রাবেয়া

রাবেয়া

প্রথম যেদিন আমি রাবেয়া কে দেখেছিলাম সে দিনটির কথা আজও মনে পড়লে আমার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে। সেদিন ছিলো (সোমবার)। শহরের ব্যস্ত তম একটা দিন। সেই ব্যস্ততার মাঝে আমিও নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলাম কোন এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। সেদিন ছিলো আমার ভার্সিটি জীবনের প্রথম দিন। সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ায় তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে রুটি মুখে দিতে দিতে দৌড় শুরু করলাম। পেছন থেকে (মা) ডাকছে পানি খাওয়ার জন্যে তার আর সময় নেই।

এ ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। আমি ছোট্ট থেকেই গুরুত্বপূর্ণ দিন গুলোতে একটু দেরিতেই গিয়েছি। যখন প্রথম স্কুলে যায় তখনও লেট। যখন নাকি পৃথিবীতে এসেছিলাম ২ মিনিট দেরি করে এসেছিলাম। কোন রকম রিক্সার ভাড়া টা মিটিয়ে দৌড় শুরু করলাম। গেট দিয়ে ঢুকে নিজের ডিপার্টমেন্ট খুঁজতে লাগলাম। এতো এতো অপরিচিতো মুখের মাঝে আমি কাকে জিজ্ঞেস করবো বুঝতে পারতেছিলাম না। সবাই যার যার ক্লাশ রুমে যাওয়া শুরু করলো। আমি দেখলাম অপরিচিতা এক মেয়ে এলো চুলে একটা ক্লাশ-রুমে যাচ্ছে পেছন থেকে তাকে ডাক দিলাম।↓

আমিঃ এই যে, মিস! ( সে আমার দিকে এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মনে হলো আমাকে চোখ দিয়ে গিলে ফেলবে।) আমি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে একটু হাসি-হাসি মুখ নিয়ে বললাম।

আমিঃ হিসাববিজ্ঞান,,ডিপার্টমেন্ট টা কোন দিকে আপু?

সে এবার দরজা থেকে আমার পাশে সরে এলো এবং আমাকে ডিটেকটিভ দের মতো খুঁতিয়ে দেখতে লাগলো এবং আমার চার-পাশে চক্কর দেয়া শুরু করলো। আমি এবার ভীত বনে গেলাম। সে তার চশমা ঠিক করে আমার এক-পাশে ফাঁড়িয়ে উপরের দিকে তাঁকিয়ে বললো।

সেঃ হিসাববিজ্ঞান। নাহ নাম টা তো ঠিকই আছে। বলছি কি মশাই চোখে কি কিছু দেখেন না নাকি? নিজের ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন হিসাববিজ্ঞান ডিপার্টমেন্ট টা কোন দিকে আপু? (ব্যাঙ্গ করে) কোথেকে আসে এসব রোবট বুঝি না বাপু।  আমি মাথা নিচু করে ক্লাসে ঢুকে গেলাম। গিয়ে পাশের এক বেঞ্চিতে বসে পড়লাম। সব অপরিচিত মুখ। সবাই যার যার সম্পর্ক তৈরিতে ব্যস্ত। যেনো বয়ফ্রেন্ড আর গার্ল্ফ্রেন্ড পরিকল্পনা করেই উভয় ই এই ইউনি তে ভর্তি হয়েছে। আমার পাশে এক ছেলে এসে বসলো গোলগাল চেহারা দেখতে বেশ ভালোই। ক্লাসে স্যার ঢুকলেন অতঃপর সবাই চুপ হয়ে গেলো। আমার মনে হচ্ছে আমি কোন এক পাতাল পুড়ি তে ঢুকে পড়েছি। সবাই এখন শান্ত। স্যারের মুখের দিকে এমন ভাবে চেয়ে আছে যেনো স্যারের একটা কথা ও তারা প্রত্যাখ্যান করবে না। এমত সময় আমার পাশে বসা ছেলেটি বলে উঠলোঃ-

সেঃ আমি কী তোমার সাথে পরিচিত হতে পারি?

আমিঃ হ্যা অবশ্যই। কেনো নয়?

সেঃ আমার নাম (আরিফ) থাকি উত্তর বাড্ডায়। তুমি?

আমিঃ আমি (তৌহিদ)- থাকি (মিরপুর)।

অতঃপর আমরা স্যারের কথা শুনায় মনযোগ দিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমাদের পাশের বেঞ্চ এ বসে সেই মেয়েটি নাকের ডগায় চশমা রেখে খাতার মাঝে স্যারের লেকচার নোট করছে। স্যার ক্লাস থেকে চলে যাওয়ার পর, আমি তার বেঞ্চ এর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, বললাম।

আমিঃ তখনকার জন্য ধন্যবাদ। ( সে মাথা উঁচু করে আমার দিকে তাঁকালো)

সেঃ ঠিক আছে। আপনার নাম? (হয়তো সৌজন্যতা সূচক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো।)

আমিঃ তৌহিদ- আপনি?

সেঃ রাবেয়া।

শুরু হলো নতুন জীবনের পথ চলা। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এতো ব্যস্ততার মাঝে ও আমি তাকে কেমনে জানি মনের ঘরের একটা কোণায় বসিয়ে ফেললাম জানি না। তাকে নিয়ে মাঝে মাঝে ঘুরতে যেতাম। পড়ন্ত বিকেলে গাছের ছায়ায় বসে আইসক্রিম খেতাম। যখন ও বইয়ের উপর খুব মনযোগী থাকতো তখন আমি তার রাগী চেহারা টা দেখার জন্য ব্যাকুল  হয়ে থাকতাম। এক টানে তার হাত থেকে  বই সরিয়ে ফেলতাম। তখন ও কপট রাগ দেখাতো আমার উপর। আমি তখন হেসে দিতাম- আর যখন ই হেসে দিতাম তখন ও আমার সাথে সাথে হেসে দিতো। মুহূর্তেই তার সব রাগ বাতাসের সাথে মিলিয়ে যেতো। আমরা আবার কথা বলতাম নিজেদের ভাব বিনিময় করতাম। কতো সুন্দর করে আমাদের সময় অতিবাহিত হতে লাগলো।

বৃষ্টির দিনে ও ভিজতো আমি ছাওনির নিচে  দাঁড়িয়ে তার বৃষ্টি বিলাস দেখতাম। আমার ঠান্ডার প্রবল সমস্যা থাকায় কখনো তার সাথে একসাথে বৃষ্টি বিলাস করা হয়ে ওঠেনি। সময় যেনো এভাবেই অতিবাহিত হতে লাগলো তার নিজ গতিতে। আমার ভালোবাসা যেনো আরো গভীর হতে থাকলো  ওর প্রতি। ঘুম নামক নিদ্রা বিশ্রামেও আমি  তাকে খুব করে মনে করতাম। আমার কাছে মনে হলো ৪ টা বছর আমার চোখের পলকে শেষ হয়ে গেলো। শেষ দিন  আমি তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিলাম। কোথাও তাকে আমি খুঁজে পাইনি। হতাশ মন নিয়ে বাসায় ফিরি। আমার কিছু ভালো লাগছিলো না সময় যেনো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো আমার। এভাবেই কেটে যায় ৫ টি বছর। তাকে ভুলতে পারিনি। আসলে তাকে মন গহীন থেকে সরাতেই পারিনি। ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে।

বেলা শেষে তাকে না পাওয়ার বেদনা আমাকে নিদ্রাহীন করে ফেলতো। বাসায় মা-বাবা পাত্রী দেখা শুরু করেছেন। সামনের সপ্তাহে দেখতে যাওয়ার কথা। ছাদের মাঝে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কশছিলাম। অনিশ্চিত হিসাব টা কোন- দিকে যাবে বুঝতেছি না। সিড়ি বেয়ে নূপুরের রিনি-ঝিনি শব্দ নিয়ে কে যেনো ছাদের দিকে আসছে। আমার  সময় থমকে যায়। বুকের কম্পন বেড়ে যায়। হাত- পা অবশ হয়ে যায়। দড়জা খোলার শব্দ পেলাম- কে যেনো আমার পাশে এসে- দাঁড়ালো। সেই চিরচেনা হাটার শব্দ আমি – ভুলতে পারি নি। নূপুরের শব্দে আমি পেছন ফিরে তাকাই- অবাক হই আমি। লাল-শাড়ি তে মোড়ানো এ কাকে দেখছি আমি?- যার জন্য এতকাল আমি অপেক্ষা রত সে  কি তবে সত্যিই ফিরে এসেছে আমার কাছে। কান্নার গতিবেগ বাড়তেই থাকে। কাঁপা স্বরে সে বলতে থাকে।

রাবেয়াঃ সেদিন তোর সামনে যাওয়ার সাহস পাইনি আমি তাই চলে গিয়েছিলাম। আমার পরিবারে একমাত্র (মা) ই আদেশ দেন বাবার কথার কোন দাম নেই। আমাকে জোড় করে এক বয়স্ক লোকের সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছে। আজ আমার  বিয়ের দিন। বাবা আমাকে পালাতে সাহায্য করে। আমি আজ আমার অন্য বাবাকে – দেখছিলাম। বাবা বললেন বেঁচে থাকলে আর এ মুখে আসবি না। আমি একটা ছোট্র একটা কাগজে তোর ঠিকানা লিখে দিয়ে এসেছি। বলেছি সময় হলে দেখতে এসো  তোমার মেয়ে জামাইকে- আমি তার কাছেই  যাচ্ছি।  রাবেয়া বলতে শুরু করলো আমি তোকে বিয়ে করবো যদি আমাকে এখন গোলাপ- ফুল এনে দিস।

আমিঃ মাফ করবেন। ডায়রির পাতায় শুকনো বেলি ফুলের মালা আছে চলবে?

রাবেয়াঃ না, দৌড়াবে জনাব।

আকাশে মেঘের গর্জন শুরু হতে থাকলো। পেছন থেকে মা-বাবা দুজনেই বললো। কাজী সাহেব কে আসতে বলি? বৃষ্টি শুরো হলো৷ আমরা ভিজতে থাকলাম।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত