পাহাড়, সমুদ্র, আকাশের মাখামাখি

পাহাড়, সমুদ্র, আকাশের মাখামাখি

ভ্রমণ, বেড়ানো, ঘোরাঘুরি সবার জন্যই খুবই আনন্দদায়ক বিষয়। ঘুরে বেড়ানোটা সবার জন্য প্রত্যাশিত বিষয়ও বটে। আমারও কিন্তু তাই। সেই ছোটবেলা থেকেই ঘুরে বেড়ানো শখ। আমি ঘুরেছিও অনেক। বাংলাদেশের ভেতরেই পরিবারের সাথে প্রায় সবখানে আমি দেখেছি। কিন্তু খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবান বাকি ছিল। এবার সেই অপূর্ণতাকে পূর্ণ করা হলো।
গত বছর থেকেই ঐদিকটায় যাওয়ার প্ল্যান ছিল আমাদের। রাঙামাটির সাজেক ভ্যালী দেখা মূল উদ্দেশ্য। নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এবার সেই স্বপ্নটা পূরণ হলো।

১১ তারিখ দুপুর দুইটার দিকে খুলনা থেকে আমরা রওনা দেই। ঢাকা পৌঁছাতেই আমাদের রাত ১০ টা বেজে যায়। তবে ঘাটে আমরা দ্রুত ফেরি পেয়ে যাই। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রোড ধরে ফেনী হয়ে পরদিন ভোরের মধ্যে খাগড়াছড়ি পৌঁছানো ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। সেই অনুযায়ী গাড়ি চলতে থাকে। নারায়নগঞ্জের এক হোটেল থেকে আমরা রাতের খাবার খেয়ে নেই।
কিন্তু কুমিল্লা এসে সমস্যা হয়। আর গাড়ি যেতে সবাই মানা করে। ফেনীর পথে নাকি ডাকাতির সমস্যা থাকতে পারে। তাই কুমিল্লার এক হোটেলেই আমাদের সেই রাত্রিযাপন হয়।

পরদিন ভোরে ৭টার দিকে উঠে শীত শীত আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে আমরা গোসল সেরে নেই। তারপর কুমিল্লার বিখ্যাত মাতৃ ভাণ্ডারের রসমালাই এবং একটি হোটেল থেকে নাস্তা সেরে আমরা খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেই।
ফেনীর পর থেকে রাস্তাগুলো উঁচু নিচু হওয়া শুরু হয়। আশেপাশে ছোট ছোট টিলাও দেখা দিতে লাগে। তবে রাস্তা খুবই মসৃণ। যদিও খুবই বিপজ্জনক। আমি এসময় কিছুটা ভিডিও করার চেষ্টা করতে লাগলাম। পথের দৃশ্যগুলো প্রচণ্ড রকমের সুন্দর ছিল। চোখ এবং ফুসফুসের জন্য দৃশ্য এবং আবহাওয়া খুবই আরামদায়ক।

আমরা খাগড়াছড়ি পৌঁছালাম পৌনে দুটোর দিকে। সাজেকে ঢোকার গেট আবার শুধু সাড়ে দশটা এবং সাড়ে তিনটায় খোলে। দিঘিনালায় আর্মি ক্যাম্প থেকে তাদের মাধ্যমেই সাজেক পর্যন্ত যাওয়া লাগে। তাই আমরা কিছুটা শংকিত ছিলাম যে সময়মতো পৌঁছাতে পারব কি না। কিন্তু আমরা সময়মতো পৌঁছে যাই।

আমাদের সাথে সাজেকের এক রিসোর্টের লোকের কথা হচ্ছিল। তিনি জানান যে আমরা চাইলে গিয়ে খেতে পারি আবার খেয়েও যেতে পারি। তাই আমরা হালকা নাস্তা করে নেই আর সাজেকে গিয়ে খাওয়ার কথা চিন্তা করি। প্রায় পৌনে তিনটার সময় সাজেকের উদ্দেশ্যে দিঘিনালা থেকে আমরা রওনা দেই। পথটা বলতে গেলে পুরোটাই খাঁড়া। গাড়ির ওপর প্রচণ্ড চাপ দিয়েও আমরা এগিয়ে যেতে থাকি। তবে সাজেকের পথের মূল আকর্ষণ পুরোপুরি ভিন্ন। সাজেকের পথটা ত্রিপুরাদের এবং অন্যান্য কিছু আদিবাসীদের বাড়ির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। পথটা অনেক বেশী এবং সেসব পথে ছোট ছোট বাচ্চারা সারাক্ষণই দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো গাড়ি যেতে দেখলেই হাত নাড়ে এবং “চক্কে চক্কে” বলে চিৎকার করতে থাকে। কেউ একটা দিলে তারা “আরো আরো” বলে চিৎকার করে। আমরা এই তথ্য আগেই জানতাম। আমাদের সাথে তাই এক প্যাকেট চকলেট নিয়েছিলাম। কিন্তু পথে শত শত বাচ্চা থাকায় আমরা আমাদের সাথে থাকা শুকনা খাবার মোয়া, কলা, আপেল এবং আরো অনেক কিছুই তাদের দিয়ে দেই। তারপরেও শেষের দিকে অনেক বাচ্চা বাদ পড়ে যায়। তাদের চিৎকার শুনলে খুব খারাপ লাগে।

আদিবাসী বাচ্চাগুলোকে দেখে আরো বেশী কষ্ট লাগে কারণ তাদের স্বাস্থ্যের অবস্থা মোটেও ভালো নয়। সকলে রুগ্ন, অপুষ্টি আক্রান্ত। ছোট দুএকটা বাচ্চা দেখলাম গায়ে দানা দানা কি ওঠা, সম্ভবত পক্স হবে।

এভাবে প্রায় দেড় ঘন্টা গাড়িতে করে খাড়া খাড়া পাহাড়ের ওপর দিয়ে সন্ধ্যার কিছু আগে আমরা সাজেকে পৌঁছাই। রিসোর্টে রুম আগেই ঠিক করা ছিল। আমরা গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে অনেক দ্রুত করে হেলিপ্যাডে পৌঁছাই। সেখান থেকে সূর্যাস্ত দেখা যায়। সূর্যাস্তের দৃশ্যটা ছিল অসাধারণ। মনে হচ্ছিল পাহাড়ের মাঝে সূর্যটা হারিয়ে গেল। হালকা লালচে এবং বেগুনী আভা ছড়িয়ে দিয়ে সূর্য বিদায় নিল।

সূর্যাস্ত দেখে আমরা খেয়ে নেই। দুপুরে না খাওয়ায় দুপুরের খাবার হিসেবেই খাই। খেয়ে তারপর আমরা হাঁটাহাঁটি করতে লাগি।
সাজেকে পাহাড়ের ওপরেই বেশ উন্নত। ২০-২৫টার মত শুধু থাকার রিসোর্টই রয়েছে। তবে সেগুলো কাঠের। আমাদের রিসোর্টে কাঠ দিয়ে এত্ত সুন্দর রুম কিভাবে করল সেটা দেখে আমি অবাক হয়েছি। আর সাজেকে প্রচুর খাবার রেস্তোরাঁও রয়েছে। সেখানে বর্ষাকালে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশের কোড়লের শ্বাস দিয়ে এক প্রকার খাবার তৈরি হয়। কিন্তু আমরা তো এসেছি শীতকালে তাই সেটা খাওয়া হলো না। তবে তাদের খাবার রেস্তোরাঁ গুলো খুবই পরিষ্কার এবং গোছানো। রাতে আমরা ফানুসও উড়ালাম।

পরেরদিন সকালে আমরা সূর্যদয় দেখলাম। পাহাড়ের কারণে শুরুতে সূর্য দেখা গেল না। প্রাত আধঘন্টা পর সূর্য পাহাড়ের মাঝ দিয়ে উঁকি দিল। পাহাড়ের ঝাড়ুর গাছগুলোর ওপর সূর্যের আলো পড়ে যে সোনালি আভা তৈরি হলো তা দেখলে প্রাণ জুড়ে যায়।
সূর্যদয় দেখে গোসল এবং নাস্তা সেরে আমরা সাজেকের মূল পয়েন্টে যাবার জন্য রওনা দিলাম। গাড়ি গেল। তারপর হাঁটা পথ। একেবারে ওপর পর্যন্ত আমরা উঠতে পারলাম না। পানি শেষ হয়ে গিয়েছিল আর আমরা প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছিলাম। তাই নেমে আসলাম। তবে বলতে গেলে প্রায় উপরে একটা স্কুল পেলাম। আর ছোট জবা ধরনের ফুলেরও দেখা পেলাম।

সাড়ে দশটার সময় আমরা সাজেক থেকে বেরিয়ে গেলাম। যেতে যতটা সময় লেগেছিল ফিরতে তার অর্ধেক সময় লাগল। তবে আসার সময়ও দেখলাম সাজেকের পেছনের পাহাড়গুলো কুয়াশায় ঢাকা।

সাজেক থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম রহস্যময় আলুটিলা গুহায়। খাগড়াছড়ি থেকে কিছুটা দূরেই অবস্থিত। গুহাটি আসলে রহস্যময় মনে হলো না। পানির মোটর দেখতে পেলাম। তবে যে প্রাণ জুড়ানো বাতাস, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। আর পাথরগুলোর আশ্চর্য আকৃতিও কিছুটা রহস্যজনক।

আলুটিলা গুহা থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম রিসাং ঝর্ণায়। প্রায় ১০ কিলোমিটার পায় হাঁটার রাস্তা হেঁটে রিসাং ঝর্ণা পর্যন্ত পৌঁছালাম। কিন্তু দৃশ্য দেখে কষ্ট ভুলে গেলাম। ঝর্ণায় নামা হলো না। কারণ আমাদের সামনেই ঢালু ঝর্ণার ওপর থেকে একজন নিচে পড়ে গেল। তবে তার কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়নি, কারণ পানিতেই পড়েছিল। আমরাও কঠিন রাস্তা বেয়ে ঝর্ণার কাছে চলে গেলাম। তবে পানির স্রোতে পিছলা জায়াগায় যাওয়ার সাহস হলো না।

রিসাং থেকে বেরিয়া দুপুরে খেয়ে আমরা রাঙামাটির দিকে চলে গেলাম। রাতে রাঙামাটিই থাকা হলো। সকালে ঝুলন্ত ব্রিজ দেখে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বান্দরবান থেকে নীলগিরি বেশি দূর হওয়ায় সেখানে যাওয়া গেল না। কিন্তু নীলাচল যাওয়া হলো। নীলাচল এবং সাজেকের সৌন্দর্য প্রায় এক রকম। তবে নীলাচল উন্নত বেশী বলে সেখানে আনন্দও বেশী। নীলাচলে থাকতেই সূর্যাস্ত হয়ে গেল। কুয়াশা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে যেতে লাগল। রাতে নীলাচলের ভেতরের এক রেস্তোরাঁয় খেয়ে কক্সবাজারের জন্য রওনা দিলাম।

কক্সবাজার আমি আগে একবারও গিয়েছি। ক্লাস ওয়ানে থাকতে। কিন্তু কিছুই মনে নেই। তাই আবার যাওয়া হচ্ছে। কক্সবাজার পৌঁছালাম রাত ১১টায়। হোটেল থেকে সমুদ্র দেখা যায়। জোয়ার চলছিল বলে গর্জন শুনতে পেলাম। ভোরবেলা উঠে আমরা কলাতলী বীচে চলে গেলাম। সেখানে খানিকক্ষন সমুদ্রে লাফালাফি করলাম। একটা মেরিন ড্রাইভও হলো। মেরিন ড্রাইভে যে মজা পেয়েছি সম্ভবত জীবনে আর কিছুতে সে মজা পাইনি।

কলাতলী থেকে ফিরে নাস্তা করে ইনানীর দিকে রওনা দিলাম। গতবার ইনানী গিয়ে রীতিমত বিরক্ত হয়েছিলাম যে একই জিনিস দেখতে আবার যাওয়ার দরকার কী। কিন্তু এবার গিয়ে অবাক হলাম। ইনানীতে প্রচুর প্রবাল তৈরি হয়েছে। সময়স্বল্পতার কারণে সেন্ট মার্টিন না যাওয়া দুঃখ ভুলে আনন্দে মেতে উঠলাম। নীল আকাশ ও নীল পানিতে একাকার হওয়া দৃশ্য দেখতে লাগলাম।
দুপুরে হিমছড়ীর এক রেস্তোরাঁয় খেলাম। পাহাড় অনেক দেখা হয়েছিল। তাই হিমছড়ীতে আর উঠা হলো না। সেখান থেকে লাবনী পয়েন্টের জন্য যাত্রা শুরু করলাম।

লাবনী পয়েন্ট দেখে হতভম্ব। কী দারুণ সমুদ্রের গর্জন সেটা বুঝলাম। ভাঁটা থাকা সত্ত্বেও গোসলে নেমে গেলাম। কানে লবণ পানি ঢুকে গেল। মুখেও গেল, কিন্তু খুলনার মানূষের আবার লবণ পানি কী! লাবনী থেকে হোটেলে ফিরে গোসল করলাম। তারপর সূর্যাস্ত দেখার জন্য চলে গেলাম কলাতলীতে। কিন্তু দূর্ভাগ্যের কারণে শুরু থেকে দেখতে পারলাম না। আমরা যেতে যেতে সূর্য প্রাউ অর্ধেক ডুবে গিয়েছিল। তাও যে লাল আভা ছিল সেটাই ছিল দেখার মত। প্রাণ ভরে দেখলাম। কারণ চলে যাচ্ছি কিছুক্ষণের মধ্যেই। গাড়িতে উঠে ইনানী আর লাবনী দুই বোনের জন্য মন খারাপ হতে লাগল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম বছরে একবার হলেও দুই বোনকে দেখতে আসবই।

দীর্ঘ ৬ দিনের ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটল। আর কোনোদিন সাজেক, নীলাচলে যাব কিনা জানি না। তবে তিন পার্বত্য জেলা আর কক্সবাজারের এই ভ্রমণ চিরদিন স্মৃতির পাতায় অম্লান থাকবে। সেটা হতে পারে ত্রিপুরা বাচ্চাদের চকলেটের জন্য চিৎকার, ধুলা মেখে মেখে হাইকিং, রিসাং ঝর্ণার পানি পরার শব্দ, নীলাচলের পাহাড়ের ওপরের কুয়াশা, কক্সবাজারের দুই বোন এবং সকলকে।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত