লাইন পারের ভূত

লাইন পারের ভূত

দক্ষিণ পূর্ব রেলে আদ্রা থেকে গুনে গুনে তিনটে স্টেশন পরে। চতুর্থ স্টেশন ঝাঁন্টিপাহাড়ী। আমার মামাবাড়ি। ছোটবেলার অন্যতম প্রিয় গন্তব্যস্থল। রেল লাইন গ্রামের মাঝ বরাবর চলে গেছে বাঁকুড়া শহরের দিকে। মূল গ্রামটি রেল লাইনের পাশেই। উত্তরে। জনবসতির ঘনত্ব একটু বেশী। আমার মামাবাড়ি উত্তরের দুর্গামেলার পিছনে। আর রেল লাইনের দক্ষিণ দিকে ঝাঁটিপাহাড়ীর অর্থনৈতিক অঞ্চল। যোগিন্দ্র রক্ষিত, শ্যামকুন্ডু, অবনীকুন্ডু, মোহর কুন্ডুদের রাইস মিল। পানকালি রক্ষিতদের তেল মিল। বাঁকশিমূলের ধীরেন কুন্ডুর ডাল মিল। দক্ষিণ দিকের এই বিভিন্ন মিল সমৃদ্ধ এলাকা বেশ ফাঁকা, ফাঁকা।গাঁয়ের বাঁধ থেকে একটা রিলিফ রোড চলে গেছে রেল লাইনের সমান্তরাল। চাকলতা তলের কাছে বাস রোডে উঠেছে। এপাশে গুটিকতক পরিবারের বসবাস। উত্তরের মানুষজনের কাছে “লাইনপার ” হিসেবেই পরিচিত। আজকের ঝাঁটিপাহাড়ীর সাথে আমার শৈশব কৈশরের ঝাঁটিপাহাড়ীকে মেলাতে গেলে ভুল হবে। রাইস মিল, ওয়েল মিল, ডাল মিল গুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেছে। দু একটি চলছে ঠিকা বা কমিশনের ভিত্তিতে।

সাধারনত জ্যোষ্ঠ মাসের হুচুকগাজনের সময় যাওয়া হতো মামাবাড়ি। স্কুলে তখন গ্রীষ্মের ছুটি। মামাবাড়ির মূল আকর্ষন ছিল দুটি। প্রথমত নিরিবিলি রেলস্টেশন আর দ্বিতীয়ত লাইনপারে আমার মেজমাসির বাড়ি। আম, জাম, কাঁঠাল বাগান। আমাদের মানে আমার আর মেজ ভাইয়ের প্রিয় খেলাটি ছিল ভয়ংকর। ফাঁকা স্টেশন থেকে রেল ট্রাক ধরে কেবিনম্যানের গেট পর্যন্ত ব্যালেন্স করে হেঁটে যাওয়া। আর লাইন পার হয়ে সারাদিন একবার মাসির বাড়ি তো একবার মামাবাড়ি। আমাদের এই ডানে (দক্ষিণে) তো পরক্ষণেই বামে ( উত্তরে) ঘন ঘন অবস্থান বদল কোন বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমালোচনার বিষয়বস্তু না হলেও, মেজ মেসোর ছিল নাপসন্দ। মৃদু ধমক দিয়েও কোন লাভ হতো না দেখে হতাশ হতেন।

” গোপীর ( আমার মা গোপা) ছেলে দুটা-কে ( আমরা দু ভাই) নিয়ে আর পারি না”। মেজ মেসোর এই স্বগতোক্তি এখনো স্পষ্ট শুনতে পাই।

পেশায় প্রাইমারী শিক্ষক ধরনীধর কুন্ডু ( মেজ মেসো)। আমার দেখা চতুর ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম এক ব্যক্তিত্ব। একদিন দুপুরবেলা লাইনপার হয়ে মেজমাসির বাড়িতে গিয়ে হাজির। রবিবারের দুপুর। মেসোর স্কুল ছুটি। আমাদের দুই ভাইকে পাকড়াও করে চালান দিলেন সটান চিলেকোঠার ঘরে। ঘুমিয়ে পড়ার নির্দেশ। ব্যাস। যাবি কোথায়। মেসোর আদেশ অমান্য করা যাবে না। কিন্তু ঘুম কি হয়। মটকা মেরে পড়ে থাকতাম। আবার ধরাও পড়তাম। মেসো বলতেন, “ঘুমালে পা নড়ে।”। অমনি আমরা যে ঘুমোচ্ছি তার প্রমান দিতে পা নাড়াতাম। মেসোর চালাকি বোঝার মতো বুদ্ধি তখনো হয় নি। মেসো বুঝে নিতেন আমরা ঘুমোচ্ছি না। আমরাও সুযোগের অপেক্ষায় থাকতাম। পাহারায় যেই ঢিল পড়তো, আমরা দিতাম চম্পট। সোজা রেলষ্টেশনের প্লাটফর্মে। বিকেল চারটের ট্রেন চলে গেলে শুরু হতো লাইনের উপর ব্যালেন্স করে চলা। পরবর্তী ট্রেন আসতো সন্ধ্যা ছ’ টায়। অনেকক্ষণ খেলার ময়দান ফাঁকা থাকতো।

সন্ধ্যাবেলা মায়ের সাথে সুবোধ বালকের মতো হাজির হলাম মেজমাসির বাড়ি। ঢুকতে না ঢুকতেই নালিশ। ব্যাস, আর যাবি কোথায় একটা আস্ত পেয়ারা ডাল নিয়ে মা রনচন্ডী রূপ ধারন করতেই পড়িমরি করে একছুট। ছুটে রিলিফ রোড ডিঙিয়ে সামনের ফাঁকা মাঠে। মা মেজমাসির বাড়ির দরজা থেকে হুঙ্কার দিতে থাকে–” আজ তোদের একদিন কি আমার একদিন। আর কক্ষনো নিয়ে আসবো না তোদের”। আমরা ভয়ে আশ্রয় নিলাম পাশের একটা পোড়বাড়ির ভাঙা পাঁচিলের কোলে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ছোড়দি, মাসির ছোট মেয়ে, তারস্বরে চিল্লাতে থাকে–” ওরে যাস না রে, ভাই, ওখানে ভূত আছে। ”

কি করি, এদিকে ভূতের ভয় আর ওদিকে মারের ভয়। দুইয়ের যাতাকলে বুক ঢিবঢিব করছে। অন্ধকারে ভূতের ছানার মতো গুটি গুটি পায়ে আত্ম সমর্পন করলাম। এ যাত্রা বাঁচালেন মেজমেসো। মাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে মার খাওয়ার হাত থেকে রেহাই।

বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে পাতা হলো দড়ির খাট। বাধ্য ছেলের মতো আমি, ভাই বসলাম। আকাশে ফুটফুটে জোৎস্না। ছোড়দি আর মেসো বসলেন আরেকটা খাটিয়াতে। অনেক কথার মাঝে ছোড়দিকে বললাম ওখানে ভূত থাকে। মেজমেসো যেন লুফে নিল কথাটা। –“এক দুটো নয় আট আটটা।”
আর একবার ছ্যাঁত করে উঠলো বুকটা।অথচ জানার আগ্রহ কম নয়। বললাম -“কি করে জানলে?”

মেজোমেসো পাশেই কুন্ডুদের রাইস মিলটা দেখিয়ে বললেন –” কয়েক বছর আগের কথা। এই রাইস মিলের কর্মচারীরা থাকতো ঐ পোড় বাড়িটায়।”।

মেসো বলে চললেন।১৯৭৮ সালে প্রবলবৃষ্টির রাতে ভেঙে পড়ে ঐ ঘরটা। ওখানে একটা পরিবার থাকতো। আট জন প্রাণী। সবাই মারা যায় দেওয়াল চাপা পড়ে। এমন কি ওদের ছাগলগুলোও চাপা পড়ে।কাউকে বাঁচানো সম্ভব হয় নি। তারপর থেকে ঐরকম ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। মাঝে মাঝে অমাবস্যার রাতে বিকট আর্তনাদ শোনা যায়। ছোটদি সায় দেয় তার বাবার কথায়। সারা শরীর দিয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে যায়। আকাশে চাঁদের আলোয় পোড়ো বাড়িটা আলো আঁধারের নক্সায় আরো ভয়ংকর দেখতে লাগছে। না জেনেই, মারের হাত থেকে বাঁচতে ছুটে গিয়েছিলাম ঐ পোড়বাড়ির পাঁচিলের কাছে। এঘটনা শোনার পর মাটিতে পা রাখতে সাহস কুলোচ্ছিল না। জড়সড় হয়ে খাটিয়াতে বসে রইলাম । কিছুক্ষণ পরে দূরের রেল লাইন দিয়ে ঝিকঝিক কর তে চলে গেল রাত ন’টার প্যাসেঞ্জার ট্রেন।

এই গল্প বলার আগে পর্যন্ত কিছুতেই আমাদের লাইনের এপার ও পার করা আটকে পারেন নি মেজমেসো। তবে আজ বুঝতে পারি সেই রাতের পর তিনি একশ শতাংশ সফল হয়েছিলেন চালাকির আশ্রয়ে।।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত