দ্বীপান্তিতা

দ্বীপান্তিতা

দ্বীপান্তিতা বলুন আপনাকে একটা কথা বলব। কথা দিন রাগ করবেন না, হুট করে ফোন কেটে দেবেন না। প্রমিজ করুন হাহাহা কি বলবেন? আগে প্রমিজ করুন আচ্ছা প্রমিজ করলাম। বলুন। আমি তিন সেকেন্ড দম নিলাম। তারপর চোখ বন্ধ করে মুখস্তের মতো বললাম, আমি আপনাকে ভালোবাসে ফেলেছি। আপনাকে কোন ভাবেই মন থেকে সরিয়ে রাখতে পারছি না। আমি আপনাকে ভালোবাসি দ্বীপান্তিতা ফোনের ঐ পাশ মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হলো। আমারও হার্টবিট মিস হলো। সে কি রাগ করেছে? রাগে ফেটে পড়বে? নিশ্চয়ই ফোন কেটে দেবে এবার। কয়েক সেকেন্ড পর ওপাশ থেকে মুক্তোঝরা হাসির শব্দ শোনা গেল।

দ্বীপান্তিতা হাসতে হাসতে বলল, দুঃখিত আমি আপনার কথা রাখতে পারছি না। এখুনি আমার ফোন রাখতে হচ্ছে। ভয় পাবেন না। রাগ করে ফোন রাখছি না। একটু কাজ পড়ে গেছে। আর আপনার কথাটা হজম করতেও সময় দরকার। আপনার গলায় কাঁপুনি ছিল। আপনিও স্বাভাবিক হোন। আমরা আধা ঘন্টা পরে কথা বলছি।
ফোন রেখে দেয়াতে সত্যিই আমার জন্য সুবিধে হয়েছে। আমার কথা আটকে যাচ্ছিল। আমি বোধহয় আর কিছু বলতেই পারতাম না। এই জীবনে এই প্রথম কোন মেয়েকে প্রেম প্রস্তাব করছি। ভয় লাগা আশ্চর্যের কিছু নয়।
ভয় লাগা আশ্চর্যের কিছু না হলেও আশ্চর্য হওয়ার মতো অনেক কিছুই আমি ঘটিয়ে ফেলেছি। আমার বয়স ২৯। এই বয়সের কোন ছেলে কোন মেয়েকে প্রেম প্রস্তাব করবে এতে অস্বাভাবিকতা নেই। বরং এই বয়সে এসে কেউ জীবনে প্রথম প্রেমে জড়াবে এটাই অস্বাভাবিক। আমি যাকে প্রেমের প্রস্তাব করেছি সে কোথায় থাকে আমি জানি না। সে কি করে তাও জানি না। এমনকি আজ অব্দি তাকে আমি দেখি নি। সে হিসেবে আমার প্রেমে পড়া অনেকটাই বিস্ময়ের। বিস্ময়ের শুরু অর্ধ বছর আগে।

একটা পাক্ষিক ম্যাগাজিনের নিয়মিত পাঠক আমি। নানান রকম গল্প সেখানে ছাপা হয়। প্রতিষ্ঠিত অপ্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখা মূল নামে, ছন্ম নামে প্রকাশিত হয়। আমি দায়সারাভাবে পড়ি। কোন লেখাই খুব একটা আহামরি রকম টানে না। হঠাৎ করেই পরপর দুই সংখ্যায় কোন এক লেখকের লেখা চুম্বকের মতো টানল। গল্প পড়ে মনে হলো এই রাইটারের মধ্যে কিছু একটা আছে, কিছু একটা। খুব সাধারণ প্লট থেকেই অসাধারণ লেখা বের হয়ে আসছে। এবং অদ্ভূত ব্যাপার পরপর দুইটা গল্প পড়েই আমার মতো ২৯ বছরের যুবকের চোখে পানি নেমেছে।
লেখক মহিলা, নাম দ্বীপান্তিতা। এক শব্দেই নাম। ছদ্মনাম যে সেটা স্পষ্টতই বোঝা যায়। এই পত্রিকার একটা সুন্দর সিস্টেম আছে। সেখানে যে কোন লেখা বা লেখক ব্যাপারে চাইলে খোলা চিঠি লেখা যায়। আমি সাহস করে একদিন লিখেই ফেললাম। অল্প কথা লিখে পাঠিয়ে দিলাম পত্রিকা অফিসে। “প্রিয় দ্বীপান্তিতা, আপনার দুটি গল্পই আমাকে মুগ্ধ করেছে। কথাটা আরো সুন্দর করে বলা উচিত ছিল। কথা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার জ্ঞানের অপ্রতুলতাকে ক্ষমা করবেন। খুব ইচ্ছে একদিনের জন্য হলেও আপনার সাথে কথা বলি। নিচে ফোন নাম্বার দিলাম। ইচ্ছে হলে ফোন করবেন। না করলেও ক্ষতি নেই। আপনার গুণমুগ্ধ হয়েই থাকব।” ভেবেছিলাম পত্রিকা ছাপাবে না। কিন্তু পরের সংখ্যাতেই চিঠি ছাপিয়ে দেয়া হলো। তারপর দুরুদরু বুকেঅপেক্ষা, কেবলই অপেক্ষা।

কোন অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসলেই বুক ধড়ফড় করত। এই বুঝি কেউ বলবে “আমি দ্বীপান্তিতা”।
আমার জীবন অতি সাধারণ। জীবনে একটাও বিস্ময়কর ঘটনা নেই যেটাকে গল্প হিসেবে বলা যায়। এই প্রথম কোন উত্তেজনা আমার জীবনে সৃষ্টি হলো। ঘুমানোর আগে একবার কললিস্ট দেখি, ঘুম থেকে উঠে আরেকবার দেখি।
হয়তো দ্বীপান্তিতা নামের কেউ ফোন করেছে, আমি বুঝতে পারি নি। মাসখানের মধ্যে আমার উত্তেজনা নেমে পড়ল। দুই মাসের মধ্যে বুঝতে পারলাম আমি বালকসুলভ আচরণ করেছি। এরকম অপরিচিত কোন ছেলেকে একটা মেয়ে কেন ফোন করবে? তাও এত ভালো একজন লেখক! নিশ্চয়ই তার পেছনে গুণমুগ্ধের লাইন বসে। তিন মাসের মধ্যে আমি প্রায় ভুলেই গেলাম। এর মধ্যে একই পত্রিকাতে তার আরো তিনটা গল্প ছাপা হয়েছে। বলাই বাহুল্য একটার চেয়ে আরেকটা বেশি সুন্দর। ঘটনা ঘটল দুই মাস আগে।

রাত এগারোটার সময় বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছি। তখনই ফোন আসল। আমাকে বিস্ময়ে ভাসিয়ে দিয়ে একটা কন্ঠ কানে ঝংকার তুলল “আমি দ্বীপান্তিতা বলছি। কেমন আছেন আপনি? আমি ঝট করে শোয়া থেকে উঠে মাত্র দুইটা শব্দ বলতে পারলাম, “এতদিন পর!” সে আস্তে করে বলল, হাঁ এতদিন পর। কেমন আছেন বললেন না যে? আমি বললাম, অপেক্ষার অর্থ জানেন! অপেক্ষার কষ্ট চেনেন? সে বলল, অপেক্ষার পর প্রাপ্তি আনন্দের। আমি কি আপনাকে কোন আনন্দ দিতে পারলাম? আমি বললাম, এই বছরের সেরা আনন্দ। দ্বীপান্তিতা ফোন করেছে। আমার বুকে আবার অদ্ভূত কাঁপুনি শুরু হয়েছে। মেয়েটা কি বলবে? আমার বুকের নিঃশ্বাসে বড় করা আশার বেলুন কি চুপসিয়ে দেবে? আমার ফোন ধরলাম। দ্বীপান্তিতা খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ব্যাংকার কেমন আছেন? আমিও যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললাম, ভালো আছি। রাতে খেয়েছেন? এখনো না। কি বলেন! রাত বাজে পৌনে বারোটা। এখন খান নি! এটা কোন কথা? আমার গলা ফাটিয়ে বলতে ইচ্ছে করল, এই মেয়ে! আজকে খাওয়া যায়? আজকের দিনে?? বুকের ভূমিকম্পে খাবার পেট অব্দি পৌঁছাবে না। আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম, খেতে ইচ্ছে করছে না। ক্ষুধা নেই।

সে কপট রাগ দেখিয়ে বলল, মিথ্যে বলছেন কেন? অকারণে মিথ্যে বলা আমার একদম পছন্দ না। আপনি টেনশনে খাচ্ছেন না। আমি কাতর গলায় বললাম, আমি ভেবেছিলাম আপনি আর আমাকে ফোন দেবেন না। আচ্ছা আমাদের কি আর কখনো কথা হবে? দ্বীপান্তিতা একটু সময় নিল। তারপর কন্ঠ শীতল করে বলল, কেন হবে না? আপনি চাইলে অবশ্যই হবে। তবে আপনি কিভাবে চান সেটা একটা প্রশ্ন। আমি জোর গলায় আবদার করে বললাম, আমি আপনার কন্ঠ চাই। সাথে কন্ঠের মালিককেও। আজন্মের জন্য। দ্বীপান্তিতা আবারো সময় নিল। একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আপনার সাথে দুই মাস হয় কথা বলি। আপনি বড় সাধারণ মানুষ। আমি বললাম, হাঁ জানি। আমি খুব বেশি সাধারণ। এটা আমার ত্রুটি। আমার জীবনে অসাধারণ বলে কিছুই নেই। এই জীবনে গল্প করার মতো কোন গল্প নেই।

দ্বীপান্তিতা বলল, আপনি ভুল বুঝবেন না। সাধারণ হতে পারাটা অনেক বড় গুণ। অসাধারণরা নিজেদের ত্রুটি তাদের প্রতিভা দিয়ে আড়াল করতে চায়। তাদের মধ্যে সব সময়ই প্রতিযোগীতার মতো একটা ব্যাপার থাকে। প্রমাণ করার একটা চেষ্টা তাদের সত্ত্বাকে ঢেকে দেয়। আপনি এসব ত্রুটি থেকে মুক্ত। আপনার সাধারণত্ব বড় বেশি অসাধারণ। আমি যেটা বলতে চাই বলুন আপনি কেন আমাকে ভালোবাসেন? এ প্রশ্নের কোন উত্তর নেই দ্বীপান্তিতা। কেন জানি মনে হচ্ছে আপনাকে ছাড়া এই মুহুর্তে আমি থাকতে পারব না। ভবিষ্যত জানি না। সত্যিটাই বললাম। আপনি যে সত্যি বলছেন সেটা আমি জানি। কিন্তু আপনি তো আমাকে কোনদিনও দেখেন নি! দেখা কি খুব বেশি দরকার? অবশ্যই দরকার। আমি চিকচিকে কালো হতে পারি, খুব মোটা হতে পারি, আমার এক চোখ অন্ধ হতে পারে…পারে না?

এই পৃথিবীর সবচেয়ে কালো মেয়েটার জন্যও সৃষ্টিকর্তা কাউকে না কাউকে রেখেছেন, সবচেয়ে মোটা কুৎসিত মেয়েটার জন্যও কেউ আছে..আছে অন্ধ, খোঁড়া বা বধিরের জন্যও কেউ একজন। যদি কেউ থেকেই থাকে, তবে সেটা আমি কেন নই? বেশ সুন্দর বলেছেন। কিন্তু আপনিও জানেন আপনার কথাটা অনেকটাই সিনেমাটিক! জানি। তবে এটা বিশ্বাস করতে পারেন আমি আবেগে ভেসে কিছু বলছি না। আমার বয়স তিন দশক। দেড় দশকের কিশোর আবেগ আমার মধ্যে অনুপস্থিত। আমি কি করি, কোথায় থাকি সেটাও কিন্তু জানেন না। হতে পারে আমি বস্তিতে থাকি, হতে পারি আমি অল্পশিক্ষিত  আমার কমনসেন্সকে এতটা নিচু করে দেখা বোধহয় উচিত না। আপনি বস্তিতে থাকেন কিনা, অশিক্ষিত কিনা সেটা আপনার লেখা পড়েই ধারণা করা যায়। আমি লেখক না হতে পারি, পাঠক হিসেবে কিন্তু খারাপ না। আমরা একজন আরেকজনকে এখনো আপনি করে বলি! তুমি করে বলার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে। দ্বীপান্তিতা আরেকবার দম নিল। তারপর শান্ত গলায় বলল, আপনার কি মনে হচ্ছে না আপনি অনেক বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন? কিছু না দেখে, না শোনে, না ছুঁয়ে আমার সাহস এতক্ষণে পুরোপুরি ফিরে এসেছে। আমি শক্ত গলায় বললাম, দ্বীপান্তিতা…সব দেখে, শোনে, ছুঁয়ে এবং লাভ ক্ষতি বিবেচনা করে যে সম্পর্কে জড়ানো হয় তাকে চুক্তি বলে, ভালোবাসা না। আমি ভালোবাসায় জড়াতে চাই দ্বীপান্তিতা। যেখানে লাভ ক্ষতির কোন হিসেব নেই।

ভালোবাসায় জড়ানোটাই লাভ। এর পরপরই লাভ ক্ষতির খাতা বন্ধ। দ্বীপান্তিতা বলল, আচ্ছা একটা কঠিন কথা বলি। যদি আমি আপনার প্রস্তাবে রাজী না হই? কিংবা আপনি কি মনে করেন আমার রাজী হওয়া উচিত? আমি এই প্রশ্নের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম। আমি বললাম, দেখুন আপনাকে রাজী হতে হবে তা না। কিন্তু আমি চাই আপনি একদিন আমার সাথে দেখা করুন। আমার চেহারা রাজপুত্রের মতো না হলেও খুব একটা খারাপ না। আমি ব্যাংকে চাকরি করি। সেলারী একেবারে কম না। দুইজন মানুষের জীবনে কষ্টে সৃষ্টে কেটে যাবে। আমি আপনাকে সুইজারল্যান্ডের তুষারপাত দেখাতে পারব না সত্যি, কিন্তু বছরে এক দিনের জন্য হলেও কটেজ ভাড়া করে বাংলাদেশের বৃষ্টিপাত দেখাতে পারব। আপনি মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে গল্প লিখতে চাইলে লাইট জ্বালিয়ে নিতে পারবেন। আমি বসে থেকে আপনার লেখা দেখব। গল্পের চিন্তায় আপনার মুখ কিরকম হয় সেটা দেখার বড় ইচ্ছে আমার।

আমি জানি না আপনি কি আপনার লেখার মতোই বাস্তব জীবনে এত বড় কেউ। যদি খুব বড় কেউ হোন, যদি আপনার কোথাও প্রেম থাকে, যদি আপনি অনেক গর্জিয়াস জীবনের অধিকারী কেউ হোন, বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে বাধ্য করার চেষ্টা করব না । কষ্ট পাব, তবে সেটা পুষিয়ে নেব কোন না কোনভাবে। আপনি কি আমার জন্য একদিনের জন্য দেখা করবেন? এতকিছু একসাথে বলে আমি হাঁপিয়ে উঠলাম। তবে এভাবে গুছিয়ে বলতে পারাতে আমি নিজের উপর নিজেই মুগ্ধ হলাম। ওপাশে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলাম। দ্বীপান্তিতা বলল, হয়তো দেখা হবে, হয়তো না। তার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। কিভাবে আপনি আমার প্রেমে পড়লেন? লেখা বাদ দিয়ে কি দেখলেন আমার মধ্যে? আমি বললাম, সেটা যে দিন দেখা হবে সে দিন বলব।

সে গলা নামিয়ে বলল, আচ্ছা। আপনার ফোনে কথা বলা অবস্থায় দুইবার কল এসেছে। কে ফোন দিয়েছে?
আমি এতটাই উত্তেজিত ছিলাম ফোন এসেছে কিনা খেয়াল করি নি। কল লিস্টে গিয়ে দেখলাম সত্যিই দুইটা মিসড কল। দ্বীপান্তিতা বলল, কে ফোন দিয়েছে? দরকারি ফোন? আমি বললাম, না তেমন দরকারি না। একটা মেয়ে কে হয় আপনার? পরিচিত কেউ? স্যরি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেললাম। আমি বললাম, না আসলে ঐরকম পরিচিত কেউ না। ঘটনাচক্রে একবার পরিচয় হয়। পরে বলব আপনাকে। আচ্ছা। বলবেন কিন্তু। শায়লা নামের মেয়েটা আবারো ফোন দিয়েছে। আমি ফোন ব্যাক করব কিনা ভাবতে লাগলাম। শায়লাদের সাথে আমার পরিচয় দুই মাস আগে একটা ঘটনাসূত্রে। আমি অফিস থেকে রাস্তা ধরে ফিরছি। হঠাৎ কানে শোরগোলের আওয়াজ এল। এক ৬০- ৬৫ বছরের বৃদ্ধকে ঘিরে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে। বৃদ্ধে লম্বা হয়ে রাস্তায় পড়ে আছেন। চরম উত্তপ্ত বাক্যালাপ চলছে চারপাশে। একজন বলল, ড্রাইভারগুলো মানুষ নাই। শুয়োরের বাচ্চা হয়ে গেছে। রাস্তায় ফাঁসি দেয়া দরকার। আল্লাহ মুরব্বীরে বাঁচাইছেন। নইলে ভর্তা হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

আরেক পৌঢ় চিৎকার মারলেন, সব দোষ জালিম সরকারের। যারে তারে টাকা খাইয়া লাইসেন্স দেয়। এরকম ঘটনা তো ঘটবই। দেশ যে কই যায় কে জানে! ৩য় আরেকজন পাল্টা জবাব দিল, আপনার সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় তো দেশ স্বর্গ ছিল, তাই না? আমি এসবে গেলাম না। একটা সিএনজি ডেকে ঢাকা মেডিকেলে বৃদ্ধকে নিয়ে আসলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরল। জানা গেল আঘাত কিছুই নয়। কিছু ভাঙে নি, কাটে নি। ভদ্রলোক ভয় পেয়েই জ্ঞান হারিয়েছেন। ইমার্জেন্সিতে স্যালাইন দেয়া হলো। একটু পরেই তাঁর মেয়ে আসল। নেকাবে ঢাকা মুখ। আমার দিকে তাকিয়ে বেশ কয়েকবার বলল, আমি কৃতজ্ঞ। বাবাকে দেখার মতো আমি ছাড়া কেউ নেই। আপনি আজকে যা করলেন তার ঋণ কোন দিন শোধ হবে না। তারপর থেকে বাবা মেয়ে তাদের বাসায় যাওয়ার বায়না ধরতে থাকে। বৃদ্ধ দুইবার আমার ব্যাংকে এসেছেন। একবার তিন ঘন্টা বসে জোর করে বাসায় নিয়ে গেলেন। ছিমছাম বাসা।

তিনি রিটায়ার করেছেন। স্ত্রী আছেন, কিছুটা অসুস্থ। আমাকে ড্রয়িং রুমে বসানো হলো। ঘরের এক কোণায় একটা আলমারি। আলমারি জুড়ে আনুমানিক হাজারখানেক বই। বই বরাবরই আমাকে আকর্ষণ করার মতো জিনিষ। আমি বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলাম, এত বই কে পড়ে? আপনি? বৃদ্ধ বললেন, আরে না। শায়লা পড়ে। আগে অনেক বেশি পড়ত। তিন বছর ধরে কম পড়ে। আমার পেনশনের টাকা তুলে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ওকে বই কিনে দিয়েছিলাম। শায়লা ঘরে চা নিয়ে প্রবেশ করলেন। যথারীতি ওর মুখ নেকাবে ঢাকা। এত কঠিন পর্দা করে মেয়েটা! শায়লা বলল, আয়োজন খুব বেশি নেই। বাবা মাঝে মাঝে পাগলামী করে। আজকে আপনাকে নিয়ে আসবে আমাকে জানায়নি। আমি মাত্র বাইরে থেকে আসলাম। এখন কিছু ব্যবস্থা করাও কঠিন। কিছু মনে করবেন না প্লিজ। রাতে আমরা যা খাই তাই দিয়েই খাবেন। আমার ঘর খুটিয়ে দেখলাম। বিশেষ্যত্ব বলে তেমন কিছুই নেই। দেয়ালে লাগানো একটা ছবি দৃষ্টি আকর্ষণ করল। বৃদ্ধের সাথে একটা চরম রূপসী মেয়ে। অনুমিতভাবেই বলা যায় শায়লা।

আমাকে ছবির দিকে তাকাতে দেখে বৃদ্ধ বললেন, শায়লার ছবি। তিন বছর আগের। আমার মেয়েটা রাজকন্যার মতো সুন্দর না? আশ্চর্য ব্যাপার বৃদ্ধ কাঁদছেন! আমি বললাম, হাঁ, এত সুন্দরী মেয়ে খুব কম দেখা যায়। কিন্তু আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, হঠাৎ চোখে পানি আসা আমার রোগ। সন্তান পরীক্ষায় ভালো করলে যেমন চোখে জল আসে, তেমনি সন্তান সুন্দর বললেও চোখে জল আসে। শায়লা আয়োজন খারাপ বললেও আয়োজন ততটা খারাপ ছিল না। মুরগী ভুনা, শিং মাছের ঝোল, ডিম ভাজি আর পাতলা ডাল। বৃদ্ধ বললেন, মেয়ের রান্না। ভালো না? আমি বললাম, সত্যিই ভালো। এত ভালো রান্না এই জীবনে কম খেয়েছি। বৃদ্ধ বললেন, আমার মেয়েটা কি পরিমাণ ভালো কল্পনাও করতে পারবা না। এত গুণবতী মেয়ের বাবা হয়েছি আমি। আমার গর্বে মরে যাওয়া উচিত। বৃদ্ধ কাঁদছেন। কি অদ্ভূত! উনার বোধহয় কান্না করা রোগ আছে বোধহয়। আমি অফিস করতে গেলাম। সারাটা দিন মাথার মধ্যে দ্বীপান্তিতা ঘুরঘুর করতে থাকল। আমি অবচেতনভাবে আমার প্যাডে বারো বার “দ্বীপান্তিতা” লিখলাম।

বারবার মনে হতে থাকল আমি কি বেশি আশা করে ফেলেছি? বেশি চাওয়াই অনেক সময় হারানোর রাস্তা খুলে দেয়। মেয়েটার মধ্যে অদ্ভত এক ক্ষমতা আছে। লেখালেখির বাইরে কেয়ার করার ক্ষমতা। আমার সাথে যতদিন কথা বলেছে কিভাবে জানি আমাকে বদলে দিয়েছে। একদিন বলল, দেখুন আমি আপনার প্রেমিকা নই। প্রতি দিন আপনার খবর নিতে পারব না। সপ্তাহে একবার আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করব। আপনি যদি এক সপ্তাহের মধ্যে দুইটা ডিনার লাঞ্চ মিস করেন তবে আপনার সাথে এক সপ্তাহ আমার কোন কথা নেই। বিছানা না গুছিয়ে আপনি আমাকে ফোন দেবেন না। ঠিক আছে? কেমন সাধারণের মধ্যেই একটা অসাধারণ ব্যাপার। তার সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। অথচ মনে হচ্ছে তার সব জানি। তার ভেতরের আশ্চর্য এক নরম মায়াময় সত্ত্বার ছবি আমার কাছে স্পষ্ট।

লাঞ্চ শেষ করার পরপরই শায়লার ফোন আসল। আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও এবার ফোন ধরলাম। কেমন আছেন আপনি? আমি বললাম, ভালো আছি। আপনার কি খবর? ভালো। আপনাকে ফোন দিচ্ছি। আপনি ধরছেন না। ব্যস্ত নাকি বিরক্ত? আমি বললাম, না না বিরক্ত হবো কেন? বাবার খুব ইচ্ছে আরেকবার আপনার সাথে ডিনার করার। খুব করে বলছেন তো, তাই ফোন দিচ্ছি। আজকে আপনার অফিসে আসতে চেয়েছিলেন। আমি যেতে দিই নি। একটু ব্যস্ত তো। তাই সময় করতে পারছি না। শায়লা কাতর গলায় বলল, পারলে আজকে একটু আসুন না। প্লিজ, প্লিজ…একটু অনধিকার চর্চা হয়ে যাচ্ছে। তবুও বলছি। আমার এরকম মানসিক অবস্থা দাওয়াত খাওয়া উপযোগী না। দ্বীপান্তিতা যে কোন সময় হাঁ বা না বলবে। চরম আনন্দ বা চরম দুঃখ যে কোন কিছুর জন্য আমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। সে ফোন দিলে রিসিভ করার মতো অবস্থায় থাকতে হবে।

আমি বললাম, শায়লা আমি সময় করে ঠিকই আসব। আজকে আসতে পারছি না স্যরি। আপনার কি এমন কাজ! আমি করে দেয়ার মতো হলে বলুন করে দেব। তাও আসুন না প্লিজ আমি এবার বিরক্ত হলাম। ইচ্ছে হলো চিৎকার করে বলি, শায়লা পারলে আমার প্রেম জোড়া লাগিয়ে দাও। তোমাদের বাসায় একমাস থাকব। আমি কোনমতে বিদায় নিয়ে ফোন কেটে দিলাম। দ্বীপান্তিতা বলুন কি বলব বুঝতে পারছি না। আপনি কি আজকে একটু স্বাভাবিক হয়েছেন? আমি বললাম, না। আরো অস্বাভাবিক হয়েছি। প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত হয়ে পানি খোঁজা যতটা কষ্টের, পানি অর্ডার করে পানির জন্য অপেক্ষা করা তারচেয়ে বেশি কষ্টের। আপনি কিন্তু অনেক সুন্দর করে কথা বলেন। আপনার লেখা পড়েই এসব শিখেছি। এবার বলুন কবে দেখা হবে আমাদের? দ্বীপান্তিতা হাসতে হাসতে বলল, এত তাড়া কেন আপনার ব্যাংকার? জীবন সংক্ষিপ্ত। তাড়া থাকবেই। আচ্ছা আমি যে আপনাকে ব্যাংকার বলি আপনি রাগ করেন না? আমি তো ব্যাংকারই। রাগ করার কি আছে? ব্যাংকার কিন্তু আরেক অর্থে ব্যবহার হয়। ব্যাঙ্কার মানে যুদ্ধরত সৈন্যদের গোপন আস্তানা। সেটা তো খারাপ কিছু না।

গোপন শব্দটাই খারাপ। গোপন শব্দটাই নেগেটিভ। কিরকম? ব্যাঙ্কারে সৈন্য কখন থাকে? যখন সে সম্মুখে যুদ্ধ করার সাহস বা সুযোগ পায় না তখন। এটাকে কিভাবে পজেটিভ অর্থে দেখেন? এটা যুদ্ধ কৌশল। প্রেম এবং যুদ্ধে সবকিছুই শুদ্ধ। দ্বীপান্তিতা হাসতে হাসতে বলল, সত্যি বলছেন? মানেন তো এটা? আমি বললাম, হাঁ। মনে রাখবেন। কোন দিন কথাটা নিজের উপরেই চলে আসতে পারে। আচ্ছা মনে রাখব। ব্যাংকার, আপনার ফোনে কল আসছে। ধরবেন? আমি কান থেকে ফোন নামিয়ে দেখলাম শায়লার কল। মেয়েটা এত ফোন দিচ্ছে কেন? আমি প্রায় বিরক্ত হয়ে গেলাম। যদিও ওর মাঝে এখনো বিরক্ত হওয়ার কিছু পাওয়া যায় নি। কিন্তু এই সময়ে দ্বীপান্তিতার সাথে কথা বলা ছাড়া পৃথিবীর সবকিছুই বিরক্তিকর। দ্বীপান্তিতা বলল, ফোন রাখব? কথা বলবেন? আরে নাহ, পাগল হইছেন? কে ফোন করেছিল? না, ঐ যে কালকে যার কথা বলেছিলাম। ওদের বাসায় যাওয়ার জন্য ওর বাবা বলছেন। দ্বীপান্তিতা একটু হেসে বলল, ব্যাংকার একটা কথা বলি? রাগ করবেন না তো? আমি বললাম, বলুন।

আমি রাইটার তো, রাইটারদের কিছু ক্ষমতা থাকে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এই মেয়ে আপনার প্রেমে পড়ে গেছে। বাবার কারণে সে আপনাকে তার বাসায় যাওয়ার জন্য বলছে না, বলছে তার জন্যই। আপনি তার বাবাকে সাহায্য করেছেন, একটা মেয়ের প্রেমে পড়ার জন্য এটাই যথেষ্ট। হঠাৎ করেই সে আপনাকে প্রেম প্রস্তাব করে বসবে। সাবধানে থাকবেন। এই সমস্যা হবে না। হবে হবে। আপনি বুঝতে পারছেন না। মেয়ে সুন্দরী তো? হাঁ সুন্দরী। একবার দেখেছি। তাহলে কিসের চিন্তা। আর সব ঠিক থাকলে রাজী হয়ে যাবেন। আমি গলা নামিয়ে বললাম, আপনি কোথায় আঘাত করছেন জানেন? মজা করতে গিয়ে আপনি গলা টিপে ধরছেন। দ্বীপান্তিতা বেশ কিছুক্ষণ হাসল। তারপর বলল, স্যরি। একটু মজা করতেও দেবেন না, আশ্চর্য! আমি বললাম, কবে দেখা করবেন বলুন। আমার তর সইছে না। তার গলা হঠাৎ করেই নেমে গেল। একদম অন্য রকম গলা করে সে বলল, বেশি তাড়াহুড়ো ভালো না। কিছু কিছু কাজে দেরীতেই মঙ্গল।

আমি স্বপ্ন দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। আচ্ছা এমন কি হতে পারে না। দেখা হওয়ার পর আর কোনদিন দেখা হলো না? আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। আপনার তৃষ্ণা মিটে গেল? হবে না। হয়ে যায় ব্যাংকার। জগত বিচিত্র। জগতের সব হিসেব কারো জানা নেই। হিসেব আবিষ্কার করতে হয়। সৃষ্টি লগ্নে হিসাব বিজ্ঞান নামক পুস্তক কেউ সাথে নিয়ে আসে নি। ধীরে ধীরে সব কিছুরই জন্ম হয়েছে। আপনার কথা যত সুন্দর পৃথিবী তত সুন্দর না। কথার মারপ্যাচে যাব না। দেখা কবে করছেন বলুন। দেখা করার ঝুঁকি সত্যিই নেবেন? অবশ্যই। আচ্ছা আমি ডেট জানিয়ে দেব। আজকে আমার চরম সুখের দিন। আমার স্বপ্নের নায়িকা অবশেষে দেখা করতে রাজী হয়েছে। সারা পৃথিবী চিৎকার দিয়ে সে খবর জানিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো। পৃথিবীর কোন সুখই বোধহয় নির্ভেজাল হয় না। আমার এই সুখও নির্ভেজাল হলো না। আমার ফোন ভাইব্রেট করে একটা মেসেজ আসল।

“আমি জানতাম আপনি আসবেন না। তাও আপনার জন্য খাবার রেডি করে আমি বসেছিলাম। কেন বসেছিলাম জানি না। হয়তো কোন কারণ আছে। কারণ একটাই হতে পারে, আপনাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। আপনার কাছে কোন দাবী নেই। তবুও আগামী শনিবার দুপুরে আমি সেজেগুজে আপনার জন্য বসে থাকব। আশা করি আসবেন, যদিও জানি আসবেন না। স্বপ্ন আর জানার মধ্যে কোনটা জয়ী হয় দেখব। গত তিনটে বছর কেউ আমাকে সাজতে দেখে নি। আপনি দেখবেন না? শায়লা” শায়লার প্রেম নিবেদন আমাকে দ্বীপান্তিতার প্রতি আরো দুর্বল করল। কি অসাধারণ লেখিকা! আমি যা ভাবি নি সেটা সে ধরে ফেলেছে? এই মেয়েটা সত্যি সত্যিই প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে দিল? এত অসাধারণ সুন্দরী মেয়ে! শনিবারের বাকি চার দিন। আমার যাওয়া উচিত হবে কিনা ভাবছি। একবার যাওয়া যায়। গিয়ে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলা যায় আমি সম্পর্কে আছি। আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব না। নইলে ঝামেলা পরে বাড়তে পারে।

আমার জগত যে আর স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই সেটা বুঝতে পারলাম দুই দিন পর। দ্বীপান্তিতা শনিবার দেখা করতে বলেছে। কি কাকতালীয় ব্যাপার!অবশ্য কাকতালীয়কে পাত্তা দেয়ার সময় এখন নয়। জগতের সব কাজই এই মুহুর্তের তার সাথে দেখা করার চেয়ে তুচ্ছ। শনিবারের বাকি ৪৮ ঘন্টা। না না ৪৮ হাজার ঘন্টা। তাও না, ৪৮ হাজার কোটি ঘন্টা। কবে আসবে সে দিন? আমি আমার প্রিয় কালো রঙের পাঞ্জাবী ইস্ত্রি করলাম। শেভ করলাম। একদিন আগে থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ। তার সামনে বিন্দাস চেহারা নিয়ে যাওয়া যাবে না। আচ্ছা সে দেখতে কেমন হবে? যদি সত্যিই কালো হয় তবে খারাপ লাগবে না? হয়তো লাগবে। তবে সেটা ভালো লাগাতে আড়াল হয়ে যাবে। আমি আমাকে চিনি। বর্ণবাদের কাছে আমি হারব না। দেখা করার আগের রাতে অনুমিতভাবেই মেজাজ খারাপ করার মতো ঘটনা ঘটল। আবারো টেক্সট আসল ফোনে।

“আমি কিন্তু সত্যিই দুপুরে সেজেগুজে বসে থাকব। আসবেন তো? প্লিজ আসুন না, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ..আর কোন দিন আপনাকে দেখা করতে বলব না। কেবল একটাবার আমি মনে মনে বললাম, স্যরি শায়লা। কিছুই করার নেই। একদম কিচ্ছু করার নেই। আমি ধানমন্ডি লেকের নির্দিষ্ট জায়গাতে বসে আছি। দ্বীপান্তিতা এখানেই থাকতে বলেছে। সে আসবে দুপুর আড়াইটায়। এখন বাজে দেড়টা। আমি আগেভগেই চলে এসেছি। এসে মনে হচ্ছে ভুল করেছি। সময় কাটছে না। এর মধ্যেই শায়লা চারবার ফোন করেছে। এখন সিরিয়াসলীই বিরক্ত হচ্ছি। একটা উপকার করতে গিয়ে একটা ক্লোজ হওয়া উচিত হয় নি। শুধু শুধু ঝামেলা বাড়ালাম। মেয়েটাকে এতটা ইগনোর করা কি ঠিক হলো? সে যে খুব সমস্যা করেছে তা না। এত চমৎকার গোছানো একটা মেয়ে। এভাবে কষ্ট দেয়া উচিত হলো? উচিত অনুচিতের সময় এখন নয়। আজকের দিনটা কেবল দ্বীপান্তিতার। অন্য কোন মঙ্গল- অমঙ্গল নিয়ে পরে ভাবা যাবে। দ্বীপান্তিতা আসল ঠিক আড়াইটাতেই।

“ব্যাংকার কেমন আছেন?” আমি ঘাড় ঘুরিয়ে যখন তাকে দেখতে পেলাম তখন আমার মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। আমার মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী আমার সামনে দুলছে। কিভাবে সম্ভব হলো এটা? ঘাড় ঘুরিয়ে বোরকা পরা নেকাব দিয়ে মুখ ঢাকা মানুষটা আমার পরিচিত। আমি তাকে স্পষ্ট চিনতে পারছি। আমি প্রবল বিস্ময়ে কেবল দুইটা শব্দ উচ্চারণ করলাম, শায়লা আপনি! অরেকক্ষণ ধরে আমাদের কারো কোন কথা হলো না। আমার বুকের মধ্যে অদ্ভূত এত অভিমান বাসা বাঁধল। কেন হলো এমন? দ্বীপান্তিতা কেন এরকম করতে গেল? আমাকে কি খেলনা হিসেবে ব্যবহার করল? অনেকক্ষণ পর দ্বীপান্তিতা..না না শায়লা বলল, রাগ কমেছে আপনার? আমার রাগ মোটেই কমে নি। আমি মুখ ঘুরিয়ে বললাম, কি বলবেন বলে ফেলুন। সে বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খানিকটা কাতর গলায় বলল, আর আমাদের দেখা হবে? জানি না। তার মানে সম্ভবত হচ্ছে না। আমার চোখে পানি চলে আসছে। কঠিন অভিমান।

আমি বললাম, আমি তো খুব সাধারণ একজন মানুষ। আমাকে নিয়ে এরকম কিছু করার খুব দরকার ছিল? এত কঠিন কিছু! আমাকে আপনার গল্পের মতোই একটা প্লট না করলেও পারতেন আপনাকে ব্যক্তি হিসেবে ভালোবাসতে চেয়েছি, সেটা হয়তো অপরাধ হয়েছে। কিন্তু লেখক হিসেবে আপনার প্রতি যে শ্রদ্ধা ছিল তার দামটাও দিলেন না! সে বলল, পৃথিবী বড়ই নিষ্টুর ব্যাংকার। এখানে সবাই গল্পের প্লট। আমিও গল্পের প্লট। কঠিন সব গল্প। আপনাকে সব বলব। তার আগে বলুন আপনি কি দ্বীপান্তিতাকে এখনো ভালোবাসেন? আমি সময় নিয়ে বললাম, হাঁ। শায়লাও কিন্তু সত্যি সত্যিই আপনাকে ভালোবাসে। সে সত্যিই ঐ দিন আপনার জন্য খাবার নিয়ে বসে ছিল। আজকেও সে সত্যিই আপনার জন্য বসে অপেক্ষা করেছিল। তাই নাকি? হাঁ। এবার আপনি বলেন আপনি কাকে চান? শায়লা নাকি দ্বীপান্তিতা। শায়লা বাস্তব, দ্বীপান্তিতা অবাস্তব।

আমি মরিয়া হয়ে বললাম, তার আগে বলুন আমার সাথে এরকম করলেন কেন? দ্বৈত আচরণ না করলেই কি হতো না? সেটার ব্যাখা পরে দেব। আপনি কাকে চান? নাকি দুজনকেই রিফিউজ করবেন? আমি বললাম, আমি দুজনকেই চাই। যে আমাকে ভালোবাসে তাকে, যাকে আমি ভালোবাসি তাকেও। তার আগে সত্যিটা জানতে হবে। শায়লা বলল, ব্যাংকার..আপনি আমার দেখা সেরা মানুষ। বাবা ছাড়া আর কোন পুরুষকে কোনদিন বিশ্বাস করব আশা করি নি। আপনি আমার ধারণা বদলে দিয়েছেন। আপনার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। আমি সত্যি সত্যিই আপনাকে ভালোবাসি তাহলে আর কি বলার থাকতে পারে! আছে। আছে বলেই আমি চাই আপনি সব ভুলে যান। ভালোবাসি বলেই আমি চাই আপনি বাসায় চলে যান। গিয়ে একটা ঘুম দেন। তারপর শায়লা দ্বীপান্তিতা দুজনকেই ভুলে যান। কথা দিচ্ছি শায়লা আপনাকে কোন দিন ফোন দেবে না, দ্বীপান্তিতা আর কোন দিন গল্প লিখবে না।

আমি মরিয়া হয়ে বললাম, এসবের মানে কি? এগুলো কোন ধরণের খেলা? মানে আছে। আপনি যাবেন প্লিজ? পায়ে পড়ি আপনার। আমি যাওয়ার জন্য আসি নি। খুব কঠিন এক গল্প আছে আমার। আপনি নিতে পারবেন না। আপনার মতো মানুষের জীবন কঠিন হোক আমি চাই না। আপনি কোন কারণে হেরে গেছেন এটা দেখতে ভালো লাগবে না। আমি সবকিছুর জন্যই প্রস্তুত দ্বীপান্তিতা সত্যি বলছেন? হাঁ। আচ্ছা। আমি নেকাবটা খুলি। এভাবে কথা বলতে ভালো লাগছে না। শায়লার চেহারা ছবিতে দেখেছি। দ্বীপান্তিতাকে দেখার অধীর আগ্রহ তাই অনেকটাই কমে গেছে। মেয়ে মানুষ নেকাব খুলছে এ অবস্থায় তার দিকে তাকিয়ে থাকা অভদ্রতা। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। তার নেকাব পুরোপুরি খুলে সে আমার দিকে তাকাল। আমি জীবনের সবচেয়ে বড় চমক খেলাম। বিস্ময়ের ধাক্কায় আকাশ- পাতাল- পৃথিবী সবকিছুকেই এক মনে হলো। আমার সামনে কোন মানুষের মুখ, কোন পরাজগতের কারো মুখ ভাসছে।

জীবনে এই প্রথম কোন এসিডদ্বগ্ধ মানুষকে আমি দেখতে পাচ্ছি! অনেকক্ষণ পর শায়লা বলতে শুরু করল। “আমি অসাধারণ সুন্দরী ছিলাম। জানেন সেটা জানেন। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। আদরের শেষ দেখেছি। অসাধারণ এক শৈশব, অসাধারণ এক কৈশোর কেটেছে আমার। তবে বাঁধ সাধল যখন বড় হলাম। আমার চারপাশে মুগ্ধ মানুষের দল ঘোরাঘুরি শুরু করল। আমাকে ছুঁয়ে দেখার মতো অসংখ্য হাত। আমি বোরকা পরা শুরু করলাম। মুখ ঢেকে হাঁটাচলা করতাম। তাতে সমস্যা খুব একটা কমল না। তার মধ্যে একটা ছেলে একটু বেশিই সমস্যা করল। প্রকাশ্যে জড়িয়ে ধরতে চাইল একদিন। আমি চড় বসিয়ে দিলাম। তারপর দিনই নেমে আসল অন্ধকার। কিছুই জানি না। কেবল এটাই জানি, এক অসহ্য যন্ত্রণা শরীরজুড়ে। যখন আয়না দেখলাম আরো বেশি কষ্ট পেলাম। আমাকে আমিই চিনতে পারছি না। আমি আগে কাঁদলে অনেক মানুষ সহানুভূতির জন্য এগিয়ে আসত।

এসিড দ্বগ্ধ হওয়ার পর আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম সহানুভূতি কমে যাচ্ছে। যারা অতীতে আমার পেছনে ঘুরঘুর করত তারা কেউ আমার আশেপাশেও আর আসল না। যে ছেলেটা এসিড মেরেছিল সে দুই বছরের মাথাতেই জেল থেকে ছাড়া পেল। এখনো সে আমাকে কুটুক্তি করে। তবে এখন ঘেন্নায়। পুরো পৃথিবী বদলে গেল আমার। আমি মুখ ঢেকে চলাফেরা শুরু করলাম। আসলে মুখ ঢেকে না, মানুষের চোখ ঢেকে। আগে লোভাতুর পুরুষের চোখ ঢাকতাম, এখন ঢাকি নারী পুরুষের ঘেন্না করা চোখ। আমি একটা এনজিওতে চাকরি নিলাম। জানতাম এভাবেই জীবন কাটাতে হবে। পাশাপাশি শুরু করলাম লেখালেখি। এরমধ্যেই আপনার সাথে পরিচয়। হাসপাতালে আপনার নাম্বার পেয়ে অবাক হয়েছিলাম। পত্রিকার সাথে মিলে যাওয়ার কারণে ফোন দিই। অনেক কষ্ট করে শায়লা- আর দ্বীপান্তিতাকে আলাদা করতে হয়েছে আমার। দুই রকম ভাবে কথা বলতে হয়েছে। দুই রকম চরিত্র সৃষ্টি করতে হয়েছে।

আমি জানি আমি অন্যায় করেছি। আপনাকে জড়ানো ঠিক হয়নি। কিন্তু একজন শুদ্ধ পুরুষকেও হারাতেও ইচ্ছে করে নি। আপনাকে যখন পেলাম তখন আমার শায়লা সত্ত্বার ইচ্ছে হলো আপনাকে ভালোবাসুক। আবার আপনি যখন দ্বীপান্তিতাকে ভালোবেসে ফেললেন তখন আবার আপনার ভালোবাসা নিতে ইচ্ছে হলো। অনেক বার চেয়েছি আপনাকে আসল ব্যাপার বলে ফেলি। কিন্তু এই প্রথম কোন পুরুষের শুদ্ধতম ভালোবাসা নেয়া এবং একইসাথে কোন পুরুষকে শুদ্ধভাবে ভালোবাসার সুযোগ হাতছাড়া করতে ইচ্ছে হয়নি। আমি বড় বেশি দুঃখী, জানেন? আমাকে মাফ করে দেবেন।” শায়লা দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছে। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। আমার কথা বোধহয় ফুরিয়ে গেছে। সে বলল, তবে আপনি চাইলে ঘটনাটকে পজেটিভভাবে নিতে পারেন। একজন মানুষের জীবন কত বিচিত্র হতে পারে আপনার জানা দরকার। দুইটা মানুষ কিন্তু ত্রিভুজ প্রেম…এই অসাধারণ জিনিষটার সাক্ষী হয়ে রইলেন আপনি। আমি এখনো চুপ করে বসে আছি।

আমার চোখ জ্বলছে। রাগে ক্ষোভে না দুঃখে বুঝতে পারছি না। কার উপরেই বা রাগ সেটাও নির্ণয় করা যাচ্ছে না।
শায়লা বলল, দ্বীপান্তিতা নামের অর্থ জানেন? আমি অনেকক্ষণ পর বললাম, জানি। যে আলো জ্বেলে রাখে। ভুল জানেন। ঐটা আলাদা শব্দ। দীপ আর দ্বীপ আলাদা। আপনি যে দীপান্তিতার কথা বলছেন এটা সেটা না। এই শব্দের অর্থ দ্বীপে নির্বাসন। আমি নিজেকে নির্বাসিতই ভাবি তাই এই নাম নিলাম। সে আরো খানিকক্ষণ পর বলল, আপনাদের সমাজের কি সুন্দর সিস্টেম দেখেছেন? ভালোবাসলও পুরুষ, এসিড ছুঁড়লও পুরুষ..আবার সেই পুরুষই ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল।

মেয়েরা সমাজে কি সুন্দর ক্রীড়ানক! আপনাকে আমি কষ্ট দিয়েছি। আপনি আমার প্রতারণায় কষ্ট পেয়েছেন। তবে আপনি ঠিকই এক সময় ভুলে যাবেন। কিন্তু আমার কষ্ট কি করে ভুলব? নিজেকে হারানোর কষ্ট, সমাজ হারানোর কষ্ট সবশেষে আপনাকে হারানোর কষ্ট। তাকে শায়লা বলব না দ্বীপান্তিতা বলব বুঝতে পারছি না। তবে এটা বুঝতে পারছি সামনের এসিডদ্বগ্ধ মেয়েটির চেয়েও আমি অসহায় হয়ে পড়ছি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত