মুখোস

মুখোস

রাত তখন প্রায় এগারো টা। কলিং বেলটা বেজে উঠলো। চমকে উঠলো রুপু। আজ একরাশ টেনশন নিয়ে বাড়িতে রয়েছে সে আর তার শাশুড়ি মা।

ঘন্টা খানেক আগে হসপিটাল থেকে ফোন এসেছে । শ্বশুর মশাইয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। অফিস থেকে হসপিটাল ঘুরে তখন সবে বাড়ি ফিরেছে কুনাল । ফোন পেয়ে আবার ছুটে বেরিয়ে গেছে সে। রুপু সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মা একা থাকবে বলে কুনাল সাথে নেয়নি। রুপুর কুনালের কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছিল । প্রচন্ড মানসিক চাপে আছে সে। কিন্তু উপায় কি?একমাত্র ছেলে যখন বাবার জন্য তো এসব করতেই হবে।রুপু বারবার বলল,

” দিদিভাই কে ফোন করি সুমিতদা যদি তোমার সঙ্গে যেতেন।”
কুনাল তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল যাবার সময় বলে গেল,
” চিন্তা কোরো না আমি সুমিত দার সাথে কথা বলে নিচ্ছি। ”
বাবার অবস্থা সত্যিই খুব সিরিয়াস। মা কে সবটা না বললেও ওরা জানে আশা কম।

এতরাতে বেলের আওয়াজ পেয়ে রুপু ভয় পেল। দরজা খুলে দেখল সুমিত দা।একটু চমকে ওঠে সে। কি ব্যাপার সুমিত দা হসপিটালে যাওয়ার বদলে এখানে এলেন কেন?

মানুষ টাকে এমনিতেই রুপুর খুব একটা পছন্দ নয়। প্রথম দিন থেকেই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অন্য কিছু জানান দিয়েছে।কোনমতে রুপু বলল,

“আপনি এখন।কুনাল ফোন করেনি?”

একটা অদ্ভুত হাসি হেসে সুমিত দা বলল,
“হ্যাঁ করল তো। আমাকে হসপিটালে যেতে বলল ।
কিন্তু ভাবলাম তোমরা একা আছো একবার দেখে যাই।”

মানুষটা ঠিক কি বলতে চাইছে বুঝতে পারলোনা রুপু। তবে একটা অশনি সংকেত ভেতরে টের পেল সে।
“আরে ভেতর তো আসতে দাও।মা কোথায়? তোমাদের খাওয়া হয়ে গেছে?”

রুপু কে সরিয়ে ভেতরে ঢুকলো সুমিতদা ।

আতঙ্কিত হয়ে রুপু চাপা গলায় বলল ,
“মা কিন্তু বাবার সিরিয়াস অবস্থার কথা জানেন না।আপনি যেন–”
“আরে ধুর, আমি ওসব বলবো নাকি। একবার দেখা করে আসি । তুমি এখানে বসো আমি আসছি।”

এই শীতের রাতে রুপু ঘামতে শুরু করে। কেমন একটা বিপদ যেন ধীরে ধীরে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে তারদিকে।কি করা উচিত বুঝতে পারছে না সে।একবার ভাবলো কুনাল কে ফোন করবে?কিন্তু কি বলবে? সে তো সুমিত দা বলতে অজ্ঞান । বিয়ের এই ছমাসে রুপু ভালোভাবে বুঝে গেছে এবাড়ির পুরো নিয়ন্ত্রণ তার ননদ আর ননদাই এর হাতে। তার শ্বশুর শাশুড়ি কুনাল সবাই সুমিতদার হাতের পুতুল। দিদিভাই আর সুমিতদার পনেরো বছর বিয়ে হয়েছে। প্রোমোটারির ব্যবসা । টাকা পয়সা প্রচুর। তাছাড়া শাসক পার্টির বেশ উঁচু পদে আছে সুমিতদা। অর্থের সাথে সাথে ক্ষমতা ও অনেক। রুপু চিরকাল এই শ্রেণীর মানুষ কে এড়িয়ে চলেছে। কিন্তু এমনই কপাল। যে এ বাড়ির সবাই এমন একটা মানুষের হাতের ঈশারায় চলে। তাকে একেবারে মাথায় করে রেখেছে ।
রুপু মনে মনে ভাবল,

“হে ভগবান এমন বিপদে তো আগে কোনদিন পড়িনি । রক্ষা করো ঠাকুর ।”
তারপর হঠাৎ তার মাথায় এল একটা কাজ করলে তো হয় মায়ের ঘরে গিয়ে বসলে তো হয়। সত্যি সে কেন ড্রইং রুমে বসে আছে । ভেবেই সে পা বাড়ায় মায়ের ঘরের দিকে ।আর তখনই সুমিতদা ঘরের আলো নিভিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

“একি একি রুপু কোথায় যাচ্ছো।মা কে অনেক বুঝিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বলেছি।এখন ওদিকে যেও না ওনার ঘুমের দরকার। এসো আমরা এদিকে বসি।”

হঠাৎ করে রুপুর হাত টা ধরে ফেলল সুমিতদা । এমন সে সবসময়ই সবার সামনেও করে ।অনেক ছোট শালার বউএর সাথে ননদাইয়ের এমন কিছু কারোর কাছেই দৃষ্টিকটু লাগে না। কিন্তু রুপু এই স্পর্শে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনা । কেমন অস্বস্তিতে পড়ে যায় ।

কথা জড়িয়ে যাচ্ছে রুপুর। তবু বলল,

“আপনি হসপিটালে যাবেন না? ও তো একা আছে।খুব চিন্তা হচ্ছে।বাবার অবস্থা মোটেও ভালো না।”

“আরে জানি জানি।ডাক্তার সব বলেছে।কিডনির অবস্থা একেবারে শেষ।বড়ো জোর দু চার দিন। তোমার দিদিভাই তো ডাক ছেড়ে কান্নাকাটি জুড়েছে দিয়েছে।”

বলতে বলতে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল সুমিতদা। কি অবলীলায় কথা গুলো বলে গেল ।যেন এমন কারোর কথা বলছে তাকে সে ভালো করে চেনেই না।সুমিতদার প্রকৃত রূপ মুখোস খুলে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসে রুপুর সামনে ।

তারপর পাশে হাত দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে রুপু কে বলল,
” সুন্দরী এখানে বসো।তোমার সাথে তো গল্প করার সুযোগই পাই না।কুনাল আর একবার ফোন করুক তখন বেরোবো।বাইকে যেতে তো দশ পনেরো মিনিট লাগবে।”

নিজেকে এতটা অসহায় এর আগে কোনদিন রুপুর লাগেনি।মায়ের মুখটা মনে পড়ছে বারবার। কি করে সামাল দেবে সে ।এ বাড়ির কেউই এই মানুষটার এতো জঘন্য রূপ সম্বন্ধে কিচ্ছু জানে না । দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে থাকল রুপু।

“কি হল আমায় ভয় পাচ্ছো না কি।”
পান খেয়ে লাল হয়ে যাওয়া দাঁত বের করে হে হে করে হাসলো সুমিতদা।তারপর হঠাৎ উঠে এক হেঁচকায় রুপুকে পাশে বসিয়ে দিল সুমিতদা।

“একি কি করছেন ।” ফোঁস করে ওঠে রুপু।
কিন্তু রুপুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তার ওপর হিংস্র জন্তুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সুমিতদা ।
নিজেকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে রুপু। কিন্তু পশুর শক্তির কাছে পারবে কেন সে। মুহূর্তে কি সবকিছু চুরমার হয়ে যাবে। এক অসহায় হরিন শিশুর মতো সুমিতের বাহুবন্ধনে ছটপট করতে থাকে রুপু।

এমন সময় সুমিতের মোবাইল টা তীব্র আওয়াজে বেজে ওঠে। একটু অসচেতন হয়ে ফোন টা বার করতে যাবে সেই সুযোগে রুপু কোনমতে বাঁ দিকের টেবিলে রাখা ফুলদানি টা হাতে নিয়ে সজোরে আঘাত করল সুমিতের মাথায়। তারপর হাত ছাড়িয়ে এক দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা দিল রুপু।

অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকল রুপু।হৃৎপিন্ড টা যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে তার। সারা শরীর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে ।

দড়াম করে ভীষণ জোরে দরজা বন্ধের আওয়াজ পেল রুপু। বুঝল শয়তান টা বেরিয়ে গেল। এবার বিছানায় পড়ে হাউ হাউ কেঁদে ওঠে রুপু। সত্যি কত অসহায় আজও মেয়ে রা।বাড়ির ভেতরেও পদেপদে বিপদ তাদের। মনে পড়ছে কুনালের দিদির মুখটা।সে কি সত্যিই নিজের স্বামী কে এত দিনে ও চিনতে পারেনি।নাকি ছেলে মেয়ের দোহাই দিয়ে সব জেনেও মেনে নিয়েছে সবটা। কুনাল কে সবটা বলতে হবে। কিন্তু ও তো একবারও ফোন করলনা। একটু ধাতস্থ হয়ে ফোন টা দেখল রুপু। অনেকবার ফোন করেছে কুনাল ।কথা বলার মতো অবস্থায় সে নেই।
বলতে বলতে আবার ফোন টা বেজে উঠলো। হ্যালো বলতেই কুনাল বলল,
“কি ব্যাপার কতবার ফোন করছি। ধরছো না কেন?”
কান্না ভেজা গলায় রুপু বলল

“বাবা কেমন আছেন?”
“ভালো নয়।একই রকম।ভেন্টিলেশনে দেবে বলছে।কিন্তু এদিকে আরো একটা খারাপ খবর হয়েছে ।”
“কি?” আঁতকে ওঠে রুপু।
“একটু আগেই সুমিত দার মারাত্মক বাইক অক্সিডেন্ট হয়েছে । হসপিটালের প্রায় সামনেই।”
ফুঁপিয়ে উঠলো যেন কুনাল।
দাঁতে দাঁত চেপে রুপু জিজ্ঞেস করলো ,

“এখন কি অবস্থা।”
“একদম ভালো নয়। বাইক থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়েছে ।পায়ের ওপর দিয়ে গাড়ি চলে গেছে । বাঁচার আশা খুব কম। আর ডাক্তার বলল বেঁচে গেলেও পা দুটো হয়তো বাদ যাবে।”

ফোন টা ইচ্ছে করেই কেটে দিল রুপু।এতক্ষণের প্রবল ঝড়ের পর কি ভীষণ যেন শান্তি লাগছে। একটু আগেই সে ভেবেছিল এত বড় শয়তানটার কি শাস্তি পেলে তার ভেতরের জ্বালাটা একটু কমবে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে এই শাস্তি সে পাবে রুপু ভাবতেই পারেনি। সে শুধু মনেমনে বলল শয়তান টাকে পঙ্গু করে বাঁচিয়ে রেখো ঠাকুর।কত মেয়ের কত সর্বনাশ যে করেছে এই ঘৃণ্য মানুষ টা তার ঠিক নেই। এখন সারাজীবন নিজের কৃত কর্মের ফল দগ্ধে দগ্ধে অনুভব করুক।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত