স্বপ্নটা তুমিময়

স্বপ্নটা তুমিময়

আজ ইভানের ইউনিভার্সিটির প্রথম দিন।ভার্সিটির প্রথম দিনেই ভার্সিটি এসে ইভান চরম ভাবে ফেঁসে গেলো।তাও কিনা এক সিনিয়র মেয়ের উপর ক্রাশ। উহু! এটা কিন্তু যে সে রকমের ক্রাশ না।মারাত্মক রকমের ক্রাশ খেয়েছে ইভান মেয়েটা প্রতি। মেয়েটা ইভানের এক ব্যাচ সিনিয়র।ইভানেরই ইউনিভার্সিটির ২য় বর্ষের ছাত্রী নিধি।

এর পর থেকেই গল্পের শুরু….. সেদিনের পর থেকে রোজ ক্যামপাসে এলেই ইভান নিধিকে আড় চোখে দেখতো। এভাবেই চলতে থাকে তাদের দিনের পর দিন। ভার্সিটির ক্লাসের ফাঁকে, ক্যানন্টিনে খাবার ছলে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায়। কখনো আবার বলি বল খেলার নাম করে চলতো ইভানের লুঁকিয়ে চুড়িয়ে নিধিকে দেখা। ইভান বেশ ভালো বলি বল খেলতো। ইউনিভার্সিটিতে খেলাধুলার সুবাদে অল্প কিছুদিনেই ইভান বেশ পরিচিতি লাভ করে নিয়েছিলো। কিন্তু তাতে কি তার চোখ তো সারাক্ষনি অনুসরণ করতো অন্য কাউকে।দিনের সকল কাজের মাঝেই বেশির ভাগ সময় ইভান লুঁকিয়ে নিধিকে দেখার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যেত। কিন্তু কখনোই ভালো লাগার কথা বলে উঠতে পারতো না। সিনিয়র ব্যাচের মেয়ে যদি মাইন্ড করে বা পিটুনি দেয়।তাই এক প্রকার ভয় কাজ করতো ইভানের মাঝে। কিন্তু মেয়েটাকে দেখলেই ইভানের হার্ট বিট যেন দ্রুত গতিতে বেড়ে যেত।ইভান বুঝতেই পাড়তো না কি হচ্ছে। শুধু বুকের বাম পাশটায় হাত দিলেই বুঝতো কারো জন্য সেখানে ধুপ ধুপ….ধুপ ধুপ শব্দ হচ্ছে। আর সেটা শুধু নিধির জন্য।

এর মাঝে এসে গেলো ইউনিভার্সিটির ৪২তম বর্ষ পুর্তি অনুষ্ঠান।ভার্সিটির বেশ সব বর্ষের ছাত্র ছাত্রী এই অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে।ইভান জানতো নিধি ভালো নাচ করে।আসলে নিধিকে প্রতি নিয়ত অনুসরণ করতে করতে ইভান নিধির জীবন বৃত্তান্তই জেনে গিয়েছিলো।তাই কায়েদা করে ইভান ওই অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং ভলেন্টিয়ারের দায়িত্ব নেয়।যেহেতু ইভান স্পোর্টসে অনেক ভালো তাই ভার্সিটির বাকি সিনিয়র জুনিয়র এমনকি স্যার ম্যাডামরাও বেশ ভালবাসতো।ইভান লেখা পড়ায় ও ভীষণ মেধাবী ছিলো।তাই ইভানের চাওয়াটাকে সবাই সমর্থন করেছিলো।

২৫ ফেব্রুয়ারি ভার্সিটির বর্ষ পুর্তি অনুষ্ঠান।বেশ হাত লাগিয়ে তড়িঘড়ি করেই সব কাজ চলছে।ইভানের ক্লাসে ক্লাসে যাওয়া নাম সিলেক্ট করা এই কাজ গুলো ইভান নিজেই করছে।তা অবশ্য নিধির সংস্পর্শে যাবার উদ্দেশ্যে।যাই হোক সবার নাম লিস্টে নিয়ে ইভান গেলো অবশেষে নিধির ক্লাসে।

নিধির ক্লাসে ঢুকেই ইভানের চোখ পড়ে নিধির দিকে।অতঃপর ভার্সিটির বর্ষ পুর্তি অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয় সে।সবাই এক কথায় নিধির নাচের ব্যাপারটাই বলে উঠে। নিধি অনুষ্ঠানে নাচে অংশ নিতে একদমি ইচ্ছুক ছিলো না।সবাই এক প্রকার জোড়া জোড়ি আর ইভানের অনুরোধেই নিধি অবশেষে নাম টা লিখিয়ে নেয়।ইভানও এখানে খেলে যায় এক নিদারুন ছলনার খেলা।এতক্ষন ইভান নামের সাথে কারো ফোন নাম্বার লিস্ট করেনি। কিন্তু নিধির ফোন নাম্বার চেয়ে বসে অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে ফোন করবে।নিধিও অনুষ্ঠানের সুবাদের নাম্বারটা দিয়েই দেয়।তেমন ঘোড় প্যাচ নিধি তখনো বুঝতে পারে নি।

আস্তে আস্তে বর্ষ পুর্তির অনুষ্ঠানের সময় ঘনিয়ে এলো।সবাই ইউনিভার্সিটির রিয়ার্সাল হলে যার যার মতো রিয়ার্সাল করছে।নিধিরও নাচের রিয়ার্সাল চলছে।রোজ ইভান রিয়ার্সাল ঘরে আড়াল থেকে নিধির নাচ দেখতে আসতো।অপলকে তাকিয়ে থাকতো ইভান।আর ভাবতো কি দারুন নাচে মেয়েটা।ইভানের এত সব কিছু ছিলো আরো বেশি সময় নিধিকে দেখতে পাওয়া।নিধির সংস্পর্শে থাকা কিংবা ওদের মাঝে বন্ধুত্ব টাকে জন্ম দেয়াই তার মুল উদ্দেশ্য।

এভাবেই দিন গুলো কাটতে থাকে।প্রতিদিন রিয়ার্সাল ঘরে কিংবা বাহিরে মাঝে মাঝে অনুষ্ঠানের সুবাদেই কথা হতো নিধি আর ইভানের মাঝে।কথা বলতে বলতে বেশ ভালো একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয় ওদের। যার বন্ডিং টা ছিল খুব শক্ত।নিধি এখন ইভানকে তার ভালো একজন বন্ধু ভাবে।জুনিয়র হলেও বুঝা যায় না কথায় যে তারা সিনিয়র জুনিয়র।অবশ্য ফুল ক্রেডিট গোজ টু ইভান।

২৫ ফেব্রুয়ারি ভার্সিটির বর্ষ পুর্তি অনুষ্ঠান।আগের দিন ইভানের অনেক মন খারাপ।এতদিন নানা ছলনায় ইভান নিধির কাছা কাছি যাবার কথা বলার সুযোগ পেত।কিন্তু অনুষ্ঠানের পর চাইলেও যখন তখন কথা বলতে পারবে না।তাই মন খারাপ করে ভার্সিটির বাগানের এক পাশ টাতে বসে ছিলো।
হঠাৎ করেই শুভ্রের আগমন।
পাশে বসে বল্লো-
– কিরে দোস্ত এখানে একা একা বসে আছিস যে?
– ইভান নিশ্চুপ….
– কিরে কিছু হয়েছে? মন খারাপ কেনো তোর?
– না আমি ঠিকাছি। কিছু হয়নি।
– হ্যা রে…দোস্ত তোর আর নিধির মাঝের ব্যাপার টা কিরে। আমি বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছি তুই মেয়েটাকে অনুসরণ করিস।মাঝে মাঝেই অপলকে চেয়ে থাকিস।এখনতো আবার এক সাথে চলতেও দেখা যায়।কাহিনী কি মামু?
– কাহিনী আবার কি? তেমন কিছুই না।
– সত্যি কি তাই। উহু! ডাল মে জরুর কুছ কালা হে…. বল না দোস্ত প্লিজ প্লিজ প্লিজ।
– কি বলবো?ভালবাসি নিধিকে……
– আচ্ছা…. তলে তলে এই চলে ঠিক ধরেছিলাম? এতদিন বলিসনি কেনো রে।তা ম্যাডাম কি জানে?
– না… সাহস পাই নি বলার।
– হু সিনিয়র ব্যাচ বেশ জটিলতা আছে। এত ভাবিস না বলে দে ওকে।না’হলে পরে অন্য কেউ নিয়ে নিলে পাখি ফুরুত। – কিন্তু ভয় হয় যে….যদি রিফিউজড করে।
– আরে এত চাপ নিস না। একবার বলেই দেখ। পরে যা হবার হবে।

শুভ্রের কথায় ইভান ক্ষানিকটা সাহস পেলো। না এবার ইভানের নিধিকে তার মনের কথা বলতেই হবে। এতে যা হয় হোক। পরেরদিন অনুষ্ঠান যথা সময়ে যথারিতী আরম্ভ হলো। বেশ ভালো ভাবেই অনুষ্ঠান টা চলছে। অনুষ্ঠান শেষে যে যার যার মতো বাড়ি ফিরছে। নিধিও ওর কিছু বান্ধবীর সাথে ফিরে যাচ্ছে। হঠাৎ দৌড়াতে দৌড়াতে সামনে এসে দাঁড়ালো ইভান।বেশ হাঁপাচ্ছে ছেলেটা। অনেকটা দৌড়ে এসেছে নিধিকে আটকাতে।
অতঃপর….নিধি বল্লো-
– একি ইভান তুমি এমন দৌড়াচ্ছো কেনো?
– আমার তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো।
– হ্যা তা বলো… কিন্তু এভাবে না দৌড়ালেও পারতে। কথাটা টা রাতে ফোনেও তো বলা যেত।
– না। আমি কথাটা সামনা সামনি বলতে চাই। নিধি বেশ অবাক হচ্ছে ইভানের কথাগুলো শুনে। ইভান নিধির খুব ভালো আর কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছে।কিন্তু ইভানের আচমকা এরকম ব্যবহারে বেশ চিন্তিত করছে নিধিকে।
– আচ্ছা বলো….কি কথা।
– পিছনের হাত থেকে বেশ কয়েকটা গোলাপ নিয়ে নিধিকে দিলো ইভান।বল্লো- এগুলো তোমার।
– নিধি ফুল গুলো হাতে নিয়ে বল্লো- ও ধন্যবাদ। এটা বুঝি আজ ভালো নেচেছি তার জন্য?
– না এটা তোমার ধন্যবাদ বা ভালো নাচার জন্যে না। এটা আসলে তোমাকে দিয়েছি একটাই কথা বলার জন্য।আমি আসলে…. আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি। সেই ভার্সিটি আসার প্রথম দিন থেকে।যেইদিন আমি তোমায় প্রথম দেখেছিলাম।আমি কোন ভঙ্গিমা বা অভিনয় জানি না। তাই কথাটা সরাসরি বললাম।হ্যা অনেক ভেবেছি তোমায় নিয়ে।অনেক সাহসের অভাব ছিলো…সেটাও জুগিয়েছি। ফাইনালি আজ মনের কথা তোমাকে বলে উঠতে পারলাম।

না আমি বলবো না তোমাকে সিদ্ধান্ত টা এখনি জানাতে হবে। আমি তোমাকে ঠিক তিন দিন সময় দিলাম।এই তিন দিন আমার কোন ছায়া ও তোমার আসে পাশে পাবা না।আমার চেহারাও কোথাও দেখবা না।তিন দিন পর তুমি যেখানেই থাকো আমি তোমাকে খুঁজে নিবো আমার উত্তরের জন্য। এই তিন দিন তুমি ভাবো তার পর আমাকে সিদ্ধান্ত জানাবা।আর হ্যা উত্তরটা কিন্তু আমার চাই।অনড়গল বলেই ইভান হন্ত দন্ত হয়ে চলে গেলো।

নিধি তো সব শুনে অবাক। স্তব্দ প্রায়….এমন কথা শুনবে কল্পনাও করেনি সে।এটা কি প্রপোজাল নাকি থ্রেট ছিলো।এভাবে কেউ অনড় গল ভালবাসার কথা বলে?ছেলেটা দেখছি মেয়েদের প্রপোজ ও করতে জানে না।অতঃপর নিধিও সেখান থেকে বাড়ি ফিরে গেলো।
বেশ রেগে আছে মেয়েটা। ইভান এটা কি করলো বন্ধুত্বের অপমান করলো ভালবাসি বলে। না না এ কি করে হয়।ইভান নিধির সম্পর্কটা অসম। নিধি ইভানের এক বছরের সিনিয়র। এই সম্পর্কে ভালবাসা কি করে হয়।ইভানটা পাগল হয়ে গেছে নাকি। তাও আবার প্রপোজ এর স্টাইল দেখো। যেভাবে বল্লো যেন ভালবাসি বলছে না রাতা রাতী থ্রেট করছে।এসব ভাবতে ভাবতেই রেগে টমেটোর মতো লাল হয়ে ফুলতে ফুলতেই ফোন দিলো ইভানকে। কিন্তু অপাশ থেকে কেউ বলছে- “আপনার ডায়াল কৃত নাম্বারটি এই মুহুর্তে বন্ধ আছে।” বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর নিধি খুব বিরক্ত হয়ে গেলো। কিছুতেই ইভানকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।বার বার একি কথা বন্ধ বলছে।সারা রাত মেয়েটা ইভানের উপর রেগে ছিলো।

পরদিন ভার্সিটি গিয়ে সারা ক্যাম্পাস ইভানকে খুঁজলো কিন্তু কোথাও পেলো না। লাইব্রেরী ক্যান্টিন,ইভানের ক্লাস,বাগান,ইভানের বন্ধুদের আড্ডায় সব যায়গায় খুঁজেছে কিন্তু কোথাও পায়নি। ছেলেটা গেলো কোথায় আচমকা উদাও হয়ে গেলো নাকি মনে মনে ভাবছে নিধি।

অতঃপর শুভ্রকে ইভানের কথা জিজ্ঞেস করলে শুভ্র বলে- “ইভানতো আজ ক্লাসে আসেনি নিধি।” কথাটা শুনে নিধি বেশ হতাশ হলো।ক্লাস না করেই মন খারাপ করে বাড়ি ফিরলো।বিকেলে গান শুনে কফি খেতে খেতে আবারো ইভানকে কল দিলো।কিন্তু না তখনও ইভানের ফোন বন্ধ বলছে।এবার নিধির অনেক কান্না পাচ্ছে।ইভানকে মেসেজ পাঠালো- “please open ur phone…. I need u now ivan… please call me.”

কিন্তু কোন সাড়া নাই।নিধি খুব কাঁদছে। কেনো কাঁদছে কেনো এত কষ্ট পাচ্ছে।কেনো বার বার ইভানকে ফোন করছে এসবের উত্তর নিধিরও জানা নাই।শুধু জানে ইভানকে সে খুব মিস করছে। ইভানকে তার প্রয়োজন যেভাবেই হোক। . দেখতে দেখতে তিন দিন কেটে গেলো।তিন দিন ইভানের ফোন নন স্টোপ বন্ধ ছিলো। কোন ভাবেই যোগাযোগ করতে পারেনি নিধি। কত হাজার বার মনের অজান্তেই ফোন করেছে নিজেও জানে না।বার বার অপাশের মহিলা এক কথাই বলে গেছে-“নাম্বারটি সংযোগ প্রধান করা সম্ভব হচ্ছে না”।এই তিন দিন ইভান ক্লাসেও যায় নি।নিধির প্রতিটা মুহুর্ত কেটেছে বিষাদময়। যেন তিন যুগ পার হচ্ছে সময় গুলো থমকে গেছে।কোন কাজেই মন দিতে পারেনি নিধি।ক্লাসও করতে পারে নি।কেনো এমন হচ্ছে নিধির।এত মিস কেনো করছে।তবে কি নিধিও ইভানকে….. না না এ কি করে হয়।

তিন দিন পর…… নিধি ক্লাস রুমে মন খারাপ করে বসে আছে।ভীষণ রকম মন খারাপ ওর।হঠাৎ করেই ইভানের আগমন। নিধির সামনে এসে-
– হাতে একটা কেটবেরি দিয়ে বল্লো- এই নাও চকোলেট খাও।
– নিধি বেশ রেগে আছে।কটমট করে তাকাচ্ছে। হাত সরিয়ে বল্লো
-খাবো না। বলে উঠেই ক্লাস থেকে বেড়িয়ে বাগানের দিকে যাচ্ছে।পাশে নিধির বান্দরনি থুক্কু বান্ধবী গুলাও ছিলো।
– আরে আরে কই যাও। চকোলেট খাবে না ভালো কথা।সে আমি খেয়ে নিবো।কিন্তু আমার উত্তরটা?
– কি…কোন উত্তরের কথা বলছো?
– বারে ভুলে গেছো? বলেছিলাম তিন দিন পর আমার উত্তর চাই।
– নিধি অবাক হয়ে তাকালো।আর বল্লো বয়েই গেছে আমার তোমাকে ভালবাসতে।
– কি তোমার বয়ে যায় নি?তুমি আমাকে ভালবাসো না?
– না বাসি না।এক প্রকার রেগে গিয়েই বল্লো।
– দেখো অনেক কষ্ট করে সারা ক্যাম্পাস খঁুজে তোমাকে ক্লাস রুমে পেয়েছি।বলেছিলাম তিন দিন পর আমি তোমাকে খুঁজে নিবো।অনেক আশা নিয়ে এসছি আর তুমি আমাকে হতাশ করছো এমন কিন্তু কথা ছিলো না।আবারো বলছি আমাকে ভালবাসো না?
– আবারো একি উত্তর….না বাসি না। ঠিকাছে না বাসলে আর কি করার।জোর করে তো আর ভালবাসা হয় না। পাশ দিয়েই নিধির ক্লাস প্রেজেন্টেটিভ ঈশিতা যাচ্ছিলো। আগেই বলেছি স্পোর্টস এর জন্য ইভান সবার কাছেই অনেক পরিচিত।আর অনেক দুষ্টু প্রকৃতির বলে সবার সাথেই মজা করে।হুট করেই ঈশিতার সামনে গিয়ে দাড়ালো। আর বল্লো-
– হাই…. ঈশিতা?
– হাই…ইভান।
– এই তোমার টিপ টা না সরে গেছে দাও তো ঠিক করে দেই।বলেই ঠিপ টা কপালে বসালো।( টিপ ঠিকি ছিলো তবুও…নিধির সামনেই ইভান ঈশিতার সাথে এসব করছে) – ও…।আসলে মুখ ধুয়েছিলাম তাই হয়তো।
– তোমাকে না একটা কথা বলা হয় নি ঈশিতা।
– ও… কি কথা ইভান বলো।
– তুমি কি জানো এই কলেজে তুমি সব থেকে বেশি সুন্দর। অনেক মায়া তোমার চোখে।আর ওই হাসিটা আহা দেখলেই যেন মন ছুঁয়ে যায়।
– ও তাই? জানো আগে কেউ এভাবে বলেনি আমাকে। ঈশিতাও আছে। ঢংগি মেয়ে একটা ইভানের থেকে এসব শুনে সে কি ঢং। দেখতে তো মোটি কেউ ফিরেও তাকায় না। ইভানটাও আছে নিধিকে জব্দ করতে ঈশিতাকেই চোখে পড়লো।

ওদিকে নিধি তো আগুনের মত রেগে টমেটোর মত লাল হয়ে যাচ্ছে এসব দেখে। মনে হচ্ছে বেলুনের মতো ফুলছে একটু পরেই ফাটবে।নিধি কিছুতেই ইভানের এসব সহ্য করতে পারছে না।হন হনিয়ে এসে এক ধাক্কায় ঈশিতাকে সরিয়ে দিলো।অতঃপর ইভানের কলার চেপে চোখ গুলো বড় বড় করে বলে-

– তোর এত বড় সাহস তুই আমার সামনে ঈশিতার সাথে ফ্লার্ট করছিস।
– বারে আমি ফ্লার্ট করলে তোমার কি। তুমিতো আমাকে ভালবাসো না। আমি সারাজীবন আই বুড়ো থাকবো নাকি।
– আমার কি মানে? আমি থাকতে তুই যদি ক্যাম্পাসের আর কারো দিকে তাকিয়েছিস খুন করে ফেলবো তোকে। শুধু আমার দিকে তাকাবি। আমার থাকবি। কথা গুলো বলতে গিয়ে নিধির চোখ ছল ছল করছিলো। নিধি ইভানকে কিছুতেই অন্য কারো পাশে দেখতে পারছিলো না। নিধিও ইভানকে ভালবাসে ইভান তা জানতো। কারণ তিনদিন ইভান নিধির সব রকম খোঁজ রেখেছিলো।ইভানের ওভাবে উদাও হয়ে যাওয়াটা ওর প্লান ছিলো।কিন্তু মেয়ে কিছুতেই মনের কথা বলবে না। তাই ইভান একটু খেলিয়ে নিলো আর কি।

– আমি তো তোমার মাঝেই খুন হতে চেয়েছিলাম। তুমি তো রাজি না।আমাকে ভালবাসো না বলেই দিলা তাই তো ওই মোটির দিকে তাকাতে হলো।
– বাসিতো… না মানে তুমি বুঝো না সব বলে দিতে হবে বুঝি। তোমাকে ছাড়া আমি ভাল নেই।কেন আমাকে এভাবে কষ্ট দাও হু।
– বুঝি তো তাই তো খেলিয়ে নিলাম। তুমি তো সোজা সুজি বলবে না… ভালবাসি। তাই আংগুল বেঁকিয়ে নিলাম আর কি। তবে বাঁকা পথে খেলার মজাই আলাদা।
– ওরে দুষ্টু সব আমাকে জব্দ করারা প্লান ছিলো?
– আবার জিগায়।বলেই হেসে দিলো ইভান।

অতঃপর শুরু হলো ওদের নতুন পথ চলা।ক্যাম্পাসের প্রায় সবাই জানতো ওদের সম্পর্কের কথা। ওদের প্রায় সব সময় এক সাথে দেখা যেত।ক্লাসের বাহিরে ক্যাম্পাস বাগান ক্যান্টিন সব সময়। আর সুযোগ পেলেই ইভান নিধিকে রাগাতো অন্য মেয়ের সাথে ফ্লার্ট করে। এভাবেই অনেক গুলো দিন কেটে গেলো।

তিন বছর পর…… . ইভান আর নিধির লেখা পড়া প্রায় শেষের দিকে।নিধির বাড়ি থেকে প্রচন্ড রকমের বিয়ের চাপ আসছিলো।কিন্তু নিধি কিছুতেই বিয়ে করবে না।নিধি অতঃপর তার বাবা মাকে ইভানের কথা জানায়।কিন্তু অসম সম্পর্কের কারনে ওরা ইভানকে মেনে নিতে চায় না।কি করেই নিবে বয়সের যে পার্থক্য আছে। সমাজ কি মেনে নেয় এটা।কিন্তু কে শুনে কার কথা।নিধি অত্যন্ত জেদি টাইপের মেয়ে।সে বিয়ে করলে ইভানকেই করবে নাইলে না। বাবা মায়ের একমাত্রে মেয়ে হওয়াতে অবশেষে হার মেনে নেয় মেয়ের জিদের কাছে নিধির বাবা মা আর ইভানের পরিবার।পারিবারিক ভাবেই ওদের বিয়েটা ঠিক ঠাক।দু’জনেরি গ্রাজুয়েশন শেষ হলে ধুম ধাম করে বিয়ে হবে।

কিছুদিন পরের কথা…. . সকাল বেলা নিধির ফোন।
– ইভান তুমি কোথায়।
– কোথায় আবার ভার্সিটিতে।
– দুই দিন আসো নি কেনো। – প্রচন্ড জ্বর ছিলো তাই আসতে পারিনি।
– তা এখন কেমন আছো। – একদম বিন্দাস নাইলে কি ভার্সিটি আসতাম বাদরামো করতে?
– ঠিকাছে তুমি ওখানেই থাকো আমি আসতেছি।
– ওকে।
বলেই ফোনটা কেটে দিলো।ইভানটা না কেমন জানি।একদম নিধিকে বুঝে না।যেই ছেলেকে এক মুহুর্ত না দেখলে নিধি অস্থির হয়ে ওঠে তাকে দুই দিন ৪৮ ঘন্টা দেখেনি। উফ! নিধির যেন দম বন্ধ হয়ে মরেই যাচ্ছিলো। বাদরটা ফোন অফ করে রেখেছিলো।বিয়ের আগে শশুর বাড়ি যাওয়া নিষেধ তাই নিরুপায় হয়ে অপেক্ষা করা ছাড়াও উপায় ছিলো না নিধির।

ভার্সিটি পৌঁছে রিক্সা ভাড়া মিঠিয়ে গেট থেকে প্রবেশ করলো নিধি। প্রচন্ড রকম অস্থির সে। তীক্ষ চোখ জোড়া ইভানকেই খুঁজছে। কিন্তু ক্যাম্পাসের কোথাও পেলো না। হতাশ হয়ে নিজের ক্লাসে ঢুকতেই দেখে ইভান ঈশিতার সাথে কথা বলছে- .
– ঈশিতা তোমার হাত গুলা এত সুন্দর কেনো? কত নরম জানো ধরলেই মনে হয় তুলোর মত।কি ফর্শা ইয়া বড় বড় রাক্ষসীর মত নোখ।তবে দেখতে খারাপ না।
– যাহ! ইভান তুমি যে কি বলো না। আমার লজ্জা করে না বুঝি?
– অলে বাবুটা লজ্জা পেলে তোমাকে অনেক কিউত লাগে। ওই রাগিণী তো সারাক্ষন রেগেই থাকে পেত্নি একটা।
– কিন্তু ও তো তোমার বউ।দুইদিন পর তোমাদের বিয়ে।
– আরে রাখো তো ওর কথা রাগিণী বুড়ি একটা। আচ্ছা ঈশিতা তুমি কি পার্লার যাও? ওই মিনিকিউট পেডিকিউট। আটা মিয়দা সুজি কি সব মাখে না ওসব মাখো? (মনে মনে বলে মাখলেও পেত্নিই লাগবে।নিহাত নিধি দাঁড়িয়ে তাই আপস করছি)
– না মানে ওই আর কি। নিধি তো রেগে পুরো রুটির মত ফুলছে।ইভানের ভাষায় লাল টমেটো। কিছুক্ষণ বাদেই নিধি কাছে এসে ইভানের কানটা শক্ত করে চেপে ধরলো।
– ঈশিতার হাত অনেক নরম তাই না এবার বুঝবি আমার হাত কত শক্ত।
– নিধি আহ! আহ! ছাড়ো লাগছে তো।
– ছাড়ার জন্যে ধরিনি।লাগুক তোর। কত বড় সাহস আমি দুই দিন তোকে না পেয়ে কেঁদে কেঁদে মরছি আর তুই এখানে বসে ফ্লার্ট কিরছিস। এই তোর সাথে দুই দিন বাদে না আমার বিয়ে।
– ছেড়ে দাও বাবু। সবাই দেখছে।
– দেখুক।
কিছুক্ষন পর নিধি ইভানের কান থেকে হাত সরিয়ে নিলো। প্রচন্ড রকম ভাবে রেগে আছে মেয়েটা। রাগতে রাগতে হন হন করে হেটে ক্লাস থেকে বেড়িয়ে পড়লো। আর ইভানের কি মহারানীকে রাগিয়েছে এবার মান ভাঙাতে হবে। নিধি যেতে যেতে বলতে লাগলো তুই খারাপ। তুই অনেক খারাপ। আমি তোকে বিয়ে করবো না। আজি এই বিয়ে ভেঙে দিবো। দেখে নিবো তোকে।বলে রাখা ভালো নিধি রেগে গেলেই ইভানকে তুই করে বলতো।

ইভান তো ইচ্ছে করেই নিধিকে রাগায়।ইভান তো দেখেছিলো নিধি ক্লাস রুমের দিকে আসছে তাইতো নিধিকে রাগাতেই ইভানের এই নাটক। কিন্তু রাগের ডোজ টা বুঝি এবার একটু বেশি হয়ে গেলো। পাগলি টা বুঝেই না রাগিনীকে রাগলে কত টা সুন্দর লাগে। আমি সেই সুন্দর্য দেখে বার বার নতুন করে প্রেমে পড়ি। কিন্তু এখন যেভাবেই হোক মহারানীর রাগ নামাতেই হবে। তাই পিছন পিছন ছুটছে নিধি নিধি বলে।

কিন্তু কে শুনে কার কথা নিধি প্রচন্ড রেগে আছে।তাই বেশ হন হন করেই বাড়ির দিকে ছুটছে। আর বার বার পিছন ফিরে ইভানকে আঙুল দিয়ে ইশারা করেছে তোকে দেখে নেবো।আসবি না আমার পিছু পিছু।এসব বলতে বলতে বেশ অন্যমনস্ক হয়েই ভার্সিটির দিক থেকে রাস্তার অপারে যাচ্ছিলো মেয়েটা। হঠাৎ ডান দিক থেকে একটা মালবাহী ট্রাক এসে সজোরে এক ধাক্কা দিলো নিধিকে।নিধি যেন বারি খেয়ে ৫-৭ হাত উপরে শুন্যে উঠে পিচ ডালা রাস্তার উপরে আছাড়ে পোড়লো।পড়ে গিয়ে নিধির মাথা ফেটে ওর শরীরের সমস্ত রক্ত বিন্দু ছিটকে রাস্তার এপাশ ওপাশের পুরো রাজ পথ রাঙিয়ে দিলো।নিধির নাক মুখ বেয়ে রক্ত ঝড়ছে। কাঁপতে কাঁপতে ইভানের দিকে হাত বাড়িয়ে যেন শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ইভান নাম টা উচ্চারণ করার চেষ্টা নিধির।অতি কষ্টে দুই অক্ষর ডেকেই নেতিয়ে পড়লো মেয়েটা।

ইভান যেন স্তব্দ হয়ে গেলো। ১০ সেকেন্ডের মাঝে তার চোখের সামনে এ কি ঘটে গেলো সে যেন নিজেই বুঝে উঠতে পারলো না।ফ্রিজের মত ঠান্ডা আর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় চোখ করে।চোখ ভর্তি জল থৈ থৈ।কাঁপতে কাঁপতে হাত বাড়িয়ে ভীতস্ত কন্ঠে চিৎকার করে বলে উঠলো…নিধি।

ইভান ছুঁটে গেলো নিধির কাছে।নিধিকে কোলে তুলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বল্লো- নিধি কি হলো তোমার।নিধি কথা বলো। মাথার পিছন থেকে হাত সরাতেই দেখে ইভানের সমস্ত হাত রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ইভান নিধিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছে। ইভানের পড়নের সাদা শার্ট টাও রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে।ইভান শুধু নিধি নিধি করে কাঁদছে। আর চিৎকার করে বলছে হেল্প…প্লিজ হেল্প।ডাক্তার,আ ম্বুলেন্স,প্লিজ কেউ আমার নিধিকে বাঁচাও।প্লিজ হেল্প…বলে চিৎকার করছে। . রাত তখন পৌনে দুটা…. . ইভান বিছানায় শুয়ে কাপা কাপা হাত বাড়িয়ে ভীতস্থ কন্ঠে বলছে- নিধি চোখ খুলো।কথা বলো প্লিজ।আমাকে ছেড়ে তুমি কোথাও যেতে পারো না।নিধি…….নিধি।

নিধি হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠে ইভানের ডাকে।ইভানের এমন দৃশ্য দেখে অবাক মেয়েটা। অতঃপর ইভানকে ধাক্কা দিয়ে বল্লো- – ইভান…. এই ইভান কি হয়েছে তোমার? তুমি এমন করছো কেনো? – নিধির ধাক্কায় ইভানের চেতনা ফিরলো।চমকে উঠে ইভান বল্লো- হু….?
– কি হয়েছে বাবু? তুমি এমন অস্বাভাবিক ভাবে ঘামছো কেনো? খারাপ কোন স্বপ্ন দেখেছো? পানি খাবা…এই নাও পানি। বলেই ইভানের দিকে পানির গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলো।

ইভান নিধির দেয়া পানি খেয়ে গলা ভিজালো।তারপর কেমন ভীতস্ত ভাবে নিধির দিকে তাকিয়ে নিধির নাক মাথা হাত ছঁুয়ে বল্লো-
– নিধি তুমি ঠিকাছো তো।তোমার কিছু হয়নি তো।তুমি সুস্থ আছো তো জিজ্ঞেস করে বসলো বেশ ভয়ার্ত কন্ঠে?
– এই দেখো ইভান আমি একদম ঠিকাছি।কি হয়েছে বাবু। খারাপ কোন স্বপ্ন দেখেছো?
– হু… স্বপ্ন? হ্যা ওটা স্বপ্নই ছিলো। খুব খারাপ স্বপ্ন…দূর্স্বপ্ন। বলেই ইভান নিধিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। আর বল্লো- আমি সরি বাবু।আমি খুব সরি। আমি আর কখনো তোমাকে কষ্ট দিবো না।কখনো তোমার সাথে ঝগড়া করবো না।তোমাকে রাগাতে আমি আর কখনো অন্য মেয়ের হাত ধরে ফ্লার্ট করবো না।তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও প্লিজ। আমাকে কথা দাও তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেনা কখনো যাবে না।প্লিজ নিধি…. বিশ্বাস করো আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি।শুধু তোমাকে রাগাতেই মজা করতাম।আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি।অনেক বেশি ভালবাসি।তোমার কিছু হলে আমি বাঁচবো না বাবু।আমাকে চেড়ে যেও না প্লিজ।

নিধি ইভানের কথা গুলো শুনে বুঝতে পারলো ইভান কোন খারাপ স্বপ্ন দেখেছে হয়তো। আসলে রাতে ঈশিতাকে নিয়ে নিধির সাথে অনেক ঝগড়া করেছে।অবচেতন মনে হয়তো তা স্বপ্ন হয়েই এসেছে।মাঝে মাঝে কিছু ঝগড়াও দুর্স্বপ্ন হয়ে ভালবাসাকে বহুগুন বাড়িয়ে দেয় হয়তো।আজ নিধি আরেকবার বুঝতে পারলো ইভান নিধিকে আসলে কতটা ভালবাসে। অতঃপর নিধি ইভানের মাথা তার কোলে রেখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বল্লো-
– না বাবু….আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।কখনো না কোনদিনও না। আমিও যে তোমাকে অনেক ভালবাসি। অনেক বেশি ভালবাসি……..!!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত