অপূর্ণ ভালবাসা

অপূর্ণ ভালবাসা

যদি ঠিকঠাক থাকে,তবে আর দেরি নয়। আভা কেমন আছে,কোথায় আছে,সব জানা হয়ে গেছে। ফ্যানের শব্দটা ভারী অসহ্য লাগছে।বন্ধ করেছিল। তবে প্রচণ্ড গরম। তাই আবার চালু করেছে।মাথার চুলগুলো বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বাতাসে।

বারান্দায় দাঁড়াল। মেঘলা আকাশ। যেকোনো সময় বৃষ্টি নেমে পড়বে। একটা সিগারেট ধরাল। মেয়েটা কেমন আছে,খুব কাছ হতে দেখতে ইচ্ছে করছে। সবমিলিয়ে এই যানজটে ভরা ব্যস্ত শহরে কতটা ভাল আছে,কে জানে? সিগারেট শেষ হতেই সবুজ রংয়ের একটা টি শার্ট গায়ে দিল আর জিন্সের প্যান্ট। আয়নায় মুখটা দেখল। দেখতে ভালই লাগল।মনে হল চেহারাটা একদম খারাপ না। দশটা বাজতে পনের মিনিট। স্কুলের সামনে দাড়াতে হবে এগারটার মধ্যে। কারণ ওর একমাত্র ছেলেটার ক্লাস ছুটি হয় এগারোটায়।ও স্কুল গেটে সাড়ে দশটা পৌনে এগারোটার দিকে রোজ দাড়িয়ে থাকে। রিকসায় উঠে।যেতে মিনিট পনের লাগবে। আশেপাশে অনেক কিছু বদলে গেছে। গজিয়ে উঠেছে নতুন নতুন বহুতল বিল্ডিং। ভেসে উঠছে পুরাতন স্মৃতি।

-আভা ভূ-ভারতে তোর মত আর কেউ নেই।
আভা একটুও বিস্মিত না হয়ে শুধু হেসে বলল-আমি জানি।
-কি জানিস?
-আমার মত আর কেউ এ পৃথিবীতে কেউ নেই।শুধু আমি নয় কারও মত এ পৃথিবীতে কেউ নেই।
-তা মানছি।কিন্তু নিজের দিকে কখনও তাকিয়ে দেখছিস?
-দেখব না কেন?রোজই তো আয়না দিয়ে দেখি।
-তাহলে বলব তুই ভাল করে নিজেকে এখনও দেখিস নি।
-কেন এমন মনে হচ্ছে?
-তুই পৃথিবীর অদ্বিতীয় সুন্দরী।দিব্যি বলছি তোর মত আর একটিও নেই।
-আর চাপা মারতে হবে না।
-দেখ আশেপাশের সব ছেলেরা তোর দিকে তাকিয়ে আছে।
-ওটা ছেলেদের অভ্যাস।মেয়ে দেখলে না তাকিয়ে থাকতে পারে না।
-জ্বি না ম্যাডাম।আশেপাশে আমাদের অনেক মেয়েয় আছ,তাদের দিকে কিন্তু তাকাচ্ছে না।
-স্যার নামেন, এসে পড়েছি।

রিকশাওয়ালার কথা শুনে কল্পনার জগৎ হতে বের হয়ে এলো।রিকসা হতে নেমে প্রথমে ঘড়ির দিকে তাকাল।দশটা বেজে পাঁচ মিনিট।মিনিট বিশ তিরিশ ওয়েট করতে হবে।কতদিন পড়ে ঠিক দেখা হচ্ছে,মনে পড়ছে না।বছর সাত আট তো হবেই।মেয়েটা দেখতে কেমনে আছে,আগের মত আছে নাকি মুটিয়ে গেছে।মুটিয়ে একেবারে অ্যান্টি-মতন হয়ে গেছে নাতো।সেই আভা সেই আভা যার হতে চোখ নামানো যেত না,সেই আভাকে দেখতে পাব তো?একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাড়ায়।গাছ ফুলে ফুলে ভরে গেছে।গাছটাকে দেখতে লাগছে ভয়ানক সুন্দর।এখন বাংলা কি মাস,কে জানে?কি মাসে এই ফুলটা ফুটে বড় জানতে ইচ্ছে হচ্ছে।এই সময় রিকসা হতে আভা গেটের সামনে নামল।গেটের পাশে একটি ছাউনি আছে।ছাউনির নিচে গিয়ে বসল।হাট ধক করছে।সে এখন থেকে না।সে আগে থেকেই।যখন দেখা হত হাট ধক ধক করত।একদম আগের মতই আছে।একদম এখনও ভূ-ভারতের অদ্বিতীয় সুন্দর।নীল রং খুব প্রিয়।নীল শাড়ি সাথে মিল করে নীল ব্লাউজ।আগে ঘুরতে বের হলে এই রকম ড্রেজ কোর্টে বের হত।এখনও কি বের হলে এই রকম পরে?পাশ দিয়ে দাঁড়াল একেবারে আভার পাশে।আভা কপালটা হাত দিয়ে টিপছে।

-ম্যাম চা লাগবে চা?
আভা না তাকিয়েই বলল-না।
-ম্যাম চা খেলে মাথা ব্যথা একদম সেরে যাবে।
-বললাম না চা খাব না।যাও।
গলাটা খুব চেনা চেনা। যেন খুব পরিচিত।ঘুরে তাকাতেই দেখল লোকটা পেছন ফিরে হাটতে শুরু করেছে।
-শুনুন।
সুলয় ঘুরে তাকাল।দেখে খুব বেশি বিস্মিত হয়ে গেল।কথা গেল আটকে।উঠে দাঁড়াল।
-আরে তুই?
-এত অবাক হচ্ছিস কেন?আমি কি ভূত টূত কিছু নাকি?
-তুই দেখি একটিও বদলাস নি।একদম আগের মত।
-আর তুই বুঝি খুব বদলেছিস?
-তা তো অনেক।এখন আমি মা,বউ।আর আগে ছিলাম মেয়ে।আর তুই পুরুষ পুরুষই আছিস।
-তোকে কিন্তু সেই আগের মতই লাগছে।সেই আভা।আমার চিরসুন্দর আভা।
-বিবাহিত মেয়ে পটানো হচ্ছে মশায়।
-আচ্ছা আমরা কি এখন বিয়ে করতে পারি না?
-এসব কি বলেছিস?আমি এখন মা।একটি মেয়ে আছে।
-জানি।নাম শোভা।এই নামটি রাখলি কেন?আমি একদিন আমার মেয়ের নাম শোভা রাখব বলেছিলাম বলে।
-জানি না।
-বর মস্ত-বড় অফিসার।টাকা পয়সার অভাব নেই।থাকিস সুরম্য অট্টালিকায়।
আভা হেসে বলে-সবই তো জানিস দেখি।তোর মত তো অতবড় স্টার আর তো নয়।টিভি খুললেই তো দেখা যায়।দেশের জনপ্রিয় লেখক
-থাক থাক আর বলতে হবে না।সামনে চল।তোর জন্য একটা গিফট নিয়ে এসেছি।
-এখানে দে।
-সামনে না গেলে দেওয়া যাবে না।
-এর মানে কি?
-গেলেই দেখতে পাবি।
দুজনে সামনে হাটতে থাকে।কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়ায়।
-এই পুরো গাছ ভরা ফুল শুধু তোর জন্য।শুধু তুই আসবে বলে এই গাছে এত ফুল ফুটেছে।
আভা গাছটার দিকে তাকায়।সত্যিই ফুলে ফুলে ভরা গাছটা খুব সুন্দর লাগছে।প্রতিদিন এর পাশ দিয়েই যায়,অথচ কখনও তো লক্ষ্যই করেনি।

সুলয় হাতটা ধরতেই আভা হাত ছাড়িয়ে নেয়।বলে-এই আমি কিন্তু একজনের ওয়াইফ।এভাবে হাত ধরা ঠিক না।
সুলয় হালকা হেসে বলল-ও ভুলেই গিয়েছিলাম।কিন্তু তোর কাছে আমার সব পড়ে রয়েছে।আমার কৈশোর যৌবন সব।
-আমার কাছে?
-মনে নেই একসাথে স্কুলে যেতাম,কলেজে যেতাম।স্কুল কলেজের নাম করে কত যে ঘুরে বেড়িয়েছি তার ইয়ত্তা আছে?
-আমাকে তখন বিয়ে করলেই পারতি।
-পারতাম।কিন্তু কেন জানি মনে হল,ভালবাসা আর বিয়েটা ঠিক এক জিনিস না।ভালবাসা ভালবাসা।এর সাথে কোন কিছুর তুলনা হয়ে না।একজন আরেকজনকে বিয়ে করলেই যে ভালবাসা হবে তেমন কোন কথা নেই।
আভা হেসে বলে-সে তো বুঝতেই পারছি।

-ভয় ছিল,বিয়ে করলে বুঝি আমার মানসচিত্রে আকা অদ্বিতীয় সুন্দরী মেয়েটি অতি সাধারণ আর আট দশটা মেয়ের মত আমার কাছের সাধারণ হয়ে যায়।আর আট দশটা মেয়ের মতই শুধু মাংস মতন হোক,আমি তা কখনও চাইনি।
-তবে এখন বিয়ে করতে চাচ্ছিস কেন?

-তোর বিয়ে হওয়ার পর হঠাৎ একদিন মনে হল সবকিছু খুব শূন্য।আমার সবকিছু কেমন যেন লাগে,কিছুতেই কোন কিছুতে মন বসে না।তোর মানসিক সৌন্দর্য আমি কিছুটা পেয়েছি কিন্তু দৈহিক সৌন্দর্য তোর কিছু পায় নি।খুব অপূর্ণ লাগে তাই।
-কেন অন্য কোন মেয়ের সৌন্দর্য পাস নি।
-পেয়েছি।তবে কেন জানি তৃপ্তি আসে না।একমাত্র তুই পারস আমাকে পূর্ণাঙ্গ করে দিতে।তোর মানসিক সৌন্দর্য পেয়েছি দৈহিকটা পেলে একেবারে তৃপ্ত হতাম।
-এসব কি বলছিস?
এবার সুলয় হাত ধরে বলল-আমাকে তোর জীবন হতে একটা দিন দিবি।
আভা হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-ছাড়,লোকজন দেখছে।
সুলয় হাত ছেড়ে বলল-একদিন।
-সে আর হয় না?
-কেন?
-এরপর আমি কি নিয়ে থাকব?
-আমাকে বিয়ে করে ফেল।
-সে আর হয় না।আমার যে তোর প্রতি লোভ নেই তা নয়।
-তাহলে?
-সে আর হয় না।
-কেউ জানবে না।
-আমার দেহটায় সৌন্দর্যের আর কিছু নেই যা তোর জন্য বাকি।সব লুটে পুটে শোষন করে নিয়েছে।পুরুষ জাতি খুব ভয়ানক।দেহের কোন অংশই বাদ দেয় না।সেখানে তোর ছোঁয়া সে কল্পনায় থাক।এ নিয়েই যে আমার এখন বেচে থাকা।যদি দেখি তুই ওর মত তাহলে আমার বাচার মত কিছু থাকবে না।

এই বলে আভা সামনের দিকে এগোয়।গেটের সামনে হতে তার মেয়ে তাকে মা মা করে জড়িয়ে ধরে।এরপর রিকসায় উঠে।একবার পিছন ফিরে তাকিয়েই চোখটা সরিয়ে নেয়।সুলয় আকাশের দিকে তাকায়।নীল আকাশ।মেঘ একদম নেই।হেটে চলে রাস্তায়।ভাবে,তার মুক্তি হল না।মেয়েটার বন্ধন হতে তার মুক্তি হল না।পূর্ণাঙ্গ সৌন্দর্যের সন্ধান তার মিলল না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত