বকুল গাছ

বকুল গাছ

শুঁচিবায়ু টাইপ রোগ আছে এমন একটা ছেলের সাথে বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।আমি তখন ভার্সিটির হলে ছিলাম।বাবা জরুরি ভিত্তিতে ফোন দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো-‘রিশা,আজই চলে আয় বাসায়।তোর আম্মা মাথা ঘুরে রান্নাঘরে পড়ে গেছে’

আমি আমার বাবা’কে চিনি।সে প্রতিবারই একটা উছিলা দিয়ে আমাকে বাসায় ডাকাবে,ছেলে দেখাবে,ইত্যাদি ইত্যাদি।তবে এ বারের টা সিরিয়াস।আমার ছোটভাই মারফত খবর পেয়েছি এবার নাকি আমার বিয়ে কনফার্ম!

আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম-মাথা ঘুরে পড়ে গেলে ডাক্তার দেখাও,ঠান্ডা পানি ঢালো।আমি কি ডাক্তার নাকি যে এসে মা’কে চেকাপ করবো।

বাবা দাঁত কিড়মিড় করে বললেন-তোমাকে আসতে বলেছি,আসবা।এত মুখের উপর কথা কবে থেকে শিখলা?
আমি আস্তে আস্তে বললাম- আসবো,তুমি এতো দাঁত কিড়মিড় করো না।মোবাইল ই না তোমার কিড়কিড়ানি তে ভেঙ্গে যায়!

এই বলে চট করে ফোন নামিয়ে রাখলাম। বাবা এখন অস্থির ভাবে পায়চারি করবে।আমি না আসা পর্যন্ত টেনশন করবে।এত টেনশন করলে তো শেষমেশ সে হার্টএট্যাক করবে।তা তো হতে দিতে পারি না। পরদিনই তল্পি তল্পা গুছিয়ে বাসায় আসলাম।মা দিব্যি সুস্থ। বাবা আয়েশ করে পান চিবুচ্ছিলেন।আমাকে দেখামাত্রই খুশি খুশি গলায় বললেন- আসছিস তুই?

আমি বিরক্ত মুখে বললাম- দেখতেই তো পাচ্ছো।

বাবা মুখ কালো করে বললেন- ছেলে ভালো!
আমি লম্বা একটা শ্বাস টেনে বললাম-হু! জাস্ট একটু শুঁচিবায়ু আছে।
বাবার মুখ আরো কালো হয়ে গেলো। বললেন-সোনার চামচ বাঁকাও ভালো। পরদিন ছেলে তার গুষ্ঠিশুদ্ধ আমাকে দেখতে আসলো।এর মধ্যে কাজের মেয়ে ১০ বার ঘরের মেঝে লাইজল দিয়ে ধুয়ে মুছে তকতকে করে রেখেছে।
ছেলেকে আমার পছন্দ হয় নি। সারাক্ষণই মুখে টিস্যু চেপেই রেখেছে।পা দু’টোকে প্রায় শূন্যে তুলে রেখেছে,যেনো আমাদের ঘরে প্রচুর ময়লা। আমি চট করে ছেলেকে বললাম-আপনার পায়ে কি সমস্যা আছে কোনো?
ছেলে এবং ছেলের পরিবার মুখ কালো করে ফেললো।বাবা ও থতমত খেয়ে গেলো।পর মুহুর্তেই সব সামলে সবাই আমাকে বোঝাতে লাগলো যে তার পায়ে কোনো সমস্যা নেই।

তানভীর কে ফোন দিলাম।আমার বাউন্ডুলে টাইপ প্রেমিক। বললাম-চলো পালিয়ে যাই।
তানভীর আঁতকে উঠে বললো- কোথায়?
-চিটাগাং…
-চিটাগাং কেনো?

-কারণ,তোমার মতো বেকারের সাথে বাবা বিয়ে দিবে না।আর তোমার তো থাকার জায়গা ও নেই।চিটাগাং এ অনেক পাহাড় পর্বত আছে,সেখানেই একটাতে থাকবো গুহা বানিয়ে।

তানভীর মুখ কালো করে বললো- কিন্তু সেখানে তো ঝর্ণা নেই।গুহা’তে তো কিচেন ও থাকবে না,রাইট? টিভি? ওয়াইফাই?

আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম-ঠিকাছে,তাহলে বরং শুঁচিবায়ু ওয়ালারে বিয়ে করে নেই,ঠিকাছে না?

তানভীর আতঙ্কিত কণ্ঠে বললো- না, না প্লিজ।অল্প ক’টা দিন শুধু ধৈর্য্য ধরো। আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলবো।

-কবে? আমার বিয়ের পর…

তানভীর ঢোঁক গিলে বললো-আচ্ছা ঠিকাছে, কাল..
-সত্যি তো?
-হ্যাঁ!

পরদির তানভীর বাসার সামনে এসে ঘুরঘুর করতে লাগলো।কিন্তু, ঢুকলো না।আমি বারান্দা থেকে ইশারা করে ডাকলাম। ও তবুও ঘুরঘুর করছে।আমাদের বাসার সামনে একটা বকুল ফুলের গাছ আছে,বাবা খুব শখ করে লাগিয়েছিলেন।তানভীর গাছটার সাথে হেলান দিয়ে একটা ডাল ভেঙ্গে বিরস মুখে ভেতরে ঢুকার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।

বাবা চিৎকার করে বললেন- কে! কে ওখানে।আমার বকুল গাছের ডাল ভেঙ্গে ফেলছে কোন হারামজাদা?

তানভীর ডাল-টাল ফেলে ছুটে পালালো।

রাতে তানভীর খুব মন খারাপ করে বললো-রিশা,শোনো আমি প্রায় ঢুকতেই নিচ্ছিলাম।কিন্তু তোমার বাবা হঠাৎ……

আমি চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম- তুমি গাছের ডাল কেন ভাঙ্গতে গেছো? হাত নিসপিস করে, না? জানো না,ওটা বাবার খুব শখের গাছ।

তানভীর ভীতু গলায় বললো-এ ভুলটা আর করবো না।

বাবা’কে খুব সাহস নিয়েই বললাম যে আমি ঐ শুঁচিবায়ু ওয়ালাকে বিয়ে করবো না।আমার নিজের একটা পছন্দ আছে।

বাবা সেমাই খাচ্ছিলেন।আমার কথা শুনে কাশতে কাশতে সেমাইয়ের বাটি ফেলে দিলেন,চশমা খুলে পড়ে গেলো,চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে পড়লো।

আমি বিরক্ত কণ্ঠে বললাম- এত উত্তেজিত হয়ে পড়তেছো কেন?সামলাও নিজেকে….
এটা বলেই চলে আসলাম।বাবার স্থির হতে ঘণ্টা দুয়েক তো লাগবেই।

দুইদিন পর তানভীর আবার আসলো।বকুল গাছের নিচ এসে দাঁড়াতেই,বাবা বারন্দা থেকে চেঁচিয়ে বললেন- এই! এই ছোকরা,কে তুমি?হারামজাদা আবার আসছো বকুল গাছের ডাল ভাঙ্গতে?

তানভীর উর্ধ্বশ্বাসে পালালো।প্রচন্ড ভয় পায় সে,এই মানুষ’টাকে।

শুঁচিবায়ু ওয়ালার সাথে বিয়ে ঠিকঠাক। সে আমার সাথে দেখা করতে আসছে।ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে সে খুবই অস্বস্তির সঙ্গে বললো- ছাদে খুবই শ্যাওলা জমেছে,তাই না রিশা?

আমি ভ্রুঁ-কুঁচকে বললাম- একদমই না।

-তাহলে সবুজ সবুজ ওগুলা কি?

-ওগুলা হচ্ছে সুন্দরবনের কেওড়া পাতা।আমার অনেক শখ কিনা,তাই লাগিয়েছি।

শুঁচিবায়ুওয়ালা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বুঝতে চেষ্টা করলো আমি রসিকতা করছি কিনা।

নীরবতা ভাঙ্গিয়ে তিনি আবার বললেন- আমাকে তোমার পছন্দ হয়েছে রিশা?

-খুউউউব…

তিনি খুব খুশী মনে সেদিনের মতো বিদেয় হলেন।
তানভীর কে শুঁচিবায়ুওয়ালা’র সাথে কথোপকথন গুলো বলার পর ও প্রায় কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো-না রিশা,প্লিজ বিয়ে করো না।থাকতে পারবো না, একদম…

-আমার কিচ্ছু করার নেই।তুমি বাবার সাথে এসে কথা বলো।

-আমি তো আসি…

-তবে ছুটে পালাও কেনো?

তানভীর নিরুত্তর কিছুক্ষণ নিরুত্তর থেকে ধীরে ধীরে বললো-কালকে সিউর তোমার বাবার কাছে যাবো, দেইখো…
আমি মাথা দুলিয়ে বললাম-আমীন!

খুব সকালে উঠে বাবা বকুল গাছটার গোড়ায় পানি দেন একবার,আবার বিকেলে দেন একবার।তিনি যখন পানি দিচ্ছিলেন, তানভীর ভীরু পায়ে বাসার আশেপাশে পায়চারি করছিলো।

বাবা চশমা ছাড়া তেমন দেখতে পান না।তিনি তীক্ষ্ণ চোখে তানভীর’কে দেখে, একসময় চেঁচিয়ে বলে উঠলেন- এই ছোকরা,তুমিই তো না সেই বদমাইশ, যে প্রতিদিন বকুল গাছের ডাল ভেঙ্গে পালাও?

তানভীর দ্বিক-বিদ্বিক ছুটে পালালো।
বাবা চিৎকার করে বলতে লাগলেন-তোরে পাই হারামজাদা, ছাল তুলে ফেলবো তোর।

তানভীর ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো- রিশা,আর ১ টা দিন প্লিজ।পরের দিনই যাবো তোমার বাবার কাছে।

আমি শান্তভাবে বললাম- ১ সপ্তাহ পর আমার বিয়ে।তোমার অগ্রিম দাওয়াত।তোমার না রোস্ট পছন্দ? ফিশ ফ্রাই পছন্দ? সব পাবা একদম মন ভরে খেয়ে যেও কেমন?

এই বলে ফোনটা নামিয়ে রাখলাম।জিদ ধরলাম,আর ফোন দিবো না।শুঁচিবায়ুওয়ালারেই বিয়ে করে সংসার করবো।

পরদিন বাবা খুব মুখ গম্ভীর করে আমাকে ওনার রুমে ডেকে পাঠালেন। শুঁচিবায়ুওয়ালার সাথে কি নিয়ে যেনো সমস্যা হয়েছে। বাবা এখন বেঁকে বসেছে।দিবে না বিয়ে আমার।

বাবা মুখ কালো করে বললেন- তোমার যে ছেলেকে পছন্দ তাকে নিয়ে এসো।কথা বলবো আমি তার সাথে।

-কেনো বাবা? তোমার পছন্দ করা ছেলের কি হবে?

বাবা মুখ ফিরিয়ে বললেন-যা বলেছি তাই করো।

মা’র থেকে শুনলাম- শুঁচিবায়ুওয়ালা নাকি বাবাকে বলেছে, বকুল গাছ টা কেটে ফেলতে।কারণ এটা বাড়ি টাকে অন্ধকার করে রাখে,এটার জন্য সূর্যের আলো ঢুকতে পারে না।পাতা পড়ে নোংরা হয়।

বাবার খুব শখের গাছ।তাই বাবা বেঁকে বসেছে। যে ছেলে প্রকৃতি ভালোবাসে না,তার হাতে তিনি তার মেয়েকে কোনোমতেই তুলে দিবেন না।

তানভীরের সাথে আমার বিয়ে হলো যেদিন, সেদিন বাবা তানভীর কে ডেকে কিড়মিড় করে বললেন- শুনো বাবা,এক বদমাইশ আছে, যে প্রায়ই আমার বাসার সামনে আগে ঘুরঘুর করতো।একবার তো আমার বকুল গাছটার একটা ডাল ভেঙ্গে পালিয়েছে।

আমার মনে হয় বখাটে টাইপ কোনো ছেলে।তুমি যদি দেখো কোনোদিন ওরে, আমার কাছে নিয়ে আসবা।ওর ছাল-চামড়া ছাড়িয়ে নিবো।

তানভীর ঢোঁক গিলে আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো-ভাগ্যিস উনি বুঝতে পারেন নি,ওনার বকুল গাছের ডাল আমিই ভেঙ্গেছি…

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত