নীলার আংটি

নীলার আংটি

কাশ্মীরী কাঠের বাক্সটা দিদুন কিছুতেই হাতছাড়া করে না।ছোট্ট একটা চাবি আটকানো কারুকার্য করা বাক্সটাতে কি আছে কে জানে?

”ও দিদুন একদিন ঐ বাক্সটা খুলবে?”

”না রে বুবু ঐ বাক্সটা ভুলেও খুলিস না বারণ আছে।”

”কার বারণ?কে বারণ করেছে?বলনা দিদুন!কি আছে ওতে?”

বুবু প্রশ্নে-প্রশ্নে জর্জ্জরিত করে তোলে দিদুন কে।মাঝে-মাঝে দিদুন সবার আড়ালে বাক্সটা একটু ফাঁক করে দেখে আবার চাবি দিয়ে আলমারিতে তুলে দেয়।এদিকে যে বিষয়ে যত বিধিনিষেধ সে বিষয়ে ততই কৌতূহল।বুবু ভাবে একদিন ঐ বাক্স আমি খুলবই।

একদিন বুবু হঠাৎ শুনল পাড়ায় বিশুকাকুদের বাড়ী কে একজন বড় জ্যোতিষী আসবেন কাল।বুবুর ছোটবেলার বন্ধু বিল্টু ছুটতে-ছুটতে এসে বুবুকে বলল-

”জানিস বুবু আমার মেজদাদু দারুণ ভবিষ্যতবাণী করতে পারেন।কাল আসবেন।তুই যাবি?যা জিজ্ঞেস করবি বলে দেবেন কিন্তু।মানুষকে একবার দেখেই তার ভূত-ভবিষ্যত সব বলে দেন।পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরে-ঘুরে বেড়ান।খেয়াল হলে আসেন,নয়তো আসেন না।কি মনে হয়েছে অনেকদিন বাদে আসবেন আমাদের বাড়ী,নিজে থেকেই বলেছেন।আজ একজন লোক এসে খবর দিয়ে গেল।জানিস, মা বলেছে মেজদাদুকে জিজ্ঞেস করবে এইবার আমি পাশ করব কিনা।এইবছর ক্লাস টেনে উঠতে না পারলে আর আমাকে ইস্কুলে রাখবে না।আমি তো তোর মত লেখাপড়াতে ভাল না।তাই ঐ খগেন স্যার আমাকে খুব মারেন।আমাকে দুচক্ষে দেখতে পারে না।বলেন আমার মাথায় নাকি গোবর ভরা আছে। ”

মুখটা কাঁচু-মাচু করে বিল্টু দাঁড়িয়ে রইল।

বুবু বলল-

” দূর বোকা ভাল করে পড় তাহলেই পাশ করবি।এইসব ভবিষ্যতবাণী -টানী করে কিস্যু হয় না।তুই যদি না পড়ে বসে থাকিস কারো সাধ্যি নেই তোকে পাশ করাবে।কিছু অসুবিধে হলে আমার কাছে বুঝে নিবি।বুঝলি হাঁদারাম আমি এইসব অলৌকিক,
জ্যোতিষবিদ্যা বিশ্বাস করি না।”

বুবু মুখে এইসব বলল বটে কিন্তু মনটা কেমন খচ্ খচ্ করতে লাগল।তারওপর বিল্টুর বয়েসের তুলনায় বুদ্ধিটা ততটা পরিণত নয়।তাই মনে হয় ও কিছুতেই অঙ্ক পারেনা।পড়া মনে রাখতে পারে না। বুবু মনে-মনে ভাবল কাল একবার গিয়েই দেখবে,ঐ বিল্টুর মেজদাদু কি বলেন।পরখ করে দেখবে ওনার কত ক্ষমতা।রাতে ভাল ঘুম হল না বুবুর।পরেরদিন সকালে শুনল মা, দিদুন,জেম্মা সবাই আজ বিল্টুদের বাড়ী যাবে।আর পাড়ার সব লোকও নাকি যাবে।

বিকেল থেকে বিল্টুদের বাড়ী লোকে-লোকারণ্য।বিল্টুর মেজদাদু নাকি সকলকে এমন-এমন কথা বলে দিচ্ছেন যে একেবারে হৈ-হৈ পড়ে গেছে।বুবু চারিদিকের সব আলোচনা শুনতে-শুনতে ভিড় ঠেলে মেজদাদুর কাছে পৌঁছবার চেষ্টা করতে লাগল।ঘরে ঢুকে দেখল বিল্টুর মা মুখ শুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মেজদাদু নাকি বিল্টুকে বলেছে একটা নীলার আংটি পরাতে হবে বিল্টুকে। তবেই নাকি বিল্টু পাশ করবে এইবার।আর এই নীলার আংটিটার অনেক ক্ষমতা।আছে বিল্টুরই কোনো একজন বন্ধুর কাছে।তবে ঐ নীলার আংটি যদি সহ্য না হয় তবে আর কিছু করার নেই।বিল্টুর মা মায়াকাকীমা তো দারুণ চিন্তায় পড়লেন।এত টাকা কোথায় পাবেন?তাছাড়া যদি নীলার আংটি বিল্টুর সহ্য না হয় তবে তো আরও বিপদ।এমনিতেই ছেলেটা বোকাসোকা।

বুবু বিল্টুদের দরজায় পা দিতে না দিতে মেজদাদু গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন-

”কাশ্মীরী কাঠের বাক্স খোলার ইচ্ছে খুব?এত কৌতূহল কেন তোর?ঐ বাক্সে যা আছে তা যদি জোর করে দেখতে যাস তো ঘোর বিপদ।ঐ বাক্সটা বিল্টুকে এনে দিবি।ভুল করেও খুলবি না।ঐ বাক্সে যা আছে তা বিল্টুর দরকার।”

ততক্ষণে বুবুর হাড় হিম হয়ে গেছে।সে ভাবছে কি সাঙ্ঘাতিক কান্ড!এইসব কথা কি করে বলে দিলেন মেজদাদু?

”অতো ভাববার কিছু নেই।ঐ বাক্সে আছে শক্তিশালী আত্মার ছায়া।তাই খুব সাবধান।তোর দিদা ঠিক কাজই করেছেন ঐ বাক্স তোকে খুলতে না দিয়ে।বাক্সটা এনে বিল্টুকে দিয়ে দিবি।”

একথা শুনে বিল্টুর মা বলছেন-

” ওবাবা ঐসব অতৃপ্ত আত্মা-টাত্মার পাল্লায় পড়লে যে আর বাঁচব না।দরকার নেই আমার আংটির।বিল্টু থাকুক এই ক্লাসেই।দরকার পড়লে ইস্কুল বদলে দেব।”

বুবুর দিদুন পড়লেন মহা ফ্যাসাদে।ঐ বাক্সটা বিল্টুকে দিতে বলছেন এই সন্ন্যাসী।কিন্তু কি করে দেবেন?ওতে যে বুবুর দাদুর স্মৃতিটুকু রাখা যত্ন করে।আর ঐ আংটি এই পরিবারের রক্ষাকবচও বটে।ঐ আংটির এত ক্ষমতা যে বদ্ অভিসন্ধি নিয়ে কেউ এই বাড়ীতে প্রবেশ করতে পারে না।কোনো লোক কোনো খারাপ কাজও করতে পারে না।ঐ বাক্সের ভেতরই শক্তি লুকিয়ে রাখা আছে।যে করেই হোক এই অঘটন আটকাতে হবে।এই বাক্স হাতছাড়া করলে ঘোর বিপদ আবার না দিলেও বিপদ।কেননা এই সব লোকেরা খুব ক্ষমতাশালী হন।বুবুর দিদুন পড়লেন মহা চিন্তায়।

সেদিন রাতে দিদুন বুবুকে ঐ কাশ্মীরী কাঠের বাক্সের রহস্য খোলাখুলিভাবে বললেন।বুবুর দাদুকে এক সাহেব এই নীলার আংটিটা দিয়েছিলেন।তখন বুবুর দাদু এইসব বিশ্বাস করতেন না।অতো সুন্দর আংটিটা শখ করে আঙুলে পরেছিলেন উনি।ঐ আংটিটা পাওয়ার কদিন বাদে ছিল বিশ্বকর্মা পূজো।আংটিটা পাওয়ার কয়েকদিনের ভেতরই বাড়ীতে নানা অলৌকিক ঘটনা ঘটতে লাগল।মায়ের বহুদিনের চুরি যাওয়া রূপোর বাসন খুঁজে পাওয়া গেল।দাদুর ব্যবসায় আটকে থাকা বকেয়া টাকা ফেরৎ পাওয়া গেল।ছোটপিসির একটা পা ব্যাঁকা ছিল সেটা পুরোপুরি সেরে গেল।এইসব দেখে-শুনে সবাই হতবাক।সকলের মুখে-মুখে এই আশ্চর্য আংটির কথা প্রচার হয়ে গেল।সবাই ঐ আংটি দেখার জন্য বাড়ীতে ভিড় করতে লাগল।

দাদুর এক বন্ধু কায়দা করে ঐ আংটিটা দাদুর কাছ থেকে নিয়ে নেবার মতলব করলেন।দাদু সাদা মনের মানুষ।বন্ধুর আংটি পরার শখ সেই শুনে নিজের হাত থেকে খুলে বন্ধুর আঙ্গুলে আংটিটা পরিয়ে দিলেন।অতো মূল্যবান আংটি দেখে হয়তো ঐ বন্ধুর মনে লোভ হয়েছিল।দাদু এত বোঝেননি।কিন্তু খারাপ মানুষদের ঐ আংটি ঠিক ধরে ফেলে আর তার বিরাট ক্ষতি হয়ে যায়।একথাটা জানা গেল সেদিন-

দিনটা ছিল বিশ্বকর্মা পূজো।দাদুর ঐ বন্ধুটা কিছুতেই আংটিটা ফেরৎ দিচ্ছেন না।দাদুও কিছু বলতে পারছেন না।সবাই মিলে ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো চলছে।হঠাৎ দাদুর বন্ধুর বিকট চিৎকারে সকলে চমকে উঠল।ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে ধারালো মাঞ্জার সুতোয় নীলার আংটি সমেত ঐ বন্ধুটার কড়ে আঙুল ছাদের মাটিতে কেটে পড়েছে।রক্তারক্তি কান্ড! সেই থেকে দাদুর ঐ বন্ধুটার ডানহাতের কড়ে আঙুল ছিল না।দিদুন স্বপ্নে দেখেছিলেন ঐ সাহেব বলছে দাদু ছাড়া আর কেউ যেন ঐ আংটিতে হাত না দেয়। ঐ আংটি বাড়ীতে যত্ন করে রাখতে হবে।তাহলে এবাড়ীর কাউকে কোনো বিপদ স্পর্শ করতে পারবে না।কিন্তু কেউ যেন লোভে পড়ে ঐ বাক্স না খোলে, আর ঐ আংটি চুরি করার চেষ্টা না করে।তাহলে আবার তার আঙুল কাটা পরবে।

বুবু তো গল্প শুনে থ।এদিকে বিল্টুর মেজদাদু ঐ সন্ন্যাসী বলেছেন বিল্টুকে ঐ বাক্সটা দিতে।আর তার ভেতর আছে ঐ নীলার আংটি।যদি ঐ আংটি বিল্টু হাতে পরে আর সেই আংটি ওর সহ্য না হয় তাহলে তো ওর আঙুলও কাটা যাবে।না না তা কি করে হয়?এদিকে আঙ্গুলে আংটি না পরলে বিল্টু যদি পাশ না করে?এ তো মহা সমস্যা।ঐ আংটিটা কেন যে দিদুন রেখে দিল কে জানে?এদিকে বিল্টু অঙ্কে খালি ফেল করে বলে বিল্টুর অঙ্কের স্যার বিল্টুকে চোরের মার মারেন।বিল্টুর মায়ের থেকে অনেক টাকা মাইনেও নেন ঐ স্যার।একেবারে অর্থ পিশাচ।বিল্টুর ওপর তার ভয়ানক রাগ। বিল্টুকে রাতদিন বলেন-

” কি করে তুই অঙ্কে পাশ করিস দেখব।তোকে আমি ফেল করিয়েই ছাড়ব।নয়তো আমার নাম খগেন খান্না নয়।”

বিল্টুর অঙ্কে তেমন মাথা নয়।সে তো হতেই পারে।তাছাড়া এখন তো মারধোর করার আর নিয়মও নেই।ঐ খেঁচুটে অঙ্কের স্যারটা কোনো কথাই শোনেন না।এইবার আবার ঐ স্যারটাই অঙ্কের খাতা দেখবেন।কিছু একটা করতেই হবে।হঠাৎ বুবুর মাথায় একটা ফন্দী এসে গেল।দিদুন রাতের বেলা ঘুমিয়ে পড়তেই দিদুনের ঘর থেকে ঐ কাশ্মীরী কাঠের বাক্সটা সরিয়ে ফেলল বুবু।ভোরবেলা বিল্টুকে অঙ্কের স্যার অঙ্ক করাতে আসবেন।তখনই কাজটা করতে হবে।

ভোরবেলা পা টিপে-টিপে বুবু ঐ বাক্সটা নিয়ে বিল্টুর ঘরে গিয়ে হাজির।

”কি রে বুবু এত সকালে?”

”তোর জন্য একটা জিনিস এনেছি।”

”অ্যাই অ্যাই ছোঁড়া কি ব্যাপার রে?সকাল-সকাল বিল্টুর পড়ার সময় এসে হাজির হয়েছিস?এমনিতেই তো তোর বন্ধুটি গোবর গণেশ।পর-পর একই ক্লাসে বসে-বসে গাব্বা খাচ্ছে।তার ভেতর তুই এলি জ্বালাতে।যা বলছি, পালা এখান থেকে।নয়তো চাবকে লাল করব।”

খগেন খান্না গলা- হাঁকড়ানি দিতে লাগলেন।

”কি এনেছিস হাতে?দেখি! অ্যাই! অ্যাই !লুকোবি না দেখি দেখি!”

”এই তো!দেখি! এ তো দেখছি একটা কাশ্মীরী কাঠের বাক্স।নিশ্চই টাকা পয়সা চুরি করেছিস?বাঁদর ছোঁড়া সব!’—-একি!একি! এ তো একটা বহুমূল্যবান নীলার আংটি! দেখি !দেখি! এইসব জিনিস ছোটদের হাত দিতে নেই।আমার কাছে থাকুক।”

এই বলে খগেন স্যার ঐ নীলার আংটির বাক্সটা নিয়ে চলে গেলেন।

”স্যার স্যার ঐ বাক্সটা আমার জন্য বুবু এনেছে স্যার।”

খগেন খান্না আংটির বাক্সটা নিয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে সোজা বাড়ী গিয়ে হাজির।নতুন ফ্ল্যাটের বাকী কিস্তিটা এই আংটি বিক্রির টাকায় হয়ে যাবে!নাকি আংটিটা ঘরেই রাখবেন?এই আংটির তো অনেক ক্ষমতা।নানা কানাঘুষো শুনছেন।যদি এই আংটির দৌলতে ভাগ্য ফিরে যায় তবে আর চিন্তা নেই।বিধাতা যখন দেন তখন ছপ্পর ভরকে দেন।আংটিটা আঙ্গুলে পরে নিয়েছেন খগেন খান্না।কাশ্মীরী কাঠের বাক্সটা কাঁধের ঝোলায় রেখেছেন।মনটা আজ বেশ খুশি।-

”গিন্নী একটু চা খাওয়াও তো।”

বলে খাটের ওপর আয়েস করে বসলেন খান্না স্যার।

”উফফ আজ বেশ গরম।টেবিল ফ্যানটা ঘুরিয়ে দিই।আরে আরে কি হল আঙ্গুল দুটো পাখার খাঁজে আটকে গেছে।আহ্!পারছি না কিছুতেই বার করতে।বাঁচাও আমাকে!বাঁচাও!মাগো আমার আঙ্গুল !আমার আঙ্গুল!কত রক্ত!মাগোওওওওও—-।”

বলে খান্না স্যার অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।সকলে ঘরে ছুটে এসে দেখল নীলার আংটি সমেত খগেন খান্নার দুটো আঙ্গুল কাটা অবস্থায় পড়ে আছে।এরপর থেকে আর কখনও খগেন স্যার ছাত্রদের গায়ে হাত তোলেননি।আমূল পরিবর্তন এসেছিল তার ব্যবহারে।

আর বিল্টু ঐ নীলার আংটি পরেনি।দিদুন ওটা চিরতরে আলমারিতে তুলে রেখেছিল।বুবুর কাছে অঙ্ক বুঝে বিল্টু ক্লাস টেনে উঠে গেছিল সেবার।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত