গল্পকারের গল্প

গল্পকারের গল্প

দূর থেকে নীলরঙা শাড়ি পড়া মেয়েটিকে দেখে বুঝে নিলাম হয়তো ইনিই মায়া । তাই মোটামুটি শিওর হয়েই আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। সে হয়তো আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমি তার পাশে গিয়ে বললাম,
— আপনিই কি মায়া?
মেয়েটি আমার কথা শুনে পাশ ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে হয়তো খানিকটা অবাক হয়েই বললো,
— জ্বি, আমিই মায়া কিন্তু আপনাকে তো চিনলাম না!
— আমিই অভ্র।
— তুমি অভ্র?

বেশ অবাক হয়েই বললো মায়া আর ওর অবাক হওয়াটা ওর চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেলাম। তারপর হাসিমুখে উত্তর দিলাম,

— হ্যাঁ, আমিই সেই অভ্র।

মায়া আমার দিকে তাকিয়ে ভাল করে দেখে নিলো। ও হয়তো বিশ্বাসই করতে পারেনি যে আমি হুইলচেয়ারে বসে ওর সাথে দেখা করতে আসবো। ওর যে এখনও বিশ্বাস হচ্ছেই না যে আমিই অভ্র সেটা আমি বুঝতে পারছি। তাই আমিই আগ বাড়িয়ে বললাম,
— চলেন ওদিকটায় গিয়ে বসি।
— হ্যাঁ চলো।

মায়াকে নিয়ে পাশের একটা বেঞ্চে বসলাম। কিছু সময় চুপ থাকার পর ওই বললো,
— তুমি তো এসবের কিছুই আগে বলো নি।
— কোন সবের?
— এইযে তোমার সমস্যা।
— বলিনি কারণ আমার নিজেকে কারও কাছে ছোট করতে মন চায় না। আর এসব বললে সবাই করুণা করতো কিন্তু আমি তা কখনোই চাই নি।
— তোমার কি কোন একসিডেন্ট হয়েছিল?
— উহু, ছোটবেলা থেকেই আমার দুইটা পা’ই অকেজো। পরিবার অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে তবে লাভ হয় নি। আল্লাহ আমাকে এভাবেই পাঠিয়েছেন।
— সেটাও ঠিক।
— হুম।

মায়ার ভেতরে কি চলছে তা খুব ভালো করেই আঁচ করতে পারছি আমি। আসলে ও প্রচণ্ড রকমের শক খেয়েছে। ও কল্পনাও করতে পারেনি যে আমি এমন হবো। তবুও ফর্মালিটি মেইনটেইন করার জন্যই হয়তো আরও কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা ঘণ্টা খানেক ধরেই আমার সাথে বললো। তারপর বিদায় নিয়ে মায়া চলে গেল। আমিও হুইলচেয়ারে ভর করেই নিত্যদিনের মতো বাড়ি ফিরে এলাম৷ পরবর্তীতে কি ঘটবে তার কিছুটা আগেই আন্দাজ করে রাখছি যদিও এটা ঠিক হবে কি না জানি না, তবুও।

আমি অভ্র। ফেসবুকের জগতের একজন ছদ্মবেশী তথাকথিত লেখক। মোটামুটি অনেকেরই প্রিয় আমি। আবার এই প্রিয় হতে হতে অনেকেই আমাকে অতি প্রিয় মানে মনে জায়গা দিয়ে দিয়েছে বহু বার৷ এটা একদম ঠিক যে ফেসবুকে যারা লেখালেখি করে তাদের উপর অনেকেরই দূর্বলতা কাজ করে। তেমনি আমার উপরও এমন অনেক মেয়েই দূর্বল সেটা অজানা নয়। অনেক সময় অনেক মেয়ের আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্নের কথা শুনেছি। অনেকেই আমাকে একান্তই তাদের আপন করে চেয়েছিল তবে শেষমেশ এসবের কিছুই আর হয় নি। তবে মায়া মেয়েটা ছিল একদম আলাদা। সেও যদিও সবার মতোই আমাকে লেখালেখির জন্যই ভালোবেসেছিল তবে তার ভালোবাসা একদম বেহায়া ছিল। হ্যাঁ আসলেই বেহায়া ভালোবাসা। কারণ প্রায় আটমাস ধরে ওকে বুঝানোর পরও ও শুধু আমাকে প্রতিদিন ভালোবাসার কথাই বলেছে৷ আমি বুঝিয়েছিলাম বহুবার যে আমি দেখতে খারাপ, পারিবারিক অবস্থাও তেমন একটা ভাল না আর আমি ছেলেটাও বাজে। তবে মায়া এসবে একদম কান দিতো না ওর একটাই কথা যে ও আমাকেই চায়। অনেকবার ছবি চেয়েছিল আমার তবে কোনবারই দেইনি। সেও নাছোড়বান্দা। তাইতো আমার সাথে দেখা করবে আর করবে বলেই পাশের জেলা থেকেই আজ আমার সাথে দেখা করতে চলে এসেছিল। আসার আগেরদিন আমাকে বললো,

— কাল দেখা হোক দেখিও তোমার কি করি। আমাকে এতদিন ধরে কষ্ট দেয়া না? তুমি যেমনই হও না কেন আমি তোমাকে দেখা হলে সবার সামনেই ভালোবাসি বলবো। যতই বলো না কেন আমি তোমায় ছাড়ছি না। শুনে বেশ অবাক আর ভালোবাসার জল্পনা মনে এঁকেছিলাম আমিও। ভেবেছিলাম মেয়েটা আসলেই আমাকে অনেকখানিই ভালেবাসে। তবুও মনে একটা ভয় ছিল যে সে যদি জানে যে আমি একজন শারিরীক প্রতিবন্ধী তাহলেও কি ভালোবাসবে?

তবুও মনের কোন এক কোণে আশার জোনাকি উঁকি দিয়ে কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল।

অনলাইনে ঢুকতেই মায়ার অনেক বড় একটা মেসেজ দেখলাম। মেসেজটা এমন,
অভ্র, আমাকে মাফ করিও। আমি যেমনটা ভেবেছিলাম আসলেও আজ সব এমন ছিল না। আমি তোমাকে আমার কল্পনার রাজকুমার মনে করেই সব সময় ভালোবেসেছি তবে তোমার এমন সমস্যা! এটা আমি মানতে পারছিলাম না, কোন ভাবেই না। আমার পরিবারও কখনোই মানতো না। তুমি দেখতে ভাল না এতে সমস্যা ছিল না। তবে!
আমাকে মাফ করিও অভ্র।

মেসেজটা পড়ে কষ্ট হলেও ফিক করে হেসে দিলাম। এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল।

লেখকদের লেখার সাথে কখনোই তাদের জীবনের বা তার মিল থাকে না। তবে লেখার মাঝে তার চিন্তাধারা থাকে। লেখার মতো লেখক কখনোই সবার মনের মতো রাজকুমার হন না, কখনোই না। গল্পের মতো তারা কখনোই অতি রোমান্টিক হন না। এদের জীবনটা আপনাদের মতোই। আপনারা কষ্ট পেলে কাঁদেন, এরাও কাঁদে। শুধু পার্থক্য হলে এরা ইচ্ছে করেই মানুষকে হাসাতে পারে বা কাঁদাতেও পারে।

সর্বোচ্চ কোন লেখকের লেখার প্রেমে পড়া যায় তবে তার প্রেমে পড়তে হলে মহামানবী হতে হয়। এটা সবাই পারে না।

এইযে আমি, আমি যে একজন প্রতিবন্ধী। আমি গল্পে দৌড়ে গিয়ে প্রেমিকাকে জড়িয়ে ধরলেও বাস্তবে হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে তবেই সামনে যেতে হয়। আমি গল্পে প্রেয়সীর হাত ধরে বহুদূর হাঁটলেও বাস্তবে বদ্ধ ঘরেই বন্দী। আমি চাইলেই হুটহাট একটা গল্পের সমাপ্তিতে ভালোবাসা ঢেলে দিয়ে পূর্ণতা দিতে পারি তবে বাস্তবে পূর্ণতারা আসে না৷

মায়া আমাকে ভালোবেসেছিল। তবে ওর মতো করে। যেখানে আমি ছিলাম স্বপ্নের মতো। ওর হাত ধরে হাঁটা, বৃষ্টিতে ভেজা আরও কতো মজার ব্যপার। তবে এসবের কিছুই ঠিক ছিল না আমার মাঝে। মায়ার স্বপ্ন আর আমার জীবন দু’টো দু’দিক বরাবর সমান্তরাল রাশি। আমাদের এক হওয়া সম্ভব না, হবেও না।

চোখটা মুছে ভাবলাম,
ছদ্মবেশী জীবনে মায়ার মতো অনেক মেয়েই হয়তো আমাকে রাজকুমার ই ভেবেছে। নাহ, মায়ার মতো সবাইকে আর কষ্ট দিতে চাই না।
গ্যালারী থেকে হুইলচেয়ারে বসা নিজের ছবিটা এবার হুট করেই প্রোফাইলে ঝুলিয়ে দিলাম।

এবার হয়তো অনেকেই কিছুদিন অবিশ্বাস করবে যে এটা কি আদৌও আমি! যখন শুনবে তখন আবার অনেকে করুণাও করবে। সে যা হয় হোক। অন্তত অনেকের কল্পনার কষ্ট তো দূর হবে। এটাই বা কম কিসে।

আমি তো আর একদম অক্ষম নই।
দু’হাত দিয়ে এই জীবনে কত গল্পেরই তো পূর্ণতা দিলাম।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত