প্রতিশোধ

প্রতিশোধ

নদীর ধারে দাড়িয়ে আছি। নৌকা ওপারে রয়েছে। ওপার থেকে কেউ এপারে আসলে তবেই পার হয়ে বাড়িতে যেতে পারব। এসেছিলাম আমাদের পাশের গ্রাম বাশবাড়িয়ায়। মাঝে মধ্যেই নদী পার হয়ে এই গ্রামে ঘুরতে আসি।

কখনো প্রয়োজনীয় কাজেও আসি।
আজকে এসেছিলাম ছোটবেলার এক বন্ধুর সাথে
দেখা করতে।
ওর সাথে ১ম শ্রেনী হতে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত
একসাথে লোখাপড়া করেছিলাম।
আজ যখন শুনলাম ও ওর মামাতো ভাইয়ের সাথে তার
খালার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে তখনি চলে
আসলাম।
অবশ্য এসে ওকে পেলাম না।
ওরা দুজন এবং যেই বাড়িতে এসেছে ঐ বাড়ির
একজন মিলে ঘুরতে গেছে ওরা বেলকুচিতে।
ঐ বাড়ির কাকি বলল রাতে ফিরবে ওরা।
দুপুরের পরই বের হয়ে গেছে ঘুরতে।

ওপার থেকে নৌকা ছেড়ে দিয়েছে। ৩/৪ মিনিটের
মধ্যেই আসবে।
এটা একটা ডাল-নদী।
আগে অনেক চওড়া ও গভীর ছিল নাকি এই নদীটা।
বাবার মুখে শুনেছি এই নদীতে জাহাজ স্টীমার ও
চলতো নিয়মিত।
এখন অবশ্য “হুড়াসাগর” নামক এই নদীটা মরা নদী
বললেই চলে।
কারন বর্ষাকাল ছাড়া খুব বেশি পানি থাকেনা এই
নদীতে।

নৌকা মাঝ নদীতে রয়েছে।
এদিকে আমি টেনশনে আছি।
কাউকে দেখছি না এপারে।
কেউ না আসলে তো আমি ওপারে যেতে পারব
না।
কারন আমি নৌকা বাইতে পারি না।
আর এই নৌকার কোন মাঝি ও নাই।
দুইপারের মানুষ মিলেই এই নৌকা কিনে রাখছে।
যদিও এইপারের মানুষের ই বেশি দরকার।
ওপারের মানুষ এপারে আসে কম।
কিন্তু এপারের মানুষগুলোর আমাদের ওপারে
যেতেই হয় প্রতিদিন।
কারন স্কুল, কলেজ, হাট, বাজার সবই ওপারের
এলাকায়।
সেসব জায়গায় যেতে ওপারে গিয়েই যেতে হয়।

হঠাৎ লক্ষ করলাম একটা মেয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে
আছে।
আড়চোখে তাকালাম।
শ্যামলা চেহারার একটা মেয়ে।
কিন্তু মায়াবী সুন্দর চেহারা।
মেয়েটা বুঝতে পেরেছে আমি তাকিয়ে দেখছি
তাকে।
তাই ও অন্য দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে এখন।
আমি একটু খুশি।
কারন এখানকার মেয়েরা নৌকা বাইতে পারে।
এই মেয়েই পার করে দেবে আমায়।
কিন্তু ওর হাতে কয়েকটা বই আর কাধে একটা স্কুল
ব্যাগ।
মনে হয় তামাই কোচিং এ যাবে।

নৌকা এসে পাড়ে ভিড়িয়েছে।
নৌকা থেকে ওপারের যাত্রীরা নামার পর আমি লাফ
দিয়ে উঠে পড়লাম।
আমি নৌকাতে উঠার পরই মেয়েটিও উঠে বসে
পড়লো নৌকার মাঝখানে।
আমি একেবারে নৌকার কিনারায় গিয়ে বসে আছি।
দুজনি চুপচাপ।
আমি তাকিয়ে আছি মেয়েটার দিকে।
কিন্তু ও যে নৌকা বাইবে সেরকম কোন ইঙ্গিত
পাচ্ছি না।
হঠাৎ দেখলাম মেয়েটি আড়চোখে আমার দিকে
তাকাচ্ছে।
আমিও না দেখার ভান করে অন্য দিকে তাকিয়ে
আছি।

-এই যে, আপনি কি মহিলা মানুষ নাকি?
মেয়েটির কথা শুনে আমি আবুলের মতো তাকালাম
ওর দিকে।
এই মেয়েটাই কি এই কথা বলল!
আহ কি মধুমাখা কন্ঠ!
-কি ব্যাপার! বললেন না যে…
আপনি কি পরুষ মানুষ নাকি?
এবার কলারটা একটু ঠিক করে প্রতিবাদী একটা ভাব
নিয়ে বললাম..
-কি মনে হয় ম্যাডাম?
আমি কি পুরুষ না?
-হুম দেখতে পুরুষ হলেও কাজে একটা মহিলা
আপনি।

-মানে? এসব কি বলেন!
-কথা না বলে নৌকা ওপারে নিয়ে নিজেকে পুরুষ
প্রমান করেন।
আমি মেয়েটির কথা শুনে সাহসী পুরুষের ভাব
থেকে বোকারাম পুরষে পরিনত হয়ে গলাম।
-ইয়ে মানে… আমি আসলে…মানে ইয়ে…
-হয়েছে হয়েছে…
আপনি যে পুরুষ না তা বুঝে ফেলেছি।
এই নেন বইগুলা আর ব্যগটা ধরেন।
এই বলে মেয়েটা বই, ব্যাগ আমার কোলে
রেখে বৈঠা হাতে নিলো।

মেয়েটা বৈঠা চালাচ্ছে আর লজ্জালজ্জা ভাব নিয়ে
আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে।
আমি হা করে তাকিয়ে দেখছি মেয়েটাকে।
কি অপরুপ লাগছে বৈঠা হাতে মেয়েটাকে!
মনে হচ্ছে মনপুরা ছবির নায়িকা পরী।
-এই যে মহিলা সাহেব, আপনার মুখটা চাপান।
মুখে উড়ন্ত পোকা ঢুকবে।
এই বলেই হি হি… করে হাসছে মেয়েটা।
কি অদ্ভুত সেই হাসি!!
যেন সত্যি কবিদের আকা এক কল্পনার পরী।
মেয়েটি আবার আমায় বলল…
-আপনি এত্ত বড় একটা জোয়ান ছেলে হইয়া নৌকা
বাইতে পারেন না।

কোন শহরে বাড়ি আপনার?
-আমার বাড়ি রয়নাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই।
-চাপা মারার জায়গা পান না?
বলেন আসল বাড়ি কোথায়?
-সত্যিই রয়নাপাড়া।
-কই আপনাকে তো কোনদিন দেখলাম না।
প্রতিদিন ই তো রয়নাপাড়া স্কুলের ওখান দিয়েই তামাই
হাইস্কুল ও প্রাইমেসিয়া কোচিং এ যাই।
আপনি কি বাড়িতে থাকেন?
নাকি বিদেশ?
-আরে নাহ। আমি বাড়িতেই থাকি।

নৌকা পাড়ে ভিড়েছে।
আমি নেমে মেয়েটার বই আর ব্যাগটা হাতে
দিতেই মেয়েটা আমায় একটা চোরা চোখটিপ
মেরে দিল।নৌকা থেকে নেমে মেয়টা হেটে চলছে।
আমিও ওর পাশাপাশি হাটছি।
মেয়েটা একটু পর পর আড়চোখে আমার দিকে
তাকাচ্ছে আর মুচকি হাসছে।

-আপনার নামটা কি বলবেন? (মেয়েটা)
-তার আগে বলেন ওভাবে চোখটিপ মারলেন
কেন? (আমি)
-কখন চোখটিপ মারলাম?
কি বলেন এসব!
-নৌকা থেকে নামার পর ই তো মারলেন।
– হু মারছি তাতে কি?
দেখলাম আপনি সত্যিই পুরুষের বিপরীত কিনা?
-কি বুঝলেন তবে?
-পুরাই মহিলা আপনি হা হা হা…
-দেখেন আমার কিন্তু রাগ হচ্ছে।
বারবার শুধু আমাকে মহিলা বলে যাচ্ছেন।
-আহহা… মহিলার দেখি লেগে গেছে।
তা নামটা কি আপনার?

-নিলয়ন নিলয় নাম আমার।
নিলয় বলেই ডাকে সবাই।
আপনার নাম কি?
-জান্নাতুল নাঈমা।
জান্নাত বলেই ডাকে সবাই।
তবে বান্ধবীরা আরেকটা নামে ডাকে।
-আপনি কোথায় পড়েন?
-তামাই বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে।
আর এখন যাচ্ছি প্রাইমেসিয়া কোচিং এ।
-কোন ক্লাসে পড়েন?
-ক্লাস টেন। সামনে এসএসসি দেব।
-তা মহিলা কি করেন?
-কাজ করি আমি।

-মানে! পড়াশোনা করেন না?
-না, অনেক আগেই বাদ দিতে হয়েছে।
-বাদ দিলেন কেন?
-পারিবারিক কারনে।
-কি পর্যন্ত পড়েছেন?
-ক্লাস সিক্স।
-ওহ আচ্ছা ভালো তো।
কি কাজ করেন বলা যাবে?
-ক্ষেত খামারে কৃষকের কাজ করি।
-বাহ! এই বয়সেই তো আপনি কৃষক হয়ে
গেলেন।
তা বিয়ে করছেন কি?
-না, আপনাকে করব।
আমার এই কথা শুনে মেয়েটি থমকে দাঁড়ালো!
-কি বললেন? আবার বলেন তো।
-আপনাকে বিয়ে করব।

এই কথা বলেই আমি তাকালাম জান্নাত নামের
মেয়েটির দিকে।
-কি বললি আবার বল। (চোখমুখে রাগের ভাব নিয়ে)
-হুম আপনাকে ভালো লাগছে।
বিয়ে করব যদি রাজি হয়ে যান তো।
একথা বলার সাথে সাথে মেয়েটি ঠাস ঠাস করে
কয়েকটা থাপ্পর লাগিয়ে দিলো আমার গালে!!
থাপ্পরগুলো এতো জোরে মারলো যে রাস্তার
সব লোক এগিয়ে এলো।
আমি অথব্যের মতো গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে আছি
জান্নাত এর দিকে।

ঘটনাটা আমাদের রয়নাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছেই
ঘটেছে।
ওর পাশেই আমার আব্বার মুদির দোকান।
তিনিও দুর থেকে এটা দেখে এগিয়ে এসেছেন।
-কি হইছে নিলয়? (আমার আব্বা)
আমি লজ্জায় আর কষ্টে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি।
-এই ছেলে আপনার কি হয়? (জান্নাত)
-আমার ছেলে।
কেন কি হইছে মা? (আব্বা)
-ওকে একটু ভদ্রতা শিখিয়ে রাস্তায় বেরুতে
দিয়েন।
রাস্তায় মেয়েদের সাথে নোংরামি আচরন যেন না
করে।
এই বলেই মেয়েটি দ্রুতপায়ে ওখান থেকে
চলে গেল।

প্রায় ৩০/৪০ জন লোক জুটে গেছে ওখানে।
সবাই আমাদের গ্রামের লোক।
আমার কাছে সবাই জানতে চাইতেছে কি হইছে
মেয়েটার সাথে?
আমি কষ্টে কথা বলতে পারছি না।
চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পরছে।
গ্রামের যেই মানুষগুলার কাছে আমি ছিলাম একজন
আদর্শ যুবক।
আজ সেইসব লোকের সামনে অপরাধীর মতো
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি।

হঠাৎ আমার আব্বা আমার গালের উপর আরো
কয়েকটা থাপ্পর বসিয়ে দিলো।
তবে থেমে যায়নি…
মারতেই ছিল থাপ্পর আর ঘুসি।
আশেপাশের সবাই আমার বাবাকে ঠেকাচ্ছে কিন্তু
তার পরেও আব্বা আমাকে মারতে আসছে।
আমি এখন ফুপিয়ে কাঁদছি।
হঠাৎ সবাইকে ছাড়িয়ে আব্বা এসে আমার কলার ধরে
সবাইকে বলতেছে…
কেউ ঠেকাবে না বলে দিলাম।
ওকে আজ বাড়িতে নিয়ে ঝুলাবো।
এই বলে আব্বা আমায় নিয়ে বাড়িতে এলো।

মা আমাকে এই অবস্থায় দেখেই দৌড়ে আসলো।
-কি হইছে? ছেলের সাথে এমন করছো
কেনো? (মা)
-বাবা আমায় ছেড়ে দিয়ে একটা লাঠি নিয়ে
আসলো।
মা আমায় জড়িয়ে ধরে আছে।
বাবাকে বলতেছে ওর গায়ে আর একটা আঘাত
করবে না বলে দিলাম।
কাজ হয়নি এই কথায়।
মাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে আমায় লাঠি দিয়ে
আঘাত করতেছে।
আমার কাকারা এগিয়ে এসে আব্বাকে ঠেলে দুরে
নিয়ে গেছে।
তার আগেই আমার মাথায় একটা লাঠির আঘাত লাগে!
আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি!!
আমাকে সাথে সাথে এনায়েতপুর হাসপাতালে নেয়া
হয়।

এরপর ৩ মাস আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে ছিলাম।
কাজ হয়নি।
ডাক্তার জানিয়ে দেয় আমার মাথায় আচমকা জোরে
আঘাত লাগায় ব্রেন এ সমস্যা হয়েছে।
তারা পারেনি আমায় সুস্থ করতে।
অবশেষে Pabna mental hospital এ আমায়
পাঠানো হয়।
৩ বছর হয়ে গেছে।
আমি নাকি এখনো পাগল!
অথচ আমার সবকিছু মনে পড়ে।
কিন্তু কেউ বিশ্বাস ই করতে চায় না আমি ভালো
হয়েছি।

আমার আব্বাটা পৃথিবীর সেরা আব্বা আমার কাছে।
খুব আদরে মানুষ করেছে ছোট থেকে।
আমি ক্লাস সিক্স পাশ করার পর আর্থিক সমস্যার
কারনে পড়াতে পারেনি আমায়।
এরপর আমি বাধ্য হয়ে ১১/১২ বছর বয়স থেকে
কাজে লেগে পড়ি।
কখনো ধান রোপন, কখনো ধান কাটা সহ জমি জমার
কাজ করি।

আমি জানি আমার মতোই ছোট থেকে আমার
আব্বাও তিলে তিলে কষ্ট করে আমায় মানুষ
করেছে।
সারাদিন তাতের কাজ করে এসে কোলে তুলে
নিয়ে আদর করেছে আমায়।
কখনো বুঝতেই দেয়নি অভাব।
নিজেরা ভালো খাবার না খেয়ে, ভালো পোষাক না
পরে আমায় সবই দিয়ে বড় করেছে।

আমার মনে পরে…
এই ঘটনার ১ বছর আগেও আব্বা প্রতিরাতে আমার
রুমে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে গেছে
ঘুমানোর আগে।
এই আব্বাই প্রতিদিন আমায় উপদেশ দিয়েছে…
কোনদিন বড়দের সাথে খারাপ আচরন বা বেয়াদবি
করবা না, এমন কাজ করবা না যাতে আমাদের সম্মান
নষ্ট হয়।
বাবার আদর্শেই বড় হয়েছিলাম।
কিন্তু মাঝখানে একটা কালবৈশাখী ঝড়ে সব
এলোমেলো হয়ে গেল।

সেই আব্বাটা তার পাগল ছেলের হাত, পা ধরে
প্রতিদিন কাঁদে এখন।
ক্ষমা চায় ছেলের কাছে।
এই দৃশ্যটা ছেলের কাছে কতোটা কষ্টের বলে
বোঝানো যায়না।
বাবাকে কতোবার বলেছি যে…
আমি সুস্থ এখন।
আপনার উপর কোন রাগ, অভিমান বা ঘৃনা নাই।
আমার প্রিয় আব্বাই তো আমাকে মেরেছে।
তাতে কি হয়েছে?

এই বলে আব্বাকে জড়িয়ে ধরি আর বলি…
আব্বা আমি ভালো হয়ে গেছি।
দয়া করে আমায় বাড়িতে নিয়ে যান।
মায়ের কাছেও বলেছি এই কথা…
কিন্তু কেউ ই বিশ্বাস করেনা আমি এখন পাগল নয়
ভালো।
তবে একজন বিশ্বাস করে…
সে হলো পাখি…..।পাখি হলো এই হাসপাতালের একজন নার্স।
এই তিনটা বছর সবসময় আমার পাশে থেকেছে পাখি
নামের এই মেয়েটা।
শুধু পাশে থাকা নয়…
আমার সেবা, যত্ন, খাওয়া, গোসল সহ সব কাজেই
সহযোগিতা করে যাচ্ছে এই পাগলিটা।
তাছাড়া এই মেয়েই বোঝে যে আমি আগের
মতোই সুস্থ।

কিন্তু এটা আর কেউ ই বিশ্বাস করেনা।
তাছাড়া পাখি আমার খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেছে।
ও আমায় অনেক ভালোবাসে।
২ দিন পর পাখি আমায় ভ্রমনে নিয়ে যাবে সাতদিনের
জন্য।
অনেক জায়গায় ঘুরবো ওর সাথে।
এ জন্যই আমাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে
এসেছে।
সাথে পাখিও এসেছে।

কতোদিন পর আমি বাড়িতে আসায় সবাই আমাকে
নিয়ে মেতে উঠেছে।
কতো রকমের খাবারের আইটেম করেছে।
আমরা সবাই একসাথে খেতে বসেছি।
আমার পাশে পাখি বসেছে।
পাবনায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নাকি পাখি নিজ হাতে
আমায় খাওয়ায়।
ও মুখে তুলে খাইয়ে না দিলে আমি খাই না।
আজকেও আমাকে পাখি খাইয়ে দিচ্ছে।
মা আর বাবা মিটিমিটি হাসতেছে।

খাওয়ার পর আমি রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
টিভিটা অন করে দেখতে লাগলাম।
হঠাৎ দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো পাখি।
ঢুকেই বলতেছে…
-তুমি আজকে একাই ঘুমাইবা হুম।
আমি তোমার মার কাছে গিয়ে শুই।
-না, তোমাকে ছাড়া আমি ঘুমাতে পারব না।
দরজা আটকে আসো। (আমি)
পাখি হাসতে হাসতে বের হয়ে গেল।

একটুপর আবার ঢুকে পড়ল।
এবার দরজাটা আটকে এসে আমার পাশে বসলো।
-তুমিতো এখন ভালোই হয়ে গেছ।
তবুও পাগলামি করো কেন?
আমি একটা যুবতী মেয়ে।
হাসপাতালে একজন সেবিকা হিসেবে একটা
রোগীর সেবাযত্ন করেছি।
তাছাড়া তখন তুমি মানসিক রোগী ছিলে।
এখন তো তোমার দাবীতে তুমি সুস্থ।
যদিও….
-যদিও কি?
-থাক, তুমি রাগ করবে হয়তো বললে।
-আরে নাহ, বলো তুমি।
রাগ করবো না কথা দিলাম।

-তুমি এখনো মানসীক রোগী।
অনেক কিছুই তুমি ভুল বলো।
অনেক ঘটনাই তোমার মনে নাই।
অনেক কিছুই চিনতে পারো না।
আবার কিছু কিছু আজব কথাও বলো তুমি!
-শেষমেশ তুমিও বললা আমি ভালো হইনি?
আর কি আজব কথা বলি?
-রাগ করোনা তুমি।
তবে হা, তুমি অনেকটাই সুস্থ এখন।
ডাক্তার বলেছে আর কিছুদিন আমি তোমার পাশে
থেকে সেবা করলে তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে
যাবে।

আর তোমাকে নিয়ে ভ্রমনে যাওয়ার প্লানটাও
ডাক্তাররা দিয়েছে।
এতে নাকি তুমি অনেকটাই আগের কথা মনে
করতে পারবে হয়তো।
-আচ্ছা ঠিক আছে।
তবে আমি সুস্থ হলে তুমি আমাকে ফেলে চলে
যাবে না তো?
-হা হা হা… পাগল একটা!
আমি কি চিরদিন তোমার পাশে থাকতে পারব?
আমি তো একজন নার্স হিসেবে তোমার সেবায়
নিয়োজিত আছি।
আমি না চাইলেও চলে যেতে হবে তুমি সুস্থ
হলে।
-না না… আমি কখনোই সুস্থ হবোনা দেখো।
তুমি সারাজীবন আমার পাশে থাকবে কথা দাও।

-হি হি… আজব মানুষ তো তুমি!
আচ্ছা ৩ বছর আগে নৌকায় যেই মেয়েটিকে
দেখেছিলে ওনাকে এনে দেব কি বলো?
-চুপ…. ওর কথা মুখে আনবে না বলে দিলাম।
ওর জন্য আজ আমার এই অবস্থা।
আমি ওকে পেলে চরম প্রতিশোধ নেব এবার।
-পারবে তো নিতে?
কি করবে ওকে পেলে?
-আমি আগে সুস্থ হই তারপর দেখো।
-আচ্ছা সোনা। এইবার একটু ঐদিকে সরে শোও।
আমি শুয়ে পরব।
টুকটাক কথা বলে আমি ঘুমিয়ে গেছি।
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় আমার।
পাশ ফিরে শুতে দেখি পাখি আমায় জড়িয়ে ধরে
আছে।

আমার কেমন যেন লাগছে।
একটা যুবতি মেয়ে আমায় জড়িয়ে ধরে আছে।
আর কেনই বা আমাকে আর ওকে এক বিছানায়
থাকতে দিলো?
তিনটা বছর তো পাখি আমার কাছেই শুয়েছে।
কিন্তু কোন কিছু তো মনে পড়ছে না আমার!
এই প্রথম কি ও আমায় জড়িয়ে ধরলো?
নাকি এখন আমি সুস্থ?
তিন বছর হাসপাতালে কিভাবে থেকেছি তা তো
মনে পড়ছে না!!
ওহ, মাথাটা ঘুরছে আমার।

আমার নড়াচড়ায় পাখি চেতন হইছে।
চোখ মেলে আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসছে
পাখি!
-কি হইছে? এমন করছো কেন?
কিছু খাবে?
পাখির কথা শুনে আমি ওর দিকে চেয়ে আছি।
ও এবার হি হি করে হেসে আমার কপালে একটা চুমু
দিল!
-কিছু খাব না। তবে একটা প্রশ্ন করতে চাই।
-কি প্রশ্ন করবা করো।

-এই তিন বছর কি আমরা একসাথে এক বিছানায় শুয়েছি।
-হা শুয়েছি তো।
কেন কি হইছে?
তুমি তো মানষিক রোগী।
তাই এটাতে আসে যায় না।
এখন তুমি চুপ করে ঘুমাও।
২/১ দিন গেলে সব বুঝতে পারবে।
এই বলে আমাকে আরেকটু জড়িয়ে ধরে পাখি।
একটু পর চোখ বুঝে ফেললো।
আমি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখতেছি পাখিকে।পাখির মায়াবি মুখটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে
কখন ঘুমিয়ে গেছি জানিই না।

ভোরে হালকা পানির ছিটায় চোখ মেলে তাকালাম।
হি হি… করে হাসছে আমার প্রান পাখিটা।
-কি হইছে, হাসছো কেন?
-আমি পানি ছিটিয়ে দেয়ায় চমকে উঠেছো তুমি
তাই….. হি হি হি….
-ওরে পেত্নী এবার দেখাচ্ছি মজা…
এই বলে পাখি কে এক ঝটকায় বুকের উপর
টেনে নিলাম।
দুটো মুখ খুব কাছাকাছি এখন।
দুজনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে।
-এই ছেড়ে দাও, ভাল হচ্ছেনা কিন্তু।
আমি তো তোমার প্রেমিকা বা বউ না।
তবে এমন করো কেন?
-তুমি আমার সব কিছুই।

প্রেমিকা, বউ, লাড্ডু, চমচম… তুমি আমার সবকিছুই… হা
হা হা…
-যাহ… বললেই হলো?
তুমি অনেকটাই সুস্থ এখন।
এই তিন বছর তোমার চোখে বা ইশারায়, আচরনে
কোন পুরুষের ভাব দেখিনি।
কিন্তু গতকাল হতে মনে হচ্ছে তুমি এখন আমার
প্রতি দুর্বল।
এখন সময় হয়েছে তোমার থেকে আমার দুরে
চলে যাওয়ার।
পাখির এই কথা শুনে আমি ওকে ছেড়ে দিয়েছি।
এক নিমিষে আমার হাসিখুশি মুখটা মলিন হয়ে গেছে।
বুকের বাম পাশে ব্যথা অনুভুত হচ্ছে।

-তুমি সত্যিই আমায় ফেলে চলে যাবে?
-যেতে তো হবেই এক সময়।
-থাকা যায় না আমার হয়ে?
-যদি থাকি রাখবে তো?
-হুম রাখব।
বউ করে রাখবো তোমায়।
৭ দিনের জন্য বের হয়েছি আমি আর পাখি।
এই সাতদিন অনেক জায়গায় ঘুরব আমরা।
তবে শুধু আমরা দুজনি যাচ্ছি না।
পাবনা পাগলা গারদের আরো কয়েকজন রোগী ও
ডাক্তার মিলেই যাওয়া হচ্ছে।

গাড়ী শো শো করে যমুনা সেতুর উপর দিয়ে
যাচ্ছে।
আমি তাকিয়ে দেখতেছি সেতুর নিচের
দৃশ্যগুলো।
কোথাও কোথাও পানি নাই নদীতে।
মানুষেরা বাড়িঘর করে রয়েছে সেখানে।
এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ সামনের দিকে
তাকিয়ে আমি চিৎকার করে উঠলাম!

ভয়ে আমার শরীর এখনো কাঁপতেছে!
পাখি আমায় জড়িয়ে ধরে বলতেছে কিছু হয়নি
চেয়ে দেখ।
আমাদের গাড়ীতে থাকা ডাক্তার এবং ডাক্তারনিও
সামনের সিট থেকে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে
বলতেছে… চোখ খুলে সামনে তাকাও নিলয়।
আমাদের গাড়ী তো এক্সিডেন্ট হয়নি।
তুমি ভুল দেখেছো।

আমি ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে তাকালাম।
হা ঠিকই তো, গাড়ি আগের মতোই চলতেছে।
তবে আমি যে দেখলাম…!!
ওহ… মাথাটা আবার ধরেছে।
মনে হচ্ছে মাথার ভিতর লাঠি দিয়ে কেউ আঘাত
করতেছে।
পাখি বুঝতে পেরে আমার মাথাটা তার ঘাড়ের উপর
রেখে শুয়ে থাকার মতো করে দিয়েছে।
মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছে এই মেয়েটা।
রাত প্রায় ৯ টার দিকে সিলেট পৌছলাম।
একটা উন্নত হোটেলের সামনে গাড়ি থামাতে বলল
ডাক্তার।
বুঝলাম আগে থেকেই এই হোটেল ঠিক করা
ছিলো।

কয়েকটা রুম নেয়া হলো।
আমি আর পাখি একটা রুমে ঢুকলাম।
বেশ গোছানো রুমটা।
সবাই হাতমুখ ধুয়ে গল্প করতেছে।
আমি শুয়ে আছি আর পাখি বাথরুমে।
ঠিক তখনি একটা মেয়ে বাইরে থেকে বলল
আসতে পারি স্যার..?
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম আসুন।
দেখি একটা মধ্য বয়সী মহিলা খাবার নিয়ে
এসেছে।

খাবার রেখে বলল পানি এনে দিয়ে যাচ্ছি,
খেয়ে নেন আপনারা।
মেয়েটি চলে যেতেই পাখি বের হলো বাথরুম
থেকে।
-ওহ খাবার এসে গেছে?
নাও ওঠো, খেয়ে নেই। (পাখি)
টেবিলে বসে পড়লাম।
মেয়েটি আবার এসে জগ আর গ্লাস রেখে
গেল।
আর বলে গেল কিছু লাগলে বলবেন স্যার।
আমরা বাইরে আছি।

খাওয়ার পর শুয়ে পড়লাম।
ঐদিকে পাখিকে ডেকে নিয়ে ডাক্তার ও তার বউ কি
যেন বলল ওকে।
একটুপর দরজা আটকে পাখি এসে শুয়ে পড়লো
আমার পাশে।
-ওষুধ খাইছো? (পাখি)
-না খাইনি। (আমি)
-ওঠো তাহলে, ওষুধ খেয়ে শুবে এসো।
এই বলে আমায় টেনে তুললো পাখি।
নিজ হাতে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে আবার শুইয়ে দিলো।

চুপ করে শুয়ে আছি।
পাখি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে যথারীতি।
বড়ই অদ্ভুত লাগে সবকিছুই!!
এই পাখি মেয়েটা কে?
কেনই বা ও আমার এত কাছে থাকে স্বামী
স্ত্রীর মতোই।
আর আমিই বা কেন ওকে এতোটা কাছে রাখি?!
আমার তো গত তিন বছরের কিছুই মনে পড়েনা।

এই মেয়েটা কি শুধুই নার্স?
নাকি আমার আপন কেউ?
কোন নার্স কি এইভাবে একটা পুরুষ রোগীর
সাথে এক বিছানায় থাকতে পারে?!
এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যাচ্ছি।
পাখি আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে গেছে।
হঠাৎ মনে হলো একটা মেয়ে দরজার ওখানে
দাড়িয়ে হাসছে!!
চোখটা ওদিকে দিতেই আমার গলা শুকিয়ে গেল।
হা, ও তো সেই জান্নাত নামের মেয়েটা।
নৌকায় যে আমাকে পার করে দিয়েছিল।
যার কারনে তিনটা বছর আমি পাগলা গারদে আছি পাগল
হয়ে।

কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব?
দরজা তো ভিতর থেকে আটকানো!
আর এই সিলেটেই বা এই মেয়ে আসবে কি
করে?!
আমার শরীর কাঁপছে ভয়ে!
হাতটা কোনরকমে পাখির দেহে রেখে ধাক্কা
দিলাম।
চোখটা দরজার দিকেই রয়েছে আমার।
পাখিকে আমি জাপটে ধরে ওকে জাগাতে
চাইতেছি।

মুখে কোন ভাষা নাই আমার ভয়ে।
হঠাৎ পাখি বলল কি হলো তোমার?
আর এটা বলার সাথে সাথেই দরজার কাছে দাঁড়ানো
মেয়েটি ওখানে পড়ে গেল!!কি হইছে এমন করো কেন?
এই বলে পাখি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে
ধরেছে।
আমি হাত ইশারায় দরজায় তাকাতে বললাম পাখি কে।
দরজায় তাকিয়ে পাখি বলল কই ওখানে কিছু তো নাই।
পাখির কথায় আমি অবাক হয়ে তাকালাম দরজার নিচের
দিকে।
সত্যিই তো কিছুই নাই ওখানে!
কিন্তু একটু আগেই তো জান্নাত নামের সেই
মেয়েটি ওখানে পড়ে গেল।

তবে কি ওইটা কোন ভুত/পেতননি?
ভাবতেই আমার শরীরে কাটা দিয়ে উঠলো।
আমি ভয়ে চুপসে গিয়ে পাখির বুকে মাথা লুকিয়ে
চোখ বুঝে রইলাম।
পাখিও আমার অবস্থা বুঝে আমাকে বুকে জড়িয়ে
মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর বলছে…
-কিছুই নেই ওখানে।
তুমি হয়তো স্বপ্নে কিছু দেখেছো।
সব ঠিক হয়ে যাবে।
আর সারারাত আমাকে এইভাবেই জড়িয়ে ধরে
ঘুমাবে।
তাই আর স্বপ্নে আজেবাজে কিছু দেখবে না।

ভোরে কপালে কিছুর স্পর্শে ঘুম ভেঙ্গে
গেল।
দেখি পাখি আমার কপালে একটা আলতো চুমু দিয়ে
খিলখিল করে হাসছে।
আমি হাত দুটো বাড়িয়ে ওকে বুকের দিকে
টেনে নিতেই ও বলে উঠলো…
-এই যে মশাই, আগে বাসি মুখটা ধুয়ে নাও বিছানা
থেকে উঠে।
এই বলে আমাকে ছাড়িয়ে ও বাইরে চলে গেল।

আমি বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে ঢুকে হাত-মুখ
ধুয়ে বের হলাম।
দেখি এর মধ্যেই পাখি সুন্দর ম্যাচিং করে শাড়ি-ব্লাউজ
পড়ে নিয়েছে।
আয়নার সামনে দাড়িয়ে ও সাজগোজে ব্যস্ত।
কি অপরুপ লাগছে পাখিকে!
যা ভাষায় প্রকাশ করার নয়।
আমি এক নয়নে তাকিয়ে দেখছি পাখি কে।
-এই এমন ভাবে তাকিয়ে কি দেখ?
-আমার বউকে দেখি।
-ইশশ সখ কতো…!!
টেবিলে আসো, খেয়ে নেই আগে।
তারপর আমরা বের হবো শাহজালাল মাজারের
উদ্দেশ্যে।

খাওয়ার পর বিছানায় বসে আছি।
পাখি এসে বলল চলো বের হয়েছে সবাই।
আমি পাখির হাতটা ধরে টেনে কাছে বসালাম।
ওর গালদুটো ধরে চোখে চোখ রেখে
তাকিয়ে আছি।
আমার চাহনি বুঝতে পেরে পাখি বলতেছে..
-এই বাইরে সবাই অপেক্ষার করছে আমাদের
জন্য।
এমন সময় বাইরে থেকে কেউ যেন ডাক
দিলো।
বের হলাম ঐ হোটেল থেকে বিদায় নিয়ে।

শাহজালাল মাজারে ঢুকতেই কেমন যেন চেনাচেনা
মনে হলো।
আমি কি কোনদিন এসেছি এখানে?!
হাবলুর মতো দাঁড়িয়ে আছি আমি।
হঠাৎ হাতটা টান দিলো কেউ।
-এই আসো তো।
এই বলেই পাখি আমায় নিয়ে ভিতরে ঢুকলো।
মসজিদের উপর হাজার হাজার কবুতর রয়েছে।
অদ্ভুত ব্যপার হলো এতো কবুতর থাকা সত্বেও
ওখানে কোন ময়লা নাই।
পাখি বলল এগুলোই হলো জানালি কবুতর।
আরেকটু এগিয়ে যেতেই একটা মাঝারি পুকুরের
মতো দেখতে পেলাম।
তার চারপাশে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে কি যেন
দেখতেছে।

আমরাও এগিয়ে গিয়ে দেখতে লাগলাম।
পুকুরটিতে অনেক বড় বড় গজার মাছ।
এখানেও অদ্বুত একটা ব্যাপার হলো…
অনেকেই এই মাছগুলোকে খাবার দিতেছে।
যেমন বিস্কুট, পাউরুটি এই জাতীয় খাদ্য।
কিন্তু কারো দেয়া খাবার দেয়ার সাথে সাথেই
কারাকারি করে খাচ্ছে মাছগুলো।
আবার কারো দেয়া খাবার ভেসে বেড়াচ্ছে কিন্তু
কোন মাছ ই স্পর্শ করছে না।
ওখান থেকে আরেকটু এগোতেই দেখি
সাইনবোর্ডে লেখা “গজার মাছের কবর”।
আরেকটু পর দেখলাম “সোনার কই” নামক মাছের
কুয়া।

সবশেষে মাজারের দিকে গেলাম।
মাজারের পাশেই বিশাল কবরস্থানের গেইট।
আমি একটু এগিয়ে গিয়ে গেইটে ঢুকলাম।
ভিতরে তাকিয়ে দেখি একজন মস্ত বড় মোছওয়ালা
জল্লাদের মতো লোক বন্ধুক হাতে দাঁড়িয়ে
আছে।
পাখি আবার আমায় টান দিয়ে বলল…
-এটা হলো নায়ক “শালমান শাহ” এর কবর।
আমি অবাক চোখে তাকালাম কবরটার দিকে!
-এই পাখি, এই কবর আমি আগেও দেখেছি। (আমি)
-কবে দেখেছো?
তুমি কি এর আগে সিলেটে এসেছো?
-না তো, এর আগে আসিনি।

-হা হা হা তবে দেখলে কি করে?
-জানিনা। তবেই সত্যিই আমি দেখেছি এটা। আমার খুব
খেয়াল হচ্ছে।
-আচ্ছা ঠিকাছে দেখেছো।
এইবার মাজারে চলো।
মাজার জিয়ারত শেষে বের হয়ে গাড়িতে উঠলাম।
-মাথাটা কেমন জানি ঘুরতেছে।
আমি তো সিলেট কখনো আসিনি।
তবে ঐ কবরটা তো আমি সত্যিই দেখেছি।
-নাহ এমন হচ্ছে কেন?
তবে কি আমি আসলেই এখনো মানষিক রোগী?

মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে পাখি।
ডাক্তার বলতেছে নিলয়কে একটু পানি খেতে
দাও পাখি।
এই নাও বোতল।
বোতলটা হাতে নিয়ে আমার কানের কাছে বলল..
পানি খাও একটু।
আমি চোখ খুলে পানির বোতল হাতে নিয়ে পানি
খেলাম।
সামনের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভার এর গাড়ি চালানো
দেখতেছি এক মনে।
হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম।

হাসপাতালে শুয়ে আছি আমি।
আমার সামনে অনেক মানুষ।
কাউকেই চিনতে পারছি না!
-আমি এখানে কেনো?
আপনারা কে?
আমার কথায় সবাই যেন অবাক হয়ে গেল!
আমার মাথার কাছে একটা মেয়ে মাথায় হাত দিয়ে
বসে ছিলো।
সে বলতেছে…
-কি বলো এসব?!
আমাদের চিনতে পারছো না? (মেয়েটি)
-না তো।
আপনারা কারা? আর আমিই বা কোথায় আছি এখন?
-আমি পাখি।
তিন বছর ধরে তোমার সেবা করে যাচ্ছি।
তুমি মানষিক রোগী হয়ে তিন বছর হলো পাবনা
পাগলা গারদে আছো।

-আমি এখন কোন জায়গায় আছি?
আমার বাবা, মা কই?
-তোমাকে নিয়ে আমরা সাতদিনের ভ্রমনে
এসেছি। (মেয়েটা)
-তুমি অনেকটা সুস্থ হয়েছিলে। তবে অনেক
কিছুই উল্টাপাল্টা বলতে।
তাই তোমার আগের সব মনে করানোর জন্য এই
ভ্রমনের ব্যবস্থা।
এই প্লান আমরা সব ডাক্তার মিলেই করেছি।
মনে হচ্ছে আমরা সফল ই হচ্ছি এ ক্ষেত্রে।
এই কথাগুলো একটা লোক বলতে বলতে আমার
সামনে এলো।

মনে হয় ইনি বড় কোন ডাক্তার।
উনার সাথে আরো একজন মহিলাও বলতেছে… হা
তোমার চিকিৎসার পাশাপাশি এই ভ্রমনটাও চিকিৎসা
হিসেবে ধরা যায়।
-ভ্রমনে এসে এখানে কেন আমরা একটু
বলবেন? (আমি)
-এটা সিলেটের একটা হাসপাতাল।
শাহজাহাল মাজার ঘুরে জাফলংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা
দিয়েছিলাম।
কিন্তু মাঝপথে তুমি চিৎকার করে বেহুশ হয়ে যাও।
এ জন্যই তোমাকে নিয়ে আমরা এখানে এসেছি।
তবে তুমি সুস্থই আছো।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আবার গাড়ি চলছে।
আমার পাশে সেই পাখি নামের অপরিচিত মেয়েটি
রয়েছে গা ঘেসে বসে।
কেমন জানি লাগছে আমার।
এদের কাউকেই আমি চিনি না।
অথচ মেয়েটি বলতেছে তিন বছর নাকি আমি তার
সাথেই ছিলাম।
সে নাকি সবসময় আমার সাথে থাকে।
কিন্তু এসব তো আমার কিছুই মনে পরছে না!

জাফলং এ ঢুকে পড়েছে গাড়ি।
সন্ধ্যা হলেও দুর থেকেই সেই দেখার মতো
দৃশ্যটি আবার চোখে পড়লো।
আবার বলছি এ কারনেই, কয়েক বছর আগেও আমি
এখানে এসেছিলাম।
এখানে আসলে পাহাড়ের গায়ের ঐ ঝর্না দেখে
যে কেউ অবাক হয়ে যাবে।
কারন এই ঝর্না দেখলে মনে হয় আকাশ থেকে
সরাসরি ঝর্না নিচের দিকে নামতেছে।
যারা জাফলং চা বাগান দেখতে গিয়েছিলেন তারা
হয়তো বুঝবেন।

অন্যদের বলে বুঝানো সম্ভব না এই সুন্দর একটা
দৃশ্যের কথা।
এসব ভাবতেছি পাহাড়ের ঝর্নার দিকে চেয়ে।
হঠাৎ মনে হলো পাশের মেয়েটি আমার মাথায় হাত
বুলাচ্ছে।
অবাক চোখে তাকালাম মেয়েটির দিকে!
মেয়েটি খিলখিল করে হাসছে আর বলতেছে…
-এখানে কখনো এসেছো?
-হা, কয়েক বছর আগেই তো এসেছিলাম।
-এখানে এসেছো অথচ শাহজালাল মাজারে যাওনি
তুমি?

-কে বলেছে যাইনি? গিয়েছিলাম তো।
সেই ভ্রমনে সিলেট শাহজালাল, শাহপরান, জাফলং,
রাঙামাটি, কক্সবাজার এসব জায়গায় গিয়েছিলাম।
-হা হা হা… তবে শাহজালাল মাজারে গিয়ে তো
বললে এখানে এর আগে আসোনি।
-কখন বললাম? আজব তো!
আর কখন ই বা শাহজালাল মাজারে গেলাম আজকে?
-হা হা হা…তুমি সত্যিই পাগল।
এই বলে মেয়েটা আমার ঘাড়ে মাথা রেখে
হাসছে!
কি বেহায়া মেয়ে একটা!ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিলো।
সবাই নেমে গিয়ে হোটেল খুঁজতে লাগলাম।

আমরা যে কয়জন এখানে এসেছি তার মধ্যে আমিই
শুধু একবার এই জাফলংয়ে এসেছিলাম এর আগে।
তাই আমার একটু চেনাজানা আছে কোথায়
হোটেল বা কোথায় কি?
সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললাম…
-এইদিকে আসেন সবাই আমার সাথে।
সামনেই ভালো হোটেল আছে।
-তুমি কি এর আগে এখানে এসেছিলে? (ডাক্তার)
-হা, কয়েক বছর আগে এসেছিলাম।
-ও, তাহলে তো ভালোই হলো।
কোথায় কি আছে তুমিই ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে।
একটা হোটেল ঠিক করা হলো।
তবে এখানে খাবারের ব্যবস্থা নেই।
আমাকে নিয়ে ডাক্তার বের হলেন খাবারের
ব্যবস্থা করার জন্য।

একটা বিরিয়ানির রেস্টুরেন্ট এ ঢুকে বিরিয়ানীর
কয়েকটা প্যাকেট করে নিয়ে আসলাম।
এইদিকে হোটেলে এসেই আমি টাস্কি খেয়ে
গেলাম!
আমাকে ঐ পাখি নামের মেয়েটার সাথে নাকি একই
রুমে থাকতে হবে!
এটা কিভাবে সম্ভব?
আমি রুমে ঢুকে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।
শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে।
-এই শুয়ে পড়লে কেনো?
ওঠো, হাতমুখ ধুয়ে এসে খেয়ে নাও আগে।
এই বলে পাখি বাথরুমে ঢুকে গেলো।

আমি মনে মনে ভাবতেছি…
কি আজব মেয়েরে বাবা!!
চেনাজানা নাই অথচ ঘরের বউয়ের মতো কথা
বলতেছে।
ও বাথরুম থেকে বের হলে আমিও গিয়ে হাতমুখ
ধুয়ে আসলাম।
দুজন একসাথে বসে খেয়ে নিলাম।

বিছানায় শুয়ে তাকিয়ে আছি পাখি নামের মেয়েটার
দিকে।
ও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে।
শাড়ীতে মেয়েটাকে সত্যিই অপূর্ব লাগছে!
এমন একটা সুন্দরী মেয়ে আমার সাথে একই
রুমে, একই বিছানায় শুয়ে থাকবে ভাবতেই কেমন
জানি লাগছে।
একটুপর মেয়েটি খাটের দিকে তাকালো।
আমি লক্ষ করে ঘুমের ভান করে চোখ বুঝে
রইলাম।

একটুপর আড়চোখে তাকালাম।
মেয়েটা এগিয়ে আসছে খাটের দিকে।
আমার বুকের ভিতর ধুকধুকানি বেড়ে গেছে।
আমার পাশে শুয়েই আমার মাথায় হাত রাখলো পাখি।
মেয়েটার বদ অভ্যাস নাকি এটা?
আমার কাছে আসলেই মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
অবশ্য ভালোই লাগে আমার।
কিন্তু একটু পরই আমি চমকে গেলাম!
মেয়েটার অপরদিকে মুখ করে শুয়ে আছি।
হঠাৎ একটা হাত আমার শরীরের উপর দিয়ে
মেয়েটা জড়িয়ে ধরলো আমায়।
আমার কেমন জানি দম বন্ধ হয়ে আসছে।
এমন একটা যুবতী মেয়ে একটা যুবক ছেলেকে
জড়িয়ে ধরলে তার অবস্থা কি হয় বুঝতেই
পারছেন।
তবুও চুপ করে ঘুমের ভান করে শুয়ে রইলাম।

-এই, এইদিকে ঘুরে আমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমাও।
নইলে আজেবাজে স্বপ্ন দেখবে।
মেয়েটার কথায় বুঝলাম যে ও বুঝতে পেরেছে
যে আমি ঘুমাইনি।
মাথাটা ঘুরিয়ে মেয়েটাকে বললাম…
-আপনার কি লজ্জা-শরম নাই?
একটা যুবক ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে বলছেন।
আমার কথা শুনে মেয়েটি হো হো করে
হাসছে

-এই তিনটা বছর কোথায় ছিলো এমন কথা?
একটা রাত ও তো আমায় জড়িয়ে না ধরে ঘুমাতে না।
একদিন তোমার কাছে না শুইলে তো পাগলামি ২০%
থেকে ১০০% হয়ে যেত।
এখন আবার লাজুক পুরুষ সাজা হচ্ছে…ঢং দেখে
বাঁচিনা…হা হা হা
এসব বলে হাসতে হাসতে মেয়েটা হুট করে
আমার গালে একটা আলতো চুমা দিলো।
আমি শিউরে উঠলাম।
মেয়েটা খিলখিল করে হেসেই চলেছে।
দেখে মনে হচ্ছে এই মেয়েও কোন মানসিক
রোগী।

-এই, আপনি কি আমার বউ নাকি যে এভাবে থাকেন
আমার সাথে?
-সময় হলেই বুঝবে আমি কে।
এখন চুপ করে আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাও।
ভোরে উঠেই একটা রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে নাস্তা
করে বের হলাম ঘুরতে।
চা বাগানে ঢুকেই পাখি নামের মেয়েটা যেন সত্যিই
পাখি হয়ে গেল।
এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে এদিক ঘুরছে
আর দেখছে।

এই সুযোগে আমি ডাক্তারের দিকে গেলাম।
আমাকে দেখেই বলল…
-কিছু বলবে নিলয়??
-আচ্ছা পাখি মেয়েটাও কি মানসিক রোগী?
আমার কথা শুনে ডাক্তার হাসতেছে…
-ও রোগী না। তবে ভাবতে পারো এই
মেয়ের জন্যই আজ তুমি সুস্থ প্রায়।
তুমি আগের সব মনে করতে পারছো এখন।
শুধু একটা ঘটনা এখনো তোমার মনে পড়েনি।
তবে এই কয়দিন ঘুরে বাসায় ফেরার আগেই তুমি
সম্পূর্ণ সুস্থ হবে ইনশা-আল্লাহ।

আর পাখি নামের মেয়েটা তোমার কে তাও
বুঝতে পারবে বা জানতে পারবে।
তবে মেয়েটাকে কোন খারাপ বা অপমানজনক কথা
বলো না।
এই মেয়ে তোমার জন্য যা করেছে তা করার
মতো মানুষ পৃথিবীতে আছে কিনা সন্দেহ।
থাকলেও খুব কম আছে।
চা বাগান ঘুরে এবার সেই ঝর্না দেখতে যাচ্ছি।
যদিও ওটা খুব কাছে গিয়ে দেখার কোন সিস্টেম
নাই।
এর আগেরবার যখন এসেছিলাম তখন ঐ ঝর্না কাছ
থেকে দেখার জন্য ভারতে ঢুকে পড়েছিলাম।
একটুর জন্য ধরা পড়িনাই।

এখানকার আমাদের দেশীয় এক চাচার কল্যানে
বেঁচে গিয়েছিলাম।
নইলে সরাসরি গুলি খেতে হতো।
অথবা ধরে নিয়ে জেলে ভরতো আমাদের ৪
জন ছেলেকে।
ঝর্না দেখার পর ডাক্তারনী বলতেছে…
-আর কি কি আছে দেখার মতো এখানে?
-ঝুলন্ত ব্রীজ, পার্ক এসব আছে। (আমি)
চলুন আমার সাথে।
এই বলে হাটতে লাগলাম।

একটা নদীর ডাল পার হয়ে ঐ পার্কে যেতে হয়।
নৌকা ডেকে সবাই উঠে পড়লাম।
পাখি আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
বুঝলাম নৌকায় চড়ার অভ্যাস নাই।
নৌকার কথা মনে হতেই আমার মাথাটা ঘুরে গেলো
আচমকা!
আমার মাথার ভিতর কি জানি মনে পড়েও পড়ছে না।
মাথাটা বড্ড বেশি ব্যথা করছে।
ব্যপারটা ডাক্তার লক্ষ করে এগিয়ে আসলো আমার
দিকে।
পানির বোতলটা হাতে দিলো।
দুইটা ঢোক গিলে চেয়ে আছি মাঝির দিকে।
কি যেন মনের ভিতর উকি দিচ্ছে এই নৌকা আর বৈঠা
দেখে।

নৌকা হতে নেমেই সবাই খুব খুশি।
সবাই ভাবতেই পারেনি এই নদীর পর এমন একটা
জায়গায় এমন সুন্দর পার্ক থাকতে পারে।
এই পার্ক টা হলো বাংলাদেশেরর শেষ সীমানায়।
উচু পাহাড়ের নিচেই এই পার্ক।
পাহাড়টাই হলো ভারত এর অংশ।
এই পাহাড়ের কিনারে বসে ভারতের কিছু ছেলেরা
ছিপ দিয়ে মাছ ধরছে আমাদের বাংলাদেশের
নদীতে।
অসাধারন একটা দৃশ্য এখানে।
দুই দেশেরি প্রশাসন এখানে পাহারা দিচ্ছে।
পার্কটায় অনেকক্ষন ঘোরার পর আবার নৌকায়
উঠলাম।

ঝুলন্ত ব্রিজ এর নিচে চলে গেলাম।
এই ব্রিজটার মাঝখানে কোন পিলার নাই।
এক প্রান্ত আমাদের বাংলাদেশে ব্রিজের অন্য
প্রান্ত ভারতে।
আর ওখান থেকে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের ফাঁকে
ফাঁকে দারুন সব বিল্ডিং ভারতে।
পাহাড়ের বুকে এমন দৃশ্য যারা নিজ চোখে
দেখেছে তারাই কেবল বুঝবে।
নৌকা পাড়ে ভিড়েছে।
বৈঠা হাতে মাঝিকে দেখেই আমার মুখ দিয়ে একটা
নাম বের হলো…
-জান্নাত কোথায়?
আমার কথায় যেন সবাই চমকে গেল!
ডাক্তার আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল..
-জান্নাত কার নাম? হঠাৎ করে এই নাম বললে যে!
-জানিনা, এর বেশি মনেও পরছে না।

তবে বৈঠা হাতে একটা মেয়ে আমার দিকে চেয়ে
লজ্জারাঙ্গা মুখে হাসছে।
ওর নাম তো জান্নাত…!!নৌকা থেকে নেমে হোটেলের দিকে যাচ্ছি।
খেয়াল করলাম পাখি আর ডাক্তার কি যেন বলছে আর
মুচকি হাসছে আমার দিকে চেয়ে।
আমার একটুও ভালো লাগছে না।
কখন বাড়িতে যাব, কখন দেখব মা, বাবাকে।
হোটেলে ফিরে একটু বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।
একটুপরই পাখি এসে সরাসরি আমার বুকের উপর মাথা
রেখে শুয়ে পড়লো।

-এই মেয়ে তুমি কি আমার বউ?
-হ বউ ই তো…হা হা হা…
মেয়েটা হাসছে খিলখিল করে।
-ওর হাসি দেখে মেজাজটা আমার চরম বিগড়ে
গেল।
কিছু না ভেবে মেয়েটার গালে ঠাস করে একটা
থাপ্পর লাগিয়ে দিলাম!
দেয়ার সাথে সাথে মেয়েটি লাফিয়ে উঠে গালে
হাত দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে!
হাতটা পুড়ে যাচ্ছে আমার।
খুব জোরে মেরেছি থাপ্পরটা।
আড়চোখে পাখির দিকে তাকালাম।
ওর দিকে তাকাতেই বুকের ভিতরটা ধুক করে
উঠলো।

একি…! মেয়েটার চোখ দিয়ে টুপটুপ করে জল
গড়িয়ে পড়ছে!
আমি কি করব বুঝতে পারছি না।
একটু ওর দিকে এগিয়ে যেতেই ও চোখ মুছে
খাট থেকে নেমে গেল।
আমার নিজেকে কেমন জানি অপরাধী মনে
হচ্ছে।
এই অচেনা মেয়েটিই নাকি তিন বছর আমার পাশে
থেকে আমার সেবাযত্ন করেছে।
আর আমি কিনা তাকেই….!!
ভাবতেই বুকের ভিতরে এক অজানা কষ্ট সাড়া
দিলো।

হোটেল থেকে বের হয়ে আমরা আবার
গাড়িতে উঠলাম।
এবার যাচ্ছি সরাসরি কক্সবাজার।
ওখানে আর ২ দিন থেকেই চলে যাব বাড়িতে।
বাড়িতে যাওয়ার জন্য মনটা খুব ছটফট করছে।
কক্সবাজার গেলেই বাঁচি।
কারন ওখানে থাকলে এই দুইটা দিন আনন্দেই
কেটে যাবে।
কারন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গেলে আমার আর
সেখান থেকে আসতে মন চায় না।
বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর জায়গা এটা।

গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি বাইরের দিকে।
হঠাৎ চোখ ঘুরিয়ে পাশে বসা পাখির দিকে তাকালাম।
মেয়েটার গাল টকটকে লাল হয়ে আছে।
মনটা ভার করে বসে আছে পাখি।
ওকে দেখে কেমন জানি মায়া হচ্ছে আমার।
এই মেয়েটাই তো কতো হাসিখুশি ভাবে ছিলো
আমার পাশে।
এখন তার মুখে আমাবস্যার রাতের ছাপ।
সিটের উপর ওর একটা হাত রাখা ছিলো।
আমি হাতটা সিটে রাখতেই ওর হাতের উপর পড়লো
হাতটা।

ও একটু নড়েচড়ে বসলেও হাতটা ওভাবেই
রেখেছে।
অন্য দিকে তাকিয়ে থাকলেও ও আমার দিকে
আড়চোখে তাকাচ্ছে।
আমি হাতটা ওর হাতের উপর চেপে ধরেছি।
এটা করার উদ্দেশ্য হলো ওর হাসিমাখা বদনখানা
ফিরিয়ে আনা।
আমরা যেহেতু পেছনের সিটে তাই সবাই
আমাদের কোনকিছু দেখতে বা বুঝতে পারবে
না।

তাছাড়া গাড়ির সকলেই প্রায় ঘুমে ঝিমুচ্ছে।
এদিকে ওদিক দেখে পাখিকে অবাক করে দিয়ে
ওর লাল হওয়া গালে একটা ছোট্ট চুমু দিয়ে আবার
স্বাভাবিক হয়ে বসলাম।
মনে মনে হাসছি আমি…
একটুপর ওর দিকে তাকালাম সরাসরি।
এখনো ফুলে আছে পাখিটা।
আমি কেমন জানি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি মেয়েটার উপর।
কে এই মেয়ে?
কেনই বা ও আমায় এতো ভালোবাসে, এতো
কাছে রাখে?
কেনই বা ওকে দেখে এতো মায়া হচ্ছে আমার?

রাত প্রায় ১০ টার দিকে কক্সবাজার পৌছলাম।
ডাক্তার সাহেব ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললেন।
আমার দিকে চোখ ঘুরিয়ে বললেন…
-কোথায় হোটেল নেয়া যায় নিলয়?
তুমি তো এর আগেও নাকি এসেছিলে এখানে।
চেনাজানা আছে কি কোন ভালো হোটেল।
-হা, কলাবাগান যেতে বলেন ড্রাইভারকে।
৫ মিনিটের মধ্যে কলাবাগান পৌছলাম।

ওখানে ভালো একটা হোটেলে উঠলাম।
পাখি আমার আগেই রুমে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে
হাতমুখ ধুয়ে এসে শুয়ে পড়লো।
আমার কেমন জানি অস্থির লাগছে।
গোসল করলে ভালো লাগবে।
বাথরুমে ঢুকে গোসলটা সেরে রুমে ঢুকতেই
কেমন জানি মাথার ভিতর ঘুরে উঠলো!
ওখানেই ধাপ করে বসার মতো করে পড়ে
গেলাম।
আমার ভিতরে কেমন জানি লাগতেছে।

কি যেন মনে হতে গিয়েই হচ্ছেনা।
শুধু ঐ জান্নাত নামের মেয়েটার মুখ ভেসে
উঠছে আমার সামনে!
আমি রুমের মেঝেতে পড়ে আছি।
পাখি ঐদিকে মুখ করে শুয়ে আছে।
হঠাৎ দেখি জান্নাত আমার সামনে একটা সাদা কাপড়
পড়ে দাঁড়িয়ে হাসছে!
আমি ভয়ে চুপসে গেছি!
এ কি দেখি আমি!!
এরপর কি হইছে আমার মনে নাই।

তবে রাত একটার দিকে আমি চেতন পাই।
দেখি পাখি আমাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে।
আমি নড়ে উঠতেই পাখি আমার চোখের দিকে
তাকালো।
-কি হইছিলো তোমার?
ওমন করে মেঝেতে পড়েছিলে কেনো?
(পাখি)
-জান্নাত এসেছিলো আমার সামনে। (আমি)
-জান্নাত কে?
ওর সাথে তোমার কি সম্পর্ক ছিলো?
-জানিনা, কিছুই মনে পড়ছেনা আমার।
তবে ওর চেহারা আমার সামনে ভাসে।
ও আমার সামনে আসে।

ওর নাম জান্নাত এটা আমি জানি।
-আচ্ছা ঠিকাছে, তুমি আমার একেবারে কাছে এসে
বুকে মাথা রেখে ঘুমাও এখন।
এই বলে পাখি আমায় কাছে টেনে নিলো
আরেকটু।
মনের অজান্তে আমার চোখে পানি জমে
গেছে।
এই মেয়েটাকেই আমি রাগের মাথায় থাপ্পর
মেরেছিলাম।
গালটা এখনো ওর লাল টকটকে হয়ে ফুলে
রয়েছে।
অথচ সব ভুলে কতো আপন করে বুকে ঠাই
দিয়েছে আমায় এই পাখিটা।

আমি আবেগ ধরে রাখতে পারিনি।
ও বুঝতে পেরে মাথাটা একটু ঝুকে আমার মুখের
কাছে মুখ এনে বলতেছে…
-এই বোকা ছেলে কাঁদো কেনো?
-তোমায় আমি মারলাম অথচ তুমি আমায় এতো আপন
করে কাছে টেনে নিলে।
-চুপ, তাতে কি হইছে?
তুমি আমায় মারবে, কাটবে, আবার পরে
ভালোবাসবে, আদর করবে ব্যাস।
এই বলে চোখের পানিটুকু মুছে দিয়ে আমার
কপালে একটা আলতো চুমু একে দিলো পাখি।
আমিও ওকে একটু ছাড়িয়ে ওর কপালে একটা চুমু
একে দিলাম।
ও একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল পাগল একটা।

ভোরে উঠেই সমুদ্রপাড়ে চলে গেলাম।
অনেক মানুষ পানিতে নেমে মজা করছে।
আমাদের সাথের সবাই নেমে গেছে।
হঠাৎ পাখি আমায় টান দিয়ে বলল আসো তো…
প্রায় ২ ঘন্টা সমুদ্রের লোনা পানিতে সাতার
কেটে, ডুব দিয়ে মজা করলাম।
এর আগে এসে এতো আনন্দ পাইনি।
কারন তখন ছিলাম একা।

আজ আমার সাথে আছে পাখি নামের মেয়েটা।
যদিও এখনো জানিনা এই মেয়েটা কে আমার?
সমুদ্রপাড় থেকে হোটেলে ফিরছি।
হঠাৎ একটা গাড়ির সামনে একটা মেয়েকে দেখে
চমকে উঠলাম!
ও তো জান্নাত…
-এই তোমরা দেখো ঐ যে আমার জান্নাত।
তোমরা ওকে বাঁচাও..
ও তো গাড়িতে চাপা পড়বে।
এই বলতে বলতেই গাড়িটা ঐ মেয়ের উপর উঠে
গেলো।

আমি চিৎকার দিয়ে ওখানেই লুটিয়ে পড়লাম!!হাসপাতালে শুয়ে আছি।
আমার মাথার কাছে বসে আছে পাখি।
বাকিরা সবাই দাঁড়িয়ে আছে পাশেই।
পাখি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে…
-কি হইছিলো তোমার?
সমুদ্র থেকে আসার সময় জান্নাত বলে চিৎকার করলা
কেন?
-ঐ মেয়েটা কি জান্নাত ছিলো?
আমি বললাম…
-মেয়েটার কি কিছু হইছে? (আমি)
-কোন মেয়ে? (পাখি)
-সমুদ্র থেকে আসার সময় যে গাড়ির নিচে
পড়লো ঐ মেয়েই তো জান্নাত।

এ জন্যই তো আমি চিৎকার করে বললাম
তোমাদের।
-আরে ওখানে এমন কিছু ঘটে নাই।
যা দেখছো তা পুর্বের মতোই ভুল দেখছো।
-হয়তো তাই। তবে এখন আমার সব মনে পড়ছে।
-কি মনে পড়ছে বলো।
জান্নাত কে?
তাকে কিভাবে চেনো বলো। (ডাক্তার)
-জান্নাত হলো আমাদের পাশের গ্রাম বাশবাড়িয়ার
একটা মেয়ে।
ওর সাথে প্রথম দেখা হয় নৌকা পার হতে।
আর….
এটুকু বলেই আমার বুকটা ধুক করে ওঠে!!
জান্নাত কোথায়?
ওর কিছু হয়নি তো?
বলো তোমরা দয়া করে…
এসব বলে সবার দিকে তাকালাম।

সবাই চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি পাখির দুটো গাল ধরে বললাম…
-বলোনা গো পাখি ঐ জান্নাত এক্সিডেন্ট এর পর
কোথায় আছে?
ওর কিছু হইছে কি?
পাখি আমার দিকে চেয়ে হাতটা আকড়ে ধরে
বলছে… সব বলব তোমায়।
আগে চলো বাড়িতে যাই।
তোমার ভালো হওয়ার জন্যই এই ভ্রমনে আসা
হয়েছিল আমাদের।
এখন তোমার কথায় আমরা বুঝলাম তুমি এখন সম্পুর্ন
সুস্থ।
তাই সাতদিনের আগেই আজ বাড়িতে যাব চলো।

গাড়িতে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দিছি।
জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি আর মনে করতেছি ৩
বছর আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো।
সেদিন নৌকা থেকে নেমে জান্নাত নামের
মেয়েটি আমায় চোখটিপ মেরেছিলো।
আর আমিও তার ইশারায় সাড়া দেয়ার ইঙ্গিত দিতে তার
সাথেই পায়ে হেটে বাসায় ফিরছিলাম।
মাঝপথে হঠাৎ একটা সিএনজির সাথে আরেকটা
সিএনজির ধাক্কা লেগে আমাদের দিকে ছুটে
আসে।

আমি কোনকিছু না ভেবে জান্নাত নামের ঐ
মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়ে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু পারিনি ধাক্কা দিয়ে ওকে সরাতে।
তার আগেই সিএনজিটা আমাদের উপর এসে পড়ে।
আমার কি হয়েছিল খেয়াল করিনি।
তবে মাথাটা কোনরকমে তুলে তাকিয়ে ছিলাম
জান্নাত এর দিকে…
ও কথা বলতে পারছিলো না।
মাথা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিলো।

শুধু হাতটা কোনরকমে তুলে আমায় কাছে
ডাকছিলো।
কিন্তু আমি সিএনজির চাপে পড়ে ছিলাম।
এরপর আর কিছু মনে পড়ে না।
গাড়ি তার আপন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
আমার চোখ দিয়ে টুপটুপ করে জল গড়িয়ে
পড়ছে।
জানিনা জান্নাত নামের ঐ মেয়েটা বেঁচে আছে
নাকি মারা গেছে।
তিনটা বছর জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেছি।

আমি অন্য দিকে চেয়ে থাকলেও পাখি আমার
চোখের জল লক্ষ করেছে।
আমার মাথাটা হাত দিয়ে ওর ঘাড়ের উপর রাখলো।
কাঁদছো কেনো পাগল?
জানো এই তিনটা বছর তোমার পরিবারের লোক
কতো কষ্ট পেয়েছে তোমার এই পাগলামিতে?
তুমি পাগল হওয়ার পর কতো যে আজগুবি কথা
বলেছো তার হিসাব নাই।
তুমি সবসময় বলতে জান্নাত তোমায় রাস্তার ভিতর
থাপ্পর মারায় তোমার আব্বা তোমাকে
মেরেছিলো বলেই তুমি পাগল হইছো।

এরকম কিছুই ঘটেনি তোমার জীবনে।
আর তোমার বাবা, মা তোমায় ভীষন ভালোবাসে।
এই তিন বছর তারা ২/৩ দিন পরপরই তোমাকে
দেখতে পাবনায় গিয়েছে।
তুমি পাগল হওয়ার পর প্রায়ই বলতে তোমার বাবা নাকি
তোমার হাত, পা ধরে কাঁদে আর ক্ষমা চায়।
এটাও আজব কথা।
তোমার বাবা, মা কাঁদতো এটা ঠিক, তবে মাফ চায়নি বা
চাওয়ার মতো কিছু করেও নি।
তবে তারা একটা কাজ করে দিয়েছে তোমার জন্য
যা হয়তো তুমি এখন বলতে পারবে না।
কারন পাগল হওয়ার পর কি হইছো বা করছো তা
তোমার মনে নাই।

পাখির এই কথায় আমি মাথাটা তুলে ওর দিকে তাকিয়ে
বললাম…
-কি কাজ করেছিলো বাবা, মা যা আমার মনে
হচ্ছেনা?
-বাড়িতে গিয়ে সব বলব গো…
এখন একটু চুপ হয়ে শুয়ে থাকো আমার উপর মাথা
রেখে।
এই বলে পাখি আমায় টেনে মাথাটা তার ঘাড়ের উপর
রাখে।

আমি চোখটা বুঝে ভাবতেছি…
এই মেয়েটা কে?
কেনোই বা আমায় এতো আপন করে রাখে?
আর জান্নাতেরি বা কি হয়েছে?
মাথাটা ঘুরতেছে আবার।
রাত প্রায় ২ টা বাজে।
কপালে কোন স্পর্শ পেয়ে ঘুম ভেঙ্গে
গেছে আমার।
তাকিয়ে দেখি পাখি আমার কপালে আলতো একটা চুমু
দিয়ে খিলখিল করে হাসছে!
এই হাসিটা যতবারই দেখি ততবারই ওর প্রেমে পড়ে
যাই।

এক নয়নে তাকিয়ে রয়েছি ওর দিকে।
হঠাৎ চোখের কাছে একটা আঙ্গুল দেখিয়ে পাখি
বলতেছে…
-ঐ কি দেখো এমন করে?
চোখ উপরে নেবো কিন্তু…হি হি হি
এই বলে টেনে আমায় গাড়ি থেকে নামালো।
গাড়ি থেকে নামতেই আমার মা এসে আমাকে
জড়িয়ে ধরলো।
-আমার বাজান ভালো হইয়া আইছে দেখো…
বাবাকে উদ্দেশ্য করে আহাজারি করে এসব
বলতেছে আমার মা।

-হা মা, আমি এখন সুস্থ।
আগের সবকিছুই আমার মনে পড়ছে।
আর কোন পাগলামি করিনা, আর আজগুবি কথাও বলিনা।
আমার কথা শুনে বাবা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো
আমায়।
-চল বাবা ঘরে চল। (বাবা)
এতো রাতে খেতে মন না চাইলেও খেতেই
হচ্ছে সবাইকে।
খাওয়ার পর পাখি আর মা মিলে.. ডাক্তারসহ সবার বিছানা
ঠিক করতে পাশের রুমগুলোতে গেল।

এইদিকে ডাক্তার আমার কাছে এগিয়ে এলো
-আচ্ছা বলো তো…
পাখি মেয়েটা কে নিলয়?
আমি ডাক্তারের কথায় অবাক হয়ে চেয়ে আছি তার
দিকে!
-জানিনা তো। আপনি বলেন কে এই পাখি?
-যেহেতু তোমার মানষিক শক্তি হারানোর পর পাখি
তোমার জীবনে এসেছে তাই ওকে তুমি
চিনতে পারছো না।
তবে বলতেই হয়… আল্লাহ তোমাকে ভালো
করার জন্য ওকেই পাঠাইছে তোমার কাছে।
কোন ডাক্তার হাজার চিকিৎসা করেও এটা পারতো না।
খুব সিরিয়াস রোগী ছিলে তুমি।
যখন তখন বড়সড় পাগলামি করতে।
কখনো এমনি চিৎকার করে উঠতে।

তোমার সামনে কিছু না ঘটা সত্বেও তুমি বলতে ঐ
যে জান্নাত বা অমক, তমক।
আর তখন এই পাখি নামের মেয়েটাই তোমাকে
বুকে জড়িয়ে শান্ত করেছে তোমার পাগলামি।
তোমার মা, বাবা সহ আপন লোক অনেকেই
চেষ্টা করেও তোমার পাগলামি ঠিক করতে পারে
নাই।
এমনকি আমরা সব ডাক্তার, নার্সরাও ব্যর্থ হয়েছিলাম।
তখনি হুট করে চলে আসে ঐ অচিন মেয়ে পাখি।
এসব বলেই ডাক্তার আমার মাথায় হাত দিয়ে মুচকি
হেসে গুড নাইট বলে বের হয়ে যায়।
যাওয়ার সময় বলে যায়…
কালকে অজানা সবই জানতে পারবে তুমি।

ডাক্তারসহ সকলে বের হয়ে যাওয়ার পর বিছানায়
গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
সারাদিন গাড়িতে থাকার কারনে এখন শুয়ে খুব ভালো
লাগছে।
একটুপরেই পাখি এসে দরজা আটকে আমার সামনে
এলো।
আবারও সেই মুক্তোঝরা হাসি!
-কি ব্যাপার এতো হাসছো কেন?
নাকি আমি ভালো হওয়ার পর তুমি আবার পাগল হইলা?
আমার কথা শুনে পাখি হাসির গতি আরেকটু বাড়িয়ে দিল।
কাছে এসে আহ্লাদী ভাব নিয়ে গলা জড়িয়ে
ধরলো।

-হাসবোই তো
আমি যে সফল হলাম।
যেইখানে সব বড় বড় ডাক্তাররা তোমায় নিয়ে
কোন আশা দেখাতে পারেনি।
সেখানে আমি এসেই বলেছিলাম ওকে আমি
ভালো করব।
এবং করে দেখিয়েছি গো…
তাই এতো খুশি আমি।
এই বলে গলা ধরা অবস্থায় ই আমাকে শুইয়ে দিলো
পাখি।
ও আমার বুকের উপর।
এই প্রথম সুস্থ মাথায় বুঝেশুনে পাখিকে আমি
বুকের সাথে আগলে নিয়েছি।
ওর মায়াবী মুখটার কাছে মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছি।
ও আবার ও হাসছে হি হি…করে।

কি অদ্ভুত সেই হাসি!
এমন মেয়ে কেমন করে এলো আমার
জীবনে?
কেনই বা এলো?
কি পরিচয় ওর, কোথাকার মেয়ে এই পাখি…?!!ভোর হয়ে গেছে।
পাখির কলরবে ঘুম ভেঙ্গে গেছে।
পাশে তাকিয়ে দেখি পাখি নাই!
মাথাটা তুলে লক্ষ করলাম কেউ জায়নামাজে
বসে
কাঁদছে চুপিসারে।
লাফিয়ে উঠলাম আমি।

হা, পাখিই জায়নামাজে বসে হাত তুলে
দোয়া করছে
নামাজ পড়ে।
তবে কাঁদছে কেনো?!
আমি তো এখন সুস্থ।
আমি অবাক চোখে ওর মোনাজাত
দেখতেছি…
একটুপর ও উঠে এসে চোখের পানিটুকু মুছে
দুইহাতে আমার গাল ধরে কপালে একটা চুমু
দিলো।
দিয়েই আবার সেই মুক্তোঝরা হাসি ফুটিয়ে
তুললো মুখে।

সকাল ৮ টার দিকে সবাই খাওয়া দাওয়া
করলাম একসাথে।
একটুপর ডাক্তার বলল
-চলো সবাই রেডি হয়ে রওনা দেই।
আমি বললাম কোথায়?
-আগে চলো, তারপর সবই জানবে।
তোমার মা, বাবাও যাবে সাথে।
গাড়িতে উঠে যাচ্ছি…
গাড়িটা এনায়েতপুর… “খাঁজা ইউনুস আলী”
হাসপাতালের
সামনে থামলো।
সবাই ভিতরে যাচ্ছে…
আমিও ওদের সাথে যাচ্ছি আর অবাক হচ্ছি!
হাসপাতালে কেনো আবার!!

হাসপাতালের একটা রুমের নিকট যাওয়ার
সাথে সাথে
একটা বয়স্ক মহিলা এসে পাখিকে জড়িয়ে
ধরে
কাঁদতে লাগলো!
-কি হয়েছে মা? (পাখি)
-তোর ছোট বোনটার অবস্থা খুব খারাপ।
ডাক্তার বলেছে আর বেশিক্ষন টিকবে না।
একথা শোনার সাথে সাথে পাখি রুমে ঢুকে
গেলো প্রায় দৌড়ে।
আমরাও ওর পিছু পিছু ঢুকলাম।

একটা মেয়ে শুয়ে আছে হাসপাতালের বেডে।
দুর থেকেই মুখটা পরিচিত মনে হচ্ছে।
পাখি ইতিমধ্যেই ঐ মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে
বলতেছে…
এসেছি বোন, তোর কিচ্ছু হবেনা।
আমি এগিয়ে যাচ্ছি ধীর পায়ে।

হটাৎ ছোট্ট কন্ঠে শুনতে পেলাম…
-নিলয়কে নিয়ে এসেছিস বুনু?
একথা শুনতেই আমার বুকের ভিতর ধুক করে
উঠলো!
ততক্ষনে আমি পাখির পাশে দাঁড়িয়েছি।
পাখি আমার দিকে হাত ইশারা করে বলল…
ঐ তো নিলয়, চেয়ে দেখ বুনু।
আমি মেয়েটার মুখের দিকে চেয়ে অবাক
হয়ে
কাছে গেলাম!!
এই তো সেই জান্নাত।
যাকে নিয়ে আমি নৌকা পার হয়েছিলাম।
যার সাথে কথা বলতে বলতে রাস্তায়
এক্সিডেন্ট
হয়েছিলাম।

আমি আস্তে করে জান্নাতের পাশে বসলাম।
ওর কপালে হাত দিয়ে বললাম তোমার কি
হইছে?
-প্রতিশোধ নিবা না তুমি নিলয়? (জান্নাত)
-কি বলছো এসব জান্নাত!
-হুম, তুমি তো প্রতিবারই আমার কাছে আসলে
আমার
দিকে ধেয়ে আসতে।

বলতে তোর কারনেই আমি পাগল হয়েছি।
আমাকে মারার জন্য এগিয়ে আসতে যে তুমি।
এসব বলছে আর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি
ছাড়ছে জান্নাত।
আমি কিছুই বুঝতে পারতেছি না।
এসব কি বলে ও!
হঠাৎ পাশ থেকে পাখি আমার ঘাড়ে হাত
রাখে।

-হা গো, ও ঠিকই বলতেছে।
এই তিন বছরে তোমাকে নিয়ে অনেকবার
ওকে
দেখতে এসেছিলাম।
কিন্তু তুমি প্রতিবারই ওকে দেখে ধেয়ে
যেতে
প্রতিশোধ নিতে।
তুমি ওকে চিনতে পারতে না।

আর আমি হলাম জান্নাত এর বড় বোন পাখি।
তুমি সেদিন জান্নাত কে বাঁচাতে গিয়ে
দুজনি গাড়িতে
চাপা পড়ে গিয়েছিলে।
দুজনকেই হাসপাতালে নেয়া হয়।
তোমার মাথায় বেশি আঘাত পেয়ে মানষিক
শক্তি
হারিয়ে ফেলো।

আর আমার পিচ্চি বোনটার
এটুকু বলেই পাখি আমার বুকে মাথা লুকায়।
ডুকরে ডুকরে কাঁদছে মেয়েটা।
তাকিয়ে দেখি পাশের সবাই চোখ মুছতেছে।
আর জান্নাত হাত ইশারায় আমায় ডাকতেছে।
আমি পাখি কে ছেড়ে দিয়ে জান্নাত এর
হাত ধরলাম।
ও আমাকে টেনে তুলতে বলল
আমি ওকে টেনে বসালাম।
মেয়েটা আমার বুকে মাথা রাখলো

-আমি হয়তো সেদিনই চলে যেতাম।
কিন্তু তুমি নিজের চিন্তা না করে আমাকে
বাঁচাতে
গিয়ে দুজনি পড়ে গেলাম গাড়ির নিচে।
তোমার মাথায় গুতো দিয়ে ফেলে দিলো
গাড়িটা।
আর আমার পায়ের উপর দিয়ে উঠে গেল।
সাথে মাথায় ও আঘাত পেলাম।
তুমি হারালে মানষিক শক্তি।
হয়ে গেলে পাগল।
আর আমি পঙ্গু জীবন উপহার পেলাম।
এটুকু বলেই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে জান্নাত।

আমি জান্নাতকে বুকের মাঝে জড়িয়ে
রেখেছি।
ও ভীষন কষ্ট পাচ্ছে।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
ঠিক তখনি আবার পাখি বলা শুরু করলো…
-তোমরা যখন এক্সিডেন্ট হয়ে হাসপাতালে
ছিলে
তখন আমি খবর পেলাম যে আমার ছোট
বোনটা
হাসপাতালে।

-আমি ঢাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে
পড়তাম।
একটা জব ও করতাম।
আমি কোন নার্স না।
আমি যখন হাসপাতালে আসলাম তখন দেখলাম
আমার
প্রিয় বোনটার দুটো পা নাই!!
কেটে ফেলতে হয়েছে।
ঐ দৃশ্যটা কতো কষ্টের ছিলো বুঝাতে পারব
না।

এভাবে তিনমাস কেটে গেল।
একদিন জান্নাত আমায় ওর কাছে ডাকলো।
আমার হাত ধরে ও একটা অনুরোধ করতে
চাইলো।
আমি কোন কিছু না ভেবেই রাজি হলাম।
ও তখন বলল…
যে আমাকে বাঁচাতে গিয়ে পাগল হয়ে
পাগলা গারদে
আছে তাকে তুই একটু দেখ গিয়ে।

যদি পারিস ওর একটু সেবা করে দেখ।
শুনলাম ডাক্তার নাকি বলেছে যে শুধু
চিকিৎসা দিয়ে
এই রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব না।
তাকে ভালো করতে একটা মানুষ দরকার।
যেই মানুষকে দেখলে ও পাগলামি করবে না।
তাকে কাছে রাখতে চাইবে।
কিন্তু ওর পরিবার বা আপন কাউকেই দেখতে
পারেনা।
কখনো কখনো ভালো থাকে, চেনে
সবাইকে।
কিন্তু প্রায় সময়ই পাগলামি করে, কাউকে
চেনে না।

এরপর আমি আমার বোনের অনুরোধ রাখতে
গিয়ে তোমার কাছে চলে গেলাম পাবনায়।
গিয়েই ফেঁসে গেলাম।
তুমি আমায় দেখেই জড়িয়ে ধরলে।
ডাক্তাররা এই দৃশ্য দেখে তোমার মা,
বাবাকে সব
খুলে বলল।

তারপর তোমার মা, বাবা আর ডাক্তাররা
আমায় অনেক
অনুরোধ করায় আমি তোমার সাথে থাকতে
রাজি হই।
কিন্তু কয়কেদিনের মধ্যেই তুমি এতো পাগল
হলে আমার জন্য যে…
তুমি আমায় ছাড়া খাও না, গোসল করোনা,
ওষুধ খাওনা
এমনকি রাতে আমাকে কাছে না পেলে
ঘুমাও না।
পাগলামি করতে লাগলে খুব বেশি।

আমি ১ টা যুবতি মেয়ে হয়ে এটা মানতে
পারিনি।
তুমি পাগল হলেও একটা পুরুষ মানুষ।
কিভাবে তোমার সাথে রাতে এক বিছানায়
থাকি?
শেষে বাধ্য হয়ে ফিরে এলাম আমি।
আমি কাছে থাকলে তুমি অনেকটা সুস্থ
মানুষের
মতোই থাকতে, পাগলামি করতে না।

কিন্তু আমি চলে আসার পর তুমি আরো পাগল
হয়ে
গেলে।
তোমার মা, বাবা এসে আমার হাত জড়িয়ে
ধরে
তোমার জন্য আমাকে চাইলো।
তবুও রাজি হতে পারিনি।
পরে আমার এই মৃত্যপথের যাত্রী ছোট বোনটা
যখন তোমার জন্য আমাকে চাইলো তখন আর
পথ
পাইনি সরে যাবার।

জান্নাত আর তোমার পরিবারের জন্য
নিজেকে
কোরবানি করলাম।
একটা পাগলকে বিয়ে করে নিলাম।
তোমাকে বিয়ে করছি শুধু আমার ঐ লক্ষি
বোনটার
অনুরোধে।
ও তোমায় অনেক ভালোবাসে।
কিন্তু ডাক্তার জানিয়ে দেয় ৩/৪ বছর আর
বেঁচে
থাকবে জান্নাত।

তাই তোমায় বিয়ে করতে বাধ্য হলাম বোন
জান্নাতের চাওয়ায়।
অনেকবার তোমায় জান্নাতের সামনে
এনেছিলাম।
কিন্তু তুমি ওকে দেখেই প্রতিশোধ নিতে
চাইতে।
ও খুব কষ্ট পেতো তোমার ঐ ব্যবহারে।
বোনটা অনেক কাঁদতো আর বলতো..
আমার জন্যই নিলয় আজ পাগল।
তুই ওকে ভালো করতে পারবি না বুনু?
আমি তখন ওকে কথা দিয়েছিলাম…আমি
পারবো।

হা গো পেরেছি, কিন্তু আমার বোনটা আর
থাকবে
না বেশিদিন…
এটুকু বলেই পাখি মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে।
আমার বুক থেকে মাথাটা তুলে ওর আপু
পাখিকে
ইশারায় ডাকছে…
পাখি এসে আমার কাছেই বসে জান্নাতকে
বুকে
টেনে নেয়।

জান্নাত আমাকে আর পাখিকে দুইহাতে
জড়িয়ে
ধরে।
-তোমাকে প্রথম দেখেই ভালো লেগে
গিয়েছিলো।
কিন্তু ভাগ্য বিধাতা এটা চায়নি যে তোমার
আমার
ভালোবাসা হোক।
তাইতো প্রথম দেখাতেই পেয়েও হারিয়ে
ফেলেছিলাম।

আজকে তুমি আমায় বুকে জড়িয়ে নিয়েছো।
এই দিনটার জন্যই বেঁচে ছিলাম গো।
আমার বোনটাকে তোমায় দিয়ে গেলাম।
ওর মাঝেই তুমি এই জান্নাতকে পাবে।
পাখি বুনুকে বুকে ঠাই দিয়ে আপন করে নিও।
তবেই আমার আত্মা সুখ পাবে।
বলোনা…নেবে তো? (জান্নাত)
আমি এসব শুনতে শুনতে কখন কেঁদে ফেলেছি
নিজেও জানিনা।
আমি চোখের পানিটুকু মুছে বললাম…
-কিছুই হবেনা তোমার।
আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবেনা।
-আমি চলে যাচ্ছি গো…দেরি করোনা, কথা

দাও
প্লিজ।
আমি আর পাখি জান্নাতকে কথা দিলাম।
আর তখন জান্নাত নামের মেয়েটা আমার
বুকে মাথা
রাখলো।

চুপটি করে শুয়ে আছে।
কোন কথা নাই জান্নাতের মুখে।
একটুপর ওকে শুইয়ে দিলাম।
ডাক্তার ওকে পরীক্ষা করে দেখে মাথা
নিচু
করে বাইরে চলে গেল।
সারা হাসপাতালে যেন কান্নার রোল পড়ে
গেল।
পাখিটা ওর ছোট্ট বোনটাকে বুকের সাথে
আকড়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতেছে।
সাথে ওর বাবা, মা সহ সবার চোখে
হারানোর কান্না।

একমাস পার হয়ে গেছে জান্নাত চলে
যাওয়ার পর।
আজ আমার আর পাখির বাসর রাত।
বাসর ঘরে বসে আছে পাখি।
আমি ওর কাছে গিয়ে ঘোমটা সরিয়ে দিলাম।
ওর চোখের জল দিয়ে বুক ভেসে গেছে।
১ মাস হয়ে গেলেও ভুলতে পারেনি
বোনটাকে।
আমি ওর চোখের পানিটুকু মুছে দিয়ে বুকে
টেনে নিলাম।
দুজন এক হয়ে গল্প করতে করতে মাঝ রাত হয়ে
গেছে।

-এই ঘুমাবে না পাখি?
-নাহ, ঘুমাবো না।
-কেন গো?
-কেন তা বোঝোনা হাবলু?
তিন বছর কষ্টে রেখেছো আমায়।

নিজের স্বামীকে বুকে নিয়েও পাইনি তার
আদর,
ভালোবাসা।
আজ তার শোধ নেব…..হা হা হা…
একমাস পর পাখির মুখে সেই হাসি
দেখতেছি।
যেই হাসিতে মন কেড়ে নিতো আমার।
পাখিকে টান দিয়ে বুকের উপর তুলে নিলাম।

-নাও এবার প্রতিশোধ…হা হা হা…
এভাবে দুজন হাসতে হাসতে চলে যাই আপন
হওয়ার
যুদ্ধ ময়দানে।
জান্নাত এর ভালোবাসা মিশ্রিত এই
পাখিটাকে নিয়েই
বেঁচে থাকতে চাই আমি।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত