নীল নির্জনে

নীল নির্জনে

কিশোরীবেলা থেকেই লাল রঙটার উপর বড্ড রাগ বিয়াসের।হবে নাইবা কেন! ছটফটে প্রাণশক্তিতে ভরপুর বিয়াস তখন অষ্টম শ্রেণীতে পাঠরতা।ঋতুকালীন অবস্থায় মাঝেমধ্যেই তলপেটে অসহ্য ব্যথা হত ওর।প্রথম প্রথম এরকম অনেকেরই হয় মনে করে ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।ওই টুকটাক ওষুধ খেয়ে ব্যথা চাপা দিয়েই চলছিল।কিন্তু একদিন চোখের সামনে সব অন্ধকার, এরকম ব্যথা হতে হতে জ্ঞান হারায় বিয়াস।তারপর ডাক্তার,ওষুধ,নার্সিংহোম কিছু বাকি থাকেনি।শেষমেশ নানা পরীক্ষানিরীক্ষার শেষে ওর ইউটেরাসে ক্যান্সার ধরা পড়ে।ওই অবস্থাতে ইউটেরাস কেটে বাদ দিতে হয় ডাক্তারদের পরামর্শে।ছটফটে মেয়েটা তখন অনেকটাই শান্ত এসবের ধকল নিতে নিতে।সাধ্যসাধনা করে বিয়াসকে বাঁচানো গেলেও সন্তানধারণ করার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়েছিল ও।কোনদিন ও মা হতে পারবে না জেনেও কোন পুরুষ বিয়ে করবে ওকে?

মনের গভীরে সেই ভাবনা আর অভিমানবোধ থেকেই লালসিঁদুর,লালআবির খেলার কথা উঠলেই শরীর কুকড়ে আসে বিয়াসের। সবার জীবনে লাল রং যখন প্রেমের রং ওর কাছে সেটা একটা ভীতির কারণ।তাই প্রতিবারের মত দোলের দিনে চিলেকোঠার ঘরেই লুকিয়ে থাকে বিয়াস।কিছুক্ষণ পর দরজায় খুটখুট আওয়াজ। হটাৎ কে এলো ওর এখানে,সকলে তো জানে ও রং খেলেনা।খানিকটা বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে ও দেখে সদ্য কলেজে পা দেওয়া বিয়াসের বড়দার বন্ধু পরমদা দাঁড়িয়ে আছে।ওকে দেখে বলে,”একবার বাইরে আসবি প্লিজ?”

ওর কথার মধ্যে কি এমন একটা ব্যাপার ছিল মন্ত্রমুগ্ধের মত দরজা খোলে বিয়াস।পরম এসে ওর কপালে ছুঁইয়ে দেয় একমুঠো নীল আবির।তারপর বিয়াসের হাত ধরে বলে,”ভয় পাস কেন এত?লাল রং ছাড়াও তো রঙিন হওয়া যায় নাকি! পুরানে শ্রীরাধাও তো নীলাম্বরী শাড়ি পরেই অভিসারে যেতেন।এবার চল রে পাগলি আমার সঙ্গে।বাকি জীবনের প্রতিটা দোলের দিন তোর সাথেই কাটাব।”এইপ্রথম দোলে ভালোলাগার আবেশ ছড়িয়ে পড়ে বিয়াসের চোখেমুখে ওর প্রিয় নীল রঙ আর পরমকে সাথী করে।একটু পরে অস্ফুটে ও বলে,”কিন্তু পরম আমি তো কোনদিন মা হতে পারব না, তোমার বাড়িতে কেউ কি সেটা মেনে নেবে।”

বিয়াসের হাতে ভরসার হাত রেখে পরম বলে,”চিন্তা করিসনা আমি নিজেও আমার মা বাবার দত্তক সন্তান।বড় হবার পর কথা প্রসঙ্গে সেটা জেনেছি।কিন্তু ছোট থেকে কোনোদিন মায়ের স্নেহ ভালবাসা আর বাবার শাসন মিশ্রিত আদরে কোনোদিন মনে হয়নি ওরা আমার পর।তাই তোর অবস্থা ওদের থেকে ভালো আর কেউ বুঝবেনা।আমরাও ওদের মত কাউকে একজন নিজের মত গ্রহণ করব বুঝলি?এবার একটু তো হাস গজদাঁতের হাসিতে তোকে যে বড্ড মানায়।”

সাত বছর আগে এই ঘটনার পর আজ দুজনেই সুপ্রতিষ্ঠিত জীবনে।গত ফাল্গুনে শুভপরিণয় সুসম্পন্ন হয়েছে ওদের।অফিস কাছারি এইসময় কদিন ছুটি থাকে বলে দোলের সময়টাকে মধুচন্দ্রিমা উদযাপনের জন্য বেছে নিয়েছে ওরা।গন্তব্য নীল সমুদ্রের রানী আন্দামান। আদিগন্ত নীল সমুদ্রের বুকে ক্রুজে ভাসতে ভাসতে পরম বলে,”কিরে বিয়াস দুজনের ভীষণ প্রিয় নীল রংটাই তাহলে মিলিয়ে দিল আমাদের কি বল?” নীলনির্জনে লজ্জায় রাঙা হয়ে পরমের বুকে মুখ লুকায় বিয়াস।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত