আমি নারী

আমি নারী

আমি রেশমি। আমি একজন স্বনির্ভর মেয়ে। আমি কারোর উপর নির্ভর করে বাঁচি না। আমি নিজের খাওয়া পড়া নিজেই জোগাড় করতে পারি। পুরুষকে ভোলানোর নানা ছলাকলা দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় শিখতে হয়েছে আমাকে। ছোটবেলায় রাত নয়টার পর আর জেগে থাকতে পারতাম না। পড়তে বসে হাতে কলম নিয়েই ঘুমিয়ে যেতাম। মা অধোঘুমে তুলে ভাত চটকে ছোট্ট ছোট্ট গ্রাস করে মুখে পুরে দিত। তখন যদিও আমার নাম রেশমি ছিল না। ছিল… থাক। কি হবে সে নাম জেনে ? সতের বছর বয়সে ভালবেসে ঘর ছেড়েছিলাম রমেনের হাত ধরে। ঘর বাঁধব বলে। সে আর হয়নি। এখন আমার দিন শুরু হয় রাত নয়টার পর। সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে খোঁপায় বেলি ফুল জড়িয়ে পুরুষের মন ভোলাই আমি। ছোটবেলায় নাকি খুব নাক ছিল আমার। একটুও দুর্গন্ধ সহ্য হত না। আর এখন অনায়াসে মুখে নিই সমাজের পুতিগন্ধময় সৃষ্টি যন্ত্র। ওহ হ্যাঁ, নাক কুঁচকোবেন না যেন। রীতিমত লাইসেন্স প্রাপ্ত আমি। নিজের পেট চালানো ছাড়াও সপ্তাহে একদিন সমাজকে শিক্ষা দিতে বাড়ি বাড়ি যাই আমি। বলি নিরোধক ব্যবহার করতে। রোগমুক্ত থাকতে। আরেহ বাঁধনহীন আনন্দ দানের জন্য তো আমরা রয়েছি। আমি এক নারী। পেশায় যৌন কর্মী।

আমি জিনিয়া। সদ্য এম.কম পাস করেছি। ডিগ্রি শেষে চাকরি। এই শিখিয়েছিল বাবা। সেই মত জীবনের এতগুলো বছর শুধু দিয়েছি বইকে। ছয় মাস হল ফাইল নিয়ে ঘুরছি। এতদিনে বুঝেছি চাকরি পাওয়া সহজ কাজ নয়। ছয় বছরের লড়াই জিতছে না যেখানে আমি তো কোন ছার। মনকে প্রস্তুত করেছিলাম আরেক লড়াইয়ের জন্য। কিন্তু গত পরশু তালগোল পাকিয়ে গেল সব হিসাব নিকাশ। “রয় এন্টারপ্রাইজ” যেখানে আমার ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ডের সার্টিফিকেটকে রিজেক্ট করে দিল এক মুহূর্তে, সেখানে জানতে পারলাম আমার থেকে জুনিয়র মধুমিতা ওই পোস্টেই জয়েন করেছে পরশু। আমি আর থাকতে পারিনি। আজ গেছিলাম ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে। কি করে পারলেন উনি এটা? না, বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই উত্তর পেয়ে গেলাম। আমি আন্ডার ওয়েট। হাড় সর্বস্ব চেহারা। ত্রিশ সাইজ ব্রা পরি। না না, উনি এসব মুখ ফুটে বলেননি। সফিস্টিকেটেড ভাষায় উনি বলেছেন, “don’t get it wrong honey ! You are just not presentable for our company.” বলে উনি একবার তাকিয়ে নিয়েছিলেন আমার পা থেকে মাথা অবধি। আমি একজন নারী। একজন শিক্ষিত, বেকার।

আমি টুকটুকি। আমার বয়স মোটে বারো। কিন্ত আমি ছাড়াও বাড়িতে আরো চারটে ভাই বোন আছে। না, আমি থাকি না ওদের সাথে। আমার বাবা এক বছর আগেই বলে দিয়েছিল দশ বছর ধরে পুষছি তোকে। এবার শোধ দেওয়ার সময় এসেছে। তারপর থেকে ঘর ছাড়া। মা আর বাবা দুজনে মিলে দিয়ে গেছিল এই বাড়িতে। এই বাড়িতে সবাই খুব ভাল। আমায় দু’বেলা খেতে দেয়। বড়মার মেয়ের জামা ছোট হয়ে গেলে সেগুলোও আমার। ওর ভাঙা পুতুল নিয়ে খেলতেও পাই আমি। শুধু বাসনে এঁটো লেগে থাকলে খুব বকে, মারে। আর সবজি কাটতে গিয়ে যেদিন হাত কেটে গেছিল, বড়মা রেগে গিয়ে হাতে নুন দিয়ে চেপে ধরেছিল সেদিন। আমি খুব কাঁদছিলাম। তখন আমায় চুপ করানোর জন্য মুখেও নুন ঢুকিয়ে দিয়েছিল বড়মা। তারপর থেকে আমি খুব সাবধানে কাজ করি। দোষ তো আমারই ছিল। মা বলত যারা তোমার ভাল চায়, তারাই বকে মারে। আবার আদরও করে। বড়মা তাহলে নিশ্চয়ই আমার ভাল চায়। আর বড়োবাবা তো খুবই ভাল। কখনো বকে না আমায়। রাতের বেলা সবাই ঘুমিয়ে গেলে চুপি চুপি আমায় তুলে ছাদে নিয়ে গিয়ে অনেক আদর করে দেয়। আমার সবখানে হাত দিয়ে কি যেন করে, আর বলে কাউকে বলবি না, তাহলে বড়মা তোকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। না, আমি আর কিছু বলিনা। জানি, বাড়ি গেলে বাবা খুব বকবে। আবার জ্বলন্ত বিড়ি দিয়ে চেপে ধরবে হাতে। আমি তো একটা মেয়ে। মা বলে মেয়েরা হল নারীর জাত।

আচ্ছা, এই যে এতক্ষন আপনি পড়লেন তিন নারীর গল্প, সেগুলো তো এরকমও হতে পারত …

আমি রেশমি। আমি একজন গৃহবধূ। রমেন আমার স্বামী। ও আমায় খুব ভালবাসে। ওকে নিজের জীবনে পেয়ে আমি গর্বিত। মা বাবা প্রথমে আমাদের সম্পর্কটা মেনে নেয়নি। রমেন কারখানায় কাজ করে বলে। রমেন গরিব। কিন্তু রমেনের চোখে আমি যে বিশ্বাস আর ভালবাসা দেখেছিলাম আমার জন্য, তা মিথ্যে নয়। সেই রাতে যখন বাড়ির অমতে কাউকে কিছু না বলে ঘর ছেড়েছিলাম, একটু হলেও বুক ঢিপ ঢিপ করছিল। কিন্তু পর দিনই রমেন যখন মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করল আমায়, সুখে মরে যাব মনে হচ্ছিল। নতুন জীবন ! নতুন সংসার ! দু’বছর হল রমেনের সাথে আমি বেশ ভাল আছি। মা বাবাও আমার সুখ দেখে শান্তি পেয়েছে। সংসারে সাহায্য করার জন্য আমিও একটা সেলাই মেশিন ভাড়া নিয়ে কাজ শুরু করেছি। পেটে যে একজন এসেছে। তার দায়িত্ব আমি আর রমেন ভাগ করে নেব। একজন বিশ্বস্ত স্বামী, সন্তান, দু’মুঠো ডাল ভাত, মাথার গোঁজবার একটা কুঁড়ে। আর কি চাই একটা মেয়ের ?

আমি জিনিয়া। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আমি। মা বাবার একমাত্র সন্তান। মেয়ে বলে কখনো তারা দুর্বল ভাবেনি আমায়। তাই তো এই পঁচিশ বছরের লড়াইয়ে আজ আমি সফল। “রয় এন্টারপ্রাইজ”এ পরশুই কাজে ঢুকলাম আমি। স্যালারি ভালোই। তার থেকেও ভাল ওখানে মানুষগুলো। আমার কোয়ালিটি দেখে কি প্রশংসাই না করলেন ! সত্যি, বাবা যে বলত রূপ নয়, মানুষের গুনটাই আসল, তা বুঝলাম এতদিনে। যাক বাবা! এবার সংসারের হাল ধরতে পারব আমি, একটু হলেও। মাকে একটা ভাল ডাক্তার দেখিয়ে চেকআপ করাবো মাইনে পেলেই। বাবা কোনোদিন পাঁচশ টাকা দামের জামা গায়ে দেয়নি। আমি কিনে সারপ্রাইজ দেব! উফ ! আমার চাকরির জয়েনিং লেটারটা হাতে পেয়ে ওদের হাসি মুখ দুটো দেখে কি যে শান্তি পেয়েছি ! আমার মেয়ে হয়ে জন্মানো সার্থক মনে হচ্ছিল সেই মুহূর্তে। বাবা বলছে এবার একটা ছেলে দেখে বিয়ে দেবে আমার। কিন্তু আমি একদম না করে দিয়েছি। এখন আমি শুধু কেরিয়ারে মন দিতে চাই।

আমি টুকটুকি। আমরা পাঁচ ভাইবোন। সবাই মিলে একটা ঘরে থাকি আমরা। কিন্তু হলে কি হবে বাবা আমাদের খুব ভালবাসে। প্রত্যেক রবিবার আমরা ঘুরতে যাই এদিক ওদিক। আইসক্রিম খাই। বেলুন কিনি। বাবা বলেছে আমাদের জন্য যা করতে হয় করবে। তাই তো আমাদের ইস্কুলেও ভর্তি করে দিয়েছে। আমরা সকাল বেলা কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সেখানে যাই। দিদিমণি আমাদের কত সুন্দর সুন্দর জিনিস শেখায়। আমার সব ভাল লাগে পড়তে। কিন্তু সবথেকে ভাল লাগে ভূগোল। আমরা নাকি সবসময় ঘুরছি গোল গোল ! কই যখন বসে বা শুয়ে থাকি, বুঝতে পারি না তো ! আর ওই দূরে ফুটকি ফুটকি তারা ! ওখানে নাকি যাওয়া যায়। আমি বাবাকে বলেছি আমায় একটা তারায় নিয়ে যেতে। কিন্তু তার জন্য নাকি অনেক লেখাপড়া করতে হয়। আমি তাই মন দিয়ে পড়ি। একবার এক বড়মা আমায় নিয়ে যাবে বলেছিল তাদের বাড়িতে। বাবা তো শুনেই না বলে দিয়েছিল। আমিও কেঁদেছিলাম খুব। সবাই তো নিজের বাড়িতে থাকে। এমনকি যাদের বাড়ি নেই, তারাও একসাথে থাকে দেখেছি। আমিই বা কেন থাকব না ? আমি বড় হয়ে তারায় যাব ওদের নিয়ে।

কি? রেশমি, জিনিয়া, টুকটুকি এরা কি খুব বেশি কিছু চায় ? বিজ্ঞান বলে , একমাত্র এই গ্রহ নাকি প্রাণ সৃষ্টির জন্য আদর্শ। তাহলে কার ভুলে কার দোষে সেই প্রাণেরা এত অসহায় ? ডারউইনের তত্ত্ব যদি মেনে নিই, তাহলেও ওদের অস্তিত্ব বাঁচানোর যে লড়াই, তা কি যুক্তিযুক্ত ? কেন সারা পৃথিবী জুড়ে এখনো এই অসম লড়াই করে যেতে হচ্ছে মেয়েদের ? আর কাদের বিরুদ্ধে ? তাদেরই জন্ম দেওয়া কোনো এক বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সাথে। কি আশ্চর্য তাই না ! আমাদেরই গর্ভে আমরা লালন করে চলেছি রক্তবীজের ঝাড়।

রেশমি, জিনিয়া, টুকটুকি এবং এদের মত আরো যেসব মেয়েরা, তারা যেদিন মা হবে, সন্তানের লিঙ্গ পুরুষ জেনে একবারও কি বুক কাঁপবে না তাদের ?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত