ফিরে পাওয়া

ফিরে পাওয়া

“আগুনের পরশ মনি”

পরিচিত ধীর পায়ের চলনে নীলাদ্রির গুনগুনানিতে ছেদ পড়ে । শব্দটা যেন ইতস্তত করেও শেষমেশ ওর পিঠ ঘেঁষে দাঁড়ালো, আস আসবো?

“এসেই তো পড়েছো ”
ঘাড় না ফিরিয়েই নির্বিকার জবাব দেয় নীলাদ্রি বাবু ।
“দাদা”

আগন্তুকের স্বরটা কেমন কাঁদো কাঁদো ঠেকলো ! এবার খানিকটা বাধ্য হয়েই নীলাদ্রি বাবুকে মুখ ফেরাতে হলো …
“কি হলো এই সময় আবার তুমি ?”

নিলাদ্রী বাবুর প্রশ্ন শুনেও নত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে ￶রিতা |
” কি হলো কথা কানে যাচ্ছে না ? তুমি এখানে কেন?”
” দাদা,রিমির খুব শরীর খারাপ ,জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে ,ডাক্তার দেখতে হবে ”

” তো? টাকা চায় তোমার ?”

চুপ করে থাকে রিতা |
” তো কত লাগবে শুনি?”

” তিনশোর মতো হলেই চলবে ”

” আমি তোমাকে কেন দেব বলো??”
দাদা,আমার অসহায়তার সুযোগ নিচ্ছেন ?
কথাটা আতে ঘা লাগে নীলাদ্রী বাবুর,কিন্তু রিতাকে বুঝতে না দিয়ে বললেন

” রিতা, তোমার অনেক শুভাকাঙ্খী আছে,কিন্তু ওদের কাছে টাকা না চেয়ে আমার কাছে চাইছো ? কিন্তু কেন?”
এবারো চুপ করে থাকে রিতা,নীলাদ্রী বাবু আবার বলেন ” কারন তুমি জানো,তুমি এখানে চাইলেই পাবে, কেননা তুমি ভাবছো আমি তোমাকে যে প্রস্তাবটা দিয়েছি ,তার জন্যই তোমাকে ঘুস দেব| কিন্তু না, এটা মানবিকতা থেকেই দিলাম,রিমিকে ভালোবাসি বলেই দিলাম ”

পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে রিতার হাতে দিয়ে আবার বললেন ” এটা রাখো ,মেয়েকে ভালো করে ডাক্তার দেখাও,এটা ফেরৎ দিতে হবেনা ”

টাকাটা নিয়ে উসখুস্ করতে করতে রিতা বললো
” দাদা,আজ কি খাবেন ? কিছু রান্না কি করে দেব?”
এবার মাথা গরম হয়ে যায়

নীলাদ্রী বাবুর,ঝাঁজিয়ে বলেন “আমি যখন তোমাকে রান্নার কাজ থেকে বরখাস্ত করেছি,তখন তোমার এত খোঁজে লাভ নেই | একা মানুষ আমার ঠিক ব্যাবস্থা হয়ে যাবে | হোম ডেলিভারি তো আছেই”

আঁতকে ওঠে রিতা,বলে ” হোম ডেলিভারি?? সে তো বেশি তেল মশলা যুক্ত খাবার ,আপনার সহ্য হবে না যে ?”
“তো,কি করবো আমি তো অফিস যাওয়ার আগে হাত পুড়িয়ে রান্না করবোনা,তাছাড়া পারিও না | চা অবধি করতে পারিনা,তবে এবার শিখবো | আসলে এক গ্লাস জল কখনো নিয়ে খাইনি তো,তাই অভ্যাস নেই | তবে আস্তে আস্তে সব শিখে যাবো বুঝলে রিতা”

আবার অবনত হয়ে রিতা বললো…

” আপনার প্রস্তাবটা মানতে পারলাম না,লোকে অনেক কুকথা বলবে,..তবে আমার কাজটা বহাল রাখলেই পারতেন,আমি না হয় একবেলা রান্না করে চলে যেতাম ”

” তুমি কাজ করলে লোকে আরো বেশি কথা বলতো,বলতো একটা ￶￶সমর্থ মেয়ে একটা পুরুষ মানুষের ঘরে কি করে? ওদের চরিত্র কেমন ..শোনো রিতা তুমি তো বছর তিন কাজ করছো, আমি কি তোমাকে কখনো খারাপ ইঙ্গিত দিয়েছি? তোমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি আর নলিনী সব সময় তোমার পাশে থেকেছি | নলিনী চলে যাওয়ার পর আমি সম্পূর্ণ একা হয়ে গেছি,তাই তোমাকে বৈবাহিক প্রস্তাবটা দিলাম ”

” আমাকে মাফ করবেন আমি এটা পারবোনা,লোকে বলবে আমি বৌদির সংসার ￶আত্মসাৎ করেছি | কাজে না রাখলেও আমি এই প্রস্তাব মানতে পারবোনা”
” বেশ,ভালো কথা..আমিও তো তোমাকে জোর করিনি রিতা,তবে আর এখানে আসবে না ”
আর কথা না বাড়িয়ে রিতা চলে গেল |

একমাস আগেও নীলাদ্রী সেনের বাড়িতে খুশি ঝড়তো,ওনার স্ত্রী নলিনীর কলতানে মুখরিত ছিল ‘সেন ভিলা ‘ | নিঃসন্তান হাওয়া সত্ত্বেও ওনাদের ভালোবাসা ছিল অটুট, কিন্তু একটা বাস দুর্ঘটনায় চিরতরে হারিয়ে যাই নলিনী | ওনাদের সংসারে নেমে আসে কালো ছায়া | দিন কুড়ি বাড়িতে আত্মীয়রা থাকলেও এখন পুরো বাড়ি ফাঁকা | রিতা এসে দু বেলা রান্না করে দেয়,তবে রিমি এলে মনটা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে নীলাদ্রী বাবুর | বড্ডো মিষ্টি একটা বাচ্চা রিমি | নলিনী মারা যাওয়ার পর রিমির উপর টান দ্বিগুন বেড়েছে | তাই রিতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন |

রিতা চলে যাওয়ার পর,দিন দশ অতিক্রান্ত হয়েছে,এই ক দিনেই নীলাদ্রী বাবুর একদম নাস্তানাবুদ অবস্থা | সকালে স্নান করে বাইরে খেয়ে অফিস যাওয়া | আবার বিকেলে ফিরে কিছুক্ষন রেস্ট নিয়ে আবার রুটি কিনতে যাওয়া,আবার কোনোদিন হোম ডেলিভারি থেকে খাবার আনানো,এই ভাবেই কাটছিলো দিনগুলো |

একেই পেট রোগা মানুষ,তারপর আবার বাইরের খাবার খেয়ে বার তিন ঠাকুর ঘরে যাওয়া হয়ে গেছে | না আজ রাতে উনি জল মুড়ি খাবেন বলে ঠিক করলেন | টিভি দেখতে ইচ্ছা করেন না ওনার ,আগে টিভি রিমোর্ট নিয়ে নলিনীর সাথে কত খুনসুটি চলতো,আর এখন যেন উনি নিঝুম পুরীতে বাস করেন | কিচ্ছু ভালোলাগছে না ওনার,গিয়ে দাঁড়ালেন নলিনীর ফটোর সামনে…

“যেন আজ মনে হচ্ছে আমাদের একটা সন্তান থাকলে খুব ভালো হতো ,তাহলে এতটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তাম না | ভগবান তোমার সাথে আমাকে কেন তুলে নিলোনা কি জানি | জানো দাদা ,বোনরা আমার দায়িত্ত্ব নিতে চেয়েছিলো, কিন্তু আমি জানি ওদের আমার সম্পত্তির দিকে নজর তাই আর ওদের প্রস্তাবে রাজি হয়নি | তবে আমি আর একা থাকতে পারছিনা “চোখ মুছতে মুছতে বললেন নীলাদ্রী বাবু |

পরের সকালে একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠলেন নিলাদ্রী বাবু | রবিবার ছুটির দিনে পাতলা মাংসের ঝোল খেতে মন চাইছিলো | তখনি কলিং বেলের আওয়াজ” এখন আবার কে এলো ” বলে দরজা খুলে দেখলেন রিমি আর রিতা দাঁড়িয়ে | ওনাকে দেখে সাত বছরের রিমি ওনার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বললো ” জ্যেঠু কত দিন তোমাকে দেখিনি ”

ওদের দেখে মনটা ফুরফুরে হয়ে গেলো ওনার,

” তুই তো ভুলে গেছিস ”

“দাদা ,একটু খাসির মাংস নিয়ে আসুন তো,পেঁপে দিয়ে ঝোল বানাবো “বলে উঠলো রিতা |

” তুমি কেন রান্না করবে ?আমি তো বলেছি ”

ওনাকে থামিয়ে দিয়ে রিতা বললো “না আমি ভেবে দেখলাম ,লোক নিন্দার ভয়ের থেকে নিজের ভালো থাকাটা বেশি দরকার,তাই আমি আপনার প্রস্তাবে রাজি ”

” কি বললে রিতা,তুমি রাজি? আমি জানি তুমি আমার থেকে বয়েসে অনেকটা ছোট ,আমাকে স্বামী হিসাবে মানতে কষ্ট হবে, তেমনি আমিও নলিনীর জায়গা তোমাকে দিতে পারবোনা | তবে রিমি যেন আমাকে বাবা বলে ওটা দেখো”

রিতা তখন রিমির উদ্দেশ্যে বললো ” বেটা,আমরা যদি এই ঘরে থাকি আর জ্যেঠু যদি তোমার বাবা হয় কেমন হবে? ”

“জ্যেঠু বাবা?” চোখ গুলোকে গোল্লা পাকিয়ে রিমি বললো |
” আমাকে বাবা বলবি রে মা ?” করুন স্বরে নীলাদ্রী বাবু বললেন |
” তুমি আমার সাথে খেলবে তো?”
” খেলবো তো ”
“আমাকে বার্বি ডল এনে দেবে তো?”
“হ্যাঁ,রে অনেক কিছু এনে দেব,একবার বাবা বল”
“বাবা,ও বাবা” বলে ফিক ফিক করে হাসতে থাকে রিমি |

নীলাদ্রী বাবু ওকে আরো কাছে টেনে কপালে স্নেহের চুম্বন দিয়ে ,ওকে কোলে তুলে নলিনীর ফটোর কাছে গিয়ে বললেন ” জানো,তুমি চলে যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম সব শেষ হয়ে গেলো,কিন্তু এখন যেন আমি সব হারিয়েও আবার অনেক কিছু ফিরে পেলাম | তুমি যেখানেই থেকো ভালো থেকো”

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত