ফেরা

ফেরা

একটা অদ্ভুত হাহাকার আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো পুরোটা সময়। অস্তিত্বহীনতার অমোঘ নিয়তির প্রহরগুলো দারুণভাবে রেখাপাত করেছিলো ছোট দু’টি সত্তা জুড়ে। প্রবল মনের জোরে কিশোর বয়সের সীমা ছাড়িয়ে হঠাৎ যেন বড় হয়ে উঠেছিলো মাত্র এগারো বছরের কলিম। সময়ের প্রয়োজনে নিজের থেকে মাত্র দুই বছরের ছোট ভাই রতনের অভিভাবক হয়ে উঠেছিলো। আর, কোন এক অলৌকিক উপায়ে মায়ের অন্তিম সময়ের ভারী দেহটিকে বহন করার শক্তি অর্জন করেছিলো। প্রকৃতিই যেন সবকিছু নির্ধারণ করে দেয়, মানুষ কেবল প্রকৃতির সীমারেখায় সমান্তরালভাবে নিরন্তর ছুটে চলে চেনা গন্তব্যে।

অনেকক্ষণ ধরে আকাশে চক্কর দিচ্ছিলো শকুনটা। ঘুরে ঘুরে পাক খাচ্ছিলো নীলগঞ্জ আর আলীপুরের মাঝখানে দিগন্তবিস্তৃত বিলের মধ্য দিয়ে মোটা দড়ির মত মাটি আঁকড়ে থাকা কাঁচা সড়কটার উপর। পাশের বিলে থৈ-থৈ পানি। আশপাশের কয়েক মাইলের মধ্যে লোকালয়ের চিহ্ন নেই। ভাদ্র মাসেও মেঘহীন আকাশ। হাওয়াশূন্য রোদ্দুরে খাঁ-খাঁ করা খোলা জলাভূমিটা সম্পূর্ণ স্থির। মৃত্যুর মত নিস্তব্ধ সময়টাতে বৃক্ষবিহীন ফাঁকা রাস্তাটার কোথাও কোন ছায়া নেই। রাস্তাটির দু’পাশে নল-খাগড়া আর জংলি লতাপাতায় পরিপূর্ণ পানিতে সাপ আর জোঁকের আখড়া।
রাস্তা থেকে অনেক দূরে ভরা বিলের মাঝে ডিঙ্গি নৌকার উপর দাঁড়িয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে জমির শেখ। ভাবছে- ‘এই অসময়ে শকুনটা এলো কোত্থেকে? অনেকদিন এ তল্লাটে এ-প্রাণি দেখা যায়নি।’ জমির শেখ কপালে হাত রেখে রোদ আড়াল করে বড় সড়কটির দিকে তাকায়। প্রায় দুই মাইল দূরের রাস্তাটিকে ঝাপসা লাগে। বাঁক খাওয়া সড়কটির যেখানে ভেঙ্গে খাদের সৃষ্টি হয়েছে, তার ঠিক ওপাশে কিছু মানুষের অবয়ব চোখে পড়ে অস্পষ্টভাবে। জমির শেখ নিজের মনেই বলে, ‘আবার কারা আটকা পড়লো?’ দুপুরের কড়া রোদে লু হাওয়ায় ঠিকমত ঠাহর করতে পারে না সে। আরও কিছুক্ষণ চেষ্টা করে বিফল হয়, তারপর বাড়ির দিকে ঘুরিয়ে দেয় নৌকার মুখ।

চারিদিকে থৈ-থৈ জলরাশির মাঝে কাঁচা রাস্তাটার উপর কেবলমাত্র দুটি প্রাণি আর ভ্যানের উপর শোয়ানো ওদের মায়ের দেহটি ছাড়া আশেপাশের কয়েক মাইলের মধ্যে কোন জনমানবের সাড়া নেই। দূরের গ্রামগুলো ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতই স্থির। মধ্যগগনে পূর্ণযৌবনা গনগনে সূর্যটা অকৃপণভাবে আগুনের হল্কা ছড়াচ্ছিলো। রতন কিছুক্ষণ পর পর কাপড়ে ঢাকা মায়ের দেহটিকে দেখে, তারপর বড় ভাই কলিমের মুখের দিকে তাকায়। সে চোখে হাজারো প্রশ্ন। কলিম ছোট ভাইয়ের করুণ চোখের দিকে তাকাতে পারে না। বুঝে গিয়েছে আজ থেকে ও-ই রতনের অভিভাবক।

ভাই, আর কতক্ষণ এইহানে বইয়া থাকুম আমরা? কিছুক্ষণ পর বড় ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলে রতন।
জানি না। একটা ভারী নিঃশ্বাস ফেলে বলল কলিম।
রতন ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায়।

মনে অয় অনেক সময় লাগবো। পানি না কমলে ভ্যান নিয়া যাওন যাইবো না। ভ্যানের উপর মায়ের নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে বলে কলিম।

নীলগঞ্জ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে প্রায় পাঁচ মাইল দীর্ঘ এবড়ো-থেবড়ো পথ পেরিয়ে কলিমের ভ্যানটা এই খাদের কাছে এসে আঁটকে পড়েছে। উদাস চোখে ভাটার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলোনা ওর। নীলগঞ্জ থেকে আলীপুরের দিকে ছুটে চলা কাঁচা সড়কটা এই জায়গাটায় এসে হঠাৎ থমকে গেছে। গত বন্যায় ভেঙ্গে যাওয়া খাদটি রাস্তাটিকে দ্বিখন্ডিত করে দিয়েছে। বছর শেষ হয়ে গেলেও রাস্তাটি মেরামত করা হয়নি আর। জোয়ার-ভাটায় পানির উচ্চতার সাথে তাল মিলিয়ে চলাফেরা করে এখানকার মানুষ।

ভাটা শুরু হয়েছে মাত্র। কিছুক্ষণ পর পর কলিম দেখে পানি কতটুকু কমলো। পানি হাটু সমান উচ্চতায় নেমে এলে রওনা দিবে ওরা। মাথার উপর সূর্যটা যেন ক্রমশ আরও নির্মম হয়ে উঠছে।

ভাই, কাইল বিহালে তো এত পানি আছিলো না!

বুঝতাছি না রে রতন, আগে তো একলা এইদিকে আহি নাই!

ভাবনায় পড়ে যায় কলিম। ওর ধারনা ছিলোনা গতকাল বিকেলে অসুস্থ মাকে হাসপাতালে নেয়ার সময় দেখা অল্প পানির খাদটি আজ এই সময়ে বুক সমান পানিতে ডুবে যাবে।

মাথার উপরে চক্কর দেয়া শকুনটির দিকে তাকিয়ে রতন বলে-
ভাই, অইডা কি উড়তাছে আকাশে?

আকাশের দিকে তাকায় কলিম। মাথার উপর শকুনের ওড়াউড়ি দেখে কিছুটা অস্থির হয়ে ওঠে। খাদের ঢাল থেকে একটু দূরে ভ্যানটার দিকে তাকায়। আয় তো রতন! তাড়াতাড়ি উঠে ভ্যানের কাছে যায়।
ভাই, কইলা না ঐডা কি?

ঐডা শগুন, হুনছি এইগুলান নাকি মরা খায়। বাজানের লগে বিলে আইসা একবার দেখছিলাম মরা গরু খাওয়ার লাইগ্যা দুইডা শগুন এইরহম আকাশে উড়তেছিলো।

রতন ভয় পায়।

ভাই, ঐডা কি আমগো দিগে আইবো?

কলিম কিছু বলে না, কেবল লক্ষ্য করে উড়ন্ত শকুনটার গতিবিধি। ভ্যানের উপরে মায়ের ছোট্ট দেহটি লম্বালম্বিভাবে শোয়ানো। পা দু’টো বাহিরে কিছুটা ঝুলে আছে। তাঁর পরনের কাপড়ের আঁচল দিয়েই মুখমন্ডল আরও ভাল করে ঢেকে দেয় কলিম।

ভাই, মায় আর ফিরা আইবো না? হঠাৎ রতন জিজ্ঞেস করে।

একটা চমক লাগে কলিমের। চট করে ছোট ভাইয়ের দিকে ঘুরে তাকায়। মনে পড়ে যায়- ঠিক এই প্রশ্নটাই রতন মাকে করেছিলো মাত্র তিনমাস আগে। তখন বাবার নিষ্প্রাণ দেহটা শোয়ানো ছিলো বাড়ির উঠোনে। ছোট ভাইটির দিকে তাকিয়ে মনটা কেমন করে ওঠে কলিমের।

বাবার চলে যাওয়ায় সেদিন বিরাট একটা ধাক্কা খেয়েছিলো কলিম। নিজের চোখের সামনে জলজ্যান্ত বাবাকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলো। বাবার মৃতদেহের কাছে বাকরুদ্ধ হয়ে বসেছিলো অনেকক্ষণ। তারপর জোরে একটা চিৎকার দিয়ে উঠেছিলো। সেই চিৎকারে সবাই ছুটে এসেছিলো ওদের বাড়ির উঠোনে। আজ মা চলে যাবার দিন কেউ নেই ওদের পাশে। আজ ওকে একাই সংগ্রাম করতে হচ্ছে, ছোট ভাইটিকেও সামলাতে হচ্ছে।

ভ্যানের উপর শোয়ানো মায়ের দেহটির পাশাপাশি বাবার মুখটা ভেসে ওঠে মনে। কী সুখ-শান্তি, আদর-স্নেহে ভরা ছিলো ওদের জীবন! বাবা-মা দুজনেই আগলে রেখেছিলো ওদের দু’ভাইকে। মাছ পাগল বাবার সাথে কতদিন এই বিলে এসেছে ও! ঘরের বাইরে নেমে দক্ষিণে তাকালেই দিগন্ত বিস্তৃত বিলের থৈ-থৈ পানি হাতছানি দিয়ে ডাকতো মালেক ঢালীকে। শক্ত সামর্থ্য মানুষ ছিল মালেক ঢালী। কী নিখুঁত নিশানা! বাজপাখীর ক্ষিপ্রতায় পানির নিচে মাছের নড়াচড়া লক্ষ্য করে সপাং করে ছুড়ে মারতো কোঁচ, যা বেশীরভাগ সময়ই ছিল অব্যর্থ। আঁধার রাতে পাঁচ ব্যাটারীর টর্চ নিয়ে বাবার সাথে কতদিন বিলের পানিতে নৌকা ভাসিয়েছে কলিম!

‘বাপজান, অইহানে আলোডা ফ্যালতো।’, কলিম বাপের দেখানো স্থানে আলো ফেলতেই চোখে পড়েছিলো লালচে লেজের সামান্য নড়াচড়া। মালেক ঢালীর জন্য ওটুকুই ছিল যথেষ্ট। সপাং করে কোঁচটা ছুটে গিয়েছিলো মাছের পিঠ বরাবর। বাপ-ছেলের মুখে হাসি ফুটেছিলো। বাপকে এমন হাসি আরও অনেকদিন হাসতে দেখেছিলো কলিম; নিজেও হেসেছিলো। তারপর একদিন সেই হাসি থেমে গিয়েছিলো একেবারেই।

নিখুঁত চোখের দৃষ্টি আর অব্যর্থ ক্ষিপ্রতা ছিল যার, সেও একবার ভুল জায়গায় পা ফেলেছিলো। আর সেই ভুলই তার জন্য কাল হয়ে দেখা দিয়েছিলো। জীবনে আর ভুল করার সুযোগ মেলেনি মালেক ঢালীর।

সেদিন হাত থেকে ছুটে যাওয়া কোঁচটা তুলতে নৌকা থেকে নেমে দাঁড়িয়েছিলো বিলের মধ্যে জমানো আগাছার স্তূপের উপর। হিসহিস শব্দটা কানে যাবার সাথে সাথেই সতর্ক হয়ে উঠেছিলো মালেক, কিন্তু নৌকায় উঠতে কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিলো তার। হাঁটুর নিচে অব্যর্থ ছোবল খাওয়ার সাথে সাথেই একলাফে উঠে এসেছিলো নৌকায়। ‘বাপ, আমারে কেউটেয় কাটছে, জলদি নৌকা ঘুরা’ বলেই কোমর থেকে গামছাটা খুলে নিয়ে হাটুর উপরে শক্ত করে বেঁধে ছেলের সাথে লগি চালিয়ে ফিরে এসেছিলো বাড়িতে। কিন্তু ঘরে ফেরা হয়নি তার। ঘরের সামনের ছোট্ট উঠোনে সেই যে আছড়ে পড়েছিলো, আর ওঠেনি। কলিমের চোখ দু’টো ছলছল করে ওঠে।

রতন আবার প্রশ্ন করে ভাইকে- ভাই, কতা কওনা ক্যান? মায় আর আমার লগে কতা কইবো না?
কলিমের খুব কান্না পায়। অনেক কষ্ট করে নিজেকে সামলায়। ভাইকে কাছে টেনে নিয়ে বলে,
মানুষ মইরা গ্যালে আর ফিরে আহে নারে ভাই। আমগো মায় আর কতা কইবো না।
রতন কাঁদতে কাঁদতে বলে- তইলে মেডিকেলে বইয়া কইছিলি ক্যান যে মায় ভাল অইয়া যাইবো?

কলিম উত্তর দিতে পারে না। ভাইয়ের কাছ থেকে নিজেকে লুকাতে খাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। রতনকে কী বলবে ও? নিজের বুকে পাথর চেপে ভাইকে সান্ত্বনা দিয়েছিলো। মায়ের শেষ সময়ের করুণ চোখের চাহনি বুকের ভিতর আলোড়ন তোলে কলিমের। রাত্রির শেষ প্রহরে মায়ের অন্তিম মুহূর্তের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের ছবিটা ভুলতে পারে না। যাকে দু’দিন আগেও মা মুখে ভাত তুলে দিয়েছে সেই অবুঝ ছোটভাইটিকে কাল রাত্রে বলতে পারেনি- ওদের মা আর বেঁচে নেই।

মায়ের অকাল মৃত্যু কলিমকে মুহুর্তেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো। মাত্র এগারো বছরের কলিম হয়ে উঠেছিলো একজন জীবন যোদ্ধা। কাউকে বলে দিতে হয়নি- ওর কি করণীয়। মাতৃপিতৃহীন অনাথ কিশোরটিকে একমাত্র ছোট ভাইটিকে নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রামে নামতে হয়েছিলো।

ভোর হতে তখনও অনেক বাকি। হাসপাতালের পাওনা পরিশোধ করার চিন্তাটা কেবলই ঘুরে ফিরে মাথায় আসছিলো। শিক্ষিত ভদ্র মানুষগুলোর নির্মম আচরণ ওকে মনে করিয়ে দিয়েছিলো- বাস্তবতা কত কঠিন! এ পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে কারো উপর নির্ভরশীল হওয়া চলবে না। কারো জন্য অপেক্ষা করে থাকলেও হবে না। নিজে বাঁচতে হবে, ছোট ভাইটির মুখের অন্নও যোগাতে হবে।

ভোরের আলো ফোটার আগেই ভ্যানটা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলো কলিম। টাকা জোগাড় করতে হবে, মায়ের মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। টাকার অভাবে মায়ের লাশ হাসপাতালে পড়ে থাকবে? নিজেই নিজেকে বলেছিলো- ‘তাই কী হয়! কলিম এহনো বাইচা আছে না?’। গলার কাছে দলা পাকানো কান্নাটাকে আটকে রেখে ছোট ভাইটিকে বলেছিলো-‘তুই মার কাছে থাক, আমি টাকার জোগাড় কইরা আইতাছি।’ সেই কাকভোরে ভ্যান নিয়ে চলে

গিয়েছিলো ষ্টেশনে। বুকের ভিতর চাপা কষ্টের দাগ কেউ দেখতে পায়নি। কয়েক ঘন্টা মানুষ আর মালামাল টেনে কলিম যখন হাসপাতালের পথ ধরলো ভাদ্র মাসের সূর্য্য তখন তার স্বরূপ দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।

খাদের কাছ থেকে কলিম ঘুরে তাকায়। রতন তখনও মায়ের দেহকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলো। ছোট ভাইয়ের কাছে এগিয়ে যায়।

কান্দিসনা ভাই। আমগো কপালডাই খারাপ। আইজ থেইক্যা আমরা এতিম অইয়া গেলাম।
রতন তখনও ডুকরে ডুকরে কাঁদছিলো। -মায় ক্যান মইরা গ্যালো?

কলিম রতনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে- চিন্তা করিস না ভাই, আমি বাইচ্যা থাকতে তোর কোন কষ্ট অইবো না।
রতন তখনও মায়ের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে থাকে, দু’চোখ বেয়ে নামে বাঁধভাঙা অশ্রুর ধারা।

কলিম উঠে গিয়ে আবার দেখে পানির উচ্চতা কতটুকুতে নামলো। মাথার উপর দগদগে সূর্যটা একটু একটু করে পশ্চিম দিকে নামছে। পেটের ভিতরে রাক্ষুসে ক্ষুধাটা জানান দিচ্ছে বার বার। কলিম রতনের দিকে তাকায়, মনে পড়ে গতকাল রাতে ছোট এক টুকরা পাউরুটি ছাড়া দু’ভাইয়ের পেটে আর কিছুই পড়েনি। এই প্রতিকূল পরিস্থিতি ছোট্ট রতনকেও ভুলিয়ে দিয়েছে ক্ষুধার কষ্ট।

অপেক্ষার প্রহরগুলো বড় দীর্ঘ। আশেপাশের বিরূপ প্রকৃতি এই সময়টাকে আরও অসহনীয় করে তোলে। প্রচণ্ড গরমে অস্থির হয়ে উঠেছে রতন। গা থেকে জামা খুলে বিলের পানিতে ভিজিয়ে আবার গায়ে জড়িয়ে নেয়। হঠাৎ সামনের পানির দিকে চোখ পড়তেই দেখে একটা সাপ পানিতে সাতার কেটে এদিকেই আসছে। রতন ভাইকে দেখায়।

ভাই দেহো, সাপটা আমগো দিগেই আইতাছে,
কলিম তাকিয়ে দেখে একবার। বলে- আউক।
যদি কামড় দেয়?
এইডা ডোরা সাপ, ডরের কিছু নাই।

কলিম আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে শকুনটা চলে গেছে। রোদের তেজও ধীরে ধীরে কমছে। কলিম আবার খাদের কাছে গিয়ে পানির উচ্চতা পরীক্ষা করে।

ভাই, এহন যাওন যাইবো না? রতন জিজ্ঞেস করে।
না রে রতন, এহনও অনেক পানি, ভ্যান ডুইবা যাইবো।
তাইলে আমরা আর কতক্ষণ বইয়া থাকুম? মার খুব কষ্ট অইতাছে, না-রে ভাই?

কলিমের মনে পড়ে ওদের মসজিদের হুজুর বলেছিলো- মানুষ মরে গেলে তার শরীরে খুব ব্যথা হয় কিন্তু সে বলতে পারে না। কলিম নিজের জামাটা খুলে কাপড়ে ঢাকা মায়ের দেহটির উপরে বিছিয়ে দেয়। ভাইয়ের দেখদেখি রতন তার ভিজা জামাটা দিয়ে মায়ের পা দু’টো ঢাকে।

অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর একসময় শেষ হয়। সূর্য্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে অনেকটাই। কলিম আবার খাদের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। পানি কমে গিয়ে হাঁটুর কাছাকাছি উচ্চতায় নেমেছে। কলিম ভাবে- ‘এইবার যাওয়া যাইবো।’ ভ্যানের কাছে ফিরে এসে বলে,

রতন ধর তো ভাই, রশি দিয়া মার দেহটারে ভাল কইরা আটকাইয়া নেই।
ভাই, মায়রে বান্ধতাছো ক্যান?
রশি দিয়া ভালমত আটকাইয়া না নিলে মার দেহ ঐ উঁচা-নিচা গর্তে পইড়া যাইবো।
রতন বুঝতে পেরে আর কোন কথা বলে না। বড়ভাইয়ের কথামত কাজ করে চলে শুধু।
আয় রতন, এইবার আমরা রওনা দেই

ধীরে ধীরে খাদে নামে ওরা। কলিম হ্যান্ডেল ধরে ভ্যানটাকে সামনের দিকে টেনে চলে আর রতন পিছন থেকে ধাক্কা দেয়। উঁচু-নিচু কাদামাটিতে বার বার ভ্যানটা আটকে যাচ্ছিলো। ছোট্ট রতনের পক্ষে নিজেকে সামলে ভ্যান ঠেলা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কলিম বুঝতে পেরে ছোট ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলে,

রতন তুই খালি ভ্যানের পিছনডা ধইরা রাখ।
আইচ্ছা।

রতন প্রাণপণে চেষ্টা করে ভ্যানটা ধরে রাখার, কিন্তু উঁচু-নিচু পিচ্ছিল খাদের পানিতে পড়ে যায় হঠাৎ। কলিম পিছন ফিরে তাকায়। ভ্যান ছেড়ে ভাইকে ধরার উপায় থাকে না। ছোট ভাইয়ের উদ্দেশ্যে শুধু বলে,
রতন সাবধানে চল ভাই।
রতন উঠে দাঁড়ায়, আবার পেছন থেকে ধাক্কা দেয়।

অল্প জায়গার খাদটি পার হতে দুই ভাইয়ের অনেক সময় লেগে গেল। মায়ের দেহটি নিয়ে যখন ওরা খাদের ওপারে উঠলো- সূর্য্য তখন পশ্চিম আকাশের শেষ প্রান্তে নেমে এসেছে। দূরে গ্রামগুলোর গাছের মাথা ছুঁই ছুঁই।
ভাই, আন্ধার হওয়ার আগে আমরা বাড়ি যাইতে পারুম?

দেহি!
কলিম রতনের দিকে তাকায়; বোঝে ক্ষুধা তৃষ্ণায় ও বেশ ক্লান্ত।
তুই পেছন থেইক্কা জোরে ধাক্কা দিতে পারবি না রতন?
রতন জবাব দেয়- হ, পারুম। ভাই, তোমার পায়ে কত্তবড় একটা জোঁক! হঠাৎ কলিমের পায়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে রতন।

কলিম পিছনে ঘুরে পায়ের দিকে তাকায়। জোঁকটা গোড়ালির উপর থেকে প্রায় হাঁটু কাছাকাছি পর্যন্ত লম্বালম্বিভাবে আঁকড়ে আছে। রাস্তার পাশের ঝোপ থেকে কাঠি নিয়ে জোঁকটা ছাড়ায়। রক্তের লাল ধারাটা পা বেয়ে নেমে আসে। রতন ভাইকে বলে,
ভাই, রক্ত পড়তাছে তো। তুমি একটু খাড়াও।

কিছু দুর্বাঘাস দু’হাতে ডলে কলিমের পায়ের ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেয় রতন। রক্ত পুরোপুরি বন্ধ হয় না।
কলিম বলে- থাউক আর কিছু দেওন লাগবো না, রক্ত পড়া এমনিই থাইমা যাইবো। আর দেরি করনের সময় নাই। বেলা শেষ অইয়া আইতাছে। তাড়াতাড়ি চল।

আবার শুরু হয় ওদের দুর্গম যাত্রা। নিজেদের শরীরের অবশিষ্ট শক্তিটুকু অবলম্বন করে দুই ভাই ভ্যানটাকে চালিয়ে নিয়ে চলে বাড়ির পথে। উঁচু-নিচু পথের ঝাঁকুনিতে ভ্যানের উপর মায়ের দেহখানি দুলছিলো বার বার। পিছন থেকে ভ্যান ঠেলতে ঠেলতে মাত্র নয় বছরের ছোট্ট রতন বার বার কাপড়ে ঢাকা মায়ের দিকে তাকায় আর ভাবে- এখন থেকে মা বলে ডাকবার আর কেউ থাকলো না। ব্যথা পেলে কেউ আর আদর করবে না, কোলের মধ্যে নিয়ে রাতজেগে পাখার বাতাস করবে না, মুখে ভাত তুলে দেবে না। ঘুমের ঘোরে হাত দিয়ে আর মাকে খুঁজে পাবে না রতন। রতনের বুক ফেটে কান্না আসে। ও বোঝে মায়ের দেহ নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌঁছতে হবে, ক্লান্ত শরীর নিয়ে ভ্যান ঠেলে চলে। দু’টি চোখ ক্রমশ ভিজে ওঠে।

রতন, আর একটু ভাই। এই দ্যাখ- আমরা আইসা পড়ছি। ঐ তো জমির চাচার ঘর দেখা যাইতাছে। সামনে থেকে কলিম বলে।

ভাইয়ের কথা শুনে রতন সামনের দিকে তাকায়, দূরে ওদের বাড়িটা তখন চোখে পড়ছিলো। বাড়ির প্রবেশমুখে জমির শেখের ছোট্ট কুঁড়েঘরটাও স্পষ্ট হচ্ছিল। ক্লান্ত অবসন্ন দেহে বড়ভাই কলিমের সাথে ভ্যান ঠেলে এগিয়ে চলছিল ছোট্ট রতন।

অপরিণত বয়সী দু’টি কিশোরের অসম যুদ্ধটা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছিলো। দুঃস্বপ্নময় দীর্ঘ একটি দিনের শেষে একটু একটু করে ওরা এগিয়ে যাচ্ছে চেনা গন্তব্যের দিকে। দিন শেষে গোধূলির রঙিন আভাটুকু মিলিয়ে যাবার পর চারিদিক থেকে অন্ধকারের দেয়ালটা ক্রমশ এগিয়ে এসে ঢেকে দিচ্ছিলো ওদের।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত