সংসার সাগরে

সংসার সাগরে

কষিয়ে মাংস রাঁধতে রাঁধতে বার বার অজান্তেই চোখ ঝাপসা হয়ে যায় সুমনার, হাতের তালু উল্টে চোখের জল মুছে নেয় সে। পাশের ঘরে বুবু আর টুবুর গলার আওয়াজ পায় সে।

গ্যাসটা কমিয়ে দিয়ে সে ঘরে গিয়ে বলে – কিরে! এরমধ্যে পড়া হয়েগেলো নাকি তোদের?

তাকে দেখে তারা চুপ করে যায়। “বইটা খুলে সে বলে ট্রান্সেলশন গুলো করে নে তোরা, কাল ক্লাস টেস্টে আসতে পারে। ”

বাধ্য ছেলের মতো তারা খাতা নিয়ে বসে, সে একটু পাশে বসে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
মনেপড়ে অনেক বড় হয়ে যাওয়ার পর ও পড়তে বসলে বাবা এসে তার পাশে বসে মুগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন, সে বলতো- কি দেখছো বাবা, ওমন করে?

বাবা হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতেন- কিছু না রে মনা, তোকে ছাড়া কি ভাবে বাঁচবো সেটাই ভাবছি, সে বই খাতা গুটিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলতো- তোমাকে ছাড়া আমি কোথাও যাবো না গো।

আজ সে বাবা মাকে ছেড়ে দিব্যি অনেক দূরে এসে সংসার করছে। বছরে এক বার ছেলেদের ছুটি হলে কয়েকদিনের জন্য গিয়ে ঘুরে আসে।

মাংসের গন্ধ বেরিয়েছে, নিচে লেগে না যায় আবার, তাড়াতাড়ি এসে ওটা নেড়ে দেয়।
রান্নাঘরে শব্দ পেয়ে শ্বশুর মশাই বলেন, একটু লিকার চা দেবে বউমা? পাশ থেকে শুভঙ্কর বলে -আমায় হাফ কাপ দিও তো কড়া করে। আনছি, বলে সে চায়ের জল চড়ায় পাশের ওভেন জ্বালিয়ে, “আমি কিন্তু খাবো না বউমা” শাশুড়ি মা বলেন।

মাংসে গরম জল ঢেলে প্রেশার কুকার আটকে দেয় সে। কাপ ধুয়ে চা ছেঁকে কাপ নিয়ে এঘরে আসে। বড্ড ভালো রাঁধে সে। বাড়ির সবাই ওর রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

আগে ও বাড়িতে কখনোই রান্নাঘরে ঢোকেনি , খুব আদরে মানুষ হয়েছে সে। মা যদিও বা কিছু শেখাতে গেছেন বাবা হাহা করে বলেছেন সারা জীবন তো করবেই, এখন না হয় এসব নাই বা শিখলো।

পাকা গৃহিণী হয়ে কতটুকু ঐ মানুষদের জন্য রান্না করতে পেরেছে সে, কষ্ট হয় তাদের কথা ভেবে।
তার জন্মাবার সাত বছর পর মায়ের কোলে দ্বিতীয় শিশুর আগমন সে সময় মেনে নিতে পারে নি সে। মা যখন কাজের ফাঁকে এসে ভাইকে দুধ খাওয়াতো তখন ওকে কোল থেকে নামিয়ে দেবার জন্য বায়না করতো সুমনা। মা তাকে পাশে বসিয়ে আদর করতে করতে বোঝাতো, ও ছোটো, একটু বড় হলে তার সাথে খেলবে, পড়াশোনা করবে,স্কুলে যাবে, সে কি বুঝতো নাকি কিছু।

যতক্ষণ না বাবা আদর করে বলতো- তুই তো আমার সোনা মা অনেক ভালোবাসিরে তোকে মনা ,তবে গিয়ে একটু মনটা শান্ত হতো।

পরে যখন ভাই একটু বড় হোলো তাকে নিয়ে সুমনার সে কি আদিখ্যেতা। না পারলেও ছেঁচড়ে টেনে কোলে নিয়ে বেড়াতো সুযোগ পেলে।

যখন সে দু’বছরের হেঁটে বেড়ায় বাড়িময় ,তখন কখন সবার নজর এড়িয়ে চলে গেছিলো খিড়কি পুকুরের দিকে। সারাদিন ডাকাডাকি খোঁজাখুজির পর তার ছোট্ট শরীর ভেসে উঠেছিলো সেখানে। মা যেন শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলো। বাবা নিজেকে সামলে ছিলেন তার মুখ দেখে।

বিয়ের পর শহর তাদের কাছে বা কাছাকাছি কোথাও চলে আসতে বলেছিলো শুভঙ্কর ও সুমনা, তারা বলেছিলো – এই বয়েসে আর টানাটানি কেনো, এখানে টুকরো টুকরো স্মৃতির মাঝে তারা বেশ ভালোই আছেন। কতদিন বাবা মাকে লুকিয়ে কাঁদতে দেখেছে সে।

প্রেশার কুকারে সিটি পড়তেই নামিয়ে রেখে আবার ছেলেদের ঘরে ঢুকলো সে। ছুটির দিন ছাড়া অন্যদিন এসময় বাড়িতে থাকে না শুভঙ্কর। আর যে দিন থাকে সে দিন একটু রিল্যাক্স মুডে থাকতে চায়, বাবা মা ও তার সারা সপ্তাহ ওকে কাছে না পেয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন।

ছেলেদের পড়াশোনা সে সামলে নেয়, সবকিছু পরিপাটি করে সামলে বাবা মায়ের জন্য কিছুই করতে পারে না সে, ওটাই তাকে খুব কষ্ট দেয়।

সময় পেলে মাকে ফোন করে খবর নেয়, বাবা আজকাল কানে কম শোনায় ফোন ধরতে চায় না।মায়ের থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কথা শোনেন পরে।

মা হাঁটুর ব্যাথায় বেশ কাবু হয়েছে, বুবু টুবুর গরমের ছুটিতে গিয়ে ওদের নিয়ে আসবে ভেবেছিলো সুমনা, সে আর হয়ে ওঠেনি।

একমাত্র ননদের বাচ্চা হওয়ায় সে এসে কাটিয়ে গেলো চার মাস, তাদের এনে সেবাযত্ন বা ডাক্তার দেখাতো কি করে?

রাতের খাবারের সময় হয়ে গেলো, শ্বশুর মশাইকে খাবার আগে ওষুধ দিতে হবে। ওদের বইখাতা গুটিয়ে রাখতে বলে ওঘরে যায়।

খাবার টেবিলে বাচ্চাদের হাঁড়ছাড়া মাংস দিতে দিতে মনেপড়ে মাও এইভাবে একটা একটা করে বেছে তার পাতে তুলে দিতো।

আর বাবা, ছোটো মাছের চচ্চড়ি খুব প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও তার গলায় কাঁটা লাগার ভয়ে আনতোই না।
আবার নিজেকে সামলে নিয়ে পরিবেশনে মন দেয় সুমনা। আইডিয়াল গৃহবধূ হতে হতে তার আর ভালো মেয়ে হয়ে ওঠা হলোনা কোনোদিন।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত