শুভ্র এবং এক কাপ চা

শুভ্র এবং এক কাপ চা

অনেকক্ষণ যাবৎ বসে আছি অরিত্রির বাসায়। বসে না একচুয়ালি দাঁড়িয়ে আছি। অরিত্রি “দাঁড়াও তোমাকে চা দিতে বলে আসি, চা চলবে তো?” জিজ্ঞেস করায় আমি মাথা নাড়তেই ভিতরে চলে গেল।

এটা জিজ্ঞেস করলো না যে চিনি বেশি খাই না কম। অবশ্য আমি চায়ে চিনির বাছবিচার করি না। যে যা দেই তাই খাই।

একবার অল্পবয়সী এক চা-ওয়ালাকে এই কথা বলায় সে একগাদা চিনি দিয়ে আমাকে গরম শরবত বানিয়ে দিয়েছিল। ভেবেছিল আমি খেতে পারবো না। আমি ঢকঢক করে সবটকু খেয়ে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দিলাম। সে বোকাচোদা হয়ে গেল! হাহাহা

অরিত্রি আমাকে দাঁড়াতে বলেছিল তাই আমি দাঁড়িয়ে আছি ব্যাপারটা কিন্তু তা না। পাশেই সোফা। চাইলেই বসা যায়। কিন্তু আমি বসতে পারছি না, কারণ আমার মনে হচ্ছে সোফাটা বেশ নরম। নরম সোফায় বসতে আমার ভয় লাগে। মনে হয় যেন সোফার ভিতর আমি ডুবে যাব!

ভয়টা অবান্তর না, কাহিনী আছে.. একবার আব্বা বেশ দাম দিয়ে নরম গদিওয়ালা একসেট সোফা এনেছিলেন।
রাজকীয় টাইপ সোফা। আমার আর আমার বোনের একদফা মারামারিও হয়ে গেল কে আগে বসবে তা নিয়ে! অবশেষে যখন আমি সোফায় বসলাম তখন মনে হলো কি যেন একটা আমাকে শুষে নিচ্ছে! আমি তলিয়ে যাচ্ছি সোফার ভিতর!

মুহূর্তেই আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। আমি হাত পা ছোড়াছুড়ি করে ওঠার চেষ্টা করলাম কিন্তু সোফার নরম ফোম যেন আমাকে ছাড়তেই চাইছিলো না।

শেষে আব্বা আমাকে টেনে বের করেছিলেন। টান দেওয়ার সময় জোরটা একট বেশিই দিয়ে ফেলেছিলেন, এট দ্য সেইম টাইম আমিও লাফ দিয়েছিলাম। দুয়ের মিলিত বলে ব্ল্যাকহোলের আকর্ষণ ভেঙে আমি একলাফে উঠে গেলাম আব্বার কোলে। তখন আমার বয়স ষোল। বেশ মোটাসোটা শরীর। আব্বা আমার ভর রাখতে না পেরে আমাকে ছেড়ে দিলেন। শক্ত ফ্লোরের উপর পড়ে আমার কোমড়ের হাড্ডিতে ফ্র্যাকচার হয়ে গেল।
পরবর্তী সাত মাস আমাকে কাটাতে হলো হুইলচেয়ারে বসে…
যদিও তখনকার অভিজ্ঞতাগুলো বেশ মজার ছিল।

চাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গাড়ির মত ভো ভো শব্দ করে এক রুম থেকে আরেক রুমে ঘুরে বেড়াতাম, বাসার মানুষদের পিছনে গিয়ে পিপ পিপ করতাম। সাইড দিলে ভালো, না দিলে পায়ের আঙুলের উপর চাকা উঠিয়ে দিয়ে বলতাম “কানা নাকি? হর্ণ দিচ্ছি শুনতে পাও না?” (তখন আমি কানা মানে জানতাম যে কানে শোনে না!)

যখন আমার বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়তো তার দায়িত্ব নিতে হত আমাদের কাজের ছেলে মোস্তফার। সে হুইলচেয়ার সহ আমাকে বাথরুমে নিয়ে যেত। তারপর প্যান্ট খুলে আমাকে চ্যাংদোলা করে বসিয়ে দিত কমোডে।
ছোটবেলা থেকেই আমার আত্মসম্মান ছিল মারাত্মক। কেউ আমাকে ন্যুড করে হাগাচ্ছে এটা আমি মেনে নিতে পারতাম না। কাজেই এর প্রতিশোধ নিতে মোস্তফাকে দাঁড় করিয়ে রাখতাম বাথরুমের দরজার সামনে।
বেচারাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার হজম হওয়া খাদ্যদ্রব্যের সুঘ্রাণ নিতে হতো! সে যেন গন্ধ থেকে মুক্তি পেতে দূরে যেতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে কিছুক্ষণ পর পরই ডাক দিতাম মোস্তফা বলে। সে ক্ষীণকন্ঠে জবাব দিত। সম্ভবত নাকে মুখে হাত চাপা দিয়ে রাখায় সাউন্ড কম শোনা যেত..

-কি ব্যাপার তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন?
-তুমিই তো বলেছিলে দাঁড়াতে।
-আমি কখন দাঁড়িয়ে থাকতে বললাম?
-যাওয়ার আগেই তো বললে তুমি দাঁড়াও আমি চা নিয়ে আসছি।

অরিত্রি হেসে ফেললো। সব মানুষ একভাবে কাঁদে কিন্তু হাসার সময় একেকজন একেকভাবে হাসে। অরিত্রি যখন হাসে তখন ওর মুখের কর্ণারের একটা ভোগদাঁত দেখা যায়। এই দাঁতটা ও কখনো ব্রাশ করেনা। কিংবা ব্রাশ করলেও এই দাঁতটা কখনো পরিষ্কার হয় না। কেন কে জানে..দাঁতটা হলুদ হয়ে থাকতে থাকতে এখন বাদামি টাইপ কালার হয়ে গেছে..

একবার কলেজে থাকতে এই দাঁতটায় আমি সবুজ কিছু একটা লেগে থাকতে দেখেছিলাম। ঘাসের মত কালার। অরিত্রি ঘাস খেয়ে কলেজে এসেছে এটা বিশ্বাসযোগ্য না। সম্ভবত সেটা কোন শাকের পাতা ছিল। মেবি কচুশাক। কচুশাক অরিত্রির ফেবারিট।

-বসো বসো, আর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।
আমি আসনকুট্টি দিয়ে ফ্লোরে বসে পড়লাম। ছোটবেলায় ভাত খাওয়ার সময় বাবা আমাকে বলতো আসনকুট্টি দিয়ে বসে খা। কিন্তু আমি কখনো আসনকুট্টি দিয়ে বসে খেতে পারতাম না। শুয়ে শুয়ে কিংবা চেয়ারে বসে খেতাম। ইভেন এখনো আমি কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে বিছানার উপর আধশোয়া হয়ে ভাত খাই। জমিদারের মত ভাবসাব আরকি..
-আরে আরে ফ্লোরে বসছো কেন!!
-তাহলে কোথায় বসবো?
-সোফা আছে,সোফায় বসো।
-আচ্ছা

আমি ভয়ে ভয়ে সোফায় উঠে বসলাম। বসেছি একদম সামনের কিনারার দিকে। সোফার মাঝের চেয়ে সামনের দিকটা একটু শক্ত হয়।

-এখন বলো তোমার কি খবর? হঠাৎ কি মনে করে আগমন?
-এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, ভাবলাম একটু চা খেয়ে যাই। কিন্তু এক কাপ চা খেতে এতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে জানলে দোকান থেকেই খেয়ে নিতাম।

অরিত্রির জায়গায় অন্য কোন মেয়ে থাকলে এই কথায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ত কিন্তু অরিত্রি আধুনিক যুগের মেয়ে। এ যুগের মেয়েরা সহজে বিব্রত হয় না।

অরিত্রি শান্তস্বরে বললো,

-ঘরে চা পাতা নেই। কাজের ছেলেটাকে পাঠিয়েছি চা পাতা আনতে। ও এলেই তোমাকে চা বানিয়ে খাওয়াবো।
-আচ্ছা

আমি টের পাচ্ছি আমি আস্তে আস্তে সোফার ভিতরে ঢুকে যাচ্ছি। সোফাটা আমাকে চোরাবালির মত গিলে নিচ্ছে। প্রক্রিয়াটা স্লো মোশনে ঘটছে বলে অরিত্রি ব্যাপারটা ধরতে পারছে না। নাহলে জিজ্ঞেস করতো, কি ব্যাপার তুমি সোফার ভিতরে ঢুকে যাচ্ছ কেন!

আমার বুক কাঁপছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। শক্ত করে সোফার হ্যান্ডেল ধরে রাখার পরেও মনে হচ্ছে প্রতিমুহূর্তে ঠিকই একটু একটু করে আমি হারিয়ে যাচ্ছি সোফা নামক এই ভয়ানক ব্ল্যাকহোলের মধ্যে..

-কি ব্যাপার! কি হয়েছে তোমার? এরকম করছো কেন?
অরিত্রির কন্ঠে বিস্ময়।
-শরীরটা খারাপ লাগছে। মাথা ঘুরছে।
-সারাদিন রোদে রোদে ঘুরে বেড়ালে মাথা তো ঘুরবেই!
আমি জবাব দিলাম না।

এইসময়ে কাজের ছেলেটা ট্রে তে করে দুইকাপ চা নিয়ে ভিতরে ঢুকলো।
ছেলেটা দেখতে কালো। শ্যামলা কিংবা ময়লা না, নিগ্রোদের মত কুচকুচে কালো। অন্ধকারে এই ছেলেকে টর্চ ছাড়া খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

ছেলেটা আমার কাছে ট্রে নিয়ে আসলো। আমি চা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

-কেমন আছো মোস্তফা?

ছেলেটা অদ্ভূত চোখে তাকাল। সম্ভবত ওর নামও মোস্তফা। আমি অবশ্য ভাবিনি ওর নাম মোস্তফা হবে। আন্দাজে বলেছি। মাঝেমাঝে আমার আন্দাজে বলা দুয়েকটা কথা লেগে যায়।
-আমার নাম মোস্তফা না, রুবেল।
-নায়ক শিশুশিল্পী রুবেল?

ছেলেটা এবারেও অদ্ভূত চোখে তাকালো। সম্ভবত ও রসিকতা বোঝে না। কিছু মানুষ আছে যারা সূক্ষ্ম রসিকতা ধরতে পারে না। কেউ কোন জোকস বললে মুখ শুকনো করে রাখে। মানুষ হিসেবে এরা বোরিং।
ছেলেটা আসলেই রসিকতা বোঝে কিনা পরীক্ষা করার জন্য বললাম,
-আচ্ছা রুবেল, কালো হওয়ার বেনেফিট কি জানো?
রুবেল তাকিয়ে আছে।

-কালো হওয়ার সুবিধা হলো কালোদের হাসি খুব সুন্দর হয়। এদের দাঁত অতিরিক্ত রকমের সাদা হয়। হাসলে সাদা দাঁত দেখা যায়। কালোর মাঝে সাদার ঝিকিমিকি দেখতে অন্যরকম ভালো লাগে! হাহাহা

রুবেল আমার জোকস শুনে তেমন মজা পেল বলে মনে হলো না। সে তার কালো মুখটা আরো কালো করে ট্রে নিয়ে চলে গেল। সম্ভবত সে অপমানিত বোধ করেছে।

এই রসিকতা যদি অন্য কোন কাজের ছেলে তার সাথে করতো তাহলে সেও তার সাথে হাসতো। কিন্তু আমার সাথে তার স্ট্যাটাস মেলে না। “নিজের চেয়ে উঁচু শ্রেণীর মানুষের রসিকতাকে অপমান হিসেবে ধরে নিতে হয়। এটা নিয়ম…”

-তুমি একটুও বদলাওনি শুভ্র।
অরিত্রির দিকে তাকালাম। তার চোখেমুখে কৌতুক।
-অরিত্রি, তুমি কি আমার হাত ধরে আমাকে একটু টেনে তুলবে? আমি ডুবে যাচ্ছি!
-টেনে তোলার জন্য হাত আমি বাড়িয়েছিলাম শুভ্র। তুমি সে হাত অবহেলা করে সরিয়ে দিয়েছিলে। আজ তাহলে কেন আবার হাত ধরতে চাচ্ছো?

-ধুরো ভোকচোদ, ফিলসফি বন্ধ কর। আমারে টাইনা উঠা আগে।
আমার কথা শুনে অরিত্রির হাত থেকে কাপ পড়ে গেল। কিন্তু ঝনঝন করে কাপ ভাঙার শব্দ হলো না। কারণ কাপ উল্টে পড়েছে ওর পায়ের উপর। জামার কোল ভিজে গেছে চা পড়ে। পায়জামাও খানিকটা ভিজে গেছে। বাকি চা গড়িয়ে পড়েছে মেঝেতে। গরম চা পায়ে পড়ায় অরিত্রি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সাথে সাথেই মেঝেতে পড়া চায়ে পা পিছলে ধপাস!

ঘটনার আকস্মিকতায় আমিও লাফ দিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে পড়েছি। উঠেই আর দাঁড়ালাম না। দরজা খুলে বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম। পেছনে অরিত্রি বাপ-মা বলে চিল্লাচ্ছে। ওখানে থাকাটা নিরাপদ না। রুবেল পরে ষড়যন্ত্র করে আমার ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দিতে পারে, অসম্ভব কিছু না।
ওর চোখে আমি প্রতিশোধের নেশা দেখেছি..

কে জানে এখন হয়তো অরিত্রিকেও হুইলচেয়ারে করে ঘুরে বেড়াতে হবে। ওকে বাথরুমে কে নিয়ে যাবে কে জানে! রুবেলই মেবি। রুবেলের জন্য হিংসা হচ্ছে। শালার গরিবের কপাল…

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত