উদ্ভট ছেলেটা

উদ্ভট ছেলেটা

রাইশা ক্লিপ নিয়ে চুলে গুঁজে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো একবার ভাল করে দেখে নিল। চুলগুলো ঘাড়ের উপর ছড়িয়ে আছে। শাড়ির কুচিটা ভাল করে ঠিক করে নিল। পাক্কা আধা ঘন্টা ধরে সে শাড়ি পরেছে। ইউটিউবে টিউটরিয়ালের কল্যানে শাড়ি পড়া শিখতে পেরেছে। কপালে হালকা কাজল লাগাল। বেশি গাড়ো করে কাজল দিলে ভুতের মত লাগে! এই সন্ধ্যাবেলায় এমন সাজগোছ করার কোন কারন নেই। তবুও রাইশা নিজেকে পরিপাটি করে সাজিয়েছে। সাজগোছ করতে তার ভালই লাগে। সময়ও কেটে যায়।

রাইশা ঘড়ির দিকে তাকাল। শাফকাতের ফেরার সময় হয়ে এল। বিয়ের এক মাসে শাফকাতের সবকিছু তার জানা হয়ে গিয়েছে। ছেলেটা হুটহাট এমন কথা বলে ফেলে! কখনো তার কথা শুনলে হাসি পেয়ে যায়। মন খারাপ থাকলেও তার কথা শুনে অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে ওঠে! রাইশা সি এন জির জন্য দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশে কোন সি এন জি নেই! বৃষ্টি নামলেই এই রাস্তায় সি এন জি চালকরা রাজা বনে যায়। অনেক হাতে পায়ে ধরেও রাস্তায় কাউকে পাওয়া যায় না! রাইশা ছাউনির নিচে বসল। অপেক্ষা করলে সি এন জি অথবা কোন রিক্সা পাওয়া যেতে পারে। একটা ছেলে রাইশার পাশে দাঁড়িয়ে ভ্যাবলার মত তাকিয়ে আছে। ছেলেটাকে দেখতে ভদ্র মনে হলেও এভাবে তাকিয়ে থাকা একদম অসহ্য।

-আপনি কখনো গাড়ো করে কাজল দিবেন না। এতে আপনার সৌন্দর্য বাড়ার বদলে কমে হয়ে যায়।

পাশে দাঁড়ানো ছেলেটার এমন কথা শুনে রাইশা রেগে গেল। চেনা নেই জানা নেই! এমন কাউকে এভাবে বলার মানে কি! রাইশা চুপ করে আছে। ছেলেটি বলল

-একটু ভাল করে তাকালেই পারেন।

এমন রাগ নিয়ে তাকাচ্ছেন কেন! ভুল কিছু বলিনি। আশেপাশের কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন। আপনার প্রেমিককে জিজ্ঞেস করবেন। তিনি আরো ভাল বলতে পারবে। ছেলেটাকে রাইশার অসহ্য লাগছে। ধরে ইচ্ছামত থাপড়াইতে ইচ্ছা করছে। এমনিতে গাড়ি নেই, তার উপর আবার এমন বকবকানি! রাইশা রেগে বলল

-আপনার সমস্যা কি?
-কই কোন সমস্যা নেই তো।
-আপনার সমস্যা আমি জানি।
-জানলে জিজ্ঞেস করেন কেন! বলে দিলেই পারেন।
-আপনার প্রধান সমস্যা আপনি বেশি কথা বলেন। এত বেশি কথা বলবেন না। তবে বিপদে পরবেন।
-ধন্যবাদ।
-আরো সমস্যা আছে।
-সেগুলো পরে একদিন বলবেন। গাড়ি এসেছে।
-আমি চাইনা দ্বিতীয়বার আপনার সাথে দেখা হোক।

রাইশা পাশে তাকিয়ে দেখল সি এন জি দাঁড়িয়ে আছে। অবাক ব্যাপার! একটু আগে একটা সি এন জি’ও ছিল না; এখন কয়েকটা সি এন জি দাঁড়িয়ে আছে। রাইশা কথা না বাড়িয়ে সি এন জি তে উঠে বলল

-মতিঝিল চলেন।

রাইশার আসা পূরন হয়নি। যে ছেলেটার সাথে দেখা না হওয়ার কামনা করেছিল; সেই ছেলেটাকেই সারাজীবন বারবার দেখতে হবে! সেদিন শাফকাত রাইশার পিছু নিয়ে বাসা পর্যন্ত গিয়েছিল। পরে রাইশার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়। ছেলেকে অপছন্দ হওয়ার মত কারন ছিল না। তাই রাইশার পরিবার রাজি হয়ে গেল। রাইশা বাসর ঘরে চুপচাপ বসে আছে। শাফকাত ভেতরে ঢুকে রাইশার পাশে বসল। বিছানায় পা তুলে দিয়ে বলল

-তোমার জন্য দুঃখ লাগছে।

রাইশা অবাক হয়ে শাফকাতের দিকে তাকাল। বাসর ঘরে ঢুকে কেউ এমন কথা বলে! শাফকাত রাইশার অবাক চোখের দিকে না তাকিয়ে সাজানো বিছানার দিকে তাকিয়ে বলল

-তুমি চেয়েছিলে, দ্বিতীয়বার যেন আমার সাথে দেখা নাহয়! কিন্তু এখন বারবার দেখা হবে! রাইশা মুচকি হাসল। কোন কথা বলল না। শাফকাত বলল
-আমার আর কি কি সমস্যা বললে না তো!
-তোমার সমস্যা জানার জন্য আমাকে বিয়ে করেছ!
-শুধু তাই নয়, সমস্যার সমাধান’ও তোমাকেই করতে হবে।
-তোমার কথা বলা এখনো কমেনি!
-কি বল! আজকের সারাদিন আমি তেমন কথা বলিনি। তোমাদের বাসায় গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে হয়েছে!
-বিয়ের দিনে তো বরকে চুপচাপ বসে থাকতেই হয়। শাফকাত নড়েচড়ে বসল। পা দুইটা গুছিয়ে বাবু সেজে বসল। একটু অনুযোগের সুরে বলল
-এটা একদম ঠিক না।

যার জন্য এত আয়োজন তাকেই চুপ থাকতে হবে! আমার তো মনেহয় বর কনে দুজনের সবচেয়ে বেশি মজা করা উচিত। সারাদিন নাচানাচি করলে আরো ভাল হয়। রাইশা হেসে ফেলল। শাফকাতের কথা শুনে রাগ হওয়ার বদলে হাসি পাচ্ছে। একটা মানুষ এমন উদ্ভট হয়! কলিংবেল বেজে উঠল। রাইশা ড্রেসিংটেবিলের সামনে থেকে উঠে দরজা খুলল। শাফকাত ভেতরে ঢুকল। গায়ের শার্ট খুলে রাইশার হাতে দিল। শার্ট ঘামে ভেজা; কিন্তু কোন গন্ধ বের হচ্ছেনা! শার্টটা হ্যাঙ্গারের সাথে ঝুলিয়ে শাফকাতের দিকে লুঙ্গি এগিয়ে দিল। শাফকাত লুঙ্গি নিতে নিতে বলল

-আর বলো না। আজকে এক বন্ধুর সাথে দেখা। গল্প শুরু করে দিল। থামতেই চায় না!
-তুমিও কি কম কথা বল!
-আমি তো একদম কম কথা বলি।
-তুমি! এটা কোন পাগলকে বললে বিশ্বাস করবে। কিন্তু আমি না।
-দেখেছ! একটা পাগল নিশ্বাস করবে, অথচ তুমি বিশ্বাস করতে চাইছ না!

শাফকাতের মুখে হাসি। তার হাসি দেখে রাইশাও হেসে দিল। বাইশ দাঁড়িয়ে আছে। জামাকাপড় ছেড়ে শাফকাত বিছানায় বসল। এই ছেলেটা অফিস থেকে এসে হাতমুখ ধোঁয়ার কথা ভুলে যায়! রাইশা হালকা রেগে বলল

-তুমি অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হওনা কেন!
-ফ্রেশ হয়ে কি হবে!
-তাই! বিয়ের আগে না জানি কত মানুষ কত কথা শুনাতো!
-কেউ কথা শুনায়নি। মেসের ছেলেরা সবাই এমন।
-বাবা-মা এখন ঢাকায় থাকলে ভাল হত।
-কেন! তাদেরকেও এমনভাবে বলতে!
-আরে ধুর। তাদের ছেলে কত ভাল সেটা দেখাতাম। তারা তো গ্রামের বাড়ি দিব্যি আরামে আছে। কিন্তু তাদের ছেলের প্যারা আমাকে সহ্য করতে হচ্ছে!
-আমি তোমায় প্যারা দেই! রাইশা দুষ্টামিভরা হাসি দিয়ে বলল
-হ্যা,দাও তো।

-আরেকটু দেই তাহলে! শাফকাত বিছানা ছেড়ে রাইশার পাশে এসে দাঁড়াল। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরতেই রাইশা বলল
-এই হাতমুখ ধুয়ে এস আগে।
-আচ্ছা, তারপরে নাহয় বাকিটা হবে। শাফকাত ওয়াশরুম থেকে বের হল। রাইশা ডাইনিং টেবিলে চলে গিয়েছে! রাইশা শাফকাতকে ডেকে বলল
-খেতে এস। টেবিলে ভাত দিয়েছি।
শাফকাত খাবার টেবিলে এসে বসল। ভাত প্লেট।নিয়ে বলল
-বুয়া আজ কি রান্না করেছে?
-বুয়া আসেনি।
-আসেনি! তবে খাব কি! সে আসেনি কেন!
-তার শরীর খারাপ করেছে। আমি রান্না করেছি।
-তুমি রান্না করেছ! রাইশা মাছের তরকারি গরম করে চুলা থেকে নামাল। কড়াই থেকে বাটিতে ঢেলে ডাইনিং টেবিলে রাখল। শাফকাতের পাশে দাঁড়িয়ে বলল
-আমার রান্না করতে বারন নাকি!
-ঠিক তা নয়। তবে তোমার রান্না খাওয়া যাবে নাকি কে জানে!
-একটু খেয়েই দেখ। খারাপ হয়নি।
-নিজের রান্না নিজের কাছে খারাপ লাগেনা।

সেদিন যে রুটি বানাইছিলে! যেন বাংলাদেশের মানচিত্র! আমি তো রুটিগুলোকে মানচিত্র হিসেবে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। শাফকাত হো হো করে হাসছে। কিন্তু রাইশা রেগে গিয়েছে। সেদিনের জন্য আজ’ও এভাবে বলবে! প্রথম প্রথম রুটি বানালে এমন হওয়া স্বাভাবিক। তাই বলে এভাবে বলবে! রাইশা মন খারাপ করে বেডরুমে বসে আছে। শাফকাত ডাইনিং টেবিল থেকে উঠে বেডরুমে ঢুকল। রাইশার পাশে বসল। আস্তে করে রাইশার হাতটা ধরতেই, সে ঝাকি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল। শাফকাত রাইশার মুখের দিকে তাকাল। মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রেখেছে। রাইশার মেঘ জমা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল

-সরি। আমি মজা করে বলছি।

তবুও সে চুপ করেই আছে। শাফকাত তার থুঁতনিতে হাত দিয়ে মুখটা ঘুরালো। ঘাড়ের পিছনে হাত দিয়ে ধরে তার ঠোটের সাথে ঠোট মিলিয়ে দিল। শাফকাত রাইশাকে গভীর চুম্বনে আকৃষ্ট করে নিল। রাইশার মেঘজমা চোখ থেকে দুফোটা জল।গড়িয়ে পরল। সাথে অভিমান’ও ঝরে গেল। শাফকাত রাইশার হাত ধরে বলল

-খেতে দিবে চল।
-তুমি নিয়ে খাও। আমার যেতে ইচ্ছা করছে না।
-তাই!

শাফকাত রাইশাকে কোলে তুলে নিল। রাইশা লজ্জা রাঙা চোখে শাফকাতের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে রাইশা কোল থেকে নামল। শাফকাত প্লেটে ভাত নিল। রাইশা তার প্লেটে ট্যাংরা মাছের তরকারি তুলে দিল। শাফকাত দুই লোকমা খেয়ে রাইশার দিকে তাকাল। রাইশা বলল

-কোন সমস্যা!
-হ্যা। খাব না।
-কেন! বেশি অস্বাদ হয়েছে!
-না।
-তাহলে!
-আমি খাচ্ছি। আর তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছ! আমার পাশে বসতে পারনা!
-এই কথা! রাইশা শাফকাতের পাশে বসল। সে ভাত মাখিয়ে রাইশার দিকে তাকিয়ে বলল
-হা কর।

রাইশা হা করতেই মুখের ভেতর ভাত পুরে দিল। রাইশা ভাত চিবাচ্ছে। শাফকাত হুট করে তার গালে চুমু খেয়ে বসল। তার ঠোটে লেগে থাকা মাছের ঝোল রাইশার গালে লেগে গেল। রাইশা সেটা না মুছে খেতে থাকল। রাইশা মাঝে মাঝে ভাবে, ছেলেটা এতটা উদ্ভট কেন! এমন উদ্ভট কর্মকান্ডের জন্যই কি তার উপর রাগ করে থাকা যায় না!

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত