সুন্দর কথা

সুন্দর কথা

ছেলেটি যখন কলেজে ভর্তি হল তখন senior দিদিরা পর্যন্ত প্রেমে পড়ে গেছিল। লম্বা শ্যামলা গড়ন, বেশ পেটাই চেহারা; তবে অনাবৃত দেহয় তার কোনো জিমের ছোঁয়া নেই। মাথার কোঁকড়া চুল, কাছাকাছি থেকে দেখলে তাতে নেই যত্নের ছোঁয়া। অন্য ছেলেরা যখন জিম করে, স্যালনে গিয়ে নিজেদের টিপটপ রাখতে ব্যস্ত, এই ছেলেটি তখন শুধু আঁকার জগতে ডুবে। আর্ট নিয়ে পড়ার ইচ্ছে থাকলেও পরিবারের চাপেই আর্টস নিয়ে ভর্তি হয়েছে সে, নাম পারিজাত।

নয়নিকা এই কলেজের নামকরা সুন্দরী, ভগবান খুব যত্ন করে বানিয়েছে তার দেহ-মূর্তি। আর বাকি যেটুকু খুঁত তবু বা ছিল, নিপুণ হাতে সেসব শুধরে নেয় নয়নিকা। ওর কাজলটানা চোখের মোহময়ী চাউনি দেখে rose day তে হয়না গোলাপের অভাব। কিন্তু এত হাতছানিকে পাত্তা দেয়নি যে মেয়ে, তার স্বপ্নে নিত্য যাওয়া আসা মোটা ফ্রেমের চশমা, গালভর্তি না কামানো দাড়িওয়ালা একটা মুখের, যার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিটায় নয়নিকার জন্য কোনো দুর্বলতা প্রকাশ পায়নি, হ্যাঁ, সে পারিজাত।

নয়নিকা অনেকবার হাবে-ভাবে বুঝিয়েছে সে কতটা ব্যাকুল পারিজাতের জন্য। পারিজাত বোঝে কি বোঝেনা বলা মুশকিল। ছেলেদের তো মেয়েদের মত ওই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নেই যেটার প্রভাবে সহজেই সে বুঝে যাবে কে পেতে চায় তাকে।

অর্জুন পারিজাতের কাছের বন্ধু। একটা strict relationship এ আছে নয়নিকারই কাছের বন্ধুর সাথে। তাই পারিজাতকে জানার জন্য অর্জুনের সাথে বন্ধুত্ব গভীর করতে হবে, এটাই modern law of cardiology ভাল করে জানে নয়নিকা। অর্জুনের সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার পরই সে জানল পারিজাত দুর্ধর্ষ কিছু ছবি এঁকেছে, figure, যেগুলোর মুখ সে আঁকেনি একটারও। অর্জুনের কথায় ওই world class ছবিগুলো যেদিন মুখ পাবে সেদিন পারিজাতের নাম নাকি পিকাসোর পরেই উচ্চারণ হবে। কিন্তু পারিজাত নাকি এমন সুন্দর কাউকে এখনো পায়নি, যে কিনা ওই সুন্দর ছবির মুখমণ্ডলের অধিকারী হতে পারে।

নয়নিকা অত্যন্ত smart মেয়ে, সে পারিজাতের কাছে আসার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। পারিজাতের life-র friend list এ নামটা ঢুকিয়েও ফেলে। পারিজাতের সাথে সাথে লেগে থাকে, আরও সুন্দর, আরও আরও সুন্দরভাবে নিজেকে সাজায় রোজ। পারিজাত বন্ধু হিসেবে অন্যদের মতই treat করে তাকে, special কেউ হিসেবে না।
নয়নিকা একদিন সরাসরি পারিজাতকে বলে বসে, “তোর চশমার পাওয়ার বেড়েছে, check করা ”
পারিজাত- “কেন? ”

নয়নিকা- “কেন কি? তোর চোখের সামনে সুন্দর মুখের অভাব নেই, তবু ছবিগুলো complete করতে পারলি না ”
পারিজাত- “সুন্দর কাউকে পাইনি এখনো, natural beauty, আকাশ কি কখনো artificial make up করে নিজেকে সুন্দর দেখানর জন্য? সে নিজেই সুন্দর। ”

নয়নিকা পরের দিন প্রথমবার বিনা make up এ কলেজ আসে। make up ছাড়াও সে সুন্দর দেখতে।
পারিজাতকে পাওয়ার জন্য সে মরিয়া।
পারিজাতের সামনে দাঁড়ায় সে,

নয়নিকা- “দেখ পারিজাত, আমি কি সত্যিকারের সুন্দরী নই? আমার মুখের কোনো কোণে artificial make up এর চিহ্ন নেই ”

পারিজাত তাকায় এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওর দিকে,

নয়নিকা- “এখনো কি তোর ওই সব ছবির মুখের অধিকারী আমি নই? ”
পারিজাত অদ্ভুত হেসে বলে “এখন যে তুই মানুষটাই artificial, এই যে তুই তোর সাজগোজ করে নিজেকে সুন্দর দেখানোর চেষ্টা করিস সেটাই তোর nature. এখন তুই তোর সেই nature এর বিরুদ্ধে গিয়ে শুধু আমায় পাওয়ার জন্য বিনা সাজগোজে দাঁড়িয়ে, এই এখনের ‘তুই’ মানুষটার মনেও artificial make up, তুই তোর মত সুন্দর নয়নিকা। আমি যাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি সে সত্যের মত সুন্দর। প্রকৃতিই তার সৌন্দর্য।”

নয়নিকা সেসব তত্ত্ব বুঝলনা, সেটাই স্বাভাবিক অবশ্য। ও শুধু বুঝেছে পারিজাতের স্বপ্ন-সুন্দরী সে নয়। তার আত্মাভিমানে একটা বড় আঘাত হানল পারিজাত, ঘা খাওয়া নেকড়ের মত ফুঁসে উঠল নয়নিকা।
নয়নিকা- “তুমি তোমার স্বপ্নসুন্দরীকে খুঁজে পাও, দেখি পারিজাত সে কত সুন্দর! ”

ঘূর্ণি যখন প্রথম কলেজে আসে ওকে প্রথম দর্শনে ভয় পায়নি খুব কম জনই আছে। ওর মুখের একদিকটা বীভৎস বললে খুব কম বলা হয়। ইচ্ছে করলে ও ওর মুখের ওদিকটা ঢেকে আসতেই পারে, কিন্তু ও আসেনা। প্রথম প্রথম ওকে দেখলে সবাই আঁতকে উঠত, এখন কেউ কেউ ঘেন্না করে, তবে বেশিরভাগ জনই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ওকে অনেকে বলে কেন ও ঢেকে আসেনা মুখ, দৃশ্যদূষণ ঘটাচ্ছে নাকি ও।

ও বলেছে আকাশে মেঘ ঢাকা থাকলে যখন কালো দেখায়, আকাশ কি মুখ ঢাকে, ওর মুখের একদিকটা সত্যিই অদ্ভুত রকমের কালো আর বিকৃত।

ওর বন্ধু জগৎ খুবই ছোটো, মাত্র দুজন; ওই দুজনই ওকে আগলে রাখে। কলেজে 1st year এ কোনো মেয়ে ঢোকার পর senior দাদাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য competition শুরু হয়, ঘূর্ণির জন্য যে হয়নি সেটা বলাই বাহুল্য। যেটা হত ওর সাথে সেটা ragging বললে কম বলা হয়। senior, নয়নিকা নামের সুন্দরী মেয়েটির পাশে দাঁড় করিয়ে তুলনামূলক আলোচনা। এত ঘৃণ্য মানসিকতা যে সমাজে আছে সে সমাজকে ঘূর্ণি বহুদিন পাত্তা দেওয়া বন্ধ করেছে। তবু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে প্রশ্ন করেছে কোন দোষে ভগবান তাকে এমন বিকৃত করেছে? পরক্ষনেই ভেবেছে রূপ তো সব নয়, সুন্দর নাই বা হল সে। তাকে ভগবান কেন এত মেধা, সুর দিয়েছে সেটাও তো প্রশ্ন।

বাড়িতে বাবা-মা সবসময় পাশে থেকেছে ওর। ছোটবেলায় প্লাস্টিক সার্জারি করানোর কথা ভেবেও খরচের ভয়ে পিছিয়ে এসেছে। বড় হওয়ার সাথে সাথেই ঘূর্ণি নিজেই প্লাস্টিক সার্জারি করানোর চিন্তাটা বাবা-মাকে ত্যাগ করিয়েছে। সেই ছোটবেলার বন্ধুহীনতা থেকে স্কুলের টিচারদের কাছ থেকে ঘৃণা, কোনটাই তাকে টলাতে পারেনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে।

ওর senior পারিজাত ওকে ডেকেছে শুনে অস্বস্তি হচ্ছিল ওর। তার থেকেও বেশী অস্বস্তি হচ্ছিল যে তাকে একাকী ডেকেছে personally. আবার কোন অপমান সইতে হবে কে জানে। পারিজাতকে যে ও চেনেনা তা নয়, দেখেছে অনেকবার, সুন্দরের সংজ্ঞা সে। এমন ছেলেদের অহঙ্কার স্বাভাবিক। তার প্রতি ঘৃণা স্বাভাবিক, কিন্তু, কিন্তু পারিজাতকে সে যতবার দেখেছে ওর মনে হয় কেমন অদ্ভুতভাবে চেয়ে আছে ওর দিকে। ওই দৃষ্টি পড়তে পারে না ঘূর্ণি। এমন দৃষ্টির সাথে ও পরিচিত নয়। পারিজাত সম্পর্কে আরও অদ্ভুত একটা ব্যাপার শুনেছে ঘূর্ণি, ও নাকি অনেক ছবি এঁকেছে, যেগুলো শুধু সুন্দর মুখের অভাবে অসম্পূর্ণ। মনে মনে হাসি পায় ঘূর্ণির, সুন্দর মানুষের সৌন্দর্যের চাহিদাও অতিরিক্ত।

পারিজাতের ঘরে ঢুকে একটু চমকালো ঘূর্ণি। ঘরটা আসলে ক্যানভাসে ভরা, সাদা কাপড় লাগানো ক্যানভাস। পারিজাত ওর মুখোমুখি বসলো, সেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো ওর দিকে। এই দৃষ্টি ঘূর্ণির অস্বস্তির কারণ হল না, এই অচেনা দৃষ্টি তার মধ্যে যেন অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করল। পারিজাতই কথা শুরু করল, “প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ঘূর্ণি তোমার কাছ থেকে, তোমার অনুমতি না নিয়ে আমি একটা কাজ করেছি।”
ঘূর্ণি- “মানে?”

পারিজাত ধীরে ধীরে গেল একটা বড় ক্যানভাসের সামনে, সাদা কাপড়টা সরাল। ঘূর্ণি দেখল একটা পরীর ছবি, পরীর মুখটা বড্ড চেনা চেনা, কিন্তু মনে করতে পারল না। পারিজাত পরীর মুখের অর্ধেকটা সাদা কাপড় চাপা দিল। চমকে গেল ঘূর্ণি। এ সেই মুখের প্রতিচ্ছবি যেটা সে তার বিকৃতি চাপা দিলে আয়নায় দেখে। খুব কষ্ট হচ্ছিল ঘূর্ণির।
পারিজাত- “জানো ঘূর্ণি, এই ছবিটার নাম ‘স্বপ্ন’। ”

ঘূর্ণি- “আমায় অপমান করছ? বোঝাতে চাইছ তুমি, আমি কত কুৎসিত? নাকি এ ছবি এঁকে তুমি বলতে চাও আমার মুখের একদিক ঢেকে রাখা উচিৎ? শোনো আমি যা, আমি তাই, এটাই সত্যি। জীবনটা স্বপ্ন নয়। তাই আমি যা আছি তাই নিয়েই খুশী।”

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল ঘূর্ণি। একটা চাপা কষ্ট, রাগ।
কিন্তু পারিজাত স্মিত হাসল, “তুমি ওই লাইনটা জানো ঘূর্ণি, ‘truth is beauty, beauty is truth’ ? ”

বলতে বলতে পারিজাত অন্য ছবিগুলোর ঢাকা খুলে দিল। অসাধারন তুলির টানে সেসব ছবি সম্পূর্ণতা পেয়েছে ঘূর্ণির বাস্তব মুখভঙ্গিমায়। তার একদিকের স্বাভাবিক ও অন্যদিকের অস্বাভাবিক মুখের গড়ন অসাধারন হয়ে ফুটে উঠেছে শিল্পীর রঙের আঁচড়ে।
হতভম্ব হয়ে বসে পড়ে ঘূর্ণি,

পারিজাত- “ঘূর্ণি, আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর তুমি। আমার কারো মুখ আঁকতে তাকে মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাখার প্রয়োজন হয় না। তাই তোমার অজান্তেই এগুলো এঁকে ফেলেছি আমি, তোমার অনুমতি নিইনি। ক্ষমা কর আমায়। কিন্তু তুমি না বললে আমি এই ছবিগুলো প্রকাশ করবো না।”

ঘূর্ণি- “আমি কি সত্যিই এত সুন্দর যে শিল্পীর মানসসুন্দরী হতে পারি?”
চোখে তার জলের ধারা।

পারিজাত- “সুন্দরের কোনো সংজ্ঞা তুমি দিতে পারো ঘূর্ণি ? ঘূর্ণি সত্যির চেয়ে সুন্দর কিছু নেই। তুমি সত্যিকে ভয় পাওনা, এটাই তোমার প্রকৃতি। তুমি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অপরুপা। ঢাকোনি নিজেকে, লোকাওনি নিজেকে, তাই তুমি সুন্দর। তোমার মুখমণ্ডল পেয়ে আমার সৃষ্টি ধন্য। তুমি যদি অনুমতি দাও তবে সারা বিশ্বের সামনে আমি সৃষ্টিকে প্রকাশ করবো। ”

ঘূর্ণি- “তোমার ‘স্বপ্ন’ তো আমি নই, ও ছবি প্রকাশের অনুমতি দেওয়ার অধিকারও নেই আমার। ”

পারিজাত- “স্বপ্নটা যে একান্ত আমার, আমার স্বপ্নকে আমি বিশ্বকে দেখিয়ে বেড়াতে চাইনা। আমি শুধু চাই সত্যের প্রকাশ ”

ঘূর্ণি- “তবে তাই হোক শিল্পী ”

পারিজাত ঘূর্ণির পায়ের কাছে বসে পড়ে হাঁটু গেঁড়ে, “তুমি সত্য তাই তুমি সুন্দর। আমি সুন্দরের পূজারী, আমাকে ফিরিয়ে দিওনা। ”

ঘূর্ণি আর পারিজাত আলিঙ্গনবদ্ধ হয়। পারিজাত আবৃত্তি করে,

“আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ
চূণী উঠল রাঙা হয়ে…”

ঘূর্ণি বোঝে বারবার যে অচেনা দৃষ্টি সে দেখেছে পারিজাতের, তার নাম “মুগ্ধতা”।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত