মানিব্যাগ

মানিব্যাগ

অনেকদিন পর রেস্টুরেন্টে গেলাম নিজের পছন্দের কিছু খাবার খেতে। ম্যানুকার্ড দেখে নিজের পছন্দের কিছু খাবার অর্ডার করলাম আর মনভরে খেয়ে নিলাম। যাক অনেকদিন পর পছন্দের খাবারগুলো খেলাম। ” ওয়েটার এসে সামনে বিলটা রাখলো ” ৭৪০টাকা বিল এসেছে। বিল দেওয়ার জন্য মানিব্যাগ নিতে গিয়ে পকেটে হাত দিতেই দেখি আমার মানিব্যাগ নাই। এ কী আমার মানিব্যাগ গেলো কই! পুরো প্যান্টের পকেটগুলো তন্নতন্ন করে খুঁজার পরেও আমার মানিব্যাগটা পেলামনা। নিশ্চয় কোনো পকেটমার আমার মানিব্যাগটা হাতিয়ে দিয়েছে।

ওয়েটারটা একটু কষকষে গলায় বললো,
-‘ এইযে স্যার! সেই কখন দাঁড়িয়ে আছি বিলের জন্য। আমাদের আরো কাস্টমার আছে নাকি।
-‘ আরে ভাই এই শহরেই না চলাও বড় মুশকিল! দেখুননা আমার মানিব্যাগটা কে চুরি করে নিলো এখন পাচ্ছিইনা।
-‘ নাটক করবেননা বলে দিলাম। আপনার মতো নাটক করা মানুষ কতো আসে কতো যায়। আমি মালিককে ডেকে দিচ্ছি তিনিই এর ফয়সালা করবেন।

রেস্টুরেন্টের মালিককে সব খুলে বললাম! এও বললাম অন্যবার এসে বিলটা দিয়ে যাবো। ভদ্রলোকের উত্তর; -‘ এইখানে ইতরামি করতে আসস? দেখেতো ভালো পরিবারের ছেলে মনে হচ্ছে। পকেটে টাকা না থাকলে এইখানে খাইতে আসস কেন? টাকার সমপরিমাণ কাজ না করিয়েতো তুকে আজ ছাড়বোনা। পিছনের কিচনে যতগুলো অপরিষ্কার প্লেট আছে আজ সব তুকে পরিষ্কার করে ধুয়ে দিয়ে যেতে হবে।

এই বলে আমাকে রেস্টুরেন্টের কিচেনে দিয়ে আসলো। আমিও আর দেরি না করে প্লেটগুলো ধুয়া শুরু করে দিলাম। ” টানা ২ঘন্টা কাম্লামি করার পর কোনোভাবে রেস্টুরেন্টের মালিক আমাকে ছাড় দেয়।”

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এসে পাশের দোকানের চেয়ারে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসে পড়লাম। ” রেস্টুরেন্টে যাওয়ার আগে এই দোকান থেকেই আমি মোবাইলে রিচার্জ করেছিলাম ” রিচার্জের কথা মনে করতেই মনে পড়লো তখনওতো আমার মানিব্যাগটা ছিলো। মাত্র কয়েকমিনিটের ব্যাবধানে কেমনে হারায় গেলো আমার মানিব্যাগ? তার মানে এখানেই কেউ আমার মানিব্যাগটা চুরি করেছে! মনেমনে এইসব কথা বলতে না বলতেই দেখি পাশে থেকে একটা লোক দোকানটি থেকে চা খেয়ে বিল দিয়ে চলে যাচ্ছে। লোকটা একটু দূরে যেতেই দেখি সে তার পিছন পকেটে মানিব্যাগ ঢোকাচ্ছে! এ কী এইটাতো হুবুহূ আমার মানিব্যাগের মতো দেখতে। ”তাহলে কী লোকটাই আমার মানিব্যাগ চুর?” আমি আর দেরি না করে লোকটার পিছনে দূর দিলাম।লোকটা দেখি চলন্ত একটি বাসে উঠে গেছে। নিশ্চয় আমাকে দেখতে পেয়ে সে পালানোর চেষ্টা করছে। আমিও হাল ছাড়ার পাত্র নই.. কথা যখন আমার মানিব্যাগের তখনতো মোটেও না। বাসের পিছন,পিছন আমিও দিলাম সেই দৌড়, অনেক কষ্টে বাসটাকে থামালাম। বাসের ভিতর ঢুকে সরাসরিভাবে ওই লোকটার কলার ধরে বললাম;-‘ শালা চুর! লজ্জা হয়না হাত,পা থাকতে চুরি করস? আমি আজ তুকে পুলিশে দিবো।

ওই লোকটি আমাকে এক ধাক্কায় পিছনে ফেলে দিয়ে বলে;-‘ এই শুয়োর! তুই চুর কাকে বলস? তুই জানোস আমি কে? আর তুই কি আমাকে পুলিশে দিবি; আমিই তুকে আজ মানহানীর দায়ে পুলিশে দিবো। আমার শ্বশুর এই চট্টগ্রাম শহরে অনেক বড় পুলিশ অফিসার।

যাক শালা! চুরের মায়ের আবার বড় গলা.. তার উপর এর শ্বশুর নাকি পুলিশ, মনেমনে একটু ভয়তো পেয়েছিলাম৷ কিন্তু কথা আমার মানিব্যাগের ভয় পেলে চলবেনা। একটু সাহস নিয়ে বললাম;-‘ শ্বশুর পুলিশ তাই জামাই চুর হয়েছিস? শ্বশুর এর পাওয়ারের উপর সবসময় বেঁচে যাবি তাইনা? না এইবার তা হবেনা। তুই আমার মানিব্যাগ চুরি করেছিস তার শাস্তি তুকে পেতেই হবে।

বাসের লোকেরা তখন বলতে লাগলো, মানিব্যাগ দেখালেইতো সব ক্লিয়ার। আর তাদের কথায় আমিও তাল মিলিয়ে বললাম;-‘ হুম! মানিব্যাগ বের কর.. আমার মানিব্যাগে আমার প্রমাণ আছে। ভিতরেই আমার একটা না দুদুটা ছবি আছে।

ওই শালাটা মানিব্যাগ বের করে আমাকে এবং বাসের সবাইকে দেখালো! মানিব্যাগ দেখে আমার বাঘের মতো গর্জন দিতে থাকা গলাটা নিমিষেই বিড়ালের গলার রুপধারন করলো। মানিব্যাগের কালারটাই শুধু আমারটার মতো, ব্রান্ড বেশকম আর ভিতরে ওই শালা জানুয়ারটার ছবি। সে লোকটা আমাকে তার শ্বশুর এর ধমক দিতে লাগলো! আমি তাকে খুবই বুঝাতে চেষ্টা করেছি ইভেন কানে ধরে স্যরিও বলেছি।

বাসের সবাই মিলে আমাকে পুলিশের হাতে যাওয়ার থেকে বাঁচিয়েছে.. কিন্তু শাস্তিতো একটা দিবেই দিবে। সবাই মিলে কয়েকটা ছ্যাঁড়া জুতা জোগাড় করে মালা বানিয়ে আমাকে জুতার মালা পরিয়ে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। ” হয়তো এইটাই হওয়ার ছিলো! ভুলটা আমার। কে কি করলো আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসেনা আমার মাথায় এখনও মানিব্যাগের চিন্তা।”

বাস থেকে অসম্মানিত হয়ে নামার পর আমি রাস্তা দিয়ে হাটছিলাম.. সকাল থেকে দুপুর হয়ে গেলো। ” আমার সামনে দিয়ে সামনে এক সুন্দরী মেয়ে হেটে যাচ্ছিলো! আমার মতো একটা জিন্স পড়েছিলো মেয়েটি। এইটাইতো ট্রেডিশন! ছেলেদের প্যান্ট, শার্ট মেয়েরা দিনদিন কপি করে যাচ্ছে কিন্তু ছেলেরা আদৌ মেয়েদের কোনো কিছুই কপি করেনি।” দূর আমি এইসব ভাবছি কেন? নিজের টেনশনে নিজে শেষ এইসব ভেবে আরও টেনশ ন নেওয়ার কোনো মানেই হয়না।

এইসব ভাবা শেষ করতেই লক্ষ্য করলাম মেয়েটি রাস্তার পাশের দোকান থেকে কি যেনো কিনছে। দূর সে কি কিনবে না কিনবে তাতে আমার কী! নিজের জ্বালায় নিজে মরি, কেমনে পাবো আমার মানিব্যাগ। মেয়েটির দিকে আবার থাকাতেই দেখি সে যেনো তার প্যান্টের পিছনের পকেট থেকে কী যেনো বের করছে।

হোয়াট দ্যা ফা*.. এই মেয়েতো মানিব্যাগ বের করে দোকানদারকে টাকা দিচ্ছে। ” আচ্ছা মেয়েরাও কী ছেলেদের মতো মানিব্যাগ ব্যবহার করে?” শার্ট,প্যান্টের সাথেসাথে কী তাহলে তারা ছেলেদের মানিব্যাগও কপি করা শুরু করে দিলো? এইরকম হাজারো প্রশ্ন তখন মাথাতে ঘোরপাক খাচ্ছিলো। মেয়েটির মানিব্যাগের কালারটা আমার মানিব্যাগের মতো! এইটা আমার মানিব্যাগ নয়তো? মেয়েরাতো মানিব্যাগ ব্যবহার করার কথানা। দূর এইসব আমি কি ভাবছি, ওই লোকটার মানিব্যাগের মতো হয়তো শুধু কালারটাই সেইম.., তবুও আরেকটু সামনে গিয়ে দেখতে পেলাম এইটাতো “Oxpord” ব্রান্ডের মানিব্যাগ। আমার মানিব্যাগের ব্রান্ডতো “Oxpord” আমি এইবার ডেফিনেটলি সিউর এইটাই আমার মানিব্যাগ।

মেয়েটি আমার সামনে দিয়ে ওভারটেক করে গিয়ে দেখি একটি বাসে উঠেছে.. আমিও মেয়েটির পিছুপিছু ওই বাসে উঠে গেলাম। বাসে দেখি অনেক মানুষ! আমার মানিব্যাগ নিয়ে কথা উঠাবো,উঠাবো ভাবতেই মাথায় এলো এইখানে অনেক মানুষ, আমি এখন মেয়েটির মানিব্যাগ আমার বললে যদি মেয়েটি ন্যাকা কান্না করে দেয়? না মানে মেয়েদেরতো ন্যাকা কান্না করার অভ্যাস বেশি। তাহলেতো পুরো বাসের মানুষেরা মেয়েটির পক্ষে কথা বলবে, কারণ বাঙালিরা সবসময় মেয়েদের ন্যাকা কান্নায় পটে চলেছে। এইটা এখন বলতে গেলে বাঙালির সংস্কৃতি হয়ে গেছে। তাই আমি ভাবলাম মেয়েটিকে হাতেনাতে ধরে সবার সামনে প্রমান দিবো।

প্রায়ই ১৫মিনিট বাসযাত্রা হয়ে গেছে, কিন্তু তবুও মেয়েটি মানিব্যাগটা পকেট থেকে হাতে নিচ্ছেনা!উফ। আমি লক্ষ্য করলাম মেয়েটির পিছন পকেটে আমর মানিব্যাগটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এইটাই আমার মানিব্যাগ এতে কোনো ভুল নেই। মনেমনে এইসব কথা বলতে,বলতে হঠাৎ আমাদের দেশটার জন্য খুবই মায়া হলো.. ” এ দেশের কী হবে? যে দেশে এতো সুন্দর,সুন্দর মেয়েরাও চুর হয় সে দেশের ভবিষ্যৎ কোথায়?”। দূর! এইসব ভেবে লাভ নাই এই মুহূর্তে আমার একমাত্র ফোকাস আমার মানিব্যাগ।

মেয়েটির পিছন পকেট থেকে মানিব্যাগটি নিয়ে নেওয়ার চান্স আছে। তাই ভাবলাম মানিব্যাগটি নিয়ে নিবো এবং আমি পুরোপুরি সিউর হয়ে সবার সামনে প্রমাণ করবো। তো আমি আর দেরি না করে সরাসরি মেয়েটির পিছন পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগটা নিয়ে নিলাম।

সাথেসাথে মেয়েটি চুর,চুর বলে চিল্লাতে লাগলো। কয়েকটা লোক এসে আমার শার্টের কলারে হাত দিয়ে বলে;-‘ কি সমস্যা? বাসে এসে মেয়েদের পকেটমার করিস লজ্জা করেনা?’

আমার আর ভয় কিসের! আমি বললাম;-‘ হাহা! আমি চুর? আরে এই মেয়েটাই চুর। এইটা আমার মানিব্যাগ। এতো সুন্দর মেয়ে পকেটমার ভাবতেই অবাক লাগে তাইনা? আমি নিশ্চিত ওরা অনেকেই মিলে একটা গ্যাং হয়ে আছে। দেশের সুন্দর,সুন্দর মেয়েরাই পকেটমার, একবার ভাবুন সবাই “ দেশ এখন কতোটা বিপর্যয়ে।“

মেয়েটি তখন রেগে যতোগুলো ইংলিশ গালি জানে সবগুলায় আমাকে দিয়েছে। আর বলে;-‘ এইটা আমি আজই মার্কেট থেকে কিনেছি। ভিতরে আমার ২৫০০টাকা আছে, আর আমার আর আমার জানুর ছবিও ভিতরে লাগানো আছে ।

এক লোক আমার হাত থেকে মানিব্যাগটা নিয়ে নাকে ঘ্রাণ শুকে প্রমাণ করলোযে এইটা নতুন। মানিব্যাগ খুলে ভিতরে টাকা গুনে দেখে বরাবর ২৫০০টাকা ও ভিতরে মেয়েটা এবং তার কালা জানুর ছবি । মেয়েটিকে তখন একটিবারের জন্যে বলতে ইচ্ছে হয়েছিলো “ ঠকছেন আপু ঠকছেন!“ কিন্তু ততক্ষণে বাসে ঘোষণা হয়যে আমি পকেটমার ।

আমি কিছু বলে উঠার আগেই বাসের সবাই মিলে ধুমধাম মারতে শুরু করলো । তারপর আমার আর কিছু মনে নেয়।

আমার যখন জ্ঞান আসে আমি তখন বাসের মেঝে শুয়ে ছিলাম। বাসে আর একটা প্যাসেঞ্জারও নেই। চোখ খুলতেই বাসের হেল্পার আমার কাছে এসে বলে;-‘ এইবার বাস ভাড়া দাও আর দূর হও!

আমি বললাম “ আমার কাছে একটা পয়সাও নেই “ বাসের হেল্পার তখন বলে “ তাহলে রাত পর্যন্ত বাসের হেল্পারের কাজ করে টাকা শোধ করে যাও।“

মানবতা আর বেঁচে নেয়, সত্যিই বেঁচে নেয় । আমি আর মার খেয়ে অজ্ঞান হতে চাইনা তাই কাজ শুরু করে দিলাম।

“ এই ২নাম্বার, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, জিসি, টাইগারপাস আসেন আসেন । এই ২নাম্বার, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, জিসি, টাইগারপাস আসেন আসেন“

রাত ১০টা পর্যন্ত বাসের হেল্পারগিরি করে বাসের ড্রাইভার থেকে ২০টাকা বাসা আসার গাড়ি ভাড়া নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়লাম! বাস থেকে নেমে একটা রিক্সা নিয়ে সোজা বাসায় চলে আসলাম ।

বাসায় কাউকে কিছু না বলে নিজের রুমে চলে আসলাম। ক্লান্ত শরীরে তখন শার্ট,প্যান্টগুলো তখন বোঝা মনে হচ্ছিলো। শার্ট আর প্যান্ট খুলে অনেকটা রাগান্বিত হয়ে ফ্লোরে আছাড় দিলাম ।

প্যান্টটা আছাড় দেওয়ার সাথে,সাথেই দেখি আমার “মানিব্যাগটা“ বেরিয়ে এলো। তখনি আমার মনে পড়ে আজ সকালে বাসা থেকে বেরোনোর সময় এই নতুন প্যান্টটা পড়েছিলাম, আর এই প্যান্টটার পকেটের ভিতর আরেকটি ইন্টারেস্টিং পকেট ছিলো। আর আমি চালাকি করে মানিব্যাগটা ওই পকেটে নিয়েছিলাম ।

এক মিনিটের মধ্যেই সব হিসাব মিলে গেলো। তখন একটিবারের জন্যে “ নিজের মাথাটা নিজেই ফেটে ফেলার ইচ্ছে করেছিলো “ কিন্তু পারিনি! হাজার হলেও মাথাটাতো নিজের ছিলো ।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত