দেহনাট্যম

দেহনাট্যম

এই হল দেহনাট্যম। এ যে কী নৃত্য,না দেখলে বিশ্বাস হয় না। উফ! কিছুতেই ভুলতে পারছি না! যেদিকেই তাকাচ্ছি শুধু ছায়াছন্ন সেই নৃত্যছবি। একেই বলে বোধহয় স্বপ্নযাপন। সবকিছুই স্বপ্নময় লাগছে।

তাহলে প্রথম থেকেই বলি। নাচ আমার বরাবর ভাল লাগে। সুযোগ পেলেই দেখি। সেরকমই এক নাচের অনুষ্ঠানে ওকে প্রথম দেখা। দেখতে দেখতে ভাললাগাটা ভালবাসায় রূপ নিল। মানে আগে সময় পেলে নাচ দেখতাম। এখন নাচ দেখার জন্য সময় বের করে নিই। আর তা শুধু ওর নাচ দেখার জন্য। মুদ্রা তাল আঙ্গিক এক্সপ্রেশান সবকিছু দিয়ে মঞ্চে এমন নৃত্যছবি তৈরী করে চোখের পলক পরে না আমার। প্রত্যেক অনুষ্ঠানে একেবারে সামনের সারির সিটে আমাকে দর্শক হিসেবে দেখতে দেখতে ওরও আমাকে ভাল লেগে গেল। একদিন গ্রীনরুমে ডেকে পাঠাল। আমি যেতেই কোন আলাপ পরিচয়ের প্রসংগে না গিয়ে সরাসরি প্রশ্ন, আমার নাচে কি এমন আছে যে প্রত্যেকটা অনুষ্ঠান দেখতে ছুটে আসেন?

– জানি না। তবে না এসে থাকতে পারি না।
-তাই?
– হুম।

সেই শুরু। তারপর ফোন নাম্বার দেয়া নেয়া। কিন্তু কথা হত না। ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপেও পেতাম না। কোথায় যেন লুকিয়ে থাকতো। ওই দূর আকাশের তারার মতো। কিন্তু ঠিক দিনে ঠিক সময়ে মঞ্চাকাশে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠত।

কতবার বলেছি, কি গো নাচ ছাড়া অন্যসময়ে তোমাকে দেখতে পাব না?

-নাঃ। বলেই মন ভাল করা হাসি উপহার দিয়েই উধাও হয়ে যেত।

এভাবেই দিন ফুরোচ্ছিল। রাত ঘুমোচ্ছিল। ফুল ফুটছিল। ঝরেও যাচ্ছিল। আমিও নিজের সংগে থাকতে থাকতে সবকিছুই মেনে নিচ্ছিলাম।

হঠাৎ একদিন। সক্কালবেলা ওর মেসেজ। দিনটা ছিল ওর জন্মদিন। জানতাম দেখা হবে না। তাই ফোনেই উইশ করতে গেলাম। কিন্তু আমাকে অবাক করে আমার বাড়ীর ঠিকানা চাইল। কারণটা বুঝতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলে তো বলবে না। তাই কৌতূহল চেপে রখে ওর ইচ্ছে মেনে অ্যাড্রেস আর রুটগাইড দিলাম।

কী আশ্চর্য! ও এসেছিল! আমার বাড়ি! কিছুতেই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন স্বপ্ন দেখছি। তবে স্বপ্নেও বোধহয় ওকে এমনভাবে দেখতে পেতাম না। সে কি সাজ! কল্পসুন্দরীর মতো! পরণে বাসন্তী রঙের শাড়ী। খোঁপায় পলাশের মালা। কানে ঝুমকোফুলের দুল। নাকে আকন্দের নাকছাবি। আর হাতের আঙুলে জুঁইফুলের আংটি। কপালে গোধূলির সূর্য। ঠোঁট লালগোলাপের পাপড়ি। কী ভালই না লাগছিল। চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। এই প্রথম ওকে ছোঁয়ার ইচ্ছে হল। তবে মুখে কিছু বললাম না। চুপচাপ সাদর অভর্থ্যনা দিয়ে ভিতরে নিয়ে গেলাম। বসালাম বিছানায়। তারপর হাঁটু গেড়ে ওর পায়ের কাছে বসলাম।

আমাকে এভাবে বসতে দেখে ও বলল, এ কি! এভাবে নীচে বসলে যে! আমার পাশে এসে বোসো। আমি ওর সেকথায় কান না দিয়ে বলে উঠি, চোখ বোজ।

কি! ও বোধহয় আমার কথাটা বুঝতে পারে নি। তাই আবার বললাম, বলছি দুচোখ বন্ধ করে চুপটি করে একটু বোসো তো।

সে কি কেন?
আঃ! বোজোই না।
বেশ। কিন্তু তাড়াতাড়ি।
– উফ! শুধু প্রশ্ন করে! একটু চুপ করে বোসো না গো।
– আচ্ছা ঠিক আছে নাও। আমি নিজেকে সমর্পন করলাম তোমার হাতে।

ও কি সব বুঝতে পারল? কি জানি! মেয়েদের তৃতীয় নয়ন নাকি খুব প্রখর! যাক গে। আমি ঠিক করে নিয়েছি আজ আমার ইচ্ছেপূরন করবই। ওর কোন ওজর-আপত্তি শুনবো না। আর তাই তাকালাম ওর পায়ের দিকে। আমি মনে মনে যার নাম দিয়েছি ঘুঙুরপাদিকা। ঘুঙুরফুলে সাজানিয়া সেই পা দুটি এই প্রথম আমি ফাঁকা দেখছি। সে কথা ওকে বলতে বলতে, আমার পাঞ্জাবীর পকেট থেকে এক জোড়া ঘুঙুর বের করে পরিয়ে দিলাম ওর দুপায়ে। ও বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিল…আমি ওর ঠোঁটে তর্জনী রেখে চুপ করালাম। তারপর আস্তে আস্তে ঠোঁট রাখলাম ওর ডানপায়ের পাতায়। আমার প্রথম চুম্বন ওকে। হ্যাপি বার্থ ডে টু হিয়া।

এ কি করলে তুমি! তোমার স্থান আমার বুকে! সেখানে তুমি কিনা আমার দুপায়ের গহনা দিলে…এ আমি পরব না। পরতে পারবো না।

আমি সে কথায় কান না দিয়ে এক এক করে ওর পায়ের আঙুলগুলোয় আলতো কামড় দিচ্ছি আর বলে চলেছি,তোমার পায়ের প্রথম আঙুল বেশি ভার সহ্য করে সংসারের বৃদ্ধদের মতো। তাই এর নাম দিলাম বৃদ্ধপদঙ্গুষ্ঠা। দ্বিতীয় আঙুলে আঙোট পরেছ ; এর নাম রাখলাম আঙুরানি। মাঝের আঙুল তো পায়ের পরমাসুন্দরী। তাই ওর নাম পদ্যমা। এর পরের আঙুল আমার সবথেকে প্রিয়। ভালোবাসার রিং পরেছ এখানে। এর নাম পদানিকা। আর ছোট্ট আঙুলটাকে ডাকব আদুরিকা নামে। কি গো পছন্দ হয়েছে তো?

জানার জন্য মুখের দিকে তাকাতেই দেখি, ওর দুচোখ ভরা জল। আমি মোছার জন্য হাত বাড়াতেই ও জড়িয়ে ধরল, এ তোমার কেমন আদর! সারা শরীরে কোথাও কোন শিহরন নেই। শুধু ভিতরে ঘুঙুর বেজে চলেছে ।

-তাই!

হুম। জয়, আজ আমাকে যে সুখ দিলে এর বিনিময়ে আমি কি দিই বলো তো !
ধ্যাত, এ আবার কেমন কথা ! ভালোবাসা কি বিনিময়ে বাঁচে! বাঁচে ইচ্ছের দ্বারা। আমার আজ যা ইচ্ছে করেছে তাই করেছি। তোমারও কিছু ইচ্ছে করলে কোরো।
বেশ, তবে আজ না। অন্য কোন একদিন। বলেই ও উঠে দাঁড়ালো।

আমার মন রাঙানিয়া হিয়াকে তখন মনে হচ্ছিল সদ্য ফোটা ফুল! পাপড়িতে লেগে আছে শিশিরবিন্দু। জানলা দিয়ে আসা আলো পড়ে মুক্তোর মতো ঝকঝক করছে।

সেদিনের পর। হিয়া আর এল না। ফোনও সুইচ অফ। কোনভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে একদিন ওর বাড়ী গেলাম। এর আগেও বেশ কয়েকবার গিয়েছি। ওর মায়ের সঙ্গে আলাপও ছিল আগে থেকে। তাই কোন অসুবিধা হল না। গিয়েই পড়লাম বিপদে।

এ কি ! জয়, তুমি! হিয়া তো বাড়ী নেই। এক বন্ধুর বাড়ী গিয়েছে। তোমায় বলে নি ? ওর মায়ের প্রশ্নবাণ ধেয়ে আসতে লাগল আমার দিকে।

না, বলেছিল। আমি ভুলে গেছিলাম। স্যরি। আসলে এই বইটা ওকে দেওয়ার ছিল। বলেই ব্যাগ থেকে কদিন আগে কলেজস্ট্রিট থেকে কেনা গল্পের বইটা বের করে কোনরকমে সামাল দিলাম।
ওঃ। তাতে কী হয়েছে। এস ভিতরে এস। এককাপ চা খেয়ে যাবে।
আজ থাক মাসীমা। আমার একটু তাড়া আছে।

বইটা ওনার হাতে দিয়েই হনহন করে বেরিয়ে এলাম। বাসস্টপে দাঁড়িয়ে ভাবছি, কোথায় যাওয়া যায়। ঠিক তখনই চোখে পড়ল, হিয়া অটো থেকে নামছে। আমি হাসিমুখে এগোতে যাব হুস করে একটা বাস ছুটে এসে আড়াল করে দাঁড়াল। বাসের আড়াল সরে যেতেই দেখি, হিয়া উধাও।

এবার খটকা লাগল। ও কি ইচ্ছে করেই এমন করছে। আমাকে অ্যাভয়েড করে তাই বোঝাতে চাইল কি! শেষ দেখায় বলেছিল, ও আমাকে কিছু দিতে চায়। সেটা কি এই ভালবাসার যন্ত্রনা! হঠাৎ দেখি আমার অজান্তে আমার ডানহাতটা কখন আমার বুকে উঠে এসেছে। আর কী আশ্চর্য! বুকটা সত্যি সত্যি ব্যাথা ব্যাথা লাগছে ! দুচোখেও জ্বালা! বুঝলাম, ভালবাসলে বড্ড কষ্ট পেতে হয়। কিন্তু কেন? জানতে হলে তো …

ওর বাড়িতে আবার যাব? এবার তো দেখা করতে বাধ্য হবে। নাঃ থাক ! ভালবাসার জন্য আমার এই কাঙালপনা ভাল! কিন্তু সেই কাঙালপনাকে ও যদি অপমান করে সে আমার সইবে না। তাই যা পেয়েছি সেটুকু নিয়েই ফেরা যাক। পরক্ষনেই মনে হল, আমার ব্যথার খানিকটা ওকে দিয়ে এলে কেমন হয়! ওর মুখের হাসি নিশ্চয় তখন মিলিয়ে যাবে। ছিঃ ! ছিঃ! এ আমি কি ভাবছি ? ও নাই বাসুক, আমি তো ওকে ভালবাসি। আর যাকে ভালোবাসি তাকে সব দেয়া যায়, কষ্ট দেয়া যায় না। ও মাসের পর মাস আমাকে অ্যাভয়েড করলেও আমি অপেক্ষায় থাকব। আর একবার ডাক দিলেই ছুটে যাব।

সেই ডাক এল। তিনমাস পর। কী আশ্চর্য ! ভিতরের ছটপটানি এতদিনে এতটুকু কমে নি। বরং বেড়েছে। অভিমানের সঙ্গে লড়াইয়ে অনায়াসে জিতেও গেল দেখা করার ইচ্ছে! বুঝলাম, ভালবাসা এমনই হয়। তার অভিমান থাকে কিন্তু মান অপমান বোধ থাকে না! এই সত্যটুকু আবিষ্কার হতেই আমার অহং বিদ্রোহ করে বসল। তবে তাকে একটু বুঝিয়ে সুজিয়ে বলতেই রাজী হয়ে গেল।

হিয়া মেসেজে সন্ধ্যায় ওদের বাড়ীতে যেতে লিখেছে। কেন? সেসব কিছু লেখে নি। জিজ্ঞেস করার প্রশ্নই ওঠে না। ভালবাসা ডাক দিয়েছে, সেটাই তো শেষ কথা।

শুরু হল প্রতীক্ষা। গত তিনমাসে যা হয় নি আজ তাই হচ্ছে। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেছে। ও আর আমার আছে তো? নিজেকে এই প্রথম এত অসহায় মনে হল।

অফিসে আজ দীর্ঘতম দিন কাটাচ্ছি। ঘড়ির কাঁটার গতি কমে গেছে। সূর্য ডুব দিতে ভুলে গেছে। একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। আমার অনেক প্রার্থনার পর সূর্য যদিও বা অস্ত গেল গোধূলির আলো অন্ধকার নামার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উফ! কী অসহ্য! অবশেষে এল সেই কাঙ্খিত সন্ধ্যা। তার আগেই আমি পৌঁছে গিয়েছি আমার গন্তব্যের দরজায় । এখন শুধু টোকা দেওয়ার অপেক্ষা! হাতটা উঠেও থেমে গেল। ভিতরে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে কে জানে! জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে হালকা করার চেষ্টা করলাম। যাইহোক বুকে সাহস এনে দরজায় টোকা দিতে গেলাম। কিন্তু দেওয়ার আগেই দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে হিয়া!

-আমি জানতাম তুমি আসবে।
– শুনে খুশি হলাম। তা আসতে বলার কারণটা জানতে পারি কি?
– নিশ্চয়। কিন্তু এখানে নয়। ভিতরে এস।
– চলো। কিন্তু বেশি সময় নেই। একটা জরুরী কাজ আছে।
– খুব রাগ হয়েছে দেখছি। আজ সব রাগ কমিয়ে দেব।
– থাক আমার রাগ নিয়ে তুমি কত ভাব সে এই তিরানব্বই দিনে বুঝে গেছি।
– বাব্বা। একেবারে দিনক্ষন গুনে মনে রেখেছ। কিন্তু কেন এমন করেছি যখন জানবে সব রাগ গলে অনুরাগ হয়ে যাবে। এখন এস।
– থাক, আমার জেনে কাজ নেই!
– আমার আছে। কিন্তু মশাই ওভাবে কথার পিঠে কথা না চাপিয়ে আজ চুপ থাকার দিন তোমার। বুঝেছ?
-মানে!

-চুপ! আর একটাও কথা নয়। বলেই ও আমার ঠোঁটের উপর তর্জনীর স্টিকার লাগিয়ে দিল।
আমিও বাধ্য হয়ে কথা থামালাম। ভিতরে গেলাম চুপচাপ। কিন্তু ভিতরে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না তো। ওর মা বোন কোথাও নেই। ওর বাবা তো অফিস থেকে রাত করে ফেরে। তার মানে পুরো বাড়ীতে ও একা ! সাহস কম নয় দেখছি।

– কাউকে খুঁজছো?
– হ্যাঁ। না, মানে তোমার মা…
– মা বোন মামাবাড়িতে। আর বাবা অফিস থেকে ট্রেনিং এ গেছে। রাতেও ফিরবে না।
– হুম। বুঝলাম। তা তুমি একা বাড়ীতে কেন?
– নাচের ক্লাস আছে বলে যাই নি।
– কই ক্লাস?
– উফ ! এত প্রশ্ন করছ কেন আজ? দেখেও বুঝতে পারছ না যে ক্লাস ডুব দিয়েছি।
– সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু কেন ?
– আমার এই হাঁদারামকে নাচ দেখাব বলে। বুঝেছ।
– সে তো মঞ্চেই দেখতে পাই।

– না মশাই, এ নাচ শুধু আমার আরাধ্যপুরুষের জন্য। মনে আছে সেদিন বলেছিলাম, তোমায় কিছু দেব । কিন্তু তখন ভেবে পাই নি কি দেব। তারপর মনে হল, আমার নাচ ছাড়া কি আর আছে তোমায় দেওয়ার মতো।

– আরাধ্যপুরুষ! আমি তোমার আরাধ্যপুরুষ! সত্যি বলছ!
– হ্যাঁ গো হ্যাঁ! এতদিনে তাও বোঝ নি। সব বুঝি মুখে বললে তবে বুঝবে!
– বুঝতাম তো! কিন্তু এই তিনমাসে…

– বা রে, তুমি তো বলো আমি তোমার জীবনাকাশে পূর্নিমার জ্যোৎস্না। তা জ্যোৎস্না বুঝি সমসময় থাকে! মাঝে মাঝে অমাবস্যাও আসে। বোঝ না?

এরপর আর কোন কথা বলা চলে না। তবু বললাম, কিন্তু একজন মাত্র একজন পুরুষের সামনে নাচের মানে জানো তো?

– ভুলে যেও না নাচ আমার কাছে নিছক শিল্পচর্চা নয়। জীবনের সাধনা। তাই প্রিয়পুরুষকে নাচ দেখাব আর তার মানে জানব না তা কি হয়!

– হিয়া! তুমি তাহলে মাহারি হবে আজ। বেশ আমিও তবে জগন্নাথদেব হয়ে সিংহাসনে বসেই তোমার নৃত্যরস আস্বাদন করব।

– তুমি ওড়িশি নৃত্যের গল্প জান!

-জানি। পুরীর মন্দিরের দেবদাসীরা হল মাহারি মানে প্রেমপাগলিনী। কিন্তু আমাকে তো ঠুঁটো করে দিলে । তোমাকে ছোঁয়া নিষেধ!

– ভয় নেই। আমি তোমায় যে নাচ দেখাব তা মাহারিদের নৃত্য নয়। এ এক অন্য নৃত্য।
-তাই বুঝি! কিন্তু তুমি তো অশাস্ত্রীয় কিছু করো না।

– ভালো বলেছো আমি আজ যা করতে চলেছি তা আমাদের দেশের শাস্ত্রীয় নৃত্যমতে হয়তো অবৈধ। নিষিদ্ধও হতে পারে। তবে জীবন কি সর্বদা শাস্ত্র মেনে চলে! এই যে আমি প্রতিরাতে বিছানায় সম্পূর্ন নগ্নিকা হয়ে বুকের উপর ঘুঙুর রাখি। জড়িয়ে ধরি দুই হাত দিয়ে। তা কি শাস্ত্রসম্মত! যে ঘুঙুরকে দুপায়ে বাঁধার আগে দুই চোখে ছুঁইয়ে প্রণাম জানাই তাকে দুই নগ্নবুকে জড়িয়ে আদর করি। তা শাস্ত্রসম্মত না হলেও আমার প্রাণের আরাম। আর তার চেয়ে বড় কিচ্ছু নয়।

-হিয়া! নাচকে এত ভালোবাসো!
-বাসি বাসি বাসি। ততটা ভালো হয়তো তোমাকেও বাসি না।
-তা তো বাসোই না। বাসলে আমাকে ছেড়ে থাকতে পারতে এতদিন?
-আচ্ছা বাবা, আমার ঘাট হয়েছে। এবারের মতো ক্ষমা করে দাও। আর এমন করব না।
-কথা দিলে কিন্তু।
-হুম। দিলাম।
– বেশ। এবার বলো, কি নাচ দেখাবে আজ?
– আজ যে নাচ দেখাবো তার নাম দিয়েছি দেহনাট্যম।
– দেহনাট্যম! বেশ নাম তো!
– হুম। তবে এই নাচে কিন্তু শুধু দর্শক হলে চলবে না। অংশও নিতে হবে।
-তাই? তবে আমার হাতখানি ধরে নিয়ে চলো সখা। কিন্তু আমি যে নাচ জানি না।
– সে আমি শিখিয়ে নেব। এখন চুপটি করে চলো তো।
-কোথায়?
– আমাদের ছাদে। ওখানেই আজ আমাদের নৃত্যমঞ্চ।
– বাঃ ভালো। কিন্তু তোমাদের খোলাছাদে…
– মশাই, শিবপার্বতীর রাসলীয়ায় নাগদেবতা যেমন তার উজ্জ্বল মণির সাহায্যে আলোকিত করেছিল তাদের নৃত্যস্থান

ঠিক তেমনই জোৎস্না এসে আলোকিত করবে আমাদের আজকের মঞ্চ। আর নাগদেবতার মনির আলোকে উজ্জ্বল হয়ে যেমন সে দেশের নাম হয়েছিল মনিপুর আর তাদের রাসনৃত্য থেকেই জন্ম নিয়েছিল মনিপুরী নৃত্য। তেমন আমাদের দেহনাট্যম থেকে…

– কি বললে? শিবপার্বতীর রাসলীলা?
– হ্যাঁ মশাই। ভুলে যেও না নৃত্যের দেবতা নটরাজ মানে শিব। রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা দেখে মুগ্ধ হয়ে শিবপার্বতীও সেই নৃত্য করেন। আজ তুমিই আমার সেই শিব। এখন চলো তো ছাদে।

-কিন্তু…
– এখনও কিন্তু! তোমায় নিয়ে আর পারি না!
– না তা নয়… আসলে…
– সবাই দেখে ফেলবে, এই ভয় পাচ্ছো তো? দেখুক । হি হি হি। ভয় নেই মশাই। ছাদভর্তি আমার বাবার প্রিয় সব গাছ। সেই গাছ আমাদের জন্য কুঞ্জবন তৈরী করে রেখেছে। বুঝেছ। এখন তুমি যাও তো, ছাদে গিয়ে একটু বোসো। আমি নৃত্যসজ্জা সেরেই আসছি।

মাত্র তিনমাস। কী এমন সময়? কিন্তু হিয়া যেন এই তিনমাসে তিনবছর ছোট হয়ে গিয়েছে। কী ভেবে এসেছিলাম। আর এসে কি দেখলাম। আগে যা করত, ভেবেচিন্তে করত। এতটুকু ভুলচুক করত না। এমনকি ওর জন্মদিনে আমি যখন আদরের বন্ধনে বাঁধছিলাম তখনও সংযম হারায় নি। আর আজ কোন যাদুবলে ও এমন সংযমহারা হল! তাই মনে হচ্ছে, ও এখন একুশের পূর্ণতাপ্রাপ্ত যুবতী নয়, অষ্টাদশী। আঠারোর হুল্লোড়ে হিয়া এত সাহসী হয়েছে আজ!
এখন আমি কি করি! ওর বাঁধনহারা উচ্ছ্বাসে বাধা দিতে চাইলেও ও কি শুনবে! আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল ঘুঙুরধ্বনি শুনে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, হিয়া উঠে আসছে ছাদে। নিজস্ব ছন্দবদ্ধ পদচারনায়। কিন্তু, এ কী দেখছি আমি ! এমন নৃত্যসাজ! এ-ও কী সম্ভব ! সারা শরীরে কোথাও এতটুকু কাপড়ের টুকরো নেই! সমস্ত দেহাঙ্গে শুধু কালোমাটির প্রলেপ! আর নাকে কানে সিঁথিতে বাজুতে মণিবন্ধে গলায় কোমরে পোড়ামাটির টেম্পল জুয়েলারী! আমাদের দেশে মন্দিরের দেওয়ালে যেমন নৃত্যমূর্তি দেখা যায় হিয়াকে অবিকল তেমন দেখাচ্ছে। হস্তমুদ্রায় ফুটিয়েছে ফুল। দৃষ্টিতে রয়েছে প্রেম। দাঁড়ানোর ভঙ্গিও স্বর্গের দেবীর মতো।

আমি মুহুর্তের মধ্যে খাজুরাহ পৌঁছে গেলাম। মন্দির জুড়ে যেখানে প্রতিটি মূর্তি বেশভূষাহীন। হিয়া তেমনই এক মূর্তি হয়ে নেমে এসেছে আমার কাছে।

তখনই মনে পড়ল গতবছর এই খাজুরাহতে সারা ভারত ডান্স ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে গিয়েছিল হিয়া। মন্দিরের ভাস্কর্য দেখে বলেছিল, আমার নৃত্যরতা মূর্তিও যদি কোথাও এমন স্থান পেত ধন্য হয়ে যেতাম। সেই শুনে ওকে কথা দিয়েছিলাম, মূর্ত্তি তো তৈরি করতে পারি না। যেটা পারি সেটা করব। আমার ক্যামেরায় তোমার হাজারো নৃত্যরতা ছবি তুলবো। আর সব ছবি দিয়ে সাজাবো আমাদের খাজুরাহ।

হঠাৎ বেজে উঠল কিঙ্কিণী। তাকিয়ে দেখি, হিয়া দিগঙ্গনা হয়ে নৃত্য শুরু করেছে। ললিতছন্দে ওর শরীর কখনও ভুজঙ্গী, কখনও বা অশ্বক্রান্তা। কখনও কপোতী, কখনও বা অধীরা। দেহের প্রতিটি ভঙ্গি ছবি হয়ে ধরা দিতে লাগল। নৃত্যের সমস্ত ব্যকরণ ভেঙে চুরে দুমড়ে মুচড়ে নবনৃত্য সৃষ্টি করে চলেছে। ও তখনও আছোঁয়া। আমি কেবল অন্তরিন্দ্রিয় দিয়ে ওর উলঙ্গিনী নৃত্য দেখে চলেছি।

আর ভাবছি ও এখন ইচ্ছেনদী। এককুল ভাঙবে, আর এককুল গড়বে। এভাবেই ভাঙাগড়ার খেলা খেলতে খেলতে এগিয়ে যাবে। আমি সমুদ্র হয়ে যতই উত্তাল হই না কেন ও মোহনায় না পৌঁছলে মহাসঙ্গম হবে না। মহাসঙ্গমের ভাবনা মাথায় আসামাত্রই দেখি ওর বাম হাত মুষ্ঠিকারে স্থাপিত হল বক্ষে, আর ডান হাত চারিত হল যোনিতায়। এমন আঙ্গিকে স্থির হল ও।

আমি মন্ত্রমুগ্ধ। বুঝতে পারছি না কি করব। হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল ছোঁওয়াব ওর নিতম্বে? নাকি মাথা ঠেকাব জঙ্ঘায়? ও মনে হয় আমার মনের ইচ্ছা বুঝতে পারল। তাই আঁখিপল্লবে ডাক দিল আমাকে। আমিও যাদুকরের অনুগত শিষ্যের মতো উঠে দাঁড়ালাম। দেখি, ওর একহাতের আঙুলগুলির ফাঁক দিয়ে আমার একহাতের আঙুলগুলোকে প্রবেশ করাল। আর অন্যহাত নেমে এল আমার কোমরে । জড়িয়ে ধরল শর্পিনীর মতো। দুই শরীর মিলিত হয়ে মুহুর্তে সৃষ্টি হল এক অপূর্ব নৃত্যচিত্র।

তারপর ও নিজের হাতে আমাকে নাগারূপে সাজাল। আর দেখাতে শুরু করল ওষ্ঠমুদ্রা। আমার সারা শরীর এখন ওর নৃত্যমঞ্চ। সেই মঞ্ছে জিহ্বা ও দন্ত দিয়ে নৃত্যমুদ্রা দেখাতে দেখাতে হয়ে উঠল রাসেশ্বরী। মুখে বোল পায়ে তাল। দ্রুতলয়ে চলছে। চলতে চলতে ক্রমশ দ্রুততর হচ্ছে। আরো দ্রুত। ও যেন উন্মাদিনী। রনচন্ডিনী। হঠাৎ আমারও কি যেন হল। ওর চরণতলে নিজেকে সঁপে দিলাম। নিজের পায়ের সামনে আমার বক্ষদেশ পেয়ে ও-ও ওর ডানচরণ রাখল আমার বুকে। ঠিক তখনই আমি মুক্তকন্ঠে বলে উঠলাম, ‘দেহিপদপল্লব মুদারম’। যুগযুগ ধরে সকল প্রেমিকের যা প্রার্থনা। আজ পূরণ হল আমার। সুখানুভবের চুড়োয় পৌঁছল হৃদয়। আবেশে বুজে এল চোখ। হঠাৎ আমার বক্ষপটে ‘ ঝরঝর ঝরিছে বারিধারা’।

হিয়া কাঁদছে! কাঁদুক। নতুন জীবন কান্না দিয়েই শুরু করতে হয়। ও যে আর হিয়া নেই। নাচতে নাচতে ও হিয়া থেকে ঋষিতা হয়ে জন্ম নিয়েছে। গার্হস্থ্য জীবন ভুলে কঠোর তপস্যিনীদের মতো নিজেকে সঁপে দিয়েছে দেহনাট্যমের কাছে।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত