শাপলা-শালুক

শাপলা-শালুক

বর্ষা মানেই বৃষ্টি। আর বৃষ্টি মানেই ঘরে বন্দি হয়ে থাকা। বলা নেই, কওয়া নেই, হুট-হাট করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। কোথাও বের হওয়া যায় না। রাস্তায় হাটুঁ পানি জমে যায়। কাদায় রাস্তা একাকার হয়ে যায়। ক্লাশে যাওয়া যায় না। অফিসে যাওয়া যায় না। দোকানে যাওয়া যায় না। সারাদিন চুপচাপ ঘরে বসে থাকতে হয়। অবশ্য প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য বর্ষাকাল খুব ভাল। সারাদিন ঘরে বসে ফোনালাপ করা যায়। কবি সাহিত্যিকরা ঘরে বসে গল্প, কবিতা লিখেন। আমি তেমন কোন সাহিত্যিকও নয় যে, এই বর্ষাকালে বৃষ্টির দিনে ঘরে বসে গল্প, কবিতা লিখে সময়টা পার করব। আর ছোটদের জন্য বর্ষাকালটা আরো ভালো। সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে খেলা যায়। বর্ষার পানিতে নেমে সাঁতার খেলা, শাপলা-শালুক কুড়ানো, মাছ ধরা, কলার ভেড়ায় চড়া, নৌকা ভ্রমণ আরো কত কি। বর্ষায় বাংলার মাঠঘাট ডুবে যায়। নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, ডোবা সবই পানিতে টইটুম্বর হয়ে যায়। দূর থেকে পানিতে ভাসমান গ্রামকে দেখে মনে হয় কোন একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ডিঙি নৌকায়, কলার ভেলায় চড়ে মানুষ এ বাড়ি ও বাড়ি যায়। দৃশ্যটি বেশ উপভোগের।

আজ সকাল থেকেই মেজাজটা খুব চড়া। সেই কাকডাকা ভোর থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখনও বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো একনাগারে আবার কখনো থেমে থেমে। সে কি বৃষ্টি! বাইরে কিছুই দেখা যায় না। বাইরে বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই। রাস্তাঘাট পিচ্ছিল হয়ে গেছে। সারাদিন অলসভাবে ঘরে বসে সময় পার করলাম। দোকানেও গেলাম না। কারণ এই বৃষ্টির মধ্যে আমি কষ্ট করে গেলেও কোন ক্রেতা আসবে না। তার চেয়ে বরং ঘরে বসে লুডু খেলায় ভাল। যেই ভাবা সেই কাজ। ছোট বোন মোমেনা, ছোট ভাই রবিউল ও মায়ের সাথে লুডু খেলায় মেঠে উঠলাম। লুডু খেলতে খেলতে কখন যে সন্ধ্যা হলো খেয়াল নেই। এবার লুডু খেলায় বিরতী দিলাম।

পড়ার রুমে গিয়ে বসলাম। জানালা খোলা। এখনও টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। বাইরের দিকে তাকালাম। চারদিক অন্ধকার। পাশেই কদম গাছে কদম ফুল হাসছে। মনকাড়া হাসি। বাগানে রজনীগন্ধা ফুট ফুটেছে কি মিষ্টি গন্ধ! নাকে লাগে ফুলের সুবাস। এসব দেখে ভাবছি উদাস মনে শৈশবের সেই সোনালী দিনগুলোর কথা। বর্ষায় ফুটে নানা ফুল। কদম, কেয়া, শাপলা, রজনীগন্ধা, পদ্মা, হাসনাহেনা, কলাবতী, হিজল, চালতা, কলমিলতা, দোলনচাঁপা, নীলকমল, সুলতানচাঁপা, কাঁঠাল চাঁপা, কচুরিপানা, এমন নানা নামের বিচিত্র ফুল। আম, কাঁঠালের মধুর গন্ধ বর্ষায়ও যেন নাকে লেগেই থাকে। ডাহুক, শালিক, কাক, কোকিল, হরেক রকম পাখির কিচিরমিচির ডাকে প্রকৃতি মেতে ওঠে এ বর্ষায়। হাজার রূপে বর্ষার রূপের কথা বলে শেষ করা যায় না।

আউশের ক্ষেতে নেমেছে কৃষক। কাটছে ধান। আঁটি মাথায় ছুটছে কৃষক। বাড়ির পাশে বিল। বিলে শাপলা ফুটে হাসছে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা শাপলা-শালুক কুড়িয়ে আনছে। মাছ ধরছে। হাঁসগুলো সাঁতার কাটছে বিলের জলে। বকগুলো বিলের পাড়ে কুচুরী পানার উপর বসে আছে। মাছ ধরে খাচ্ছে। ব্যাঙ ডাকছে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর। বর্ষার আগমনবার্তা জানিয়ে ডাহুক আপন মনে ডাকছে অনেকক্ষণ। দোয়েল শীষ দিচ্ছে। বর্ষার মাঠে সবুজ ধানের শিষগুলো দুলছে আর বর্ষার রূপ কীর্তন গাইছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা শালুক কুড়াচ্ছে ডুবাইয়ে। শাপলা তুলছে নৌকায় করে। উদাস করা পল্লীবধূ ঘোমটা পরা রাঙামুখ টেনে ছই নৌকায় বাপের বাড়ি নাইয়র যাচ্ছে। পাল তোলা নৌকা কলকল করে এগিয়ে চলছে। চলতে থাকে আপন মনে। ঘুন টেনে মাঝি যাচ্ছে। কতই না আনন্দ লাগে! আর মাঝি গান গায় ভাটিয়ালি, পল্লীগীতি ও লালনের গান।

মাথার উপর বিশাল আকাশ ভাসছে। আকাশে কোথাও সূর্য্য নেই। বাতাস বইছে। ফুরফুরে বাতাস। সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। সারাদিন সূর্য্যরে দেখা নেই। আকাশে জমেছে কালো মেঘ, সাদা মেঘ, ধূসর মেঘ। মেঘের খেলা জমে উঠেছে আকাশে। ক্ষণে ক্ষণে আকাশের রং বদলায়। স্থির থাকে না মেঘ। ছুটতে থাকে একদিক থেকে অন্যদিক। কেঁদে বুক ভাসায় আকাশ। মেঘের জল বৃষ্টি হয়ে নামে জমিনে। টুপটাপ ঝরে পড়ে বৃষ্টি। বাতাসে শোঁ শোঁ আওয়াজ বইতে থাকে। এই খানে আছে বৃষ্টি, তো অন্যখানে নেই। বিভিন্ন সুরে বৃষ্টি নামে। হৃদয় আকুল হয়ে যায়। কখনো গর্জে উঠে আকাশ। ভয়ে চুরমার হয়ে যায় হৃদয়। মাঝে মাঝে এই মেঘ এই রোদ্দুর। যাকে খেঁকশিয়ালের বিয়ে বলে গ্রামের লোকেরা। বৃষ্টি ভেজা কাদা পথ দিয়ে হাঁটতে ইচ্ছে হয় না। মন ভারী হয়ে যায়। কখন পিচলে পা ফসকে পড়ে যাই। সেবার একবার এক তরুণীর সামনে কাদায় পা পিছলে পড়ে সে কি লজ্জা পেলাম তা কি বলা যায়! স্মৃতিময় বর্ষার দিনগুলো কত মধুর ছিল। তখন বর্ষা মানেই ছিল আনন্দ। আর এখন এই বর্ষা আমার কাছে এক বিরক্তিকর মনে হয়। এখন ভাবি বর্ষা ঋতু না থাকলেই ভাল হতো। অলসভাবে ঘরে বসে থাকতে হতো না।

মনে পড়ছে সেই শৈশবের কথা। তখন আমার বয়স ১০/১১ বছর হবে। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলে লেখা পড়ায় তেমন মনযোগী ছিলাম না। সারাক্ষণ টইটই করে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়াতাম। বনে বাদাড়ে ঘুরে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেতাম। নাওয়া খাওয়ার কথা ভুলে যেতাম। বর্ষাকাল আসলে একমূহূর্তও ঘরে বসে থাকতাম না। সেই কাকডাকা ভোরে কিছু খেয়ে বেড়িয়ে যেতাম সন্ধ্যালগ্নে বাড়ি ফিরতাম। সারাদিন শাপলা-শালুক কুড়িয়ে খেতাম। এদেশে বর্ষাকালে নদী-নালা খালবিল জলাশয়ের নিচু জমিতে এমনিতেই জন্মাতো প্রচুর শাপলা শালুক ও ভেট। বাংলাদেশে শাপলার দুটি প্রজাতি পাওয়া যায়। এর একটিকে শাপলা বলা হয় আর অন্যটিকে শালুক। শালুক পাওয়া যায় এই গাছের মাটির নিচের মূল অংশে। শৈশবে অনেক শালুক কুড়িয়ে আনতাম। শালুক হজম শক্তি বৃদ্ধি করে, দ্রুত ক্ষুদা নিবারন করে এবং শরীরে পর্যাপ্ত শক্তিও জোগায়। এর মধ্যে শাপলা আবার দুই ধরনের। সাদা ও লাল শাপলা। সাদা শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। আর শালুকের রং নীল। শাপলা শুধু ফুলই নয়। সর্বভুক মানুষ শাপলা খায়ও। এমনও দিন গেছে সারাদিন শাপলা, শালুক ও ভেট খেয়ে দিন পার করেছি। শাপলা খাওয়ার একাধিক পদ্ধতি আছে। এই শাপলা থেকেই হয় একটি চমৎকার খাবার। ফুলের মাঝখানের বোটার উপড়ে অর্থাৎ গর্ভাশয়ে গুড়ি গুড়ি বীজ থাকে। সেটা যখন পেকে যায় তখন তাকে ভেট বলতাম। ছোটবেলায় আঙ্গুল দিয়ে খুটে সেই ভেট থেকে কালো দানাদার বীজ বের করে খেতাম। খেতে খারাপ না। খুব মজা লাগত। কিন্তু সেই ভেট হজম হতো না। বাথরুম করলে সেই ভেটের দানাগুলো আস্তা বের হতো। আর সেই বীজ দিয়ে আরেকটি সুস্বাদু খাবার হয়। নাম ভেটের খৈ। খুব হালকা এই ভেটের খৈ। মাঝে মাঝে এই ভেট বাড়িতে নিয়ে আসতাম। একদিন রেখে দিলে পরদিন এই ভেট থেকে দানা ফেটে সুন্দরভাবে বেরিয়ে আসত। তখন খেতে খুব ভাল লাগত। এই ভেট থেকে দানা বের করে রোদে শুকাতাম। মা আমাদেরকে ভেটের খৈ তৈরি করে খাওয়াতেন। আর শাপলা যেখানে হয় সেখানে যত বেশী পানি থাকে তত লম্বা হয় শাপলার ডাটা হয়। তবে সাধারণত শাপলা গাছ ও ডাটা পানির গভীরতায় ৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। নরম কচি আর খসখসে এই ডাটা খালি মূখে কিংবা ঝাল লবণ ও তেতুল মাখিয়ে মুখরোচক সবজী হিসেবে খেতাম। আবার কখনো সবজি হিসেবে মাছ দিয়ে রান্না করে খেতাম। গ্রাম বাংলার অনেকেই চুলকানি এবং রক্ত আমাশয় নিরাময়ের জন্য ঔষধী গুন সম্পন্ন এই শাপলা খুঁজে ফেরেন। পানির উপরে ফুটে থাকা শাপলা ফুলের দৃষ্টিকাড়া সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে।

আমি শৈশবে দেখতাম গ্রামবাংলার বিলে-ঝিলে ও ডোবানালায় এই ফুলের সমারোহ ছিলো চোখে পড়ার মত। কিন্তু বর্তমানে এই শাপলা তেমন বেশী পাওয়া যায় না। প্রকৃতির বিরুপ প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী শাপলা, পানিফল, শালুক আর ভেট আজ তেমন চোখে পড়ে না। বর্তমানে শাপলা ফুলসহ পানি ফলগুলো যেন হারিয়ে গেছে। এখনও যদি গ্রামে যাই বর্ষায় দুয়েকটা শাপলা হয়তো চোখে পড়ে। জমিতে অতি মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে শাপলা ফুল। এক সময় বর্ষা মৌসুমে দেশের নদীনালা খালবিল রাস্তার দুপাশে জলাশয়ে ব্যাপকভাবে শাপলা ফুলের মনোরম দৃশ্য দেখা যেত।
হঠাৎ করে কে যেন দরজায় নক করল। শৈশবের স্মৃতি থেকে ফিরে আসলাম বাস্তবে। দেখি মোমেনা কুপি হাতে পড়ার ঘরের দিকে আসছে। বিদ্যুৎ চলে গেছে। চারদিকে অন্ধকার। ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত নয়টা বাজে। কখন যে এত রাত হয়ে গেল টেরই পেলাম না।

ভাইয়া খাবে না।
হ্যাঁ খাব। আমি আসছি। তুই যা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত