কিছু কথা বাকি এখন ও

কিছু কথা বাকি এখন ও

রুমাঝুম রুমাঝুম
রুম ঝুম নুপুর পায়ে
আসিল রে প্রিয়
আসিল রে।

আসিফ এর বাসার পাশে এই নাচের স্কুল। তিনটার পর থেকে তবলা নুপুরের বাচ্চাদের কলকাকলির আওয়াজ। প্রতি দুপুরের ভাত ঘুম মাটি তার। তবু বিরক্ত হয়না সে। কান খাড়া করে গান তবলা নুপুরের আওয়াজ শোনে। তার নৈশব্দের জগতে এই শব্দ ই শুধু আপন। আপনজন সবাইকে ছেড়ে নিরিবিলি জীবনের শেষ কটা দিন কাটাতে সে চলে এসেছে এই স্থান একটু দুরে তার সব আপনজনের কাছে থেকে।

মজা পাচ্ছে সে এইভেবে এই গানের সাথে বাচ্চার নাচ করাচ্ছে দেখে। তার রুম এর জানালা থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মেয়েটিকে যে নাচ শিখাচ্ছে। বেশ দেখতে মেয়েটি মায়াবী ঢল ঢলে চেহারা। অপলক নয়নে দেখে আসিফ মেয়েটিকে। মেয়েটির সাথে কচি কিছু মেয়ে নাচের প্র্যাকটিস করছে।

বাচ্চা মেয়েটিকে দেখতে দেখতে চমকে কিছুটা আগের সময়ে চলে যায় ,কিছুটা অতীতে। সিঁথির ভাই এর মেয়েটির মত দেখতে একেবারে গুটলু গুটলু।

সিঁথি আহ সিঁথি। হটাৎ যেন বিস্মৃতির আড়াল থেকে বেড়িয়ে এল সে । দীর্ঘ আট মাস সিথিকে দেখেনা সে। ভাবলে ও অবাক হয়ে যায়। যে একসময় শরীর স্পন্দন এর মত ছিল । একসাথে লেপ্টে থাকত তারা সারাদিন ।

সে নিজে ছেড়ে এসেছিল সিঁথি কে স্বেচ্ছায়। না ছেড়ে বা কি করে। ডাক্তার রা তার সময় বেধে দিয়েছে একবছর। তার লিউকিমিয়া। কাওকে না জানিয়ে বলা যায় একরকম পালিয়ে এসেছে। একরকম সিথিকে বলা যায় অপমান করে সে এখানে এসেছে। যেদিন ঘর ছেড়ে চলে এসেছিল বলা যায় সিঁথির হতভম্ভ মুখের উপর রুড কথা বলে সে চলে এসেছিল। বড় অন্যায় হয়েছে। তারপর ও কিছু করার ছিলনা। সে চাচ্ছিল সিঁথির মন থেকে সে দূর হয়ে যাক একেবারে।

২বিকাল এর এই সময় টা খুব নিঃসঙ্গ কাটে। বুকের ভিতর টা থেকে থেকে হু হু করতে থাকে। আজ আবার আকাশে মেঘ করেছে। এরকম আবহাওয়ায় চিৎকার করে কাদতে ইচ্ছে হয়। আপন মানুষের অনুপস্থিতি র বোধ তীব্র হয়। আশেপাশের জায়গা জনশূন্য হয়ে গিয়েছে এর মধ্যে। বড় ঝড়ের পূর্বাভাস দেখে মানুষ প্রাণী এমনকি পাখি রা ফিরে গিয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে। তার ঘরের নিরাপদ আশ্রয় এখন বেশি অসহনীয়। এইভাবে অপঘাতে মরে যাইনা একদিন ভাবে সে।

হুইসেল বাঝিয়ে ট্রেন থামল। ট্রেন থেকে কেও একজন নামল দূর থেকে দেখা যাছে। মেয়ে শাড়ি পরা। বাতাসে শাড়ির আচল উড়ছে। তাকিয়ে আছে সে অভিভূতের মত।

মেয়েটি কাছে প্রকৃতি আলো করে হেসে দিয়ে বলল
যাক তোমাকে পেলাম অবশেষে “কেমন আছ “?
আসিফ এর অভিভূতের ভাবটা এখন ও সরেনি।
সিঁথি অনেক দিন পরে।

তার শৈশব থেকে কৈশোর ,কৈশোর থেকে যৌবন ,সংসার তার জীবনে একমাত্র নারী।
হাতে অনেক ব্যাগ। সামলাতে সে হিমশিম খাচ্ছে।
কয়েকটা ব্যাগ হাত থেকে নিয়ে নিল আসিফ।

আবেগে ভেসে যাচ্ছে তার হৃদয়।

৩। ঘরে এসে দরজা জানালা সব বন্ধ করে দিয়েছে। দুনিয়া প্রলয়ের মত করে বৃষ্টি হচ্ছে। গত তিন বছরে এরকম বৃষ্টি আর হয়নি। সিঁথি বসে আছে আসিফ এর হাত ধরে। সে এসেছে বিশেষ সংকল্প নিয়ে। যে করে হোক আসিফকে এই স্থান থেকে নিয়ে যাবে পূর্বের স্থানে।

কি দিয়ে যে তোমায় আপ্যায়ন করি। বলে কয়ে আসবেনা নীরবতা ভেঙ্গে এতক্ষণে বলে উঠে আসিফ।

বললে কি আর তুমি থাকতে, পালাতে। সিঁথি হেসে উঠে বলে।

আমি আজকের খাওয়ার আর কিছু বাজার নিয়ে একসপ্তাহ পর্যন্ত চলবে।

আসিফ এখন ও অভিভূত হয়ে আছে। তুমি কি এখানে থাকবে নাকি ? অবাক হয়ে বলে।

হ্যা তুমি যেখানে আমি সেখানে সেকি জাননা। জেদের স্বরে বলে। ফাকি দিয়ে চলে আসছ আগে। থামাতে পারিনি ওইসময়।

খাওয়া দাওয়া আনন্দে কাটল অনেকটা সময় আগের মত। রাতে শুতে এসে দেখে সিঁথি সেই আগের মত রাতের পোশাকে বিছানায় বসা। অস্বস্তি বোধ করে ঘর থেকে বের হতে দৌড়ে পথ আগলালো তার।

ব্যাপার কি ? এইভাবে চলে যাচ্ছ কেন ?আমি তোমার স্ত্রী।

আসিফ সত্যি অসহায় বোধ করছে এইধরনের পরিস্থিতি তে।

আমি আগের সেই বোধ আবেগে ফিরে যেতে চাইনা সিঁথি। মাপ কর আমাকে। কাতর গলায় বলে।

আমার অপরাধ ?,চোখে জ্বল আসে তার।

সিঁথিকে চমকে সেই কথা বলে ফেলে। আমার লিউকিমিয়া। জীবনের শেষ কয়টা দিন কোন আসক্তি ছাড়া পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চাই। আমাকে দয়া কর। তোমার সাথে আবার ইনভলব হলে পৃথিবী ছেড়ে যেতে অনেক কষ্ট হবে।

অনেকদিন পরে বাধভাঙ্গা উচ্বাসে সে কেদে উঠে জোরে।

প্রবল আবেগে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে সিঁথি। আমি সেইজন্য ই এসেছি তোমার কাছে আসিফ। তোমার ডাক্তার এর কাছে গিয়ে সব জেনেছি ,এই ঠিকানা পেয়েছি।

প্রথমে ভেবেছিলাম বোকার মত আমাকে ছেড়ে বুঝি কাওকে বিয়ে করেছ বলে হেসে উঠে ।
তোমাকে বাহিরে নিয়ে যাব। টিকিট নিয়ে এসেছি। ব্যাগ থেকে টিকিট বের করে দেখাল।

গাল ফুলিয়ে বসে থাকে আসিফ। সে সিথিকে এইমুহুর্তে কষ্ট দিতে চায়না। কিন্তু আবার এই আশ্রয় ছেড়ে কোথাও যেতে চায়না। নিজের শরীর বুঝে নিয়েছে। আর বেশিদিন ভার বহন করার মত নেই শরীর।

একসপ্তাহ পার হয়ে একমাস। একসন্ধায় আসিফের শরীর অসুস্থ হয়ে বলা যায় জোর করে হাসপাতাল এ ফোন করে বসল। সংজ্ঞাহীন আসিফকে অবশেষে নিয়ে আসা হল হসপিটাল এ। তার দেখা শোনা করছে একজন বিদেশী ডাক্তার।

সিঁথি প্রতিদিন প্রার্থনা করে আল্লাহ র কাছে অলোকিক কিছু দেখার শোনার আশায়।
ডাক্তার তার পিঠ চাপড়ে বলে

শেষ পর্যন্ত আমি আশা করছি। তুমি আশা রেখো মনে। এখন ও সম্ভাবনা আছে। ক্যান্সার ক্ষত সরিয়ে দিলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে।

তার ব্যাগে আছে সিঙ্গাপুরের যাওয়ার টিকিট। এখানে না হলে বাহিরে যাবে। আসিফকে সুস্থ করতে সে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করবে। তার আর ও অনেক কথা বলার আছে আসিফকে।

সাত আকাশের উপরে বিধাতা হাসেন স্নেহে। তিনি জানেন ফিরিয়ে দিবেন কি আসিফের প্রাণ। ওনার অনেক ক্ষমতা। চাইলে ই তিনি পারেন।
আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের জ্বল মুছে উঠে দাড়ায় সিঁথি। ভাগ্য জানে তাকে কি খবর শোনাবে। হাসপাতাল থেকে মাত্র ফোন এসেছে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত