দুঃস্বপ্ন

দুঃস্বপ্ন

তুহিন কম্বল দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে চোখ বুজে চিৎকার শুরু করে দিল। “মা আমাকে বাঁচাও। আমাকে মেরে ফেলল, মা আমাকে বাঁচাও।”

তুহিনের মা পাশের ঘর থেকে ছুটে এসে দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। “কী হয়েছে তুহিন? দরজা খোল।”
তুহিন দরজা খুলতে পারছেনা, কারণ সে চোখ খুলতে চায়না। ভয়ংকর জিনিসটা সে আর দেখতে চায়না। সজিবের মত হুবহু কথা বলল ভয়ংকর প্রাণীটা। চেহারাও সজিবের মত। একটু আগে জানালার কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ শুনে তুহিন জেগে উঠেছিল। তারপর দেখল সজিবের পা নেই, সে কোমড় দিয়ে এগিয়ে আসছে তুহিনের দিকে। মাথা তার জায়গামত নেই। এক হাতে নিজের কাটা মাথাটা নিয়ে এসে বাকি হাতে তুহিনের এক পা ধরে বসল। কাটা মাথা থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। তখনই তুহিন চিৎকার শুরু করছিল।

তুহিনের মা আবার ডাকল, “তুহিন দরজা খোল। কী হয়েছে তোর? ”

তুহিন ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে। কোথাও কেউ নেই। তবুও তার ভয় কাটেনা। বিছানা থেকে খুব সাবধানে উঠে দরজা খুলল। তুহিনের মা তাড়াতাড়ি রুমে ঢুকল। তুহিন তার মা’কে জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দিল। “মা আমাকে মেরে ফেলবে। আমাকে বাঁচাও মা।”

তুহিনের মা তুহিনকে খাটে বসিয়ে জানতে চাইল, “কী হয়েছে বাবা আমাকে বল। এই তো আমি, তোর কিছু হবেনা।”
তুহিন ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিয়ে একটু শান্ত হল।

তুহিন জানালার দিকে আঙ্গুল তুলে বলছে, “মা এই জানালা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে সজীব আমাকে মারতে এসেছে। ওর কাটা মাথা থেকে রক্ত পড়ছিল। দেখো দেখো, আমার বিছানায় রক্ত।”

তুহিন নিজেই অবাক হয়ে গেল। বিছানায় কোনো রক্ত নেই। জানালাটাও আছে ঠিক আগের মত। ভাঙ্গবে তো দূরের থাক, একটু ফাটেওনি কাচের জানালাটি।

সজিব রাজনীতি করত। একই রাজনৈতিক দলের পিন্টু ভাই। তাকে চিনেনা এমন কাউকে এই এলাকায় খুঁজে পাওয়া দায়। খুবই ভয়ংকর সন্ত্রাসী এই পিন্টু। তার গালে একটি কাটা দাগ আছে। চুলগুলো বড় থাকায় গালের কাটাটি আড়াল হয়ে থাকে। রাজনৈতিক ছত্রছাঁয়ায় থেকে আরো প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। লোকমুখে শোনা যায়, তিনি কত লোককে খুন করেছে তার হিসেব নেই। চারদিন আগে মোড়ের কাছে তুহিনকে বাড়ি আসতে দেখে ডাক দিল। তুহিন খুব ভয় পাচ্ছিল। কোনোরকম গিয়ে সামনে দাড়িয়েছে। তারপর তিনি বললেন, “এই শোন, বাড়ি যাবার পথে সজিবকে বলবি বুড়ির ভিটায় আসার জন্য। খবরদার, আমার নাম বলবিনা। বলবি এক লোক অনেকগুলো সবজি এনেছে বিক্রি করবে। তাই তাকে ডাকছে। যা তাড়াতাড়ি।”

তুহিন হনহন করে সজীবের সন্ধানে হেঁটে যাচ্ছে। তারা গাঁজাকে সবজি বলে। কী অদ্ভুত ব্যাপার। গাঁজার নাম সবজি।

“সজীব, এক লোক তোকে বুড়ির ভিটায় যেতে বলেছে। সে নাকি সবজি বিক্রি করবে।”
সজীব কথাটি শুনে খুশি হল। মনে হচ্ছে সস্তায় কিনতে পারবে। এর আগেও দু’বার কিনেছে। চারিদিকে সন্ধা নেমে আসছে। সজীব গেল বুড়ির ভিটায়।

এই ভিটায় দিনের বেলাতেই কেউ আসতে চায়না। গা ছমছম করে। চারিদিকে ঝোঁপ জঙ্গলে ভরপুর। বড় বড় মেহগণি গাছ মাথা উঁচু করে আছে।

সজীব গিয়ে দেখল একটু দূরে এক লোক দাড়িয়ে আছে। তার মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রেখেছে। কাছে গিয়ে ডাক দিল,

“এই যে, সবজি কতটুকু?”
লোকটি পিছনে ফিরল। তার মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে ঢেকে রেখেছে। চোখ দুটো শুধু দেখা যায়। সজিব কিছু বুঝে উঠার আগেই গাছের আড়াল থেকে আরো দুইজন বেরিয়ে এল। তাদেরও মুখ বাঁধা, হাতে বড় ছুঁড়ি। কোরবানীর সময় এত বড় ছুঁড়ি দিয়ে গরু জবাই করে। সজীব ভয়ে জড়োথরো হয়েছে জানতে চাইল, “কে তোমরা? আমার কাছে কী চাও?”

তিনজন মিলে ধরে ফেলল সজীবকে। একটা কাঁপড় দিয়ে মুখ বেঁধে ফেলল। দুইজন সজীবকে শুইয়ে ধরে রাখল। একজন বড় ছুঁড়িটা গলায় চালিয়ে দিল। গরগর শব্দে রক্ত বের হচ্ছে। সজীব মরে যাবার পর পিন্টু মুখোশ খুলল। ব্যাঙ্গ স্বরে বলছে, “তুই না বলেছিলি তোকে সভাপতি না দিলে একেকজনকে দেখে নিবি? দেখ এবার ভালো করে দেখ। এই ধর শালারে, তিন টুকরা করব।”

এই বলে পিণ্টু আর তার সাথের দু’জন মিলে গলা থেকে মাথা আলাদা করে ফেলে। তারপর কোমড় থেকে আলাদা করতে থাকে। কোমড়ের হাড় বহু কষ্টে কেটে সজীবের লাশকে তিন টুকরা করে সেখান থেকে চলে গেল পিন্টু আর তার সহযোগীরা। সজীব মরার আগে জানতেও পারল না তাকে কে খুন করেছে। সে শুধু জানে তুহিন তাকে এই ভিটায় আসতে বলেছে।

তুহিনের মায়ের কথা অনুযায়ী সে মেনেই নিয়েছে গতরাতের গঠনাটি একটি ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুনা। তাই আজ রাতে আর ভয় পাবার কিছু নেই। তবুও তুহিন আজ ঘরের দরজা খোলা রাখে। যদি আবারো কোনো ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে, তাহলে রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে যাবে। জানালাটি ভালো করে চেক করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় তুহিন। আজ বাতিও নিভানো হয়নি। বাতির আলোতে ভয় কম লাগবে। তবে মনের দিক থেকে সজিবের কথা ভাবতেই ভয় পেয়ে যাচ্ছে তুহিন। ভাবছে, তুহিনের কথায় সজিব বুড়ির ভিটায় গিয়েছিল। তারপরই খুন হল সজীব। সজীবকে যারা খুন করেছে সে তাদের কাছে যাক, তার কাছে এসে ভয় দেখানোর কী হল?

মধ্যরাতে কাঁচ ভাঙ্গার শব্দে লাফিয়ে উঠল তুহিন। সজিব এক হাতে জানালা ধরে আরেক হাতে তার কাটা মাথাটি নিয়ে রুমে ঢুকছে। তুহিন বালিশটাকে বুকে চেপে চোখ বড় বড় করে বিড়বিড় করে বলছে, “এটা কল্পনা, এখনি সব ঠিক হয়ে যাবে।”

সজিব তার কাটা মাথা নিয়ে রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছে। তা দেখে তুহিন একটু স্বস্তি পেল। যাক বাবা, বাঁচা গেল। রান্না ঘরে গিয়ে সজিব রান্না করে খেয়ে চলে গেলেই হবে।

বুড়ির ভিটা থেকে সজীবের লাশ উদ্ধার হলেও এলাকাবাসী কেউ মুখ খুলেনি। কেউ জানেনা সজীবকে কে খুন করেছে। তুহিনও মুখ খুলেনি যে, তাকে দিয়েই সজীবকে ডাকানো হয়েছে। ভাগ্যিস আর কেউ দেখেনি তুহিন ডেকে এনেছিল সজীবকে। তাহলে তাকেই সাক্ষী দিতে হত পিন্টুর বিরুদ্ধে। আর যে ভয়ংকর এই পিন্টু। জেল থেকে পিন্টু জামিনে বেরিয়ে নির্ঘাত তুহিনকেও জবাই করত।

সজীব রান্না ঘর থেকে মাছ কাটার বড় বটি নিয়ে ফিরে এল। একহাতে কাটা মাথার চুলে ধরে আছে, আরেক হাতে বটি। গলা আছে, মাথা নিজের হাতে। পা নেই, কোমড় দিয়ে হাটে। এর চেয়ে ভয়ংকর আর কী হতে পারে। তুহিন আবারো বালিশ বুকে চেপে দেয়ালের দিকে সরে যাচ্ছিল। বিছানায় উঠে এল সজিব। একদম তুহিনের কাছে চলে এল। তুহিন আবার চিৎকার শুরু করল। “এটা আমার কল্পনা, এটা স্বপ্ন। চলে যাও তুমি, আমার কাছে কী চাও?”
সজীবের কাটা মাথাটি সামনে এল। কাটা মাথা থেকে তুহিনের শরীরে রক্ত পড়ছে। কাটা মাথার মুখ থেকে কথা বের হচ্ছ। “আমাকে যে খুন করেছে তুই তাকে চিনিস। তোকে আমার খুব দরকার। আমি একা ওদের কিছু করতে পারছিনা। তোকে মরতে হবে। আমার মত কাটা মাথা নিয়ে ঘুরতে হবে।”

তুহিন কান্না করে দিল। বলছে, “আ-মা-র, আমার কোনো দোষ নেই। পিন পিন্টু ডাকতে বলেছিল। আমাকে ছেড়ে দে। আমি বাঁচতে চাই। মা, সজীব আমাকে মেরে ফেলবে।”

তুহিনের কথাগুলো ঘরের চার দেয়ালে আটকে রইল। সজীব নিজের মাথা একটু দূরে নিয়ে ডান হাতে বটি কাছে নিয়ে এল তুহিনের। কাটা মাথা থেকে আবারো বিড়বিড় শব্দ আসছে, “তবুও তোকে মরতে হবে। পিন্টু আর তাদের সহযোগীদের মারতে তোকে আমার দরকার। তোর মাথাটা আমার খুব দরকার। দে মাথাটা দে ”

বটির এক কোপে তুহিনের মাথাটি ফ্লোরে গিয়ে পড়ল। তুহিনকে সজীবের লাশের মত তিন টুকরো হতে হয়নি। তবে মাথাটি আলাদা হয় গেছে।

সজীবের মাথা থেকে কথা বের হচ্ছে মুখ দিয়ে অট্টহাসি দিয়ে। “হা হা, আমার মাথার মত আরেকটি মাথা। আয় এবার আমরা যার জন্য খুন হয়েছি তার কাছে যাব। আয়, আমাদের আরো কাটা মাথা দরকার।”

পরদিন রাতে সজীবের সাথে তুহিনও বেরিয়ে পড়ল। তুহিনের পা আছে। মাথাটি এক হাতে নিয়ে সজীবের পেছন পেছন যাচ্ছে। দুইজনের হাতে নিজেদের দুটি কাটা মাথা। তাদের আরো কাটা মাথা দরকার।

তুহিন ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠল। এত বড় আর এত ভয়ংকর স্বপ্ন সে কখনো দেখেনি। সজীবের খুন হবার পর থেকে তুহিনের একটা রাতও ভালো কাটেনা। প্রতিনিয়ত ভাবে, এই বুঝি সজিব প্রতিশোধ নিতে ছুটে আসছে। তুহিন যদি সজীবকে সত্যি কথাটা বলত, কে তাকে বুড়ির ভিটায় যেতে বলেছিল। তাহলে হয়তো সজীব সেখানে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে যেত। অন্তত পিন্টুর হাতে তাকে মরতে হতোনা।

তুহিন নিজেকে অপরাধীও ভাবছে আর প্রতিনিয়ত এমন ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখে যাচ্ছে।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত