চিনির রাগ

চিনির রাগ

প্রতিদিনের মতো, সন্ধে সাতটার সময়ে আমি ফিরে এলাম অফিস থেকে। নিচে গাড়ি পার্ক করিয়ে তাকালাম এদিক সেদিক। চিনি নিচে থাকলে ঠিক ছুটে আসে, এসে পাপা বলে জড়িয়ে ধরে। একটু অপেক্ষা করে ওপরে উঠে এলাম। ও নিশ্চয়ই আজ তাড়াতাড়ি খেলে ওপরে চলে গেছে তনুর সাথে। ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়লাম। তনু ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, হাতে গরম খুন্তি, সেটা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ঘরের ভেতরে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। আমি তনুকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম , “কি হয়েছে ? ”

কোনো কিছু না বলে, আমার হাত থেকে লাঞ্চ-বক্স নিয়ে ভেতরে চলে গেলো ও। আমি জুতো খুলে, ভেতরে এলাম। অন্যদিন হলে চিনি ভেতর থেকেই ছুটে আসতো, আমার কোলে ওঠার জন্য বায়না করতো ভীষণ। আমি ওকে কোলে নিয়ে একটু আদর করে দিলে, ও নেমে আমার হাত থেকে লাঞ্চ-বক্স নিয়ে নিজেই কিচেনে গিয়ে রেখে দিতো বেসিনে। তারপরে আমার পায়ে পায়ে, পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াতো যতক্ষন না আমি অফিসের জামা প্যান্ট না ছেড়ে বাইরে আসি – ঠিক ততক্ষণ। আজকের সন্ধেটা বেশ অন্যরকম। চিনির গলার আওয়াজ ও পাচ্ছি না , তনুও চুপ করে আছে। ওর মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই কি হয়েছে।

আমি ও, চুপ করে ভেতরে চলে গেলাম। ভেতরে গিয়ে দেখি, চিনি বিছানার ওপরে বসে আছে খাতা আর বই হাতে। চোখ ওর খাতার পাতায়, কিন্তু মন অন্য কোথাও। আমি ওর গায়ে টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি রে ? কি হয়েছে তোর ? ” কিছু না বলে আমার দিকে তাকালো চিনি। দু চোখে ভর্তি অভিমান আর রাগ, আর চোখ ভর্তি টলটলে জল।

ও কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই তনু প্রায় দৌড়ে এসে আমাকে বললো ,”লালন, তুই একদম ওর সাথে কথা বলবি না। আরে চেনা বানানগুলো সব ভুলে গেছে। কয়েকদিন একটু রিভিশন করা হয়নি , আর ও সব ভুলে গেছে ? এভাবে কি পড়াশোনা হবে ওর ? আমাদের মেয়েটা মূর্খ হয়েই থাকবে। ”

বুঝলাম, বেশ একচোট হয়ে গেছে মা আর মেয়ের মধ্যে। গত কয়েকদিন ছুটি ছিলো, আমরাও ঘুরে বেড়িয়েছি এদিক ওদিক , করেছি হৈ হুল্লোড়। আর চিনি ভুলে গেছে এই কয়েকদিনে অনেক কিছুই। আমি তনুকে বাইরে এনে বললাম , “কি করছিস ? ওইটুকু একরত্তি মেয়ে আমাদের। আর কতই বা বয়স ওর ? মাত্র সাড়ে পাঁচ। কয়েকটা বানান ভুলে গেলে কি হবে বলতো ? ছাড় না ! ওকে ওর চাইল্ডহুড এনজয় করতে দে তো। ”

আমাকে জড়িয়ে ধরে তনু বলে ওঠে ,”আমিও চাই না ওর ওপরে রাগারাগি করতে। কিন্তু কি করবো ? কয়েকদিন পরে ক্লাস ওয়ান হবে , তখন কি ও পারবে সবকিছু ফলো করতে ? আমার ভয় হয় রে লালন। ”

তনুর মাথায় হাত রেখে আমি বলে উঠলাম,”আমাদের কথা মনে কর না তনু। এই আমরা যখন ক্লাস ওয়ান-এ পড়তাম, আমরাও কি সবকিছু পড়তে পারতাম ? আর তার জন্য কি আমরা মূর্খ হয়ে থেকেছি ? ধীরে ধীরে হয়ে যাবে সব। এবার ছাড়ো তো, একটু ওর সাথে গিয়ে গল্প করি আমি। ”

তনু আমাকে ছেড়েই হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে ,”এই চিনি ! গলার আওয়াজ পাচ্ছি না কেন ? পড়ছিস কি তুই ? জোরে জোরে চেঁচিয়ে পড় ! ”

আমি আর কিছু না বলে বাইরের ঘরে পেপার হাতে বসলাম কিছুক্ষণ। আধঘন্টা পরে তনু আমাকে বললো, “লালন, ডিনার রেডি। যা মেয়েকে নিয়ে আয়। ”

আমি লাফিয়ে উঠে দৌড়ে ভেতরে এলাম। দেখলাম চিনি মুখ লাল করে রেগে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমাকে দেখেই আমার কোলে ঝাঁপিয়ে চলে এলো। আমি ওকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম , “আমার চিনির, রাগ হয়েছে ? খুব রাগ হয়েছে ? ”

মাথা নেড়ে বলে ওঠে চিনি ,”মাম্মা , বকেছে। খুব বকেছে। ”

“বকবেই তো। দুস্টুমি করলে বকবে না ? ”

আমার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে ,”মাম্মার সাথে কিট্টা। কোনোদিন আমি মাম্মার সাথে কথা বলবো না। আমি শুধু তোমার সাথে কথা বলবো। ”

“তাই ? মাম্মা তো খুব কাঁদবে তাহলে। কি হবে ? ” বলে উঠলাম আমি।

একটু যেন চিন্তায় পড়ে গেলো চিনি। আমার দু গালের ওপরে হাত রেখে বলে ওঠে ,”মাম্মা… খুব কাঁদবে ? ” আমার কোল থেকে নেমে গেলো চিনি। বাইরে এসে তনুর কাছে গিয়ে বললো , ” আমাকে আর বকবে না তো ? আমাকে বকলে আমি রাগ করে তুমহারে সাথ কিট্টা
কর দুঙ্গি। মুঝে সরি বোলো ! ”

আমি পেছন থেকে এসে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম ,”সরি ? কেন রে ? ”

তনু হাসতে হাসতে চিনিকে কোলে তুলে বসিয়ে , ওর মুখের ভেতরে খাওয়ার ঢুকিয়ে বলে ওঠে ,”আর বলিস না। সেদিন বিকেলে ওরা খেলছিলো। তৃণা আর চিনি লাফাচ্ছিলো খুব। আমার ভয় হচ্ছিলো পড়ে না যায় ! আমি চিনিকে ধমক দিয়েছিলাম। আর ওইটুকু তৃণা, সে এসে আমাকে বলে কি জানিস ? ‘আন্টি , তুম চিনিকে উপর গুস্সা কিঁউ কর রহে হো ? উসে সরি বোলো ! ‘ আমি যে কাকে কি বলবো আর ভেবে পাই নি সেদিন। মানে হাসবো, না কাঁদবো ?”

চিনি খেতে খেতে তনুর বুকে মাথা রেখে বলে ওঠে ,”আমাকে বকবে না তো ? আমি কিন্তু খুব রেগে যাবো। ”

তনুও হাসতে হাসতে চিনিকে আরো জোরে জড়িয়ে, ওর মুখে, কপালে, গালে, ঠোঁটে আদর করে বলে ওঠে ,”তুই এতো সুন্দর করে রাগ করলে, আমি তোকে রোজ বকবো। আর তুই যখন রেগে যাবি, আমি তোকে খুব চটকাবো। ”

চিনি তনুর কোল থেকে নেমে, আমার পাশে বসে হাসতে হাসতে বলে ওঠে,” এই… একদম চটকাবে না আমাকে। বুঝা ?

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত