আয়েশার জীবন সংগ্রাম

আয়েশার জীবন সংগ্রাম

আয়েশারা তিনবোন। রোকেয়া ফাতেমা সে। আয়েশা বড়। বয়স পনের,রোকেয়া মেঝ,ছোট ফাতেমা নয় বছর।

রোকেয়া,ফাতেমা,ছোট শরীরে শাড়ী পড়ে রোকেয়া ফাতেমা ছোট শরীরে আজ ছোটাছোটি করছে। আয়েশার আজ পানচিনি,মা বলেছে। অনেক মেহমান নাকি আসবে,মা বলেছে। যদিও সব খাওয়ার মেহমানদের জন্য মা ঢেকে রেখেছে। মেহমান রা আসার পর তাদের খেতে দিবে।

খুব জোরে ক্যাসেট এ গান বাজছে।
বিয়ের হলুদ বাট মেন্দি বাট গান।

পাশের গ্রামের আজিজ ব্যাপারী আয়েশা কে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে এ আয়েশা র ভাগ্য তার বাবা মাকে শুনিয়ে হাজার বার বলে। না হলে যেই কাল মেয়ে জন্ম দিছ এর কি গতি করতাম আমি। আজিজ ব্যাপারী তার বাবার বয়সে বড়। এখন আটত্রিশ। বিয়ের বাজারে ছেলেদের এ কোন বয়স আয়েশা র দাদী ও শোরগোল করে তাই বলছে।

এ নিয়ে প্রথমে মা প্রতিবাদ করেছে। মেয়ের চোখের পানিতে মায়ের অন্তর বেদনা হচ্ছে। বাবার কড়া কথায় মাও এখন কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। অসহায় আয়েশা কান্নাকাটি করে ভাগ্যকে মেনে নেওয়া সাব্যস্ত করল।

এত ভাল পাত্র বারবার পাইবানা। বাবার কড়া এক কথা। তোমার কাল মেয়েকে পছন্দ করেছে এই ভাগ্য মান। মেয়েরে এত লাই দিবানা। যাও আচার ব্যবহার শিখাও।

মা গোপনে চোখ মুছে মেয়ের ঘরে আসে বোঝানোর জন্য। মা বাবার চেয়ে পাত্রের বয়স বেশী।
মেয়েটা দ্বিতীয় হইয়া ক্লাস টেন এ উঠছিল।

মাগো আমারে এস.এস.সি পাশ করতে দাও করুন স্বরে আয়েশা অনুরোধ করে।
মার ও তাই ইচ্ছে। স্বামীর মেজাজকে ভয় তার।

আয়েশা ,রোকেয়া, কোথায় তোরা উঠান থেকে তাদের বাংলা আপার ডাক শুনে তিনজনে ঘরের বাহিরে এসে দাড়ায়।
কিরে স্কুল এ যাস না কেন? আপা স্নেহে মাথা নেড়ে দেয় আয়েশার।

এই আপাটি আয়েশাকে অনেক প্রীতির চোখে দেখে। ক্লাসের বাহিরে আয়েশাকে তিনি তুই বলেন। সব শোনার পর তিনি বিষন্ন হয়ে পড়েন।
আপা এই ভুলটা কইরেন না মেয়েরে স্কুল পর্যন্ত যাইতে দেন।

হের বাবা তো কথা শোনেনা। মা হতাশ
পরের দিন যথারীতি ব্যাগ গুছিয়ে আয়েশা স্কুল এর পথে রওয়ানা করে।

তার সামনে আস্তে আস্তে সাইকেল এর ঘন্টি বাজিয়ে যাচ্ছে কাইয়ুম ভাই।
তার বুক ধক করে কেপে উঠল কাইয়ুম কে দেখে। পাশের ছেলেদের কলেজ এ বি এ পড়ে। বাবা সামনের এক অফিস এ ছোটখাট কাজ করে।

সাইকেল থেকে মাথা ঘুরিয়ে আয়েশাকে দেখে হাসে একটু।
ভাল আছি ভাল থাক
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখ। কাগজের একটা পুটলি আয়েশার দিকে ছুড়ে দ্রুত উধাও হয়ে গেল।
কাপতে কাপতে চিঠি হাতে নিল সে

প্রিয় এশা

তোমাকে নিয়ে দিনরাত স্বপ্ন দেখে যাচ্ছি। আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে দিওনা প্লিজ। বি এ পাশ করে একটা চাকরিতে ঢুকব শিগ্রই। তারপর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাব তোমাদের বাড়ী। ততদিন পর্যন্ত কি আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবেনা আর মাত্র দুটি বছর। ?

চিঠির এই অংশটুকু পড়ে সে ঢুকরে কেদে উঠে। সে কিভাবে বাবাকে বোঝাবে।

ভয়ে চিঠি পড়ে ততক্ষনাত ছিড়ে ফেলল। বিছানায় মুখ লুকিয়ে কাদতে শুরু করলো।

কি হইছেরে মা মা এসে অনেকক্ষণ পাশে বসে থাকে ,জিজ্ঞাসা করে বারবার।

মাঝরাত জানালায় টোকার আওয়াজ।

সেইরাতে আয়েশা ঘর ছাড়ল। ভাবা যেত কাইয়ুম এর সাথে পালিয়েছে। স্টেশন এ নিয়ে আসার পর কাইয়ুম তাকে একবার বসিয়ে সেই যে উধাও হলো তার কোন ও খবর পাওয়া গেলনা। সে সবে ছাত্র। বাবার অন্নে নির্ভরশীল। যতই আবেগ বুকে থাকুক ঐমুহুর্তে তার পকেট এ না ছিল ট্রেন এর ভাড়া না খাওয়ানোর কোন টাকা। জীবন চলে বাস্তবতায়। আবেগে পেট ভরেনা। যত আবেগ ভালবাসা নিয়ে চিঠি টি লিখেছিল সময়ে দুশ্চিন্তায় অপারগতায় তা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল।

একঘন্টা আয়েশা এদিক সেদিক ছোটাছোটি করলো। বাবাকে তার অনেক ভয়। একবার যখন ঘরের বাহির হয়েছি আমি আর ও মুখো হবনা। পড়াশোনা শেষ করে বাবার সামনে এসে দাড়াব এই রকম ছিল তার মনোভাব। সঙ্গে কাইয়ুম থাকলে ভালো হত। নাই তাতে কি হয়েছে। আমার আল্লাহ আছে। আকাশের দিকে আল্লাহ কে স্মরণ করে নিল।

নৈশ কোচ এ উঠে বসল।

দিন যায় মাস কাটে ঘুরে বছর। সে মোটামুটি একটা ভদ্র সংস্থান নিজের জন্য যোগাড় করেছে। এক রেস্টুরেন্ট মশলা পেশা ,তরকারী কাটাকুটি করে. তাদের ওখানে খাওয়া পরা চলে যায়। পাশে ব্র্যাক এর এক অবৈতনিক স্কুল পেয়ে যায় যেখানে আফিয়া আপার মত একজন কে পেয়ে যায়। যিনি তার স্কুল ভর্তি র ব্যবস্থা করে দেয়।

সকাল দুইঘন্টা কাজ করে স্কুল এ যায়। দুপুরে এসে আবার রেস্টুরেন্ট এর অন্য কাজে হাত লাগাতে হয়। রাত জেগে সে পড়ে। যে করে তাকে ভাল ফল করতে হবে পরীক্ষায় নিজের সাথে তার এই পণ।

সারাদিন ক্লাস করে রেস্টুরেন্ট কষ্টের পরিশ্রমের কাজ করলে ও মনের দিক থেকে সে তৃপ্ত আছে সে। শুধু মা ছোট দুইবোনের কথা মনে হলে বুকের ভিতরটা হুহু করতে থাকে।

মা রে শিগ্রই আসব তোদের কাছে। রোকেয়া ফাতেমা তোরা কেমন আছিস।

এবার রোকেয়ার বিয়ে ঠিক করেছে বাবা। ফাতেমা নাবালিকা হওয়ায় রক্ষা। সেই একই বয়স্ক পাত্র। সমাজের কিছু কিছু স্থানে মেয়েদের অবস্থানের এখন ও কোন হেরফের হয়নি। সেই আইয়ামে জাহিলিয়াত থেকে এখন পর্যন্ত সমাজের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অনেক সমাজ সেবক আছে প্রগতির কথা সবসময় শোনা যায়। অন্দরে নিভৃতে নারীরা নির্যাতিত হয় এখন ও আগের মতই । রোকেয়ার হয়ত বিয়ে হয়ে যাবে। সে আয়েশার মত প্রতিবাদী না হলে।

চারিদিক এ অন্ধকার। ঘোর অমাবস্যা আজ। তবু ও জানালা খুলে আয়েশা বিছানায় বসে আছে। বোন দুইটার জন্য মন কেমন করছে। একই সময়ে গ্রামে তাদের ঘরে ছোট বোন রোকেয়া জানালা খুলে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার আজ বাগদান হয়ে গেল। পরের সপ্তাহে বিয়ে।

আপার জন্য মন কেমন করছে।

ফিরে আস আপা আকুল হয়ে বলতে থাকে।

মা ছোটবোন একইভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনের কথা বলে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত