অলক্ষ্মীদের পাঁচালি

অলক্ষ্মীদের পাঁচালি

আস্তাকুঁড়ে মাছি ভনভন করছে। বাচ্ছাটার মুখে চোখে বসছে। একটা মাছি সুট করে ঢুকে গেল বাচ্ছাটার ঈষৎ হাঁ করা মুখের ভিতর। এখনো ভাল করে ঠাহর করলে বোঝা যাবে মৃদু ধুকপুক করছে তার বুকের বাঁদিকটা। তবে আর কতক্ষন ! মাথার উপর কয়েকটা কাক ডেকে চলেছে সমানে। কুকুরগুলো ঘ্যা ঘ্যা করছে। নগ্ন মেয়ে শিশুটা নেতিয়ে পড়ে আছে উচ্ছিষ্ঠের সাথে। কারো চোখ পড়েনি ওর উপর। আজ যে বিশেষ দিন।

রানীর পড়ে থাকা রক্তাক্ত শরীরটার উপর লোকটা ছুঁড়ে মারল একদলা নোটের তাড়া। যেন একদলা থুথু। আজ শুভদিন। রানীর পতিতালয়ে প্রথম দিন আজ। দু’চোখ স্বপ্নে বিভোর হয়ে ঘর ছেড়েছিল সে। তার রাজার সাথে। সে রাজা রানীর গল্প এভাবে শেষ হবে স্বপ্নেও ভাবেনি হতভাগী। তাই মাঝে মাঝে চোখ খুলে সে পিটপিট করে চাইছে লোকটার দিকে। যদি কোনো মন্ত্রবলে সে তার রাজা হয়ে যায়। ওই তো আবার তার উপর নেমে আসছে লোকটা। রাজআআ চোখ বুজে কেঁপে ওঠে রাতের রানী। বাইরে কিসের শাঁখ বেজে উঠল।

ফুটপাথে গুটিসুটি মেরে একসাথে বসে আছে ফুলি ফুচি আর সোনি। ওরা জারজ। মেয়ে বলে কি ?ওদের মাথা ভর্তি জট, উকুন। মুখে কালো কালো ছোপ। নাকে সর্দি। মানুষ কি ওরা ? হবে হয়ত ওই সদৃশই কোনো প্রাণী। পাশেই ভাত ফুটছে ইটের উপর। মধ্যবয়সী এক মহিলা মহানন্দে পুট পুট করে ওদের মাথার উকুন মারছে। অনেকদিন পর ভাত জুটেছে আজ। সোনি একছুটে চলে যায় পাশের দোকানে। এক চিমটি নুন আনতে। দোকানে অনেক ভিড় আজ। ঠাকুর কিনছে।

সোমলতা ভোর চারটায় উঠেছে আজ। সেই থেকে চলছে একটানা কাজ। বিয়ের দু’বছরের মধ্যে একদম গিন্নি হয়ে উঠেছে সে। সবাই হিংসে করে তার ভাগ্য দেখে। শশুর শাশুড়িহীন নির্ঝঞ্ঝাট সংসার তার। আমিটি আর স্বামীটি। কাল রাতের বাসনগুলো মাজতে মাজতে আপন মনে হেসে ওঠে সোমলতা। আজ তার স্বামীর অফিসে ছুটি। তাই তার কাজ আরো বেশি। সকাল আটটার মধ্যে উঠে সারা বাড়ি ঝকঝকে তকতকে না দেখলে তার স্বামীর মধ্যেই তার শাশুড়ির আত্মা ভর করবে যে ! দুপুরে আবার পুজো আছে।

সেনকো গোল্ডের শোরুম থেকে বেরোতে বেরোতে একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাই। দু’মাস পর ওর বিয়ে। বর প্রফেসর। উত্তর কলকাতার বিরাট বনেদি পরিবার। তা এরকম পরিবার তো শিক্ষিত মেয়ে চাইবেই। রাই ওদের জন্য একদম যোগ্য। বাংলায় এম এ। আর দেখতেও সুন্দরী। ফর্সা। তবে কিনা ওর হবু শশুর বাড়ির জানলা দরজায় পর্দাগুলো ভারী মোটা। সে পর্দা পেরিয়ে সূর্যের আলো খুব বেশি দেখা হবে না ওর। সে কথা তাঁরা জানিয়েই দিয়েছেন। নিজের চোখে যোগ্য হয়ে ওঠা আর বুঝি হল না ওর। দরিদ্র বাড়ির বড় মেয়ে হওয়ার কিছু ক্ষতিপূরণ তো তাকে দিতেই হবে। শ্বশুরবাড়িতে বিশাল উৎসব আজ তার।

ঘুমন্ত স্বামীর দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছে নীলিমা। আহা ! ক্লান্ত হয়ে গেছে লোকটা। এত খাটুনি যায় ওর রোজ। ঘুমোক। আওয়াজ না করে মৃদু পায়ে বিছানা থেকে উঠে যায় সে। দরজাটা ভেজিয়ে পায়ে পায়ে বারান্দায় যায় সে। বেতের চেয়ারটায় বসে খানিক। সিলিংয়ের ফ্যান টার দিকে তাকিয়ে থাকে। নাহ এবার লোকটাকে মুক্তি দেওয়াই ভাল। দশবছর তো হল। আর কতদিন বাঁজা বউটাকে পেটাবে মদ খেয়ে রোজ লোকটা ! আর ক্লান্ত হবে না লোকটা। কাল থেকে মুক্ত সে। সিংহাসনে প্রদীপটা তখন জ্বলছে।

আজ গাঁদা রজনীগন্ধার দাম চড়া। গলির মোড়ে মোড়ে পটের লক্ষ্মী বিক্রি হচ্ছে। বিরখুন্ডি ক্ষীরকদম বিক্রি হচ্ছে ঢেলে। সারা দিনমান লক্ষ্মী বন্দনা চলছে। কাঁসর ঘন্টা শাঁখ ধুপ ধুনো, ফল প্রসাদ মন্ত্রের উচ্চারণে লক্ষ্মী বাঁধা পড়ছে বাড়িতে বাড়িতে। আর সবার অলক্ষ্যে যারা অলক্ষ্মী তারা এভাবেই অনাড়ম্বরে ভাসান হচ্ছে আনাচে কানাচে। ওদের খোঁজ রাখতে গেলে কি চলে ? আজ যে লক্ষ্মী পুজো। কোজাগরী। এসো মা লক্ষ্মী। বোসো ঘরে। আমারই ঘরে থাকো আলো করে।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত