ছাতা

ছাতা

হাল্কা মেরুন রঙের ছাতাটা খুঁজে পাচ্ছেন না বাদল দত্ত। জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলা মোট্টেও তাঁর অভ্যেস নয়। পছন্দ তো নয় বটেই। আপনি বলতেই পারেন, ছাতা জিনিসটাই অমন। যখন-তখন হারায়। বিশেষত সে ছাতা যদি সরকারি আপিসের কো-অপারেটিভের কেজি দরে কেনা ছাতা হয়, তাহলে তো বটেই। তাছাড়া, বর্ষাকালে ছাতা চুরি বলুন, ছাতা হারানো বলুন – এসব দোষের মধ্যে ধরা যায়না। কিন্তু না। ব্যাপারটা আপনি যতটা সহজ ভাবছেন তা মোটেও নয়। বাদল বাবুর ছাতার ভেতরে সিডি মার্কার দিয়ে গোটা গোটা শব্দে লেখা আছে, “If found, please call 983….” অন্যের ছাতার সঙ্গে গুলিয়ে গেছে বললেই হল আর কি! তথাপি কেলেঙ্কারিটি ঘটেছে। এক শুক্রবার ভরা শ্রাবণের জোর বৃষ্টিতে ছাতা হারিয়ে কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফিরতে একরকম বাধ্য হয়েছেন বাদল দত্ত।

বাদল বাবুদের একান্নবর্তী পরিবারে তাঁর পারিপাট্য যথেষ্ট ঈর্ষার ব্যাপার। নিজের পারিপাট্য বজায় রাখতে বাদলবাবু বাড়ির মানুষজনের উপর ভয়ানক উৎপাত করে থাকেন। এ হেন পরিস্থিতিতে তাঁকে ভিজে ফিরতে দেখে, বৌদি, ভাইপো-ভাইঝি, মায় বাড়ির পোষা কুকুর টেলো পর্যন্ত ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হেসেছে। মা অবশ্যি ব্যাপারটাকে মজার ছলে নেননি। বর্ষায় ছাতা হারিয়ে ফেলা তাঁর মতে ঘোরতর অপরাধ। ফলে তিনি ৫১ বছরের বাদল বাবুকে ১৫ বছরের কিশোরের মতই, “জিনিসপত্রের যত্ন নাও না… সব ধ্বংস করে ফেল। হে ভগবান, এই ছেলেকে নিয়ে আমি কী করব?” ইত্যাদি দুচার কথা শুনিয়ে দিয়েছেন।

পরদিন মাঝদুপুর নাগাদ বাদল দত্তের ঐ ৯৮৩… নম্বরটিতে ফোন আসে। ফোন আসে মানে, ফোনটা বাজে। কিন্তু কোন নম্বর দেখা যায় না। বাদলবাবু শনিবারের দুপুরের ভাতঘুমের মেজাজে ছিলেন, ফোন তুলে অত্যন্ত বিরক্ত ভাবে, “হ্যালো… কে?” বললেন।

“আপনি তো চিনবেন না আমাকে। তবে… আমার ছোট ছেলেটির আপনার উড়ন্ত ভেলাটি বড্ড পছন্দ হয়েছে। সে ওটা নিয়ে এসেছে এবং ফেরত দিতে চাইছে না।”

“আমার কোন উড়ন্ত ভেলা নেই…” এতক্ষণে কথা বলার সুযোগ পেলেন বাদল দত্ত।

“আজ্ঞে হ্যাঁ, আলবাত আছে। গতকাল অব্দি ছিল অন্তত… যেটা করে আপনি রোজ অফিসে যাতায়াত করেন…” বলেন ওপাশের কণ্ঠস্বর।

“ছাতা…?” আকাশ থেকে পড়েন বাদলবাবু। ছাতার সঙ্গে উড়ন্ত ভেলার এই সংযোগ প্রথম উদ্ধার করেছিল বাদল বাবুর ৪ বছরের ভাইপো, আকাশ। ২৬ বছর আগে। আজ ‘উড়ন্ত ভেলার’ প্রসঙ্গ শুনেই সে কথাটা মনে পড়ে গেল। বিছানায় উঠে বসলেন বাদল বাবু, “আপনার ছেলে আমার ছাতাটা নিয়ে গেছে। এবং আপনি বাবা হয়ে তার হয়ে সাফাই গাইছেন?” দুম করে ফেটে যান তিনি।

“দেখুন, আমার ছেলেটা ছোট। আর ওকে আমি কখনও না বলি না…” বলেন ফোনের ওপাশের মানুষটি।

“খারাপ কাজ করেন। অত্যন্ত খারাপ কাজ করেন। ছেলেকে বিগড়ে ফেলার সব ব্যবস্থাই তো পাকা করে ফেলেছেন মশাই। আমার বাবার পাল্লায় পড়ত আপনার ছেলে, টের পেতেন। বেতিয়ে সোজা করে দিত…” পিঠের উপর বাবার বেতের ঘা এখনও স্পষ্ট মনে আছে বাদলবাবুর।

“আমরা অহিংস জাতি…”

“মানুষ সহিংস জাতি। ম্যালা ফ্যাচফ্যাচ করবেন না তো মশাই…”বাদল দত্ত খেঁকিয়ে ওঠেন।

“আমি মানুষ একথা তো আমি আপনাকে বলিনি…” বলে আবার বক্তব্য পেশ করতে শুরু করেন ওপাশের কন্থস্বর। আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা রেখে দেন বাদলবাবু। বোঝাই যাচ্ছে, ছাতাটা কোন এক খ্যাপার হাতে পড়েছে। যাক গে, যা গেছে তা যাক। ছাতা হারালে ছাতা পাওয়া যায়, শনিবার দুপুরের ল্যাদ গেলে আর পাওয়া যায় না।

আবার বালিশটা ফাঁপিয়ে নিয়ে বাদল বাবু মাত্র তাতে মাথা ঠেকিয়েছেন কি ঠেকাননি, এমন সময় একজন তাঁর মুখের সামনে দুম করে আবির্ভূত হয়ে বললেন, “আমরা হলুম গে ক্যান্টাপিলা।”

খানিকটা ইঁদুর, খানিকটা পিঁপড়ে এক মানুষের শরীরে মেশালে যেমন একটা বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপার হয়, ভদ্রলোককে… থুড়ি, ভদ্র ইয়েটিকে দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বাদলবাবু কেটে কেটে বলেন, “ক্যা…ক্যান্টাপিলা?”

“আপনারা যেমন মানুষ। আমরা তেমন ক্যান্টাপিলা। এ তো সাধারণ ব্যাপার। এতে এত আশ্চর্য হওয়ার কী হয়েছে?” বললেন শ্রীমান ক্যান্টাপিলা।

“তা তো বটেই…” ঢোঁক গিলে বললেন বাদলবাবু। আসলে বলার আর কিছু পাচ্ছেন না খুঁজে।

“আমার নাম হবুটুভুতুকুবিনাদুম…” বললেন শ্রীমান ক্যান্টাপিলা। বাদলবাবু ৩০ সেকেন্ড মুখ বন্ধ করে রেখে খুললেন আবার। মানুষের নাম শুনে হাসাটা অভদ্রতা। যদিও ‘মানুষ’ নন। কিন্তু হুঁশ আছে, মান থাকাও অসম্ভব নয়।

“আমার পুত্র জবুটরকুতুবুসিমানাগালিটু আপনার উড়ন্ত-ভেলাটা নিয়ে গেছে…” হবুটুভুতুকুবিনাদুম বলতে শুরু করতেই বাদলবাবু বাধ সাধেন, “ওটাকে ছাতা বলে… উড়ন্ত-ভেলা ব্যাপারটা জাস্ট আর নেওয়া যাচ্ছে না দাদা…”

“বেশ, আপনার ছাতাটা নিয়ে গেছে। সে সেটা ফেরৎ দিতে চাইছে না। তাই তার বদলে, আমি আপনাকে এটা দিচ্ছি…” বলেই হবুটুভুতুকুবিনাদুম একটা ছোট্ট যন্ত্র বাড়িয়ে দেন। বাদলবাবু জিনিসটা ভুরু কুঁচকে দেখেন। ইত্যাবধি কম যন্ত্র তিনি দেখেননি কিন্তু এটিকে সেরকম দেখতে নয়। হাত লাগলে ফেটে ফুটে যাবে কিনা তাও বিশ্বাস করতে পারছেন না বাদলবাবু। কিন্তু আর অবাক হওয়ার মত ক্ষমতাও তাঁর ছিল না।

তিনি হাত বাড়িয়ে জিনিসটা নিজের হাতে নিয়ে জানতে চাইলাম, “এটা কী?”

“এটাকে আমরা বলি হলবলিসিমাটুগ্রাফোলঝিরাকারীপুনি। আপনি… বোধহয়… মনে রাখতে পারবেন না…” জিজ্ঞেস করেন হবুটুভুতুকুবিনাদুম।

“আজ্ঞে না। মনে রাখা তো দূরের কথা, ওই বীভৎস শব্দটা আমার জিভ দিয়ে উচ্চারণ অবধি হবে না…” বাদলবাবু শব্দটা মনে রাখার আর চেষ্টাই করলেন না।

“আপনি এটাকে ‘অ্যাপারিশন অ্যাপারেটাস’ বলতে পারেন…” হবুটুভুতুকুবিনাদুম থামলেন এবং বাদলবাবুর দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করতে পারলেন যে মনুষ্যস্তরের ইংরাজি নামক ভাষাতে প্রকাশ করেও বাদলবাবুর বোধগম্য করতে পারেননি তিনি ব্যাপারটা। তাই দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে হবুটুভুতুকুবিনাদুম বললেন, “এই যন্ত্রটির ঐ রিসিভিং এন্ডে আপনি যে জায়গার নাম বলবেন, আপনি তৎক্ষণাৎ সেই জায়গায় পৌঁছে যাবেন। আপনাদের ভাষায় একে বলে অ্যাপারিশন। আমাদের ভাষায় বলে…” বাদল বাবু হাত জোড় করে ফেললেন। আরও কতগুলো ভয়ানক শব্দবন্ধ পারস্পরিক সংযোগে শোনার মত অবস্থা তাঁর আর নেই।

ক্রমে বাদলবাবু বুঝতে পারলেন যে এই ‘অ্যাপারিশন অ্যাপারেটাস’ যন্ত্রটি দিব্য কাজের। প্রথম প্রথম কিছুদিন এই ‘অ্যাপারিশন’ ব্যাপারটা করলে বাদলবাবু বেশ অসুস্থ হয়ে পড়তেন মিনিট ১৫-২০র জন্যে। ঐ কথামুখে ধরুন বলা হল, “প্যারিস…” তাহলে আপনি হয়ত মুহূর্তে প্যারিসের ইমিগ্রেশনের সামনে আবিষ্কার করতে পারেন।

সে এক বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপার। আপনার পছন্দের আবির্ভাবের জায়গাটি একটু মাথা ঠাণ্ডা করে বলতে হয়। “চারতলার বাথরুম” বল্লে কোন অফিসের বা কোন বাড়ির চারতলার বাথরুমে নিয়ে যাবে, খোদায় মালুম। একবার তো এক ভুঁড়িওয়ালা টেকো বুড়োর বাথরুমে হাজির করেছিল। বাপরে। সেখান থেকে নিজের বাড়িতে অ্যাপারেট করে প্রাণে বেঁচেছেন।

ধীরে ধীরে ব্যাপারটা বেশ রপ্ত হয়ে গেছে তাঁর। অফিস থেকে বাড়ি আর বাড়ি থেকে অফিস করতে এখন সময় লাগছে মাত্র এক মিলিসেকেন্ড। ফলে সকালে খেতে না খেতে অফিসে দৌড়ানোর সমস্যা মিটে গেছে। বাসট্রামের জ্যাম, ভিড়, ঘাম, বৃষ্টি, রোদ, পলিউশনের সমস্যা থেকে উনি মুক্তি পেয়ে গেছেন। সরকারের ট্রাভেল অ্যালাওয়েন্সটাও দিব্যি বেঁচে যাচ্ছে। মন্দ কী? আর তাছাড়া, গাড়ি ঘোড়ার অসুবিধার জন্যে বন্ধুদের কাছেও মাঝে মাঝে বদনাম কিনতে হত বাদলবাবুকে। লেট-লতিফ হিসাবে। সে বদনামও ঘুচেছে। বন্ধুদের নির্ধারিত সময়ে একেবারে হাসতে হাসতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসছেন বাদলবাবু।

ও হ্যাঁ, বাদলবাবু ভেবে দেখেছেন, মানুষ তো ক্যান্টাপিলা নয়, হঠাৎ যেখানে সেখানে “কাল ছিল ডাল খালি, আজ ফুলে যায় ভরে…” র মত আবির্ভূত হল ব্যাপারটা সুবিধাজনক হয় না। তাই তিনি সাধারণত বাথরুমের বন্ধ দরজার ভিতরে আবির্ভাব ঘটিয়ে থাকেন। বাড়ি ফেরার সময়ে অবশ্য নিজের ঘরেই চলে আসেন সোজা, কারণ সেটা তাঁর “একলা ঘর আমার দেশ…”

থাক সে-সব কথা। আসল ঘটনার কোথায় আসা যাক। একদিন ঝাঁ চকচকে অফিসের সপ্তাহে একদিন সাফাই হওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত বাথরুমে আবির্ভূত হয়ে দেখলেন একটি মেয়ে বুকের সামনে বিবেকানন্দের ভঙ্গিমায় হাত গুটিয়ে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। তাঁর হঠাৎ আবির্ভাবে মেয়েটি মোটেও চমৎকৃত হয়নি। উপরন্তু পুরুষ শৌচালয়ের অভ্যন্তরে তাকে দেখে বাদলবাবুই যারপরনাই অস্বস্তিতে পড়লেন।

মেয়েটির পরনে জিন্স, ঢোলা গেঞ্জি, মাথায় টুপি এবং টুপির তলা থেকে নীল চুল নেমে এসেছে কাঁধ অবধি। বাদলবাবু মুখটা ভয়ানক বিকৃত করে বললেন, “তুমি কে? এখানে কেন? এটা পুরুষ শৌচালয়… তুমি বাইরে থেকে দেখতে পাওনি?”

“আমি বাইরে থেকে আসিনি। অ্যাপারেট করেছি। যাক গে, যে যন্ত্রটা আপনি ব্যবহার করেন ওটা আমার। এবং ওটা আমার ফেরৎ চাই…” বলে মেয়েটি।

“এই যন্ত্রটা আমাকে আমার এক বিশেষ বন্ধু…” বাদলবাবুকে কথা শেষ না করতে দিয়ে মেয়েটি বলে, “আপনার বিশেষ বন্ধু হবুটুভুতুকুবিনাদুম, আমার বাবা। আমার ভাই জবুটরকুতুবুসিমানাগালিটু আপনার ছাতা নিয়ে যায় উড়ন্ত ভেলা ভেবে। ওটা চিরকালের গাধা। বাবা আমার যন্ত্রটি আপনাকে দেন। ওটা আমার ফেরৎ চাই” – বলে মেয়েটি।

“কিন্তু…”

ওকে দেখে ক্যান্টাপিলা মনে হচ্ছে না কিন্তু ওর জিভে নামগুলো একবারও বাধল না, হতেও তো পারে যে ও সত্যি বলছে!

“কিন্তু এতে আমার অনেক সুবিধা হচ্ছে…”

“জানি। আমি সেই জন্যে আপনাকে অন্য একটা যন্ত্র দেব। আমারটা আমাকে ফেরৎ দিন…” মেয়েটির গলা দৃঢ় হচ্ছে।

“বেশ। কিন্তু তোমার কাছে যখন একটা যন্ত্র আছে, তখন তোমার এটা চাই কেন? তুমি তোমারটা দিয়েই তো এসেছ এখানে…” মুঠোর মধ্যে যন্ত্রটা চেপে রেখে বলেন বাদলবাবু।

“কারণ…” মেয়েটি হাসে। ওর দুটো শ্ব-দন্ত দেখা যায় দুপাশে। ভাগ্যে ক্যান্টাপিলা অহিংস জাতি, না হলে আজ একটা কেলো হতই হত।

“কারণ ওটা আমি নিজে হাত মডিফাই করেছি। ওতে আরো অনেক কাজ হয়। কিন্তু আমার পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে বলে বাবা ওটা আমার থেকে কেড়ে আপনাকে দিয়ে দেয়। ওটা দিয়ে দিন। আপনার কাজ এটাতেও হবে।” আরেকটা যন্ত্র এগিয়ে দেয় মেয়েটি। মানে ‘মেয়ে’ নয়, মানে ঐ হল! বাদলবাবু হাতবদল করেন। মেয়ে ক্যান্টাপিলাকে বিশ্বাস করা যায় কিনা কে জানে! এতে যদি কাজ না হয়!

মেয়েটি বলে, “একবার ব্যাবহার করে দেখুন। নাহলে অবিশ্বাস করবেন।” বাদলবাবু যন্ত্রটি পকেটে ঢুকিয়ে বলেন, “তোমার নামটা জানা হল না…” বলে তাঁর নিজেরই খটকা লাগল। ঐ ভয়ঙ্কর গোছের একটা নাম তিনি আদৌ জানতে ইচ্ছুক কি?

“আমার নাম…” মেয়েটি আবার শ্ব-দন্ত বের করে হাসল, “মুলিকাটুনিসিচামিনোকাবিলিভুতি… আপনি ‘তি’ বলে আমাকে ডাকতে পারেন, অসুবিধা হলে।”

বাদলবাবুর পক্ষে নামটা গোটা মনে রাখাই অসম্ভব। তিনি সে-কথাটা আর ভুলেও উচ্চারণ করলেন না।

তি বলল, “এত সহজে আপনি দেবেন ভাবিনি। দিলেন যখন তখন একটা এফেক্ট দেখাই।” বলেই কিছু একটা করে ‘তি’ তাঁর যন্ত্রে। মুহূর্তে দুর্গন্ধ ওঠা বাথরুম পরিণত হয় এক গহীন অরণ্যে, চারপাশে গাছপালা, পাখির কিচিরমিচির। ‘তি’ বলে, “যান, আপনার ঘরে। দেখবেন আজ কাজ করতে ক্লান্তি আসবে না। বিকেলে এখানেই দেখা হবে।”

সারাদিন একটা ঘোরের মধ্যে কাটল বাদলবাবুর। সিনিয়রের ঘরে যাচ্ছেন, পায়ের তলায় কুলকুল করে একটা ছোট্ট স্রোত বয়ে যাচ্ছে। পায়ে ঠাণ্ডা লাগছে, কিন্তু ভিজছে না। যে কাজটা গোলমেলে বলে, ক’দিন পরে করার জন্যে সরিয়ে রেখেছিলেন, সেটাও কেমন যেন দুম করে হয়ে গেল।

বিকেলে ‘তি’ এল বাদলবাবুর ঘরে। বলল, “বাবুঘাটে গিয়ে একটু বসা যাক…”

‘হ্যাঁ-না’ বলার আগেই বাদলবাবু দেখলেন তিনি গঙ্গার ধারে বসে আছেন। পাশে ‘তি’। চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন, এখানে কেউ একা বসে নেই। সকলেই জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে। বেশ নন্দনকানন নন্দনকানন একটা আবহাওয়া। ক্যান্টাপিলাদের মনুষ্য সমাজ সম্বন্ধে কোন ধারণা নেই বোঝাই যাচ্ছে। এই ভর সন্ধেবেলায় তাঁকে বাবুঘাটে ‘তি-এর সাথে বসে থাকতে যদি কেউ দেখে ফেলে, কেলঙ্কারি হবে যে!

‘তি’ অবশ্য এসব নিয়ে একেবারেই চিন্তিত নয়। সে বলল, “আপনার নিশ্চয়ই খুব অবাক লেগেছে আজ সারাদিন। এই যে আপনি আজ যে ইমেজটা সারাদিন দেখলেন এটা একটা হোলোগ্রাম। অন্তত, আপনাদের ভাষায় একে হোলোগ্রাম বলা হয়।”

“তোমাদের দেশটা এত্ত সুন্দর, তি?” বাদলবাবু মুগ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন।

“আমাদের দেশ, মানে আমাদের গ্রহ নুনপটনাটকরসোভিনাজিকালুকা-তে রঙ মাত্র দুটো, সাদা আর কালো। আমরা মানে আমাদের চোখের রেটিনায় অন্য কোন রঙ প্রতিফলিত হয় না। আমাদের সংখ্যাও দুটো- ০ আর ১। আমাদের সব কাজ, ঐ দুই সংখ্যায় সীমাবদ্ধ। যেমন আপনাদের কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজ, তেমনই…আমরা সাব-সোনিক আওয়াজ শুনতে পাই। তবে আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে ভাষার দরকার হয় না। আমরা টেলিপ্যাথির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে কথা আদান-প্রদান করতে পারি। যে কোন অন্য প্রাণী, বা অন্য জগতের প্রাণীর ভাষা আমরা রপ্ত করি তার ব্রেন-ওয়েভ থেকে। যেমন বাংলায় কথা বলছি…” বলে চলে ‘তি’।

“তোমাদের না থাকা ভাষাটাও বড় গোলমেলে ‘তি’। ওই সব শব্দ মনে রাখতে গেলে আমাকে আমার মাথায় আরেকটা হার্ড ডিস্ক ঢোকাতে হবে…” কথাটা বলতে বলতেই চারপাশে একবার ঝট করে চোখ বুলিয়ে নিলেন বাদলবাবু। চেনাশোনা কাউকে দেখা যাচ্ছে না তো? ভাইপো-ভাইঝি-ভাগ্নে-ভাগ্নীরাও বোধহয় এখানে প্রেম করতে আসে। যদিও তিনি প্রেম করতে আসেননি। এবং ‘তি’ এর সঙ্গে প্রেম করার বিন্দুমাত্র বাসনা তাঁর নেই, তবু সে কথা অন্যদের বোঝাতে গেলে বড় বিপদ।

“আপনাদের যেমন বারকোড হয়। আমাদের সব শব্দও ওইরকম। আমাদের ভাষায় সব কিছুরই একটা ম্যাথামেটিক্যাল ইক্যুয়েশন আছে। আমার নামটা ধরুন ০০১১১১০১০১১১০০১১১১০১০১০০০১১১১…” নম্বরের সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাদলবাবুর মুখের হাঁ বড় হচ্ছিল। ঢোঁক চিপে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “আমার জন্য ‘তি’-টাই ঠিক আছে, ‘তি’। তা তোমাদের দেশ যখন ওটা নয়, তখন হলোগ্রামটা কিসের?”

“ওটা তোমাদের অ্যামাজন রেন ফরেস্টের উত্তরপূর্বাঞ্চল। ওদিকে জনবসতি তেমন নেই। গহীন বন। শান্ত, নিস্তরঙ্গ। আমার কাছে এরকম অনেক হলোগ্রাম আছে। সাহারা আছে… প্যারিস আছে…লাস ভেগাস আছে… কেনিয়া আছে… পিরামিডের ভেতরের দৃশ্য আছে… ভেনিসের নাইট লাইফ আছে…” হাসতে থাকে ‘তি’। বাদলবাবু ভুরুটা তুলে ফেলেন নিজের অজান্তেই। ‘তি’ আবারও বলে, “আসলে আমি একটু ম্যালফাংশনড। আমার বাবা, মা, পরিবার, আমাদের দেশের সাইন্টিস্ট আর প্রোগ্রামাররা আমাকে নিয়ে যারপরনাই অস্বস্তিতে ভোগেন। বাবা তো রীতিমত লজ্জিত। আমাকে বেশির ভাগ সময় ল্যাবে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়। আমি সবার সঙ্গে মিশতে পারি না।”

বাদলবাবু কথা বলেন না। ‘চেষ্টা করা হয়’ মানে ও মাঝেমাঝেই পালিয়ে যায়, সেটা বুঝতে বুদ্ধির দরকার পড়ে না। বাদলবাবুর ধারণা ছিল, মেয়ে জাতের প্রাণীরা স্বভাবতই একটু প্রগলভ হয়। তাদের প্রশ্ন করতে হয় না। এমনিতেই উত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু বাদলবাবুর ধারণা ঠিক কাজ করল না। মানুষ মেয়েদের মত ক্যান্টাপিলা মেয়েরাও বোধহয় একা একা বকতে অভ্যস্ত নয়। তিনি জিজ্ঞেসা করতে বাধ্য হলেন, “কিরকম ম্যালফাংশন?”

“আমি সবরকম রঙ দেখতে পাই, আওয়াজ শুনতে পাই, আমি নিজের পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসি কিন্তু আমাদের ওখানে সেটা সময় নষ্ট করার সামিল। আমার গল্প করতে ভালো লাগে, সিনেমা দেখতে ভালো লাগে কিন্তু আমাদের ওখানে সাহিত্যচর্চাকে সময় নষ্ট বলা হয়। আমাদের গ্রহ পৃথিবী থেকে দেড় হাজার লক্ষ বছরের ছোট। কিন্তু আমাদের বৈজ্ঞানিক উন্নতির কথা মানুষ ভাবতেও পারে না। কারণ আমরা রূপ-রস-গন্ধ-প্রেম-বিরহ-আন্দোলন- পলিটিক্স-স্ক্যাম এসবে আমাদের সময় নষ্ট না করে ক্যান্টাপিলা জাতিগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নতির জন্যে কাজ করে গেছি।”

“তা…” সাহিত্য-টাহিত্য না থাকলে পৃথিবীটা কেমন হত ভাবতে ভাবতে বাদলবাবু বলে, “তোমাকে তোমাদের প্রোগ্রামাররা ঠিক করতে পারছেন না?

“এখনও পারেননি। আগামিকাল আমার ৭৮৩তম সিস্টেম রিজেনারেশন আছে। সবাই আশাবাদী যে এর পর আমার আর কোন সমস্যা থাকবে না।” উদাস গলায় বলতে বলতেই ‘তি’ লক্ষ করে বাদলবাবু এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন সন্ত্রস্ত চোখে। ওঁর চোখে ঝিলিক খেলে যায়, “এই আমার ডিভাইসটার আরেকটা কাজ আছে।” বাদলবাবু চোখ ফেরান।

ও কি একটা পুটুং-পাটুং করে যন্ত্রটার মধ্যে। বাদলবাবু বুঝতে পারেন, সময়টা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তাঁর বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা ঘড়িটা বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে। যখন থামল, মনে হল, তিনি সবই দেখছেন একটা ঝাপসা কাচের ভেতর থেকে। ‘তি’ বলে, “টাইম-হোল। তুমি এখানেই আছ। কিন্তু আছ টাইম-হোলে। তো তোমাকে কেউ দেখতে পাবে না। কিন্তু তুমি সবাইকে দেখতে পাবে।”

“এগুলো তোর আবিষ্কার?” গলায় স্নেহ ঝরে পড়ে বাদলবাবুর। ‘তি’ তাকিয়ে থাকে। ‘তি—এর চোখটা কি জলে ভরে যাচ্ছে? ও মাথা থেকে হুডটা খুলে ফেলে। ওর ইঁদুরের মত কান আর পিঁপড়ের মত শুঁড় দেখা যায়। বলে, “এই জন্যে তো আমি পৃথিবীতে পালিয়ে আসি। পৃথিবীর মানুষ রাগতে জানে, কাঁদতে জানে, ভালবাসতে জানে।”

“তো আসবি মাঝে মাঝে আমার কাছে। আমার সাথে এত কথা বলার লোক তেমন নেই তো…” বাদলবাবু ওর পিঠে হাত রাখেন। ওমা! কি নরম তুলোর মত ওর গা-টা! মেঘের মত, হাত যেন ডুবে গেল ওর গায়ে। ও হাসে, বলে, “আমি তো আর আসতে পারব না, তাই এটা আজ নিয়ে গেলাম। কালকের প্রোগ্রামের পর আমার সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে। আমি সবার সঙ্গে মিশতে পারব, সবার সঙ্গে অফিসে কাজ করতে পারব। আমার আর হাসিও পাবে না। কান্নাও পাবে না।”

“তুই আর কখনও আসবি না?” বাদলবাবুর বুকের ভেতরটা কেন এমন খালি খালি লাগছে, কেন এমন মুচড়ে উঠছে? আজ সকালের আগে তো ‘তি’-এর অস্তিত্বের কথা জানতেনও না তিনি। ‘তি’ মাথা নাড়ে। তারপর বলে, “ভাই-এর কাছ থেকে তোমার ছাতাটাও নিয়ে এসেছি। ও বুঝতেই পারেনি।”

ছাতাটা আর ব্যবহার করেন না বাদলবাবু। একটা নতুন কালো ছাতা কিনেছেন। যন্ত্রটাও আলমারির লকারে তোলা আছে যত্ন করে। নাকে-মুখে গুঁজে বাস-ট্রামের ভিড় সামলে, ঐ ধুলো পড়া ফাইল ঘাঁটেন রোজ, এত বছর যেমন ঘেঁটেছেন। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে এখনও মাঝে মাঝে দেরি হয়ে যায়। মেনে নিয়েছেন। ওই যন্ত্রটা কখনও সখনও হাতে নিয়ে দেখেন। আবার রেখে দেন।

‘তি’-এর সঙ্গে তো মাত্র কয়েক ঘন্টার আলাপ। কিন্তু সেই আলাপেই কেমন যেন ভালোবেসে ফেলেছিলেন ওকে। কিরকম একটা অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে গেছেন। মানুষের মধ্যেও এরকম কিছু মানুষ থাকে। যাদের ভালো না বেসে থাকা যায় না। ক্যান্টাপিলাদের মধ্যেও যে থাকবে এতে আর আশ্চর্য কী!

বাদলবাবু এখন মাঝে মাঝে বাবুঘাটে গিয়ে বসেন। একাই। একা থাকতে থাকতে এত বছরে অভ্যাস হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হয়নি। কিছু কিছু জিনিস বোধহয় কখনই অভ্যাস হয় না। বন্ধু-বান্ধব, কাজ, প্যাশনের মধ্যেও একটা জায়গা খালি রয়ে গেছে বাদলবাবুর। ‘তি’ এক সন্ধের কয়েক ঘন্টার সাক্ষাতে সেই জায়গাটা ছুঁয়ে গেছে। এখানে এসে বসলে, হয়ত কোথাও একটা আশা ঝিলিক মারে – ‘তি’ আসবে। আজ নিশ্চয়ই আসবে। আসে না। ওর সিস্টেম রিজেন হয়ত সফল হয়েছে। ও হয়ত আর পাঁচজন ক্যান্টাপিলার মত সাধারণ হয়ে যেতে পেরেছে। সবার মত হওয়ার কিছু সুবিধা আছে, কিন্তু আলাদা হওয়ার যে আনন্দ ‘তি’-এর ছিল। এখন আর সেটা ও উপভোগ করতে পারে কি?

সেদিন সন্ধেবেলাতেও ওমনি বসে ছিলেন বাদলবাবু। আবার বর্ষাকাল এসে গেল। প্রায় একটা গোটা বছর। সামনে দিয়ে একটা গন্ডোলা চলে যাচ্ছে, আর…

…এক সেকেন্ড! গঙ্গায় গন্ডোলা চলা কবে থেকে শুরু হল? আর বাবুঘাটের গঙ্গা কেষ্টপুর খালের সাইজে হল কবে থেকে? এই বিল্ডিংগুলোই বা কবে গজাল ওর পাড়ে?

“ভেনিস নাইটলাইফ…গত পরশু গিয়েছিলাম…” গলা শুনে ঘাড়টা ঘোরালেন বাদলবাবু। হাসবেন না কাঁদবেন ঠিক বুঝতে পারছেন না। একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে ‘তি’ হাসি মুখে বলল, “সিস্টেম রিজেন আবার ফেল করেছে।”

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত