তোমাতে রয়েছি আমি

তোমাতে রয়েছি আমি

কবিতার বইটা আজই শেষ করা চাই কবিতার । বইমেলা থেকে কিনেছে । গোগ্রাসে গিলছে প্রতিটি লাইন । বেশিক্ষণ নয় দু ঘন্টার মধ্যে ফিনিশ করলো । কবিতার চোখের সামনেই যেন পরিষ্কার হচ্ছে কবি কোন আগুনের মধ্যে দগ্ধ হয়ে এমন কবিতাগুলোর জন্ম দিয়েছে – স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে কবিতা ।

জল খেয়ে বিছানায় একটু এলিয়ে দিলো নিজেকে । পাশে ওল্টানো বইটা – বড় বড় করে সোনালী অক্ষরে লেখা ‘ চিরকুটের কবিতা সমগ্র ।’ ক্ষীণ শব্দে দূরে ট্রেন চলার শব্দ টেনে নিয়ে যাচ্ছে অতীতে ।

কবিতার ভালো নাম সুনয়না । তবে ও কবিতা বলেই ডাকতো । ও চেয়েছিল কবিতার কবি হতে । কেউ কবি বললেই ও বলতো প্লিস কবি বলিস না । ভালো লাগে তাই লিখি । ওসব কবিটবি কিছু না । ওসব আলোকবর্ষ দূরে । আকাশ জানে কবিতাই হচ্ছে তার আসল কবি । কবিতাই জন্ম দেয় নতুন নতুন কবিতার । সে নিজে তো একটা নিমিত্ত মাত্র , মাধ্যম মাত্র । সেদিন দুপুরে কলেজ ছুটির পর সুনয়না একান্তে ডাকলো আকাশকে ।

– ভালোই তো কবিতা লিখছিস ।
– হ্যাঁ ওই আর কি একটু আধটু ।
– তা এই শিক্ষকদিবসে একটা কবিতা পাঠ করতে পারিস তো ।
– হ্যাঁ করলেই হয় । বেশ ঠিক আছে দেখছি ।

ব্যাস এটুকুই , আর কোনো কথা হয়নি সেদিন । দেখতে দেখতে এলো ৫ সেপ্টেম্বর , কবিতা পাঠ করলো আকাশ । ক্লাস জুড়ে আকাশের বাহবা দিলো সবাই । কেউ কেউ বলছে ভাই এবার পত্রিকায় যোগাযোগ কর কেউ বলছে অমুক ব্লগে লেখা পাঠা এসব শুনতে শুনতেই বেশ দারুণ কেটে গেল আকাশের । রাতে একটা ছোট্ট মেসেজ দিলো সুনয়নাকে । ‘ অনেক ভালো লাগলো আজকের দিনটা । থ্যাংকস । তুই না বললে এটা সম্ভব ছিল না ।’
তারপর আর থেমে থাকেনি । স্বভাবতই যৌবনের হাওয়া পালে লাগিয়ে তরী তখন ছুটছে খরস্রোতে । ক্লাস কামাই করে ঘোরাঘুরি ক্যান্টিনে আড্ডা বিকেলে নদীর পাশে হাতে হাত রেখে গল্প । কিছুই বাদ যায়নি । এসবের পরও নিত্যনতুন কবিতা লিখে উপহার দেয় আকাশ । কবিতা যে খুব ভালো লাগে কবিতার তা নয় । কিন্তু আকাশের কবিতা পড়ে কবেই যেন ভালোবেসে ফেলেছে । মাঝে মাঝে সুনয়না বলেই ফেলে

– আমি তোকে নয় তোর কবিতাকে ভালোবাসি ।
– তাতেও কোনো ক্ষতি নেই । তোর চোখে দুটো আলাদা হলেও আসলে কিন্তু একটাই জিনিস । বলে হাসে আকাশ ।
– কি যে বলিস তুই বুঝিনা । বলে আকাশের কাঁধে মাথা রাখে আকাশের কবিতা ।

এভাবেই হাসিখুশি প্রেম ভালোবাসা দেখতে দেখতে তিনবছর পার করে ফেললো । কিন্তু ওই যে ঘড়ির কাঁটা বদলায় মানেই সময় বদলায় । প্রেমের জোয়ারে তখন একটু একটু ভাঁটা শুরু হচ্ছে কারণ সুনয়নার বিয়ের সম্বন্ধ আসতে শুরু করেছে । ওরা দুজনেই তখন সবে গ্রাজুয়েট । একটা চাকরি জোগাড় করতে মিনিমাম একবছর তো লাগবেই লাগবে । তাও যদি খুব কপাল ভালো হয় তবেই । একটা চাকরি ছাড়া ওর বাড়ি থেকে মেনে নেবে না সেটা আকাশ ভালো করেই জানে । আর সত্যিই তো তাই প্রেম ভালোবাসায় তো আর পেট ভরে না ! পেট ভরে টাকা থাকলে । কবে কি কোথায় চাকরি পাবে সেটাও তো কোনো ঠিক নেই , আদৌ পাবে কিনা সেটা নিয়েও সংশয় । যদিও সুনয়না বলছিল যে বাড়িতে বলে যদি একবছর সময় চেয়ে নেওয়া যায় । কিন্তু আকাশই বাধা দিল । ও জানে ওর এই ছন্নছাড়া জীবনের সাথে সুনয়নার জীবন গুলিয়ে না ফেলাই ভালো । শুধু শুধু ওর জীবনটা নষ্ট করে লাভ নেই । নাহলে এই প্রফেসরটা হাতছাড়া হয়ে যাবে ।

– তোর কষ্ট হচ্ছে না আকাশ ?
– কই না তো । যাইহোক সবশেষে তোর হাসিমুখটা দেখতে পেলেই আমি খুশি রে । আর তাছাড়া আমার সাথে তো তুই সবসময় আছিস কবিতা হয়ে । কবিতা নামটা এমনি এমনি দেওয়া নয় । অনেক কারণ আছে বুদ্ধু ।
– এসব ফিল্মি কথা বলতে তোর ইচ্ছে করছে এখন ? চোখ ছলছল কবিতার ।
– নারে সত্যি বলছি । দেখিস তোর জন্যই আমি বাঁচবো অনেকদিন । আমি আজীবন বাঁচবো সুনয়নাকে ছাড়া কিন্তু আমার কবিতাকে নিয়ে । তুই প্লিস ভুলে যাস আমায় । দেখবি ও তোকে খুব ভালোবাসবে । কোনো কিছুর অভাব রাখবে না ।

– চুপ কর আকাশ । জড়িয়ে ধরলো সুনয়না । বর্ষার মরসুমে ঝর্ণা তখন তীব্র বেগে নামছে চোখ থেকে । আকাশের চোখে একটা ছোট হিরেবিন্দু ।

সম্পর্কের ইতি টানতে অনেকটা সময় লেগেছিল । বুকে পাথর নিয়ে ওর কবিতাকে বুঝিয়েছিলো যে শুভর কাছেই ভালো থাকবি । বহু ঝুটঝামেলার পর অনেক কষ্টে সুনয়না বাধ্য মেয়ের মত কথা শুনেছিল আকাশের । ব্যাস তারপর থেকে আর যোগাযোগ রাখেনি দুজনেই । বাস্তবের কাছে হেরে গেছিলো তারা । আসলে হার স্বীকার করেছিল বিনা যুদ্ধেই । আজ ভালো আছে কবিতা । আরেহ না না , কবিতা তো শুধু আকাশের । শুভর কাছে সুনয়নাই । সেদিন ওরকম ভাবে আকাশকে না ছেড়ে এলে জানতেই পারতো না যে পৃথিবীতে কত রকমের মানুষ আছে । শুভর কাছে কেরিয়ার যতটা গুরুত্বপূর্ণ ততটাই সুনয়না । ঘরবাড়ি গাড়ি স্বামী আর মেয়েকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কেটে যায় তার । সুনয়নার ম্যাগাজিন পড়ার অভ্যাসটা আকাশের দেওয়া । মাসের শেষে নিজে গিয়ে নিয়ে আসে পত্রিকালয় থেকে । সুচিপত্রতে খোঁজে চেনা নামটা । পায় না খুঁজে । হতাশ হয় । মাঝে মাঝে ভাবে অন্য কোনো ছদ্মনামে লেখে না তো ! ও তো বলেছিল একটাই ছদ্মনাম সেটা হলো চিরকুট । নাকি কলমের নিব ভেঙে পালটে গেছে ওর জীবন ! একটা ঝোড়ো হাওয়া তোলপাড় করে দিতে চাইছে কিন্ত যে করেই হোক সামাল দিতে হবে । না আর পেছন ফিরবে না সুনয়না ।

সেদিন রুহি বইমেলা যাওয়ার জন্য খুব জেদ করলো ।
– মা আমি যাবোই । টিনটিন আর স্কুবিডুবি কিনবো । বলে কাঁদতে লাগলো ।
অগত্যা কি আর করা যায় । ঠিক হলো যাওয়ার দিন । সপরিবারে রওনা । বইমেলাতে এই প্রথম আসা । চারিদিকে এত্ত বই দেখে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিল না । এখানে সেখানে উন্মাদের মত ঘুরছে সুনয়না । মেয়েকে দুটো কমিকস কিনে দিয়ে শুভর হেফাজতে রেখে এসেছে । আচ্ছা এত উতলা কেন হচ্ছে ও ! ও কি এখানে খুঁজছে পরিচিত কলমকে ! নাকি পরিচিত মুখটাকে ! ও তো বলেছিল কোনো বইমেলা মিস করে না ! আজ যদি একবার ভুল করে দেখা হয়ে যায় ! সেই পুরোনো অতীত মুখ থুবড়ে পড়বে আবার জনস্রোতের মাঝে । না থাক । যা অতীত তার সম্মুখীন আর হতে চায় না ।

গটগট করে হেঁটে কোনরকমে বেরিয়ে যাচ্ছিল সুনয়না । হঠাৎ কেউ যেন ডাক দিল । পেছন ফিরে তাকাতেই এক অপরিচিত মুখ ।

– দিদি আপনাকে ডাকছে ওই ৫৭ নম্বর স্টলের এক ভদ্রলোক । ওই যে চারুলতা প্রকাশনী ।
– আমাকে ?
– হ্যাঁ । ওই যে ওদিকে ৫৭ নম্বর । বলে আঙ্গুল বাড়িয়ে দেখিয়ে দিল ।
স্টলের সামনে এসে হতচকিত সুনয়না । এ সে কাকে দেখছে ! এ তো তাদের ক্লাসমেট রমেশ ।
– কি রে খবর কি । তোকে ডাকছি তুই না শুনেই পালিয়ে যাচ্ছিলি তো !
– আরে না না । আসলে শুনতে পাইনি রে ।
– ঠিক আছে ঠিক আছে । বেশি কথা বাড়াবো না । এই যে প্যাকেটটা ধর । এখানে একটা বই আছে । বাড়ি গিয়ে

খুলবি। পড়ে দেখিস । কেমন লাগলো জানাবি কিন্তু । এই চারুলতা প্রকাশনীটা আমারই । নাম্বার দেওয়া আছে । বেশ বেশ যা তুই , ব্যস্ত আছিস ।

সুনয়না কোনোরকমে বেরিয়ে এল । আসলে বেরোনোর জন্যই ছটফট করছিল । কখন আকাশের কথা উঠে আসবে। একটা বাজে ব্যাপার হয়ে যেত ।
– কি গো । এত দেরি হলো । কখন থেকে ওয়েট করছি ।
– কিছু মনে কোরো না প্লিস । বই দেখতে দেখতে বুঝতে পারিনি ।
– রুহিকে ধরো । আমি গাড়িটা পার্ক করে নিয়ে আসি ।
– ঠিক আছে যাও ।

রুহিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুনয়না , ঘুমিয়ে পড়েছে ও । আর কত ঢাকা রাখবে আকাশকে ! কত মিথ্যে বলবে শুভকে !

গাড়িতে ফিরতে ফিরতে মনে পড়ছিল বারবার আকাশের কথা । না এভাবে কোনোদিন মনে পড়েনি । সবকিছু থেকেও কিছুই যেন নেই আজ তার কাছে । বারবার আকাশের ওই পাতলা চেহারা , মুখে সর্বদা হাসি ছবিটা ভেসে উঠছে । ওরা যখন বাড়ি ফিরলো তখন পশ্চিম আকাশে সূর্য পরম নিশ্চিন্তে হেলান দিয়ে চোখ বুজবো বুজবো করছে।

গাড়ি থেকে নেমে সুনয়না এগিয়ে গেল মেয়েকে নিয়ে ।
– শোনো না , আমার অভিকের বাড়িতে অফিসের একটা কাজ আছে । এক ঘন্টার মধ্যে ফিরছি । ঠিক আছে ?
– বেশ । সাবধানে যেও ।
গাড়ি ঘোরাচ্ছে শুভ । সুনয়না দাঁড়িয়ে । একটু এগিয়ে গাড়িটা থেমে গেলো ।
তোমার একটা বই রয়ে গেছে তো । শুভ বললো ।
ও হ্যাঁ । তাই তো , যেটা রমেশ দিয়েছে ।
– তুমি দাঁড়াও । আমি নিয়ে আসছি ।

এগিয়ে এসে শুভ দিয়ে গেল । কপালে একটা চুমু দিয়ে বললো তাড়াতাড়ি ফিরছি । সুনয়নার ঠোঁটে একটু হাসি ।
মেয়ে আর কাগজে মোড়ানো বইটা নিয়ে ঘরে ঢুকলো । মেয়েকে শুইয়ে দিয়ে চটজলদি ফ্রেশ হয়ে টেবিলল্যাম্পের আলোয় প্যাকেটটা খুলছে । কি এমন আছে যে ওখানে খুলতে বারণ করলো রমেশ ! বইটা দেখে সুনয়নার চক্ষু চড়কগাছ । হ্যাঁ সারপ্রাইজই বটে । আকাশের লেখা বই । ওপরে বড় বড় সোনালী অক্ষরে লেখা ‘ চিরকুটের কবিতা সমগ্র ।’

ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগলো । বইটার শেষ পাতা উল্টোদিকে চারুলতা প্রকাশনীর নীচে যে ফোন নাম্বারটি দেওয়া আছে ওতে কল করলো ।

– এটা কি চারুলতা প্রকাশনী ?
– হ্যাঁ বলুন ।
– একটু রমেশ চৌধুরীর সাথে কথা বলা যাবে ? জরুরি ছিল । ও আমার ক্লাসমেট ।
– একটু হোল্ড করুন ম্যাডাম ।
একটু একটু করে বুকের ধুকপুক বাড়ছে সুনয়নার ।

– কে ?
– আমি সুনয়না । আকাশের সাথে তোর যোগাযোগ আছে ?
– ও । আমি জানতাম তুই ফোন করবি । তুই চলে যাবার পর আকাশ আরো বেশি করে আরো এমন এমন কবিতা লিখতো যে সেগুলো সাধারণ চোখে বিচার করা দুর্বিষহ । ওর ভাবনাচিন্তা অবাক করে দিত । ও আমাদের সামনে কোনোদিন চোখের জল ফেলেনি । একটা বন্ধ ঘরে নিজেকে আটকে রেখে দিনের পর দিন শুধু কলম চালিয়েছে । অন্য অনেক প্রকাশনী বিশাল অঙ্কের অফার দিলেও ও শুধু আমার সাথেই যুক্ত ছিল । জীবনে অনেকরকম মানুষ দেখেছি কিন্তু আকাশ সম্পূর্ণ আলাদা । প্রথমদিকে বিভিন্ন খবরের কাগজে লিখতো । কিন্তু পরে মনস্থির করলো তোকে একটা বই উপহার দেবে । তাই খবরের কাগজে লেখা ছেড়ে দিলো ।
রমেশকে থামিয়ে সুনয়না জিজ্ঞেস করলো

– ও কোথায় থাকে ? ওর ফোন নাম্বারটা দে না আমায় একবার ।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ।
– বেশ কয়েকবছর একসাথে কাজ করার পর আকাশ একদিন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল । কেউ কিছু খবর দিতে পারলো না । ফোন নাম্বারটাও লাগে না । তারপর অনেকদিন পর খবর এলো ও নেই আর । রাস্তায় অন্যমনস্ক ভাবে চলার সময় গাড়ি এসে ধাক্কা দেয় ওকে । হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ারও দরকার পড়েনি । তবে যাওয়ার আগে আমাকে বইটা দিয়ে গেছিলো । বলেছিল যদি কোনোদিন দেখা হয় তোর সাথে বইটা দিয়ে দিতে।

রমেশ বলে চলেছে আরো অনেক কথা । কিন্তু ঢুকছে কই সুনয়নার কানে ! আকাশ ঠিকই বলেছিল সুনয়নাকে ছাড়াই কবিতার মধ্যে বেঁচে থাকবে আজীবন । এখন আকাশকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে চিনতে পারছে কবিতা । এতদিনের শুভর সংসারে কোনো কিছুই অভাব বোধ করেনি সে । কিন্তু আজ মনে হচ্ছে ভালোবাসার যোগসূত্রটা সেদিন জোর করে ছাড়িয়ে নিলেও কিছুটা রয়ে গেছে । আর সেটাই আরো একবার দৃঢ় হচ্ছে । অনেকেরই কানে আসে কাছে থাকলেই নাকি ভালোবাসা দূরে গেলেই তা উধাও ! কবিতার প্রতি আকাশের টান ভুল প্রমাণিত করেছে । কবিতার দুই চোখের ফাটল দিয়ে ঝরছে দুধরনের জল । একচোখে আকাশকে না বোঝার অন্যচোখে নিজের মধ্যে আকাশকে খুঁজে পাওয়ার ।

বিছানায় সুনয়নার বন্ধ চোখের ভেতর বারবার ভেসে উঠছে সেই হাসি কান্না খুনসুটি অভিমানের দিনগুলো । প্রতিটা লাইনে প্রতিটা অক্ষরের অনুভবে আজ আকাশ ওরফে কবিতার কবি ওরফে চিরকুট ।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত