেই সময়…!

বর আর শ্বাশুড়ি মাকে নিয়ে মামাতো ননদের মেয়ে তুয়া আজ সকালে এসেছিল ছেলের অন্নপ্রাশনের নেমন্তন্ন করতে। আগে থাকতে বলাই ছিল। সেই মতো অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা রেখেছিলেন বলাকা।

তুয়ার বর শুভজিৎ মাংসের চপ, নারকেলের তক্তি, ভেজিটেবিল স্প্রিং রোল – এই সবকিছু বলাকা নিজে হাতে বাড়িতে বানিয়েছেন শুনে ভীষণ আপ্লুত হয়ে গেল। শুভজিৎ এর মা বলাকার দুই জা, দেওর আর স্বামী তপনের সামনে বলাকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। শুভজিৎ বলল -” বলাকা -মামীমাকে দেখে কিছু শেখো তুমি তুয়া। ওনার ফিগার আর স্কিন দেখে তো মনে হয় উনি তোমার থেকেও বোধহয় বয়সে ছোট। কি দারুণ মেনটেন করছেন নিজেকে। একদম আলট্রা -মডার্ন নো মেকআপ লুক যাকে বলে! আবার খাবার-দাবার গুলো বানিয়েছেন পাক্কা প্রফেশনাল শেফেদের মত । হ্যাটস অফ বলাকা মামীমা। তুয়ার এক দল ভুলভাল বন্ধু-বান্ধব আছে। যাদের সঙ্গে সারাদিন হাহা- হি হি করেই তুয়া টাইম -পাস করে। তুয়়া আর ওর সব বন্ধুদের আপনি কিন্তু রীতিমত ক্লাস নিতে পারেন। নিজেকে এই বয়সেও রীতিমত সুন্দরী রেখে কিভাবে বাড়ির সব কাজেও এতটা পারফেকশন আনা যায় – তা আপনাকে দেখে শিখতে হয় বলাকা মামীমা। ”

তুয়া ,শুভজিৎ আর ওর মা চলে গেছে অনেকক্ষণ। বলাকার দুই জা মুখ হাঁড়ি করে যে যার নিজের ঘরে। রান্নাঘরের সিঙ্কে এঁটো বাসন -পত্র গুলো সব গুছিয়ে রাখছিলেন বলাকা। মনটা যে কি অসম্ভব ফুরফুরে লাগছে! দু বছরের দাঁতে দাঁত চেপে কৃচ্ছ্রসাধন আজ সর্বতো অর্থে সার্থক হল তবে ! হঠাৎ চমকে পেছন ফিরে বলাকা দেখলেন তপন দাঁড়িয়ে আছেন। কেমন যেন চোর চোর মুখ করে আঠাশ বছরের পুরোনো স্বামী ভদ্রলোকটি অত্যন্ত লাজুক গলায় বললেন –

“তোমার জন্য সত্যিই গর্ব হচ্ছে। ”
কথাগুলো বোধহয় অনেকদিন ধরেই বলবার কথা ভাবছিলেন তপন। আজ কোনক্রমে কথা কটা বলে ফেলে কোথায় যে পগার পার হয়ে গেলেন!

বলাকার ছোট দেওরের ছেলে জন্টি ঠিক সেই সময়েতেই ফ্রিজ খুলে বোতল নিয়ে জল খাবে বলে রান্না ঘরে ঢুকেছিল। অবাক বিস্ময়ে জন্টি দেখলো জ‍্যেঠিমা নাচছেন!

বলাকারা তাহলে ইচ্ছে করলে অসাধ্য সাধন করতে পারেন এইভাবেই। দরকার শুধু নিজের উপর আস্থা, ধৈর্য আর কখনো হার না মানার , হাল না ছাড়ার নিজেকে নিজেই দেওয়া প্রতিশ্রুতি। দুঃখের কালো রাত্রির পর যেমন ভোরের সূর্যোদয় অবশ্যম্ভাবী সত্য – তেমন অনেক প্রতীক্ষার পরে, অনেক চোখের জল, পরিশ্রম আর কঠিন লড়াইয়ের পরে -সব বলাকা দের জীবনেই সাফল্য খুব মধুর ভাবে আসে -আসবেই! আর সেই আনন্দের ক্ষণে নিজের পিঠ চাপড়ে নিজেকে বলতে ইচ্ছে করে বোধহয় -“ওরে মন তোকে দিলাম কানায় কানায় পূর্ণ হওয়া আমির সবটুকু সাফল্য। তোকে দিলাম তৃপ্তি আমার!”

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত