অকাল বসন্ত

অকাল বসন্ত

সকালবেলা আজ ঠাণ্ডা পড়েছে খুব। অবশ্য কলকাতার মাপেরই ঠাণ্ডা। হিমালয় কিংবা আল্পস্ মার্কা নয়। ত্রিশ তলা নিচের পৃথিবী কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়েছে। তার অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে খুব অলস দৃষ্টিতে দেখছিল সঞ্জীব। ওর গায়ে একটা জ্যাকেট কাম উইন্ড চিটার, নীল রঙের বেসের ওপরে লাল রঙের আগুনলাগা কিছু এলাকা জ্বলছে যেন দাউ দাউ করে। জামাটার ওপর আমেরিকার একটা রাগবি টিমের নাম লেখা—ব্রঙ্কোস। গতবার আমেরিকা বেড়াতে গিয়ে ডেনভারের একটা শপিংমল থেকে কিনে দিয়েছিল ওর বোন শান্তি। এইটা পরে বেরোলে মল বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর-এ অনেকে ওখানে ওকে আঙুল দিয়ে ‘ভি’ চিহ্ন দেখাত। তারা ওকে তাদের মতো ব্রঙ্কোসের সাপোর্টার ভাবত হয়তো। ও যে রাগবির ‘আর’ও জানে না সেটা আর ডেনভার-এর সাহেব-মেমরা জানত না। কলকাতার শীতের জন্য এই লাল-নীল জামাটা বেশ ভালো পরিচ্ছদ। ওর পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি হাইট হালকা গৌরবর্ণ গায়ের রং আর মাঝারি গঠনের চেহারায় ওকে এই পোশাক আর বারান্দাসহ একটা সম্পূর্ণ এবং মানানসই ছবি বলেই মনে হচ্ছিল। অল্প অল্প হাওয়ায় উড়ছিল ওর মাথাভর্তি চুল। সুতরাং সঞ্জীবের জন্য এটা সহজলভ্য উত্তরাধিকার।

উইন্ড চিটারের পকেটে রাখা ওর অ্যানড্রয়েড মোবাইল সেটটা বেজে উঠল তখনই। অঞ্জু ফোন করেছে, অঞ্জলি গুজরাল।

‘আঙ্কেল, আমি অঞ্জু বলছি।’

‘হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি তোমার নাম, তোমার নাম্বার তো সেভ করা আছে আমার ফোনে।’

‘তুাম কি এখন বাড়িতে?’

‘হ্যাঁ, বাড়িতে আছি।’

‘এক্ষুনি কোথাও বেরোবে কি?’

‘না এরকম কোনো প্রোগ্রাম নেই।’

‘আমি একটু আসতে পারি তাহলে? একটু দরকার আছে।’

‘এসো এসো, দরকার থাকলে এসো, না থাকলেও এসো।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ আঙ্কেল।’

বলে হেসে ফোনটা রেখে দেয় অঞ্জলি। ছোটবেলা থেকে কলকাতায় বড় হয়েছে বলে পাঞ্জাবি মেয়ে হলেও অঞ্জু বেশ শুদ্ধ বাংলা বলে। একটু টান অবশ্য থাকে। বাড়িতে তো ওরা ইংরাজি আর গুরমুখী বলে।

অঞ্জুদের পরিবারের সঙ্গে ওদের খুব পরিচয় ছিল যোধপুর পার্কে, অঞ্জু যখন কিশোরী, তখন খুব আসত ওদের বাড়িতে, কল্পনার কাছে। কল্পনা থাকতে এই ফ্ল্যাটেও এসেছে কয়েকবার। কল্পনা চলে যাওয়ার পরে আর যোগাযোগ হয় না বহু দিন। এই সেদিন হঠাত্ দেখা হয়েছিল সামনের মলে, ক্রস ওয়ার্ড বইয়ের দোকানে, ওর কাছে ফোন নাম্বার নিয়েছিল, ওকেও দিয়েছিল ওর ফোন নাম্বার। ওকে আসতে বলেছিল সঞ্জীব।

‘আমার তো খুব যেতে ইচ্ছে করে তোমার বাড়ি, কল্পনা আন্টি চলে গেছে, তোমার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হয়, কিন্তু তুমি এখন কত বড় মানুষ, নিশ্চয়ই খুব কাজ, আমি এসে বক বক করব, কি জানি কি ভাববে তুমি, তাই আসি না।

এই কয় বছরেই যেন অনেক বড় হয়ে গেছে অঞ্জু। পাঞ্জাবি মেয়েরা এমনিতে স্বাস্থ্যবান হয়। হয়তো সবে টিন এজারের সীমা ছুঁয়েছে, অথচ দেখে মনে হয়, বাইশ-তেইশ। কিন্তু ওর চোখে এখনো সেই কৈশোরের সারল্য, কিছুটা হয়তো দুষ্টুমিও।

কথা শেষ হলেও কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে সঞ্জীব। নিচের মুখরিত পৃথিবীর শব্দকে বাদ দিয়ে এই দূর থেকে দেখার একটা নেশা আছে। বেশ সময় কেটে যায়।

এই রেসিডেন্সির কম্পাউন্ডের ভিতরে একটা শিবের মন্দির আছে, এক তলা, ছোট কিন্তু সুন্দর, মার্বেল পাথরে তৈরি, তার চারপাশে অনেক সবুজ, আর অনেকগুলো ফুলের বেড। শ্বেত মর্মর, সবুজ ঘাস, হলুদ গাঁদার ফুল, চোখের জন্য তৃপ্তিকর, রামধনুর বর্ণালিতে সবুজের পরই হলুদ, একে অন্যের বন্ধু রঙ, মন ভালো করে দেয়। ওখানে সকালবেলা পূজা দিতে গেছে কেউ। কযেকবার ঢং ঢং করে ঘণ্টাটা বাজল তাই। তিনশ ফুট নিচে থেকে তার আওয়াজ সঞ্জীবের বারান্দার কাছে এসে ক্ষীণ হয়ে যায়। দূরে দেখা যায় বিদ্যাসাগর সেতুর পিলারগুলোকে। কুয়াশার ঝির ঝির জালের আড়াল থেকে দেখা যেন আকাশের গায়ে আবছা করে আঁকা কোনো স্কেচ। সকাল সবে ন’টা, রবিবারের সকালে প্রাইম টাইম বলা যায়, ছুটির দিনটা সবে জমে উঠছে, কিছু বাচ্চা স্কুলে না যেতে হওয়ায় এই সাপ্তাহিক স্বাধীনতার সময়টা নিচের পার্কে কাটাচ্ছে, দোলনাগুলো দুলছে, কিন্তু সেখান থেকেও শব্দ আসছে না কোনো। বাচ্চারা নেমে পড়ার পরও দোলনাগুলো অনেকক্ষণ দুলতে থাকে। ওগুলো দেখলে একটা কেমন যেন অনুভূতি আসে সঞ্জীবের, যেন কি একটা ঘটার ছিল, অথচ ঘটল না, এমনি একটা ভাব।

এক পাশের সুইমিং পুলের নীল জল ঝলমল করে। ফিরিয়ে দেয় আলো। আলো শব্দের থেকে বেশি দূর যেতে পারে আর অনেক অনেক বেশি দ্রুত। সুইমিং পুলে অবশ্য এখন কোনো জনপ্রাণী নেই। বিদেশি অতিথিরাও না।

এই কমপ্লেক্সে কিছু বিদেশি সব সময় থাকে। তাদের অনেকের এই জায়গাটা পছন্দ মনে হয়। কমপ্লেক্সের এক পাশে শপিংমল। কলকাতার সব থেকে বড় বিলাস বিপণী হওয়ার দাবিদার। বেড়ানোর জন্য মাঠ, সবুজ ঘাসের দেশ, ক্লাব এবং জিমনেসিয়াম। প্রিন্স আনোয়ার শাহ্ রোডের ব্যস্ততার আড়ালে এরকম একটা নিস্তব্ধ জগত্ লুকিয়ে আছে—ভিতরে না ঢুকলে বোঝা যায় না। সঞ্জীব বিদেশেও গেছে বেশ কয়েকবার। এই কমপ্লেক্সকে নিঃসন্দেহে তথাকথিত উন্নত বিশ্বের এরকম অনেক রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সের ওপরে রাখা যায়। এখন কলকাতার সব থেকে অভিজাত ঠিকানার মধ্যে এটা একটা।

হয়তো দেশে তাদের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে এখানকার পরিবেশ খানিকটা মেলে বলে বিদেশিরা এটা পছন্দ করে, প্রচুর এনআরআই আছেন এখানে। কিন্তু এই শীতে কোনো সাহেব সুবোও নামেনি পুলের মধ্যে। সেখানে নীল নীল উন্মুখ জল কারো প্রতীক্ষায় তাকিয়ে আছে শুধু। স্পর্শের প্রতীক্ষা। স্পর্শ বড় চমকপ্রদ অনুভূতি। স্পর্শ বড় আরামের। মানুষের শরীর আর জল ভারি চমত্কার একটা যুগলবন্দি হয়। গায়ের ওপরে ছলকে ওঠা কারো উচ্ছ্বল আমন্ত্রণ যেন। সঞ্জীব ওখানে যায় মাঝে মাঝে গরমকালে। জিমেও যায়। শরীরের ওপর দিয়ে পঞ্চান্নটা বসন্ত চলে গেছে—তখন ওকে দেখলে এমন মনে হয় না। মেদ বিহীন ঝরঝরে চেহারা। ওর মুখেও একটা মায়া আছে, বয়সের সঙ্গে সেটা কমেছে, কিন্তু চলে যায়নি একেবারে, ইংরাজিতে যাকে বলে বয় ফেস, বিয়ের পর কল্পনা নাকি তার মাকে বলেছিল, ‘মা দেখো, তোমার জামাই বুড়ো হবে না কখনো।’

যোধপুর পার্কে তাদের পুরনো ফ্ল্যাট থেকে প্রিন্স আনোয়ার শাহ্ রোডের এই ঠিকানায় আসবার পর গত কয়েক বছরে সঞ্জীব আক্ষরিকভাবেই নিচে মাটির পৃথিবীর মায়া অনেকটা কাটিয়ে ফেলেছে যেন। ওদের আগের বাড়িতেও দোতলার ফ্ল্যাটে বারান্দা ছিল। কিন্তু সেটা পৃথিবীর অনেক কাছে। সেখান থেকে ফেরিওয়ালা, রিক্সা, রাস্তায় হেঁটে যাওয়া অফিসফেরত মানুষ আর স্কুলযাত্রী বাচ্চা সবাই খুব কাছে থাকত। তাদের অনেককে চেনা যেত শব্দ দিয়ে, এখানে বারান্দার কাছে কোনো মানুষ নেই। দু-একটা চিল চক্রাকারে ওড়ার সময় কাছাকাছি এসে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে চলে যায়। তাদের আকাশলোকে মানুষের এই দাম্ভিক উপস্থিতি নিশ্চয়ই পছন্দ করে না তারা।

বারান্দা থেকে কিচেনে যায় সঞ্জীব। হট বক্সে রুটি করে রেখে গেছে পঞ্চানন। একটা ছোট বাটিতে অলিভ অয়েলে নেড়ে চেড়ে দেওয়া কিছু সেদ্ধ সবজি। পঞ্চানন সকালবেলা তৈরি করে দিয়ে গেছে। ওটাকে মাইক্রোওভেনে একটু গরম করে নেয় সে। ও ডিম সেদ্ধও রেখে গেছে দুটো, সব ছুরি দিয়ে আধখানা করা। প্লেটে ডিমের সাদাটাই আছে শুধু, কেবল সেইটা সঞ্জীবের, হলুদটা কোলেস্টরল, ওটা পঞ্চাননের বোনাস। কিছু কম মিষ্টি ফল আছে টেবিলে, পেয়ারা আর কিউয়ি। এইসব নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে সে। ব্রেকফাস্টটা সেরে ফেলা যাক। কল্পনা চলে যাওয়ার পর থেকে সঞ্জীব তার ডায়েট নিয়ে সচেতন। সাধারণত আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে যায় ও। আজ ছুটির দিনে একটু স্বাধীনতা নেওয়া গেছে।

এই অ্যাপার্টমেন্টে সে এসেছে পাঁচ বছর হলো, এখানে আসার পর কল্পনাকে হারিয়েছে, সেটাও তিন বছর হয়ে গেল। কন্যা উর্মিলা তার ট্রান্সপোর্ট ইকোনমিস্ট স্বামীর সঙ্গে সিঙ্গাপুরে থাকে। সন্দীপন এই আকাশ ছোঁয়া ঘরগুলোতে এখন একলা থাকে, একলা মানে তার কমবাইন্ড হ্যান্ড পঞ্চাননকে হিসেবে না নিলে। তিনটে বেডরুম, তার একটাতে সে শোয়। বাকিগুলো খালি। অতিথির প্রতীক্ষায়। এই ফ্ল্যাটের সঙ্গে একটা অ্যাটাচড্ সার্ভিস কোয়ার্টার আছে, কিন্তু সেটা পঞ্চাননের সংসার কেন, হূষ্টপুষ্ট দেহ অনুপাতেও যথেষ্ট বড় নয়। মহামূল্যবান স্কোয়ার ফিট, মালিকের সেবাদানকারী লোকদের জন্য খুব একটা বরাদ্দ রাখেনি প্রোমোটাররা। সেখানে কোনোভাবে শুধু একলা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারে লোক। বাস করা মুশকিল। পঞ্চানন রান্নাবান্না ঘর গেরস্থালি করে দিয়ে বাড়ি চলে যায় রোজ সকালেই, আবার দরকার থাকলে সন্ধ্যাবেলা আসে কোনো কোনো দিন। না হলে ফ্রিজ থেকে খাবার নিয়ে মাইক্রোওয়েভে গরম করে, ডিনারের জন্য এইটুকু কাজ বাকি থাকে সঞ্জীবের।

পঞ্চানন ছাড়া আর একজনের রান্নার অবশ্য মাঝে মাঝে স্বাদ পায় সঞ্জীব। কল্পনার বন্ধু নন্দিতার। কল্পনার থেকে সে বেশ ছোট, বোধ হয় চল্লিশও পেরিয়েছে কি পেরোয়নি ঠিক নেই। কিন্তু এমএ ক্লাশে কল্পনার সহাপাঠী ছিল, কারণ কল্পনা এমএ ক্লাশে ভর্তি হয় বিয়ের অনেকদিন পর শখ করে। এই নতুন জায়গায় আসার পর আবার নতুন করে তাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। নন্দিতার অ্যাপার্টমেন্ট ঘটনাচক্রে ওদের একদম পাশেই পড়েছে। এ বাড়িতে এসে যখন প্রথম দেখা হয় তখন খুব খুশি হয়েছিল দুজনেই।

যেকোনো কারণেই হোক বিয়ে থা করেনি নন্দিতা। অথচ এখনো বেশ লাবণ্যময়ী সে। ঢলঢল একটা সৌন্দর্য থাকে বাঙালি মেয়েদের, মায়া থাকে চোখের পাতায় আর চাউনিতে। পুরুষকে কাত করার জন্য তাদের সৃষ্টিকর্তা একশো অস্ত্র দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার প্রথম শরসন্ধান এই চোখের চাউনিতে। তাও বিয়েটা হয়ে ওঠেনি নন্দিতার। তার মাকে নিয়ে থাকে। কলকাতার একটা নামী স্কুলের টিচার। ফ্ল্যাটটা বোধ হয় তার এনআরআই দাদা বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে কিনেছিল। এই বাড়িতে মহিলাসমাজে বলতে গেলে নন্দিতা ছিল কল্পনার সবথেকে কাছের লোক। কিন্তু সঞ্জীবের সঙ্গে তার দেখা হলে মৃদু হাসি নমস্কার ছাড়া খুব একটা কথাবার্তা হতো না।

তবে কল্পনা চলে যাওয়ার আগে যোধপুর পার্কের হাসপাতালে প্রায় গিয়ে দেখে আসত ওকে। হাসপাতালেও সঞ্জীবের সঙ্গে বেশি কথা হতো না। প্রায়ই ডাক্তারি বুলেটিনের মতো কল্পনার খবর নিয়ে যেত ও। হাসপাতালের বারান্দায় বসে খুব কেঁদেছিল ও, কল্পনা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না শুনে। আমাদের মন যে আসলে কখন কোথায় গিয়ে জোড় বেঁধে আসে, আমরা নিজেরাও জানি না বোধ হয়। টান পড়লে টের পাই।

এখন কল্পনা চলে যাওয়ার পর নানান স্পেশাল ডিসের বাটি প্রায়ই ওদের কাজের মেয়েটি দিয়ে যায়। কোনোদিন এঁচড়ের তরকারি, কোনোদিন ইলিশ ভাপা। নন্দিতা জানে অবশ্য সঞ্জীব রেসট্রিকটেড ডায়েটে আছে। কোনোদিন লিফটে ওঠার সময়, কোনোদিন নিচের লবিতে দেখা হলে যেটুকু কুশল বিনিময় হয়, তখনই যা কথাবার্তা হয় ওদের। অথচ এই সমস্ত সময়ে খুব মন দিয়ে সঞ্জীবের কথা শোনে ও। এই টাওয়ারগুলোর সঙ্গে লাগোয়া ক্লাব আছে, অ্যাসোসিয়েশন আছে, আড্ডাঘর আছে নিচে একটা। কিন্তু সেখানে সঞ্জীবের যাতায়াত কম।

তাই পঞ্চানন চলে যাওয়ার পর সঞ্জীব এই আকাশলোকে বেশিটাই একা। যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে সে কাজ করে সেখানে ষাট বছরে রিটায়ারমেন্ট। যদি তার পরেও কিছু থাকে, তাহলে তখন কী করবে চিন্তায় আছে সে। মাঝে মাঝে বৈপ্লবিক কিছুও ভাবে। উগান্ডায় ওর এক কলেজজীবনের বন্ধু আছে, তার নাম দেবব্রত ওরফে দেবু। সে প্রায়ই মেইল করে, স্কাইপেতে কথাও হয় ইন্টারনেটে। মেয়ের সঙ্গে যখন কথা বলে সঞ্জীব তখন ওর কল মাঝে মাঝে এসে যায় স্ক্রিনে। দেবুর বাড়ির কাছে এক পাহাড়, সেইখানে গরিলা দেখতে পাওয়া যায়। পৃথিবীতে গরিলা দেখার নাকি ওই একটাই জায়গা আছে, পরের ছুটিতে গরিলাদের কাছাকাছি ওখানে কিছুদিন কাটিয়ে আসবে ঠিক করেছে সন্দীপন। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে অনেক টারজানের ছবি দেখেছে সে। আফ্রিকার জঙ্গলে টারজান আর গরিলা মা। তাদের একবার চোখে দেখলে একটা স্বপ্ন পূরণ হবে ওর। মাটির পৃথিবীর প্রান্তসীমায় আমাদের সবায়ের একটা কল্পনার পৃথিবী থাকে। আমরা সেই পৃথিবীটাকে খুব ভালোবাসি মনে মনে।

টিভির ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে চোখ রেখে তার বিশুদ্ধ স্বাস্থ্যকর ব্রেকফাস্ট প্রায় অন্যমনস্কভাবেই খাচ্ছিল সে, এমন সময় ইন্টারকমটা বেজে উঠল। উঠে গিয়ে ধরতে হলো সেটা। সিকিউটির ফোন। অঞ্জলি গুজরাল বলে একটি মেয়ে এসেছে তার সঙ্গে দেখা করতে যোধপুর পার্ক থেকে। সে কি আসতে পারে? তাকে পাঠিয়ে দিতে বলে আবার চেয়ারে এসে বসে সঞ্জীব। ফোনটা আসতে মনে মনে খুশি হয় সে। একজন মেয়ের উপস্থিতিতে সব পুরুষের জন্য একটা কম্পন থাকে, একটা নয় হয়তো অনেকগুলো রেডিও স্টেশনের মতো, যে যেটাতে বেজে ওঠে। বাইশ থেকে বিরাশি, সব বয়সেই, যখন যেমন তখন তেমন। আঙুরের রস কোথাও রোগীর পথ্য কোথাও সাকির হাতের পেয়ালা।

বেল বাজতে দরজা খুলে দেয় সঞ্জীব। করিডরের একদম প্রান্তে বলে এই দরজাটা অবশ্য অনেক সময় খোলা থাকে। ওর নিজের ভিজিটর ছাড়া কেউ আসবে না এখানে। করিডরের ওপরে একটা সুদৃশ্য ম্যাট পেতেছিল কল্পনা। কর্নারটা সাজিয়েছিল কিছু ইনডোর প্লান্ট আর ক্রিপার দিয়ে। আকাশের বারান্দায় মাটির সবুজের একটা ছোঁয়া। হিসেবমতো কমন মেইনটেনেন্স এরিয়া, তবু ওরা আপন করে নিয়েছে ওদের অ্যাপার্টমেন্টের পজিশনের মাহাত্ম্যে। দরজাটা তাই অনেক সময় খোলা থাকে ওর। ও গাছগুলোয় সঞ্জীব নিজেই জল দেয় নিয়মিত।

—হাই, আঙ্কেল।

ডোরম্যাটের ওপর দাঁড়িয়ে সহাস্য অঞ্জলি। দাঁড়িয়ে আছে বললে অবশ্য ঠিক বলা হয় না। একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক ডাইনে-বাঁয়ে ঘুরছে নিজের অক্ষরেখা বরাবর। হাত দুটো কোলের ওপর জড়ো করা। ওর হাতে বোধ হয় একটা কাগজের প্যাকেট, ভাবখানা এই—‘আমি এসেছি তুমি দেখ’। বেশ লম্বা হয়েছে ও। পেছনে নয়-দশ বছরের একটি কুচো এনেছে সঙ্গে করে। গালগুলো ফুলো ফুলো। গায়ে বারবি ডল ফ্রক। অঞ্জুর গায়ে প্রায় পেছনের ক্রিপারগুলোর সঙ্গে ম্যাচিং একটা জঙলি ডিজাইনের কুর্তা পাঞ্জাবি। সঙ্গে একটা জ্যোত্স্না রঙের ওড়না। মূর্তিমান বনদেবী যেন।

—আরে এসো অঞ্জু।

বলে ওদের ভেতরে এনে বসায় সঞ্জীব।

—এটি কে? কী নাম তোমার?

—নাম্পি।

—দারুণ নাম। মোস্ট অ্যাপ্রোপ্রিয়েট।

সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ল নাম্পি। তার নামের এই প্রশংসা যে সে আগেও এমন শুনেছে এটা বোঝা গেল। সোফায় বসে পা দুলিয়ে একটু এদিক ওদিক দেখল সে। তারপর বারান্দার দিকে আঙুল দেখিয়ে অঞ্জুকে তার প্রশ্ন।

—আমি ওখানে যাই?

—হ্যাঁ যাও, কিন্তু ঝোঁকবার চেষ্টা কোরো না।

তারপর হেসে বলে—

—নাম্পি আমাদের পাশের বাড়ি থাকে। তোমার ফ্ল্যাটে আকাশ থেকে কলকাতা দেখা যায় বলে নিয়ে এসেছি।

—খুব ভালো করেছ। কী খাবে অঞ্জু? আমার ফ্রিজে অবশ্য ফলমূল ডিম পাউরুটি এই সব স্বাস্থ্যকর খাবার। তবে সামনের মলে পিজা, বার্গার সব পাওয়া যায়। ফোন করে দিলেই ওরা এখানে পৌঁছে দিয়ে যাবে। এখানে থাকার এটা একটা সুবিধে।

—কিছু না, দেখছ না কীরকম মোটু আমি? বন্ধুরা বলেছে আমি মোটি ডাবল রুটি অর্থাত্ পাউরুটি। হি হি! এরপর আমি খুব সাবধান হয়ে গেছি এখন।

—তুমি এমন কিছু ডাবল রুটি না।

অঞ্জুকে আশ্বস্ত করে সঞ্জীব।

—তোমার বাবা-মা কেমন আছেন? আর ভাইয়া পুনিত?

—ওহ! পাপা-মাম্মি দারুণ আছে। মস্তিমে! খুব ক্লাব আর পার্টি করে। আজকেও দেখ না গল্ফ ক্লাবে চলে গেছে। পুনিত তো দিল্লিতে, জেনপ্যাক-এ জয়েন করেছে। তুমি কেমন আছ? রবিবার বাড়িতে বসে আছে কেন? কোথাও যাবে না? অবশ্য থেকে ভালো হয়েছে তোমার সঙ্গে দেখা হলো, না হলে দেখাই পেতাম না।

—কোথায় যাব অঞ্জু। একা একা কোথায় ঘুরব বলো। ক্লাব একটা আছে, সন্ধ্যাবেলা যাই কখনো।

—ওঃ নো! একলা কেন হবে, এত লোক চারদিকে আছে তো তোমার কলোনিতে। বন্ধু-বান্ধব ভাইপো-ভাইঝি কিছু করে উঠতে পারনি?

—এই বয়সে সেটা চট করে হয় না অঞ্জু। এ ক্রাউড ইজ নট এ কোম্পানি।

—ও মা, তুমি তো জগজিত্ সিং-এর গানের মতো হয়ে গেছ আঙ্কেল ‘হর তরফ হর জাগা বেসুমার আদমি, ফিরভি তনহায়িও কা শিকার আদমি।’ তবে আমাদের ডাকো না কেন? আমি আর নাম্পি তো যেতেই পারি তোমার সঙ্গে।’

—দ্যাটস্ এ গুড আইডিয়া। তোমরা যে আমাকে এত মনে রেখেছ, আমি জানতাম না অঞ্জু। আচ্ছা, এখন কিছু তোমরা খাবে না তা কী করে হয়? আমি ডিম ভাজতে পারি, ভেজে দেবো তোমাদের? আর আমি সবে ব্রেকফাস্ট করেছি, চা-টা তো করতে হবে।

—আরে না না ডিম ভাজতে হবে না, আমি বরং চা করে দিচ্ছি তোমায়, আমিও খাব।

—তাহলে ওখানে ক্রিম দেওয়া বিস্কুট আছে ওটাই বরং দাও নাম্পিকে আর তুমিও নাও। গেস্টদের জন্য আনা থাকে আমার।

—তুমি দাঁড়াও কোথায় কি আছে তোমার রান্নাঘরে একটু দেখি আগে।

হুড়মুড় করে রান্নাঘরে প্রায় নাচতে নাচতে ঢোকে অঞ্জলি। ওর হাতে ধরা কাগজগুলো রেখে যায় টেবিলের ওপর।

—এই কাগজগুলো কিসের অঞ্জু?

জিজ্ঞাসা করে সঞ্জীব।

—ওমা ওইটার জন্য তো এলাম, বললাম না একটা দরকার আছে। আমাদের কলেজে একটা ফাংশন হবে, কলেজ ইউনিয়ন থেকে। আমি ক্লাশ রিপ্রেজেনটেটিভ, তোমার কোম্পানির একটা অ্যাড দিতে হবে আমাকে। পাপাকেও বলেছি, আর অমৃক আঙ্কেলকে। আসছি, তোমাকে দিচ্ছি এক্ষুনি ফর্মটা।

—আচ্ছা এসো।

বলে নাম্পিকে নিয়ে পরে সঞ্জীব। বিস্কুটের প্লেটটা টেবিলে রেখে যায় অঞ্জু।

—আরে নাম্পি, এসো এখানে। একটু গল্প করি।

নাম্পির সঙ্গে গল্প জোড়ে সঞ্জীব। নাম্পিরা নেপালি। আর্ধেক বাংলা আর্ধেক ইংরাজি বলে নাম্পি।

আজকাল কসমোপলিটন শহরের অনেক বাচ্চাই এরকম। সঞ্জীবের ভাগ্নি সঞ্চিতা ব্যাঙ্গালোরে থাকে, তার মেয়ে রিমকি সবে তিন বছরের হয়েছে, অনর্গল কী একটা দুর্বোধ্য ভাষা বলে যায়—অর্ধেক কানাড়া অর্ধেক বাংলা, কেউ কিছু বোঝে না। আবার তার বক্তব্য না বুঝলে বেঁকে ধনুক হয়ে যায়।

—আঙ্কেল, চায়ে ক চামচ চিনি?

রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞাসা করে অঞ্জু।

—একটুও না অঞ্জু। ডাক্তার মানা করেছে।

চায়ের কাপ নিয়ে টেবিলে আসে অঞ্জু। বিস্কুট দিই নাম্পিকে।

অনেক দিন পর এভাবে একসঙ্গে কথা বলছে, যেন অনেক কথা জমা ছিল অঞ্জুর। সে বলতে থাকে আর সঞ্জীব শোনে। অঞ্জু বেড়াতে খুব ভালোবাসে। কিন্তু সেই গত সামারে সিমলা যাওয়ার পর আর কোথাও নিয়ে যায়নি পাপা। কলেজের বন্ধুরা কেবল মলে নয়তো নিউমার্কেট যায়, আইনক্সে যায় কেউ কেউ। অঞ্জুর ভালো লাগে সবুজ গাছপালা মাঠ-ঘাট, সমুদ্র। এইতো কলকাতার এত কাছে বকখালি, গাড়িতে যেতে দু’ঘণ্টা লাগবে, কেউ যেতে চায় না। সঞ্জীব কি নিয়ে যাবে ওদের?

—হ্যাঁ, ঠিক আছে যেতে পারি কোনো একটা ছুটির দিন।

—ওহ্ আঙ্কেল, কোনো একটা বলে কোনো ছুটির দিন হয় না। কোনো কিছুতে বেশি দেরি করলে কিছু মজা থাকে না। নেক্সট স্যাটারডে ২৬ জানুয়ারি, ছুটির দিন, পরের দিন সানডেও ছুটি। স্যাটারডে যদি যাই আমরা?

—তাও যেতে পারি।

—‘ফাইন, ইউ আর টু গুড’—বলে হাততালি দেয় অঞ্জু।

—তোমার কি সেই ফোর হুইল ড্রাইভ ট্রাভেরা জিপটা আছে এখনো আঙ্কেল?

—হ্যাঁ, ওটাকেই চালাই আমি।

—বা বা দারুণ মজা হবে, আমি কি আমার দুজন বন্ধুকে আনতে পারি, সীমা আর মৌকে?

—হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই পারো, কেন পারবে না! আমি চালাব, আমি ছাড়াও আর তিন জন কেন চার জনও যেতে পারে।

—ফাইন, আঙ্কেল, তুমি এই ফর্মগুলো দেখলে তো। ভালো অ্যাড দিও কিন্তু। আমার প্রেস্টিজের ব্যাপার।

—দেখি কী করতে পারি। এগুলো তো বিজনেস ডেভলপমেন্ট সেকশনেরই কাজ। ওরা আমার কথা শুনবে আশা করি।

নাম্পিকে নিয়ে আঙুল দিয়ে বারান্দা থেকে কলকাতার দক্ষিণ সীমা খানিকটা আবিষ্কারের পর অঞ্জু বলল, তোমাদের এখন একটা মন্দিরও আছে আঙ্কেল! এটা কল্পনাদি যখন ছিল তখন দেখিনি।

—না, ছিল একটা মন্দিরের মতো কিছু, সর্ট অফ অ্যান অ্যাপোলজি ফর টেম্পল, পরে প্রোমোটাররা ভালো করে বানিয়ে দিয়েছে।

—সুইমিংপুলও আছে তো একটা। আমরা সাঁতার কাটতে পারি না?

দু’হাতে ওর খোলামেলা মেঘের মতো চুলগুলো গুছাতে গুছাতে জিজ্ঞাসা করে অঞ্জু।

—খুব পারো। কস্টিউম লাগবে তার জন্য।

—আমার আছে, আমি এন্ডারসন ক্লাবে যাই পাপা-মাম্মির সঙ্গে, কিন্তু ওখানে খুব ভিড় হয়, আমি এখানে আসব গরম পড়লে।

নানান গল্প করে উঠে পড়ে অঞ্জু, বলে,

—আমরা এবার যাই আঙ্কেল, একটু মলে যাব, হ্যারি পটারের একটা নতুন বই বেরিয়েছে ওটা একটা কিনব। তোমাদের মন্দিরটাও দেখে যাই। তুমি যাবে আমাদের সঙ্গে?

এই মুহূর্তে বিশেষ কিছু করার ছিল না সঞ্জীবের। হাত গুটিয়ে আলসেমি করা ছাড়া। এই দুটি নবীন প্রাণের সাময়িক উত্সবে যোগ দিতে পারলে তবু খানিকটা সময় ভালোই কাটে।

—ঠিক আছে। চলো যাচ্ছি তোমাদের সঙ্গে। একটু স্নিকারটা পাল্টে একটা প্যান্ট পরে নিই।

ঘরের ভেতরে থেকে একটা ফ্লানেলের প্যান্ট পরে আসে সঞ্জীব। ঊর্ধাঙ্গে ব্রঙ্কোস-এর উইন্ড চিটারটা অবশ্য থেকেই যায়।

অ্যাপার্টমেন্ট লক করে করিডরে আসতে এক হাতে নাম্পির একটা হাত ধরে ও। অঞ্জু পেছনে থাকতে রাজি নয়। আর একটা হাত সে প্রায় জড়িয়ে ধরে। অনেক দিন পর ওর শরীরের কাছে একটা বাড়ন্ত শরীরের গন্ধ।

অঞ্জু অবশ্য শুধু চলে না দুলতেও থাকে সামনে। করিডরে লিফটের দিকে যেতে যেতে একটু দূরে নন্দিতাকে দেখে সঞ্জীব। ও আসছে বোধ হয় নিচে থেকে। হাতে একটা ব্যাগ। প্যাকেটগুলো দেখে মনে হচ্ছে ফল আর ভেজিটেবল কিছু। হয়তো সামনের মলে স্পেনসারের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে নেওয়া।

ওদের তিন মূর্তিকে একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখল নন্দিতা। অঞ্জুর নৃত্যরত চলবার ভঙ্গি অবশ্য কিছু পাল্টালো না তাইতে।

নন্দিতা আজকে একটু সেজেছে মনে হলো। চুলটা শ্যাম্পু করা, খুলে দেওয়া। একটা চাঁপা রঙ কোটা শাড়ি। ও ফরসা নয়, কিন্তু রঙটা খুব সুন্দর উজ্জ্বল অলিভ যাকে বলে তা-ই। চাঁপা রঙটা ওর গায়ে বেশ মানিয়েছে।

ওর কপালে একটা সুন্দর গোল টিপ। লাল নয় ঠিক অন্য রকম রং। মেটে লাল। কানের দুলটা একই রঙের পাথর বসানো। নন্দিতা খুব একটা সাজে না, স্কুলে যাওয়ার সময় খুব সাধারণভাবে যায়। আজ ছুটির দিন বলে কি আলাদা রূপ, কিংবা হয়তো কোনো বিশেষ দিন আজ।

ওদের কাছে এসে একটু দাঁড়াল নন্দিতা, তাই এতটা লক্ষ করার অবসর পেলো সঞ্জীব। তারপরে নাম্পির দিকে তাকিয়ে প্রায় ক্যাথলিক নানদের মতো নিরাসক্ত দৃষ্টি নিয়ে বলল,

—এরা?

—এরা সব আমার যোধপুর পার্কের পুরনো প্রতিবেশি। যাচ্ছি আমরা নিচের শিবের মন্দিরে।

—ও, আই সি।

বললে, খুব কষ্ট করে একটু হাসল নন্দিতা। তারপর এগিয়ে যাচ্ছিল ও। আটকাল সঞ্জীব।

—বাই দ্য ওয়ে, কালকের এঁচড়ের তরকারিটা কিন্তু খুব দারুণ হয়েছিল। কার শিল্পকর্ম ওটা?

—আমার।

প্রায় না থেমেই বলে গেল নন্দিতা।

লিফট দিয়ে নিচে নেমে লবি, তার একপাশে একটা কাচের বড় দরজা পেছনের বাগানের দিকে, সেইটা দিয়ে বেরিয়ে যায় ওরা। লনের পাশ দিয়ে রাস্তাটা গেছে শিব মন্দিরের দিকে। ওটা দিয়ে হেঁটে যেতে এক পাশে বাচ্চাদের দোলনা আর খেলার নানা রকম রাইডস্। সেইখানে নাম্পি একটা দোলনাতে গিয়ে চড়ে পড়ে, খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে ওরা। সঞ্জীবের হাত ছাড়ে না অঞ্জু।

—ইউ আর সো গুড আঙ্কেল, আমি তোমার কাছে আরো আগে এলাম না কেন?

—আসবে কী করে, ওরা তোমায় আগে ক্লাশ রিপ্রেজেনটেটিভ বানায়নি যে! তাহলে তোমার বিজ্ঞাপন বা লাগবে কী করে আর সঞ্জীব আঙ্কেলকে মনেই বা পড়বে কী করে?

—ধ্যাত্! শুধু তা-ই নাকি। তুমি জানো, আমি তোমার কথা কক্ষনো ভুলিনি। শুধু আসা হয়নি তাই।

আবার হাতটা ধরে একটা টান দেয় অঞ্জু। তারপর ওদের টাওয়ারটার দিকে ঘাড় উঁচু করে দেখে বলে,

—তোমার অ্যাপার্টমেন্টটা কোথায় বলো তো? এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ও মাই গড, এখান থেকে তো গুনেই শেষ করা যায় না, চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

—ওই তো। আকাশের কাছে, এখান থেকে আমাদের ফ্ল্যাটটা বার করার সহজ উপায় হচ্ছে যেখানে ওই যে খয়েরি রংটা শেষ হয়ে হলুদ শুরু হয়েছে সেখান থেকে আটটা বারান্দা পরে, ওইখানে।

ওখানে দেখাতে গিয়ে ওর অ্যাপার্টমেন্টের পাশের বারান্দাটায় নজর যায় সঞ্জীবের। দূর থেকে বোঝা যায় তার পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দায় একটা নারী মূর্তি। এখান থেকে একটু ছোট দেখালেও বোঝা যায়। ওটা নন্দিতা। ওপর থেকে ও যেন লক্ষ করছে তাদের।

নাম্পির দোলা শেষ হলে ওরা মন্দিরের দিকে হাঁটা দেয়, ওটা প্রায় রেসিডেন্সির সীমান্ত রেখার কাছে গিয়ে পড়ে। বেশ নিরালা কোণ একখানা। মল, আইনক্স মুভি থিয়েটার এবং ক্লাবের মতো ঈশ্বর এবং তাঁর মন্দির ও আধুনিক জীবনের অঙ্গ, কারণ খুব ঝামেলায় পড়লে কোনো একজন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে রাখলে প্রাণে একটা শান্তি হয় যে কেউ একটা অন্তত আপনার হাঁটুর ব্যথা, অফিসের ঘাড়ত্যাড়া বস, অথবা গৃহিণীর বয়ফ্রেন্ড জাতীয় সমস্যা থেকে আপনাকে উদ্ধার করতে ব্যবস্থা নিচ্ছে। সেই কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত আপনার কাজটা করুক আর না করুক। এই সন্তুষ্টি ব্লাড প্রেসার বেশি হতে দেয় না, টেনশান এবং স্ট্রোক হওয়ার চান্স কমিয়ে দেয়, সুতরাং মন্দির, মসজিদ, গির্জা—কিছু একটা হাতের কাছে থাকা ভালো। ঈশ্বরের সুবিধাজনক দপ্তর, যেখানে গিয়ে আবেদন জানিয়ে আসা যায়।

সবুজ মাঠের মধ্যে, ভ্যান গগ-এর ছবির মতো উজ্জ্বল হলুদের পাশ দিয়ে, ওরা তিন জন তিন বিভিন্ন বয়সের মানুষকে খুব হাসি-খুশি লাগছিল।

শিবের মন্দিরে গিয়ে খুব ঢং ঢং করে ঘণ্টাটা বাজাল অঞ্জু। ভেতরে গিয়ে হাঁটু মুড়ে মাথা ঠেকাল মার্বেলের মেঝেয়। দেখাদেখি নাম্পি ওর পাশে ওর বারবি ডলের ঝলমল ঝালরশুদ্ধ উপুড় হয়ে শুয়ে। এত ঠাণ্ডা হয়ে আছে মার্বেলটা। ওর ঠাণ্ডা না লাগে, ভাবছিল সঞ্জীব।

বাইরে বেরিয়ে আবার ওপরে তাকাতে দূরে নন্দিতাকে ভেতরে চলে যেতে দেখল সঞ্জীব। ও কি এতক্ষণ ওদেরই দেখছিল তবে?

ওখান থেকে মলে যায় ওরা। ক্রসওয়ার্ড বইয়ের দোকান থেকে হ্যারি পটারের বইটা কিনল অঞ্জু। ওটার দাম সঞ্জীবই দিয়ে দিল। নাম্পি পেলো একটা বড় চকলেট।

—ওমা তুমি দেবে কেন, আমি তো টাকা এনেছি আঙ্কেল!

—এনেছ বেশ করেছ, কিন্তু এখন আমি সঙ্গে আছি না! কতদিন পরে দেখলাম তোমায়, একটা উপহার দিতে হবে না?

—ওহ্ আঙ্কেল, ইউ আর সো গুড, থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।

একটু এদিক ওদিক উইনডো শপিং করে বিদায় নিল ওরা।

—তাহলে আমরা সামনের ছাব্বিশ তারিখ বকখালি যাচ্ছি তো?

—হ্যাঁ, তোমরা এলে অবশ্যই যাচ্ছি, এটা তো তোমারই প্ল্যান।

ছাব্বিশ তারিখে প্রজাতন্ত্র দিবস। রেসিডেন্সির ভেতরে একটা স্কুল আছে। সকাল আটটাতে বাচ্চাদের প্রভাত ফেরি হচ্ছিল নিচে। সকাল থেকে সঞ্জীব আজ তাড়াতাড়ি রেডি হয়েছে।

আগের দিন রাতে একটা এসএমএস এসেছিল অঞ্জুর।

—আঙ্কেল, উই আর কামিং টুমরো অ্যাট এইট। ইজ ইট ওকে?

—ওকে, বলে উত্তর দিয়েছিল সঞ্জীব।

‘জো ওয়াদা কিয়া ও নিভানা পড়েগা’ গানটা গাইতে গাইতে শেষ জানুয়ারির ঠাণ্ডার মধ্যেও সঞ্জীব হট ওয়াটার বাথ নিয়েছে একটা। বাইরে জেট প্লেন উড়ে গেল কয়েকটা। কলকাতায় কোনো এয়ার ফোর্স বেস বোধ হয় নেই। হয়তো কলাইকুণ্ডা থেকে উড়ছে। ডোরবেলটা বাজল এই সময়।

দরজা খুলতে বাইরে দাঁড়িয়ে অঞ্জু। তার জুড়ি আর একটি নেপালি মেয়ে এবং নাম্পি। দুজনের ইউনিফর্মের মতো পোশাক। লুজ টপ আর টাইট জিন্স।

—হাই আঙ্কেল! এ হচ্ছে আমার বন্ধু সীমা। সীমা থাপার, আমার ফ্রেন্ড আর নাম্পির দিদি, আমরা দেরি করে ফেলিনি তো?

—এসো এসো, না না দেরি করনি মোটেই। ইউ হ্যাভ কাম জাস্ট ইন টাইম। এখনো তো কুয়াশা ঢেকে। সূর্যের মুখ ভালো করে দেখাই যায়নি। কিন্তু তোমরা তো বলেছিলে আরও দলবল আসবে। তারা কোথায়?

—তোমার গাড়িতে আর বেশি তো জায়গা খালি থাকছে না আঙ্কেল। এর বেশি হলে ভিড় হবে না? আর আমাদের আরো বন্ধুরা সব আজকের জন্য আগে থেকে প্রোগ্রাম করে ফেলেছে তো।

—ও আচ্ছা, ঠিক আছে চলো কোই বাত নেই। তোমরা এখন এইগুলো ধরো।

আগের দিন মল থেকে নিয়ে আসা পটাটো চিপস্ আর কাজুর প্যাকেটসহ ব্যাগটা ওদের হস্তান্তর করে সঞ্জীব। আপেলের ব্যাগ একটা, ওগুলো কাল ধুয়ে রেখেছে সে। মিনারেল ওয়াটার বোতল নেয় তিন জনের তিনটে। নিজের ক্যানন ক্যামেরার কেসটা হাতে নেয় সঞ্জীব। একটা পুরনো বিচ ম্যাট্রেস ছিল। প্লাল্টিকের মাদুর। অনেক আগে কল্পনার কেনা। ওটাকেও নিয়ে নিল সঞ্জীব।

সঞ্জীব নিচে নেবে গাড়িটা বের করে আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজ থেকে, তারপরে ওদের নিয়ে বেরোয় ঠাকুরপুকুর হয়ে বেহালার দিকে, ওখান থেকে ডায়মন্ড হারবার রোড হয়ে দক্ষিণ দিকে যাবে ওরা।

অঞ্জু বসে ওর পাশের সিটে। ওর অনেক কথা জমে ছিল এই ক’বছর বোঝা যায়। পিছনে সীমা অনেক নীরব, গাড়িতে হিন্দি গানের সিডি চলছিল। তার মধ্যেই কথা বলছিল ওরা। ঘণ্টাখানেক পর ডায়মন্ড হারবার আসতে নেমে দাঁড়াল সবাই। ওখানে পাড়টা এখন সুন্দর করে বাঁধানো। হয়তো ইরিগেশান ডিপার্টমেন্ট বা এইরকম কোনো কর্তৃপক্ষ একটা জায়গায় বাঁধিয়ে অনেকটা খোলা মাঠের মতো করে রেখেছে। তার ভেতরে গাড়ি ঢোকাল সঞ্জীব। ওখানে বসে চা খেলো সঞ্জীব আর অঞ্জু্। সীমা আর নাম্পি চা খায় না। অঞ্জু সঞ্জীবের পাশে এসে বসল। একটা ম্যাংগো জুস হাতে নাম্পি সীমার হাত ধরে ঘুরল নদীর ধারে। সকালবেলা নদীর বুকে কুয়াশা থাকে অনেকক্ষণ। অনেক দূরে একটা জাহাজের আবছা রেখা। হালকা হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। হাওয়ায় উড়ছিল অঞ্জুর খোলা চুল।

এই জায়গাটার দৃশ্যপট বেশ আকর্ষণীয়। অল্প দূরে একটা ভাঙা বাড়ি দেখা যায়, সব ইট বার করা পরিত্যক্ত। একটা ঢিপির মধ্যে নদীর বুকে দাঁড়িয়ে। দাঁড়িয়ে ঠিক নেই, এক পাশে কাত হয়ে আছে। ধীরে ধীরে নদীগর্ভে চলে যাবে—এটা বোঝা যাচ্ছে। তার চারপাশের মাটি ধুয়ে বেরিয়ে গেছে। বাড়িটা একটা দ্বীপের মতো। চারপাশে স্রোত। কোনো কোনো মানুষও এমন হয়। দ্বীপের মতো।

‘আমি একটু নদীটাকে ছুঁয়ে আসি দাঁড়াও’—বলে অঞ্জু হঠাত্ই পাড় ধরে নেবে গেল জলের ধারে।

—আরে! ওভাবে জলের কাছে যেও না।

বলে ওকে সাবধান করে সঞ্জীব।

—ভয় নেই আঙ্কেল, আমি সাঁতার জানি তো! চেঁচিয়ে বলে অঞ্জু।

—আরে বাবা, সেটা তো তুমি সুইমিংপুলে কাটো, নদীর মধ্যে সাঁতার অন্য জিনিস। এখানে গর্ত থাকতে পারে নদীর পাড়ে, চোরাবালি থাকতে পারে, ঘূর্ণি হয়, এটা ভরা নদী—গঙ্গা, মোটেই খেলার জায়গা না অঞ্জু, সাবধান থাকা দরকার। এই দেখো তোমায় দেখে নাম্পি এখানে লাফাচ্ছে।

—আমি সাবধান তো!

বলে ঘাটের কাছে উবু হয়ে বসে পড়ে সে। দু’হাতে জল নিয়ে মাথায় ছেটায়।

সীমা ওকে ডাকে তখন :

—আর নিচে যেও না অঞ্জুদি, পড়ে যাবে তো

—মোটেই পড়ব না আমি। তুই আয় এখানে

—না না, আমি বেশ আছি বাবা।

—তুই একটা ভীতুর ডিম।

বলে ওপরে উঠে আসে অঞ্জু।

—আরে এবার চলো তোমরা। এখানেই থাকবে নাকি সারাদিন। বকখালি আরো অনেক দূর।

বলতে গাড়িতে ওঠে ওরা। মধ্যে একটা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে বেতের টুপি কেনা হয় প্রত্যেকের একটা করে।

ওটা মাথায় দিয়েই গাড়ির মধ্যে বসে থাকে নাম্পি আর অঞ্জু। ওদের নাকি বেশ লাগছে ওটা পরে, তাই খুলবে না মাথা থেকে।

ডায়মন্ড হার্বার থেকে বকখালি যাওয়ার রাস্তার দু’পাশ বেশ সবুজ ঘাস, লতাপাতা আর জঙ্গলে ভরা। অনেক গাছ মাথা নামিয়ে রেখেছে রাস্তার দিকে। তাদের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় দু’পাশের শস্যক্ষেত। বেশ উর্বর অঞ্চল এটা। ছায়াময়, সবুজ। ওদের খুব ভালো লাগে। একটা গানের সিডি নিয়ে এসেছে অঞ্জু। হিন্দি পপ গান। ওটা চলতে গাড়ির মধ্যে খালি নাচতে বাকি রাখে ওরা। সীমা যেমন একটু শান্ত প্রকৃতির, অঞ্জু তেমনই উচ্ছ্বল। বেশ ভালোই ওদের জুড়ি। সঞ্জীবের মন রাস্তার দিকে। স্টিয়ারিং তার হাতে। তবু বেশ ভালো লাগছিল ওর এই উচ্ছ্বল উদ্যাপন। তারুণ্যের এই ছোঁয়া।

বকখালি সমুদ্রতট থেকে খানিকটা দূরে পার্কিং লট। ওখানে গাড়িটা রেখে লক করে সঞ্জীব। পাশে আরও দুটি গাড়ি ছিল। দুটোতেই ড্রাইভার আছে। মনে হয় ট্র্যাভেল অ্যাজেন্সির গাড়ি। তারা গল্প করছিল। ‘ভাই, আপনারা কিছুক্ষণ আছেন তো এখানে।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চিন্তে যান আপনি। আমরা এখানে প্রায়ই আসি। এখানে গাড়ি চোর আছে বলে শোনা যায় না কখনো।

ওদের নিয়ে সমুদ্রতটের দিকে হাঁটা দেয় সঞ্জীব। এখানেও সীমার হাত ধরে থাকে নাম্পি। আগে অঞ্জু যায় নাচতে নাচতে।

পার্কিং লট থেকে এগোলে চোরাবালির পথ; পথ না বলে অ্যাপ্রোচ বলা উচিত, তার দু’ধারে কিউরিও শপ। ঝিনুকের তৈরি খেলনা, নানা রকম হাতের কাজ।

মাঝখান দিয়ে একটু এগোলেই উন্মুক্ত সমুদ্রতট। কিন্তু আসল সমুদ্র বেশ দূরে। সামনে বিস্তৃত বিশাল মহাপৃথিবী যেন দু’হাত ছড়িয়ে ডাকছে ওদের।

অঞ্জলি বলে, ‘ওয়াও!’ বলেই দৌড় লাগায় একটা। হাওয়ায় উড়ে গিয়ে ওর টুপিটা নিচে বালির ওপর পড়ে থাকে। আবার দৌড়ে এসে ইলাস্টিক ব্যান্ডটা গলায় পরিয়ে মাথায় ঠিক করে লাগায় ওটা। দূরে কয়েকটি বাচ্চা ঝিনুক কুড়োচ্ছিল, তাই দেখে উত্সাহ হয় নাম্পির, সীমার হাত ছাড়িয়ে ওই দিকে দৌড় দেয় সে। সীমা দৌড়ায় ওর পেছনে পেছনে। আজকাল বেশির ভাগ মেয়ে এটা পরে। সালোয়ার স্যুট। ওড়না নেয়নি ও। ওর বাড়ন্ত শরীরের শোভা গতির সঙ্গে দৃশ্যমান।

ভাটাই হবে এখন। সমুদ্র নেমে গিয়ে গর্জন করছে খানিক দূরে। যেন তার তীরের সঙ্গে কোটি বছরের যুদ্ধে সে আপাতত রণে ভঙ্গ দিয়েছে, কিংবা দূরে গিয়ে দম নিচ্ছে। খেলার মধ্যে হাফ টাইমের মতো। আবার আসবে ঠিকই দ্বিগুণ উত্সাহে, জোয়ার এলে। এখানে ওখানে বালির ওপর রেখে যাওয়া জল দাঁড়িয়ে আছে, যেন ছোট ছোট পুকুর হয়ে। তীরে কয়েকটা ছোট ছোট কাঁকড়া। জল স্বচ্ছ কাচের মতো। বেশি নয়, বড় জোর হাতখানেক গভীর। ঝিনুক সংগ্রহ শেষ হলে ওটার মধ্যে খানিকক্ষণ লাফিয়ে নেচে বেড়ায় নাম্পি। নাচের সঙ্গে অঞ্জু এসে গান ধরে—‘এক দো তিন, চার পাঁচ ছয় সাত আট নয়, দশ গেয়ারা, বারা তেরা।’

ক্যামেরাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে ওদের অনেক ছবি নেয় সঞ্জীব। নীল সাগর, নীল আকাশ, আর কিছু সবুজ প্রাণ, সামুদ্রিক পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছিল। অনেক কথা বলছিল ওরা, ছোট মেয়েরা খুশি হলে যেমন বলে, ঝরনার মতো উচ্ছ্বল। দমকা হাওয়া আসছিল। হাওয়া তো স্বচ্ছ হয়, বর্ণহীন। কিন্তু সমুদ্রের ধারে এই হাওয়া কেমন যেন নীলাভ, সূর্যের আলো মেখে উজ্জ্বল বলে মনে হয়। পৃথিবী এখানে নীল রঙের।

—আমার ছবি তোলো, একলা।

বলে ওর সামনে এসে দাঁড়ায় অঞ্জু। নানা ভঙ্গিতে, একবার বেতের টুপিটা পরে, একবার সেটা খুলে ফেলে, আবার দু’হাতে সেটা ধরে রাখে বুকের ওপর। টুপি খুলতে মুখের ওপর হাওয়ায় ছড়িয়ে যায় ওর খোলা চুল। দু’হাতে সরালেও সরে না সবগুলো। কপালে ঘামের সঙ্গে আটকে থাকে চূর্ণ কুন্তল। লেগে থাকে কানের লতিতে।

খেলাধুলো আর ফটো সেশন শেষ হলে ওরা লাঞ্চ করতে যায় কাছের একটা হোটেলে। নদী আর সমুদ্রের নানা রকম মাছ আর ভাত। একটা সবজিও ছিল। বেশ তৃপ্তিকর।

শীতকালের বেলা শেষ হয়ে আসছে বোঝা যায় তারপর। খাওয়া দাওয়ার পর বেশি দৌড়োদৌড়ি করা পোষায় না সঞ্জীবের। ও গাড়ি থেকে বিচ ম্যাট্রেসটা এনে পাতে তটভূমির সীমানায় একটা গাছের নিচে। সীমা, অঞ্জু আর নাম্পি তিন জনে আবার যায় ঝিনুক সংগ্রহে। কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে ওদের গতিবিধি দেখে সঞ্জীব।

খানিক পরে অঞ্জু ওখান থেকে দৌড়ে আসে ওর কাছে। হাঁফাতে থাকে, তারপরে সটান চিত্ হযে শুয়ে পড়ে ম্যাট্রেসের ওপর। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে পড়ন্ত সূর্যের আলো পড়ে ওর মুখে। বেতের টুপিটাি মুখের ওপর চাপা দেয় ও। সূর্যের লাল আলো ওর সারা শরীরে এসে লুটোয়। ছায়া জমে জামার ভাঁজে ভাঁজে, শরীরের গঠনের আভাস দেয়। অঞ্জু বলে :

—আঙ্কেল, গ্রান্ড লাগছে।

সঞ্জীব বলে : আমারও খুব ভালো লাগছে, তোমাকে একটা বিগ থ্যাঙ্কস দেওয়া উচিত এইটা প্ল্যান করার জন্য।

একটু পরেই আবার ফেরার পথ নেয় ওরা। ঠাকুরপুকুরের পরে একটা গ্রামের রাস্তা আছে, কবর ডাঙ্গার মধ্যে দিয়ে। সঞ্জীব রাস্তাটা চিনত। ওই দিকে ট্র্যাফিক কম বলে ওই পথটা ধরে ও। কলকাতার মধ্যে ওখানে এখনো অনেকটা মফস্বলের চেহারা। অনেক পুকুর। কপি ক্ষেত, মাঠের মধ্যে দূরে দূরে বাড়ি। বেশ লাগে দেখতে। এরপর সন্ধ্যা হয়ে যায়। যোধপুর পার্কে ওদের ড্রপ করে বাড়ি ফিরে আসে সঞ্জীব।

এরপর থেকে মাঝে মাঝেই মোবাইলে ফোন করে অঞ্জু। ও প্রায়ই আসেও টাওয়ারের সামনে এই মলটাতে। দক্ষিণ কলকাতায় এটাই সেরা মল এখন। ওখানে এলে এবং সঞ্জীব বাড়িতে থাকলে এই বাড়িতে একটু উঁকি দিয়ে যায়। নিজের খেয়ালে কোনোদিন কিচেনে ঢুকে কিছু খেয়েও যায়। সঞ্জীবের জন্য স্যান্ডউইচ আর চা বানায়। ডিমের সাদা দিয়ে ওমলেট বানিয়ে খাওয়ায় ওকে। সঞ্জীবের খুব বই পড়ার শখ। খুব ভালো কালেকশান। অঞ্জুও ভালো পড়ুয়া। একদিন এইরকমই খানা-পিনার শেষে একটা ট্র্যাভেল ম্যাগাজিন নিয়ে বসার ঘরে লম্বা সোফার ওপর উপুড় হয়ে পড়ছিল অঞ্জু। থাইল্যান্ড আর কাম্বোডিয়া এক্সোটিক একটা ট্যুর রিপোর্টের ছবি। ও পড়ছিল সারা পৃথিবী ভুলে। সঞ্জীব আর একটা বই নিয়ে সোফায় বসে পা-টা ছড়িয়ে দিয়েছিল সামনে। সেদিন দরজাটা বন্ধ ছিল। পঞ্চানন তার কাজ করে যথারীতি তার বউয়ের কাছে ফেরত গেছে। এমন সময় বেল বাজতে দরজাটা খুলে উঠে দরজাটা খুলল সঞ্জীব।

সামনে দাঁড়িয়ে নন্দিতা। সাধারণত সে কখনো আসে না একলা। তার কাজের মেয়েটি এসে ভালোমন্দ রান্না কখনো কখনো দিয়ে যায় সঞ্জীবকে—‘দিদি পাঠিয়ে দিয়েছে’ বলে। আজ সে নিজেই এসেছে তবে হাতে কোনো বাটি বা বাক্স কিছু নেই।

সঞ্জীব বলল—আরে নন্দিতা, এসো এসো।

ও হাসিমুখে ভেতরে ঢোকে, কিন্তু অঞ্জুকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে আগের অম্লান হাসি যেন মুছে যায় তার ঠোঁট থেকে। একটু যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যায় সে।

—আমি বোধ হয় ভুল সময় এসে পড়লাম, বলে সে।

—না না ভুল সময় কেন হবে? এসো বসো।

ওরা কথা বলে। অঞ্জু প্রথমে খেয়ালই করে না। সে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সোফায়। ট্র্যাভেল ম্যাগাজিনে নিবেদিত হূদয়-মন-প্রাণ। তার শরীরে মানুষি শরীরের ঢেউ, যেখানে যা হতে হয় ঠিক ঠিক, বেশি রকম প্রকাশ্য। তার কোনো খেয়াল নেই। সঞ্জীবকে বলতে হয়।

—তুমি তো অঞ্জুকে দেখেছ! অঞ্জু, ইনি আমার প্রতিবেশি, তোমার নন্দিতা আন্টি, কল্পনা কাকিমার বান্ধবী।

অঞ্জু এবার তোড় জোড় করে ওঠে।

—ও ইয়েস! আমি তো চিনি আন্টিকে। আমরা দেখলাম প্রথম দিনে। যেদিন মন্দিরে গেলাম। নমস্তে আন্টি!

—নমস্তে।

নন্দিতা, সাড়া দেয় খুব নিরাসক্তভাবে। সঞ্জীব অঞ্জুকে নন্দিতার সঙ্গে মিলিয়ে দেবার চেষ্টা করে—

—অঞ্জু, বসাও আন্টিকে।

—না না, আমি বসব না। শুধু একটা অনুষ্ঠানের কথা বলতে এসেছিলাম, নিচে আমাদের কমন রুমে আগামী শনিবার বিকাল ছটায় একটা গানের আসর হচ্ছে, আমাদের টাওয়ারের মহিলা সমিতির পরিচালনায়। নোটিশ বোর্ডে নোটিশ দেওয়া আছে। তাও বলতে এসেছিলাম আপনাকে। সরি, আপনি যে ব্যস্ত আছেন বুঝিনি। হয়তো ফোনেই বললে হতো। তবু ভাবলাম, নিজেই বলি, পাশেই থাকি তবুও দেখা হয় না, দেখাও হয়ে যাবে, তাই!

বলে হঠাত্ই কানের লতি লাল হয়ে যায় ওর। যেন কোনো ব্যক্তিগত একটা কথা নিজের মনের অনেক বাধা অতিক্রম করে একজন পরিচিত পুরুষকে বলতে এসেছিল সে, কিন্তু যেন আগে ভাবা যায়নি—এমন একটা পরিবেশের মধ্যে পড়ে এখন সে অনেকটাই বিরক্ত। হয়তো বক্তব্য সামান্য বলেই আরও বেশি দ্বিধাগ্রস্ত। সত্যি তো, অনুষ্ঠান যে আছে, এটাও ফোনে বললেও চলত। ওই বাড়ি থেকে প্রায়ই সঞ্জীবকে এটা ওটা খাবার পাঠায় বটে, কিন্তু সে সবই কাজের মেয়েটির মাধ্যমে, এখানে নিজে নিজে কখনো আসে না নন্দিতা। এখন এসে যেন অনধিকার চর্চার দ্বিধার মধ্যে পড়েছে ও।

—আরে ব্যস্ত কোথায় দেখলে আমায়। অঞ্জু আর আমি খুব মন দিয়ে দুজনে দুটো বই পড়ছিলাম। ও খুব পড়ুয়া মেয়ে। আর আমার বাড়িটা মল থেকে বেরিয়ে এসে ও রেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার করে। শি ইজ নাউ মাই ফেবারিট পড়ুয়া বন্ধু। এখন তুমি এসেছ এক কাপ চা তো খেয়ে যাও গরিবের বাড়ি। ওই দিন অনুষ্ঠানে তুমি গাইবে? কী গাইবে?

—হ্যাঁ, রবীন্দ্রসঙ্গীত, আমি স্কুলেও ছাত্রীদের শেখাই।

—দেখেছ, আজকালকার সাউন্ডপ্রুফ দেওয়াল আর আর্কিটেকচার হয়ে কত ক্ষতি হয়েছে, প্রতিবেশিনীর গান শুনতে পাওয়ার উপায় নেই। আগে পাড়ার একটি মেয়ে গান গাইলে সারা পাড়া এমনিতেই জানতে পারত।

ওর কথা শুনে নন্দিতা একটু স্বাভাবিক হলেও পুরোটা যে মেনে নেয়নি তা বোঝাই যাচ্ছিল। একবার নমস্তে বলার পর ওর চোখ একবারও অঞ্জুর দিকে যাচ্ছিল না আর। সঞ্জীবের উত্তর শুনে একটু কষ্ট করে হাসল ও। তারপর বলল,

—না সঞ্জীবদা, বসব না, আরও কয়েকজনকে বলতে হবে, যাই আমি।

বলে খুব হঠাত্ই যেন বেরিয়ে গেল ও।

শনিবারের সেই অনুষ্ঠানে অবশ্য গিয়েছিল সঞ্জীব। বেশ ভালোই গান করেছিল নন্দিতা। খুব সুন্দর সেজেছিল। খোলা চুল, চওড়া লাল পাড় সাদা শাড়ি। বেশ লাগছিল ওকে।

এর মাঝখানে আর একদিন এসেছিল অঞ্জু ও তার দলবল। দক্ষিণেশ্বর হয়ে ব্যান্ডেল চার্চে গিয়েছিল ওরা। তার কয়েকদিন পর আর একটা রবিবার সকালে সঞ্জীব ফোন করল অঞ্জুকে :

—‘অঞ্জু; আমাদের কোম্পানির বিজনেস ডেভলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে তোমার কলেজের ম্যাগাজিনের জন্য বিজ্ঞাপনের ম্যাটারটা দিয়ে দিয়েছে। চেকটাও আছে। যদিও সাধারণত পাবলিশ হওয়ার পরেই ওটা দেয়। আমি বলাতে আগেই দিয়েছে। তুমি এই মাসের মধ্যে ওটার রশিদ বানিয়ে দিও।

—ওহ্ গ্রেট! আমি আসছি আঙ্কেল, সকালবেলাতেই, এগারোটা নাগাদ থাকবে তুমি?

—হ্যাঁ, বাড়িতে আছি আমি।

অঞ্জুর জন্য অ্যাড মেটিরিয়াল আর চেকটা খামের মধ্যে ভরে বসার ঘরে টেবিলের ওপর রাখে সঞ্জীব। তারপর ড্রয়িংরুমে বারান্দার কাচের স্লাইডিং ডোরের সামনে লাল রঙের বাহারি পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে বাইরের দিকে মুখ করে একটা সোফার ওপর পা ছড়িয়ে বসে ও। ওর হাতে তখন মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর জীবন নিয়ে লেখা আরভিং স্টোনের কালজয়ী উপন্যাস অ্যাগনি অ্যান্ড একস্টাসি। আর সামনে উদার উন্মুক্ত নীল আকাশ। সঞ্জীবের জন্য এখন সুখের এর থেকে ভালো সংজ্ঞা নেই।

পঞ্চানন চলে যাওয়ার পর দরজাটা খোলাই ছিল। খানিক পরে পেছন থেকে আওয়াজ এল—‘আঙ্কেল!’

ঘাড় ঘুরিয়ে অঞ্জুকে দেখল সঞ্জীব। তারপরে উঠে দাঁড়াল।

—আরে এসো অঞ্জু কাম, কাম! তোমার সব কিছু রেডি রেখেছি। এই নাও বলে খামটা ওর হাতে দেয় সঞ্জীব।

—ওহ্! ইনসাইড কভার অ্যাড আর টোয়েন্টি থাউজেন্ড-এর চেক! ইউ আর রিয়েলি গ্রেট আঙ্কেল, থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ! বলে একটা কাণ্ড করে অঞ্জু। উচ্ছ্বাসে আনন্দে দু’হাতে গলাটা জড়িয়ে ধরে সঞ্জীবের। তারপরে বিরাট একটা চুমু দেয় ওর গালে।

ইতিমধ্যে হাতে তার সনাতন বাটিটা নিয়ে কখন যে খোলা দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে নন্দিতা সেটা এতক্ষণ লক্ষ করেনি সঞ্জীব, এইবার দেখে।

ঘটনার আকস্মিকতায় ততক্ষণে খানিকটা বিপর্যস্ত সঞ্জীব।

নন্দিতাও।

—আমি বোধ হয় সব সময়েই অসময়ে এসে পড়ি।

সে অস্ফুটভাবে বলে আর দাঁড়ায় না এক মুহূর্ত। বাটিটা হাতে করে ফেরত নিয়ে যায়। অঞ্জুর অবশ্য তাতে কিছু হেলদোল হয় না। আরও খানিকক্ষণ লাফালাফি করে বিদায় নেয় ও।

সঞ্জীব আবার তার আরভিং স্টোনের বইটা নিয়ে আগের মতো বসে পড়ে। কিন্তু মন বসে না ঠিক। নন্দিনীর হঠাত্ ওইভাবে চলে যাওয়াতে পুরো সকালটা যেন কেমন খাপছাড়া লাগে তার। খানিকক্ষণ পরে উঠে মলের আইনক্সে চলে যায় সঞ্জীব। একটা ভালো বাংলা ছবি চলছিল। মিশর রহস্য। ওখানে খানিকটা সময় কাটিয়ে আসে। পৃথিবীতে বাঁচতে গেলে মাঝে মাঝে তাকে ভুলে থাকতে হয়। এটা বড় প্যারাডক্স।

অঞ্জুর চুমুর থেকে ওঠা ঢেউ অবশ্য সকালেই থেমে যায় না। বিকালবেলা আবার আসে নন্দিনী। এবার দরজা বন্ধ ছিল। বেল বাজাবার পর দরজাতে বসানো ম্যাজিক আই দিয়ে ওকে দেখে দরজা খোলে সঞ্জীব। হেসে ওকে রিসিভ করার চেষ্টা করে ও। নন্দিতাকে অসম্ভব স্টিফ দেখায়। ওর মুখ চোখ আষাঢ়ের মেঘের মতো।

—এসো নন্দিতা, বসো। হঠাত্ চলে গেলে কেন ওভাবে সকালবেলা এসে?

—কেন চলে গেলাম সে তো আপনি জানেন সঞ্জীবদা। তবুও আপনার কাছে আসা কর্তব্য মনে করে এলাম। কল্পনাদি আমার খুব প্রিয়জন ছিলেন। তার স্মৃতিকে সম্মান করি আমি। আপনারও ভালো চাই। একটা কথা আপনাকে কারো একটা বলা দরকার। সেটা আমিই বলি, যে আপনি যা করছেন মোটেই ঠিক করছেন না। এটা অন্যায় আর অনৈতিক। এই পথ থেকে আপনার সরে আসা উচিত।

—তুমি কি অনৈতিক দেখলে বলো তো আমার কাজ-কর্মের মধ্যে? তুমি অঞ্জুর কথা যদি ভেবে থাকো তাহলে খুব ভুল করছ কিন্তু।

—ভুল করছি না মোটেই। অত বড় একটা কুমারী মেয়ে, এরকম করলে এটা মোটেই মানায় না, খুব দৃষ্টিকটু লাগে।

—আরে বড় কোথায় ওতো সবে কলেজে ঢুকেছে টিনএজার, নেহাত্ কিশোরী থেকে একটু বড় হয়েছে শুধু, চেহারাটা হঠাত্ই একটু ভারী হয়ে গেছে, অনেক দিন ধরে চেনে আমাদের, স্নেহের সম্পর্ক ছাড়া কিছু নয় এটা।

—না মোটেই তা লাগছে না ওর হাব-ভাব দেখে। আপনি বড় ভালো মানুষ। সিধেসাদা। এরপর লোকে সবাই লক্ষ করবে, নিন্দে করবে আপনার। মোটেই মানাবে না আপনার সঙ্গে, আপনার থেকে কত ছোট!

—দুর কী যে বলো না তুমি।

কথাটা প্রায় উড়িয়ে দিতে চায় সঞ্জীব। সমানভাবে ফোঁস করে নন্দিতা। ছোবল দেওয়ার আগে লেজের ওপর দাঁড়িয়ে পড়া কাল নাগিনীর মতো।

—আমি ঠিক বলছি, আপনি প্লিজ সাবধান হয়ে যান।

বলতে বলতে এবার ঝড়ের মতো উঠে চলে যায় নন্দিনী। খানিকটা অ্যামিউজড্ আর খানিকটা দুঃখিত হয় সঞ্জীব। নন্দিনীকে তার ভালো লাগে। পূর্ণ নারীত্বের সব গুণ আছে তার মধ্যে। আর এখন যা বোঝা যাচ্ছে তার সঙ্গে আছে সেই ঈর্ষা, যা একটা মেয়ে তার নিজের রাজত্ব গড়ে তোলার সময় আর একজন এসে অনধিকার প্রবেশ করলে, ফণা তোলে।

বিকালবেলা নিচের টাওয়ারের নিচে মাঠটায় হাঁটতে চলে যায় সঞ্জীব। ওদের এই রেসিডেন্সির কম্পাউন্ডেই অনেক বেড়ানোর জায়গা। বাচ্চারা খেলছে পার্কটায়। বয়স্ক দু-একজন মানুষ বসে আছেন বেঞ্চিতে। ক’জন ওর পরিচিত। রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার। ওকে দেখে হাত নাড়েন।

তারপরে একবার ক্লাবে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু যায় না। গেলেই গল্প-গুজবের ফাঁকে একটু ড্রিঙ্ক করতে ইচ্ছা হবে। ড্রিঙ্কস্ সে আজকাল এড়িয়ে চলে। সন্ধ্যার আগে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসে ও। একটু পরেই আবার আসে নন্দিতা।

—এসো এসো নন্দিতা।

—আই এম সরি। আমি কেন আপনাকে এইসব বলতে গেলাম। আমি তো কেউ হই না আপনার।

যেন অসহায়ভাবে সোফার ওপর বসে পড়ে নন্দিতা। তারপরে দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে অঝোরধারে। এগিয়ে এসে ওর কাঁধের ওপর হাত রাখে সঞ্জীব। তারপরে দু’হাতে উঁচু করে ধরে ওর মুখটা। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নন্দিতার মনে হয় যেন হাজার বছরের প্রতীক্ষার পর বসন্তের বাতাস বয়ে যাচ্ছে ওর শরীর দিয়ে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত