আর কতদিন?

আর কতদিন?

মের মহিলারা হচ্ছে এক একটা জীবন্ত সিসি টিভি। বাপরে বাপ। এরা এত সুন্দর করে চোখের পলকে ঘটনা ছড়াতে পারে আপনি মাইকিং করেও এত তাড়াতাড়ি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন না।

কয়েকদিন যাবত গ্রামে আছি। গ্রামে আসলে সবচেয়ে বেশি যেই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তা হল, বাবা তোমার ডাক্তারী পাশ করতে আর কতদিন লাগবে? বলতে পারেন একজন প্র‍্যাগনেন্ট মহিলা আর মেডিকেল স্টুডেন্ট এর মাঝে মিল কোথায়? বলতে পারতেছেন না তো? দাঁড়ান বলে দিচ্ছি। মিলটা হল সবাইকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় “আর কতদিন”? গ্রামে আসলে এই প্রশ্ন শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে যাই। একমাস আগে গ্রামে আসছিলাম। তখন ও সবাইকে বলে গেছিলাম আমার পাশ করতে আরও এক বছর লাগবে। এখন সবাই আইসা আবার এক ই প্রশ্ন করতাছে। কি জ্বালা!! এক মাসে কি এক বছর হয়ে যায়? কেউ কেউ তো আবার সকাল বিকাল রুটিন করে এই প্রশ্ন করে। বলি বাপ, সকাল বিকালে কি বছর পরিবর্তন হয়?

সেদিন সকাল। ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করতে করতে বাড়ির বাইরে যাই। একটা মাছাং আছে। গিয়ে সেখানে বসলাম। কই থেকে জানি এক সিসি ক্যামেরা মানে এক মহিলা হাজির।
–কি বাবা কি হর?
–এইতো কাকী ব্রাশ হরতেছি।
–এত বেলা করে উঠলা যে। রাতে ঘুমাও নাই?
–ঘুমাইছি তো। পড়ালেহা নাই। তাই ঘুমাই।
–আচ্ছা একটা কথা!
–হ্যা কইন।
— তোমার পাশ করতে আর কতদিন লাগবে?

সকাল সকাল এই প্রশ্ন শোনে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আর কোন প্রশ্ন কি আল্লাহর দুনিয়াতে নাই? শরীর স্বাস্থ্য ভালা নি, বিয়াশাদী কবে করুম এমন প্রশ্ন করতে কি ট্যকা লাগে? কি আর করা। ভাবলাম একটু রসিকতা করি।

–কাকী একটু কানের কাছে আসেন। গোপন কথা কই।
–হ্যা কও।
–আসলে হইছে কি কাকী?আমার চেহারা চুরত তো তেমন একটা ভালা না। ডাক্তারদের দেখছেন না কত সুন্দর চেহারা থাকে? দেখলেই ডাক্তার ডাক্তার মনে হয়?
–হ দেখছি তো।
–আমার চেহারা খারাপ। তার উপর প্রথম দিন ই পরীক্ষায় ফেইল করি। এর জন্য আমারে মেডিকেল থেকে বাইর কইরা দিছে। আব্বার কাছে তো কওন যাইতো না। মুড়ায়া হাড্ডি ভাইংগা ফেলব।
–তে বাবা অহন কিতা কর?
–গুলিস্তানে জুতা সেলাই করি আর একটা কাপড়ের দোকান চালাই। এইযে জ্যাকেট টা দেখতেছেন না এইটা আমার দোকানের।
–বুঝলাম।
–ফুনুইন কাকী। এগুলা কাউরে কইয়েন না। কইলে চাকরি থাকতো না। আপ্নেরে ভালা পাই তাই কইছি। কইন না যে কাউরে। বুজ্জুইন না?
–হ বাজান বুজ্জি।

উনি মুচকি হাসতে হাসতে চলে গেলেন। আমিও ব্রাশ শেষ করে নাস্তা করলাম। দুপুরে ঘুমাইতেছিলাম। লেপ ধইরা কে জানি টানাটানি করতেছিল। আমি ঘুমের ভান কইরা পইরা আছি। একটু পরে শুনি কে জানি বকতেছে গোলামের পুত উঠবি না পানি ঢালমু। তাড়াতাড়ি উঠলাম। দেখি আম্মাজান বাঘের মত চেহারা বানাইয়া তাকায়া আছে।

–কি আম্মা কি হইছে?
–এইমাসে কত টাকা নিছোস?
–আম্মা ১৮ হাজার।
–আরো লাগবে?
–হাত খরচের লাগি আর দুই হাজার দিও!
–গোলামের পুত এতদিন যত টাকা দিছি সব ফেরত দিবি।
–কেন আম্মা?
–তুই না গুলিস্তানে ব্যবসা করস তাইলে টাকা দিয়ে কি করবি?
–এই আম্মা। কি কও! আমি ব্যবসা করুম কেন?
–আমি এতকিছু বুঝিনা, এতদিন যত টাকা নিছস সব ফেরত দিবি।

আম্মায়ায়ায়া,,,,,
আর শোনে নি আমার কথা। ঘর থেকে রাগে বের হয়ে গেলেন উনি। দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে লোকাল প্রেমিকার সাথে লোকাল বাজারে লোকাল রেস্টুরেন্টে দেখা করতে গেলাম। যেহেতু সবাই চিনে তাই রেস্টুরেন্টের এক চিপায় গিয়ে বসলাম প্রেমিকার সাথে। প্রেমিকা আমার উপর অভিমান করে আছে। আমি ভাংগানোর চেষ্টা করছি।

–তুমি আমাকে আর ভালোবাস না জাবু!
–তোমার কেন মনে হল এমন?
–তুমি আগে কত কিছু বলতে আমাকে এখন কিছুই বল না।
–কি বলতাম প্রেমা?
–আমি না খেলে তুমিও খাইবা না!!
–আর?
–আমার কিছু ভালো না লাগলে তোমারও কিছু ভালো লাগে না।
–আর??
–আমাকে না পেলে তুমি পাগল হয়ে যাবে।
–আর?
–আর কি আবার? এখন এগুলা বলনা। তার মানে অন্য কেউ জুটছে তোমার। তাইনা?
–আরে না বাবু। আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।
–সত্যি?
–হাজারবার সত্যি।
–লাভু।
–লাভু টু। হাতটা একটু ধরি?
–আমি তো তোমার ই। ধর।

প্রেমিকার নরম হাতে হাত রাখলাম। হাতে একটা চুমু দিতে যাব এই মুহুর্তে এলাকার কোন মুরুব্বী এসে হাজির।
–এই জাবেদ। তোরে নাকি মেডিকেল থেকে বাইর কইরা দিছে। আমি আগেই কইছিলাম তুই মেডিকেলের যোগ্য না। কেন যে তোর বাপে এত টাকা খরচ করে তোর পিছে। শুনলাম গুলিস্তানে কাপড়ের ব্যবসা করস। এটা কিন্তু ভালো। এর চাইতে ভালো কাজ তোকে দিয়ে হবে না কখনোই। আর এই যে মেয়ে, এর সাথে তোমার কি? এ তো জুতা সেলাই করে গুলিস্তানে। তুমি তো মাশাল্লাহ অনেক সুন্দরী। অনেক ভালো ছেলে পাইবা। সময় থাকতে ভাগো।

একদমে কথাগুলো বলে শেষ করে মুরুব্বী উধাও। পাশে তাকিয়ে দেখি আমার লোকাল প্রেমিকাও উধাও!!যাবি ভালো কথা! বিলটা দিয়ে গেলে কি এমন ক্ষতি হতো? তার আশায় খাইতে আসছিলাম। পকেটে ২০ টাকা আছে। এখন বিল দিমু কই থিকা? অগত্যা আধা ঘন্টা বাসন মাজার পর রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলাম।

সন্ধ্যায় বাড়ি আসলাম। দেখি মানুষজনের ভীড়। কেউ মারা গেল নাকি!! এত মানুষ আমার বাড়িতে কি করে? ভীড় ঠেলে ভিতরে যাইতেই সবাই আমাকে দেখে খুব আনন্দিত হয়েছে। দেখি প্রায় সবার হাতেই জুতা, অনেকের হাতে জামা কাপড়। কি ব্যাপার জানতে চাইলে জানালো, এদের সবার জুতা সেলাই করে দিতে হবে। প্রথম বিজনেস। তাই প্রথমবার ফ্রি। এক মহিলা ৩ বছর আগে একটা জামা কিনছিল ৩০০ টাকা দিয়া। এখন আসছে জিগাইতে ৩০০ টাকা দিয়ে কিনে ঠকছে কিনা!! কেমন ডা লাগে কইন তো দেহি? অনেক কষ্টে মানুষজন বিদায় করলাম। রাতে আব্বা আম্মা আমারে নিয়া সালিশ বসাইছে। উনারা আমাকে আর বাড়িতে থাকতে দিবেন না। যদি কখনো ডাক্তার হই তবেই যাতে বাড়ি আসি। এর আগে আমার আসা নিষেধ।

এখন আমি বড় একখান ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাসের অপেক্ষা করতেছি। কেউ আবার জিগাইয়েন না ভাই আর কতদিন লাগবে?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত