মা

মা

আম্মা মারা যাওয়ার কিছুদিন পরেই আব্বা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে।আমি পরিবারের বড় সন্তান।আব্বা তাড়াহুড়ো করে দ্বিতীয় বিয়ে করার কারন হচ্ছে,আমার ছোট বোনের জন্ম হবার সময়-ই আম্মা মারা গিয়েছে।এতো বড় দূর্ঘটনা ঘটে যাবে,এটা আমি ভাবতেই পারিনি।আমার ছোট বোনের মুখ আজ অবধি আমি দেখিনি,ঘেন্নায়।আমার কাছে মনে হতো,মা কে ওর কারনেই হারিয়ে ফেলেছি। মেয়েটা আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে,দুই পা আর হাতের উপর ভর পুরো ঘরে ঘুরে বেড়াই।আমার রুমের দরজা লাগিয়ে রাখি। আব্বা বিয়ে করার পর,ঘরের কারো সাথেই প্রয়োজন ছাড়া তেমন কথা বলিনা। খাবার দাবার নিজের হাতেই বেড়ে খাই,নতুন মা খাবার বেড়ে ডাকলে সেদিন আর খাওয়াদাওয়া করিই না।

আব্বা নিজে এসেই আমার সাথে কথা বলে।উনি কখনোই চায়নি বাবা-ছেলের সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব তৈরী হোক।কিন্তু,আমি অনেক আগ থেকেই সবার সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছিলাম। যেই কারনে আজ অবধি কারো সাথেই তেমন কোন কথাই বলিনা। প্রতিদিন রুম থেকে বের হয়ে আবার যখন বাসায় ফিরি,তখন এসে আমার রুম খুব সুন্দর করে গোছানো আর পরিপাটি দেখতে পেতাম। আমার কাছে সবসময়’ই মনে হতো,ওই মহিলা আমাকে সিম্প্যেথী দেখাচ্ছে।

আমার ছোট বোনের জন্মদিন হিসেবে আজকের তারিখ মনে না থাকলেও,আম্মার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী হিসেবে আজকের তারিখ আমার মনে আছে। সারাদিন শুয়ে শুয়ে আম্মার জন্য কেঁদেছি,কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখলাম,পরীর মতো একটা ছোট্ট মেয়ে আমার মাথার দিকটায় বসে আছে।

আমি উঠে বসলাম,মেয়েটি আমাকে ‘দাদাভাই,দাদাভাই’ বলে ডাকছে।কী সুন্দর দেখতে মেয়েটি,তার দিকে তাকিয়ে আমি দ্বিতীয়বার চোখ সরাতে পারছিলাম না।আমি ওর দিকে তাকিয়ে কিচ্ছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়েই ছিলাম।কি আশ্চর্য!

অবিকল দেখতে আমার মায়ের মতো।সে কতোকথা বলছে,ওর কথা তেমন একটা বোঝা যাচ্ছিলো না।তবুও,আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেই যাচ্ছিলাম।আমি নির্বাক শ্রোতার মতো ওর ঠোঁটে আটকে থাকা কথাগুলো শুনছিলাম।
আমি ওকে কোলে নিতেই ও কেমন জানি বুকের সাথে লেপ্টে গিয়েছে।কোন নড়চড় নেই,কোন কথা নেই,শুধু ওর ছোট্ট নিঃশ্বাসের বাতাস আমার গলায় লাগছিলো ইদানীং আমার নতুন মা ওকে টোপ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।খাবার সময় হলেই ওকে আমার রুমে পাঠায়,আমাকে বাধ্য হয়েই ডাইনিং টেবিলে যেতে হয়।আমার হাতে খেতে চায়,আমি ওকে খাইয়ে দিই।

আস্তে আস্তে জানতে পেরেছি,আব্বার দ্বিতীয় স্ত্রী কোনদিন সন্তানের মা হতে পারবে না।আব্বা সবকিছু জেনেশুনেই এমন একজন মহিলা কে বিয়ে করেছে যে কোনদিন মা হতে পারবে না।আব্বা এটা কেন করেছে,সেটা বুঝতে আমার আর দেরি হলোনা।আব্বা চেয়েছিলেন যাতে আমার ছোট বোন আর আমার কোন অযত্ন-অবহেলা না হয়।
আমার কাছে মনে হচ্ছিলো,যেই মহিলা কোনদিন আর সন্তানের মা হতে পারবেন না,তার সাথে এতোদিন আমি অনেক বড় অন্যায় আচরন করে ফেলেছি।আমি তিনবছর পর এই প্রথম,আব্বার রুমে গেলাম।গিয়েই মা বলে ওই মহিলা কে ডাক দিয়েছি।

উনি আমাকে বুকে জড়িয়ে অনবরত কাঁদছেন।আমার ছোটবোন খুবই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে,বারবার আমাকে জিজ্ঞেস করতে চাইছে,আম্মু কাঁদছে কেন! আমি ওকে কোলে নিয়ে বললাম,তুমি যে আম্মুকে আদর করোনা সেইজন্য কাঁদছে।ও আমার কোল থেকে নেমেই,আম্মা কে আদর করতে শুরু করলো।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত