দাবার চাল

দাবার চাল

বিনোদ বারান্দায় বসে দাবার দাবার ঘুঁটি সাজাচ্ছিল। উল্টো দিকের কেদারাটা ফাঁকা। বিনোদের মুখে একটা ভারাক্রান্ত ভাব, চোখের তলায় কালি, ইস্ত্রি না করা পরিষ্কার সাদা পাঞ্জাবীটা হয়তো কোথাও অযত্নের গল্প শোনাচ্ছে। এক সময় হয়তো চুলের কায়দাটা ছিল কাল উপযোগী, কিন্তু আজ সেটা যেন এক সুন্দর প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। না, এই মার কিন্তু সময়ের নয়, বিনোদের এই অবস্থার কারণ হয়তো তার নিজের আপন বা কাছের কিছু মানুষের। সেই ধ্বংসাবশেষে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে সিঁথির আগা থেকে শুরু করে মাথার শেষ অবধি বিলি কাটতে কাটতে, কোথাও যেন নিজের অতীতকে আরও এক বার খুঁজে বার করার বৃথা চেষ্টা করে,দাবার প্রথম চালটা সবে সে দিতে যাবে, সামনে এসে বসলো বিপুল। বসে দাবার বোর্ড টা নিজের দিকে ঘুরিয়ে, সবে চালটা দিতে যাবে বিনোদ বলল- উড়ে এসে জুড়ে বসলি?

বিপুল – ওই স্বভাবটা আসলে কার সেটা কি ভুলে গেছিস!

বিনোদ দাবার বোর্ড টা আবার নিজের দিকে ঘুরিয়ে – প্রথম দান সেদিন না চাইতেও আমি দিয়ে ছিলাম, আজ ইচ্ছে করে দিচ্ছি- এক ঘর সাদা বড়ে এগোলো।

প্রায় ৩৫ বছর আগে

বিপুল আর বিনোদের বাবা, অন্ততঃ আপনাদের প্রাথমিক অবস্থায় এটা বলাটাই হয়তো উচিৎ, একজন বিরাট বড় ব্যবসায়ী। একদিন বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার ধারে একটা ছোট শিশু কে কুড়িয়ে পান। তার নিজের ছেলে আর ওই কুড়িয়ে পাওয়া বাচ্চা টি প্রায় সমবয়সী । তার স্ত্রী প্রথম বার বাচ্চাটি কে হাতে নিয়ে বললেন- আজ থেকে আমাদের দুই ছেলে। কিন্তু এই কথাটা বিপুল মেনে নিতে পারেনি কোনোদিন। কিছুটা বড় হওয়ার পরেই, সত্যিটা সে জানতে পারে বাড়ির কাজের লোকেদের কাছে- রাগ টাও জন্মায় সেদিন থেকেই নিজের ভাই বিনোদের ওপর, আর সেই মেঘ ঘনীভূত হয়, যখন স্কুলে যাওয়ার পর বিনোদ কে দুজনের মধ্যে বেশি মেধাবীর আখ্যা টা দেওয়া হয়। বিপুল, যত দিন যেতে লাগলো, নিজের ভাইয়ের প্রতি তত বেশি ক্ষোভ পোষণ করতে শুরু করে। যদিও বাবা মায়ের সামনে এই রাগ দেখালে উলটে বকা বা মাঝে মাঝে মারও খেয়ে যেতে হত, সবার অলক্ষ্যে বিনোদ কে সে নিজের সব থেকে বড় শত্রু মনে করতে শুরু করলো। এই দিকে বিনোদ, বাবা মায়ের প্রিয় ছেলে, শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র, এবং পাড়া- প্রতিবেশীদের চোখের মণি, অজান্তেই কবে যেন, বিপুলের সব চেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলো সে নিজেও জানে না।

বিপুল- তোর জানতেই হোক আর অজান্তে হোক, নিজের নিরীহ বড়ে টাকে সোজা এগিয়ে আমার জীবনটাকে একটা দাবার বোর্ড বানিয়ে দিলি। আমার কাছে তো নিজের অস্তিত্বের মান রক্ষা করার আর কোন উপায়ই ছিল না তাই মাঠে নামতে হল আমাকেও। তোর সাথে সোজা লড়াই করা সম্ভব ছিল না কারণ আমার জন্য পরিস্থিতি ছিল প্রতিকূল, তাই আমায় শুরু করতে হল লড়াই বাঁকা পথে– গজের চাল, বড়ে মাত।

বিপুল আর বিনোদ স্কুলের গণ্ডি টপকে পৌঁছল কলেজের দোরগোড়ায়। বিনোদ এতো দিনে, ওই সুবোধ বালকদের দলে নাম লিখিয়ে ফেলেছে, আর বিপুল, নিজের নামের পাশে, ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও, বড়োলোক বাবার বকে যাওয়া ছেলের তকমাটা লাগিয়ে ফেলেছে। এই পার্থক্য দৃশ‍্যমান, দুজনের হাঁটা- চলা – কথা- বার্তা, বেশভূষা ছাড়া আরও অনেক কিছুতে।

বিনোদ আর বিপুল একই কলেজে, একই ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হল, বাবার ইচ্ছায়, আর বিপুলের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও। বাবার মনে হয় বিনোদের সাথে থাকলে বিপুলটাও নাকি শুধরে যাবে কিন্তু এটা আবার নতুন করে দুই ভাইয়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিল। কলেজে ঢোকার কিছু দিনের মধ্যেই, বিনোদের চোখ পড়লো সুলেখার ওপর অপরূপ সুন্দরী, না হলেও, বেশ মিষ্টি দেখতে, খুব হাসি খুশি। কথায় বলে, নাকি প্রেম এরকম দুম করেই হয়, বিনদেরও হল। কিন্তু যখন বন্ধুদের মুখে বিপুল কথাটা জানতে পারলো, তার মনে হল, এই সুযোগ, বিনোদ কে তার উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার। পরের দিন গিয়ে বিপুল সুলেখার সাথে আলাপ করলো, আর আপনারা হয়তো জানেন, আর কথাটা অপ্রিয় হলেও সত্যি, যে কম বয়সি মেয়েদের বিনোদের থেকে বিপুলদের মত, মানে- টল,ডার্ক,হান্ডসাম, পয়সা ওয়ালা, স্টাইলিশ এবং একটু প্রয়োজনের থেকে বেশি প্রাণবন্ত ছেলেদের বেশি পছন্দ হয়, তাহলে এখনেই বা তার বিপরীতটা ঘটে কি করে?

বিপুলের সাথে আলাপের এক সপ্তাহের মধ্যে, সুলেখা তার প্রেমে প্রায় হাবুডুবু খাচ্ছিল। দুজনের প্রেমের গল্প সারা কলেজে বিখ্যাত হতে বেশি সময় লাগলো না আর তাই খবরটা এসে পৌঁছল বিনোদের কাছেও। মুখমুখি হল দুই ভাই, বিনোদ জিজ্ঞেশ করলো- তুই ভালোবাসিস সুলেখা কে ??
বিপুল- একদম নয়, কিন্তু জানি যে নাকি তুই ভালোবাসিস ওকে।

বিনোদ- তাহলে কেন খেলছিস মেয়েটার মনের সাথে ? ও তোর ওই বাকি বান্ধবীদের মতন নয়, ও খুব ভালো মেয়ে।

বিপুল- কে বলল খেলছি ?? ভালোবাসি না তো কি হয়েছে ? আমি বিয়ে ওকেই করবো। তুই যাকে ভালোবাসিস তাকে সারা জীবন তুই আমার সাথে দেখবি, বউদি হিসেবে সম্মান দিবি, তাকে আমার বাচ্চার মা হতে দেখবি, মানে একটু আমার মত ভাষায় বলতে হলে বলতে হয়, দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি, কিন্তু কিচ্ছু করতে পারবি না। তুই আমার কাছ থেকে আমার বাবা মায়ের ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছিলিস আর আমি তোর থেকে তোর প্রেম কেড়ে নিলাম!

বিনোদ একটা বড়ে এগিয়ে দিল। বিপুল হেসে বলল- মানুষ দান না খুঁজে পেলে এরকম কিছু একটা ভুল ভাল দান দিয়ে বসে, ভাবে এখনো তো খেলা অনেক বাকি, এই বড়ে টা এগিয়ে একটু সময় নিয়ে নেওয়া যাক, তারপর ভাবা যাবে। কিন্তু এটা ভুল, তুই হয়তো খেয়াল করিসনি, এখানে আমার ঘোড়া আছে, বা হয়তো ঘোড়ার আড়াই পা চলা টা ভুলে গিয়েছিলিশ তুই সেদিন ভাবিসনি, যে সব কিছু এতো তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে, আজও ভাবলি না।
ঘোড়া মাত দিল ওই বড়ে টাকে।
কলেজ সবে শেষ হয়েছে, বিনোদ ভাবনাচিন্তা করছে যে এবার ও কি নিয়ে পড়বে, হঠাৎ এক দিন বিপুল হাতে একটা কার্ড নিয়ে এসে বিনোদ কে দিল- বিয়ের কার্ড।

বিপুল- আমি বাবা মা কে বারন করেছিলাম তকে বলতে, কারণ আমি আমার প্রিয় ভ্রাতা কে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম, তাই খবর টা সব কিছু ঠিক হয়ে যাওয়ার পর তোকে জানাচ্ছি, আজ থেকে ৩ মাস বাদে আমার আর সুলেখার বিয়ে। তুই কিন্তু ওর প্রিয় দেওর, অনেক দায়িত্ব তোর ওপর, দেখিস যেন তোর বউদির কোন অসুবিধে না হয়।

নির্বাক বিনোদের প্রথম বার ইচ্ছে করছিল এই কুলাঙ্গার ভাইকে ঠাশিয়ে একটা চড় মারতে, কিন্তু ভাগ্য তার মুখে যে চড় মেরেছে, সেটা সামলে উঠতে এখনো তার অনেক সময় দরকার ছিল।

সেদিন বিনোদ একটা বিষাদে ঘিরে ছিল , কিন্তু আজ নয়। আজ তার মুখে একটা তীর্যক হাসি। সে যে নিজের বড়ে কুর্বান অকারণে করেনি সে জানে আর তাই সে বলল- চাল আমার কাছে সেদিনও ছিল, আজও আছে, সেদিনকার চালে, তোর বাঁকা পথে হাঁটা কে রুকে দিয়েছিলাম, আর আজও তাই করবো, তোকে অতিরিক্ত বেগে এসে আমার জীবন তচনচ করতে দেবো না।
সাদা গজের চালে ঘোড়া মাত।

বিয়ের প্রায় দিন পনেরো আগে হঠাৎ একদিন সকালে সুলেখাদের বাড়িতে একটা ডাক এলো। খামে একটা চিঠি এবং কিছু ছবি। চিঠি তে লেখা- নিজের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার আগে জেনে নিন, কার হাতে তুলে দিচ্ছেন মেয়ে কে।
সাথে বিপুলের, বিভিন্ন বান্ধবীদের সাথে তার কিছু ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি। ছবি গুলো দেখার সাথেই, সুলেখাদের বাড়িতে আগুন লেগে গেলো। সুলেখার বাবা, না জানি কোথা থেকে খবর নিয়ে জেনে নিল যে এই ছবি গুলো মিথ্যে নয় । বিশ্বনাথ বাবুর ছেলে তার মেয়েকে গত তিন বছর ধরে ঠকাচ্ছে, এবং, আসলে সে এক উঁচু মাপের লম্পট ছাড়া আর কিছুই না। ব্যাস, আর দেখে কে, সেদিনই ভেঙ্গে গেলো বিয়ে। বিপুল খবর টা জানতে পেরে এসে বিনোদ কে বলল – আমি জানি এটা তোর কাজ, কিন্তু যেটা বুঝতে পারছি না সেটা হল এই ছবি গুলো তুই পেলি কথা থেকে?

বিনোদ- কেন? যে তোর সাথে টাকার লোভে শুতে পারে, সে কি আরও কিছুটা টাকার লোভে এই ছবি গুলো আমায় দিতে পারে না?

বিয়েটা ভেঙ্গে যাওয়ার পরে, বিপুলের বেশ কিছুদিন সময় লাগলো নিজের মাথা থেকে এই লম্পট তকমা টা নামাতে, কিন্তু ওই কথায় বলে না, সময় সব ভুলিয়ে দেয় তাও আবার যদি ব্যাপার টা বাবা মার চোখে ছেলের শুধরে যাওয়ার প্রসঙ্গ হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। কিছুদিনের মধ্যেই, বিশ্বনাথ বাবু নিজের দুই ছেলে কে নিজের ব্যবসা তে নিয়ে এলেন। ওনার বিরাট সাম্রাজ্যের চাবি কাঠি উঠে এলো তার দুই রাজপুত্রের হাতে।

বিপুল সেদিন নিজের ভাইয়ের আঘাতের বদলা নিতে পারেনি, সয়ে নিয়েছিল মুখ বুজে, অপেক্ষা করেছিল সঠিক সময়ের, কিন্তু আজ সুযোগ চলে এলো ঠিক তার পরের দানেই।

বিপুল- তুই কি ভাবলি , যে তুই আমায় আঘাত করবি আর আমি মুখ বুঝে সব মেনে নেবো? আমি আমার সাথে হওয়া প্রতিটি অসম্মানের বদলা নিতে জানি। আর শুধু তাই না, আমি জানি ঠিক কোন জায়গায় আঘাতটা করলে সবচেয়ে বেশি লাগে, বুকে।

কালো নৌকার চালে মন্ত্রি মাত।

বিনোদ- এটাই তো তোর সব চেয়ে বড় ভুল, তুই কোনোদিন পিঠ আর বুকের তফাৎ টা বুঝলি না আঘাত করতে হয়তো চেয়েছিলিস বুকে, কিন্তু সেটা যে পৃষ্ঠাঘাত বা বিশ্বাসঘাত হয়েছিল, সেটা হয় তুই বুঝিসনি, নয় আজও না বোঝার ভান করছিস।

বিনোদ সব সময় ভাবতো, যে তার আর বিপুলের এই দ্বন্দ্ব তাদের বাড়ি, বা কলেজ বা খেলার মাঠ অবধি সীমিত , কারণ কাজের জায়গাটা এই সবের চেয়ে অনেক আলাদা– তাই কাজের জগতে ঢোকার পর যখন বিপুল খোলা মনে নিজের ভাইকে সাথে নিয়ে কাজ করা শুরু করলো। তার উত্তরে সে বিনোদের থেকেও একই রকম মনোভাব আর আচরণ পেয়েছিল, আর তাই খুব শীঘ্রই নিজের দুই ছেলেকে কাজে মত্ত দেখে বিশ্বনাথ বাবু নিজের কর্ম জীবনের থেকে অবসর ঘোষণা করে দিলেন। ব্যবসা বেড়ে উঠলো চড়চড় করে। কেটে গেলো প্রায় বছর দুয়েক। কিন্তু দুধে জলে যতই মিশুক, দু-চার ফোঁটা টকরস তাদের বিছিন্ন করে ফেলে, আর বিপুল- বিনোদের সম্পর্ক যে কোন সময়ই মিষ্টি ছিল না সেটা নিশ্চয়ই আর নতুন করে বলে দিতে হবে না।

একদিন বিশ্বনাথ বাবুকে বিপুল অফিসে ডেকে পাঠাল। ছেলের জরুরি তলব পেয়ে বাবাও ছুটে এলেন। এসে যা দেখলেন আর শুনলেন, উনি নিজের জীবনে এরকম কিছুর কল্পনা করেননি। বিপুল প্রমাণের ডালি সাজিয়ে বসে ছিল বিনোদের বিরুদ্ধে । সে নাকি গত এক বছরে অনেক কারচুপি করে একের পর এক জালিয়াতি করে গেছে। ধরা কোনোদিন পড়েনি কারণ বিপুল তার ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করত আর তাই এই নিয়ে ভাবার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু গত সপ্তাহে বিপুলের হাতে একটা খাম পড়ে যাতে ছিল কিছু স্ট্যাম্প পেপার, যাতে লেখা যে বিশ্বনাথ বাবু আর বিপুল নিজের স্বইচ্ছায় নিজেদের সব স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বিনোদের নামে করে দিচ্ছেন। এই দেখে বিপুলের সন্দেহ হলো এবং তারপর সব হিসেব পত্র খুঁটিয়ে দেখায় এই সব প্রমাণ পাওয়া যায়।

সারা অফিস সেদিন প্রথম বার বিশ্বনাথ বাবুর রাগ দেখেছিল। নিজের হাতের লাঠিটা দিয়ে খুব মারলেন বিনোদকে, আর বিনোদ, চুপ করে পড়ে মার খেলো। দুএক বার বলার চেষ্টা করেছিল বটে- যে আমি নির্দোষ কিন্তু তার কোনো কথা তে বাবা কান দিলেন না। বাবার মার আর গালাগালি তাকে ততটা কষ্ট দেয়নি যত টা বাড়ি আর অফিস থেকে বের করে দেওয়ার আগের ওনার ওই শেষ কথাটা দিয়েছিল- রক্তের রং যে লুকিয়ে রাখা যায় না, সেটা তুই আবার প্রমাণ করে দিলিরে বিনোদ। বেরিয়ে যাওয়ার আগে, বিনোদ শেষ বারের মত কাঁদতে কাঁদতে পিছন ঘুরে বাবার দিকে তাকাল তাকে শেষ বারের মত দেখার জন্য- কিন্তু বিশ্বনাথ বাবু পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবার মুখটা সে আর দেখতে পেলো না বটে, তবে যেটা তার চোখে পড়লো সেটা হল- সবার অলক্ষ্যে বিপুলের হাসি মুখে দাঁড়িয়ে নিজের কলার টা উঁচিয়ে আবার অন্য দিকে ফিরে যাওয়া।

আজ বিনোদ তার কাছে ছোট হলো, দোষী সাবস্থ হলো যার জন্য আজ সে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যে তার কাছে ভগবানের চেয়ে অনেক বেশি আর একটু খবর নিতেই কিছুদিনের মধ্যে বিনোদ জানতে পেরে গেলো যে তার সন্দেহ সঠিক- তার এই অবস্থার জন্য দায়ী তার বিস্বাসঘাতক ভাই বিপুল।

এদিকে বিপুলের জীবন থেকে বিনোদ সরে তার জীবনে ফিরে এলো আমোদ, প্রমোদ আর শান্তি। তার ছোটবেলার ইচ্ছে আজ পূর্ণ, আজ সে আবার নিজের মা বাবার এক মাত্র রাজপুত্র। সময় কাটতে থাকে, বিপুলের আনন্দে, আর বিনোদের বিষাদে আর সঠিক সময়ের প্রতীক্ষায়।

কিন্তু আজকের খেলায় সেই সময় এসে গিয়েছিল বিনোদ বলল- এই খেলার প্রথম চাল আমিই দিয়েছিলাম, আর শেষ টাও আমিই দেবো। তোর সব বেঁকা চালের উত্তর আমি তোকে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম, কিন্তু আজ শেষ হাসি আমিই হাসবো।

সাদা নৌকার চাল- কিস্তিমাৎ!

ওই ঘটনার কিছুদিন পর একদিন বিপুলের গাড়িতে একটা বোম ব্লাস্ট হলো হিসেব মতন বিপুলের শরীরের একটাও টুকরো খুঁজে পাওয়ার কথা না, কিন্তু সে দিন শরীর টা একটু খারাপ থাকায়, সে অফিস যাচ্ছিল না, গাড়িতে ছিলেন বিশ্বনাথ বাবু, আর সত্যি, তার শরীরের অবশেষ খুঁজে বের করা বেশ চাপের কাজ ছিল।

খবর টা শুনে দুই ছেলেই এলো ঘটনাস্থলে, কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। দুই ভাই মৃত বাবা কে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আর ঠিক তখন হঠাৎ, বিনোদ হাহা করে হাসতে শুরু করে দেয়, মুখে একটা কথা- ইয়ে আমি আমার বাবা কে মেরে ফেলেছি আর কি কেউ পেরেছো তোমরা আমি পেরেছি, ওই দেখো বাবা মরে পড়ে আছে।

আজ আবার কিস্তিমাৎ হওয়ার পরে, হঠাৎ বিনোদ দাবার বোর্ড ছুড়ে ফেলে, ভাইয়ের জামার কলার ধরলো, হিংস্র ভাবে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো – কি পেলি তুই আমাদের রাজা, আমাদের বাবা কে মেরে ? কেনো করলি তুই এরকম ? কেন গেলি না সেদিন তুই অফিসে বল ?

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো ওয়ার্ড বয় ছুটে এলো ওদের দিকে, আসার সময় একজন এরেকজন কে বলল- এই রে আজ আবার মনে হচ্ছে পাগলা খেপেছে, নিজের ভিসিটারের ওপরেই হামলা করেছে। তাড়াতাড়ি নিয়ে চল আবার শক দিতে হবে বিনোদ কে!

ওয়ার্ড-বয়রা বিনোদ কে ধরে পাগলাগারদের ভিসিটার রুম থেকে ভেতরে নিয়ে গেলো। বিপুল, বিনোদ কে নিয়ে যাওয়ার পর আস্তে-আস্তে বলল- আমায় ক্ষমা করিস ভাই, আমি চেয়েছিলাম তুই নিজের বাকি জীবনটা হাজতে কাটাস, তাই তোর আমার গাড়িতে বোম লাগানোর খবর পেয়ে ইচ্ছে করে নিজে শরীর খারাপের বাহানা করে বাড়িতে থেকে গেলাম। কিন্তু বাবার মৃত্যু তোকে এইখানে এনে দেবে ভাবিনি…

মুখে এক ক্রুর হাসি নিয়ে বিপুল ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত