সাডেন ডেথ

সাডেন ডেথ

– তিতলী
– বলো।কিছু লাগবে?
– না।তুমি একটু আমার পাশে এসে বসো।
– আমি তো সবসময় তোমার পাশেই আছি।
– জানি।মাঝেমাঝে খুব ভয় হয়।চোখে অন্ধকার দেখি।এত আলো চারপাশে তাও কেমন যেন লাগে।তোমাকে খুঁজে পাই না।
– আমাকে খুঁজতে হবে না।আমি তোমার পাশেই আছি।একটু বারান্দায় এসে বসবে?ভালো লাগবে।
– আমার আবার ভালো লাগা আর খারাপ লাগা।সব দিনই একরকম যাচ্ছে। শুধু অপেক্ষার পালা, কবে শেষ হবে সেটাই ভাবি।
– বাজে চিন্তা করবে না আবির।
– মন খারাপ করে দিলাম?
– দিলে তো।
– সে তো সবসময় দিয়ে আসছি।বিয়ের কয়দিন ই বা তোমাকে ভালো রেখেছি বলো?
– আমি ভালো আছি।তোমাকে নিয়ে ভালো আছি।আর তোমাকে নিয়েই থাকতে চাই।আমার তো চাওয়ার কিছু নেই তোমার কাছে।যে ভালোবাসা পেয়েছি তা নিয়ে সারাজীবন কাটবে।
– নিজের মনকে আর কত সান্তনা দিবে?আমি জানি তো তুমি কতটা ভালো আছো।
– শুনো বেশী জানতে হবে না।তোমার ওষুধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
– সে আর কি।খাওয়া, ওষুধ আর বিশ্রাম এগুলো প্রতিদিনের রুটিন হয়ে গেছে।
– ইদানীং অনেক কথা বলো তুমি।
– হয়ত আর বেশীদিন শুনতে হবে না।
– কি বললে?
– ওমা ওমা… এই দেখো… চোখে পানি পাগলীটার।আমি তো মজা করেছি।
– তুমি সবসময় এমন করো।
– আচ্ছা আর করবো না।যতদিন বেঁচে আছি।
– আবারও আবির।বেশী বেশী করছো।আমি কিন্তু তোমার সামনে আর আসবো না।
– সে তো পারবে না।
– সেটাই তো আমার দুর্বলতা। তোমার ভালোবাসা আমাকে দুর্বল করে রেখেছে।প্রতিটি নিঃশ্বাসে তোমার ভালোবাসা অনুভব করি।তোমার কাছেই শান্তি খুঁজে পাই।
– আচ্ছা আর কিছু বলবো না।মন ভালো করো।আর ওষুধ টা আমাকে দাও।
– হুম।একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো।আমি হাতের কাজ গুলো সেরে আসছি।

আবির আর আমার বিয়ে পারিবারিক ভাবে হয়েছিলো।ছয় মাস চলছে।বিয়ের আগে কেউ কাউকে একবারও দেখিনি।হঠাৎ করে সবকিছু হয়ে যায়। বিয়ের পর দিনগুলো স্বপ্নের মত কাটছিলো।এত ভালোবাসা এত স্বপ্ন আগে কখনো পাইনি।ও আমাকে যা দিয়েছে।দু’জনে ভালোবাসার ঘর বাঁধার ওয়াদা করেছি।কাউকে কখনো ছেড়ে না যাওয়ার কমিটমেন্ট করেছি।আসলে সবার কপালে সব সুখ সয় না।সবকিছু ধরে রাখার ক্ষমতা আল্লাহ্‌ সবাইকে দেন না।হঠাৎ ঝড়ের তান্ডবে সব এলোমেলো হয়ে গেলো আমার ভালোবাসার ঘর।আবির একদিন খুব অসুস্থ হয়ে যায় অফিসে।কলিগরা ওকে হাসপাতাল নিয়ে যায়।অনেক গুলো টেস্ট দিলো।

এমন একটা খবর পাবো জীবনেও আশা করিনি।ওর শরীরে কবে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে।ও বুঝতেই পারেনি।এমন খবর শুনার পর কার কি অবস্থা হয় আমি জানি না।তবে আমি জ্যান্ত লাশ হয়ে গেছি ওই মুহূর্ত থেকে।কয়েকদিন পর পর থেরাপি দিতে হয়।ওর মুখের দিকে তাকাতে পারি না।দিনদিন শরীর আরও খারাপ হচ্ছে ওর।আমার ভালোবাসা আমার চোখের সামনে ধুকে ধুকে মরছে।আর আমি চেয়ে আছি।যন্ত্রণায় বুকটা ভারী হয়ে আসে।ওকে ছাড়া হয়ত আমি বাঁচবো তবে মরার মত।এ বাঁচার কোন মূল্য নেই।আবির তুমিহীনা আমি যে নিঃস।

এক সপ্তাহ পর

আবির এখন হাসপাতালে আই সি ইউ তে।আমার পাশে ওর পরিবার আমার পরিবারের সবাই আছে।শুধু ও শুয়ে আছে চুপচাপ।আমি ছোট্ট একটা জানালা দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি।কখন ও তিতলী বলে আমাকে ডাকবে।ওর ডাক শুনার জন্য দু’দিন ধরে দাঁড়িয়ে আছি।আমাকে ডেকে যদি না পায়।তখন ও তো অস্থির হয়ে যাবে।ও তো আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝে না।

আবির মারা যাওয়ার কয়েকদিন পর

– তিতলী তোকে মানতে হবে আবির আর নেই।
– মা… আমি এসব কিছুই মানি না।ও আসবে আমাকে তিতলী বলে ডাকবে।আমি অপেক্ষায় আছি।
– তুই এত পাগলামি করলে হবে? তোকে তোর বাচ্চার কথা ভাবতে হবে।যে কয়েকটা দিন পর পৃথিবীতে আসতে চলল।
– মাগো ও মা… আমার সাথে কেন এটা হলো?আমার তো চাওয়া বেশী ছিলো না।আবিরকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছি শুধু।ও তো বলেছে আমাকে ছেড়ে কখনো যাবে না।তাহলে কেন গেলো?বলো না মা…
– কাঁদিস নারে। তোর কষ্ট আমাদের আর সহ্য হচ্ছে না।দেখবি সব ভুলে যাবি বাচ্চার মুখ দেখলে।
– বাচ্চা? ওকে দেখলে আবিরের কথা আরও বেশী মনে পড়বে।
– আয় আমার বুকে।
– মাগো।কি কষ্ট। সইতে পারছি না।

একমাস পর আমার একটা বেবি হলো।একটা ছেলে বেবি।ঠিক ওর বাবার মত চেহারা।ছেলেরা মা’য়ের মত হয়। তবে ও আবিরের মত।কিছুটা কষ্ট লাঘব হলো ও চেহারা দেখে।সারাদিন ওকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তবে দিনশেষে আবিরের শূন্যতা আমাকে পাগল করে তুলে।এত অল্প সময়ে এত ভালোবাসা পাবো, কখনো ভাবিনি।ও তো আমাকে একটা গিফট দিয়ে গেলো।এখন বেবি টাই আমার সবকিছু। আমার ছোট্ট পৃথিবী।

যে পৃথিবীতে আমি, আবির আর আমাদের বেবিটা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত