রাঙিয়ে দিয়ে যাও

রাঙিয়ে দিয়ে যাও

“হোলি হ‍্যায়,হোলি হ‍্যায়..ও দাদান আমার পিচকিরি কই ও ঠাম্মু বালতি কই? রঙ খেলবো, রঙ খেলবো। লাল রঙ,সবুজ রঙ,হলুদ রঙ সব লাগবে।”এতক্ষণ আপন মনেই সারা বাড়ি মাতাচ্ছিলো সবুজ,সবে ওর চার বছর বয়েস। গত দুই বছরই শুধু রঙ খেলেছে তাতেই পাকাবুড়োর সব চাই। “ভাই এইদিকে আয় তো,আচ্ছা সব হবে এতো চিৎকার কিসের? চল আমরা বরং ঐ ঘরে

যাই।”সবুজকে সামলাতে এগিয়ে আসে লালী ওর জেঠুনের মেয়ে। ল‍্যাপটপটা দেখেই এগিয়ে যায় সবুজ,”দাদাভাই আমি দেখবো,দেখিনা একটু। এই তো কি মজা! বাবা মাকে রঙ মাখাচ্ছে,মা একদম ভূত সেজেছে। আর বাবার পাঞ্জাবীটা লাল।”..ছবিগুলো তাড়াতাড়ি সরাতে যায় নীল কিন্তু ততক্ষণে মাউসে হাত দিয়েছে সবুজ। লালী দাদাকে ইশারা করে।” দেখি ভাইটু,যাহ্ এটার তো চার্জ নেই আর। দেখ কেমন অন্ধকার হয়ে গেছে।”চোখটা ছলছল করে ওঠে সবুজের,দাদা আর দিদির সাথে আড়ি করে দাদুর ঘরে ছুটে চলে যায়।

লালী ছোটবোন তবুও দাদাকে বকুনি লাগায়,” তোকে কতবার বলেছি দাদা,ঐ ছবিগুলো দেখিসনা। তবুও কেন খুলে বসেছিস শুনি? আর ভাইটাও ঠিক এইসময়ই এলো এখানে।”..ভেজা চোখটা লুকোতে মুখ ফেরালো নীল,” একবছর হয়ে আসছে নারে? এই সময়টা খুব ছোটকার কথা মনে পড়ছে।”

বাবাদের তিন ভাই আর দুই পিসি আর তাদের ছেলে মেয়েদের নিয়ে জমজমাট বাড়ি নীলদের। সবাই একসাথে এলে তো বাড়ি একদম গমগম করে। মেজকা,আর ছোটপিসি থাকে কলকাতায়। বড়পিসি টাটাতে আছে অনেকদিন তবে সবাই চেষ্টা করে ওদের দেশের বাড়ি দুর্গা পুজোতে আসতে। বাড়ির মধ‍্যমণি আর প্রাণ ছিলো ছোটকা। সব অনুষ্ঠানেই উৎসাহের অন্ত ছিলোনা,তেমন বাজখাই গলা আর সাহস। ছোটকা আছে মানে কোন চিন্তা নেই। ছিপ

বানানো,পুকুরে জাল ফেলা।বটগাছে দোলনা টাঙানো,বাজি ধরে মাংস আর রসগোল্লা খাওয়া সবেতেই ছোটকা। আর সবচেয়ে ভালোবাসতো রঙ খেলতে। ছোটকার দোল মোটামুটি চলতো তিনদিন ধরে। সারা গ্ৰাম জুড়ে চলতো

খেলা,রাধাকৃষ্ণের পুজো আর দোলনায় ঠাকুর রেখে পায়ে আবীর দেওয়া। সন্ধ‍্যেবেলা জমিয়ে খাওয়া মালপোয়া,লুচি আর পায়েশ।

ওদের ঐ ডাকাবুকো ছোটকাও শেষে প্রেমে পড়লো তাও কিনা একদম একটা ছোট্ট খাট্টো মিষ্টি শান্ত মেয়ের। ওরা প্রথমে জেনে আশ্চর্য হয়েছিলো,এই ওদের ছোটকাকি হবে। ওদের মা তো বলেই ফেলেছিলো,” ওরে বাবা আমার ডাকাবুকো ঠাকুরপোর এমন লক্ষ্মীমন্ত বৌ,এ তো বাঘের সাথে খরগোশের বন্ধুত্ব।”..বড় জায়ের কথা শুনে লজ্জায় মাথা নিচু করেছিলো আবীরা। আবীরা রঞ্জনের মানে ওদের ছোটকার বন্ধুর বোন। বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে আবীরা নামটা শুনেই নাকি প্রেম হয়ে গিয়েছিলো আর তারপর গান শুনে একদম ফিদা ওদের ছোটকা।
সত‍্যি দারুণ গান গায় ওদের ছোটকাকি,এই তো গত দোলেও গেয়েছিলো ছোটকাকি…

‘ব্রজ–গোপী খেলে হোরী খেলে আনন্দ নবঘন শ্যাম সাথে। রাঙা অধরে ঝরে হাসির কুম্‌কুম্‌ অনুরাগ–আবীর নয়ন–পাতে।।’

সবাই পরিস্কার জামাকাপড় পরে ঠাকুরঘরে বসে শুনছিলো গান। থরে থরে সাজানো ছিলো রাধাকৃষ্ণের ভোগ। এমনকি সবুজটাও চুপ করে বসেছিলো বাবার কোলে।

ওদের বিয়ের দুবছর বাদে এসেছিলো সবুজ। যথারীতি রঞ্জন বলেছিলো,” কোন কথা নয়,একদম রঙের নামে ওর নাম হবে।”..পুজোর পরেই সবাই মাততো রঙ খেলায়,রঞ্জনের হাত থেকে কারো ছাড় ছিলোনা। সবচেয়ে ভূত পেত্নী হতে হত আবীরাকে। নিজেকে একদম সঁপে দিতো স্বামীর নিবিড় বাহুবন্ধনে। জানতো এই দুষ্টু লোকটার সাথে পেরে ওঠা মুশকিল। যতই লালী, নীল আর দিদিভাই বলুক আমরা কিন্তু তোমার দলে। রঙের রাগে অনুরাগে হাসিমুখে রাঙা হত আবীরা,শরীরের কোন অংশই বোধহয় বাদ যেতোনা।

গতবার আবীরার দাদার বিয়ের পর প্রথম হোলি ছিলো,তাই ঐ দিন ওদের নেমন্তন্ন ছিলো শ্বশুরবাড়িতে। বড় জা হাসিমুখে বলেছিলো,” আমি সামলে নেবো সবটা,পুজো তো হয়েই যাচ্ছে। তোরা কাল ভোর ভোর বেড়িয়ে যা।”
রঞ্জন আর আবীরা দুজনেই আব্দার করেছিলো লালী আর নীলকে নিয়ে যেতে। গিয়েছিলো ওরা ওদের কাকা কাকির সাথে। গাড়ি চালিয়ে যেতে যেতে কি যে মজা করেছিলো সবাই। মাঝে পলাশ গাছ দেখে গাড়ি থামিয়েছিলো রঞ্জন,এক গোছা পলাশফুল এনে ভরিয়ে দিয়েছিলো আবীরার খোঁপা। নীল আর দেরি করেনি একেবারে মোবাইলে বন্দী করেছিলো সবটা।

খুব মজা হয়েছিলো ওদের ছোটকাকির বাপের বাড়িতে। সবাই হোলি খেলে ভূত হয়েছিলো। ননদাইয়ের পাল্লায় পড়ে সবচেয়ে ভূত হয়েছিলো ওর নতুন বৌদি। হাসতে হাসতে বলেছিলো,” সত‍্যি আবীরা,এবার থেকে প্রতিবার আসতে হবে হোলিতে। আমি ভীষণ রঙ খেলতে ভালোবাসি, তাই রঞ্জনদা ছাড়া জমবেনা।”..দুষ্টু হাসি হেসে আবীরা বলেছিলো,” আমি কি প্রতিবার আসতে পারবো? তোমার রঞ্জনদাকে পাঠিয়ে দেবো বৌদি।”…রঞ্জন বলেছিলো,” বৌ ছাড়া শ্বশুরবাড়ি কভি নেহি।”গানে গল্পে আড্ডায় আর ভালো মন্দ খাওয়া দাওয়ায় কোথা দিয়ে যে কেটে গিয়েছিলো দুটো দিন বোঝাই যায়নি।

ফেরার সময় ওদের গল্পের মাঝেই একটা ছোট ছাগলের বাচ্চা এসে পড়েছিলো গাড়ির সামনে। চোখ বন্ধ করেছিলো ওরা,আর তারপর সবটা অন্ধকার ছাগলটাকে বাঁচাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলো রঞ্জন। গাড়িটা কাত হয়ে পাশে পড়েছিলো,ছুটে এসেছিলো অনেক লোক। সবাই ওরা চোট পেয়েছিলো শুধু সবুজকে আঁকড়ে ধরেছিলো ছোটকাকি। রঞ্জনের সারা শরীরটা যেন গাড়িটাকে বাঁচাতে চেয়েছিলো,কোথাও চোট নেই শুধু মাথায়। আর কথা বলেনি রঞ্জন,মুছে গিয়েছিলো আবীরার জীবনের রঙ। পাগলের মত হয়ে গিয়েছিলেন ওর শাশুড়ি,” বাপের বাড়ি যাওয়ার শখ। গেলো তো আমার ছেলেটা। হায় ভগবান,আমার বাড়ির যে সব আলো নিভে গেলো।”পাথরের মত হয়ে গিয়েছিলো আবিরা শুধু বুঝেছিলো নিজে চলে গিয়ে সবাইকে বাঁচিয়ে গেলো রঞ্জন।

গ্ৰামের বাড়ি,তাই জায়ের মন খারাপ হলেও বলতে পারলোনা,” মা ছোটকে সাদা পরাবেননা,ঠাকুরপো সবসময় ওকে গোলাপী,লাল এইসব রঙ এনে দিতো।”লালী আর নীল বলতে গিয়েছিলো লাভ হলোনা। বাইরে থেকে ওর ভাসুর ননদেরাও বলেছিলো ‘এত কড়া নিয়ম করানোর কি দরকার! ছেলেটা ভয়ে যাচ্ছেনা মায়ের কাছে। একটু ভাবো মা।’
দেখতে দেখতে একবছর হয়ে আসছে,সবাই জানে এ বাড়িতে কেউ হয়ত আর তেমনভাবে কোনদিনই রঙ খেলতে পারবেনা। শুধু অবুঝ সবুজটাকে কে বোঝাবে। এবার রাধাকৃষ্ণের পুজোও বাড়িতে নেই,সারা বাড়ি বড় নিরানন্দপুরী। সকাল থেকেই শ্বশুরমশাইয়ের শরীরটা ভালো নেই,প্রথমটা ওরা ভেবেছিলো মনটা খারাপ। পরে হঠাৎই বুকে ব‍্যাথা শুরু হয়েছে। আবীরা সকাল থেকেই ঘরে,বিয়ের পর এই বছরের রঙের উৎসবে নিভে গেছে জীবনের আর মনের সব রঙ। আজ জীবনে একটাই রঙ সাদা,তাতে কোন আঁকিবুকি নেই। গতবছরের লাল ঢাকাই শাড়িটাতে এখনো

আবীরের গন্ধ আর ছোঁয়া লেগে আছে। হয়ত বা রঞ্জনের সোহাগের দাগও আছে,বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে শাড়িটা আবিরা। চোখদুটো বড় শুকনো,তবুও বসন্তের রঙের ছোঁয়া লেগে কান্নায় লাল হয়েছে আজ।

হঠাৎই দরজায় আওয়াজ শোনে।” ছোটবৌমা,সকাল থেকে ঘরে আছো। তোমার শ্বশুরের যে খুব শরীরটা খারাপ। একবার বেরোও,বড় খোকা ডাক্তার ডাকতে গেছে।”..দরজাটা খুলে দেয় আবীরা।” পুরোনো লাল শাড়িগুলো বাইরে কেন? উঃ আমি যে কি করি। ছেলেটাকে একটু দেখো আজ দোলের দিন কোথায় কোথায় ছুটে বেড়াচ্ছে।”

চোখটা মুছে বাইরে আসে আবিরা,দিদিভাইকে দেখে শ্বশুরমশাইয়ের কাছে। রান্নাঘরে যায়,অনেক কাজ পড়ে আছে সেখানে। ছেলেকে খোঁজে,লালী বলে নীল ওকে আনতে গেছে,পাশের বাড়িতে গেছে।

হঠাৎই ছেলের আওয়াজ পায় আবীরা,বাইরে বেড়িয়ে দেখে রঙ মেখেছে ছেলে। নীল কোলে তুলে এনেছে ওকে। অদ্ভুত একটা রাগ হয়ে যায় ওর নিজেকে সামলাতে পারেনা,ছুটে যায় উঠোনে ততক্ষণে গায়ের থেকে সরে গেছে আঁচল,মাথার খোঁপা খুলে একঢাল কোঁকড়া চুল ছড়িয়ে পড়েছে সারা পিঠে। কাকিকে এমন রাগতে কখনো দেখেনি নীল অবাক হয়ে যায়। ” এত তোর রঙ খেলার শখ! তোকে বলেছিনা আমাদের জীবনে কোন রঙ নেই।”বলেই হাত তুলে এক থাপ্পড় দিতে যায় ছেলের গালে। ভয় পায় সবুজ,এমনকি নীলও।

” এটা কি করছেন? ওকে মারবেন না প্লিজ।”হাতটা তোলা হয়না আবীরার ভাসুর আর অচেনা একজনকে দেখে হাতটা নেমে যায় ওর। বুঝতে পারে উনিই ডাক্তারবাবু। তাড়াতাড়ি গায়ে আঁচলটা তুলে দেয়।

ভাসুর একটু বিরক্ত হয়েই ওনাকে নিয়ে ঘরে চলে যান,তবুও যেন চোখাচোখি হয়ে যায় আরেকবার ভদ্রলোকের সাথে আবীরার। নীল ততক্ষণে ভাইকে নিয়ে সরে গেছে। ভয়ের তেমন কিছু নেই ডাক্তারবাবু বলেছেন,আপাতত বাড়িতেই থাকতে পারবেন শ্বশুরমশাই। এর মাঝেই আবীরা চা দিয়ে এসেছে। কি অদ্ভুত মানুষ এই ডাক্তারবাবু ওনার কথা শুনে বিরক্ত লাগলো ওর। “দোলের দিনে চা বিস্কিট! এই দিনে তো মালপোয়া পায়েশ খাওয়ার দিন।”..ঘর থেকে চলে আসে আবীরা,ছেলেটাও ভয়ে খুব একটা ঘেষছে না। ” আচ্ছা ছোট,তুই কি পাগল হলি! ও তো ঠাকুরপোর ছেলে ও রঙ খেলবে না! ঐটুকু ছেলের বোধ আছে? কাছে টেনে নে ওকে। নীল বলছে কাকিকে এমন কোনদিন দেখেনি।”ছেলেকে কোলে তুলে কান্নায় ভেঙে পড়ে আবীরা।

মাঝে কেটে গেছে দু তিন দিন। শ্বশুরমশাই এখন কিছুটা ভালো। ডাক্তারবাবু সেদিন আবার এলেন,চা দিতে গেলো আবীরা। ” আচ্ছা শুনুন,আপনি কি কখনো হাসেন না? আসলে আমরা এত চাপে থাকি এমন গোমড়া দুঃখী মুখ দেখতে আর ভালো লাগেনা।”..কেন যেন একটু হাল্কা হাসির রেখা ফুটে ওঠে ওর মুখে।”বাহ্ এই তো হাসলে কিন্তু কুৎসিত লোককেও ভালো লাগে।”

মাঝে দুদিন এলো রক্তিম,এর মাঝেই সবুজের সাথে ওনার বেশ ভাব হয়ে গেছে। তবে আবিরা আর চা দিতে আসেনা। শাশুড়িই বারণ করেছেন,” বড় বৌমা তুমিই চা দিয়ে এসো,ডাক্তারটা কেমন যেন,ছোট বৌমাকে দেখলেই জ্ঞান দিতে শুরু করে। কিছু বলতেও পারিনা,ওনার চিকিৎসায় ভালো হচ্ছে তোমার শ্বশুর। ছোট বৌমাকে দেখলেই বকবক শুরু করে। আমরা মফস্বলে থাকি,ছোটবৌমার বয়েস কম কি দরকার বাপু।”

শ্বশুরমশাই এখন ভালো আছেন,সবাই অনেকটা নিশ্চিন্ত। হঠাৎই একদিন এলো রক্তিম,সবাই আশ্চর্য হলো দেখে। ” ডাক্তারবাবু আপনি,হঠাৎ!আসুন আসুন,বাবা এখন অনেকটা ভালো।”..” আসলে আমি ছোটবেলা থেকেই বাবা মা হারা আপনাদের পরিবারটা কেন যেন মন কেড়ে নিয়েছে।

” আপনি তো ভাইকেই দেখলেন না,তাহলে বুঝতে পারতেন। কি জমজমাট ছিলো আমাদের পরিবার। সারাক্ষণ হইহল্লা আর হাসিঠাট্টায় জমে থাকতো সবাই।”

“সবুজ কোথায়?ওকে দেখছিনা তো। আমি তো ওর সাথেই দেখা করতে এলাম। ছোট থেকেই আশ্রমে বড় হয়েছি,হঠাৎই চাকরি নিয়ে চলে এসেছিলাম এই হসপিটালে। তারপর থেকে গত একবছর এখানেই আছি।”হঠাৎই সবুজ কোথা থেকে হই হই করতে করতে চলে আসে, একদম ডাক্তারবাবু ডাক্তারবাবু করতে করতে রক্তিমের কোল ঘেষে দাঁড়ায়। তোমাকেই তো খুঁজছিলাম আমি সবুজবাবু। আচ্ছা এগুলো নিয়ে যাও,দাদা দিদিদের সাথে ভাগ করে খেয়ো।”..হাতটা বাড়িয়েও পিছিয়ে যায় সবুজ,” দাঁড়াও আগে মাকে জিজ্ঞেস করি,তারপর।”..” কেন তোমার মা কি খুব রাগী,মারবে?”..ছোট সবুজের করুণ মুখটা অনেক না বলা কথা বলে যায়। ওর ঠাকুমাই বলে দেয়,” না না ডাক্তারবাবু,ওর অভ‍্যেস খারাপ হবে। বৌমা রাগ করবে।

“হাসে রক্তিম,” ঠিক আছে ডাকুন ওর মাকে জিজ্ঞেস করেই দেবো নাহয়।” রক্তিমের গলার আওয়াজে এমন কিছু ছিলো যে ওর ভাসুরই ডেকে দেয় আবীরাকে। গায়ে আঁচলটা জড়িয়ে দাঁড়ায় আবীরা,সাদা শাড়িতে ঢাকা শরীরটাতে শুধু জেগে রয়েছে ওর সরল মুখটা। ” আপনার এখন অনেক দায়িত্ব সবুজকে বড় করতে হবে,এতটা পথ চলতে হবে।খুব বেশি শাসন করলে ওর ক্ষতি হবে।”

শাশুড়িমা একটু বিরক্ত হন,তাই বলে ওঠেন,” বৌমা যাও বরং সন্ধ‍্যেটা দিয়ে দাও। আমি আছি দাদুভাইকে দেখবো। বড়বৌমাকে বোলো ডাক্তারবাবুর জন‍্য….”

আবীরা ততক্ষণে অনেকটা এগিয়ে গেছে দরজার দিকে হঠাৎই বসন্তের এক দমকা হাওয়ায় শাড়িটা যেন পায়ে জড়িয়ে যায়। ” মাসিমা আমি আজ একটা কথা বলতে এসেছিলাম সোজা কথা বলতে আমি বরাবরই শিখেছি তাই..” রক্তিমকে কথা শেষ না করতে দিয়েই ওর শাশুড়িমা বলে ওঠেন “সেটা আমাদের বোঝা হয়ে গেছে,শুধু শুধু কি রুগীর বাড়িতে কেউ ঘনঘন আসে। ছিঃ.. আপনি আসুন,আমরা অন‍্য ডাক্তার দেখাবো।”

আবীরারও রাগে মাথাটা দপদপ করতে থাকে ঘরে যাবার পথে শুনতে পায়” কিছুই বোঝেননি আপনারা মেসোমশাইয়ের শরীর খারাপের পেছনে আছে মনটা। সবুজ সবসময় ভয়ে থাকে। আপনি চোখে চোখে রাখেন বৌমাদের। এখন যুগ পাল্টাচ্ছে,ওরা আবার বাঁচুক। আমি শুনেছি উনি খুব ভালো গান করেন,সেটাই আবার শুরু করতে দিন।”..সবাই আশ্চর্য হয়ে যায় এত কথা উনি জানলেন কি করে?

রক্তিম আর এবাড়িতে আসেনি সেদিনের পর অনেকদিন। হয়ত অনেকটা নাড়া দিয়ে এসেছিলো একটা মরচে ধরা মনকে আর সংস্কারে আটকে থাকা কিছু মানুষকে। সবাই মিলে ওর শাশুড়িমাকে বলে আবীরার গান গাওয়াটা আবার শুরু করতে চেয়েছিলো। কিন্তু পারেনি আবীরা,গলা দিয়ে উঠে এসেছিলো দলা দলা কান্না। প্রথমে ঠাকুরঘরে বসে অঝোরে কাঁদতো আর গাইতো হে গোবিন্দ রাখো চরণে। বাবাই শিখিয়েছিলেন এই গানগুলো। একটু একটু করে ধুয়ে যেতে থাকে কালবৈশাখী ঝড় হাল্কা বৃষ্টির ছোঁয়ায়। হয়ত বাড়িতেও ফেরে স্বাভাবিক ছন্দ।

কখনো পথ ভুলে ঐ পথ দিয়ে যেতে যেতে জ‍্যোৎস্না রাতে রক্তিম শুনেছে আবীরা গান শেখাচ্ছে ওর ছাত্রীদের,’ চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে।’ এমনি মিস্টি ছিলো ওর মায়ের গলা,বাবা মারা যাবার পর পাল্টে গিয়েছিলো মা, তারপরে একসময় মাও চলে গিয়েছিলো ওর ছোটবেলায়। তারপর থেকে আশ্রমে মানুষ হয়েছে। সবুজের মধ‍্যে যেন আরেকবার নিজেকে দেখতে পেয়েছিলো রক্তিম।

দেখতে দেখতে আসছে আরেকটা হোলি। এবার রঙ খেলবে সবুজ,জেঠু ,দাদান সবাই এনে দিয়েছে অনেকরকম রঙ আর আবীর। সকাল থেকে পুজোর জোগাড় চলছে ,বেশ অনেকদিন বাদে আবার বাড়িতে ভোগের গন্ধ। শ্বশুরমশাই বললেন,” কই ছোটোমা একটা গান শোনাও দেখি। রাধাগোবিন্দও যে তৃপ্ত হন তোমার গানে,দীর্ঘশ্বাস পড়ে আবিরার মনে মনে ভাবে তৃপ্ত করতে পারলো কই? গানে আর রঙের ছোঁয়ায় ভরে ওঠে ঠাকুরঘর এক অপূর্ব স্নিগ্ধতায়।
পুজো শেষ হতেই সবুজ ছিটকে বাইরে বেরোয়,পেছন পেছন যায় ওর দাদা দিদিরাও।

বেশ কিছুটা বাদে উঠোনে হৈ চৈ শুনে মুখটা বাড়ায় আবীরা প্রসাদের থালা হাতে নিয়ে ঐ বোধহয় লালী, নীল, সবুজের বন্ধুরা এলো।

হঠাৎ মাথাটা কেমন যেন ঘুরে যায়,হলুদ বাটিকের পাঞ্জাবী পরে মুখে রঙ মেখে সবুজকে কোলে নিয়ে কে এসে দাঁড়িয়েছে! না না রঞ্জন আসবে কেন,কিন্তু এমন পাঞ্জাবী তো ও…ততক্ষণে এগিয়ে এসেছেন ওর শ্বশুরমশাই,” এসো এসো,গতবার প্রসাদ খাওয়াতে পারিনি। তাই এবার আমি নিজেই চলে গিয়েছিলাম নেমন্তন্ন করতে।”

“আসছি আগে একটু রঙ খেলি ভালো করে সবুজের সাথে।” ততক্ষণে বাড়ির উঠোনটা জমজমাট হয়ে গেছে,প্রসাদ খেতে এসেছে ওদের বন্ধুরা। আবীরা ঘরে চলে আসে ওর জা বলে,” কি ছেলেমানুষ বাপু এই ডাক্তার। আমি তো দেখিনি এমন,ওহ্ কিছু হৈ হল্লা করতে পারে অনেকটা ঠাকুর।” কথাটা সামলে নেয় বলতে বলতে।

আবীরার মাথায় কিছু ঢুকলোনা,আজ শাশুড়িমা নিজের হাতে পায়েশ মালপোয়া খাওয়াচ্ছেন ওনাকে। ” আরো দুটো নাও,সব বাড়িতে বানানো শরীর খারাপ হবেনা। বৌমারাই বানায় সব,আমিও হাত লাগাই।”

” মাও এমন বানাতো,কোন ছোটবেলায় খেয়েছি এখনো মুখে লেগে আছে।”

রক্তিম চলে যাবার পর শুধু হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছিলো আবীরার। কেন এমনভাবে জীবনে বারবার ঝড় আসে। বাড়িতে বসেছিলো আলোচনা,শাশুড়িমা বলেছিলেন,” ও আমার দাদুভাইয়ের বাবা হতে চায়,না না আমি ওকে ফেরাতে পারবোনা। সত‍্যিই আমি অন্ধ ছিলাম,তোমাদের বাবা আমায় বুঝিয়েছেন।”

“কিন্তু মা আমার মতটা আপনারা জানতে চাইলেননা একবারও। আমি পারবোনা,কিছুতেই পারবোনা।” ছুটে এসেছিলো ওর দাদাবৌদি অনেক বুঝিয়েছিলো..” ওকে ফেরাসনা আবীরা,আমাদের বাপেরবাড়ির গ্ৰামের ছেলে। আমি অনেকদিন চিনি খুব ভালো।”

” ও তাহলে বৌদি সবটা তোমারই বুদ্ধি তাইনা?” আবীরাকে বলতে পারেনা ওর বৌদি অনেক আগে থেকে চেনে রক্তিমদাকে। ফেসবুকেও ওর ফ্রেন্ডলিস্টে আছে ওখানেই কখনো দেখেছিলো আবীরা,রঞ্জন আর সবুজকে। জানতে চেয়েছিলো ওর কাছে। থাকনা কিছু কথা গোপনেই। হয়ত আবীরা আর সবুজ ভালো থাকলে ওদের বাড়িটাও ভালো থাকবে। আজকাল তো লাল শাড়ি পরে ওর সামনে দাঁড়াতেও খারাপ লাগতো।

পাড়ার লোকের কথায় কান দেননা শাশুড়িমা।” হ‍্যাঁ আমরাই দেখেশুনে দিচ্ছি গো,আমাদের নাতি যাকে চায় তাকে কি ফেরাতে পারি? বিয়ে আমরাই দেবো,ও তো এখন এই বাড়িরই মেয়ে। ইচ্ছে হলে এখানেই থাকবে।”ওনার সামনে আর কেউ কিছু বলতে পারেনা তবে আড়ালে অনেকেই বললো ভাগ‍্য বটে,কতই তো আইবুড়ো মেয়ে ছিলো এখানে। শেষে ডাক্তার মজলো গিয়ে আর কি যা যুগ পড়লো!

আবার সাজলো বাড়ি,লালী নীল আর সবুজের আব্দারে। সবাই এলো অনেকদিন বাদে আবার। কিন্তু আবীরা কোথায়? রঞ্জনের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছে। ধুয়ে মুছে গেছে সব সাজ। ভেজা চোখে সবুজকে ঘরে পাঠিয়ে দেয় ওর ঠাম্মি হয়ত ওই পারবে। পুচকেটা যে কখন এতো বড় হয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি কেউ, তাই ছেলের হাতে ধরা পলাশ রঙের বেনারসিটা গায়ে ফেলতেই হলো আবীরাকে। হাততালি দিয়ে উঠলো ছেলে,” এই তো মাকে আগের মত লাগছে আবার। কি মজা,কি মজা! আমার সুন্দর মা। ঐ তো বাবাও হাসছে।” মায়ের হাত ধরে বেড়িয়ে আসে সবুজ,আবীরা আজ সত‍্যিই অনন‍্যা। পলাশ রঙের ছোঁয়ায় আজ আবার এক নব বসন্তের দিন ওর জীবনে। ”

রাধাগোবিন্দকে প্রণাম করো ছোটোমা।”

” মা এসো না ,ডাক্তারবাবা এই যে মা এসেছে দেখো।” আবীরাকে দেখে মুগ্ধ হয় রক্তিম সত‍্যি বোধহয় আজ বসন্ত জাগ্ৰত দ্বারে..” এই রে ডাক্তারবাবা, এ আবার কি ডাক!আচ্ছা আমাকে কি বাবা বলা যায়না সবুজবাবু? মানে যাবে তো?”

মায়ের দিকে তাকায় সবুজ,মাথাটা চুলকে বলে,” আমাদের সবার সাথে রঙ খেলবে তো,মাকেও কিন্তু দিতে হবে একদম ভূত করে।”

“পাকা বুড়ো একটা, আচ্ছা আমি রাজি।”

“আচ্ছা তাহলে ভেবে দেখতে হবে এবার।”..সবার হাসির মাঝে কাঁপা কাঁপা হাতে সই করে আবীরা। রক্তিমের পরিয়ে দেওয়া লাল সিঁদুরের ছোঁয়ায় ভরলো ওর শূন‍্য সিঁথি আবার,তাড়াতাড়ি করে মাথায় ঘোমটা তুলে দিলো ওর বৌদি।

একচিলতে সিঁদুর ছিটকে এসে মাখামাখি হলো নাকটা। কানে কানে বৌদি বললো,” ভাবিসনা পাগলী,খুব ভালোবাসবে তোদের দুজনকে,আগলে রাখবে যত্ন করে।”

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত