আন্টির গুণী মেয়ে

আন্টির গুণী মেয়ে

সকাল বেলা প্রচন্ড শব্দে ঘুম ভাংলো। দরজাটা খুলেই দেখি পাশের বাসার আন্টি , সালাম দিতেই মাথায় হাত বুলাতে শুরু করলেন সাথে মা সম্বোধনটাও পেলাম ফ্রীতে। আন্টির ব্যাবহার দেখে আমি তো ধপাস করে আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে আবার সজ্ঞানে ফিরেছি কিনা বোঝার জন্য আন্টিকে সজোরে একটা চিমটি কাটলাম। নাহ, এটা তো স্বপ্ন নয়, এটা সত্যি!!!। কিছুতেই কাহিনীটা বিশ্লেষণ করে উঠতে পারছি না।আন্টি তো এতো নরম সুরে কথা বলার মানুষ নন!!!

আন্টিকে আবার জ্বীন-ভূতে ধরেছে নাকি?? মানে শুনেছিলাম, ভূতে ধরলে নাকি মানুষ কি সব অদ্ভুত অদ্ভুত আচরণ করে।! বাকি সবার কাছে আন্টির এই আচরণ স্বাভাবিক বলে মনে হলেও আমার কাছে তা প্রচন্ড রকমের অস্বাভাবিক।””””!!

জন্মের পর থেকেই যার মুখ ভেংচানো কথা শুনে বড় হয়েছি, সেই আন্টি কি না আজ আমাকেই মা ডাকছে!!!!
কয়েকদিন আগেই তো বাসার সামনে আমার এক ছোটবেলার ছেলে বন্ধুর সাথে কথা বলতে দেখে আন্টি আম্মুকে এসে বলেছেন–

—“ভাবি,এভাবে মেয়েকে ছেড়ে দিয়ে রাখবেন না। এখন যদি মেয়েকে কন্ট্রোল না করেন, তাহলে মেয়ে হাতছাড়া হয়ে যাবে, এই বলে রাখলাম।”

—“কেন ভাবি, কি হয়েছে?? কি করেছে আমার মেয়ে?”
— “সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে ভাবি???একটু আগেই পাড়ার মোরে দাড়িয়ে একটা ছেলের সাথে কথা বলতে দেখলাম। মেয়ে বড় হয়েছে ৷ একটু শাসন টাসন করেন ভাবি, নইলে যে উচ্ছন্নে যাবে।”

— আচ্ছা ভাবি, আমি সিলভির সাথে কথা বলবো। ”
আম্মু সবটা জানতো তাই ওনার কথায় তেমন পাত্তা দেয়নি।কিন্তু আমার সাথে ঠিকই রাগারাগি করেছে।
আন্টি সবসময়ই ওনার একমাত্র মেয়ে জরিনার সাথে আমার তুলনা দিতে পছন্দ করতেন। জরিনা আমার থেকে এক বছরের ছোট। ছোট হলে হবে কি, আন্টির কথা মতো তার মেয়ে সর্ব গুণে গুণান্বিত যার ধারে কাছে ঘেষার সাধ্যও আমার নেই।তার মেয়ে সবদিকে ১০০ আর আমি গোল্লা।

আমি ফেসবুক ইউজ করি, ফেসবুকে ছবি আপলোড দেই এগুলো নিয়েও উনি আম্মুর কান ঝালাপালা করেছেন অনেক বার।

— “”আমার জরিনা ফেসবুক তো দুরের কথা, ফোনে কল আসলে কিভাবে রিসিভ করতে হয় সেটাই জানে না।কোন দিন ফোন কিনেও চায়না বাপু।কপাল করে মেয়ে একটা পেয়েছি।””

আর দুদিন আগে এক বান্ধবীর জন্মদিনে একটু সেজে গুজে গিয়েছিলাম, সেটাতেও ওনার নজর এড়ায়নি ….। সেটা নিয়েও আম্মুকে এসে কথা শুনিয়ে গিয়েছেন।।

—” আমার মেয়েটা ভাবি, এত বড় হলো একটু কাজলও ঠিকঠাক দিতে পারে না, আর পাড়ার মেয়েদের সাজের বাহার দেখলে মরে যাই। ভাগ্যকরে একটা মেয়ে পেয়েছি ভাই, সর্ব গুণে গুণান্বিত।।।”

আমি বুঝিনা, যে মেয়ে চোখে ঠিকঠাক কাজল দিতে পারেনা, ফোন রিসিভ করতে পারেনা সে মেয়ে কিভাবে সর্ব গুণে গুণান্বিত হয়!!

কিভাবে??
আন্টির মুখে মা ডাক শুনে আমার ঘোর কাটলো…..
— মা, এদিকে একটু শোন। তোর সাথে কিছু কথা আছে….।
(আমি আরো একবার শক খেলাম, আন্টি এসেছে আমার সাথে কথা বলার জন্য??এ আবার কেমন ঠাট্টা?!!যাই হোক, আন্টিকে ভিতরে এনে বসতে দিলাম।)
— হ্যাঁ, আন্টি বলেন কি কথা??
—তোর মোবাইলে তো ফেসবুক আছে তাইনা মা??
— হ্যাঁ, তা তো আছে অনেক আগে থেকেই। কেন কি হয়েছে??
আন্টি আমাকে একটা কাগজ দিলেন, সেখানে লেখা “জান্নাতের পরী জ্যাম।”
— এই নামটা একটু খুজে বের কর তো।
ফোন আমার হাতেই ছিল, সার্চ দিতেই আইডি চলে আসলো। এই উদ্ভট নামের একটাই আইডি ছিল। আইডি তে ঢুকেই তো আমার চক্ষু চড়কগাছ, এটা যে আন্টির গুণবতী কন্যা জরিনা!!! সাথে একটা ছেলে, সেও আমার অপরিচিত নয় আমাদের পাড়ারই ছেলে নাম শামসুল।

প্রোফাইল পিকে ” ” পৃথিবীর ভয়ানক শ্যাম “” নামে এক জনকে ট্যাগ করা। বুঝলাম ওইটা শামসুলের আইডি। আবার ক্যাপশনে লিখেছে ” “জ্যামের জামাই শ্যাম।” ” আন্টিকে সব পড়ে শোনাচ্ছি, হঠাৎ করে মনে হলো আমি স্বপ্ন দেখছি, ঘোর কাটানোর জন্য আন্টির হাতে জোরে একটা কামড় বসিয়ে দিলাম। আন্টি চিৎকার দিয়ে আবার সাথে সাথেই শান্ত হয়ে গেলেন। আন্টি চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ফেলতে ফেলতে বলে উঠলেন,

—-“”সত্যিই , অনেক ভাগ্য করেই এমন বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে পেয়েছিলাম রে। মেয়ে আমার পাড়ার ছেলের সাথেই ভাগছে, বাইরের কোন ছেলের সাথে তো আর ভাগতে যায়নি!!! বাইরের ছেলের সাথে ভাগলে তো আর মানসম্মান কিচ্ছু থাকতো না, কাউকে তো মুখই দেখাতে পারতাম নারে।ভাগ্যিস পাড়ার ছেলে!!””
আন্টির কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ বেহুঁশ ছিলাম, জ্ঞান ফেরার পর আন্টিকে বললাম,

—আসলেই আপনারা মা, মেয়ে দুজনই সর্বগুণে গুণান্বিত……।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত