ডেভিল

ডেভিল

“চুর চুর… সব চুর। শ্লা… সোজা গোলটাও মিস করলো।” সকালে চায়ের কাপে হালকা একটা চুমুক দিয়ে বলে উঠলো অনি। নাম অনিন্দ্য সান্যাল।

“কি রে কি হলো? আবার কফি মেশিনটা হ্যাং করলো নাকি রে? তুই কফি ছেড়ে চা খাচ্ছিস যে?” মৃণালদা সকাল সকাল গল্পের খোরাক পাওয়ার সুযোগ বুঝে কিউবিকল থেকে উঠে এলো।

“নাহ। এই দেখো না সামান্য গোল দিতে পারেনা। ইস এদের ডিফেন্সটা একদম স্ট্রং নয়। একটু কর্নার থেকে শটটা নিলেই হয়ে যেত।” তেতো মুখে বললো অনি।

-“তা তুই গিয়ে একটু মেসিকে ট্রেনিং দিয়ে আয়, আর নীল সাদা জার্সি পরলে ডিফেন্স তো স্ট্রং হবেই গুরু।” পাশ থেকে মার্কেটিং এর জয় ফুট কাটলো।

_”ধুর বা* এমনিতেই মটকা গরম তার ওপর তুমি আবার বিনয়ের বার্নল লাগাচ্ছ।” চারিদিকে হাসির রোল উঠলো।

সকালে অফিসের কেবিনে এটা অবশ্য রোজকার রুটিন। কোনোদিন নোরাহ ফাতেহির স্ট্যাটিসটিকস, কখনো স্টক মার্কেট, ক্যান্টিনের ফ্রী’র চায়ের সঙ্গে জমে ওঠে জোরদার সব আলোচনা।

“আরে যা, যা নিজের কাজ কর, ডেভিল আসছে। এইমাত্র রিসেপশনিস্ট জানালো।” ব্যস কথাটার মধ্যে কী জাদু ছিল জানিনা তবে মূহুর্তে অফিসের চেহারা বদলে গেলো। সবাই নিজের ডেস্কে ঢুকে পরলো টুক করে।

মাহী সেন এই অফিসের নতুন জয়েনি, জয়েন করেছে দুই সপ্তাহ হলো। এসে থেকে ডেভিল নামটা শুনে আসছে। শুনেছে ওটা নাকি চিফ ম্যানেজারের ডাকনাম। যদিও তাকে দেখেনি এতদিন, তবু শুনেছে নাকি বেশ কড়া ধাতের। এসে অবশ্য চিফ ম্যানেজারের কেবিনটা খালি দেখেছে। আজ প্রথম ওনাকে দেখার সৌভাগ্য হবে। অবশ্য নামটা শুনে বেশ মজা পেয়েছে মাহী, ভাইজানের ফ্যান যে, তাই ব্যক্তিটিকে দেখার ইচ্ছে খুব।

“গুড মর্নিং ম্যাডাম।” অফিসের সিনিয়র কলিগরা উঠে দাঁড়িয়ে যাকে উইশ করলো ।তাকে দেখতে মাহী কিউবিকল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে।

জেড ব্ল্যাক কালারের স্যুট পরে ঢুকলেন মধ্যবয়সী এক তরুণী। বয়স তিরিশ হবে। পায়ে চেরী রেড স্টিলেটো। কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগ। টপ নট করে বাঁধা হাইলাইটেড চুল। খট খট হিলের আওয়াজ তুলে দরজা খুলে কেবিনে ঢুকে গেলেন সোজা, কাউকে উইশ না করেই। ইনিই সেই ডেভিল। পরে নাম জেনেছিল মাহী।

ওনার নাম দিব্যাঙ্কা লাহিড়ী। ওনার উপস্থিতি যেমন নিমেষে অফিসের পরিবেশ বদলে দিল সেটা অবাক করেছিল মাহীকে। একটা ট্যুরের কাজে কিছুদিন বাইরে ছিলেন। তারপর থেকে রোজ মাহী যত ওনাকে দেখেছিল মুগ্ধ হয়েছিল। কী অসম্ভব কাজের প্রতি নিষ্ঠা, প্রতিদিন নিয়ম করে সময়ে অফিসে আসতেন। বেশি রাত করে কাজটা তেমন পছন্দ করতেন না বাকিদের জন্যও। অফিস শেষে গুলতানি মারতে কয়েকজন পরে থাকতো তাড়াও সময়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দিত। নিজের কেবিনে বসেই বাকি অফিসের কোথায় কী হচ্ছে নজর রাখতেন। কাজ শেষ করে সময়ে বাড়ি ফিরতেন। একটা ডিপ ব্লু কালারের হন্ডা সিটি নিজেই ড্রাইভ করতেন। ডেভিলকে খুব একটা অপছন্দ হয়নি মাহীর।

কিন্তু হঠাৎ সেদিন মনখারাপ হয়ে গেলো তার। কাজ শেষ করে উঠতে যাবে এমন সময়ে জরুরী তলব। পিয়ন এসে জানালো ম্যাডাম ডাকছেন। কেবিন থেকে যখন বেরোলো তখন মাহীর মুখে অকাল বর্ষা নেমেছে। আজকে রোহিতের সাথে দেখা করার কথা ছিল সন্ধ্যেবেলায়। অথচ যা কাজ দিয়েছে রাত আটটা নয়টা বেজে যাবে। ধুর এই জন্য ভালো লাগেনা। নিজে যেমন কাট খোট্ট মনে তো হয়না জীবনে কাজ ছাড়া কিছু চেনে। আরে বাবা মানুষের পারসোনাল লাইফ বলেও তো কিছু আছে। কিন্তু সেটা বলার সাহস মাহীর কী আর আছে, এখনো পার্মানেন্ট এম্পলয়ি নয় সে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে নিজের ডেস্কে এসে বসলো।

এতদিনে বুঝলো ডেভিল ইস দেয়ার…

প্রেজেন্টেশনটা শেষ করে মেইল করে দিলো ম্যাডামকে। অফিস থেকে যখন বেরোলো প্রায় নয়টা। এর মধ্যে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ধুর আজকের দিনটাই মাটি হলো। একটা সাটেলও আসছে না। একটু গিয়ে দেখবে কিছু পায় নাকি? ছাতাও নেই সঙ্গে। তবু কিছুটা এগিয়ে দাঁড়ালো মাহী। এরই মধ্যে রাস্তায় লোকজন কম হয়ে গেছে।

পান সিগারেটের গুমটি গুলোও বন্ধ আজ। এমন সময়ে একটা কালো স্করপিও এসে ব্রেক কষলো সজোরে। উফফ্ কানা নাকি? একটা পঁচিশ ছাব্বিশের ছেলে নেমে এলো।

“কী ম্যাডাম যাবেন নাকি? চলুন লিফট দিয়ে দিই।” মুখে মদের গন্ধে বমি পেলো মাহীর। উফফ্ কোথা থেকে জোটে এইসব।

“নিজের রাস্তা দেখুন। আমি ঠিক চলে যাবো।” মাহী মুখ ঘুরিয়ে নিল।

“আরে এই বৃষ্টিতে কোথায় পাখি খুঁজবো, চলো না আজকের রাতে তুমি আমার ময়না হবে,” কথা গুলো বলেই ছেলেটা এসে হাত ধরলো মাহীর। এক অজানা ভয় মাহীকে গ্রাস করলো।

“ছাড় বলছি।” মাহী প্রাণপনে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু ছেলেটার গায়ে যেন অসুরের জোর। কষ্ট হচ্ছে মাহীর। তার সাথে ভয় লাগছে। বৃষ্টিটাও হঠাৎ জোরে নামলো। এই দুর্যোগের রাতে কাউকে ডেকেও সাড়া পাবেনা সে। আশেপাশে সত্যি কেউ নেই।

এমন সময়ে মাহী দেখলো একটা হাত এসে ছেলেটার চুলের মুঠি ধরে সজোরে ঠুকে দিল গাড়ির মধ্যে। ছেলেটার অন্য একটা হাত পিছমোড়া করে শক্ত করে ধরা তার হাতের মুঠোয়। বৃষ্টির মধ্যেও দেখলো ছেলেটার মাথার একপাশ ফুলে উঠেছে। রক্ত পরছে। ছেলেটা ততক্ষণে মাহীর হাত ছেড়ে দিয়েছে। অফিসের সিকিউরিটি গার্ড একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে আর মাহীর পাশে ম্যাডাম দাঁড়িয়ে আছেন। ওরা কখন এলো খেয়াল করেনি মাহী।

“এই মাসুদ, পুলিশকে এখুনি ফোন করো। ইন্সপেক্টর রায় আমাকে চেনেন। এই ছেলের সব তেল উনি আজ

রাতেই বের করবেন।”
“ম্যাডাম প্লিজ, ছেড়ে দিন। আমি বুঝতে পারিনি উনি আপনার লোক।” ছেলেটা ততক্ষণে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেও বিফল।
“আমার লোক কী রে? আমার লোক না হলে তুই গায়ে হাত দিবি?”
“না ম্যাডাম অন্যায় হয়ে গেছে। এবারের মতো ছেড়ে দিন।”
“এই শেষবার। এ তল্লাটে দেখলে না সোজা হাজতে যাবি।”

গাড়ি স্টার্ট দিতে আর এক সেকেন্ডও দেরি করেনি ছেলেটি।

“ম্যাম আপনি এখানে। বাড়ি যাননি।” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল মাহী।
এই দুর্যোগের অন্ধকারেও ওনার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি দেখলো মাহী। বুঝতে পারলো ওকে কাজ দিয়ে নিজেও অপেক্ষা করছিলেন। হয়তো মাহীর কথা ভেবেই।
“তুমি কোনদিকে যাবে?”প্রশ্ন করলো ম্যাডাম।
“আমি রাজারহাটের দিকে যাবো।”
“আমিও ওদিকেই যাবো। চলো আমার সাথে। একটু রাত হলেও তোমাকে বাড়িতে ড্রপ করবো।”

মাহীও মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করলো ওনাকে।
গাড়িতে উঠে মাহী শুধু ভাবছিল আজকের কথা। ম্যাডাম না থাকলে তো… অথচ অফিস থেকে বেরোনোর আগের মূহুর্তেও মনে যা এসেছে তাই বলেছে ওনাকে।

“বাড়িতে কে কে আছে?” প্রশ্নটা ম্যাডামই করেন প্রথম।
“আমি এখানে একটা মেসে থাকি। বাবা,মা দুর্গাপুরে থাকেন।”
“আশা করি খুব রাত হবেনা। এইটুকু রাস্তা পৌঁছে যাবো, আর ভয় নেই, ইউ ক্যান রিল্যাক্স।” হাল্কা করে মিউজিক চালালেন ম্যাডাম।

মাহী হেসে সম্মতি জানালো।

কথার মাঝেই ম্যাডামের মুঠোফোন বেজে উঠলো।

“হ্যালো, হ্যাঁ, কী বাবা এখনো খায়নি,৷ ঠিক আছে দাও বাবাকে।
বাবা, আমার একটু দেরি হবে। লক্ষ্মীটি, খেয়ে নাও।
আমি চলে আসবো। তুমি না খেলে রূপা দিদি বাড়ি যেতে পারবেনা। প্লিজ বাবা। একবার রূপা দিদিকে ফোনটা দাও।”

“আপনি বাবা ঘুমালে বাড়ি চলে যান, আমি একটু পরেই ফিরে যাবো। আচ্ছা রাখছি।”
ফোনের ওপ্রান্তে ম্যাডামের বাবা যে ওনার অপেক্ষায় সেটা বুঝলো মাহী।

 

“ম্যাডাম আপনার বাবা? এখনো আপনার জন্য অপেক্ষা করেন। রাত হয়েছে বলে চিন্তা করছেন হয়তো। আপনি আমাকে না ড্রপ করলেও আমি ঠিক চলে যেতাম। আপনার অসুবিধা হলো শুধু শুধু আমার জন্য ”
“না মাহী, উনি আমার শ্বশুর। আর আমার অফিসের এম্পলয়িরা আমার দায়িত্ব। ”
চুপ করে থাকে মাহী।

তারপরের পথটা সাক্ষী থাকে এক অদ্ভুত গল্পের।

জানো মাহী লোরেটো হাউস থেকে পড়াশোনা করেছিলাম। তারপর মাস্টার্স করি। আ্যকাউন্টেন্সি নিয়ে পড়েছিলাম। তারপর বিয়ে করে আসি লাহিড়ী পরিবারে। গারমেন্টসের ব্যবসা ছিল ওদের। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝেছিলাম আমি ওদের ড্রইংরুমের সবচেয়ে দামী শো পিস। সবাই নিজের মতো স্বাধীন। শাশুড়ি ব্যস্ত কিটিপার্টি আর সোশাল প্রোগ্রাম নিয়ে। স্বামী আর শ্বশুর ব্যস্ত ব্যবসায়। আমিও ভাবলাম এম.বি.য়ে. করে নেবো। বাধা এলোনা। শুধু জানানো হলো আমাকে চাকরি করার কথা ভাবার দরকার নেই, এ বাড়ির মেয়েরা চাকরি করেনা। তারপর একদিন সন্ধ্যেবেলা কোম্পানির একটা গেট টুগেদার ছিল। আমার পরীক্ষা থাকায় ঠিক হলো ওরা তিনজন আগে চলে যাবে আর ড্রাইভার পরে আমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে। কিন্তু সেদিনটা অন্যরকম ছিল হয়তো। ঝড়ের আগে যেমন সব শান্ত থাকে ঠিক তেমন। তারপর একটা ঝড়েই পালটে গেল সব কিছু। ওদের গাড়িটা আ্যক্সিডেন্ট করে। শ্বশুর প্রাণে বেঁচে গেলেও অনেক স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিল। অ্যকুয়ট অ্যলজাইমার্স।

আমাকে মাঝে মাঝে মনে পড়ে, তখন আমাকেই সন্তানস্নেহে আগলে রাখেন। কখনো ভুলে যায়। তখন আমি নেহাতই বাইরের লোক। শুধু অবাক হবে শুনলে এখনো কোম্পানিটার কথা ভুলে যায়নি। আমারও তাই আর কোথাও যাওয়া হয়নি। আটকে গেছি ওই মানুষটার জন্য। কিন্তু সেদিনের দিব্যাঙ্কা আজ তোমাদের ডেভিল।

এতসবের মাঝেও ম্যাডামের কথায় হেসে ফেললো মাহী।

পরেরদিন অফিসে এসে দেখে ম্যাডাম যথারীতি কেবিনে বসে আছেন। মাহী এগিয়ে গেলো…

“গুড মর্নিং ম্যাম”
“হোয়াটস গুড মিস মাহী। টু ডে ইউ আর টেন মিনিটস লেট। প্লিজ ট্রাই টু মেনটেন টাইম ফ্রম টুমরো।” ম্যাডাম ল্যাপটপ থেকে চোখ না ফিরিয়েই জবাব দিলেন। সত্যি তো আজকেও মাহী লেট করেছে অফিসে আসতে। অথচ এইকদিনের একদিনও লেট হতে দেখেনি সে ম্যাডামকে। আজকে ম্যাডামের বকাটা আর গায়ে লাগলো না। ডেভিলের বকায় প্রছন্ন প্রশ্রয়ের সুর ছিল যে। শুধু নিজের কাছে অঙ্গীকার করলো আর দেরি করে অফিসে আসবে না, নিজের কিউবিকলে এসে দেখে একটা ছোট্ট ফুলের তোড়া আর একটা কার্ড অপেক্ষা করছে তার জন্য। কার্ডে অবশ্য নাম ছিলনা কোনো।
শুধু লেখা ছিল।

বি দা গার্ল ইউ ওয়ান্ট টু বি।
অ্যাচিভ ইয়োর ড্রিম আ্যন্ড
লেট দা ওয়ার্ল্ড সি।

ডেভিলের মনের হদিস পায়নি আর কেউ। একটা মেয়ে একাকী লড়াই করে সফল হলে তার কপালে হিটলার, ডেভিলের উপসংহার জোটে। মেয়েদের অসহায় দেখতেই অভ্যস্ত যে সমাজ।

যার রাতের কান্নাগুলো পরেরদিনের মেকআপে ঢাকা পরে যায়। যার পায়ের নীচে পাঁচ ইঞ্চির হিল বুকের মধ্যে যুদ্ধের সুর তোলে। চোখের কালো কাজল ঢেকে দেয় ঘুম না হওয়া রাত্রিগুলো। সে কাঁধে মাথা রেখে বিশ্রাম করেনা, মাথা উঁচু করে পথ চলে। মাহী দেখেছে এক ডেভিলকে, যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত