কথাগুলো অস্পষ্ট

কথাগুলো অস্পষ্ট

সকালের মিষ্টি রোদে ঘুম ভেঙে যায় শেলীর। ফজরের নামাজ পড়ে কখন আবার ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেই পারেনি। আজকের সকালটা ওর কাছে অনেক মিষ্টি মনে হচ্ছে। মনের মধ্যে একরকমের ভালোলাগা কাজ করছে। পাখির কিচিরমিচির ওকে মুগ্ধ করছে, ভাঙ্গা জানালার ফাক গলিয়ে রোদের আলোটা ওর চোখে অপরূপ লাগছে। সবাই ঠিকই বলে যে, মন ভালো থাকলে নাকি সবকিছুই ভালো লাগে। এতদিন শেলী ভাবত যে, সকালের রোদ মানেই বিরক্তিকর , একটা ঝামেলাপুর্ণ নতুন দিনের শুরু, কাজ আর কাজ।

কিন্তু আজ ও বুঝতে পারছে যে, মন ফুরফুরে থাকলে ভাঙ্গা ঘরে থাকতেও শান্তি লাগে। এসব ভাবতে ভাবতে ও ঘুমন্ত সিরাজের দিকে তাকায়। কি সুন্দর ঘুমাচ্ছে, বিয়ের পর কখনই এমন করে দেখা হয়নি সিরাজকে, দেখবেই বা কীভাবে!!! সিরাজতো ওকে একদম পছন্দই করত না বিয়ের পর থেকে।

সিরাজের শেলীকে বিয়ে করার একটাই কারণ ছিলো, সেটা হচ্ছে শেলীর বাবার দেওয়া টাকায় বিদেশ যাওয়া। শেলী দেখতে একটু কালো হলেও অতোটাও অসুন্দর নয়… কিন্তু সিরাজ অন্য একটা মেয়েকে পছন্দ করত। বিয়ের দিনই সিরাজ শেলীকে ব্যাপারটা বলে দিয়েছিলো। “দেখো শেলী , আমি আমার বাবা-মায়ের কথায় তোমাকে বিয়ে করেছি, আমি অন্য একটা মেয়েকে ভালবাসি, তোমাকে কখনো ভালবাসতে পারব কিনা জানিনা, কয়দিন পরতো আমি মালয়েশিয়া চলে যাবো, প্লিজ এইকয়দিন একটু মানিয়ে নিতে হবে, তারপর দেখা যাবে। ” বলেই শেলীর কোনো কথা না শুনেই হনহন করে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় সিরাজ।

সেদিন শেলীর চোখ দিয়ে হয়তো পানি গড়িয়ে পরেছিলো, কিন্তু সিরাজের সেইগুলো দেখার সময় ছিলনা, আর কেউই হয়ত সেদিন শেলীর সেই কান্নাটা দেখতে পায়নি।

ভাঙ্গা একটা ছোট্ট টিনের চালের ঘর, ভাঙ্গা দরজা, জানালা। এগুলো এতক্ষণ শেলী খেয়ালই করেছিল না, কিন্তু সিরাজ ঘর থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার পর এগুলোই চোখে পরছিল শেলীর। শেলীরা মোটেও এতোটা গরীব নয়। কিন্তু শুধুমাত্র একটু কালো হওয়ার জন্যই সিরাজের মত একটা ছেলের সাথে, এইরকম পরিবারে বিয়ে দিয়েছে শেলীকে। শেলী সেদিন সারারাত কেঁদেছিল। কাদতে কাদতে কখন ঘুমিয়ে পরেছিল বুঝতেই পারেনি। নতুন বউ , দরজা খোলা রেখেই শুয়ে পরেছিল। সকালে উঠে দরজা বন্ধ দেখে আতকে ওঠে শেলী। তারপর দেখে পাশেই সিরাজ ঘুমাচ্ছে। সেদিন থেকে সিরাজ কখনই ওর সাথে ভালো করে কথা বলেনি। কিন্তু শেলী শুধু ভাবত যে , হয়ত এমন একটা দিন আসবে । যেদিন সিরাজ ওকে অনেক ভালবাসবে।

বিয়ের কয়মাস পরেই সিরাজ মালয়েশিয়া চলে যায়, কেউই জানতেই পারল না শেলীর মনের অবস্থা। সবাই ভাবল যে, শেলী আর সিরাজ খুব খুশি। কিন্তু সিরাজ বিদেশ যাওয়ার পরেই বিষয়টা জানাজানি হয়ে গেলো যে, সিরাজ শেলীকে পছন্দ করেনা। কারণ সিরাজ তিনবছর বিদেশ থাকাকালীন কখনই শেলির সাথে ভালো করে কথা বলেনি। শেলীর জন্য আলাদা করে টাকা পাঠায়নি কখনো। বরং অনেকবার বলেছে ডিভোর্সের কথা।

এই তিনবছরে অনেক ঝড় বয়ে গেছে শেলীর উপর দিয়ে, একে সিরাজের অবহেলা, তার উপর শশুরবাড়ির যত কাজ শেলীকেই করতে হত, ওর শাশুড়ি কাজ তেমন করেইনা বরং শেলী কোনো কাজ একবার করলে সেই কাজে খুত ধরে আবার করায়। তারাও শেলীকে পছন্দ করেনা, তাদের ছেলের সাথে এমন বউ মানায় না। কিন্তু শেলী সব সহ্য করেছে শুধু সিরাজের দেশে আসার অপেক্ষায়, ওর একটা বিশ্বাস ছিলো যে, দেশে আসলে নিশ্চয়ই সিরাজ ওকে পছন্দ করবে। মেয়ে হিসেবে বিয়েতো একবারই হয়েছে, ও কেনো ডিভোর্স দিতে যাবে। সিরাজতো বাইরেই থাকে, আসুক তারপর দেখা যাবে।

তিন বছরের অপেক্ষার পর সিরাজ আসল দেশে। কোনো পরিবর্তন নেই , কিন্তু শেলীকে আর ডিভোর্সের কথা কিছু বলছে না। আর কাল রাতে শেলির সাথে অনেক ভালভাবে কথা বলেছে। আর এটাও বলেছে যে, আজ নাকি শেলীকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাবে , শুধু তাই নয়, শেলির জন্য নাকি একটা সারপ্রাইজও আছে। আর এইটাই আজ সকালে শেলীর মন ভালো থাকার কারণ।

সিরাজের মুখে রোদের একটু আলো পরায় সিরাজ নড়েচড়ে ওঠে। তা দেখে শেলী জানালার সাথে বাধা ওড়নাটা টেনে দেয় ভালো করে যেন রোদের আলো সিরাজের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। এমন সময় শেলী ওর শাশুড়ির ডাক শুনতে পায়।

_আসছি মা।

বলে দরজা খুলে বাইরে যেতেই ওর শাশুড়ির চেঁচামেচি শুনতে পায়,” কি ব্যাপার!লাটসাহেবের বেটী, আজ কি ঘুম ভাঙছে না। এতো কাজ পড়ে আছে, সেগুলো কে করবে শুনি” কথাটা শুনে লজ্জা পেয়ে যায় শেলী, আজ যেন রাগ হচ্ছেনা ওর শাশুড়ির কথায়। প্রতিদিন কাজগুলো করতে করতে যেন অভ্যাস হয়ে গেছে। ও কল পাড়ে যাচ্ছিল থালাবাসন ধোয়ার জন্য, এমন সময় সিরাজ ঘর থেকে বের হয়ে ওর মাকে বলল যে,” মা আজ আমি শেলীকে নিয়ে একটু শহরে যাব, আজ একটু কাউকে বলো কাজগুলো করতে। আর শেলী তুমি রেডি হয়ে নাও। একটু পরেই বের হবো আমরা।” সিরাজের কথা শুনে অবাক হয়ে যায় ওর মা, কিন্তু কিছু বলেনা। শেলী হাতমুখ ধুয়ে রেডি হয়ে নেয়। সিরাজও রেডি হয়ে নেয়।

খাওয়া-দাওয়া না করেই সিরাজ শেলীকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। সিরাজের বাড়ির সবাই দেখছে আর অবাক হচ্ছে, অবাক হওয়ারই কথা। কয়দিন আগেও যে বউকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল , আজ সেই বউকে নিয়েই ঘুরতে যাচ্ছে! শেলীতো খুব খুশি। ও যে এমন একটা দিনের জন্যই তিন বছর ধরে অপেক্ষা করে আসছিলো, তবে শেলীর খারাপও লাগছে কারণ আগামী কালকেই সিরাজ আবার বিদেশে পাড়ি জমাবে।

সিরাজ আর শেলী আজ সারাদিন অনেক ঘুরল, মজা করল, খাওয়াদাওয়া করল। শেলীর কাছে সব যেন স্বপ্নের মতই লাগছে। মনে হচ্ছে ও কোনো রাজপুত্রের সাথে কোনো রাজপুরীতে ঘুরাঘুরি করছে। সিরাজকে যতই দেখছে ততই অবাক হচ্ছে। এইবার সিরাজ বলল ওকে সারপ্রাইজ দিবে, এই বলে ব্যাংকের মধ্যে নিয়ে গেলো। শেলীতো অবাক!!! আরে ব্যাংকে গিয়ে ও কি করবে, কিন্তু সিরাজের কথার উপর আর কিছু বলতে পারল না। সিরাজ ওকে বলল যে, ওর নামে একটা ব্যাংক একাউন্ট খুলবে যাতে এইবার ওইখানে গিয়ে টাকা পাঠাতে পারে। কথাটা শুনে শেলীর চোখে পানি চলে আসল, এতো ভালবেসে ফেলেছে এই কয়দিনে সিরাজ ওকে। এই তিন মাসের ছুটিতে শেষে এসে হইলেও সিরাজ ওকে ভালবেসেছে, এর চাইতে বড় শেলীর কাছে আর কিছু হতেই পারেনা।

শেলী ক্লাস টেন অব্দি পড়ালেখা করেছে, কিন্তু তারপরেও কাগজগুলো না পড়েই সই করে দিলো । সই করা শেষে , কিছু কেনাকাটা করল দুইজন। সিরাজ অনেকগুলো সুন্দর দেখে শাড়ী কিনে দিলো, শেলীর ভালো একটাও শাড়ী নেই, সিরাজকে যতই দেখছে ততই যেন মুগ্ধ হচ্ছে শেলী।

বাড়িতে গিয়ে শেলীতো খুব খুশি, সবাইকে গল্প করতে লাগল, সারাদিন কি করল , কি কিনল। সিরাজ সবার সাথে দেখা করতে গেলো। রাতে শেলী খুব ক্লান্ত ছিল বলে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল।সকালে উঠে দেখে সিরাজ এখনো ঘরে ফেরেনি। ও সকালে তাড়াতাড়ি উঠে রান্নাবান্না করল, সিরাজের জন্য কি কি দিয়ে দিবে তা রেডি করল। একটু পরেই সিরাজ এসে হাজির একটা মেয়েকে নিয়ে। বাড়ির সবাই বলাবলি করছে এই মেয়েকেই নাকি সিরাজ ভালবাসে। কথাটা শেলীর বুকে তীরের মতো গিয়ে লাগল। এই মেয়ে এই বাড়ি। ও সিরাজের পাশে গিয়ে দাড়াতেই সিরাজ একটা হাসি দিলো, যেই হাসিটার অর্থ শেলীর জানা নেই। কিন্তু জানতে বাকি রইল না যখন সিরাজ তার বুদ্ধির প্রশংসা করতে লাগল যে, কাল কীভাবে শেলীকে বোকা বানিয়ে ব্যাংক একাউন্ট খুলবে বলে ডিভোর্স পেপারে সই করিয়ে নিয়েছে। কথাটা শুনে শেলী ধপ করে মাটির উপরেই বসে পড়ল। তার মানে সিরাজের সাথে কালকের দিনটাই ছিল ওর শেষ দিন। তাই আজ রাতেও সিরাজ আসেনি। শেলীর দিকে সবাই যেন এক অবহেলার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে , ভাবছে মেয়েটা কি বোকা!

আসলেইতো শেলী বোকা, অনেক বড় বোকা, কারণ ও দেখতে সুন্দর নয়, ও কারো ভালবাসা পাওয়ার যোগ্য নয়। ওর কাছে সবকিছু স্বপ্নের মতই মনে হচ্ছে। কালকের দিনের ছবিটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে, সিরাজের অভিনয়ে কোনো খুত খুজে পাচ্ছেনা। পাবে কি করে সিরাজ যে একটা সফল অভিনেতা। শেলীর দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে আসছে, চারপাশের লোকজনের কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসছে। এইটাই হয়ত ছিলো ওর জীবনে…

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত