একটি আত্নহত্যার গল্প

একটি আত্নহত্যার গল্প

মোহিতা,
তোমাকে কিভাবে সম্বোধন করব,তা আমি আগে কোনদিন ভেবে পাই নি,এখনো পায় না। বেশ কয়েকবার তোমাকে পত্র দিয়েছি,প্রতি ক্ষণে ক্ষণে মনে হয়েছে তোমার পত্র এই বুঝি আসবে,তাই প্রতিনিয়ত আজ আশা ভঙ্গের বেদনায় ছটফট করছি।বুঝি না,তুমি কিভাবে চিঠির উত্তর না দিয়ে থাক?এই বিষয়টা এখনো আমাকে বিস্মিত করে।তুমি সত্যিই পার। অন্য কোনও মেয়ে হলে হয়তো দু-একটা শান্ত্বনার বাণী পাওয়া যেত। থাক,অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে তোমাকে ছোটো করতে চাই না।শুনলাম,তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে-সত্যতা যাচাই করি নি।শুনে একই সাথে খুশি হয়েছি,আবার বেদনাও পেয়েছি।জানি,আমার আনন্দ-বেদনার দাম তোমার কাছে কোনদিন ছিল না,হঠাৎ করে তা আর্বিভূত হবে তা আমি বিশ্বাস করতে চাই না। জানি,বিশ্বাস করলেই বিশ্বাস ভঙ্গের কষ্টে আবার আমার অনেকদিন ভূগতে হবে। অনেকদিন ধরে তোমায় দেখতে পাই না। নিজেকে এত আড়াল করে কিভাবে রাখ,তা আমার মাথায় ধরে না। আগে তাও সামনাসামনি দু-তিনদিন দেখা পাওয়া যেত সপ্তাহে। সে দু-তিনদিন যে আমার কী ভাল যেত,তা হয়তো তোমার বুঝার ক্ষমতা কোনদিন হবে না।কারণ যে কোনদিন কাউকে ভালবাসেনি,তার মর্মাথ বুঝার ক্ষমতা তাকে দেয় না।তুমি যখন সামনে দিয়ে আসতে,আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম।প্রকৃতি কাউকে এত সুন্দর করে তৈরী করে,তোমাকে না দেখলে আমি কোনদিন বিশ্বাসই করতাম না। ভাবতাম,একটু সামনে এলে তোমার সাথে কথা বলব,কিন্তু যেই তুমি সামনে এসে যেতে-আমি নির্বাক হয়ে যেতাম। শত চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে একটি শব্দ বের হত না। একদিন শুধু উচ্চারণ হয়েছিল-মোহ। তুমি আমার দিকে ফিরে তাকিয়েছিলে। প্রচন্ড রাগে কাপতে ছিলে। মনে হচ্ছিল,একটা অঘটন ঘটাবে। না। তুমি চলে গেলে। মনে মনে সেদিন ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম-মনে হয়েছিল বেশ বড় বাচলাম। তারপর আর তোমার যাওয়া আসার পথে দাড়ানোর সাহস পাই নি। নিজেকে ভীতু-কাপুরুষ মনে হয়েছে-তাতে কার কী আসে যায়? নিজেকে নিয়ে আমার একসময় বেশ গর্ব ছিল,ছিল অনেক অহংকার। সব একে একে ভাঙ্গল,ভালবাসা আমাকে এমনভাবে গড়ে তুলল ভিন্ন মানুষে।তাই আজ আমার মনে হয়,প্রত্যেক মানুষের অন্তত একবার ভালবাসা উচিৎ।

আমি অনেকদিন হল হাসতে পারি না।আশে পাশের কাউকে হাসতে দেখলে,তাই আজ বড় ঈর্ষা হয়।বুঝলাম,মানুষ কত সুখী হলে হাসতে পারে?আমিও একদিন এমন প্রাণবন্ত ছিলাম।আজ সেদিনগুলো গল্পের মত লাগে-লাগে বড়ই কল্পনাময়।দিন দিন একটি মানুষ শেষ হয়ে যাচ্ছে-আর একটি মানুষ সব জেনেও আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।বাহ!প্রকৃতির কি অমোঘ নিয়ম?এসব নিয়ম যিনি তৈরী করেছেন-তিনি কি চোখে দেখেন না?তাই মাঝে মাঝে মনে হয়-তিনি হয়তো চোখেও দেখেন না বা অন্তর দিয়ে উপলব্দিও করতে পারেন না-নইলে আমার এমন দশা কেন হবে?কেন আমার একা একা দুখে দুখে মরা?কী জন্যে?সে প্রশ্নের উত্তর আজও আমি খুজে পাই নি।

বেশি আর লিখব না।কিন্তু লিখতে গেলে যে কলম আমার থামে না।ননস্টপ ভাবে চলতে থাকে।এসব না লিখে কি পারা যায়?জানি,তুমি হয়তো চিঠিটা পড়বে না,অসহ্য রাগে চিঠিটা নিক্ষেপ করবে তোমার বাড়ির পাশের ডাস্টবিনে-যার সামনে গেলে কোনও সুস্থ মানুষ বমি না করে পারবে না। চিঠির ভাগ্যে যাই হোক,তবুতো আমি মনের কথাটা সানন্দে বলতে পারছি।কিন্তু তুমিতো তাও পারলে না।যত রাগ ক্ষোভ আছে,চিঠির মধ্যে লিখে পাঠাতে পারতে-দিতে পারতে পৃথিবীর যত নোংরা বকা আছে-স্টুপিড,গর্দভ-যা ইচ্ছা হয়। এই একটা বিষয়েই আমার কাছে তোমাকে বড় অবহেলিত মনে হয়-আট দশটা সাধারণ মেয়ের মত।তাই ভয় হয়,তুমিও বুঝি আট দশটা মেয়ের মত মাংসপিন্ড হয়ে যাও।আমার স্বপ্নে আকা মানসীর এমন হবে,তা আমি কল্পনাই করতে পারি না। তাই আমি এখন মাঝে মাঝেই আৎকে উঠি-চিৎকার করে উঠি ঘুমের মাঝে-সে চিৎকারে আমার রক্তের প্রতিটা কণা থরথর করে কাপতে থাকে-আমার মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রনা হয়।বিশ্বাস কর,এভাবে আজ অনেক রাত হলে আমি ঘুমাতে পারি না-দু তিনটা ঘুমের অষুধ খেয়েও।সারা রাত জেগে থাকি নিঃসঙ্গতার অসহ যন্ত্রণা নিয়ে। এমনিভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে-অসহ্য হয়ে উঠছে আমার জীবন। তাই এবার ভেবেছি,তোমাকেও মুক্তি দিব,নিজেও মুক্ত হব।জীবন হচ্ছে সুন্দরভাবে বাচার,তা যদি শুধু যন্ত্রণার হয়,সে জীবন রাখার কোনও মানে হয় না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আত্নহত্যা করব-চলে যাব অজানা দেশে-যেখানে কোনও দুঃখ নেই,ব্যথা নেই,যন্ত্রণা নেই। ভয় নেই-তোমার নামে অভিযোগ লিখে রাখব না-সে ধরণের মানসিকতা আমার কোনদিন ছিল না-আজও নেই। মাঝে মাঝে তোমাকে বউ হিসেবে কল্পনা করতাম-সে কল্পনায় তুমি পড়তে হলুদ শাড়ি,হলুদ ব্লাউজ আর কপালে হলুদ টিপ।মাথায় ঘোমটা দিয়ে থাকতে।যতবার বলি এই ঘোমটা খোল,তুমি কিছুতেই রাজি হতে না। জানি বাস্তবে তোমাকে কোনদিন এভাবে দেখতে পাব না-তাই সে ইচ্ছাটা কোনদিন পূরণ হবার নয়।পাগলামি,তা ছাড়া কি?ভাবি,মানুষতো কত ধরণের পাগলামি করে-আমিও নয় এক ধরণের পাগলামি করলাম।প্রেমতো এক ধরণের পাগলামিই।তা ছাড়া কি?

মাঝে মাঝেই ইচ্ছে হয়,তোমার প্রাণখোলা হাসি দেখি। কিন্তু তুমিতো আমায় দেখতেই পার না-সামনে গেলেই প্রচন্ড রেগে যাও।তাই এই ইচ্ছাটাও অপূর্ণই রয়ে যাবে। আমার সব ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে যাবে-এমন কি কারও হয়?কত বড় দুর্ভাগা আমি,ভেবে দেখ।সামনে পূর্ণিমা। আকাশের পূর্ণ চাঁদ দেখব।রাত গড়িয়ে যখন কাটায় কাটায় বারটা,ঠিক তখনি আমার নিথর দেহটা ঝুলে থাকবে ফ্যানের হূকের সাথে।মা-বাবা তখন গভীর ঘুমে। তুমিও হয়তো। ঐ দুজন মানুষের জন্যই কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। সকালে উঠে কী কান্নাই না করবে?
আর বাড়াব না।ভাল থেকো,সুখে থেকো।ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুক।
নিবেদক
তোমার চির অবহেলার পাত্র নাবিল

সন্ধ্যাবেলা। চেয়ারে বসে মোহিতা।মাথা ব্যথা করছে।আগে ছিল না।গত মাস হতে ছয়-সাতদিন পরপর মাথা ব্যথা হচ্ছে।ডাক্তার দেখাবে দেখাবে করেও দেখানো হচ্ছে না।সামনে ইন্টার পরীক্ষা।হাতে মাত্র তিন-চার মাস আছে।এখন যদি এরকম ঘন ঘন মাথা ব্যথা শুরু হয়-তাহলেতো বিশাল সমস্যা।কয়েকদিন হল,বান্দরটা আবার চিঠি দিয়েছে।একে নিয়ে আর পাড়া যায় না।গর্দভ মজনুদের জ্বালা আর ভাল লাগে না।মনে হয়,গালে গালে থাপড়াই।থাপড়িয়ে দাতগুলো একেবারে ফেলে দেই।বারবার এরকম সহ্য করা যায় না।মোহিতার মাথা ব্যথা আরও বেড়ে যাচ্ছে।বেশ রাত হয়েছে।মোহিতা ছাদে গেল।আকাশে পূর্ণ চাঁদ।চাঁদের আলোতে আলোকিত রাত্রি।সাদা মেঘের ভেলায় চাঁদের আলো অপরূপ শোভা সৃষ্টি করেছে।মোহিতা এ দৃশ্য খুব এনজয় করছে।মাথা ব্যথা পর্যন্ত থেমে গেছে।এমন সময় মোবাইলে ম্যাসেজে এল-বান্দরটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছে।কত বকা দিয়েছি-তাও কাজ হয়নি।জোর পদক্ষেপ না নিলে হচ্ছে না।বদমাশটা লিখেছে-জীবন যত দিন সুন্দর,ঠিক তত দিনই মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার।কারণ জীবনটা সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য-সবসময় নিরানন্দ ভাবে কাটানোর জন্য নয়।ভাল থেকো।

মোহিতার ম্যাসেজটা বেশ লাগল।তার কেন জানি মনে হচ্ছে,নাবিলকে ভালবেসে ফেলেছে।মোহিতা ফোন দিল।ওপাশে মোবাইল বেজে যাচ্ছে।কেউ ধরছে না।ছটফট করতে লাগল।তার মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে।রুমে গিয়ে নাবিলের চিঠিটা পড়ল।মোহিতার মাথা ঘুরতে লাগল।যেন হারিয়ে ফেলেছে তার সমস্ত শক্তি।তখন ঠিক এগারটা পঞ্চান্ন।মোহিতা বেরিয়ে পড়ল।বারটা বাজতে দুই মিনিট।নাবিলকে বাঁচাতেই হবে।ঘড়িতে টুন শব্দ হল।মোহিতার হৃদয় যেন চমকে উঠল।বারটা পাচ।নাবিলের রুমের সামনে।লাইট জব্লছে।দরজায় নক করল।কোন সাড়া নাই।আরও কয়েকবার।তবুও নাই।একটু জোরে ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল।রুমে কেউ নেই।মোবাইলটা বিছানায় পড়ে আছে।সাইলেন্ট করা।মোহিতা অবিরাম কাপছে।পাশের রুমে উকি দিতেই-মোহিতা চিৎকার করে উঠল।নাবিলের প্রাণহীন দেহটা ঝুলে আছে ফ্যানের হূকের সাথে বাধা দড়ির সাথে।

তিন-চারদিন পর।মোহিতা হাসপাতালে-স্যালাইন চলছে।দুই দিন জ্ঞান ছিল না।নাবিলের বাবা মার যে কী অবস্থা,তা বলে বুঝানো যাবে না।

অনেকদিন হল-নাবিলের বাবা মা ও মোহিতার খোজ নেওয়া হয় না।শুনেছি,গত বছর মোহিতার বিয়ে হয়েছে।স্বামী বিশাল ধনী-কোন কিছুর অভাব নেই।সেও হয়তো কোনদিন ভুলে যাবে বেছেড়াকে।যে ছেলেটা মেয়েটাকে এত ভালবেসে নিজেকে শেষ করেদিল,অথচ বিনিময়ে জীবন থাকতে এক বিন্দু ভালবাসা পেল না,তার জন্য কেমন জানি কষ্ট হচ্ছে।তার মত এমন হতভাগা জগতে আছে কিনা,কে জানে?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত