মোমবাতি

মোমবাতি

কত শতাব্দী পূর্বের কথা ! রানী ক্লিওপেট্রার স্নান ঘর। এ রানী যে সে রানী নন। নানাবিধ সুগন্ধী ভেষজ মিশ্রিত স্নানাধারে শায়িত তিনি। দাসী হাত ধরে রেখেছে জ্বলন্ত মোমবাতি। টুপ টুপ করে মোম গলে গলে পড়ছে স্নানের জলে। ভাসতে ভাসতে তারা শীতল হয়ে জমাট বেঁধে লেগে যাচ্ছে রানীর শরীরের প্রতিটি রোমকূপে। সময় বাধা পড়ছে সেই মোম দ্বারা রচিত পিচ্ছিল মসৃণ ত্বকে। মোম যে খুব প্রয়োজনীয় এক প্রসাধনী ! নেটে মন দিয়ে ক্লিওপেট্রার অদ্ভূত সব প্রসাধনী দ্রব্য দিয়ে সৌন্দর্য চর্চার এনিমেটেড ভিডিও ক্লিপিং দেখছিল প্রিয়া। কাল এভাবেই নিজেকে সাজাবে যে সে।

রাহুল আর প্রিয়ার পরিচয় ফেসবুকে। দীর্ঘ ছয় মাস ভার্চুয়াল পৃথিবীতে মন দেওয়া নেওয়ার পর আজ ওদের প্রথম সাক্ষাৎ হবে। অফিস থাকে দুজনেরই। তাই আদর্শ সময় হল সন্ধ্যে। পার্লার থেকে রীতিমত সেজেগুজে ওয়াক্স করে এসেছে প্রিয়া। মহানগরীর বুকে ছোট্ট এই রেস্টুরেন্টে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার একদম পারফেক্ট ওদের জন্য। নরম গদিওয়ালা চেয়ারে দু’জন দু’দিকে। মাঝে টেবিলের উপর সুদৃশ্য কারুকার্য করা সুগন্ধী মোমবাতি। প্রেমের সুঘ্রাণ বয়ে নিয়ে আসছে ওদের কাছে। মোমবাতি প্রেমের অনুঘটক। ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে রাহুলের দিকে তাকিয়ে ভাল লাগার আবেশে ভরে যাচ্ছে প্রিয়ার মন। উফঃ কি চার্মিং রাহুল ! ঠিক যেন তার স্বপ্নের রাজকুমার।

ঘড়িতে রাত বারোটা। কলকাতা শহরের আনাচে কানাচে জেগে আছে মানুষেরা। আর ঢাকুরিয়ার এই নির্জন ফ্ল্যাটে জেগে আছে ওরা দু’জন। ক্যান্ডেল লাইট ডিনার সেরে ওরা সোজা এসেছে রাহুলের এই ফ্ল্যাটে। মাদক মিশ্রিত ওয়াইনের ঘোরে প্রিয়ার পা টলোমলো। বেডের উপর ধপ করে পড়ে যায় ওর শরীরটা। হাঁটু অবধি লাল শিফনের স্কার্ট এখন আরো উঠে গিয়ে ওর ধবধবে সাদা উরু দৃশ্যমান। এক পলক সেদিকে তাকিয়ে ঠোঁটটা চেটে নেয় রাহুল ওরফে শ্যাম ওরফে ডেভিড ওরফে… ক্যামেরাটা রেডি করে ভিডিও মোড অন করে রাখে। শার্ট প্যান্টটা খুলে এগিয়ে যায় বিছানার দিকে। এহহ একদম নেতিয়ে পড়েছে মেয়েটা। নেহাতই আনকোরা। ওর দু’পায়ের ফাঁকে ঘাঁটি গাড়তে অসুবিধা হওয়ায় বিরক্ত হয় রাহুল। উঠে যায় আলমিরার কাছে। ড্রয়ারে পরে আছে অনেক গুলো মোমবাতি। সাইজ মত একটা বেছে নেয় সে। পা দুটো দু’দিকে যতটা সম্ভব করে আমূল বিঁধে দেয় প্রিয়ার যোনিতে। ঘোর লাগা গলা দিয়ে চিৎকার বেরোয় না ওর। মুখ বাঁধা হয়ে গেছে যে বহুক্ষণ আগেই। বিদ্ধ হতে থাকে প্রিয়া। প্রথমে মোমবাতির দ্বারা। তারপর পরিসর প্রশস্ত হলে রাহুলের পৌরুষে। বাইরে রাত গভীর হতে থাকে। ঘরে জ্বলতে থাকে লাল মোমবাতি। গড়িয়ে পড়ে নরম লাল মোম, নাকি রক্ত ! কে জানত মোমবাতি নামিয়ে আনতে পারে অন্ধকারও !

রাত ফুরিয়ে সকাল হয়। প্রিয়ার মা চিন্তায় আকুল। কোনো ফোনও তো করেনি সারারাত আজ মেয়েটা। আজ কি তবে নাইট শিফ্ট ছিল ! বেরিয়েছে তো সেই সকালে ! পুজোর ঘরে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে হাত জোড় করেন অসহায় বৃদ্ধা মহিলাটি। ঠাকুর ওকে রক্ষা কোরো। মানুষের বিশ্বাস, ঈশ্বর থাকেন যে আলোর উৎসে !

মিডিয়া তোলপাড়। খবরের কাগজে লেখালিখি কত ! কল সেন্টারে কর্মরতা বাইশ বর্ষিয়া জনৈক প্রিয়া গুপ্তার সেক্স এম.এম.এস ক্লিপ ফাঁস ! ছেলেটির মুখ দৃশ্যমান নয়। মেয়েটি নিজের সোশ্যাল মিডিয়ার একাউন্টে নিজেই নাকি আপলোড করেছে ক্লিপিং ! কল সেন্টারে কাজ করা… উৎশৃঙ্খল মেয়ে… উচ্ছন্নে যাওয়ার পথ প্রদর্শক… ইত্যাদি প্রভৃতি গেল গেল রবের মধ্যেই প্রিয়া গুপ্তার সুইসাইড নোট লিখে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হওয়ায় আমূল মোড় ঘুরে যায় ঘটনার।

মুখে কালো ঘোমটা টেনে পথে নামে মিছিল। “প্রিয়া গুপ্তার দোষীর দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি চাই।” হাতে শ’য়ে শ’য়ে মোমবাতি। কিছু জ্বলে, কিছু নিভে যায় হাওয়ায়। রাত শেষ হয়। দিন গড়ালে রেশও কেটে যায় ঘটনার। রাহুলেরা ধরা পড়ে, ধরা পড়ে না। ভোর হলে পথে ঘাটে নর্দমায় পড়ে থাকে আধপোড়া ক্লান্ত মোমবাতি। কাগজ কুড়ানি মেয়েগুলো মহা খুশি ! জড়ো করে ঘরে নিয়ে যায়। বহুদিন পর সন্ধ্যে বেলা ঘর আলোকিত হবে। আবার পুড়বে মোমবাতি।

এভাবেই মোমবাতি জ্বলছে সেই কোন আদি যুগ থেকে। সে জানে না তার সৃষ্টি কেন। সে শুধু তার ধর্ম জানে। জ্বলতে থাকা। জ্বালিয়ে রাখা। পুড়তে পুড়তে সব আলো করে রাখা। তবু আমরা মানুষেরা বুদ্ধিমান প্রাণীশ্রেষ্ঠ। এক থেকে বহু করে নিয়েছি তার ব্যবহার। এই আপনি যখন পড়ছেন এর ব্যবহারের নানান দিকগুলি তখনই কোনো মোমবাতি সেলিব্রেট করছে অতুল আর পূজার প্রথম বিবাহ বার্ষিকী। কোনো মোমবাতি আবার লাল বাতির দুনিয়ায় বিদ্ধ করছে পাঁচ বছরের মিতুলের অপূর্ন যোনি। তো আবার মোমবাতি জ্বালিয়ে কোনো এক মা প্রার্থনা করছে তার মেয়ের নির্বিঘ্নে ঘরে ফেরার। সেই মোমবাতিই হয়ত আবার পথে নেমে পড়বে আজ রাতে প্রতিবাদের মুখ হয়ে। কবরে পুড়বে কোনো মোমবাতি মৃত আত্মার শান্তি কামনায়। কিন্তু আর কত ? আর কতগুলো মোমবাতি পুড়লে তবে শেষ হবে ভূত চতুর্দশীর রাত ! তবে আসবে দীপাবলি !

তাই এই এত মোমবাতির ভিড়ে যদি একটা মোমবাতি কেউ জ্বালিয়ে নিতে পারি নিজের মনের অন্ধকারে, একজনও যদি পারি আমাদের গভীরে থাকা অন্ধকারে ডুব দিয়ে একটা মোমবাতি পুঁতে দিতে, তাহলেই আর কোনো বাইরের মোমবাতির দরকার পড়বে না। সেই একটা শিখাই হাজার থেকে কোটি কোটি হয়ে ছড়িয়ে পড়বে কোণায় কোণায়।

তাই দেখি না আজ থেকে আমরা পারি কিনা ? শুধু জ্বালাতে মোমবাতি ? পোড়াতে নয়…

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত