শেষ থেকে শুরু

শেষ থেকে শুরু

সকাল থেকেই আকাশটা আজ মেঘলা, ঠান্ডা একটা শিরশিরানি হাওয়া চলছে।নিম্নচাপ হয়তো! শুধু একটু বৃষ্টির অপেক্ষা।একবার বৃষ্টি হলে ঠান্ডাটা পড়বে।সামনের ফুটপাতের ওপর বেড়ে ওঠা টগর ফুলের গাছটার ফুলগুলো ঝরে পড়ছিল মাটিতে হালকা ঝড়ো হাওয়ায়,সাথে কিছু বিবর্ণ খসে পড়া হলুদ পাতা।ব্যালকনির ইজি চেয়ারটায় বসে একমনে দেখছিল অনির্বাণ।কানে ইয়ারফোনটা লাগানো ফোনের সাথে কানেক্ট করে,অথচ অটোপ্লে মোডটা অন করতে ভুলে গেছে!চেয়ারটার দুদিকের হাতলে হাত দুটো আলতো ভাবে রেখে আর হেলান দিয়ে, চোখটা বন্ধ করেছিলো।সেই ঘুম টা লেগেছিল।গানটা শেষ হতেই ,ঘরে পূজোর ঘন্টাটা বেজে উঠলো।

খেয়াল হলো, নীলা হয়তো স্নান করে বেরিয়েছে।লাল ডোরাকাটা গামছাটা ভিজে চুলের সাথে খোপায় জড়ানো, আটপৌরে শাড়ি,অনাবৃত পিঠে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু জল যেন পদ্ম পাতার উপর জমে থাকা শিশির কণা।

চেয়ারটা ছেড়ে ব্যালকনি থেকে ঘরের ভেতরে গিয়ে দাঁড়াল অনির্বাণ। একমনে তাকিয়ে ছিল নীলার দিকে।অনির্বাণ এখনো চির প্রেমিক।সেদিনের সেই সদ্য বিবাহিত নীলা আর আজকের নীলার মধ্যে এক ফোঁটাও আকর্ষনের তফাৎ ঘটেনি অনির্বাণের কাছে।

যদিও বা নিজেকে নিখুঁত করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করে না নীলা কখনোই ।সৌন্দর্যের থেকেও বেশি আকর্ষণীয় ওর মধ্যে আভিজাত্য।আজকালকার ভার্চুয়াল পৃথিবী, অত্যাধুনিক জীবনযাপন সবকিছুর মধ্যেও নীলা মনেপ্রাণে বড্ড বেশি রাবীন্দ্রিক। মনের ভেতর সব সুতোগুলো বাঁধা সুরের মতো।

নিজের মনে চোখটা বন্ধ করে গায়ত্রী মন্ত্রটা পাঠ করে যাচ্ছিল নীলা। অনির্বাণ হয়তো স্বভাব দোষেই শাড়ির আঁচলটা টেনে ধরল!একটা অদ্ভুত অসন্তোষের দৃষ্টি নিয়ে নীলা তাকালে অনির্বাণের দিকে। মন্ত্রটা বন্ধ করে বলল-

“আহা! কি হচ্ছে! ছাড়ো পূজো করছি তো।”

বাঁধনটা আলগা করে দিল ও সাথে সাথে।অনির্বাণ জানে নীলা বরাবরই এরকম।

হয়তো বা নীলার জন্য অনির্বাণ-এর প্রতি আকর্ষণ টুকু এখন ইতিহাস! কিন্তু অনির্বাণ এর জন্য নীলার সৌন্দর্য এখনো একই রকম প্রগাঢ়।অবশ্য সব ইতিহাসেরই একটা অপর পিঠ থাকে; এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়।

নীলা থাকে অনির্বাণের পৈত্রিক বাড়িতে।ওর ট্রান্সফারেবল জব ,মাঝে মাঝে বাড়ি আসে।বাকি সময়টুকু কর্মক্ষেত্রে। নীলা নিজের গান, পরিচিত কিছু সীমিত বন্ধুবান্ধব ,আর ছেলে ঋজু কে মানুষ করার মধ্যেই বেঁধে রেখেছে জীবন টুকু। নিজের ওপর বয়সের গাণিতিক সংখ্যার বোঝাটা চাপিয়ে বারবার যেন কিছু একটা থেকে পিছু ছাড়াতে চায়! যদিও মিষ্টতাটুকু চেহারা, গলার আওয়াজ আর স্বভাবেও এখনো একই রকম। তবুও আলুথালু বেশ আর বিবর্ণ প্রসাধনে গাম্ভীর্য বাড়ানোর নিরলস প্রচেষ্টার অভাব রাখে না ও।

অনির্বাণ একদম উল্টোটা,ওর চোখে জীবনের সবকিছুই ভালো।কোন কিছুরই খারাপ বলে কিছু হয় না। সবটুকু উপভোগ করা, অনুভব করা প্রয়োজন।ও উদ্দাম, প্রাণোচ্ছল।যে কোন পার্টি, সিনেমা, ক্রিকেট,ফুটবল, বন্ধুবান্ধব ,ট্রিপ, আউটিং সবকিছু নিয়েই সমানভাবে উৎসাহী।আর সবচেয়ে বেশি উৎসাহী বা আকৃষ্ট যায় বলি না কেন, তা হয়তো নীলার প্রতি। অবশ্য এরকম সুন্দরী বউ এর প্রতি আকৃষ্ট হওয়াটাও স্বাভাবিক। বদ অভ্যেসের মধ্যে দুটো, একটা রাত্রি হলেই দুটো হুইস্কির পেগ মাস্ট আর একটা নীলার প্রতি উদ্যমতা।প্রথমটাই চেষ্টা করেছিল নীলাকেও নিজের রঙে রাঙাতে, তবে এখন আর করে না। শুধু জানে নীলা ওর সম্পত্তি। নিজের স্ত্রী ছাড়া অবশ্য আর অন্য কোন নারীর প্রতি কোন আকর্ষণই নেই অনির্বাণের।

খানিকক্ষণ পর নীলার পুজো হলে অনির্বাণ এসে বলল-

” তোমার হয়েছে? এবারে তবে তো আমরা একটুখানি সময় কাটাতে পারি, নাকি!”

” হ্যাঁ! না। মানে, কেন পারি না? নিশ্চয়ই পারি।”

” আগে আমি একটু রান্না করে রাখি। ফেরার পর ঋজুকে খেতে দিতে পারবো না, তা না হলে!”

” থাক না, একদিন না হয় রান্না করো না, বাইরে থেকে আনিয়ে নেবো। চলনা একটু আমার কাছে বসবে।”

” না না তুমি তো এমনিতেই বাইরে খাও সব সময়, এখন আর বাইরে খেতে হবে না। আমি একটু রান্না করি। এক্ষুনি হয়ে যাবে।”

” আচ্ছা ঠিক আছে।”

” বলছিলাম আজ আমার কয়েকটা পেন্ডিং কাজ আছে, একটু করে দেবে ?”

“হ্যাঁ কি বল?”

” ড্রাই ক্লিনার্স এর কাছে কিছু জামা কাপড় দেওয়া আছে, সেগুলো নিয়ে ঋজুকে স্কুল থেকে পিক করে নিয়ে চলে এসো না! ওরও ভালো লাগবে। ততক্ষণে আমার সব কাজ হয়ে যাবে।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। স্নান করে বেরোচ্ছি।”

যখনই অনির্বাণ আসে তখনই এরকম একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করে নীলার মধ্যে। সারাদিনের অজস্র অপ্রয়োজনীয় কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চায়।আদেশ নয় অনুরোধের মিষ্টতা। সে মিষ্টতা যেন বেশ খানিকটা হলেও যান্ত্রিক!দূরে সরে থাকতে চাই ও অনির্বাণের থেকে। এতগুলো বছর ধরে লড়াই করে চলেছে নিজের মধ্যে নীলা।

ঋজু এখন ক্লাস সেভেনে পড়ে ।ওদের দুজনেরই কম বয়সের বিয়ে। অথচ যেন কখনো অনির্বাণের সাথে নিজেকে মেলাতে পারেনি নীলা! অনির্বাণ যা চায় নীলা হয়তো তা কখনো ভাবে নি! অনির্বাণ যেভাবে পেতে চেয়েছে নীলাকে সেভাবে নীলা কখনো ধরা দিতে চাইনি অনির্বাণের কাছে! অনির্বাণ গভীর সমুদ্রে উদ্দামের মত ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছে অথচ নীলা চেয়েছে অনুভবের সমুদ্রের নিজেকে ভাসিয়ে রাখতে বহমান স্রোতে ! চেয়েছে অনুভব দিয়ে স্পর্শ করতে তলানীতে, সেখানে,যেখানে উদ্দামতার তাণ্ডব থাকবে না, শুধু থাকবে স্পর্শের কোমল অনুভব ।

অনেক চেষ্টা করেছে নীলা।অথচ চেষ্টা করেও পারেনি,পারেনি মন থেকে অনির্বাণের উদ্দামতাটুকু গ্রহণ করতে। এ আজকের কথা নয়, ওদের সম্পর্কের প্রথম দিন থেকে শুরু হয়েছিল এই টানাপোড়েন, তবে যদি অনির্বাণ সাধারন একটা মানুষ না হয়ে মনস্তাত্ত্বিক হতো তবে হয়তো বুঝতে পারত নীলা কি চাই!

সারাটা দিন কেটে যায় যেমন তেমন করে, শুধু অনির্বাণের উপস্থিতিতে রাত টুকু যেন কিছুতেই পেরোতে চায় না!সমস্ত কাজ শেষ করে বেশ রাত করে ঘরে এলো নীলা, চাপা পায়ে।খুব সাবধানে বিছানার একটা ধার ঘেঁষে গায়ের ঢাকাটা টেনে নিল।অসাবধানতায় পা টা গিয়ে ঠেকলো অনির্বাণের পায়ে। সাথে সাথে সারা শরীরের রক্তটা ঠান্ডা বরফ হয়ে গেল।অনির্বাণ ঘুরে তাকালো নীলার দিকে।হুইস্কির তীব্র গন্ধটা নীলার নাকে এসে লাগল,

“কতবার বলেছি, যে কদিন আমি থাকি, তাড়াতাড়ি ঘুমোতে আসবে।”

ছ ফুটের একটা মানুষ,বলিষ্ঠ চেহারা, দুচোখে যার প্রেমের তীব্র ঝড়,নিজের সবটুকু দিয়ে বাহুবন্ধের মধ্যে জড়িয়ে ধরল নীলাকে।বহুদিনের অতৃপ্ত তৃষ্ণা, আদরে আহ্লাদে উদ্দামতায় গ্রাস করে নীলার সমস্ত অস্তিত্ব।অথচ নীলার চোখের শূন্যতা চোখে পড়ে না ঘরের অন্ধকারে অনির্বাণের চোখে!

কোন অনুভূতি, কোন আকাঙ্ক্ষা জানার প্রয়োজন মনে করল না অনির্বাণ।আগেও কখনো করেনি অবশ্য! সেটা কিন্তু ওর নিষ্ঠুরতা নয়, সেটা ওর স্বভাব দোষ। এটাই তো মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। অনির্বাণও সেটুকুই করে। কিন্ত নীলা তো আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়! সেটা বুঝে উঠতে পারে না ও! তাই, শরীরের সাথে শরীর মিশে থাকলেও, নীলার মনের নাগাল পায় না ও কখনো!

অনেক রাতে ঘুম ভাঙে অনির্বাণের। পাশে নীলাকে দেখতে না পেয়ে উঠে বসে খেয়াল হয়নি কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। উঠে গিয়ে দেখে সবার ঘরে শোবার ঘরের সাথে লাগানো ব্যালকনির দরজাটা খোলা, বাইরের ইজি চেয়ারটায় নীলা বসে রয়েছে চুপ করে।

বাইরে এসে নীলার কাঁধে হাতটা রাখার সাথে সাথে, ছিটকে সরে সরে দাঁড়ায় নীলা।

“প্লিজ অনি, প্লিজ আর না!”

” কি হয়েছে তোমার? আমি কিছু করছি না।”

” ও না, কিছু মনে করো না, আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।”

নীলার কান্না ভেজা গলাটা অনুভব করতে পারবে না, এতো অবুঝ অনির্বাণ নয়।একটা অপরাধবোধ সঙ্গে সঙ্গে ওকে করে আবিষ্ট করে। কিছু না বলে আস্তে আস্তে ঘরের ভেতরে ফিরে যায় অনির্বাণ। খুব ছোট মনে হতে থাকে নিজেকে।কেউ কারো সাথে কোন কথা বলতে পারেনা।

ভেতরে ভেতরে একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল অনির্বাণের, কিছুতেই বেরোতে পারছিল না ওর থেকে।সকাল বেলা চা খেতে খেতে টেবিলে বসে নীলা কে বলল-

” ভাবছি তাড়াতাড়ি ফিরে যাব।”

শুনেই চিৎকার করে উঠল ঋজু,

” না বাবা তুমি বলেছিলে আমাদেরকে নিয়ে এবারে বেড়াতে যাবে ছুটিতে এসে। আর বলছ এখনই ফিরে যাবে!”

” না রে একটু বেশি কাজ এসে গেছে।”

” না বাবা প্লিজ। তুমি আবার কখন আসবে? নিয়ে চলো, এবারই নিয়ে চলো।”

“আচ্ছা দাঁড়া দেখছি।”

“হ্যাঁ নীলা ,আসলে আমি একটা কথা ভাবছিলাম!”

” হ্যাঁ বল।”

” তোমার শুভাশিস কে মনে পড়ে? আরে তোমার ডিপার্টমেন্ট, খুব ভালো গান করতো, মনে আছে তবলাও বাজাতো দারুন!”

শুভাশিস এর কথা ভুলবে কি করে নীলা! ও ছিল সবার মধ্যে আলাদা। যখন শুভাশিস তবলা বাজাতো, গান করত নীলা। কতবার ইউনিভার্সিটির ফ্রেশার্সে ফেস্টে ওর সাথে পারফর্ম করেছে। অদ্ভুত একটা স্নিগ্ধতা ছিল ওর মধ্যে।তারপরই অনির্বাণের সাথে.. সম্পর্কটা ব্যাস……..

“ও নিজের একটা গানের স্কুল খুলেছে। কালই ওর সাথে কথা হল। তোমাকে বলব ভেবে ভুলে গেছি। জিজ্ঞেস করছিল তোমার কথা। জিজ্ঞেস করছিল তুমি আজকালের গানটা করো কিনা? আমি বললাম, করো।বলছিল ওর সাথে তো তুমিও স্কুলে জয়েন করতে পারো,যদিও তেমন একটা পে করতে পারবে না!”

-হঠাৎ করে নীলার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটা হাসির রেখা দেখা দিল।

” হ্যাঁ, তোমার যদি আপত্তি না থাকে আমি করব।”

অনেকদিন পর যেন নিজেকে আবার নতুন করে ফিরে পেয়েছিল নীলা!অনির্বাণ নিজের কাজের জায়গায় ফিরে গেছে বেশ কিছুদিন। সেবার অবশ্য ওদের বেড়াতে যাওয়া হয়নি!

শুভাশিস যেন বারবারই সবার থেকে আলাদা। অনেক বেশি ধীর- স্থির- রুচিসম্মত- পরিণত। মনের মত করে সব কথাগুলো ভাগ করে নেয় নীলা শুভাশিস এর সাথে।যেন, ঠিক নীলার মনের মত করেই কথাগুলো বলে শুভাশিস!যখন নীলার অনুভূতিগুলো বলিষ্ঠ হয়েছিল শুভাসিশ এর জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে।

মাঝখানে পেরিয়ে গেছে বেশ কয়েকটা মাস।এবারে তিন মাস হয়ে গেছে ,অনির্বাণ বাড়ি ফেরে নি।এখনে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বিশ্বভারতীতে একটা প্রোগ্রামের জন্য এসেছে নীলা আর শুভাশিস।ঋজু কে অবশ্য নিয়ে আসতে পারেনি। সামনে পরীক্ষা। তাই ও আছে ও দাদু ঠাকুমার কাছে ।

সূর্যের প্রথম আলোর সাথে দেবদারু, ইউক্যালিপটাস, ছাতিম গাছ গুলোর মাঝ দিয়ে, লাল মাটির পথে পলাশের রঙ মেখে হাঁটতে থাকে ওরা দুজনে। নীলার খোলা চুল, সবজে রংয়ের শাড়ি। চারদিকে একটা মিষ্টি মন ভালো করা গন্ধ।সব কিছু ওদের বড্ড চেনা। হঠাৎ করে নীলা বলে-

” এই পথে কেন আগে হাঁটিনি তোর সাথে কি জানি?”

” তার দায় কিন্তু আমার ওপর বর্তায় না।”

”না দায় আমি চাপায়ওনি তোর ওপর।”

“ভাগ্যিস তুই গানটা বন্ধ করিস নি, এত ভাল গান করিস তুই! তাহলে আর তোর সাথে দেখা হতো কি?”

“আসলে সময়ে নিজেই নিজের মন বুঝিনি।”

” জানিস তুই বুঝিসনি ,আমি কিন্তু বুঝেছিলাম ।বলার সুযোগ পায়নি শুধু।”

হঠাৎ করে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায় নীলার। যেন চুরির দায়ে ধরা পড়ে গেছে! একটু রাগের সাথে বলে-

” তা বলে ভাগ্যের হাতে সবটুকু ছেড়ে দিয়ে, সব পরিহাস মেনে নিতে হবে বলছিস! আমি আর নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করব না!”

” না তা কেন?আবার তো শুরু করেছিস গানটা। এবার ভালো করে কর। শুধু ওটার ওপর মন দে।”

নিজেকে সামলে নেয় নীলা। ভাগ্যিস কিছু বলেনি! শুভাশিস তো শুধু গানের কথাই বলছিল! ওই পাগল! কি ভেবেছিল এখুনি! থেমে একটু সামলে নিয়ে বলে-

” বিয়ে করিস নি কেন?”

“কই আর করা হল! এই গান, গানের স্কুল। সময় পেলাম না। এই বয়সে আর কি কেউ জুটবে বল?”

” কেন জুটবে না।মেয়ের অভাব নাকি!”

” বাবা আমি অনির্বাণ নই! এত এলিজিবল, এত হ্যান্ডসাম! সেটা কিন্তু তুই অস্বীকার করতে পারবি না!”

” তা ঠিক! তুই একদম অনির্বাণ এর মত না, কোনদিন হতেও পারবি না!”

বলে উল্টো দিকে ঘুরে পা বাড়ায় নীলা।নীলার মুখের পরিবর্তন টা শুভাশিস যে দেখতে পায় না, তা নয়!হয়তোবা কিছু বুঝতেও পারে, শুধু বলতে পারে না। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।

নীলাকে দূরে চলে যেতে দেখে শুভাশিস চিৎকার করে বলে-

” আসলে তুই আত্মসুখী নীলা।”

” পা গুলো হঠাৎ থেমে যায়। যেনো মন্ত্র বলে কেউ বেঁধে রেখেছে ওকে!”

কাছে এসে শুভাশিস অস্ফুট স্বরে বলে-

” সেদিন তুই অনির্বাণকে ছেড়ে আসতে পারিস নি।পারিস নি, তার কারন সেদিন আমার সে যোগ্যতা ছিল না। আমার তুলনায় অনির্বাণের যোগ্যতা ছিল অনেক বেশি। আজ আর তোর সে গর্ব আর নেই। তোদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে চায় না আমি, তবু বলব, বিজয়ীর গর্ব যখন পরাজিতের লজ্জায় পরিণত হয়, তখন হয়তো অনেকটা এরকমই অনুভূতি হয়।”

কিছু বলতে পারে না নীলা। শুধু চোখ থেকে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে।

” কিছু মনে করিস না, আমি সত্যি তোকে কষ্ট দিতে চাইনি!তবে যেটা বর্তমান, সেটাকে স্বীকার করতে শেখ নীলা। আমরা যা চায়, সব সময় কি তা পায়, সব সময় কি তা পাওয়া সম্ভব!”

“চুপ কর শুভাশিস।”

আর কোন কথা বলতে পারে না নীলা। তর্ক করার বিন্দুমাত্র মানসিক অবস্থা তখন আর ছিল না। নিঃশব্দে ফিরে এসে হোটেলের ঘরে নিজেকে ঘরবন্দী করে।

বিশ্বভারতী থেকে ফিরে আসার পর গানের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় নীলা। মাঝখানে কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। শুভাশিস অনেকবার ওকে ফিরে আসতে বলেছিল, কিন্তু সত্যি মন মানেনি নীলার। আজ অনেকদিন পর অনির্বাণ আবার ফিরে এসেছে বাড়িতে।তবে এবারে অনির্বাণ বেশ চুপচাপ। দুদিন হল বাড়ি ফিরেছে। কিন্তু একবারও, নীলার ওপর নিজেকে চাপাবার চেষ্টা করেনি কোন ভাবে। বেশিরভাগ সময়টা কাটিয়েছে ঋজুর সাথে।

পরের দিন সন্ধেবেলা হঠাৎই একটা বিয়ে বাড়িতে নেমন্তন্ন বেরোবার জন্য তৈরি হচ্ছে নীলা আর অনির্বাণ। কলিং বেলটা বেজে উঠলো।

“তুমি তৈরি হও ,আমি দেখছি কে এসেছে।”

বলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল অনির্বাণ। যেয়ে দরজাটা খুলতেই দেখে শুভাশিস দাঁড়িয়ে। ওরা দুজনেও পুরনো বন্ধু, হাসিমুখে অভ্যর্থনা করেই শুভাশিস কে ভেতরে নিয়ে আসে।

“তোরা হয়তো কোথাও যাচ্ছিস!অসময়ে এসে পড়লাম আমি তাইতো!”

” না না অসময় হবে কেন ?আমি একটু চা করে আনি।”

বলে নীলা রান্না ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিল। “নারে চা লাগবে না। আমি একটা দরকারি কাজে এসেছি, আরো অনেক কাজ বাকি। এক্ষুনি বেরিয়ে যাব।”

“আরে বোস না!কি এমন দরকারি কাজ? একটু চা তো খেতেই পারিস!”

অনির্বাণের কথা কাটতে পারল না শুভাশিস। আসলে বহু বছর পর ওর সাথে দেখা। বলল-

” ঠিক আছে। তার আগে আমি কাজের কথাটা বলি- পরের মাসের ১২ তারিখে আমার বিয়ে। আসিস কিন্তু দুজনেই, ঋজুকে নিয়ে।অতিথি হিসেবে না বাড়ির লোক হিসেবেই থাকতে হবে পুরো কাজে। মায়ের বয়স হয়ে গেছে, খুব জোর করলো রে, তাই ইচ্ছে না থাকলেও করতেই হলো।”

নীলার মুখ দিয়ে কথা সরলো না। এত বড় একটা অপমান অনির্বাণ করতে পারল ওকে?

“আমি চা করে আনছি।”

বলে রান্না ঘরে চলে গেল।

দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল নীলার দিকে।নিজেকে বড্ড বেশি ছোট মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কি করে সেদিন ঐ কথাগুলো ও শুভাশিসকে বলেছিল!না এভাবে অপমান সহ্য করবে না ও! এর উত্তর ওকে দিতেই হবে। হঠাৎ করে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই শুনতে পেল অনির্বাণ আর শুভাশিস কথা বলছে, থমকে দাঁড়ালো পর্দার আড়ালে।

“তোর হঠাৎ করে বিয়ে করার কারণটা আমি জানি শুভাশিস।কিন্তু বিশ্বাস কর আজ আর আমার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই; আমি যাকে পাবার জন্য একদিন সব কিছু করেছি! আমার স্ত্রী আমার সন্তানের মা হওয়ার পরেও, আমি তাকে পাই নি। আমি হয়তো যোগ্যই নয় নীলার! ওর তোর মতো একটা মানুষের দরকার ছিল। আমি জানতাম ও তোর সাথে ভালো থাকে তাইতো তোর সাথে কাজ করার জন্য বলেছিলাম।আমি জানি ও আমার দুর্বলতা,কিন্তু ওর উপর অত্যাচার করতে চাইনি আমি কক্ষনো! তাই তোকে ফোন করে বলেছিলাম তোর গানের স্কুলে ওকে তোর সাথে নিতে। আমায় তুই স্বার্থপর ভাবিস না।”

একটু হাসে শুভাসিশ।বলে-

“নারে অনির্বাণ কি করে আজকে তোকে স্বার্থপর ভাবি বল! হয়তো তোর উপর আমার আগে রাগ ছিল, কিন্তু যে মানুষ নিজের স্ত্রীকে তার প্রাক্তন প্রেমিকের দিকে নিজে হাত ধরে এগিয়ে দিতে পারে, সে আর যা হোক স্বার্থপর বা অমানবিক হতে পারে না। আমি তোর জায়গায় থাকলে কোনদিন পারতাম না, যা তুই পেরেছিস!তবে বিশ্বাস কর বিয়ে করাটা আমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত।”

স্তম্ভিত হয়ে দাড়িয়ে থাকে নীলা।অনেক বেশি যন্ত্রণা হলেও আজ নীলা বুঝেছে, সবকিছু চেনা হিসেবের মধ্যে ধরে বিচার করা যায় না।যে মানুষটাকে বাইরে থেকে এত ছেলেমানুষ, উদ্দাম, সংযমহীন ভাবতো-তা ছিল শুধু সারল্য, নিজের স্ত্রীর ওপর অধিকারবোধ আর লাগামছাড়া ভালোবাসার প্রতিফলন।কেন নিজের থেকে কিছু বলল না অনির্বাণ নীলাকে!

আজ যে কি আর ও কোন জোর খাটাতে চায়না!নিজের থেকে শিকড়টা আলগা করে ফেলেছে!ভেবে মনের ভেতরটা হু হু করে উঠল নীলার।অথচ শুভাসিশের জন্য কোন অনুভূতি কাজ করছিল না আর তখন!

যাবার সময় শুভাসিশকে বলে নীলা-

“আমি তোকে যা বলে থাকি না কেন, আমার দুর্বল মুহূর্তের ভুল ভেবে ভুলে যাস।প্রার্থনা করি তোর বিবাহিত জীবন খুব সুখের হোক!”

“আমিও। তবে একটা কথা বলবো কিছু কিছু জিনিস পরিবর্তন না হলেই ভালো লাগে। তুই আর আমি একই ভাবে বন্ধু থাকবো সারা জীবন। ওকে না হয় তোর স্বামী হয়ে থাকতে দে। আসলে, আজ বড্ড মনে হচ্ছে ওর মত করে হয়তো আমিও তোকে ভালবাসতে পারতাম না!”

“তুইও বুঝতে পারলি, আমি হয়তো বড্ড দেরি করে ফেললাম সবটা বুঝতে! শুধু নিজের ভালো লাগা খারাপ লাগার ওপরে ভিত্তি করে বিচার করেছি অনির্বাণ কে। আর কি….”

“আবার নতুন করে শুরু কর নীলা। এখনো সবটা শেষ হয়ে যায়নি।ও তোকে সত্যি খুব ভালবাসে।”

তখন অনেক রাত, বাইরে পূর্ণিমার গোল চাঁদ সারা আকাশ জুড়ে,চারদিকে ফুটফুটে জ্যোৎস্না।শোবার ঘরের দরজাটা খোলা আকাশী রংয়ের পর্দাটা হাওয়ায় উড়ছে। বিছানায় একা চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল নীলা।এখনো অনির্বাণ আসেনি ঘরে। বাইরে থেকে সিগারেটের গন্ধ টা হাওয়ার সাথে ঘরের ভেতর পর্যন্ত আসছিল। বুঝতে পারল ও এখনো ব্যালকনিতে বসে।আস্তে আস্তে পর্দাটা সরিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো নীলা।পেছন থেকে শুধু সিগারেটের লাল আগুনটা চোখে পড়ল।আস্তে করে গিয়ে অনির্বাণের হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে ফেলে দিল নীলা। দুজন তাকিয়ে থাকল দুজনের দিকে এক দৃষ্টিতে।হাতটা ধরে বলল –

“অনেক রাত হয়েছে, ভেতরে চলো। আমার ঘুম আসছে না।”

কোন কথা না বলে নীলার সাথে ভেতরে এলো অনির্বাণ। শোবার ঘরে বিছানাটায় নীলা প্রথম বার নিজের থেকে অনির্বাণ কে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখলো। কারুর মুখে কোন কথা নেই অথচ মনের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতিরা কথা বলে গেলো ফিসফিসিয়ে।শুধু অনির্বাণের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল নীলার গালে এসে লেগে গালটা ভিজিয়ে দিল।

আগুন হয়তো নিভে গেছে অনেক আগে, পড়ে আছে শুধু ছাই টুকু। তবু বিবর্ণ ফ্যাকাসে ছাই এর নিচে চাপা পড়ে থাকা ভালোবাসার ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ টুকুকে নিয়েই আবার ওরা পথ চলা শুরু করবে,এই আশায় যে,হয়তো বা কোনোদিন এই স্ফুলিঙ্গই রূপ নেবে দাবানলের!!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত