মুখার্জী দার বৌ

মুখার্জী দার বৌ

গলদঘর্ম হয়ে বোস বাবু বাজার থেকে বেরলেন, মাসের বাইশ তারিখ, পকেটে আর কটা টাকাই অবশিষ্ট, যা দুর্মূল্য হয়ে যাচ্ছে জিনিষ পত্র, সাধারণ মানুষের সামান্য মাছ ভাত টুকু যোগাড় করা মুশকিল হয়ে যায়। ৫০০ টাকার একটা নোট ভাঙিয়ে ব্যাগের মাঝামাঝি ভরেছে কোনমতে। আজ আবার বউয়ের মুখ নাড়া খেতে হবে তাকে। রবিবার দিন একটু ভালো মাছ কেনার আশায় দু দুবার পুরো বাজার চরকি পাক গিয়ে কিছু টাকা বাঁচিয়ে কাটা পোনা কিনলেন শেষে যা দাম অন্য সব মাছের ।

বাড়ির পথ ফিরছিলেন হঠাৎ একটি নারী কণ্ঠ কানে যেতেই থেমে গিয়ে ঘুরে তাকালেন ।মুখার্জী দার বৌ, এক সময়ে এক পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। বছর পাঁচেক হলো নিজে বাড়ি করে অন্য পাড়ায় চলে গেছেন।

হেসে বললেন- আরে বোস দা যে, কতদিন পরে দেখা হলো। আসুন না একদিন পূর্বা আর সুনন্দা বৌদি কে নিয়ে।

-হ্যাঁ হ্যাঁ আসবো, তো মুখার্জী দা কেমন আছেন?
-উনি বহাল তবিয়তে, আপনাদের আশীর্বাদে শরীর স্বাস্থ্য ভালোই আছে, মেয়েটার জন্য একটা খুব ভালো পাত্র যোগাড় করে ফেলেছি, ওরা তো এখনি বিয়ে দিতে বলছিলো, আমিই রাজী হইনি।

-কেন? কোনো সমস্যা?
-আরে না না শীত কাল ছাড়া কি হয়, গরমে না খেয়ে শান্তি না খাইয়ে বলুন তো?
‘হুমম তা তো ঠিকই’ বলে ঘাঁড় নাড়লেন বোস বাবু। মুখার্জী দার বৌ বললেন- জানেনই তো, আমার বুল্টি খুব শৌখিন, আর পছন্দ খুব ভালো আর হাই লেবেলের, বিয়ের জন্য সে সব পোষাক ও গয়না কিনেছে গরমে পরে কাহিল হয়ে যাবে বেচারী, তাই শীতেই বিয়েটা দেবো ঠিক করেছি। আর পূর্বার জন্য কোনো ছেলে পেলেন? ও তো আমার বুল্টির থেকে পাক্কা তিনবছর একমাসের বড়।

-ওহো হবে হয়তো আমার অত মনে নেই, বাড়িতে আসুন একদিন মুখার্জী দা ও বুল্টিকে নিয়ে, সুনন্দা খুব খুশি হবে।
-হে হেহে, সে আর বলতে, আপনার পাড়ায় থাকতে কি মিল ছিল আমাদের দুটো পরিবারের।

তো বোস দা খুব চিন্তা করছেন নাকি পূর্বাকে নিয়ে,চেহেরা একদম হাফ হয়ে গেছে। ব্যাগ থেকে একটা কাগজের চকচকে বক্স ধরিয়ে দিতে বললেন, এটা একটা দারুণ হেল্থ ড্রিঙ্ক, তিনটে ফাইল খেতে খেতেই দেখবেন কেমন তরতাজা লাগবে আপনাকে, বয়স ও কম দেখাবে গ্যারান্টি দিলাম। মেয়ের বিয়ে নিয়ে ভাববেন না, আমি খুঁজে দেবো বুল্টির বরের মতো। বোস বাবু মনে মনে খুশি হলেন মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজে দেবে বলায়। তিনি জিগ্যেস করলেন- এটার দক্ষিণা কত?

-কি যে বলেন না বোস দা, রসিকতা করে দক্ষিণা ,আরে বেশী না ৪০০টাকা, পুরো একমাস চলবে ।
কোনমতে ঢোক গিলে বোস দা বললেন – মাসের শেষে এতোগুলো… মুখের কথা শেষ না হতেই মুখার্জী দার বৌ বললেন- আরে না না, আপনাকে পুরো টা এখনি দিতে হবে না, দুশো টাকা দিন, বাকিটা পরের মাসে, এখন তো আসতেই হবে পূর্বার জন্য একটা পাত্র যখন..

বোস দা পকেট থেকে ২০০ টাকা দিতে দিতে বললেন খোঁজ খবর করুন ,আমরা একটু চিন্তায় আছি বিয়ে নিয়ে।
টাকাটা ব্যাগে সযত্নে রাখতে রাখতে বললেন -এখন থেকে নো চিন্তা ডু ফুর্তি, বিন্দাস থাকুন। দেখা হবে খুব তাড়াতাড়ি বলে চলে গেলেন মুখার্জী দার বৌ।

পকেট থেকে আরো দুশো টাকা খসিয়ে ঘরে বিষন্ন বদনে বাড়ি ঢুকলেন বোস বাবু। সুনন্দা বাজার টা হাত থেকে নিতে নিতে বলে- এই বাজার আনতেই সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েগেল, তোমার আর কি, এতো বেলায় তোমায় তো আর রাঁধতে হবে না তেতে পুড়ে! জীবন টা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাঁক হয়ে গেল এক্কেবারে, হাতে আবার ওটা কি?
বোস বাবু কাঁচুমাচু হয়ে বললেন- ঐ যে গো মুখার্জী দা মনে আছে তোমার, ঐ যে গো যাদের গৃহ প্রবেশে…

-হুমম ভনিতা না করে বলো তো?
জোর করে গছিয়ে দিলো আর বললো পূর্বার জন্য সুপাত্র খোঁজ নিয়ে তাড়াতাড়ি আসবে তখন বাকি টাকাটা নিয়ে যাবে, এটা খুব ভালো একটা হেল্থ ড্রিঙ্ক, তুমি ও খেয়ে… তিনি পুরো কথা শেষ করার আগেই প্যাকেটটা নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো সুনন্দা।

দিন দশেক পরে একদিন বিকেলে হইহই করে চলে এলেন মুখার্জী দার বৌ, বাড়িটা গমগম করে উঠলো তার আসায়।
– ওহ বৌদি কতদিন পরে দেখা হল বলতো আমাদের, একদম ভূলে গেছো তাইনা পনের মিনিটের পথ ইচ্ছে করলেই দিনে ছয় বার যাতায়ত করাই যায় আর সেই কিনা তোমরা মোটেই যাও না।

-তা ভাই তুমি ও তো আসতেই পারো মাঝে মাঝে!
-মাঝে মাঝে কি বলছো গো বৌদি আমি তো প্রায়ই আসবো এখন থেকে, তোমরা আমরা আলাদা নাকি গো? পূর্বা তো আমারও মেয়ে, তার জন্য একটা ভালো ছেলে খোঁজ না নিয়ে… তো কোথায় পূর্বা ,পূর্বা কোথায় রে মা আয় তো দেখি তোকে,কতদিন দেখিনি তোকে!

এই তো ঘুমোচ্ছিলি নাকি? এই অবেলায়? আয় আয় বস তো পাশে একটু! ও বৌদি, একটু জল খাওয়াও না গো, গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

-হ্যাঁ হ্যাঁ আনছি বসো তো আরাম করে বলে রান্নাঘরে চলেগেল সুনন্দা।
-শোন না কি পড়ছিস রে এখন? বি. এড শেষ তোর? শোন বলি কি রোদে বেরতে হয় তো (ব্যাগ থেকে দুটো টিউব বের করে) এ দুটো ইউজ করিস, দেখবি কি গ্লেজ বাড়বে তোর। রোদে মুখে একটা ট্যান্ পড়ে গেছে, এটা দিনে মাখবি আর এটা রাতে। সুনন্দার থেকে জলের গ্লাস নিতে নিতে বলে বৌদি, এ দুটো পূর্বা কে ইউজ করতে বললাম, কি চেহেরা হয়েছে দেখ, আগে তো দর্শন ধারী ,জানি খুব গুণী মেয়ে তবু পাত্রপক্ষ দেখতে এলে তো!

ও বৌদি বোস দাকে ঐ ড্রিঙ্কটা দিচ্ছো তো? ওটা খেয়েই তো বুল্টির বাবা পুরো ফিট হয়ে গেছে, আর আমাকেই দেখো মনে হচ্ছে দুদিন পর শাশুড়ী হবো? পাত্রপক্ষ তো আমাকেই পাত্রী ভেবে.. হে হে করে হেসে গড়িয়ে পড়লো। সুনন্দা বলে সত্যি না বলেদিলে তো কেউ বুঝতেই পারবেনা আর পাত্রপক্ষ তো তোমায় চেনেই না।

একটা হেল্থ ড্রিঙ্ক আমিও খাই, টপ সিক্রেট ওটা, তুমি নিজের লোক তাই বলছিগো বৌদি ,আফটার ফর্টি, শুধু মাত্র মহিলাদের জন্য, এর পর এলে তোমার জন্য একটা নিয়ে আসবো। ছিলো জানো তো আমার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে কালই।

শোনো না বৌদি পূর্বার শাড়ী পরা ফটো আর উয়েষ্টার্ন ড্রেস পরা কিছু থাকলে দাও তো, এখন যেখানে যাবো সেই বৌদির বোনপোর জন্য মেয়ে খুঁজছিলো, তাকে দেখাতে পারবো।

“হ্যাঁ দিচ্ছি ” বলে আ্যালবাম খানা আনতে বললেন পূর্বা কে।
চায়ের সাথে দুটো গরম সিঙাড়া খেয়ে ফটো নিয়ে যেতে যেতে বললো- বোস দা আগের টাকা টা দিয়ে দিন, আর এগুলোর দাম পরে নিয়ে যাবো। কাল আবার দু পেটি মাল আসবে আমার, যা ডিমান্ড! বৌদি আসছি গো, সেদিন তোমার জন্য ও কিছু নিয়ে আসবো। আজকালকার ছেলেরা না মেয়ের সাথে সাথে সুন্দর শাশুড়ী খুব পছন্দ করে। হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল মুখার্জী দার বৌ।

বোস দা কিছু বলার আগে সুনন্দা বললো- খুব করিতকর্মা মানুষ হলো মুখার্জী দার বৌ, কত পরিচিতি তার, কি সুন্দর মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজে নিয়েছে, অনলাইন বিজনেস করে বেশ ভালো রোজগার করছে তা তার বেশ পোষাক দেখে বোঝাযাচ্ছে ।

-হুমম কথাবার্তায় খুব চৌকস দেখলে, কেমন কায়দা করে আরো কি সব গছিয়ে গেলো, একে সংসার চালাতে আমি হিমশিম খাচ্ছি, তার মধ্যে এসব উটকো.. বোস বাবুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সুনন্দা বললো- আচ্ছা কুচুটে লোক তো তুমি, নিজের জন্য তো বেশ নিয়ে এলে, আর যেই আমার জন্য কিছু দিতে চেয়েছে তো তখনি তোমার যত কথা নাকি??
-না বলছিলাম যে ..

-থামো তুমি, তোমার আর কি? মেয়ের বাবা হয়ে কি করে চুপচাপ বসে থাকো কি জানি! তাও তো মুখার্জী দার বৌ একটু ভাবে মেয়েটার জন্য। কথা না বাড়িয়ে বোস দা বেরিয়ে গেলেন।

পরের সপ্তাহে মুখার্জী দার বৌ এলেন ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে। এসেই বললেন- মার দিয়া কেল্লা বৌদি, পূর্বার জন্য সুপাত্র খোঁজ খবর নিয়ে এলাম। সুনন্দা একগ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে এসে বললো- তা কোথায় থাকে পাত্র, কি করে? কে কে আছে বাড়ি তে?

ঢকঢক করে শরবত টা খেয়ো নিয়ে তিনি বললেন- আমার বাপের বাড়ি পাড়ায় ছেলেটির পৈত্রিক বাড়ি। ছেলেটা অবাঙালী, কর্মসুত্রে দুবাই তে থাকে। বিরেন্দ্র সাহানী নাম তার।

-বাঙালি নয়? মেয়ে পারবে ওদের সাথে মানিয়ে নিতে। আলাদা কালচার, আলাদা খাওয়া দাওয়া? চিন্তার ছাপ সুনন্দার চোখে মুখে।

-আরে বৌদি ওসব নিয়ে ভেবোনা তো, যৈসা দেশ ঐসা ভেষ বুঝলে তো? পূর্বা তো আমার বুল্টির মতো অতোটা আপ টু ডেট নয়, নইলে কবেই নিজের জন্য একটা পাত্র…. হেহেহে, তুমি দেখো ঐ ছেলের পাল্লায় পড়ে এক্কেবারে হিরোইন হয়ে যাবে সে আমি বলে রাখলুম। হেসে গড়িয়ে পড়লেন যেন। পূর্বা কে দেখে বললেন – সামনে আয় তো দেখি ক্রিম টা মেখে কি রেজাল্ট এলো? ভালোকরে মুখটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সুনন্দাকে ডেকে বললেন দেখ দেখ বৌদি এফেক্ট টা সত্যি চোখে পড়ার মতো। ঐ রোদে ঝলসানো টা অনেক কমে গেছে। রাতের টা ভুল করে আবার দিনে মাখিস না যেন। আর শোন এই সানগ্লাস টা রাখ, ইম্পোর্ট ক্যোয়ালিটির বুল্টির জন্য এনেছিলাম রে, তোরই দরকার বেশী, ওকে পরের লটে এনে দেবোখন। তো বৌদি আগের টাকা গুলো দাও তো দেখি, এটার দাম পরে নেবো, ওহো দেখেছো কি ভূলো মন আমার তোমার ঐ হেল্থ ড্রিঙ্কটা না দিয়েই চলে যাচ্ছি।

-না ভাই এখন ওসব আর লাগবে না, আগে মেয়েটার একটা গতি… তাকে থামিয়ে দিয়ে মুখার্জী দার বৌ বললেন- আরে বৌদি তোমার জন্য আনিয়েছি গো, তুমি তো দেখছি মেয়ের চিন্তায় বুড়িয়ে যাচ্ছো বয়েসের আগেই। বললাম তো ওর বিয়ে আমি মাস ছয়েকের মধ্যে দিয়েই ছাড়বো, নিজেদের লোক বলে কথা! একটা পাত্রের খোঁজ দিয়ে গেলাম, ভালো করে চিন্তা ভাবনা করুন, না পছন্দ হয় তো আরো খোঁজ এনে দেবো। মেয়ে কি আমাদের ফেলনা নাকি! পাঁচশো টাকা নিয়ে পাঁচশো কথার জ্বালা ধরিয়ে চলে গেলেন মুখার্জী দার বৌ।
সে চলে যেতেই মেয়েকে নিয়ে পড়লো সুনন্দা।

-তোর জন্য আর কত কথা শুনবো বলতো, সব সময় বুল্টির সাথে তুলনা, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তোকে বোঝায় তুই ব্যাক ডেটেড আর তোর বাবা তাকে দেখলে কেমন মিইয়ে যায়, কথা ফোটেনা মুখে যেন! আর আমার হয়েছে যত জ্বালা, না পারছি সইতে, না পারছি কিছু.. গলাটা কেঁপে উঠলো তার।

পূর্বা মুখ খুললো এবার, বললো- তুমি কি চাও বলতো? আমার একটা বিয়ে হলে তোমার শান্তি?
বোঝা মনে হচ্ছে আমায়? আমি তোমাকে একটা কথা বলছি আমিও ক্লান্ত হয়ে গেছি, উঠতে বসতে বিয়ে আর বিয়ে শুনতে শুনতে ।রাহুল ফিরুক আগে, তারপর তোমার কাছে নিয়ে আসবো। ওকেই বিয়ে করবো আমি।

-কি কি বলছিস,!
-হুমম তুমি ঠিকই শুনেছো ভেবেছিলাম আগে নিজের পায়ে দাঁড়াবো, তারপর তোমাদের জানাবো কিন্তু না আমায় চুপ থাকতে দিলে না তুমি।

-রাহুল কি সেই বক্সি বাড়ির ছেলেটা, যে রেলে চাকরী করে? অবাক চাউনি সুনন্দার ,কখন যে বোস বাবু এসে দাঁড়িয়েছে কেউ খেয়াল করেনি।
গম্ভীর ভাবে জিগ্যেস করলেন – ওদের বাড়িতে জানে?

-জানে সবাই, আমি আমার চাকরীর জন্য…
সুনন্দা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো – যাক বাবা শান্তি পেলাম, হেহেহে এবার আসুক ঐ মুখার্জী দার বৌ ,বৌদি তুমি বুড়ি হয়ে যাচ্ছো, বোস দা বুড়ো, পূর্বা রোদে চামচিকা…

-আরে থামো থামো, মুখার্জী দার বৌ কিন্তু আমার হেল্থ ড্রিঙ্ক টা বেশ ভালো দিয়েছে, তুমি ও খেও মনে করে বুঝলে? যদি উনি না আসতেন তবে তুমি আমার মেয়ের বিয়ে বিয়ে করে কানের পোকা মেরে দিতে।

-জানি তো, আমার সব কিছুতেই দোষ! যাই হোক ও এলো বলেই না পূর্বার পছন্দ টা জানতে পারলাম বলো? হো হো করে হাসতে হাসতে বললো- ও যাই নিয়ে আসুক পরের বার আমি কিন্তু নেবো, তোমায় আমি বলে রাখলুম। বেচারী আবার খেটে আর একটা ছেলের খোঁজ নিয়ে আসবে!

হো হো হো করে হেসে উঠলেন তিনজনেই।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত