মাতৃত্বের স্বাদ

মাতৃত্বের স্বাদ

– আজ ঠিক মতো খেয়েছো? অফিস থেকে ফিরতেই প্রথম কথা শুভর।
– অনু একটু হেসে ঘাড় নাড়িয়ে উত্তর দিল হ্যাঁ।
মনে মনে পরম তৃপ্তি অনুভব করলো শুভ।

– এই জানো, “তোমার মেয়ে আজ আমায় মা বলে ডেকেছে”। নোনা বাষ্প ততক্ষণে ঝাপসা হয়ে গেছে অনুর চোখ দুটো।

– শুভ তাদের নিঃসন্তান জীবনকে আনন্দে ভরিয়ে দেওয়া র জন্য ভগবান কে মনে মনে ধন্যবাদ জানাল।

কাল মিঠির জন্মদিন।মেয়ের জন্মদিন বলে, না না রকম প্ল্যান করে ঘুমোতে ঘুমোতে অনেক রাত হলো। ঘুমিয়ে থাকা মিঠির দিকে তাকিয়ে, অনুর মনে পড়ে যায় পুরোনো দিনগুলো।

শুভ আর অনু একই স্কুলে পড়ত। শুভ র থেকে অনু পড়াশোনায় বেশি ভালো ছিল। শুভ র তা নিয়ে গর্বের শেষ ছিল না। কলেজে ওঠার পর ও দুজন কলেজ চেঞ্জ করেনি। তাদের দুজনের ভালোবাসা ছিল ছোটবেলার। কলেজে সবাই তাদের লাভ-বার্ড ডাকত। তাদের ভালোবাসা র জোঁট বড় শক্ত ছিল। সময় বয়ে চলতে থাকে, তারা দুজন

সারাজীবনের মতো সাত পাকে বাঁধা পড়ে। বিয়ের প্রথম চারবছর শারীরিক, মানসিক, আর্থিক সব দিক থেকে ই সুখে রেখেছিল শুভ।

শুভ ব্যাঙ্কে চাকরি করতো আর অনু ছিল প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকা। তাদের দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া, খুনসুটি আর ভালোবাসয় ভরা ছিল। কিন্তু তবুও তাদের জীবনে একটা বড়ো অভাব ছিল। শুভ আর অন্যনা সংসার সুখ থেকে বঞ্চিত ছিল।বহু ডাক্তার পরীক্ষা-নীরিক্ষার করেও কিছু লাভ হয়নি। মনে একটা অনেক বড় দুঃখ আর শূন্যতা থাকলেও একে ওপরের প্রতি ভালোবাসায় তাদের কমতি নেই।

কিন্তু শুভর পরিবারে তার বাবা, মা বিয়ের একবছর যেতে না যেতেই নাতি- নাতনীর জন্য আবদার শুরু করে। তাদের দাবী না মেটাতে পেরে অনুকে অনেক কথা শুনতে হয়। অনু বাড়ির শুভ অনুষ্ঠানে যেতে ভয় পেত। কিন্তু শুভ যে সবসময় তার পাশে ছিল, অনুকে সামলে নিত। অনু যেটুকু সময় স্কুলে থাকত, ছোটো বাচ্চাদের সান্নিধ্য উপভোগ করত প্রানভরে। বাচ্চাগুলোর মাঝে থাকতে থাকতে কখন ও, অনুর মা হওয়ার স্বাদ জেগে উঠত। বাড়ি এলেই এক গুমোট পরিবেশ, তার প্রান হাঁফিয়ে উঠতো। একঘেয়ে থাকতে থাকতে অনুর দমবন্ধ হয়ে আসত।

এইভাবে দিনের পর দিন অনুকে হতাশা গ্ৰাস করতে থাকে। অনু খুব চুপচাপ ও মনমরা থাকত সবসময়। শুভ দিন দিন তা লক্ষ করে চিন্তায় পড়ে । অফিসে গিয়ে কাজে মন বসে না শুভর। দিন দিন শুভর বাড়ি থেকে তার বাবা মাও চাপ দিতে থাকে। বাড়ি ফিরে অনুর হতাশা মুখ দেখে বুক কেঁপে উঠতো শুভর। রাতে শুয়ে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না শুভ, ওদিকে অনু পাশ ফিরে বালিশ ভেজায় , শুধু মা ডাক শোনার জন্য।

শুভ সপ্তম বিবাহবার্ষিকী তে প্রতিবারের মতো সেইবারো অনুকে বাইরে ডিনার করাতে নিয়ে গিয়েছিল। বাড়ি ফেরার পথে দেখতে পায় , একদল পথ সারমেয় একটি আস্তাকুঁড়ে র দিকে তাকিয়ে চিৎকার করছে। অনু বুঝতে পেরেছিল সেখানে কিছু আছে। শুভ গাড়ি থামিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল সেদিকে, দেখতে পেয়েছিল একটা ছোট্ট শিশু পড়ে আছে আবর্জনা র মধ্যে । অনু‌ শিশুটিকে কলে তুলে নেয়। শিশুটির মুখে র দিকে তাকিয়ে মাতৃত্ববোধ জেগে উঠে তার। শিশুটির মিষ্টি চাহুনিতে ভালোবাসে ফেলে তাকে অনু। তারা দুজন সেই রাতেই শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে আসে। কিছু দিন পর কোর্টে গিয়ে দত্তক নেয় শিশুটিকে।

শিশুটিকে পেয়ে নতুন জীবন শুরু করে শুভ আর অনু। তারা দুজন বাচ্চাটির জন্য ঘর সাজায়, নতুন খেলনা কেনে, জামাকাপড় কেনে, শুভর মা , বাবার এগুলো দেখে আদিক্ষেতা মনে হয়। তারা মেনে নিতে পারেনি এসব। তারা চেয়েছিল নিজের বংশধর। তাই শুভ অনুকে নিয়ে অন্য থাকার জায়গায় চলে যায়। এতদিন পর বাবা হওয়ায় , সে খুব খুশি ছিল। শুভ বাচ্চাটির মিষ্টি হাসি দেখে তার নাম রাখে মিঠি।

শুভ আর অনুর অন্ধকার জীবন আলোতে ভরিয়ে দেয় মিঠি। মিঠির হাসির কলতানে গোটা বাড়ি আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ভোর হয়ে গেছে ভুলে যায় অনু। ঘুমিয়ে থাকা মিঠিকে জড়িয়ে ধরে আদর করে, কপালে চুমু খায়। ভগবানকে অনেক ধন্যবাদ জানায়। মিঠি ছিল বলেই, সে আজ মাতৃত্বের স্বাদ পেয়েছে জীবনে।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত