প্রতীক্ষা

প্রতীক্ষা

একটা কথা বলার ছিল বলো তোমার অফিসের বস আজ দুপুরে কল দিয়েছিলেন কি বললো? বললেন ভাবি কি করেন? কী রান্না করলেন আজকে? এরপর চিংড়ি মাছের কথা শুনে রসালো প্যাচাল জুড়িয়ে দিলেন “সেই কবে নাকি গ্রামে গিয়ে চিংড়ির দোপেয়াজা খেয়েছিল সাথে চিকন চিকন কাচা মরিচের ঝাঁজালো টেস্ট, আহা! এখনো উনার মুখে লেগে আছে, কতদিন হল তিনি খাননা, এরপর বললেন… ভাবি একদিন দাওয়াত দিলেই তো পারেন, আপনার হাতের রান্নার কোনো তুলনাই হয় না!

অনন্ত দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করলো  এরপর কি বললে তুমি? দাওয়াত দিয়ে দিলে তাইতো? তো কি করবো, মুখের উপর না করতে পারি নাকি? বললাম ভাই চলে আসেন সময় করে। দোপেয়াজা রান্নাকরে খাওয়াবনি, ভাবিকে নিয়ে আসেন আড্ডাও দেওয়া যাবে একত্রে অনন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বললো.. “স্যার নিয়ে আসবেন তার বউ কে! হাহা কখনোই আসবে না। বউকে সাথে আনলেতো আর তোমার সাথে রসালো কথাবার্তা বলতে পারবে না, সালার লুইচ্চা অনন্ত মেজাজ ঠান্ডা করতে রুমথেকে উঠে বারান্দায় চলে যায়। পকেটে থাকা সিগারেট জ্বালিয়ে আচ্ছন্ন ধোয়ার মাঝে বসে সুখটানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। চিন্তিত বিষন্ন মন তাকে বার বার ধেয়ে বেড়াচ্ছে। হাজার হলেও অফিসের বস উনি, চাইলেও মুখের উপর কিছু বলতে পারে না। তার প্রমোশন.. ক্যারিয়ার অনেকাংশ তার হাত দিয়েই ঘটেছে, ভবিষ্যতে ঘটবে। সেই সুযোগে টাকলু ইদানিং কয়েকমাস বেশ ভালই উৎপাত শুরু করে দিয়েছে। কিছু বাহানা পেলেই বাসায় চলে আসে।

কাছাকাছি বাসা হওয়ায় বিপদ আরও বেড়েছে। কখনো অফিসের কাজের ছলে, কখনো অফিসে যাওয়ার পথে রিসিভ করতে, আবার কখনো এভাবে চেয়ে চেয়ে দাওয়াত নিয়ে ছ্যাবলার মতোন বাসায় চলে আসেন। উদ্দেশ্য একটাই অনন্তের বউ সাবিহার দেখা পাওয়া, মিষ্টি মিষ্টি দু চার লাইন কথা শুনা। সখ্যতা বেড়ে যাওয়ায় আজকাল মোবাইলেও কল দেয়া শুরু করেছে! অনন্ত অনেকটা বাধ্য হয়ে চুপচাপ। কিছু ক্ষেত্রে দেয়ালে পিঠ ঠেকার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ইদানিং মনে হচ্ছে সেই দেয়াল খুব বেশি দূরে নেই। বেশি উৎপাত শুরু হলে দ্রুত এলাকা ছাড়তে হবে, প্রয়োজনে অন্য একটা চাকরি খুজে নিতে হবে, এরপর শালাকে উচিত শিক্ষা দেওয়া যাবে।পরেরদিন ডিনারে বস শফিক সাহেব দাওয়াত খেতে চলে আসেন। যথারীতি এবারও বউ বিহীন একা একা। অনন্ত ফিসফিসিয়ে সাবিহার কানে কানে বলছিল “বলেছিলাম না, বউ আনবে না, বেটা থার্ডক্লাস নাম্বার ওয়ান” সাবিহা অনন্তর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বাকা হাসি দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল।

শফিক সাহেব ড্রয়িং রুমে বসে অপেক্ষা করছেন৷ কিছুক্ষণ বাদে ডাকাডাকি শুরু করে দেন.. ভাবি কই গেলেন… আপনার খাবারের সুঘ্রাণে তো পুরো বাড়ি ভরে গেছে! সাবিহার কোনো সারা শব্দ নেই। অনন্ত তার স্যারের পাশে বসে সময় দিচ্ছে। অফিসের এটা সেটা নিয়ে আলাপ চলছে। বসের সেদিকে তেমন একটা মনোযোগ নেই। উনার চোখ মুখের চাহনিতে স্পষ্ট ফুটে উঠছে তার আর তর সইছে না, একটু পরপর দরজার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। অনন্ত দাঁতে দাঁত লাগিয়ে পাশে বসে। একটুপর স্যারের মুখে হঠাৎ ঈদের আনন্দ, আনন্দে পুরো দেহ উথলিত, মুখ ফিরে তাকিয়ে দেখে সাবিয়া রুমে ঢুকছে! আরে ভাবি কই ছিলেন এতক্ষণ? বাসায় ঢুকে খাবারের সুঘ্রাণে ক্ষুধা তো দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে, হা হা তাই নাকি! কেমন আছেন ভাই? ভাবি বাচ্চারা কই?? আপনার ভাবির তো অনেক জ্বর, আসতে বললাম আসলো না।

ও অনন্ত মুখ ফুটে বলে উঠলো “ভাবির জ্বর! কই আজই তো দেখলাম তাকে সুস্থ শরীরে শপিং করতে!” শফিক সাহেব হাসি মুখে গম্ভীর স্বরে বললেন “আজকাল মানুষ চোখে দেখেই জ্বর মাপা শিখে ফেললো নাকি!” সাবিহা চোখের ইশারায় অনন্তকে চুপ থাকতে বললো, বেয়াদবী করতে নিষেধ করলো। কথা স্বাভাবিকে ঘুরিয়ে নিতে সাবিহা আবার খাবারের আলোচনায় ফিরে গেলো। এভাবে একের পর এক টপিক উঠে যাচ্ছে আর চলছে রমরমা আড্ডা। আড্ডার মাঝে অনন্ত হঠাৎ খেয়াল করে বসলো সাবিহা বেশ আনন্দেই আড্ডায় জমে গিয়েছে। তার যে ফরমালিটি পালন করে ভেতরে চলে যাওয়া উচিৎ সেদিকে তার খেয়ালই নেই। অনন্ত ইশারা দেওয়ার পরেও সাবিহা নড়ছে না। এভাবে চললো অনেক্ষণ যাবত আড্ডা। তার বউ যে এত গল্প জমাতে জানে এটাতো আগে জানা ছিল না! তাও আবার জেনেবুঝে এই অসভ্য মানুষের সাথে! ব্যাপারটা একটু হলেও অনন্তকে ভাবিয়ে তুলে।

ফ্রেশ হয়ে সবাই খাবার টেবিলে বসেছে। সাবিহা খাবার বেড়ে আনছে। খাওয়া শুরু করতেই অনন্তের ডিটেকটিভ চোখ অদ্ভুত একটা জিনিস আবিস্কার করে ফেলে। সাবিহার কপালের ছোট্ট বিন্দু টিপ! এটা কখন দিল? এটাকি আগেই ছিল খেয়াল করা হয়নি, নাকি মাত্রই দিয়ে আসলো?! মনেতো হচ্ছে এতক্ষণ ছিল না। যখনি দিক, এটা সে রাতেই দিয়েছে! অনন্ত মুখ গোমড়া করে খাবারে হাত বুলাচ্ছে, পেটের ক্ষুধা ইতোমধ্যে উধাও। বস বলে উঠলেন কি ব্যাপার অনন্ত খাচ্ছ না যে? খেতে ইচ্ছা করছে না, মনে হয় গ্যাস্ট্রিক প্রব্লেম, স্যার আপনি খান কি যে বলো.. সাবিহা ভাবির রান্না খেলে কোনো প্রব্লেম থাকে নাকি..! তোমার তো সৌভাগ্য এমন একটা বউ পেয়েছো। গ্যাস্ট্রিক আলসার এমনেতেই সব পালিয়ে যাওয়ার কথা। একথা বলেই শশায় কচ কচ কামড় বসিয়ে দিল.. “আহা কি অমৃত টেস্ট! ভাবির রান্নার কোনো তুলনাই হয় না”  তেল দিতে দিতে এমন অবস্থায় চলে গিয়েছে যে স্লাইস করা শশাতেও ভাবির হাতের ভিন্ন ভিন্ন টেস্ট খুজে পাচ্ছে! সাবিহা মিটমিটিয়ে হাসছে। অনন্তের মাথায় আগুন দাউ দাউ। মনে মনে বলছে “এই বেটা যাহ তাড়াতাড়ি, রাত বাজে সারে দশটা, খাওয়া শেষ করে দূর হ এখনি” মনের কথা শুনতে পেয়েছে কিনা কে জানে, খেয়ে আর দেরি নেই, দ্রুতই বিদায় নিয়ে চলে যান শফিক সাহেব।

খাটের উপর জোড়াশিং হয়ে বসে আছে অনন্ত। তাকিয়ে তাকিয়ে সাবিহার কাপড় ভাজ করা দেখছে। “কি হয়েছে এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?” দুবার জিজ্ঞাস করেও কোনো উত্তর পাওয়া যায় নি। সাবিয়া তার মত চুপচাপ কাজ করে যাচ্ছে। অনন্ত তখনো তাকিয়ে তাকিয়ে সাবিহাকে দেখছে। সাবিহা এক পর্যায়ে ঝাড়ু হাতে বিছানা রেডি করতে আসলে অনন্তকে সরে বসতে বলে ঠিক তখনি একটানে সাবিহাকে তার পাশে টেনে বসায়। নিস্তব্ধ রুম। সাবিহা তৃতীয়বারের মতো গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে  কি হয়েছে একটু বলবা? তোমার কপালের টিপটা কই? একটু আগে খুলে রেখেছি। কেন? খুলেই যেহেতু রাখবে তবে পড়েছিলে কেন? পড়েছিলেই যেহেতু তবে আজ রাতেই কেন? সারাদিন কই ছিল? সাবিহা বড় বড় চোখ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে কি বলতে চাচ্ছো তুমি?!! যা বলতে চাচ্ছো স্পষ্ট ভাবে বলো ? নাহ, কিছু বলতে চাচ্ছি না, শুধু একটু জিজ্ঞেস করলাম মাত্র! সাবিহা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ওয়াশরুমে ছুটে যায়। এভাবে সরাসরি সন্দেহের চোখে জিজ্ঞাস করাটা ঠিক হয়নি, সাবিহা তাকে অনেক ভালবাসে, মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে। অনন্ত বিছানায় শুয়ে নিজের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ঝিমাতে থাকে। তবে যা কিছু নিজ চোখে একয়দিন দেখে যাচ্ছে এতে সন্দেহ না করেও উপায় পাচ্ছে না। এক হাতে কখনও তালি বাজে না। মাথায় তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। এলোমেলো চিন্তায় সেভাবেই ঘুমিয়ে পড়ে।

মাঝরাতে সজাগ পেয়ে দেখতে পায় মশারি টাঙ্গানো, গায়ে ভারি কম্বল টেনে দেওয়া। পাশে সাবিহা নেই। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সাবিহা ব্যালকনিতে দাড়িয়ে আছে। দূর দিগন্তে টিপ টিপ জ্বলে থাকা ল্যাম্পপোষ্টের আলোরাশির দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে। সেখানে পিপিলিকার মতোন গাড়িগুলো ছুটে বেড়াচ্ছে। গাড়িগুলোর ভেতর একেকটা মানুষ, একেকটা জীবন, একেকটা গল্প, কারো সুখের কারো দুঃখের। মাঝরাতে কান পেতে কখনও শুনতে পাওয়া যায় কারো আহাজারি কারো চিৎকার, কখনো দূর জানালা দিয়ে দেখা মেলে কারো ভেঙে যাওয়া সংসারের শেষ দৃশ্য। সাবিহার মন খারাপ থাকলে এভাবে মাঝরাতে এলোমেলো ভাবনায় ডুবে যায়, এভাবেই দূর দূরান্ত থেকে ভেসে আসা অন্যের কান্না শুনে নিজেকে ‘ভাল আছি’ শান্তনা দিয়ে যায়। আজকের মন খারাপ এটাতো সামান্য অজুহাত মাত্র, ছোট্ট মন খারাপ মাঝরাতে হাজারো দমিয়ে রাখা কষ্ট গুলিকে জাগিয়ে তোলে। সপ্ত তলায় দক্ষিনমূখী এই বারান্দাটিতে সাবিহা প্রায় রাতেই এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, নির্জনে একাকি, প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে.. একদিন সুখ পাখিটা নীড়ে ফিরবে বলে।

সাবিহা বুঝতে পারে পাশে অনন্ত এসে দাঁড়িয়েছে। নূন্যতম বিচলিত না হয়ে সেভাবেই বাহির পানে চেয়ে। নীরবতা ভেঙে অনন্ত বলে উঠে আমি দুঃখিত, এভাবে বাজে সন্দেহে দোষারোপ করা ঠিক হয় নি। বসের কথা বার্তা আর চাহনিতে ভেতরটা এলোমেলো হয়ে গেছিল। তাই আর কি ঠিক আছে। হুম এটাই স্বাভাবিক। নিজের ভালবাসার মানুষের পাশে কেউ অন্যের অধিকার সহ্য করতে পারে না। তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই  যদি সন্দেহ না করো তবে কি কিছু কথা বলতে পারি? আমি একটুও সন্দেহ করবো না, যা বলার একদম ফ্রি মাইন্ডে বলে ফেলো তোমার বস শফিক সাহেবকে যতই লুচ্চা বলো, মানুষটা কিন্তু ভালো, অনেক কেয়ারিং, অনেক ফ্রেন্ডলি, কাজকর্ম সব কিছুতেই একটিভ পারসন, সম্পত্তি পজিসন এসবেও কমতি নেই। এখন হয়তো তার বয়স বেড়েছে কিন্তু ইয়াং বয়সে অবিবাহিত হলে অনেক মেয়েই তার সাথে মিশলে তারা সহজেই পটে যেত। আরেকটু খুলে বলি..? তোমার সাথে আমার কোনদিন পরিচয় না হলে.. আজ আমি অবিবাহিত পাত্রী হিসেবে থাকলে শফিক সাহেব যদি অবিবাহিত পাত্র হিসেবে আমার সামনে এসে দাঁড়াতো হয়ত আমিও পটে যেতাম। কোনো মানুষের প্রতি ভাললাগা সৃষ্টি হতে আমাদের কারো হাত থাকেনা। ভালো মানুষের প্রতি, সুন্দর চেহারার প্রতি এমন অনেক কিছুর উপর ভিত্তিকরে ধীরে ধীরে ভালবাসা গড়ে উঠে।

ভাললাগাতে কোনো অপরাধ নেই সেখানে আমাদের হাত নেই অপরাধ হচ্ছে নিজেকে কন্ট্রোলে না এনে বাধা-নিষেধ ডিঙিয়ে অবৈধ ভালবাসার স্বপ্ন দেখে যাওয়া। যতটুকু বুঝতে পেরেছি শফিক সাহেব আমার প্রেমে পরেছেন। আমাকে অনেক ভালবাসেন। আমি তার অনুভূতিকে ছোট করে দেখি না, ছোট করে দেখি তার স্বপ্নকে। ঘৃণা করি শফিক সাহেবের কল্পনাকে যে তার পরিবারের কথা না ভেবে নিজেকে অবৈধ পথে টেনে নিচ্ছে সাথে অন্যকেও সেই পথে নিতে চাচ্ছে। শফিক সাহেব যদি রিগুলার এভাবে যোগাযোগ করে যায় আর আমাকেও যদি সবকিছু জেনে বুঝে এভাবে যোগাযোগ রেখে প্রতিদিন হাসিমুখে কথা বলে যেতে হয় তবে একটাদিন হয়তো আমিও তার সঙ্গটাকে ভালোবেসে ফেলব। প্লিজ ভুল বুঝো না, আমার কিছুই হয় নি, শুধু এটুক বলে দিচ্ছি আমরা ভুল পথে আছি। একটা সম্পর্কে তৃতীয় কোন ব্যক্তি ঢুকে যায় কখন জানো? ঠিক তখনই যখন আমরা ঢুকার রাস্তাটা খুলে দেই। অনন্ত.. আমি চাচ্ছি তুমি সেই রাস্তাটা বন্ধ করে দাও, আগলে রাখো আমাকে.. আগলে রাখো নিজেকে.. আগলে রাখো আমাদের সুখের সংসারকে। আমি চাইনা তৃতীয় কোন মানুষ আশেপাশে চলে আসুক, অনেক ভালবাসি তোমাকে অনেক।

সাবিহা অনন্তকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগে। অনন্ত তাকে বুকে জড়িয়ে স্বান্তনা দিয়ে বলে যায় যা বলতে চাচ্ছো বুঝেছি আমি, তুমি কোনও টেনশন নিও না, সামনের মাসে এলাকা চেইঞ্জ করে ফেলবো। তোমার নাম্বারটা চেইঞ্জ করে দিব। প্রয়োজনে সরাসরি স্যারের সাথে কথা বলবো। কাউকে আসতে দিবনা তোমার পাশে কাউকেই না। চেইঞ্জ করে দিব.. সব চেইঞ্জ বলতে বলতে ঢুকরে কেঁদে উঠে। কিছু একটা বলতে গিয়ে অনন্ত থেমে যায়। সাবিহাকে বুকে চেপে রেখে নিজ কথা থামিয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলে যায়। সাবিহা সেদিন তার না বলা কথা গুলি বুঝে নিতে একটুও ভুল করেনি।

দুই মাস পর পার্কের বেঞ্চিতে একপ্রান্তে বসে আছে সাবিহা। অপর প্রান্তে বসে আছেন শফিক সাহেব!! এটাই দুজনের দ্বিতীয় এবং শেষ গোপন সাক্ষাৎ। দুজনের মুখে আজ আনন্দের হাসি। তারা পেরেছে চার চারটা জীবন রক্ষা করতে। যেদিন তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল সেদিন দুজনেই ছিল ধ্বংসের মুখে দাড়িয়ে। শফিক সাহেব সবকিছু খুলে বলে দেয়, প্রমাণ সহ অনেককিছু দেখিয়ে দেয়.. অনন্ত এবং তার স্ত্রীর মাঝে বিশেষ বন্ধুত্বের তিক্ত কাহিনী! একই অফিসে জব করেন শফিকের স্ত্রী, স্পষ্ট করে বলতে গেলে দুজন পরকীয়া প্রেমে জরিয়ে পড়েছিল। শফিকের সাথে তার স্ত্রীর সম্পর্ক খুব একটা ভাল যাচ্ছিলো না। এসুযোগে তার স্ত্রী অনন্তের সাথে আরও বেশি সময় দেওয়া শুরু করে দেয়। তারা ভেবে নিয়েছিল এবং এখনও ভেবে বসে আছে তাদের যোগাযোগ নিয়ে কেউ কিছু জানে না। কিন্তু চৌখস শফিক সাহেব ব্যাপারটা বুঝে নিতে খুব বেশি দেরি করেনি।

চুপচাপ প্রমাণ সংগ্রহ করে যায়। ঠান্ডা মাথায় সাবিহাকে ডেকে এনে বুঝায়। হই হুল্লোর করে লাভ নেই, বরং দুজন মিলে এমন কিছু করি যাতে তারা তাদের আপন মানুষদের কষ্ট বুঝতে শিখুক। বাচ্চাদের ধরে বেধে আটকে রাখা যায়, বড়দের নয়, বড়দের আটকাতে হয় বিবেকের রশিতে। একসিডেন্টে ভেঙে যাওয়া কাচের গ্লাস পাড়ালে ভাঙা টুকরো গুড়ো হয়ে যাবে.. পা কেটে রক্তাক্ত হয়ে যাবে.. তবু গ্লাস আর ফেরত পাওয়া যাবে না, বরং একটা একটা টুকরো লাগাতে বসি একদিন হয়ত পুরোগ্লাসটাই ফেরত পেয়ে যাবো। শফিক সাহেব আর সাবিহা ঠিক এই কাজটিই ধৈর্য ধরে করে গিয়েছেন, সুদিন ফেরার অপেক্ষায়। সেদিনের উপলব্দির পর অনন্ত নিজ থেকে অফিসে ট্রেন্সফারের আবেদন করে দিয়েছিল। আজ তারা বদলি হয়ে রাজশাহী চলে যাচ্ছে। আজ শেষ দেখা করতে সাবিহা ও শফিক সাহেব দুজন মুখোমুখি।

কেমন আছেন ভাবি? আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভাল, আপনার চলছে কেমন? আমারও অনেক ভাল। আজ রাতেই চলে যাচ্ছেন?  হ্যা, সবকিছু রেডি। ভাই ভাল থাকবেন, আপনি যে উপকারটা করেছেন আজীবন মনে রাখবো। আপনার আইডিয়াতে আজ সবকিছু ফিরে পেয়েছি। কিভাবে বিপদে ধৈর্য ধরে মাথা ঠান্ডা রেখে এগিয়ে যেতে হয় আপনার থেকে শিখতে পেরেছি। কি যে বলেন ভাবি, ডায়লগ তো সব আপনিই শিখিয়ে দিলেন! জীবনে নিজ বউকেই কোনদিন প্রশংসা শুনাতে পারি নাই আর আপনাকে অনন্তের সামনে কি দিয়ে কি যে বলেছি! হুম এরপর ভাবির সামনে বেশি বেশি তার দুর্নাম কইরেন তখন বুঝবেন আবার মজা , হাহা তওবা তওবা, এখন তো আমি রোমান্টিক ছেলে হয়ে গিয়েছি, সকাল বিকাল বউয়ের প্রশংসা করি! তোমার দেওয়া টিপস গুলো দিয়ে সত্যিই সম্পর্কটা অনেক গুছিয়ে আনতে পেরেছি।

দেইখেন ভাই একটু সাবধানে, অতি প্রশংসা করতে গিয়ে সেদিনের মতো যেন শসার প্রশংসা না করে বসেন! শসা খেয়ে বাহ বাহ কি অমৃত রান্না!! হি হি হা হা হা আচ্ছা ভাই এখন উঠি, ভাল থাকবেন তুমিও ভাল থেকো বোন উঠে যেতে যেতে শফিক সাহেব বলে উঠেন ভাবি! আপনার হাসিটা কিন্তু মারাত্মক সুন্দর! এহেম এহেম ভাইজান আমরা কিন্তু এখন ক্যারেক্টারের বাহিরে আছি! দুজন হো হো করে হেসে উঠে, বিদায়ের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে তুলতে শফিক তার মত করে মজা লুটে যাচ্ছে.. ” বিশ্বাস করেন ভাবি, আপনার কোকিল কন্ঠ এখনো রয়ে রয়ে কানে বেজে যায়! আপনার রান্না একদিন খেলে সাত দিন মুখে লেগে থাকে! ইত্যাদি ইত্যাদি” সাবিহা হা হা করে হেসে যাচ্ছে।

শফিক সাহেব তার বউকে ফিরে পেয়ে নতুন করে বাঁচতে শিখেছে। গোমড়া মুখো লোকটা আজ হাসি তামাশা করতে শিখেছে। অফিসের বদ্ধ চার দেয়ালের সিরিয়াস জীবনের বাহিরেও যে সুন্দর একটি জীবন রয়েছে তা তিনি বুঝতে শিখেছে। দুজন পার্ক থেকে বেড়িয়ে যায়। সাবিহা বিদায় নিয়ে হেঁটে যেতে থাকে তার গন্তব্যের পথে। হাতে সময় নেই, সাবিহা দ্রুত হেঁটে যায়। সুখ পাখিটা আজ প্রতীক্ষায় বসে আছে তার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত