অতীতের দর্পন

অতীতের দর্পন

আরাম চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ করেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন রাশেদ সাহেব। মনে হয় আধাঘন্টার মত ঘুমিয়েছেন। হঠাৎ একটা শব্দে রাশেদ সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলে দেখলেন তার সামনে একজন অতি রুপবতী তরুনী নীল শাড়ী পরে দাঁড়িয়ে আছে। তরুনীর মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি।
— কি ব্যাপার? আজকাল অনেক ক্লান্ত থাকেন মনে হয়? একটুতেই ঘুমিয়ে পড়েন যে!
রাশেদ সাহেব দুই হাতে চোখ কচলালেন। এটা নিশ্চয়ই তার চোখের ভুল। এমন রুপবতী কেউ এই বাড়িতে থাকে না। আর থাকলেও সে রাশেদ সাহেবের ঘরে হুট করে ঢুকতে পারতো না। কারন চেয়ারে বসার আগে সে তার ঘরের দরজা আটকে নিয়েছিল যেন কেউ বিরক্ত করতে না পারে।
— কে তুমি? আমার ঘরে কিভাবে ঢুকলে?
— ওমা! এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে গেলেন? ভাল করে আমাকে দেখুন, তাহলেই আমাকে চিনতে পারবেন।
রাশেদ সাহেব আপাদমস্তক মেয়েটাকে নিরিক্ষন করলেন। কিন্তু মেয়েটাকে চিনতে পারলেন না কিছুতেই। আচ্ছা এমনো তো হতে পারে যে এই মেয়ে তার কোন আত্মীয়ের মেয়ে। চেয়ারে বসার আগে রাশেদ সাহেব দরজা বন্ধ করেননি, যার ফলে এই মেয়ে ঘরে ঢুকতে পেরেছে
— ঠিক চিনতে পারছি না। তুমি কে তা বলবে আমায়?
— বয়স বাড়ার সাথে সাথে আপনার মস্তিষ্কের জোর কমে গেছে। আমার কথা একেবারেই ভুলে গেছেন দেখছি। আবারো ভালমত দেখুন। মনযোগ দিয়ে দেখলেই আমাকে চিনতে পারবেন।
রাশেদ সাহেব আবারো মেয়েটার দিকে তাকালেন। ভালমত তার চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এবার রাশেদ সাহেবের কেন যেন মনে হলো এই মেয়েটাকে কোথায় যেন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু পুরোপুরি মনে পড়ছে না।
— আচ্ছা তুমি হেঁয়ালি বাদ দাও। তুমি কে তা খোলাসা করে বলো। আর আমার ঘরে ঢুকলে কিভাবে?
— সত্যিই আপনি আমাকে চিনতে পারেননি?
— নাহ চিনতে পারিনি।
— আমি !
মেয়েটা নিজের পরিচয় দেয়ার আগেই ঠকঠক করে দরজায় কেউ করাঘাত করলো। নিশ্চয়ই রাশেদ সাহেবের স্ত্রী দিলরুবা বেগম দরজার ওপাশে শরবত হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। কারন এখন রাশেদ সাহেবের শরবত খাওয়ার সময়।
মেয়েটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। রাশেদ সাহেব উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন।
— কি ব্যাপার? দশমিনিট ধরে দরজা ধাক্কাচ্ছিলাম। ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?
দিলরুবা বেগমের কথায় রাশেদ চমকে গেল। দশ মিনিট ধরে দরজা ধাক্কাচ্ছিল? কিন্তু রাশেদ তো মাত্র দুইবার শব্দ শোনার পরেই দরজা খুলে দিল। দিলরুবা বেগম দরজার সামনে দাঁড়িয়েই রাশেদের হাতে সরবত তুলে দিয়ে আবার চলে গেল। তার হাতে অনেক কাজ বাকি।
সরবত হাতে রাশেদ আমার ফিরে এলো আরার চেয়ারে। অাশ্চর্য! মেয়েটা নেই। হঠাৎ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল মেয়েটা। মাথাটা ঝিমঝিম করছে রাশেদ সাহেবের। দিলরুবা হয়তো ঠিকই দশমিনিট ধরে দরজা ধাক্কাচ্ছিল। ঘুমের ঘোরে হয়তো স্বপ্ন দেখছিল রাশেদ সাহেব। কিন্তু এই বুড়ো বয়সে এমন সুন্দরী তরুনী স্বপ্নে আসার কারন কি? তাছাড়া সুন্দর একটা পারফিউমের ঘ্রান বারবার রাশেদ সাহেবের নাকে লাগছে। যা ওই মেয়েটার কাছথেকে আসছিল।
রাতের খাওয়ার পরপরই এই বাড়ির সবাই বিছানায় চলে যায় ঘুমানোর জন্য। বুড়ো বয়সে মানুষের সহজে ঘুম আসতে চায় না। কিন্তু রাশেদ সাহেবের বেলায় ব্যাপারটা অন্যরকম। বিছানায় শোয়া মাত্রই সে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায়। আজও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। চোখ বুজে আসে তার গাঢ় ঘুমে।
এই গাঢ় ঘুম কিছুক্ষনের মধ্যেই ভেঙ্গে যায়। ঘুম ভাঙ্গার কারন নুপুরের মৃদু টুংটাং শব্দ এবং দুপুরের সেই পরিচিত পারফিউমের ঘ্রান। পুরো ঘর অন্ধকার, কিন্তু বারান্দা যেন চাঁদের আলোয় আলোকিত। নিশ্চয়ই আজ আকাশে বড় চাঁদ উঠেছে। রাশেদ সাহেব বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় যান। আকাশে কোন চাঁদ উঠেনি, দুপুরে স্বপ্নে দেখা সেই মেয়েটার শরীর থেকেই এমন তীব্র আলো বের হচ্ছে।
আবারো স্বপ্ন দেখছেন রাশেদ সাহেব? কিন্তু স্বপ্ন এতটা বাস্তব হয় কিভাবে? আর কে এই মেয়ে? যে বারবার রাশেদের স্বপ্নে হানা দিচ্ছে?
— এই মেয়ে কে তুমি? আর কি চাও আমার কাছে? বারবার কেন তুমি আমার কাছে আসো?
— আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি তো আপনার অতি পরিচিত একজন।
একথা বলেই মেয়েটা হাসে, অপার্থিব হাসি। এই হাসির জন্ম এই পৃথিবীতে নয়, অন্য কোন জগতে এই হাসির সৃষ্টি। রাশেদ সাহেব মুগ্ধতা এবং ভয় নিয়ে মেয়েটার হাসি উপভোগ করছে। এই হাসিটা এর আগেও কোথায় যেন দেখেছে রাশেদ। কিন্তু কিছুতেই মনে আসছে না।
— তোমার হাসিটা অনেক চেনা চেনা লাগছে আমার কাছে। তুমি কি তোমার পরিচয় দেবে?
— যেদিন পরিচয় দিব সেদিই তো সব শেষ হয়ে যাবে। এত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে গেলে কি চলবে? আমার পরিচয় পরে পাবেন। আসুন কফি খেতে খেতে কিছুক্ষন গল্প করি।
— এত রাতে কফি কোথায় পাবে?
— এইতো আমার দুই হাতেই দুই মগ কফি।
রাশেদ সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন মেয়েটার হাতে দুইমগ কফি। এতক্ষন তো এই কফি নজরে পড়লো না। মেয়েটা আবারো হাসছে, অপার্থিব এক হাসি।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে গিয়েই রাশেদ সাহেব প্রচন্ড ঝাঁকুনি অনুভব করলেন। ভুমিকম্প হচ্ছে নাকি?
— রাশেদ, রাশেদ ঘুমের ঘোরে কার সাথে কথা বলছো?
রাশেদ সাহেব চোখ মেলে তাকালেন। ঘরে বাতি জ্বলছে। দিলরুবা বেগম ঝুঁকে আছে তার মুখের উপর। তার চোখে ভয় এবং বিস্ময়।
— ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করছিলে কেন? স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি?
দিলরুবার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রাশেদ সাহেব তাকালেন বারান্দার দিকে। তখনই মনে পড়লো যে তাদের এই ঘরে কোন বারান্দা নেই, আর থাকার কথাও না। তারমানে আবারো স্বপ্ন দেখছিল সে? কিন্তু স্বপ্ন এতটা বাস্তব কিভাবে হয়? এখনো তার নাকে সেই পারফিউমের সুবাস আসছে।
এরপর থেকেই রাশেদ সাহেবের শুধু ঘুম পায়। কোথায় বসলে সে ঘুমিয়ে পড়ে, কোথায় দাঁড়িয়ে থাকলেও সে ঘুমিয়ে পড়ে। লজ্জার বিষয় হচ্ছে টয়লেটে বসেও মাঝে মাঝে সে ঘুমিয়ে পড়ে। আর ঘুমিয়ে পড়লেই সেই নাম না জানা তরুনী হাজির হয় রাশেদ সাহেবের সামনেই।
— আচ্ছা অপরিচিতা, তুমি তো শুধুই আমার স্বপ্ন। তবুও কেন তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে?
এই কথাটা বলেই রাশেদ সাহেব লজ্জায় লাল হয়ে যান। এই বয়সে এমন লুতুপুতু টাইপের কথা বলা কি ঠিক হচ্ছে? তাও আবার এমন একজনের সামনে যার কোন অস্তিত্ব নেই? কিন্তু এটা সত্যি যে এই অপরিচিত মেয়ের সাথে দেখা করার লোভেই রাশেদ সাহেব সবসময় ঘুমিয়ে পড়েন। কঠিন এক ঘুমরোগে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি।
— আপনি আমার প্রেমে পড়ে গেছেন। এখন আপনার কি করা উচিত জানেন?
— কি করা উচিত?
— আমাকে বিয়ে করা উচিত। চলুন আমরা বিয়ে করি।
আবারো মেয়েটা হাসছে। অপার্থিব সেই হাসি। রাশেদ সাহেব অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন সেই হাসির দিকে। কে এই মেয়ে? কেনই বা রাশেদ সাহেবের জীবনে এভাবে জড়িয়ে গেল? বিষয়টা জানতেই হবে।
— তুমি বলেছিল তোমার পরিচয় পরে বলবে। আজ তোমার পরিচয় বলতেই হবে। কে তুমি? কি নাম তোমার?
— আমি বলেছিলাম যেদিন পরিচয় বলবো সেদিনই সব শেষ হয়ে যাবে। তারপরেও আমার পরিচয় জানতে চান?
— হুম আমি জানতে চাই।
— আচ্ছা তাহলে শুনুন আমার পরিচয়। আমার নাম জিনিয়া সুলতানা।
জিনিয়া সুলতানা নামটা শুনেই রাশেদ সাহেব চমকে গেলেন। এই নামটা যে তার অতি পরিচিত। কিন্তু এই মেয়ে জিনিয়া হয় কিভাবে? জিনিয়াকে তো অনেক বছর আগেই……!
— কি ব্যাপার? চমকে গেছেন আমার নাম শুনে? ভাবছেন মৃত মানুষ কিভাবে আপনার সামনে এসে কথা বলছে?
— তু..তু..তুমি জিনিয়া? এটা কিভাবে সম্ভব?
— সবই সম্ভব রাশেদ আঙ্কেল। যেভাবে আপনি আমার বাবার বন্ধু হয়েও আমাকে ধর্ষনের পর মেরে ফেলার মত ঘৃন্য কাজকে সম্ভব করেছিলেন ঠিক সেভাবেই আজ আমি মরে গিয়েও আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকাকে সম্ভব করেছি।
একথা বলতে বলতেই মেয়েটা যেন হঠাৎ বদলে যেতে লাগলো। ধীরে ধীরে চেহারা পাল্টে যাচ্ছে মেয়েটার। একসময় সেই পনের বছর বয়সী জিনিয়ার রুপ ধারন করলো মেয়েটা। তাহলে কি জিনিয়া আবার ফিরে এসেছে প্রতিশোধ নিতে?
সেদিন রাশেদ সাহেব তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু রফিকের বাড়ি গিয়েছিল আড্ডা দেয়ার জন্য। কিন্তু রফিকের বাড়িতে রফিকের মেয়ে জিনিয়া ছাড়া আর কেউ ছিল না সেদিন। বাকী সবাই কোথায় গিয়েছিল বেড়াতে। শুধু জিনিয়ার পরীক্ষা থাকায় সে বাসায় ছিল।
— জিনিয়া বাসার সবাই কোথায় গেছে?
— আঙ্কেল সবাই তো বাইরে গেছে। এক্ষুনি এসে পড়বে। আপনি কিছুক্ষন বসে আমাকে ম্যাজিক দেখান।
— আচ্ছা ঠিক আছে।
ছোটবেলা থেকেই রাশেদের ম্যাজিক দেখানোর বাতিক ছিল। বয়স হওয়ার পরেও তার এই বাতিক যায়নি। জিনিয়া রাশেদের ম্যাজিকের ভক্ত। তাই আজ বায়না ধরেছে ম্যাজিক দেখার। রাশেদ মানা করলো না। সে একের পর এক ম্যাজিক দেখাতে লাগলো। ম্যাজিক দেখতে দেখতে জিনিয়া রাশেদের অনেক কাছে চলে আসলো। রাশেদের ভেতরের পশু জেগে উঠলো ধীরে ধীরে। তারপর সুযোগ বুঝে……….!
— অতীতে হারিয়ে গিয়েছেন বাকি রাশেদ আঙ্কেল? চলুন আপনাকে আমি নিতে এসেছি।
একথা বলেই জিনিয়া হেসে উঠলো। এবার এই হাসি রাশেদ সাহেবকে মুগ্ধ করেনি, ভয়ে জমিয়ে বরফ করে দিয়েছে।
সেদিন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর রাশেদ ভয়ে অস্থীর হয়ে পড়লো। কারন জিনিয়া অচেতন হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। এখন কি করবে তাই ভেবে পাচ্ছে না রাশেদ। জিনিয়া বেঁচে থাকলে সে ফেঁসে যাবে। তাই সে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলে জিনিয়াকে। তারপর জিনিয়ার লাশ বাড়ীর পেছনে বয়ে চলা নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে চলে আসে নিজের বাড়ীতে। সেদিনের এই ঘটনা কেউ জানেনা। একমাত্র প্রকৃতি এই নির্মমতা, বর্বরতার সাক্ষী ছিল। আজও নিশ্চয়ই প্রকৃতি এই নির্মমতার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য জিনিয়াকে পাঠিয়েছে।
— আপনাকে বলেছিলাম আমার পরিচয় জানার পরই সব শেষ হয়ে যাবে।
রাশেদ সাহেবের চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসছে। তার পা টলছে, মাথা ঘুরছে। সে একসময় ধপাস করে পড়ে যায় মেঝেতে।
একঘন্টার মত দরজা ধাক্কা ধাক্কির পর দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢোকে রাশেদ সাহেবের দুই সন্তান আর তার স্ত্রী। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার ঘরে কেউ নেই। শুধু ঘরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে অতি মিষ্টি পারফিউমের সুবাস।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত